০৪. কুরআনে বৈপরীত্যের সত্যাসত্য

কুরআনে বৈপরীত্যের সত্যাসত্য

সকালবেলায় ভিক্টোরিয়া পার্ক এলাকায় একটি চক্কর না দিলে আমার চলে না। পুরো পার্কটি একবার ঘুরে আসা চাই। যদিও পার্ক এলাকাটিতে যুবকদের তুলনায় বয়স্কদের আনাগোনাই বেশি।

এখানে এসে এই বয়স্ক লোকগুলোর চেহারা দেখতে আমার খুবই ভালো লাগে। আমি এদের দেখি। এই যে লোকগুলো, এরা আজ থেকে বিশ বছর আগে কেমন ছিল? টগবগে তরুণ। তাদের গায়ে তখন যৌবনের উন্মত্ততা। বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা হয়তো এদের গর্জন আর হুংকারে প্রতিনিয়ত প্রকম্পিত হতো। শার্টের কলার খোলা রেখেই এরা ঢুকত আর বের হতো। এরা চাইলেই ক্লাস হতো নয়ত হতো না।

এরা মিছিল করত, মিটিং করত। এদের কেউ হয়তো-বা ছিল পাক্কা রাজনীতিবিদ। মোদ্দাকথা, এদের শিরদাঁড়া তখন তালগাছের মতো খাড়া ছিল। বুক ফুলিয়ে হাঁটত এরা ক্যাম্পাসজুড়ে।

কিন্তু নিয়তির কী নির্মম পরিহাস! ঠিক বিশ বছর পরে এসে এদের তালগাছের মতো খাড়া-শিরদাঁড়া নুয়েপড়া কলাগাছের মতো ঝুঁকে গেছে। যে তারুণ্য নিয়ে অহংকারে মাটিতে তাদের পা পড়ত না, আজ তা অতীত। যে শরীর নিয়ে তাদের অহংকারের অন্ত ছিল না, তা আজ নেতিয়ে পড়েছে। যাদের পায়ের শব্দে বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা গমগম করত, আজকে তারা দু-মিনিট হাঁটতেই হাঁপিয়ে উঠছে। এই দৃশ্যগুলো থেকে মানুষের অনেককিছু শেখার আছে। বোঝার আছে।

 বেলা বাড়তেই ভিক্টোরিয়া পার্ক এলাকাটি সরগরম হয়ে ওঠে। চারদিকে বাড়তে থাকে মানুষের কোলাহল। বাদাম-বিক্রেতা, আইসক্রিম-বিক্রেতারা তাদের মালপত্র নিয়ে হাজির হয়। পাশেই জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়। ছাত্রছাত্রীদের আগমনে পুরো এলাকাটি আরও মুখরিত হয়ে ওঠে।

সবচেয়ে বড় কথা, বাংলা সাহিত্যের প্রাণকেন্দ্র বলা হয় যে জায়গাটিকে, সেই বাংলাবাজার এলাকা তো ভিক্টোরিয়ার ঠিক পাশেই। কত কবি, সাহিত্যিক, লেখক, গল্পকার, রাজনীতিবিদ, কলা-কুশলী রোজ এই পথ মাড়িয়ে যায়, তার ইয়ত্তা নেই। তবু ভিক্টোরিয়া তার মতোই ঠায় দাঁড়িয়ে আছে।

আজ আমার সাথে সাজিদও আছে। তার হাতে একটি বই। ড্যান ব্রাউনের লেখা অ্যাঞ্জেলস এন্ড ডেমনস।

বিখ্যাত ডিটেক্টিভ ক্যারেক্টার রবার্ট ল্যাঙডন-এর স্রষ্টা ড্যান ব্রাউনের নাম শোনেনি—এরকম মানুষ খুঁজে পাওয়াই এখন দুষ্কর বলতে গেলে। পার্কের পশ্চিম। দিকটায় এসে সাজিদ বসে পড়ল। বই পড়বে। মঈনুল নামে আমার এক বন্ধু আছে। ভালো কবিতা লিখত একসময়ে। একবার একটি কবিতা লিখে সে বিশ্ববিদ্যালয়ে হইচই ফেলে দিয়েছিল। সেই কবিতার সবটা আমার মনে নেই, তবে দু-লাইন মনে করতে পারি অবশ্য। লাইন-দুটো ছিল এরকম—

একদিন লাশেরা চিৎকার করে উঠবে
চিহ্নিত হবে খুনীদের চেহারা …

এই কবিতা লিখে মঈনুল তখন রাতারাতি ক্যাম্পাসে কবি বনে যায়। এরপর থেকে দৈনিক পত্রিকাগুলো নিয়ম করে ওর কবিতা ছাপাতে শুরু করে। পত্রিকায় কবিতা ছাপা হওয়াতে আমাদের মঈনুল তখন ক্যাম্পাসের কবির বদলে দেশের কবি খেতাবে উন্নীত হয়ে যায়।

মঈনুলের একটি কবিতা পত্রিকায় ছাপা হতো, আর আমরা সবাই মিলে মিন্টু দার দোকানে গিয়ে ফুচকা খেয়ে ওর পকেট সাবাড় করতাম। বেচারা কবিতা লিখে টুকটাক যা কিছু কামাই করে, দেখা যেত তার সবটাই আমাদের পেটে ঢুকে পড়ত।

মঈনুলের সাথে খুব একটা যোগাযোগ হয় না আজকাল। দুনিয়ার ঘূর্ণাবর্তে আমরা নিজেদের নিয়েই ব্যস্ত হয়ে পড়ি। নিয়মের এই বেড়াজালে বন্দি হয়ে পড়লে সম্পর্কগুলোর মধ্যে সংযোগ স্থাপন করতে পারাটা অনেক কঠিন হয়ে ওঠে। বন্ধু প্রতীমের কাছে জানতে পারলাম, মঈনুল এখন নাকি কবিতাচর্চা ছেড়ে নাস্তিকতা চর্চায় বিভোর হয়েছে। শুনে কিছুটা মর্মাহত হলাম। নটরডেমে আমরা একসাথে পড়েছি। ভালো ধার্মিক ছিল সে। নিয়মিত নামাজ-কালাম পড়ত। ওর বাবা ছিলেন মৌলবী। ছোটবেলায় পরিবারে ধর্মীয় শিক্ষা যে পায়নি, তাও বলা যাচ্ছে না।

ভিক্টোরিয়া পার্কে সেদিন সকালবেলা চতুর্থ চক্করটা দিতে যাব ঠিক তখন দেখলাম, উত্তর-পূর্ব দিক থেকে হাঁপাতে হাঁপাতে মঈনুল আসছে। দেখতে অনেক নাদুস-নুদুস হয়েছে অবশ্য। ভুড়িও বেড়েছে অনেকটা। হালকা পাতলা ধরনের একটি বাদামী টি-শার্ট গায়ে থাকায় তার ভুড়িটা সামনের দিকে আরও হেলে এসেছে।

কাছাকাছি আসতেই মঈনুল আমাকে উদ্দেশ্য করে বলল, কীরেভ্যাবলা! কেমন আছিস?

মঈনুল কলেজ-লাইফ থেকেই আমাকে ভ্যাবলা বলে ডাকে। আমার চেহারা নাকি দেখতে ভ্যাবলা টাইপের, তাই। নিজেকে ভ্যাবলা ভাবতেই আমার গা ঘিনঘিন করত; কিন্তু মঈনুলকে কিছু বলতেও পারতাম না। কারণ, মঈনুল ছিল আমাদের ক্লাসে অঙ্কের বস। এমন কোনো অঙ্ক ছিল না, যা সে পারত না। দু-দুবার সে গণিত অলিম্পিয়াডে প্রথম হয়েছিল।

ভালো আছি, তুই কেমন আছিস?

ভালো। অনেকদিন পরে। থাকিস কোথায়?

কাছাকাছিই। তুই?

আমিও এদিকে থাকছি।

আমি জিজ্ঞেস করলাম, কবিতা লিখিস আজকাল?

মঈনুল কিছু না বলে হাঁপাচ্ছে। আমি আবার বললাম, শুনলাম, তুই নাকি বিগড়ে গিয়েছিস?

মঈনুল আমার দিকে চোখ বড় বড় করে তাকাল। আমি কী বলতে চাচ্ছি সেটা মনে হয় সে বুঝতে পেরেছে। চোখমুখ শক্ত করে বলল, সত্য জানতে চাওয়া মানে কি বিগড়ে যাওয়া?

আমি বুঝতে পারলাম মঈনুল খুব সিরিয়াস মুডে আছে। এই মুহূর্তে তাকে পাল্টা উত্তর দিয়ে কাবু করে ফেলার ইচ্ছে আমার নেই। হাঁটতে হাঁটতে আমরা তখন পার্কের পশ্চিম দিকটায় চলে এসেছি। সাজিদ তখনো বই পড়ছে। আমি এসে সাজিদের সাথে মঈনুলের পরিচয় করিয়ে দিলাম। সাজিদের একটি গুণ এই, সে অপরিচিত কারও সাথে মুহূর্তেই সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারে।

প্রাথমিক পরিচয়-পর্ব সেরে আমি আর মঈনুল সাজিদের পাশে বসে পড়লাম। দুজনেই হাঁপাচ্ছি। মঈনুল মুখ হাঁ করে নিঃশ্বাস ছাড়ছে। সাজিদ তার ব্যাগে থাকা পানির বোতলটি মঈনুলের দিকে বাড়িয়ে দেয়। মঈনুল হাত বাড়িয়ে বোতলটি নিয়েই ঢকঢক করে বোতলের অর্ধেক পানি পেটের ভেতরে চালান করে দেয়। এরপর সে বোতলটা আমার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল, নে, পানি খা।

পানি পান করে শার্টের হাতায় মুখ মুছে নিয়ে বললাম, তা তোর বিগড়ে যাওয়ার রহস্যটা কীরে, মোটকু?

মঈনুল দাঁতমুখ খিচে আমার দিকে তাকাল। তাকে তখন আলিফ লায়লার কান খাড়া করা পিশাচের মতো দেখাচ্ছিল। আমি বললাম, সরি! সরি! আমি আসলে জানতে চাচ্ছিলাম, তোর এই পরিবর্তনের কারণ কী?

আমার কথা বেশ গায়ে লাগল তার। ভারী মুখ নিয়েই বলল, পড়াশোনা কর, জানতে পারবি…

তুই পড়াশোনা করেই এরকম বিগড়ে গিয়েছিস? মাই গুডনেস।

আমাদের এই ঝগড়া বেশিদূর আগাতে দিল না সাজিদ। সে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, কী নিয়ে তর্ক করছিস তোরা?

মঈনুলের দিক থেকে কঠিন দৃষ্টি ফিরিয়ে আমি সাজিদের দিকে তাকালাম। বললাম, মঈনুল নাকি নাস্তিক হয়ে পড়েছে। আমাদের ধর্ম নিয়ে সে নাকি এত বেশি পড়াশোনা করে ফেলেছে যে, সে আস্ত একটা অশ্বডিম্ব হয়ে বসে আছে।

আমার কথায় বেশ রাগ ঝরছে দেখে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার চেষ্টা করল সাজিদ। বলল, একজন লোক তো চাইলে অনেক বেশি পড়াশোনা করতে পারে। সেটি ধর্ম নিয়ে হোক বা অন্যকিছু।

তাই বলে নাস্তিক হয়ে যেতে হবে? আমার প্রশ্ন।

সেটি তো তোর মর্জিমাফিক হবে না। কে আস্তিক থাকবে আর কে নাস্তিক থাকবে ব্যাপারটি তো আমি আর তুই ঠিক করব না, তাই না?

এমনিতেই প্রচণ্ড রেগে আছি। তার ওপর সাজিদের এমন দরদমার্কা কথা শুনে আমার তো একেবারে গা জ্বলে যাওয়ার মতো অবস্থা।

আমাকে দুচার-কথা শুনিয়ে এবার সে মঈনুলের দিকে ফিরে খুব শান্ত গলায় বলল, মঈনুল ভাই, আরিফের কথায় আপনি কিছু মনে করবেন না। সে আসলে অল্পতেই রেগে যায়। অস্থির স্বভাবের; কিন্তু বন্ধু হিশেবে সে যথেষ্টই ভালো মনের মানুষ।

সাজিদের কথা শুনে আমার রাগের মাত্রা যেন আরও বেড়ে গেল। গাছের গোড়া কেটে আগায় পানি ঢালা হচ্ছে! খেয়াল করলাম মঈনুলের মুখ থেকে রাগের আভাটুকু সরে গেছে। সাজিদের কথাগুলো সে হয়তো পছন্দ করেছে। তাই বলল, না, কী মনে করব? ও আর আমি তো কলেজ-লাইফ থেকেই এরকম খুনসুটি করতাম। এগুলো আমাদের জন্য স্বাভাবিক ব্যাপার।

সাজিদ হেসে বলল, বাহ। তাহলে তো আর কোনো ঝামেলাই নেই। তা, কোন ডিপার্টমেন্টে আছেন?

মঈনুল বলল, ম্যাথমেটিক্স।

খুব ভালো। আপনার কথা আরিফের কাছে আগে কখনোই শুনিনি। আজকে পরিচয় হয়ে খুব ভালো লাগল।

মঈনুল ইতস্তত করে বলল, আমরা তো একই বয়সের বলা চলে। আমাদের মধ্যে আপনি সম্বোধনটা না থাকলেই ভালো হবে বলে মনে হচ্ছে।

মঈনুলের কথায় সায় দিয়ে সাজিদ বলল, ঠিক আছে। ঠিক আছে বলার পরে সাজিদ পুনরায় প্রশ্ন করল, আচ্ছা, যদি কিছু মনে না করো আমি কি তোমাকে

একটা প্রশ্ন করতে পারি?

অবশ্যই অবশ্যই বলল মঈনুল।

আরিফ একটু আগে বলল, তুমি নাকি নাস্তিক হয়ে গেছ। আমি অবশ্য জানতে চাইব না যে, কেন তুমি নাস্তিক হয়ে গেছ। আমি শুধু এটুকু জানতে চাচ্ছি, কোন জিনিসটা তোমাকে নাস্তিক হতে অনুপ্রাণিত করেছে?

আমি কুরআন নিয়ে পড়াশোনা করেছি। পড়াশোনা করে বুঝতে পেরেছি যে, এটা কখনোই স্রষ্টার বাণী হতে পারে না। স্রষ্টাকে যদি আমরা আউট অব মিসটেক হিশেবে ধরে নিই, তাহলে স্রষ্টার বাণীর মধ্যে কোনোরকম অসামঞ্জস্য কিংবা বৈপরীত্য থাকতে পারে না; কিন্তু কুরআনে এরকম অসামঞ্জস্য, বৈপরীত্য রয়েছে।—বলল মঈনুল

আমি ধৈর্য ধরে চুপ করে আছি। সাজিদ হাসিমুখে বলল, বুঝতে পেরেছি তোমার কথা। আচ্ছা, তুমি কুরআন নিয়ে কোথায় বা কার কাছে পড়াশোনা করেছ?

চুপ করে আছে মঈনুল। কুরআন নিয়ে কোথায় বা কার কাছে পড়েছে সে তার কোনো উত্তর দিতে পারল না। তাকে চুপ করে থাকতে দেখে সাজিদ আবার বলল, আচ্ছা, বাদ দাও সেটা। তুমি বললে যে কুরআনে অসামঞ্জস্য খুঁজে পেয়েছ। দয়া করে আমাকে একটু বলবে কি, সেগুলো কীরকম? আমিও আসলে কুরআনকে বোঝার চেষ্টা করি। এজন্যেই জানতে চাইছি।

মঈনুল কিছুটা সময় নিল। এরপর বলতে লাগল, যেমন ধরো, কুরআনের এক জায়গায় বলা হচ্ছে আল্লাহর একদিন হলো একহাজার বছরের সমান। আবার অন্য জায়গায় বলা হচ্ছে আল্লাহর একদিন হলো পঞ্চাশ হাজার বছরের সমান। ব্যাপারটি কি পরস্পরবিরোধী নয়? এখান থেকে আমরা কোনটা বুঝব? আল্লাহর একদিন মানে দুনিয়ার একহাজার বছর নাকি পঞ্চাশ হাজার বছর?

এবার আমি কথা বলে উঠলাম, কুরআনের কোন জায়গায় এই কথাগুলো বলা আছে রেফারেন্স দেখা। তুই নিজের মতো করে কথা বললে তো আর হবে না।

সাজিদ বলল, আরিফ, মঈনুল কিন্তু ঠিকই বলেছে। কুরআনের এক জায়গায় বলা আছে আল্লাহ তাআলার একদিন, একহাজার বছরের সমান। আবার অন্য জায়গায় বলা হয়েছে তার একদিন হলো পঞ্চাশ হাজার বছরের সমান।

সাজিদের কথা শুনে আমি হতবাক হয়ে গেলাম। মঈনুলের এই নাস্তিক্যধর্মী কথাকে। সে ডিফেন্ড করল কি না বুঝতে পারলাম না। তাকে প্রশ্ন করলাম, কুরআনের কোথায় বলা হয়েছে এরকম কথা?

সাজিদ উত্তর দিল, সূরা হজ, সাজদা এবং মাআরিজে।

মঈনুল বেশ উৎফুল্ল গলায় বলল, রাইট রাইট। এই সূরাগুলোতেই আছে। আমি পড়েছিলাম; কিন্তু রেফারেন্সগুলো মনে নেই।

সাজিদ মঈনুলের দিকে তাকিয়ে বলল, কিন্তু মঈনুল ভাই, অত্যন্ত দুঃখের সাথে বলতে হচ্ছে, এই ব্যাপারগুলোতে আমি তোমার সাথে মোটেও একমত নই।

অবাক হলো মঈনুল। বলল, কেন?

আমার দৃষ্টিতে এই ব্যাপারগুলোতে আসলে কোনোরকম অসামঞ্জস্য বা বৈপরীত্য নেই।

কী অদ্ভুত! বলল মঈনুল। স্পষ্টভাবে দু-জায়গায় দু-রকম ইনফরমেশান দেওয়া আছে। তারপরেও তুমি বলছ এখানে কোনোরকম বৈপরীত্য নেই?

হ্যাঁ। আমি আমার বিশ্বাসের জায়গা থেকে শক্তভাবেই বলছি, এই জায়গাগুলোতে বিন্দুমাত্র বৈপরীত্য নেই।- সাজিদ বলল।

সকালের রোদ চড়ে বসতে শুরু করেছে। বেড়ে চলেছে কর্মমুখী মানুষের আনাগোনা। গাড়ির হর্ন আর মানুষের আওয়াজে এলাকাটি কোলাহলপূর্ণ হয়ে উঠেছে। আমরা পাশের একটি রেস্টুরেন্টে এসে বসলাম। চা-পরোটা অর্ডার করে সাজিদ আর মঈনুল আবারও তর্কে জড়িয়ে পড়ল। মঈনুল বলল, তারমানে তুমি বলতে চাচ্ছ, এই আয়াতগুলো বৈপরীত্য নির্দেশ করে না, তাই তো?

হ্যাঁ

তোমার দাবির পক্ষে প্রমাণ কী?

নড়েচড়ে বসে সাজিদ বলল, তোমার আপত্তির ব্যাপারটা আছে সূরা হজের ৪৭ নম্বর আয়াতে, সূরা সাজদার ৫ নম্বর আয়াতে এবং সূরা মাআরিজের ৪ নম্বর আয়াতে। প্রথম দুই আয়াত, অর্থাৎ সূরা হজ এবং সূরা সাজদার আয়াতে বলা হচ্ছে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার একদিন হলো একহাজার বছরের সমান। আবার, সূরা মাআরিজের আয়াতে বলা হয়েছে আল্লাহর একদিন হলো পঞ্চাশ হাজার বছরের সমান। এখন, এই আয়াতগুলোতে সত্যি কোনো বৈপরীত্য আছে কি না—তা জানতে হলে একটি বিশদ ব্যাখ্যার প্রয়োজন আছে। তোমার হাতে কি সময় আছে শোনার জন্য?

সম্মতি জানিয়ে মঈনুল বলল, অবশ্যই আছে।

সাজিদ বলল, ঠিক আছে। ব্যাপারটি আমি দুইভাগে বোঝানোর চেষ্টা করব। প্রথমে আমি আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদীস থেকে দলীল টেনে ব্যাখ্যা করব। এরপরে আয়াতগুলো দিয়েই আয়াতগুলোকে পর্যালোচনা করব। ব্যাখ্যায় যাওয়ার আগে আমরা কুরআনের সেই আয়াতগুলো দেখে নিই যেগুলো নিয়ে আজকের আলাপ।

এতটুকু বলে সাজিদ তার ফোন থেকে কুরআনের এ্যাপস ওপেন করে সেখান থেকে সূরা হজের ৪৭ নম্বর আয়াতটি তিলাওয়াত এবং অর্থ পড়ে শোনাল আমাদের।

তারা আপনাকে তাড়াতাড়ি শাস্তি নিয়ে আসতে বলে (কিন্তু শাস্তি তো আসবে আল্লাহর ওয়াদা অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময়ে); কেননা, আল্লাহ কক্ষনো তাঁর ওয়াদার খেলাফ করেন না। তোমার প্রতিপালকের একদিন হলো তোমাদের গণনায় এক হাজার বছরের সমান।

এরপর সে তিলাওয়াত করল সূরা সাজদার ০৫ নম্বর আয়াত তিনি আকাশ হতে পৃথিবী পর্যন্ত সকল কার্য পরিচালনা করেন, অতঃপর সকল বিষয়াদি তাঁরই কাছে একদিন উখিত হবে, যার পরিমাণ তোমাদের গণনা অনুযায়ী এক হাজার বছর।

এরপর সূরা মাআরিজের ০৪ নম্বর আয়াত–

ফেরেশতা এবং রূহ (অর্থাৎ জিবরীল) আল্লাহর দিকে আরোহণ করে এমন একদিনে, যার পরিমাণ পঞ্চাশ হাজার বছর।

আমরা দেখতে পাচ্ছি, প্রথম আয়াত এবং দ্বিতীয় আয়াতে সময়কাল দেখানো হচ্ছে এক হাজার বছর করে; কিন্তু তৃতীয় আয়াতে সময়কাল দেখানো হচ্ছে পঞ্চাশ হাজার বছর। তাহলে কোনটি সঠিক? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার ১ দিন সমান ১০০০ বছর? নাকি ৫০,০০০ বছর? মূলত, আল্লাহর ১ দিন সমান ১০০০ বছর। এর পক্ষে হাদীস থেকে প্রমাণ পাওয়া যায়। রাসূল সাল্লাললাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, নিঃস্ব মুসলিমরা ধনীদের তুলনায় অর্ধেক দিন অর্থাৎ ৫০০ বছর পূর্বে জান্নাতে যাবে।[১]

এখানে অর্ধেক দিন হলো আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার একদিনের অর্ধেক সময়। আর এই সময়টা কত? তা হলো ৫০০ বছর। অর্ধেক দিন যদি ৫০০ বছরের সমান হয়, তাহলে পুরো দিন সমান কত বছর হবে? সোজা অঙ্ক। পুরোদিন সমান এক হাজার বছর। অর্থাৎ আল্লাহর একদিন সমান বান্দাদের অর্থাৎ পৃথিবীর ১০০০ বছরের সমান। মঈনুল বলল, পঞ্চাশ হাজার বছরের সময়টা কোত্থেকে এলো তাহলে? ভালো প্রশ্ন। পঞ্চাশ হাজার বছরের সময়টা তাহলে কীভাবে এলো, তাই না? এই সময়টা আসলে আল্লাহ এবং বান্দার মাঝের সময় নয়। এই সময়টা মূলত কিয়ামত দিবসের একটা সময়। এই আয়াতে পঞ্চাশ হাজার বছর বলে যে সময়টা উল্লেখ করা হয়েছে সেটি কিয়ামত দিবস-বিষয়ক। যাকাত প্রদান করে না এমন ব্যক্তির শাস্তির কথা উল্লেখ করতে গিয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, তার (যে যাকাত দেয় না) শাস্তি চলতে থাকবে এমন একদিন পর্যন্ত—যার পরিমাণ হবে পঞ্চাশ হাজার বছর। তারপর তার ভাগ্য নির্ধারিত হবে হয় জান্নাতের দিকে, না হয় জাহান্নামের দিকে।[২]

এখান থেকে এটা সুস্পষ্ট যে, উল্লিখিত দিন হলো কিয়ামতের দিন এবং উল্লিখিত সময় হলো ৫০,০০০ বছর, যা সূরা মাআরিজে উল্লিখিত আছে। তা ছাড়া, সূরা মুত্তাফফিফীন এর ৬ নম্বর আয়াত, যেখানে বলা হচ্ছে, যেদিন সৃষ্টিকুলের মানুষ দাঁড়াবে তাদের রবের সামনে, এটার ব্যাখ্যায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, তা হবে এমন একদিনে, যার পরিমাণ হবে পঞ্চাশ হাজার বছর। তারা তাদের কান পর্যন্ত ঘামে ডুবে থাকবে।[৩]

এখান থেকে দুইটি বিষয় পরিষ্কার।

এক. যেদিন সৃষ্টিকুলের মানুষ দাঁড়াবে তাদের রবের সামনে। সেটি কোন দিন? কিয়ামতের দিন।

দুই. তা হবে এমন একদিন, যার পরিমাণ হবে ৫০,০০০ বছর। সুতরাং এখান থেকে বোঝা যায় যে, কিয়ামত দিবসের সময়কাল সাধারণ সময়কালের চেয়ে দীর্ঘ। হাদীস এবং কুরআন থেকে এটি স্পষ্ট যে, সূরা মাআরিজে উল্লিখিত সময়কাল পৃথিবী এবং আল্লাহর মধ্যবর্তী সময়কাল নয়; বরং এটি কিয়ামত দিবসের সময়কাল। জেনারেল সেন্স থেকেও যদি আমরা বিচার করি, দুঃখ-কষ্টের সময়গুলো আসলেই কেমন যেন দীর্ঘ মনে হয় আমাদের কাছে। সময়গুলো যেন ফুরোতেই চায় না। কিয়ামত দিবসের চেয়ে ভয়াবহ সময় আর কী হতে পারে? তাই এই সময়কালটা দীর্ঘ হওয়াই কিন্তু স্বাভাবিক।

সাজিদ এক নিঃশ্বাসে বলে গেল কথাগুলো। এরপর সে থামল। আমাদের গরম-গরম চা-পরোটা চলে এসেছে। চায়ের মধ্যে পরোটা ডুবিয়ে মুখে দিতে দিতে সাজিদ আবারও বলতে শুরু করল, এরপর দ্বিতীয় ভাগে আসা যাক। আমরা আয়াতগুলো আবার খেয়াল করি।

সূরা হজের ৪৭ নম্বর আয়াত–

তারা আপনাকে তাড়াতাড়ি শাস্তি নিয়ে আসতে বলে (কিন্তু শাস্তি তো আসবে আল্লাহর ওয়াদা অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময়ে); কেননা, আল্লাহ কক্ষনো তাঁর ওয়াদার খেলাফ করেন না। তোমার প্রতিপালকের একদিন হলো তোমাদের গণনায় এক হাজার বছরের সমান।

সূরা সাজদার ৫ নম্বর আয়াত–

তিনি আকাশ হতে পৃথিবী পর্যন্ত কার্য পরিচালনা করেন, অতঃপর সকল বিষয়াদি তাঁরই কাছে একদিন উখিত হবে, যার পরিমাপ তোমাদের গণনা অনুযায়ী এক হাজার বছর।

সূরা মাআরিজের ৪ নম্বর আয়াত–

ফেরেশতা এবং রূহ (অর্থাৎ জিবরীল) আল্লাহর দিকে আরোহণ করে এমন একদিনে, যার পরিমাণ পঞ্চাশ হাজার বছর।

প্রথম আয়াত দুটো খেয়াল করো, মঈনুল ভাই। প্রথম আয়াতে একটি স্পেসেফিক কথা আছে। সেটি হলো, তোমার প্রতিপালকের একদিন হলো তোমাদের গণনায় এক হাজার বছরের সমান।

দ্বিতীয় আয়াতে বলা হচ্ছে, অতঃপর সকল বিষয়াদি তাঁরই কাছে একদিন উখিত হবে, যার পরিমাণ তোমাদের গণনা অনুযায়ী এক হাজার বছর।

দুটি আয়াতেই একটি কমন জিনিস বলে দেওয়া হচ্ছে। সেটি হলো—তোমার রবের একদিন তোমাদের গণনায় এক হাজার বছরের সমান। কিন্তু তৃতীয় আয়াতে শুধু বলা হচ্ছে, ফেরেশতা এবং রূহ আল্লাহর দিকে আরোহণ করে এমন একদিনে, যার পরিমাণ পঞ্চাশ হাজার বছর।

খেয়াল করো, আগের দুই আয়াতের মতো এই আয়াতে কিন্তু বলা হচ্ছে না যে, তোমাদের রবের একদিন তোমাদের গণনা অনুযায়ী এত বছর। কেন এমনটা বলা হলো না? কারণ, এই হিশাবটা আগের আয়াতগুলোর মতো একই ঘটনার নয়, এ জন্য। আগের আয়াত দুটো ছিল আল্লাহ এবং পৃথিবীর মানুষের মধ্যকার সময়; কিন্তু পরের আয়াতে একটি আলাদা, নির্দিষ্ট দিক ইঙ্গিত করে। সেটি হলো, কিয়ামত দিবস।

সুতরাং আগের দুই আয়াতের এক হাজার বছরের সাথে পরের আয়াতের পঞ্চাশ হাজার বছর গুলিয়ে ফেলার কোনো কারণ নেই। আশা করি তুমি বুঝতে পেরেছ।

মঈনুল কিছু না বলে চুপ করে আছে। চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে সাজিদ বলতে লাগল, আরেকটি ব্যাপার খেয়াল করো। প্রথম দুই আয়াতে আল্লাহ যেখানে একহাজার বছরের কথা বলেছেন, সেখানে কিন্তু রুহ বা জিবরাঈল, কারও কথাই উল্লেখ নেই। শুধু মানুষ এবং আল্লাহর মধ্যবর্তী সময়সীমা নিয়ে বলা আছে; কিন্তু তিন নম্বর আয়াতে যেখানে পঞ্চাশ হাজার বছরের কথা এসেছে, সেখানে ফেরেস্তা এবং রূহের কথাও কিন্তু বলা হচ্ছে। আয়াতটির দিকে আরেকবার খেয়াল করো, ফেরেশতা এবং রূহ আল্লাহর দিকে আরোহণ করে এমন এক দিনে—যার পরিমাণ ৫০,০০০ বছর।

এখান থেকে কী বোঝা গেল? এখান থেকে এটাই বোঝা গেল যে, দুই জায়গায় বক্তব্যের সাবজেক্ট কিন্তু আলাদা আলাদা। একটি জায়গায় মানুষকে ইঙ্গিত করা হয়েছে, অন্য জায়গায় ফেরেশতাদের। যেখানে বক্তব্যের সাবজেক্ট-ই আলাদা হয়ে গেছে, সেখানে উল্লিখিত সময়কাল যে একই থাকবে, তা কী করে ধরে নিলে?

সাজিদের এই কথাটা বুঝতে না পেরে মঈনুল বলল, বুঝিনি। ঠিক আছে। আমি একটি উদাহরণ দিয়ে পরিষ্কার করছি ব্যাপারটা।- বলল সাজিদ। ধরো, তোমার বাসা থেকে স্কুলের দূরত্ব হলো আধা কিলোমিটার। এই দূরত্বটুকু। হেঁটে যেতে তোমার সময় লাগে ১০ মিনিট। এখন তুমি বললে, বাসা থেকে স্কুলে যেতে আমার সময় লাগে ১০ মিনিট।

মঈনুল মাথা নাড়ল।

আরও ধরো, তোমাদের বাসা থেকে স্কুলে হেঁটে যেতে তোমার ছোটবোনের লাগে ২০ মিনিট। এখন সে যদি বলে, বাসা থেকে স্কুলে যেতে আমার সময় লাগে ২০ মিনিট, তাহলে তোমার কথা এবং তোমার বোনের কথার মধ্যে কি কোনো বৈপরীত্য আছে?

না, মঈনুল বলল।

তোমার কথা এবং তোমার বোনের কথার মধ্যে যদি কোনো বৈপরীত্য না থাকে, তাহলে ওপরের আয়াতগুলোতেও কোনো বৈপরীত্য নেই। কারণ, তুমি আর তোমার বোন আলাদা আলাদা সাবজেক্ট। তোমার জন্য যেটা দশ মিনিটের, তোমার বোনের জন্য সেটি ২০ মিনিটের। তোমাদের উভয়ের বক্তব্যে না তুমি ভুল বলেছ, না তোমার বোন ভুল বলেছে। তোমরা দুজনেই দুজনের জায়গা থেকে ঠিক। কোনো বৈপরীত্য নেই এখানে। ঠিক একইভাবে, একটি আয়াতে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা যখন তাঁর আর বান্দার মধ্যবর্তী সময়ের কথা বলছেন, তখন সে পিরিওড একরকম, আবার তিনি যখন কিয়ামত দিবসের কথা বলছেন, তখন সে পিরিওড অন্যরকম। দুই ক্ষেত্রে দুই রকম টাইম স্কেল হলেই যে সেটি বৈপরীত্য হয়ে যায়, তা কিন্তু নয়। কুরআনকে যারা সঠিকভাবে বুঝতে পারে না তাদের কাছেই কেবল এই আয়াতগুলো অসামঞ্জস্য বলে মনে হবে।

মঈনুল কিছু না বলে চুপ করে আছে। সাজিদের ওপর এতক্ষণ অভিমান করে থাকলেও এখন আর সেটি নেই। আমার খুব করে মঈনুলকে আরেকবার জিজ্ঞেস করতে মন চাইছে—সে কোন কোন পণ্ডিতের কাছে কুরআন পড়েছে। কিন্তু না; এই মুহূর্তে তাকে আর অপমান করা ঠিক হবে না।

———–
১ জামি তিরমিযী, হাদীস : ২৩৫৩, ২৩৫৪

২ সহীহ মুসলিম, ৯৮৭, মুসনাদে আহমদ, ০২ / ৩৮৩

৩ মুসনাদে আহমদ, ০২/১১২

শেয়ার বা বুকমার্ক করে রাখুন

One thought on “০৪. কুরআনে বৈপরীত্যের সত্যাসত্য

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *