০৭. মৃতদেহ মর্গে পাঠিয়ে

মৃতদেহ মর্গে পাঠিয়ে কিরীটীর নির্দেশমত সুবীর সুবিনয় বাহাদুর প্রিয়লাল ও অন্যান্য ভৃত্যদের আপাততঃ পুলিসের বিনানুমতিতে বাড়ি ছেড়ে কোথাও না যেতে বলে বাড়িটা পুলিস পাহারায় রেখে অরূপ ও অন্যান্য সবাই বাড়ি থেকে বের হয়ে এল।

কিরীটী আর যোগজীবন পাশাপাশি হাঁটছিল।

সান্যাল মশাই!

বলুন!

শমিতা দেবীকে আমি কয়েকটি প্রশ্ন করতে চাই, অবিশ্যি যদি আপনার আপত্তি না থাকে?

আপত্তি হবে কেন? বলব শমিকে—

আমি বিকেলের দিকে যাব আপনার ওখানেই–উনি যদি সে সময় থাকেন!

বলে দেব থাকতে ঐ সময়।

যোগজীবনকে কিরীটীর মনে হল যেন বেশ কেমন একটু অন্যমনস্ক।

তাহলে এবারে আমি চলি–বলে কিরীটী উল্টোদিকে বাড়াতেই যোগজীবন ডাকেন, রায় সাহেব!

কিরীটী ঘুরে দাঁড়াল, কিছু বলছিলেন?

হ্যাঁ–একটা কথা!

বলুন?

আচ্ছা আপনি কি গগনের হত্যার ব্যাপারে আমার বোন শমিকে কোন রকম সন্দেহ করছেন?

দেখুন সান্যাল মশাই, ওকে আমি দেখিনি আজ পর্যন্ত–তবে আপনাদের সকলের মুখ থেকে যেটুকু জানতে পারলাম তাতে করে–

কি রায় সাহেব?

তার চরিত্রে কিছুটা স্বেচ্ছাচারিতা ও উজ্জ্বলতা আছেই।

না না–সে রকম যা আপনি ভাবছেন তেমন কিছু নয়। ক্লাব নিয়ে হৈচৈ করে, একটু-আধটু ড্রিঙ্ক করে ঠিকই, কিন্তু সে সত্যিই সেরকম উচ্ছল প্রকৃতির বলতে যা বোঝায় সে ধরণের মেয়ে নয়। তাছাড়া আজকালকার দিনে ওরকম তো প্রায়ই দেখা যায় বয়সের ছেলেমেয়েদের মধ্যে।

আপনি কিছু ভাববেন না সান্যাল মশাই–সত্যিই গতরাত্রের ব্যাপারের সঙ্গে যদি তার কোন সম্পর্ক না থাকে তো কেউ তাকে স্পর্শ করতে পারবে না। আর একটা কথা–

কি?

আপনি যদি চান তো আমি আপনার বন্ধুর হত্যার ব্যাপার থেকে একেবারে সরে দাঁড়াতে পারি!

না, না–তার কোন প্রয়োজন নেই। দৈবক্রমে ঘটনাচক্রে যখন আপনি ব্যাপারটার মধ্যে গিয়েই পড়েছেন, আপনার করণীয় অবশ্যই আপনি করবেন।

আমিও ঐ উত্তরটাই আপনার কাছে আশা করেছিলাম সান্যাল মশাই।

সত্য আর গরলকে চাপা দিয়ে রাখা যায় না চিরদিন, একদিন-না-একদিন সে প্রকাশ হয়ে পড়েই–তাছাড়া শমিতা যেমন আমার সহোদরা বোন তেমনি গগনও ছিল আমার দীর্ঘদিনের বন্ধু। আমার–হ্যাঁ, আমারও কিছু দোষ আছে বৈকি। গগন আর শমিতা সম্পর্কে আমার কানে ইদানীং কিছুদিন ধরে অনেক কথাই আসছিল, কিন্তু তবু আমি সতর্ক হইনি।

হওয়া বোধ হয় উচিত ছিল আপনার সান্যাল মশাই!

এখন বুঝতে পারছি উচিত ছিল। তবে বিশ্বাস করুন রায় সাহেব, এতটা আমি কল্পনাও করতে পারিনি।

এবারে বাড়ি যান সান্যাল মশাই।

যোগজীবন বিদায় নিয়ে গৃহের দিকে চলা শুরু করলেন।

কিরীটীও তার গৃহের দিকে পা পাড়াল।

.

বেলা দশটা প্রায় হয়ে গিয়েছিল সেদিন কিরীটীর গৃহে ফিরতে। কৃষ্ণা উদ্বিগ্ন হয়ে ঘর–বার করছিল–সুব্রতকেও ফোন করে আনিয়েছিল।

কিরীটী এসে যখন গৃহে প্রবেশ করল, জংলী তখন আবার কিরীটীর সন্ধানে চতুর্থবার লেকের দিকে যাচ্ছিল। কিরীটীকে দেখে সে দাঁড়াল, বাবুজী, কোথায় ছিলে তুমি এতক্ষণ?

কেন রে?

মাইজী খুব ব্যস্ত হয়েছে–যাও। উপরে যাও।

দেড়তলার বসবার ঘরে ঢুকতেই সুব্রত বলে ওঠে, কি রে, কোথায় গিয়েছিলি?

কেন?

কেন মানে? সেই সকাল সাড়ে তিনটেয় লেকে বেড়াতে গিয়ে আর পাত্তা নেই?

কৃষ্ণা বলে, সত্যি–আশ্চর্য মানুষ তুমি!

কিরীটী সোফার উপর বসতে বসতে বললে মৃদু হেসে, হারিয়ে যাব না সে তত জানতেই প্রিয়ে–আর সেরকম কোন একটা দুর্ঘটনা ঘটলেই আগে সে সংবাদ পেতে।

থাক। আর বাহাদুরিতে প্রয়োজন নেই। তা চা খেয়েছ, না তাও পেটে পড়েনি এখনও?

পড়েছিল সেই ঘন্টা তিনেক আগে এক কাপ, তাও সম্পূর্ণ নয়। এক কাপ পেলে মন্দ হত না।

কৃষ্ণা উঠে গেল। সুব্রত আবার জিজ্ঞাসা করে, কিন্তু কোথায় ছিলি এতক্ষণ?

আর বলিস কেন! গিয়েছিলাম অবিশ্যি একটি রেয়ার ফুল দেখতে–অবশেষে জড়িয়ে পড়লাম এক খুনের ব্যাপারে।

খুন! কোথায়? কে?

ধীরে বন্ধু ধীরে। তারপর একটু থেমে কিরীটী বলে, নিহত হয়েছেন এক এক্স আর্মি কর্নেল। মৃত্যুর কারণ ছুরিকাঘাত–স্থান অনতিদূরে, সাদার্ন অ্যাভিনুতে।

তা তুই তো গিয়েছিলি লেকে বেড়াতে—

বললাম যে, বেড়ানো শেষ হবার পর গিয়েছিলাম সান্যাল মশাইয়ের গৃহে একটা রেয়ার ফুল দেখতে!

সান্যাল মশাই কে?

লেকের ভ্ৰমণবন্ধু–এক প্রৌঢ় রিটায়ার্ড ভদ্রলোক এবং যিনি নিহত হয়েছেন তাঁরই ঘনিষ্ঠ বন্ধু।

তারপর?

সান্যাল মশাইয়ের ওখানে ফোন এল বন্ধুটি তাঁর নিহত। তখন তিনি–মানে তাঁরই অনুরোধে তাঁর সঙ্গে যাই।

চায়ের কাপ হাতে কৃষ্ণা ঘরে ঢুকতে ঢুকতে বলে, তা সেখান থেকে একটা ফোন করে দিতে কি হয়েছিল?

ক্ষমা করো দেবী–মনে পড়েনি।

তা মনে পড়বে কেন? খুনখারাপির গন্ধ পেলে কি আর কিছু মনে থাকে?

কিরীটী কৃষ্ণার হাত থেকে চায়ের কাপটা নিয়ে কাপে চুমুক দিতে দিতে মৃদু মৃদু হাসে।

শোন, বস–খুব ইন্টারেস্টিং ব্যাপার!

থাক তোমার ইন্টারেস্টিং ব্যাপার, আমার শোনার প্রয়োজন নেই। কৃষ্ণা বলে।

প্রসীদ দেবী! তুমি মুখ ভার করলে এ অভাজনকে নিজগৃহেই যে পরবাসী হতে হবে! ঘটনাটা সত্যিই রোমাঞ্চকর। শোনই না।

না–ও শোনায় আমার কোন লাভ নেই।

বল কি? আমাকে যারা ভালবাসে তারা শুনলে যে তোমায় ধিক্কার দেবে! কিরীটী-কাহিনী শুনতে চায় না এমন মতিচ্ছন্ন যার হয়েছে তাকে—

সেই তো একঘেয়ে ব্যাপার। হয় টাকাপয়সা না হয় প্রতিহিংসা–না হয় কোন এক স্ত্রীলোকের বা পুরুষের প্রেমের জ্বালা। বিয়ে হওয়া অবধি তোমার মুখে ঐসব শুনতে শুনতে।

থাক্‌ গিয়ে। তা ও ছাড়া আর ক্রাইম জগতে কি আছে বল? পাপিষ্ঠ–পাপিষ্ঠার দল ঐ পাকচক্রেই ঘূর্ণিপাক খাচ্ছে যে অহরহ!

সুব্রত হাসছিল। এবারে বললে, নে, বল্ শুনি তোর এক্স আর্মি অফিসারের নিধন ব্যাপারটা!

তুইও সুব্রত দাউ টু ব্রুটাস! তুইও ব্যাপারটাকে লাইট করে নিচ্ছিস?

কিন্তু ব্যাপারটা বলবি তো?

কিরীটী অতঃপর সমস্ত ব্যাপারটা সংক্ষেপে বিবৃত করে যায়।

সব শুনে সুব্রত বলে, এ তো মনে হচ্ছে—

কি, বল?

বিকৃত এক লালসার পরিণতি।

আমারও যেন মনে হচ্ছে তাই। কারণ লালসা বস্তুটা মানুষের অন্যতম রিপু হিসাবে–অর্থাৎ নারী–পুরুষের চরিত্রের অচ্ছেদ্য এক ধর্ম, ওটা বাদ দিয়ে মানুষ যেমন কোন যুগেই চলতে পারেনি এ যুগেও পারবে না, এবং ভবিষ্যতেও বোধ হয় কখনও পারবে না।

কথাটা শেষ করল সুব্রত, তাই খুনখারাপি হবেই। কিন্তু গগনবিহারীর অমন মতিচ্ছন্ন হল কেন?

আরে প্রৌঢ় ও বৃদ্ধের দলই তো ঐ ধরনের বিকৃত লালসার বড় ভিকটিম হয়!

কিন্তু একটা ব্যাপারে কেমন যেন আমার খটকা লাগছে কিরীটী! সুব্রত বললে।

ঐ অ্যালসেসিয়ান কুকুরটা তো?

হ্যাঁ। হত্যাকারী কুকুরটাকে ম্যানেজ করল কি করে?

সে আর এমন দুরূহ ব্যাপার কি! আগে থেকেই হয়ত কুকুরটাকে সরিয়ে ফেলেছিল কৌশলে। তবে এও ঠিক, শেষ পর্যন্ত হয়ত ঐ কুকুরটাই হবে তার মৃত্যুবাণ। ভাল কথা মনে করিয়ে দিয়েছিস বলতে বলতে উঠে গিয়ে কিরীটী অরূপকে ফোনে ডাকল।

বালীগঞ্জ থানার ও. সি. কথা বলছি–সাড়া এল অপর প্রান্ত থেকে।

অরূপ–আমি কিরীটী। একটা কথা তখন তোমাকে তাড়াতাড়ি বলতে ভুলে গিয়েছি—

কি কথা?

একজন ভেটানারী সার্জেনকে দিয়ে কুকুরটাকে একবার পরীক্ষা করবার ব্যবস্থা করতে পার?

কেন পারব না? অরূপ বললে।

হ্যাঁ দেখাও, আমার মনে হয় কুকরটাকে খাবারের সঙ্গে কোন তীব্র ঘুমের ওষুধ দেওয়া হয়েছিল। শুধু তাই নয়, আর একটা কথা, কুকুরটার উপরে যেন কস্টান্টু ওয়াচ রাখা হয়।

অরূপকে নির্দেশ দিয়ে কিরীটী ফোনটা রেখে দিল।

সারাটা দুপুর কিরীটী কোথাও বের হল না। নিজস্ব লাইব্রেরী থেকে অ্যালসেসিয়ান কুকুর সম্পর্কে এক বিশেষজ্ঞের বই নিয়ে তারই মধ্যে ডুবে রইল।

বিকেলের দিকে যোগজীবনের ওখানে যাবে বলেছিল কিন্তু বেরুতে সন্ধ্যা হয়ে গেল।

সুব্রতকে কিরীটী বলে দিয়েছিল বিকেলে তার ওখানে চলে আসতে। দুজনে একসঙ্গে যোগজীবনের ওখানে যাবে।

সুব্রত যথাসময়েই এসে হাজির হয়েছিল।

কিন্তু সুব্রত এসে দেখল কিরীটী কি একটা বই নিয়ে তার মধ্যে ডুবে আছে, কাজেই তাকে আর বিরক্ত করেনি।

বইটা শেষ করে কিরীটী যখন উঠে দাঁড়াল বেলা তখন গড়িয়ে গিয়েছে–বাইরের আলো ম্লান হয়ে গিয়েছে।

সন্ধ্যার ধূসর ছায়া নামছে ধীরে ধীরে।

কি রে, বেরুবি না? সুব্রত শুধাল।

হ্যাঁ, চল।

সুব্রত তার গাড়ি এনেছিল। সেই গাড়িতেই চেপে দুজনে যোগজীবনের গৃহের দিকে রওনা হল।

গাড়িতে উঠে কিরীটী বললে, চল একবার থানায় ঘুরে যাই। রামদেওর কোন পাত্তা পাওয়া গেল কিনা জেনে যাই। আর অরূপ যদি থাকে তো তাকেও সঙ্গে নিয়ে যাব।

থানার সামনে এসে ওদের গাড়ি যখন থামল সন্ধ্যা হয়ে গিয়েছে তখন। রাস্তার আলো জ্বলে উঠেছে। অরূপ থানাতেই ছিল।

অরূপের অফিস–ঘরে ঢুকেই কিরীটী জিজ্ঞাসা করল, রামদেওর কোন খবর পেলে অরূপ?

না।

খবরটা যে চাই।

প্রতাপগড়ে ওর দেশে খোঁজ নেবার জন্য ইউ, পি-র ইনটেলিজেন্স ব্রাঞ্চে ফোন করে টেলিজেন্স ব্রাঞ্চে ফোন করে দিয়েছি। বেটার একটা ফটো পেলে সুবিধা হত।

রুক্মিণীর কাছে খোঁজ করে দেখো–পেতে পার।

দেখি, কাল একবার যাব। হ্যাঁ ভাল কথা, সুবীর চৌধুরী ফোন করেছিল।

কেন?

সে বাইরে বেরুতে চায়। আমি বলে দিয়েছি, আপাত চার–পাঁচদিন ঐ বাড়ির বাইরে কোথাও তার যাওয়া চলবে না।

তারপর?

চেঁচামেচি করেছিল ফোনে। আমরা কি তাকেই গগনবিহারীর হত্যাকারী বলে সন্দেহ করছি নাকি ইত্যাদি।

কিরীটী মৃদু হাসে।

আমার কিন্তু মনে হয় মিঃ রায়–অরূপ বলে।

কি?

ঐ হত্যাকাণ্ডের মধ্যে সুবীর চৌধুরী জড়িয়ে আছে।

কেন?

আমার মনে হয় ঐ বরযাত্রী যাওয়ার ব্যাপারটা একটা তার অ্যালিবি মাত্র।

হওয়া অসম্ভব নয়, কিন্তু হত্যা সে করবে কেন তার কাকাকে? কি উদ্দেশ্য থাকতে পারে?

কি আবার, গগনবিহারীর সমস্ত সম্পত্তির সেই-ই তো প্রকৃতপক্ষে লিগ্যাল উত্তরাধিকার!

তা তো নাও হতে পারে অরূপ।

কিন্তু—

কিরীটী বলে, এমনও তো হতে পারে গগনবিহারী উইলে তাকে কিছুই দিয়ে যাননি। না অরূপ, গগনবিহারীর হত্যার সঙ্গে আর যাই থাক অর্থের কোন সম্পর্ক আছে বলে আপাতত আমার মনে হচ্ছে না।

তবে কি–

অবিশ্যি আমি নিজেও এখনো কোন স্থিরসিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারনি। তবে আমার মনে হয়, গগনবিহারীর হত্যার মূলে আছে অন্য কিছু–অর্থ নয়।

আপনি কি বলতে চান মিঃ রায়!

ঐ হত্যাকাণ্ডের আশেপাশে যারা ছিল–তাদের মধ্যে ভেবে দেখছ কি, শমিতা আর রুক্মিণী যে দুটি মেয়ে গগনবিহারীর জীবনে এসেছিল–মনে করে দেখ তাদের দুজনেরই রূপ ও যৌবনের কথা। গগনবিহারী দুজনের প্রতিই আকৃষ্ট ছিল।

তাহলে?

সে–সব পরে বিচার করা যাবে। আপাতত তোমার হাতে যদি কোন জরুরী কাজ না থাকে তো চল, এক জায়গা থেকে ঘুরে আসি।

কোথায়?

যোগজীবনবাবুর ওখানে।

সেখানে কেন?

শমিতা দেবীর সঙ্গে একটু আলাপ করে আসি, চল না!

বেশ তো, চলুন।

অরূপ উঠে পড়ল।

শেয়ার বা বুকমার্ক করে রাখুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *