কোরআন, আকাশ, ছাদ এবং একজন ব্যক্তির মিথ্যাচার

কোরআন, আকাশ, ছাদ এবং একজন ব্যক্তির মিথ্যাচার

মফিজুর রহমান স্যার সাজিদের দিকে এক অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন। তাকানোর ভঙ্গি এ রকম, -‘বাছা ! আজকে তোমায় পেয়েছি। আজ তোমার বারোটা যদি না বাজিয়েছি, আমার নাম মফিজ না।’

সাজিদ মাথা নিচু করে ক্লাসের বাইরে দাড়িয়ে আছে। ২০ মিনিট দেরি করে ফেলেছে ক্লাসে আসতে। বিশ্ববিদ্যালয় ২০ মিনিট দেরি করে ক্লাসে আসা এমন কোনো গুরুতর পাপ কাজ নয় যে, এর জন্য তার দিকে এভাবে তাকাতে হবে।

সাজিদ সবিনয়ে বলল, -‘স্যার আসবো?’

মফিজুর রহমান স্যার অত্যন্ত গম্ভীর গলায় বললেন, -‘হু’

এভাবে বললেন যেন সাজিদকে দু চার কথা শুনিয়ে দরজা থেকে খেদিয়ে পাঠিয়ে দিতে পারলেই ওনার গা জুড়োয়।

সাজিদ ক্লাস রুমে এসে বসল। লেকচারের বেশ অর্ধেকটা শেষ হয়ে গেছে। মফিজুর রহমান স্যার আর পাঁচ মিনিটের লেকচার দিয়ে ক্লাস সমাপ্ত করলেন।

সাজিদ কপালে যে আজ খুবই খারাপি আছে, সেটা সে প্রথম থেকেই বুঝতে পেরেছে।

মফিজুর রহমান সাজিদকে দাড় করালেন।

খুব স্বাভাবিক চেহারায় হাসি হাসি মুখ করে বললেন, -‘সাজিদ, কেমন আছো?’

সাজিদ প্রায় ভুত দেখার মত চমকে উঠলো। এই মুহূর্তে সে যদি সত্যি সত্যি ডুমুরের ফুল অথবা ঘোড়ার ডিম জাতীয় কিছু দেখতো, হয়তো এতটা চমকাতো না। মিরাকল জিনিসটায় তার বিশ্বাস আছে। তবে মফিজুর রহমান স্যারের এই আচরণ তার কাছে তার চেয়েও বেশি কিছু মনে হচ্ছে।

এই ভদ্রলোক এত সুন্দর করে এরকম হাসি মুখ নিয়ে কারো সাথে কথা বলতে পারে, এটাই এতদিন একটা রহস্য ছিল।

সাজিদ নিজেকে খানিকটা সামলে নিয়ে বললো, -‘জ্বি স্যার, ভালো আছি আলহামদুলিল্লাহ। আপনি কেমন আছেন?’

তিনি আবার একটি মুচকি হাসি দিলেন। সাজিদ পুনঃরায় অবাক হলো। মনে হচ্ছে সে কোন দিবাস্বপ্নে বিভোর আছে।

স্বপ্নের একটা ক্রাইটেরিয়া হচ্ছে, স্বপ্নে বেশিরভাগ সময় নেগেটিভ জিনিসকে পজিটিভ আর পজেটিভ জিনিসকে নেগেটিভ ভাবে দেখা যায়। মফিজুর রহমান স্যারকে নিয়ে তার মাত্রাতিরিক্ত নেগেটিভ চিন্তা থেকে হয়তো এরকম হচ্ছে। একটু পরে সে হয়তো দেখবে, এই ভদ্রলোক তার দিকে রাগী রাগী চেহারায় তাকিয়ে আছে এবং বলছে এই ছেলে এত দেরি করে ক্লাসে কেন এসেছ? তুমি জানো আমি তোমার নামে ডীন স্যারের কাছে কমপ্লেন করে দিতে পারি? আর কোনদিন যদি দেরি করেছো……..’

সাজিদের চিন্তায় ছেদ পড়ল। তার সামনে দাঁড়ানো হালকা-পাতলা গড়নের মফিজুর রহমান নামের ভদ্রলোকটি বললেন, -‘আমিও খুব ভালো আছি।’

ভদ্রলোকের মুখের হাসির রেখাটা তখনও স্পষ্ট।

মফিজুর রহমান সাজিদকে বললেন, ‘আচ্ছা বাবা আইনস্টাইন, তুমি কি বিশ্বাস কর আকাশ বলে কিছু আছে?’

সাজিদ এবার নিশ্চিত হলো যে এটা কোন স্বপ্নদৃশ্য নয়। মফিজুর রহমান স্যার তাচ্ছিল্যভরে সাজিদকে ‘আইনস্টাইন’ বলে ডাকে। সাজিদকে যখন ‘আইনস্টাইন’ বলে, তখন ক্লাসের অনেকে খলখল করে হেসে উঠে। এই মুহূর্তে সাজিদ একটি চাপা হাসির শব্দ শুনতে পাচ্ছে। তাহলে এটা কোন স্বপ্ন দৃশ্য নয়। বাস্তব।

সাজিদ বলল, -‘জ্বি স্যার। বিশ্বাস করি।’

ভদ্রলোক আরেকটি মুচকি হাসি দিলেন। উনি আজকে হাসতে হাসতে দিন পার করে দেবার পণ করেছেন কিনা, কে জানে।

তিনি বললেন, -‘বাবা আইন্সটাইন- আদতে আকাশ বলে কিছু নেই। আমরা যেটাকে আকাশ বলি, সেটা হচ্ছে আমাদের দৃষ্টির প্রান্তসীমা। মাথার উপরে নীল রঙের যে জিনিসটি দেখতে পাও সেটাকে মূলত বায়ুমণ্ডলের কারণেই নীল দেখায়। চাঁদের বায়ুমণ্ডল নেই বলে চাঁদে আকাশকে কালো দেখায়। বুঝতে পেরেছেন মহামতি আইনস্টাইন?’

স্যারের কথা শুনে ক্লাসে কিছু অংশ আবার হাসাহাসি শুরু করল।

স্যার আবার বললেন, -‘তাহলে বুঝলে তো, আকাশ বলে যে কিছুই নাই?’

সাজিদ কিছু বললো না। চুপ করে আছে।

স্যার বললেন, -‘গত রাতে হয়েছে কি জানো? নেট সার্চ দিয়ে একটি ব্লগ সাইটের ঠিকানা পেলাম। মুক্তমনা ব্লক নামে। অভিজিৎ নামে এক ব্লগার লেখা পেলাম সেখানে। খুব ভালো লিখে দেখলাম। যাহোক অভিজিৎ নামের এই লোকটা কোরআনের কিছু বাণী উদ্ধৃত করে দেখালো কত উদ্ভট এইসব জিনিস। সেখানে আকাশ নিয়ে কি বলা আছে শুনতে চাও?’

সাজিদ এবারো কিছু বলো না। চুপ করে আছে।

স্যার বললেন, -‘কুরআনে বলা আছে-

“আর আমরা আকাশকে সৃষ্টি করেছি সুরক্ষিত ছাদ। অথচ, তারা আমাদের নির্দেশনাবলী থেকে মুখ ফিরিয়ে রাখে।’

“And we made the sky a protected ceiling, but they, from its signs are turning away – Al Ambia 32”

দেখলে তো বাবা আইনস্টাইন, তোমাদের আল্লাহ বলেছে, আকাশ নাকি সুরক্ষিত ছাদ। তা বাবা, এই ছাদে যাবার কোন সিঁড়ির সন্ধান কোরআনে আছে কি? হা হা হা হা।’

চুপ করে থাকতে পারলে বেশ হতো। কিন্তু এই লোকটির মাত্রাতিরিক্ত বাড়াবাড়িতে সাজিদকে মুখ খুলতে বাধ্য হল।

সে বলল, -‘স্যার আপনার সে ব্লগার অভিজিৎ আর আপনার প্রথম ভুল হচ্ছে, আকাশ নিয়ে আপনাদের দুজনের ধারণা মোটেও ক্লিয়ার না।’

-‘ও, তাই নাকি? তা আকাশ নিয়ে কিলিয়ার ধারাটি কি বল শুনি?’ -অবজ্ঞাভরে লোকটির প্রশ্ন।

সাজিদ বলল, -‘স্যার, আকাশ নিয়ে ইংরেজি অক্সফোর্ড ডিকশনারিতে বলা আছে, –

The region of the atposphere and outer space seen from the earth, অর্থাৎ, পৃথিবীপৃষ্ঠ থেকে বায়ুমণ্ডলের এবং তার বাইরে যা কিছু দেখা যায় সেটাই আকাশ। আকাশ নিয়ে আরও ক্লিয়ারলি বলা আছে উইকিপিডিয়াতে। আপনি নেট ঘেটে মুক্তমনা যেতে পেরেছেন, আরেকটু এগিয়ে উইকিপিডিয়া অবধি গেলেই পারতেন। আকাশ নিয়ে উইকিপিডিয়াতে বলা আছে, – The sky (or  celestial dome) is everything that lies above the surface of the earth, including the atmosphere and outer space, অর্থাৎ, পৃথিবীর ভূপৃষ্ঠের উপরে যা কিছু আছে, তা সবই আকাশের অন্তর্গত। এর মধ্যে বায়ুমণ্ডল এবং তার বাইরে সবকিছু আকাশের মধ্যে পড়ে।’

-‘হু, তো?’

-‘এটা হচ্ছে আকাশের সাধারণ ধারণা। এখন আপনার সেই আয়াতে ফিরে আসি। আপনি কোরআন থেকে উল্লেখ করেছেন-

“আর আমরা আকাশকে করেছি সুরক্ষিত ছাদ। অথচ, তারা আমাদের নির্দেশনাবলী থেকে মুখ ফিরিয়ে রাখে। ”

আপনি বলেছেন মহাকাশকে কিভাবে ছাদ হয়, তাই না?

স্যার, বিংশ শতাব্দীতে বসে বিজ্ঞান জানা কিছু লোক যদি এরকম প্রশ্ন করে, তাহলে আমাদের উচিত বিজ্ঞান চর্চা বাদ দিয়ে গুহার জীবন যাপনে ফিরে যাওয়া।

-‘What do you mean?’

-‘বলছি স্যার। বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে বিজ্ঞানীরা পৃথিবীর উপরিভাগে যে বায়ুমণ্ডল আছে, তাতে কিছু স্তরের সন্ধান পেয়েছেন। আমাদের পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের এসব পুরু স্তর দ্বারা গঠিত। এই স্তরগুলো হচ্ছে-

১। ট্রপোস্ফিয়ার

২। স্ট্রাটোস্ফিয়ার

৩। মেসোস্ফিয়ার

৪। থার্মস্ফিয়ার

৫। এক্সোস্ফিয়ার

এই প্রত্যেকটি স্তরের আলাদা আলাদা কাজ রয়েছে। আপনি কি জানেন, বিজ্ঞানী Sir venn Allen প্রমাণ করিয়ে দিয়েছিলেন, আমাদের পৃথিবীর ভূপৃষ্ঠের চারিদিকে একটি শক্তিশালী ম্যাগনেটিক ফিল্ড আছে। এই ম্যাগনেটিক ফিল্ড আমাদের পৃথিবীর চারদিকে একটি বেল্ট এর মত বলয় সৃষ্টি করে রেখেছে। বিজ্ঞানী Sir venn Allen এর নামে এই জিনিসটা নাম রাখা হয় Venn Allen Belt……..

এই বেল্ট চারপাশে ঘিরে রেখেছে আমাদের বায়ুমন্ডলকে। আমাদের বায়ুমণ্ডলের স্তরটির নাম হচ্ছে স্ট্রাটোস্ফিয়ার। এই স্তরের মধ্যে আছে এক জাদুকরি উপস্তর। এর নাম হলো ওজোন স্তর।

এই ওজোন স্তরের কাজের কথায় পরে আসছি। আগে একটু সূর্যের কথা বলি। সূর্যে প্রতি সেকেন্ডে যে বিস্ফোরণগুলো হয়, তা আমাদের চিন্তা কল্পনারও বাইরে। এই বিস্ফোরণগুলোর ক্ষুদ্র একটি বিস্ফোরণ তেজস্ক্রিয়তা এমন যে, তা জাপানের হিরোশিমায় যে অ্যাটমিক বোমা ফেলা হয়েছিল, সেরকম দশ হাজার বিলিয়ন অ্যাটমিক বোমার সমান। চিন্তা করুন স্যার, সেই বিস্ফোরণগুলোর একটু আঁচ যদি পৃথিবীতে লাগে, পৃথিবীর কি অবস্থা হতে পারে?

এখানেই শেষ নয়। মহাকাশে প্রতি সেকেন্ডে নিক্ষিপ্ত হয় মারাত্মক তেজস্ক্রিয় উল্কাপিণ্ড। এগুলোর একটি আঘাতে লন্ডভন্ড হয়ে যাবে পৃথিবী।

আপনি জানেন, আমাদের এই পৃথিবীকে এরকম বিপদের হাত থেকে কোন জিনিসটা রক্ষা করে? সেটা হচ্ছে আমাদের পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল। আরো স্পেসিফিকলি বলতে গেলে, বলতে হয়, ‘ওজোনস্তর’।

শুধু তাই নয়, সূর্য থেকে যে ক্ষতিকর অতিবেগুনি রশ্মি আর গামা রশ্মি পৃথিবীর দিকে ধেয়ে আসে, সেগুলো যদি পৃথিবীতে প্রবেশ করতে পারতো, তাহলে পৃথিবীতে কোন প্রাণী বেঁচে থাকতে পারত না। এই অতি বেগুনি রশ্মির ফলে মানুষের শরীরে দেখা দিত চর্ম, ক্যান্সার, উদ্ভিদের সালোকসংশ্লেষণ হতো না। আপনি জানেন, সূর্য থেকে পৃথিবীর দিকে ধেয়ে আসা এসব ক্ষতিকর জিনিসকে কোন জিনিসটা আটকে দেয়? পৃথিবীতে ঢুকতে দেয় না? সেটা হল বায়ুমণ্ডলের ওজোন স্তর। এসব ক্ষতিকর উপাদানকে স্ক্যানিং করে পৃথিবীতে প্রবেশে বাধা দেয়।

মজার ব্যাপার কি জানেন? ওজোনস্তর সূর্য থেকে আসা কেবল সেসব উপাদান কেই পৃথিবীতে প্রবেশ করতে দেয়, যেগুলো পৃথিবীতে প্রাণের জন্য সহায়ক। যেমন বেতার তরঙ্গ আর সূর্যের উপকারী রশ্মি। এখানেই শেষ নয়। পৃথিবীর অভ্যন্তরে বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় যে তাপমাত্রার সৃষ্টি হয়, তার সবটাই যদি মহাকাশে বিলীন হয়ে যেত, তাহলে রাতের বেলা পুরো পৃথিবী ঠান্ডা বরফে পরিণত হয়ে যেত। মানুষ আর উদ্ভিদ বাঁচতে পারত না। কিন্তু ওজন স্তর সব কার্বন-ডাই-অক্সাইডকে মহাকাশে ফিরে যেতে দেয় না। কিছু কার্বন-ডাই-অক্সাইডকে ধরে রাখে, যাতে পৃথিবি তাপ হারিয়ে একেবারে ঠান্ডা বরফ শীতল না হয়ে পড়ে। বিজ্ঞানীরা এটাকে ‘গ্রীন হাউস’ বলে।

স্যার, বায়ুমণ্ডলের ওজোন স্তরের এই ফর্মুলা, কাজ, এটা কি আমাদের পৃথিবীতে সূর্যের বিস্ফোরিত গ্যাস, সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি, উল্কাপিণ্ড থেকে ‘ছাদ’ এর মতো রক্ষা করছে না? আপনার বাসায় বৃষ্টি পানি প্রবেশ করতে পারে না আপনার বাসার ছাদের জন্য। বিভিন্ন দুর্যোগে আপনার বাসার ছাদ যেমন আপনাকে রক্ষা করছে, ঠিক সেভাবে বায়ুমণ্ডলের ওজোনস্তর কি আমাদের পৃথিবীকে রক্ষা করছে না?

আমরা আকাশের সংজ্ঞা থেকে জানলাম যে, পৃথিবীপৃষ্ঠ হতে উপরের সবকিছুই আকাশের মধ্য পড়ে। বায়ুমন্ডলও তো আকাশের মধ্যে পড়ে, এবং আকাশের সংজ্ঞায় বায়ুমন্ডলের কথা আলাদা করেই বলা আছে।

তাহলে বায়ুমণ্ডলের এই যে আশ্চর্যরকম ‘প্রটেক্টিং পাওয়ার’, এটার উল্লেখ করে যদি আল্লাহ বলেন- ‘আর আমরা আকাশকে করেছি সুরক্ষিত ছাদ। অথচ তারা আমাদের নির্দেশনাবলী দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে রাখে।’

তাহলে স্যার ভুলটা কোথায় বলছে? বিজ্ঞানতো নিজেই বলেছে, বায়ুমণ্ডল, স্পেশালি বায়ুমণ্ডলের ওজোনস্তর একটি ছাদের ন্যায় পৃথিবীকে রক্ষা করছে। তাহলে আল্লাহও যদি একই কথা বলে, তাহলে সেটা অবৈজ্ঞানিক হবে কেন?

আমি চ্যালেঞ্জ করে বলতে পারি, হয় আপনার সে অভিজিৎ রায় বিজ্ঞান বোঝেন না, নয়তো তিনি বিশেষ কোন গোষ্ঠীর পেইড এজেন্ট, যাদের কাজ সুস্পষ্ট প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও মনগড়া কথা লিখে কোরআনের ভুল ধরা।’

কথাগুলো বলে সাজিদ থামল। পুরো ক্লাসে এতক্ষণ একটা লেকচার দিয়ে গেল বলে মনে হচ্ছে। তাকে আইনস্টাইন বলায় যারা খলখল করে হাসতো, তাদের চেহারাগুলো ফ্যাকাসে হয়ে গেছে। মফিজুর রহমান স্যার কিছুই বললেন না। See you Next বলে ক্লাস থেকে বেরিয়ে গেলেন সেদিন।

শেয়ার বা বুকমার্ক করে রাখুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *