০৭. বিষকন্যা কেন বলছেন

বিষকন্যা কেন বলছেন?

যে কন্যার সংস্পর্শই বিষ, সে-ই তো প্রাণঘাতিনী বিষকন্যা।

তা বটে। তারপর একটু থেমে কিরীটী বললে, সুজিতবাবু, এবারে সত্যি করে বলুন তো, আজ অভিনয় শুরু হবার পর একবারও কি এ ঘরে আপনি আসেননি?

না।

ঠিক বলছেন?

নিশ্চয়ই।

মনে করে আবার ভাল করে ভেবে বলুন?

ভাবাভাবির বা মনে করবার কি আছে? আসিনি।

কিন্তু আমি যদি বলি—

কি?

আজ অভিনয় শুরুর পরে এ ঘরে আপনি এসেছিলেন!

না।

সুজিতবাবু, আমার হাতে প্রমাণ আছে যে আপনি এ ঘরে এসেছিলেন।

প্রমাণ? এ কি বলছেন মশাই?

কিরীটীর মনে হল গলাটা যেন কেমন বসে গেছে হঠাৎ সুজিতকুমারের।

গলার স্বরটা যেন ঠিক স্পষ্ট নয়।

কিরীটী বুঝতে পারে তার নিক্ষিপ্ত তীর লক্ষ্যভেদ করেছে।

অস্বীকার করে কোন লাভ নেই। বলুন, কেন এসেছিলেন?

আমি আসিনি।

আপনার জামার পকেটে ওটা কি উঁচু হয়ে আছে? দেখি বের করুন তো?

ওটা একটা হাফ পাই বোতল।

বোতলটা বের করুন।

সুজিত পকেট থেকে একটা কালো চ্যাপ্টা মত হাফ পাই বিলিতি মদের বোতল বের করল।

কি আছে ওতে?

হুইসকি।

দেশী না বিলিতি?

দেশী।

বোতলটা তো দেখছি অর্ধেকের বেশী খালি। এটা কি পরস্মৈপদী নাকি?

মানে?

কেউ কি দিয়েছে?

হ্যাঁ।

কে দিল?

পাল মশাই। তারপরই একটু থেমে বলল, অভিনয়ের রাত্রে বিশেষ করে অভিনয়ের সময় মধ্যে মধ্যে না পান করলে আমি অভিনয় করতে পারি না। তাই পাল মশাই অভিনয়ের রাত্রে একটা পাইন্ট বোতল আমাকে দিয়ে থাকেন।  

কিরীটী ক্ষণকাল অতঃপর সুজিতকুমারের দিকে চেয়ে রইল।

আমি এবারে যেতে পারি?

হ্যাঁ। কিন্তু বোতলটা আমার চাই, দিন।

বোতলটা।

হ্যাঁ, দিন।

নিন।

সুজিত বোতলটা কিরীটীর হাতে তুলে দিল। কিরীটী বোতলটা চোখের সামনে তুলে ধরে দেখল, তারপর সেটা সামনের টেবিলের উপরে রেখে দিল।

আচ্ছা, এবারে আপনি যেতে পারেন।

সুজিতকুমার ঘর থেকে বের হয়ে গেল।

মণীশ চক্রবর্তী জিজ্ঞাসা করলেন, ও কি সত্যিই আজ রাত্রে একবার এ ঘরে এসেছিল বলে আপনার মনে হয় মিঃ রায়?

মনে হয় নয়, এসেছিল। কিন্তু একটা ব্যাপার কেমন যেন খটকা লাগছে।

কি বলুন তো?

কিছু না। সুভদ্রা দেবীকে এবারে ডাকান তো!

এখুনি ডাকছি।

মণীশ চক্রবর্তী ঘরের দরজার বাইরে গিয়ে সুভদ্রাকে ঐ ঘরে পাঠিয়ে দেবার জন্য বললেন।

একটু পরে সুভদ্রা এল। কেঁদে কেঁদে তার দুচোখের পাতা ফুলে উঠেছে। চোখের পাতায় তখনও জল বোঝা যায়। সুভদ্রা ইতিমধ্যেই তার অভিনয়ের সাজপোশাক ছেড়ে ফেলেছে। পরনে সাধারণ একটি লাল রংয়ের চওড়াপাড় তাঁতের শাড়ি। কিরীটী লক্ষ্য করল মুখের প্রসাধনও তুলে ফেলেছে সুভদ্রা ইতিমধ্যেই।

মণীশ চক্রবর্তী প্রথমে তার প্রচলিত ভঙ্গীতে প্রশ্ন শুরু করলেন, আপনিই সুভদ্রা দেবী?

জলে ভরা চোখ দুটি তুলে নিঃশব্দে মাথা হেলিয়ে সুভদ্রা সম্মতি জানাল।

অনেক দিন এ দলে আছেন?

হ্যাঁ।

সুজিতবাবু বলছিলেন আপনাকে তৃতীয় অঙ্কের মাঝামাঝি সময়ে একবার নাকি এ ঘরে আসতে দেখেছিলেন।

সুজিতবাবু ঠিকই দেখেছিলেন। এসেছিলাম।

কেন?

সামন্ত মশাই আমাকে ডেকেছিলেন।

কিরীটী নিঃশব্দে চেয়ে চেয়ে দেখতে থাকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে সুভদ্রার সারা দেহ।

মণীশ চক্রবর্তী আবার প্রশ্ন করেন, কেন ডেকে পাঠিয়েছিলেন?

বলেছিলাম বর্ধমানে যাব, তাই বারণ করলেন যেন না যাই।

বর্ধমানে কেন যেতে চেয়েছিলেন?

মাসীর খুব অসুখ।

তারপর কতক্ষণ ছিলেন?

মিনিট দশেক।

ঐ সময় কিরীটীর দিকে তাকিয়ে মণীশ চক্রবর্তী বললেন, কিছু জিজ্ঞাসা করবেন ওঁকে?

কিরীটী সুভদ্রার দিকে তাকিয়ে বললে, সুভদ্রা দেবী, শুনলাম সুজিতবাবুই আপনাকে একদিন এই যাত্রাদলে এনেছিলেন?

হ্যাঁ।

সুজিতবাবুর সঙ্গে আপনার কতদিনের পরিচয়?

আমি এই যাত্রার দলে আসার আগে মধ্যে মধ্যে অ্যামেচার ক্লাবে প্লে করতাম। সুজিতবাবু একবার আমার প্লে দেখে আলাপ করেন। তারপর আমি যাত্রার দলে যোগ দিতে চাই কিনা জিজ্ঞাসা করলে আমি বলি, হ্যাঁ। তখন উনি নিয়ে আসেন আমাকে। সেই থেকেই আমাদের পরিচয়।

তার আগে পরিচয় ছিল না? ওঁকে জানতেনও না?

না।

আপনার মা বাবা ভাই বোন নেই?

না।

ছোটবেলায় মা-বাবা মারা যায়, তারপর মাসীর কাছেই আমি মানুষ।

বর্ধমান থেকে কলকাতায় যাতায়াত করতেন?

তা কেন!

তবে?

আমি পনের বছর বয়সেই কলকাতায় চলে আসি আমার স্বামীর সঙ্গে।

আপনার বিয়ে হয়েছিল?

হয়েছিল।

স্বামী এখন কোথায়?

কোথায় চলে গিয়েছে কেউ জানে না।

কতদিন আগে?

বছর দশেক আগে, বুঝতেই পারছেন। তারপর লেখাপড়া শিখিনি, বাঁচতে তো হবে, কাজেই এখানে-ওখানে অভিনয় শুরু করলাম।

ইদানীং হরিদাস সামন্তর সঙ্গেই বোধ হয় ঘর করছিলেন?

সুভদ্রা মাথা নীচু করল।

সুভদ্রা দেবী!

বলুন?

আপনি যখন তৃতীয় অঙ্কের মাঝামাঝি সময় এ ঘরে আসেন, সামন্ত মশাই তখন কি করছিলেন মনে আছে আপনার?

চুপচাপ বসেছিলেন।

তিনি মদ্যপান করছিলেন, না?

ঠিক মনে নেই। বোধ হয় করছিলেন।

তাহলে ঘরে বোতল একটা নিশ্চয়ই থাকত, বোধ হয় তিনি মদ্যপান করছিলেন না! মনে করে বলুন তো?

কি বললেন?

বলছি তিনি তখন মদ্যপান করছিলেন না বোধ হয়!

তা হবে। আমি ঠিক লক্ষ্য করিনি।

কোন গ্লাস ঘরে ছিল?

গ্লাস!

হ্যাঁ, ঐ কাচের গ্লাসটা–কিরীটী অদূরে টুলের উপরে রক্ষিত শূন্য কাচের গ্লাসটা দেখাল।

দেখিনি।

হুঁ। আচ্ছা, ইদানীং আপনার সঙ্গে তাঁর মন-কষাকষি চলছিল, তাই না?

অত্যন্ত সন্দেহ বাতিক ছিল লোকটির—

স্বাভাবিক। নিম্নকণ্ঠে কিরীটী কথাটা উচ্চারণ করল।

কিছু বললেন?

না। আচ্ছা, কে আপনাদের মধ্যে সামন্ত মশাইকে বিষ দিয়ে হত্যা করতে পারে বলে আপনার মনে হয়?

বিষ!

হ্যাঁ, তীব্র কোন বিষপ্রয়োগেই ওঁর মৃত্যু হয়েছে।

না না, ওঁর হার্টের ব্যামো ছিল, ব্লাড-প্রেসারও ছিল।

তা হয়তো ছিল, তবে তাঁর মৃত্যু বিষের ক্রিয়াতেই হয়েছে বলেই আমাদের ধারণা।

কিন্তু কে তাঁকে বিষ দেবে? কেউ তো তাঁর শত্রু এখানে ছিল না?

কার মনে কি আছে আপনি জানবেন কি করে? তারপরই হঠাৎ কিরীটী বললে, আপনার ডান হাতের কবজির কাছে রক্তের দাগ কিসের দেখি। দেখি হাতটা আপনার?

রক্তের দাগকই! না তো, ও কিছু না। ও হ্যাঁ, মনে পড়েছে, সন্ধ্যার সময় সাজঘরের টিনের পার্টিশনের একটা পেরেকে হাতটা কেটে গিয়েছিল কবজির কাছে।

অভিনয়ের সময় দেখেছিলাম, আপনার দুহাতে কাচের আয়নার চুমকি বসানো দুটি চুড়ি। চুড়ি দুটো বুঝি খুলে রেখেছেন?

হ্যাঁ। সাজঘরে বাক্সর মধ্যে।

নিয়ে আসতে পারেন চুড়ি দুটো?

সুভদ্রা কেমন যেন এবারে একটু থতমত খেয়ে যায়। চুপ করে থাকে। কেমন যেন একটু মনে হয় ইতস্তত ভাব একটা।

কই, যান? নিয়ে আসুন চুড়ি দুটো?  

সুভদ্রা বেরুচ্ছিল, কিন্তু কিরীটী তাকে আবার কি ভেবে বাধা দিল, না, আপনি না। মণীশ চক্রবর্তীর দিকে তাকিয়ে বলল, মিঃ চক্রবর্তী, বাইরে কাউকে বলুন তো, সুভদ্রা দেবীর সাজঘর থেকে চুড়ি দুটো নিয়ে আসতে।

মণীশ চক্রবর্তী বের হয়ে গেলেন।

ঘরে এবারে একা সুভদ্রা।

সুভদ্রা যেন বেশ একটু বিব্রতই বোধ করে, অথচ মুখে সেটা প্রকাশ না করলেও কিরীটীর বুঝতে কিন্তু অসুবিধা হয় না।  

কিরীটী সুভদ্রার মুখের দিকে তাকাল।

সুভদ্রা দেবী!

অ্যাঁ! আমায় কিছু বলছিলেন?

সুভদ্রা দেবী, আমার নামটা বোধ হয় আপনি জানেন না—

সামন্ত মশাই যে বলছিলেন, ধূর্জটি রায় আপনার নাম!

নামটা আপনার মনে আছে দেখছি। কিন্তু ওটা তো আমার আসল নাম নয়।

তবে?

ওটা আমার অন্য একটি নাম, বিশেষ করে নামের আড়ালে যখন আমি আমাকে কিছুটা গোপন করতে চাই। বলতে পারেন ছদ্মনাম।

ছদ্মনাম!

হ্যাঁ।

সুভদ্রা তাকাল কিরীটীর মুখের দিকে।

হ্যাঁ—কিরীটী রায় নামটা কখনও শুনেছেন?

কিরীটী রায়! আপনি কি তবে সেই বিখ্যাত রহস্যানুসন্ধানী—একটা ঢোঁক গিলে কেমন যেন শুকনো গলায় থেমে থেমে কথাগুলো টেনে টেনে উচ্চারণ করল সুভদ্রা।

হ্যাঁ, আমিই সেই।

তবে আপনি–

না। সামন্ত মশাইয়ের বন্ধু আমি কোনদিনও ছিলাম না—তাঁর সঙ্গে পরিচয় মাত্র আমার কয়েকদিন আগে। এবং আরও বোধ হয় আপনার একটা কথা জানা দরকার, তিনি মৃত্যু-আশঙ্কা করছিলেন বলেই আমার শরণাপন্ন হয়েছিলেন।

মৃত্যু আশঙ্কা!

হ্যাঁ, তাঁর ধারণা হয়েছিল তাঁকে হত্যা করা হবে।

কে—কে তাঁকে হত্যা করবে?

হত্যা যে কেউ তাঁকে করেছে সে তো দেখতেই পাচ্ছেন, ঐ সামনে তাঁর বিষ-জর্জরিত মৃতদেহ—আর এও আমি জানি–

কি—কি জানেন?

আপনারা যাঁরা আজ রাত্রে এখানে উপস্থিত হয়েছেন অভিনয়ের ব্যাপারে—সেই আপনাদের মধ্যেই কেউ একজন তাঁকে হত্যা করেছেন।

কিরীটী শান্ত ধীর গলায় কথাগুলো বলে গেল।

কে—কে তাঁকে হত্যা করেছে?

আপনিই অনুমান করুন না, কে তাঁকে হত্যা করতে পারে!

ঐ সময় মণীশ চক্রবর্তী পুনরায় এসে ঘরে ঢুকলেন, হাতে তাঁর একটি গালার চুড়ি।

একটিই পেয়েছেন—জোড়ার অন্যটা পাননি তো? কিরীটী মৃদু হেসে বললে।

না, একটিই পেলাম।

জানতাম পাবেন না। সুভদ্রা দেবী, জোড়ার অন্য চুড়িটা কোথায় গেল? সুভদ্রার দিকে ফিরে তাকিয়ে কিরীটী তার কথাটা প্রশ্নের ভিতর দিয়ে শেষ করল।

জা—জানি না, ওখানেই তো খুলে রেখেছিলাম!

না, রাখেননি।

রাখিনি—কি বলছেন আপনি?

ঠিকই বলছি—অন্যটা ভেঙে গিয়েছে!

ভেঙে গিয়েছে।

হ্যাঁ, তৃতীয় অঙ্ক শুরু হবার পরই কোন এক সময় ভেঙে গিয়েছিল। কারণ তৃতীয় অঙ্কের মাঝামাঝি সময় আমার এখন স্পষ্ট মনে পড়ছে, হাতে আপনার চুড়ি ছিল। তা কি করে ভাঙল?

সুভদ্রা চুপ। একেবারে যেন বোবা, বিমূঢ়।

জবাব দিন—এই ঘরের মধেই, না? কিন্তু ভাঙল কি করে?

হ্যাঁ, এই ঘর থেকে বেরুবার সময় দরজায় ধাক্কা লেগে চুড়িটা ভেঙে যায়।

আপনি মিথ্যে কথা বলছেন, যেমন একটু আগে বলেছিলেন, পেরেকে হাত কেটেছেন!

কিন্তু—

বলুন সত্যি কথাটা?

মিথ্যে আমি বলিনি।

বলেছেন। এবার বলুন তো—আপনি সন্তানসম্ভবা, তাই—

হ্যাঁ। মাথাটা আবার নীচু করল সুভদ্রা।

কার সন্তার আপনার গর্ভে?

সামন্ত মশাইয়ের।

তিনি জানতেন কথাটা?

জানতেন।

আশ্চর্য! অস্ফুট স্বরে কথাটা কিরীটী উচ্চারণ করল।

কি বললেন?

কিছু না। আপনি যেতে পারেন। পাল মশাইকে এ ঘরে পাঠিয়ে দিন।

সুভদ্রা ঘর ছেড়ে চলে গেল।

রাত শেষ হয়ে আসছিল। গ্রীষ্মের স্বল্পায়ু রাত্রি। খোলা জানলাপথে একটা ঠাণ্ডা ঝিরঝিরে হাওয়া আসছিল।

রাধারমণ পাল এসে ঘরে ঢুকলেন।

ইতিমধ্যেই কিরীটীর পরামর্শে মণীশ চক্রবর্তী একটা চাদরে মৃতদেহটা ঢেকে দিয়েছিলেন চেয়ার থেকে নামিয়ে মেঝেতে শুইয়ে দিয়ে।

কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই যেন পাল মশাইয়ে মুখটা শুকিয়ে গিয়েছে।

আমায় ডেকেছেন?

পাল মশাই!

কিরীটীর ডাকে রাধারমণ পাল ওর মুখের দিকে তাকালেন।

একটা কথা জিজ্ঞাসা করি।

বলুন?

সুজিতবাবুকে আজ আপনি একটা পাইণ্ট বোতল দিয়েছিলেন?

হ্যাঁ।

অভিনয়ের রাত্রে আপনি প্রত্যেক বারই দিতেন?

আজ্ঞে।

পাল মশাই, একটা কাজ আপনাকে করতে হবে। কিরীটী বললে।

কি বলুন?

আপাতত যতদিন না সামন্ত মশাইয়ের মৃত্যুরহস্যের একটা মীমাংসায় পুলিস পৌঁছায় ততদিন আপনার দলের কয়েকজন কলকাতার বাইরে কোথাও যেতে পারবেন না। ভাল কথা, দোলগোবিন্দবাবু আছেন তো, তাঁকে একবার যদি ডেকে দেন, কয়েকটা প্রশ্ন তাঁকে করতে চাই।

না মশাই, তার কোন সন্ধানই পাচ্ছি না।

সন্ধান পাচ্ছেন না?

না।

আপনি জানেন না তিনি কোথায় গিয়েছেন?

না। হঠাৎ এভাবে চলে যাওয়ার কারণও তো কিছু বুঝতে পারছি না।

কিরীটী একটু যেন কি ভাবল, তারপর বললে, তিনি তো অনেক দিন আপনার দলে আছেন?

হ্যাঁ, তা ধরুন প্রায় বছর সাতেক তো হবেই। তবে মনে হচ্ছে—

কি?

ফ্রেঞ্চ লিকারের সন্ধানে বোধ হয় গিয়েছে। সারাটা দিনই উসখুস করছিল। কিন্তু আমি যেতে দিইনি। নেশা করলে ওর হুঁশ থাকে না। পার্ট করতে পারবে না। নচেৎ সে পালাবার লোক নয়। নেশা একটু বেশি করে বটে—লোকটা সাদাসিধে, ঘোরপ্যাঁচ তেমন কিছু নেই।

আপনার দলের সকলেরই বোতল-প্রীতি রয়েছে। কিরীটী বললে।

আজ্ঞে।

আর কে কে মদ্যপান করে থাকেন এ দলে?

সবাই করে অল্পবিস্তর।

শ্যামলকুমার?

বলতে পারি না।

আপনি?

না, জীবনে আজ পর্যন্ত মদ স্পর্শ করিনি।

হুঁ। তাহলে ঐ কথাই রইল, ওরা যেন কলকাতার বাইরে না যায়।

কিন্তু আপনি দলের কাদের কথা বলছিলেন যারা পুলিসের বিনানুমতিতে বাড়ি ছেড়ে কোথাও যেতে পারবে না?

শ্যামলকুমার, সুজিতকুমার, সুভদ্রা দেবী আর আপনি ও দোলগোবিন্দবাবু।  

রাধারমণ পাল যেন কেমন ফ্যালফ্যাল করে বোবা অসহায় দৃষ্টিতে কয়েকটা মুহূর্ত কিরীটীর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকেন। তারপর কিছুক্ষণ বাদে শুকনো গলায় প্রশ্ন করেন জিভটা দিয়ে ঠোঁট চেটে, কেন, আমাদের কি আপনি সন্দেহ করেন?

আপনাদের সকলের উপরই যে পুলিসের সন্দেহ পড়েছে তা নয়—

তবে?

বুঝতেই পারছেন আপনারা যাঁরা যাঁরা মৃত হরিদাস সামন্তর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ছিলেন, এ হত্যারহস্যের মীমাংসায় একটা পোঁছতে হলে আপনাদের প্রত্যেকেরই, যাঁদের নাম করলাম আমাদের প্রয়োজন।

কিন্তু—ইতস্তত করলেন রাধারমণ পাল।

বলুন, থামলেন কেন?

সতিই কি আপনারা মনে করেন হরিদাস সামন্তকে বিষ দিয়ে হত্যা করা হয়েছে?

পুলিসের ধারণা আপাতত তাই, তবে ময়নাতদন্তে যদি অন্য কিছু প্রকাশ পায়।

কিন্তু আমরা আমাদের এককালের একজন সহকর্মীকে হত্যা করতে যাবই বা কেন?

সেটা জানতে পারলে তো সব কিছুর মীমাংসা হয়েই যেত পাল মশাই। যাক, যা বললাম, সেই মত সকলকে বলে দিন। আর পরশু বা তরশু বিকেলের দিকে আপনাদের চিৎপুরের অফিসে যাব, ওদের সকলকে উপস্থিত থাকতে বলবেন।

আর উপস্থিত থাকা! দল বোধ হয় আমার ভেঙেই গেল রায় মশাই!

রাধারমণ পালের গলার স্বরটা যেন বুজে আসে।

না না, দল ভাঙবে কেন?

কি বলেন, এর পরও দল আর থাকবে—তাছাড়া যা আপনারা বলেছেন তা যদি সত্যিই হয়-উঃ, আমি আর ভাবতে পারছি না রায় মশাই, এ কি সর্বনাশ হল! এখন দেখতে পাচ্ছি সামন্ত মশাইয়ের কথাটা শুনলেই বোধ হয় ভাল হত, বার বার করে আমাকে বলেছিলেন সামন্ত মশাই, এ নাটক করবেন না, অন্য নাটক দেখুন। কিন্তু কি যে মাথায় তখন ভূত চাপল! সামন্ত মশাই নিজে তো গেলেনই, আমাকেও ড়ুবিয়ে দিয়ে গেলেন অগাধ জলে।

কুণ্ডু ভবন থেকে সকলের বিদায় নিতে পরের দিন বেলা দশটা হয়ে গেল।

কিরীটী আগেই চলে গিয়েছিল।

মণীশ চক্রবর্তীও লাস মর্গে ময়নাতদন্তের জন্য চালান করে দিয়ে একসময় বিদায় নিলেন। রাধারমণ পাল সকলকে নিয়ে স্টেশনের দিকে রওনা হলেন দশটায়। বেলা এগারোটায় একটা কলকাতাগামী ট্রেন আছে সেটাই ধরবেন।

শেয়ার বা বুকমার্ক করে রাখুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *