০৫. ঘুম জড়ানো আধবোজা চোখ

ঘুম জড়ানো আধবোজা চোখ ডলতে ডলতে দরোজা খুলে দিলো লেবু।

ঝাড়া আধঘণ্টা ধরে চিল্লাচিল্লি করছি, কানে তুলো এঁটেছিলি নাকি, অপদার্থ কোথাকার!

ঘরেই ঢুকেই লেবুকে একচোট ধমকালো খোকা। উত্তর না দিয়ে ঘাড় নিচু করে থাকলো লেবু। ঘরদোর সব ফাঁকা ফাঁকা, থমকানো, কিছু একটা ঘটেছে, উসখুস করতে থাকে খোকা।

আলো জ্বালালো খুট করে।

রঞ্জু, এই রঞ্জু!

কোনো উত্তর নেই।

রঞ্জু তুই খেয়েছিস?

আগের মতোই কোনো সাড়া না পেয়ে বিছানার দিকে এগোয় খোকা। খাটের উপর ঝুঁকে বললে, কি রে, ঘুমের ওষুধ গিলেছিস নাকি, এই

বোঝা গেল জেগে আছে সে। খোকার দিকে পিঠ দিয়ে পাশ ফিরে শুলো।

ঠ্যালা সামলাও এখন! কি রে, গোঁসাঘরে গিয়ে খিল দিয়েছিস নাকি? একবাটি তেল লাগবে?

এবারও কোনো উত্তর পেল না খোকা। এতে কিছুটা অবাকই হয় সে। সাধারণত এ ধরনের একগুঁয়েমি করে না রঞ্জু; গোঁ ধরে বসে থাকা কাকে বলে জানে না বললেই হয়, খোকা নিজেই বরং কিছুটা ঘাড়গোঁজা স্বভাবের।

এই আহ্লাদী!

পকেট থেকে চটকানো রুমাল বের করে রঞ্জুর মুখের ওপর ছুড়ে দিলো খোকা।

এই পান্তাকুড়ি, কি হয়েছে কি তোর? ওঠ না, বেশি আদিখ্যেতা করলে গায়ে পানি ঢেলে দেবো।

হঠাৎ মনে হলো খোকার দাঁতে দাতে চেপে ঢোক গিলে গিলে রঞ্জু কাঁদছে।

লেবু, একটা লগি নিয়ে আয়, ওকে আমপাড়া করবো–

শেষে বিছানায় হামাগুড়ি দিয়ে ওর কাছে গেল। হাত ধরে টেনে ঘুরিয়ে দিলো। সত্যিই গুমরে গুমরে কাঁদছে রঞ্জু।

খেয়েছে রে! এইনে, কানমলা খাচিছ, আর রাত করবো না কখনো, ঘাট মানছি, আচ্ছা ডাব্লু তো! বুদুর মতো কাঁদছিস কেন, এই বুড়ি!

খোকা ওর গালে হাত বুলিয়ে দিলো! চোখের পানিতে ভিজে গেল হাত। হেসে আঙুলের ডগা ভিজে চুঁইয়ে টকাশ করে একটা শব্দ তুলে সে বললে, না তেমন নোনতা নয়, ফিকে হয়ে এসেছে নুনটা; তার মানে অনেকক্ষণ ধরে কাঁদছিস। বালিশটাও ভিজিয়ে ফেলেছিস। বালিশে দানা লাগিয়েছিস নাকি, চারা তুলবি?

বালিশে চোখ-মুখ ডলে দেয়ালের দিকে তাকিয়ে রইলো রঞ্জু।

খোকা বললে, বুঝলাম, আমার চেয়ে দেয়ালটাই তোর কাছে ভালো এখন। ঠিক হ্যায়, এখন থেকে ওটাকেই দাদা বলে ডাকিস।

সিদ্ধেশ্বরী থেকে চাচা এসেছিলেন, সাড়ে নটা পর্যন্ত ছিলেন, জরুরি কথা আছে। কালকেই দেখা করতে বলেছেন–

গুলি মার!

বারবার বলেছেন, কালই যেতে; খুব চটে গিয়েছেন তোর ওপর। খুব চোটপাট করেছে তাহলে? আমরা বাড়ি ছেড়ে অন্য কোথাও যাবো কি না জানতে এসেছিলেন, সবাইকে দেশে পাঠাচ্ছেন। আমাদেরও যেতে বলছেন সঙ্গে!

যতোসব গুবলেটমার্কা কথা। বাড়ি ফেলে রেখে যাই, আর সবকিছু লুটপাট হয়ে যাক, ভালো করতে পারি না মন্দ করতে পারি, কি দিবি তা বল!

সেজখালাও এসেছিলেন–

বলিস কি! কতোক্ষণ ছিলো?

দুপুর থেকেই ছিলেন, সন্ধ্যার একটু আগেই চলে গেলেন। তুই যাসনে কেন?

বললো বুঝি?

কতো কান্নাকাটি করলেন। শিগগির কুমিল্লায় চলে যাচ্ছেন সবাই, শুধু সেজখালু থাকবেন। আমাদের যেতে বলেছেন ওঁদের সঙ্গে।

হুঁ। সঙ্গে নিশ্চয়ই বেলী ছিলো, না থেকে ভালোই হয়েছে, বেলীটা একেবারে অসহ্য আমার কাছে।

থেকে যেতে চেয়েছিলো, সেজখালা রাজি হলেন না, বললেন আমি একা একা ফিরতে পারবো না, অন্যদিন আসিস।

পরে শোনা যাবে সব, এখন ওঠ দেখি। হাবার মতো এ্যাঁয়ু এ্যাঁয়ু করে কাঁদছিলি কেন?

এমনিই। এমনিই আমার কেউ কাঁদে নাকি?

আমি এমনিই কাঁদি–

তার মানে তোর ট্রিটমেন্ট দরকার। তোর কানে গরম রসুন-তেল ঢালা দরকার; নির্ঘাত একটা ইস্কুরুপ ঢিলে হয়ে গিয়েছে তোর মাথার ভিতর। দেরি করে ফিরেছি বলে কাঁদছিলি?

বাপির জন্যে মন কেমন করছিলো।

এটা তোর বাড়াবাড়ি। তারিখ এসেছে যে হাপুস নয়নে কান্না। জুড়বি?

যদি না আসতে পারে?

যদি আবার কি এ্যাঁ? তোর যতো উড়ো বায়নাক্কা। খামোকা মন খারাপ করাটা ধাত হয়ে দাঁড়িয়েছে। নেমে চল, দারণ খিদে পেয়েছে, পেট চুইচুই করছে। দুপুরের মাছ রেখেছিস তো, কি মাছ?

পাবদা!

পাবলো নেরুদা–গুড!

দুজনে একসঙ্গে খেলো। পরে একসময় রঞ্জু বললে, তুই একটা আজব মানুষ, এতোক্ষণ কিছুই নজরে পড়ে নি তোর, আশ্চর্য!

কেন কি হলো আবার?

দেখতে পাচ্ছিস না কিছু?

কি জানি বাবা—

ময়নাকে দেখছিস?

তাই বল! কি হলো আবার ময়নাটার? ঠিকই তো, এসে থেকে ওকে দেখি নি। ওর বাবা নিয়ে গেছে বুঝি?

রঞ্জু বললে, ওর বাবা বিকেলের দিকে এসেছিলো ওকে নিতে, কিন্তু পায় নি–

পায় নি মানে, কি আবোল-তাবোল বকছিস?

পায় নি মানে পায় নি! ইচেছমতো তেরিবেরি করে গেল, তুই থাকলে নির্ঘাত হাতাহাতি হয়ে যেতো তোর সঙ্গে। লোকটা এমন মুখফোড়!

তা না হয় হলো, কিন্তু ময়নার ব্যাপারটা কি?

ময়না চলে গেছে!

তোকে বলে গেছে?

হ্যাঁ!

কিন্তু এ রকম হঠাৎ চলে যাবার মানে কি? গেলই-বা কোথায়?

ময়না হাতেম আলীর সঙ্গে গেছে—

কি সর্বনাশ! তার মানে ইচ্ছে করেই গেছে। পেটে পেটে এতো বজ্জাতি মেনিমুখো ছোকরার! আগে থেকে জানতিস তুই?

না! আজকেই শুনলাম সব। হাতেম আলী ওকে বিয়ে করবে। যাবার সময় বলে গেছে, ওর কোনো দোষ নেই!

তুই যেতে দিলি কেন?

দেবো না-ই-বা কেন?

তুই জানিস হাতেম আলীর মনে কি আছে?

হাতেম আলী ওর কাছে অনেকদিন থেকে পয়সা জমায়, ওই জমা। পয়সা থেকে কানের দুলও গড়িয়ে দিয়েছে ভিতরে ভিতরে। তেমন। তাড়াহুড়ো ছিলো না ওদের, হুট করে ময়নার বাবা এই টানা-হাচড়া পাকালো বলে–

তবু আস্কারা দিয়ে তুই ভালো করিস নি—

ও বুঝি আমার বারণ শুনতো?

একশোবার শুনতো। দায়িত্ব আছে আমাদের। সব জেনেশুনেই একটা উটকো লোকের সঙ্গে যেতে দিয়ে তুই ভুল করেছিস!

ও আমাকে বলতে চায় নি। আবডালে বসে বসে কাঁদছিলো, ওর প্ল্যান ছিলো না-বলে পালানোর। শুধু আমার চাপে পড়ে সব স্বীকার করে ফেলেছে!

কিন্তু তোর কাজটা হয়েছে বোকার মতো, এদের আস্কারা দিতে নেই; কি থেকে কি দাঁড়ায় তুই কি জানবি! কোনো চালচুলো নেই, ঠিক-ঠিকানা নেই, হাতেম আলী যদি ওকে পথে বসিয়ে দেয় শেষ পর্যন্ত, তখন? সব চাপবে আমাদের কাঁধে। তোর উচিত ছিলো আমার সঙ্গে পরামর্শ করা, মতামত জানা।

রঞ্জু ক্ষিপ্ত হয়ে বললে, পাচ্ছি কোথায় তোকে? আমার বারণ শুনতে ওর বয়েই গেছে! ও নিজে যদি ভালো মনে করে থাকে আমাদেরই-বা অতো মাথাব্যথা কিসের!

খোকা রঞ্জুর মুখের দিকে তাকালো! একরোখা জেদি ভঙ্গিতে ও পায়ের পাতার দিকে তাকিয়ে আছে। সে বললে, টাকা-পয়সা নিয়েছে?

হ্যাঁ, আমিই চুকিয়ে দিয়েছি, ওর আশি টাকা জমা ছিলো—

বিরসমখে গা-হাত-পা ছেড়ে দিয়ে খোকা বললে, তাহলে এই ব্যাপার।

রঞ্জু কোনো কথা বললো না, মাথার বিনুনি খুলে নতুন করে কষে বাঁধতে বাঁধতে কেবল এক পলকের জন্যে খোকার মুখের দিকে তাকালো।

খোকা বললে, মুখ আঁধার করে বসে আছিস কেন অমন?

তুই-ই-বা মিথ্যে মিথ্যে আমার কাঁধে দোষ চাপাচ্ছিস কেন!

দোষ দিলাম বুঝি?

তবে কি!

যাব্বাবা!

রঞ্জু বললে, তুই একটা কাটমোল্লা!

তুই বুঝি?

হাতেম আলীটা খুব সরল, ওর ভিতরে কোনো প্যাঁচঘোচ নেই, বলিস নি আগে? কি এমন দোষ হয় ময়নাকে যদি ও বিয়ে করে? ময়না তো ওকে ভালোবাসেই–

আরেব্বাপ, ভক্তি বেড়ে যাচ্ছে তোর ওপর। কি করে জানবো তুই। এতো বুঝিস?

বললাম তো, তুই একটা বুড়ো ভাম।

কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর একটা সিগ্রেট ধরিয়ে খোকা বললে, তাহলে সবাই ঢাকা ছেড়ে পালাচ্ছে–

রঞ্জু কোনো উত্তর দিলো না।

তোর কি খুব ভয় লাগছে, সেজখালাদের সঙ্গে যাবি?

না।

এখানে থেকেই-বা কি করবি? এখনই কেমন ভুতুড়ে ভূতুড়ে ঘুটঘুটে হয়ে গিয়েছে পাড়াটা, তুই বরং বেলীদের সঙ্গে চলেই যা। কোনোদিন বাঁশঝাড় এঁদো পানাপুকুর দেখিস নি, এসব দেখা হবে। কি যেন গ্রামটার নাম, বাঞ্ছারামপুর, তুই যদি মনে মনে কোনো কিছু যাচ ঞা করিস তা পূর্ণ হবে ওখানে।

দরকার হলে তুই যা না!

আবার খাঁউ! ওখানে গেলে কেউ তোকে গিলে খাবে না।

বাপির কথা খেয়াল নেই বুঝি?

সে–তো আমি আছিই। দুজনে মিলে তোর ওখানে হাজির হবো। ব্যাপারটা মন্দ হয় না কিন্তু। এমনিতেও তোর কিছুদিন একলা থাকা দরকার, তখন মর্ম বুঝবি—

রঞ্জু বললে, তুই বরং ওদের সঙ্গে যা, বেলীও খুব খুশি হবে।

তাই বল! এতোক্ষণে বুঝলাম তোর গররাজি হওয়ার কারণটা। তুই বুঝি বেলীকে খুব হিংসে করিস?

হিংসার কি আছে এতে? বেলীর চিন্তায় দিনরাত যেন আমার ঘুম হচ্ছে না?

ঘুম হচ্ছে না আমার—

বেলীকে দেখলে তো তাই মনে হয়।

ওর একটা দুস্তরমতো হাতেম আলী দরকার, বুঝলি না!

তোর মুখটা একটা নরদমা।

তোর মুখ একটা ফুলের বাগান।

একটু পরে খোকা বললে, বেলীটা নিছক ঝামেলা। আপদটাকে কেন যে বিদায়ের ব্যবস্থা করছে না বুঝি না। সেজখালার উচিত দড়াম করে ওটাকে বিয়ে দিয়ে পার করা। দাঁড়া, এবারে এলে আমি নিজেই তুলবো–

পাত্র দেখে দিতে পারবি?

সেটাও একটা কথা। গোল্লায় যাক! বেলীফেলী নিয়ে মাথা ঘামিয়ে তোর কোনো লাভ নেই, ওর ইস্কুল আলাদা, কালিকলম বইশ্লেট আলাদা; ওর ব্যাপার তুই বুঝবি না।

রঞ্জু বললে, পাড়ার কতোগুলো ছেলে এসে আজ ঝামেলা বাধিয়েছিলো। আমাদের ছাদে ফ্ল্যাগ নেই, খুব চোটপাট করছিলো ছেলেরা, বলছিলো বোমা মেরে উড়িয়ে দেবো–

যে যার নিজের ছাদে একটা ফ্ল্যাগ ওড়ালেই সব হয়ে গেল আর কি! কারা যে এইসব চ্যাংড়াদের বুদ্ধি জোগায়! কি বললি ওদের?

দশ টাকা দিয়ে একটা ফ্ল্যাগ কিনতে হলো ওদের কাছ থেকে। ছাদে উড়িয়ে দিয়েছে লেবু।

ঝক্কি চুকেছে। নে এখন শুয়ে পড়।

খোকা নিজের ঘরে চলে এলো।

চারপাশে বইপত্র ছড়ানো। বিছানার চাদরও এলোমেলো, লণ্ডভণ্ড। এখানে বই, ওখানে খাতা, ঘরে পা দিয়ে একটু অবাকই হলো খোকা। ভূতপ্রেতের দল ফাঁকা পেয়ে মনের সাধ মিটিয়ে একচোট নাচানাচি করে গিয়েছে ঘরময়। কেবল দলামোচড়া কতগুলো কাগজ ভাঁজ করে অযত্নে কাটগ্লাসের ভারি এ্যাশট্রেটা চাপা দিয়ে রাখা। একটির পিছনে লেখা কেন লেখো, কেনই-বা ধ্বংস করো, তুমি কি?

এক সময় বিছানার চাদর ঠিক করতে গিয়ে বালিশ সরাতেই চোখে পড়ে একটি চারভাজের কাগজ :

খুব শিগগির আমরা বাঞ্ছারামপুর যাচ্ছি। তুমি যাবে না? যদি না যাও, হয়তো আর কোনোদিন দেখা হবে না। দেখা কোরো, ভয় নেই। তোমার কথা সবসময় মনে হয়। বড় নিষ্ঠুর তুমি। পায়ে পড়ি দেখা কোরো। তোমাকে তো পারে নি, তাই তোমার একলা বিছানাটাকেই এলোমেলো তছনছ করে দিয়ে গেল বেলী।

বেড়ে লিখেছে ছুঁড়ি, বিড়বিড় করতে থাকে খোকা। একলা বিছানা, খাসা খাসা! ভিতরে ভিতরে একেবারে ঝুনো হয়ে গিয়েছে, শাঁস বলতে কিছু নেই, সব ফোঁপল হয়ে গিয়েছে, ফোঁপল ফোঁপল।

বুকের তলায় বালিশ খুঁজে বারবার উল্টেপাল্টে নেড়েচেড়ে দেখতে লাগলো চিঠিটা। খোকা মনে মনে বলতে লাগলো, পেকে গিয়েছে, বোটার গোড়া পর্যন্ত পেকে গিয়েছে এ মেয়ে। কায়দাটা ভালোই রপ্ত করেছে, তোমাকে তো পারিনি রক্ষে করো, না, গুণ আছে ওর, ওর লাইনে ও ডিগ্রি নেবার মতোই; এইজন্যেই লতানো ঝুলপি ভোগলা। পায়জামা আর ধনুকমার্কারা ওর পিছনে কামড়ি খেয়ে লেগে থাকে। সত্যি, গুণ আছে ওর। প্রতিটি সুযোগকেই কাজে লাগাতে চেষ্টা করে, একটাই ওর চিন্তা, একটাই ওর সাধনা, কি দারুণ অধ্যবসায়! ওর হবে!

কেন লেখো, কেনই-বা ধ্বংস করো, ভেবে দেখতে হবে, খোকা মনে মনে হাসলো। ভেবে দেখলেও, ঠোঁটে লিপস্টিক ঘসার মতো সহজ করে বলা কি কোনোদিন সম্ভব হবে!

একের পর এক সিগ্রেট পোড়াতে থাকে খোকা, শেষ পর্যন্ত ময়নাকে কেন্দ্র করে তার ক্ষোভ ডালপালা বাড়ায়; কি করে পারলো রঞ্জু এমন একতরফা সিদ্ধান্ত নিতে!

খোকার বিশ্বাস, ব্যাপারটা বাড়াবাড়ির। কোনো গোপন অভিলাষ দ্বারা কি অজ্ঞাতসারে সে প্ররোচিত হয়েছে?

মুরাদের কথা মনে হলো খোকার। তার ধারণা মুরাদের মনোভাব পরিষ্কার বুঝতে পেরেছিলো সে। প্রথম থেকেই আমতা আমতা করছিলো। কদিন থেকে একনাগাড়ে কিল খেয়ে কিল হজম করে চলেছে, এটা ওর স্বভাবই নয়। রঞ্জুর দিকে মুরাদের তাকানোর ভঙ্গিটাও কিছুটা কুৎসিত ধরনের। অর্থপূর্ণ দৃষ্টিতে তাকায় মুরাদ, আর জোর করে চোখমুখে এমন একটা নিস্পৃহতা আনে যাতে মনে হয় নিদারণ বীতশ্রদ্ধ সে এখন। এ চালাকি সে ভালো করেই বোঝে, নিরাসক্তির ব্যাপারটা স্বভাবের, জোর করে কেউ নিরাসক্ত হতে পারে না। অতো লুকোচুরির কি আছে; বন্ধুর বোন থাকলেই তাকে গিলে খেতে হবে! একটা মফস্বলের স্ব ভাব, গ্রাম্যতা। অগ্রপশ্চাৎ কোনো বিবেচনা নেই, মেয়ে দেখলেই বনবন করে মাথা ঘুরে যায়, কি হাঘরে স্বভাব এদের। এই স্কুলরুচির আমড়া কাঠের চেঁকিগুলো বন্ধুত্বের মর্যাদা রাখতে জানে না। হাত ধরে ঘরে নিয়ে এসেছো কি বিপদ, শুরু হয়ে গেল চুলবুলুনি, গাবাগাবি; লটকাও বন্ধুর বোনকে!

মুরাদের আহত মুখচ্ছবি ভেসে উঠলো। ব্যথিত হয়েছে মুরাদ। কথা বলতে পারছিলো না, কেঁদে ফেলার উপক্রম হয়েছিলো বেচারার। গায়ে। পড়ে দুরমুশ করেছিলো সে, মুরাদ ভ্যাবাচ্যাকা মেরে গিয়েছিলো; এ ধরনের আক্রমণের জন্যে তার কোনো মানসিক প্রস্তুতি ছিলো না। অমন উদোম আলাপের পর তার আর কোনো পথই ছিলো না গোপন কথা ওগরানোর। সে ইচ্ছে করেই হাতে হ্যারিকেন দিয়েছে, এক অর্ধচন্দ্রেই একেবারে রাস্তায় নামিয়ে দিয়েছে।

এক সময় খুব খারাপ লাগলো খোকার; নিকৃষ্ট পন্থা অবলম্বন করেছিলো সে, তার নিজের ব্যবহারও খুব একটা রুচিসম্মত নয়, মনে। হলো এইসব। সময় সময় এমন নিষ্ঠুর হয়ে যাই, খোকা শুয়ে শুয়ে আকাশ-পাতাল ভাবতে লাগলো, মুরাদের সঙ্গে এই নির্দয় ব্যবহার বন্ধুত্বের অতি সাধারণ একটি দাবিকেও অস্বীকার করে যায়। কিন্তু কেন, সব ব্যাপারটা আগাগোড়া সুন্দরভাবে শেষ করে দেওয়াও তো এমন কোনো কঠিন কাজ ছিলো না! স্পষ্ট বললেই হতো, রঞ্জুর দিক থেকে সে তার চোখ ফিরিয়ে নিক। নিছক কষ্টের ভিতর পা বাড়িয়ে কি লাভ তার! সে ভুল বুঝেছে রঞ্জুকে। রঞ্জু ভিন্ন ধাতের মেয়ে, ওর নিজেকেই পস্তাতে হবে শেষ পর্যন্ত। সে তো জানেই তার স্পষ্টবক্তার সুনাম আছে; শুধু এই সুনামটুকুই তাকে ভাঙাতে হতো। কাটগোয়ারের মতো সে বেছে নিয়েছিলো উল্টো পথ।

স্নায়বিক উত্তেজনা খোকাকে এলোমেলো করে দিলো এক সময়। এ ধরনের অস্থিরতার সঙ্গে তার কখনো পরিচয় ঘটে নি; এমন এক বিপর্যয়ের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে সে আজ, যেখানে তার সব দৃঢ়তা মোমের মতো নিঃশব্দে গলে গলে পড়ে। আক্রোশে ফেটে পড়ে খোকা, বন্ধুত্বের সহজ নিবিড় সম্পর্কের মাঝখানে বাতুল সমস্যা এনে রেষারেষির প্রয়োজনই-বা কি! গাঁউয়া, নিরেট গাঁউয়া এই মুরাদ; স্বেচছায় সবকিছু দূষিত আবর্জনাময় করে তুলতে সে মনে মনে বদ্ধপরিকর। বন্ধুত্ব আর ডাস্টবিনের ভিতর কোনো পার্থক্য নেই।

বুকের তলার বালিশটাকে দুমড়ে দেয় খোকা। রঞ্জুর মতো মেয়ের কথা ভেবে সবকিছু বাস্তবতার নির্মল আলোকে বিচার করে দেখা উচিত ছিলো মুরাদের। চার বছর যাবৎ দেখে আসছে মুরাদ রঞ্জুকে। এখনকার আর পাঁচটা ডুগডুগি বাজানো। মেয়েদের মতো বেলেল্লা নয় রঞ্জু, অনেক আগেই তার বোঝার কথা। নিছক একটা ঘরকুনো মেয়ে, খোলা বারান্দায় দাঁড়িয়ে সারাদিনের ভিতর একটিবারও যার রাস্তার দিকে চোখ মেলে তাকাবার প্রয়োজন হয় না। তার এই আড়ষ্টতার কথা, ঘরকুরোমির কথা, নিজের কুণ্ডলীর ভিতর অচৈতন্যথায় পড়ে থাকার কথা, খুব ভালো করেই জানে মুরাদ।

না কি রঞ্জুই ওকে সাহস জুগিয়েছে?

সাহসের যে জোগানদার তার নিজেকেও সাহসী হতে হবে এমন কোনো ধরাবাধা নিয়ম নেই। রঞ্জু নিজে কতটুকু সাহসী? সবকিছুই কি নিখুঁত একটা অভিনয়? দিনের পর দিন স্রেফ অভিনয় চালিয়ে যাচ্ছে রঞ্জু?

রঞ্জু একটা দারুণ সমস্যা, এতোদিনে হঠাৎ মনে হয় খোকার। মুরাদকে কি সে গোপনে গোপনে কোনো চিরকুট চালান করেছে? এমন। বুকের জোর পেল কোথা থেকে মুরাদ? রমনা রেস্তরাঁয় মুখের ওপর ফশ করে একটা চিঠি ছুড়ে মারলে তার কি দশা হতো? নিজের সঙ্গে যুদ্ধ। চলে খোকার।

শেষ পর্যন্ত খোকা সন্ধি করে। রঞ্জু রঞ্জুই; রঞ্জু যদি ছিটেফোঁটা অনুকম্পাও করতো, মুরাদকে, তাহলে নিজেকে ঢেকে রাখতো মুরাদ, অহঙ্কারের তাপে তার মনোবল অবলম্বন করতো ভিন্ন পথ; আকুলি বিকুলি করতে হতো না তাকে অমন। এটা একটা একপেশে ঘোড়ারোগ, আলোচাল দেখে যেমন ভেড়ার মুখ চুলকায়।

বেলীর কাণ্ডকারখানা দেখে কতোবার মুখ টিপে হেসেছে রঞ্জু। বিছানার উপর বিশ্রীভাবে শুয়ে থাকার জন্যে দুম করে একবার কিল। বসিয়েছিলো বেলীর পিঠে। বেলী জোর করে যখন তাকে সস্তা সিনেমার গল্প শোনায় সে তখন বেলীর অজান্তে ঘুমিয়ে কাদা হয়ে থাকে; ঝিঝিপোকার একটি ফিনফিনে ডানা, একফোঁটা বৃষ্টির ভারেও যা মচকে যায়।

রঞ্জুকে একবার জিগ্যেস করে দেখলে কি হয়?

উচিত হবে?

না, উচিত হবে না। ঘৃণায় কুঁচকে যাবে রঞ্জু। কদর্য চোখকে কি করে ঘণা করতে হয় সে তা জানে। সে জানে, সে কোনো কুড়ানো মেয়ে নয়। রাস্তার, ফ্যালনা ন্যাতাকডনি পাতাকডনি নয়: নোংরা এঁটো চোখে কেউ তার দিকে তাকিয়ে আছে একথা শুনলে আতঙ্কে শিউরে উঠবে সে।

মুরাদের উচিত তার ওই যাত্রাদলের সস্তা স্বভাব বদলানো। স্পষ্ট বলে দিতে হবে ওকে। য়ুনিভার্সিটিতে থাকার সময় যে সব বদভ্যাস ছিলো এখনো কিছু কিছু তার থেকে গিয়েছে। ওর নজরটাই খারাপ। টিউটোরিয়্যালের চিন্তায় অন্যদের মাথার ঘিলুর ভিতর যখন কিলবিলে পোকার কামড়ানি চলছে ও তখন করিডোরের মেয়েদের দৃষ্টি আকর্ষণী পায়চারিতে মশগুল। পুরুষ্টু মেয়েদের দেখলেই ওর চোখ ছানাবড়া হয়ে যায়। বলতো-ও মাঝে মাঝে, থর নামা দেখলে আলামিয়াকে ভালোবাসতে ইচ্ছে করে আমার, ভালো কাম যদি তার কিছু থেকে থাকে তাহলে এই সবই। এমনকি রাস্তাঘাটে ভারবাহী জন্তুর মতো স্বাস্থ্যভারানতা যুবতী দেখলে ও পাগলামি শুরু করে দেয়, নাল গড়ায় ওর নোলা দিয়ে। হঠাৎ রঞ্জু ওর মাথার ভিতরে ঢুকলো কি করে ভেবে পায় না খোকা; কে বলবে এটা তার পুরানো স্বভাবেরই একটি অপভ্রংশ নয়! স্বাধিকারপ্রমত্ত আজকের মানুষ কপচাবার সময় দিব্যি আবার বদলে যায়।

রঞ্জু কি?

একটা টিনটিনে ফড়িং। দেখে মাতলামি চাগিয়ে ওঠার মতো কিছুই নেই ওর শরীরে। আদর করে একটু জোরে চাপ দিলেই মুড়মুড়িয়ে ভেঙে যাবে ওর হাত। পায়ের তলায় সামান্য একটু কাকর ফুটলে এখনো চোখমুখ সাদা ফ্যাকাসে হয়ে যায়। এখনো কাঁটা বেছে পাতে তুলে না দিলে ইলিশ মাছ খেতে পারে! এতো পলকা এতো কোমল যে সামান্য একটি দূর্বাঘাসের ভারও তার জন্যে অনেক; এইভাবে তাকে তুলোয় মুড়ে রাখতে খোকার ভালো লাগে।

ক্ষয়রোগ তলে তলে কুরে খায়, তারপর আচমকা একদিন এক ঝলক রক্ত তুলে কেতন উড়িয়ে জাহির করে নিজেকে; বয়েসও একটা ক্ষয়রোগ। বকের ভিতর ফাঁকা হয়ে গেল খোকার; আর সেই আসবাবপত্রহীন ফাঁকা ঘরে আপন অসহায়তার নুলো হাতে পিটপিটে কুপির আলো দেয়ার জন্যেই হাই হুম হাম শব্দ করলো দুচারবার। তার যাবতীয় দুর্ভাবনার গায়ে আকুল তার পুঞ্জ পুঞ্জ আর্দ্রতা জমে : হয়তো আমার নিজের চোখে ধরা পড়ছে না, নিরন্তর সাধন করে দিচ্ছে এই চোখ আমাকে, তুমি কোনোদিন সত্য উচ্চারণে সফলকাম হবে না এবং যাতে সফলকাম না হও সেইমতো একজোড়া কড়ির চোখ হয়ে আজীবন আমি তোমাকে পাহারা দেবো।

মুরাদকে কি আমি হিংসা করবো, আমার চোখজোড়া ওর মতো সন্ধানী নয়। ও যা দেখতে পায় আমি তা দেখি না কেন! গাছের একটি ভিজে পাতায় চন্দ্রালোকে দ্যাখে মুরাদ, আমি দেখি উদ্যত ফণা, ফলে আছাড় খেয়ে পড়ি দুঃস্বপ্নে। রঞ্জু কি হঠাৎ বড় হয়ে গেল?

ঘুম এলো না কিছুতেই। উঠে পানি খেলো খোকা। সিগ্রেট ধরালো। বই খুলে চেষ্টা করলো মনোযোগ দেয়ার, কিন্তু সবাই বৃথা, শত চেষ্টা করে ও একটা পৃষ্ঠা ওল্টাতে পারলো না সে। কি হয় বই পড়ে, অপরিসীম শ্রান্তি ও অনমনীয় কাতরতায় একটু একটু করে সে নুয়ে পড়ে; সে জানে এমন একটি চিন্তাও নেই সম্পূর্ণত যা তার নিজস্ব, একেবারে নিজের বলতে যা আছে তা কেবল যন্ত্রণা। এই একটাই সম্পত্তি যা একান্ত ভাবেই তার নিজস্ব। প্রত্যেকটি মানুষের যন্ত্রণা যার যার নিজের মতো, কারো সঙ্গে কারো মিল নেই, এই একটিই সম্পত্তি যা কারো কাছ থেকে ধার নেওয়ার প্রয়োজন হয় না।

শেষে পায়ে পায়ে রঞ্জুর ঘরে ঢুকলো।

বনস্পতির ছায়ার মতো মনোরম সবুজ আঁধার হালকা পাতলা ছিমছাম রঞ্জুর এই একটিপ শরীরটুকুকে কোমলতায় আচ্ছন্ন। করে রেখেছে। মনে হয় রাশি রাশি পাতার ফাঁক দিয়ে আসা এক চিলতে জ্যোছনার শান্ত নিরুদ্বিগ্ন আলো, যেন লতাগুল্মের স্নিগ্ধ নিশ্বাস; রাত্রিরানীর স্খলিত বসনের একটি চিকন সোনালি সুতো। ডাকবে কি ডাকবে না ভাবতে ভাবতে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে খোকা।

তারপর এক সময় আলো জ্বেলে দেয় খুট করে।

ঘুমিয়ে পড়েছিস?

না।

ঘুম আসছে তো?

না।

আমারও ঘুম আসছে না। বসবি কিছুক্ষণ বারান্দায়?

উঠছি—

ভিতরের বারান্দায় বসলো দুজনে। জ্যোছনার ঢল নেমেছে আজ। খুব কাছাকাছি কোথাও একটানা ডেকে চলেছে একটি পাখি।

মাঝে না সিগ্রেট কমিয়ে দিয়েছিলি?

কেন?

এতো সিগ্রেট টানছিস কেন আজ?

কি জানি—

তুই না বলিস, বেশি সিগ্রেট খেলে ঘুম হয় না?

মনে করিয়ে দিবি তো!

আমি জানি—

কি জানিস?

তোর মন খারাপ?

কই? নিজের মুখ তো আর দেখতে পাচ্ছি না!

তোরও তো মন খারাপ!

বললেই হলো—

অতো চোটপাট করলে কে তখন?

সে তো তুই—

পান্তয়াটি! কাটমোল্লা বলে গাল দিস নি?

খোকার একটা হাত ধরে আবার ছেড়ে দিয়ে বললে, কই দেখা তো কোথায় ফোস্কা পড়েছে!

খোকা বললে, তুই যদি আর কোনোদিন আমার সঙ্গে মুখ কালো করে কথা বলিস, তাহলে তার ফল খুব ভালো হবে না, আগে থেকেই বলে দিচ্ছি, আমি কিন্তু ভাগোয়াট হয়ে যাবো।

দিন দিন তোর আবদার বেড়ে যাচ্ছে।

আর তুই বুড়ি হয়ে যাচ্ছিস—

বুড়ি তো হবোই, তোর মতো?

তুই বুড়ি হতে পারবি না।

খোকা সিগ্রেটের প্যাকেটে হাত দিতেই রঞ্জু কেড়ে নিলো, বললে, খবরদার আর একটাও ধরাতে পারবি না

খোকা বললে, তোর এতো মাথাব্যথা কিসের? আমার দিকে তোর খেয়াল আছে কোনো?

কে দ্যাখে তবে?

বেলী যে আমার ঘর অমন লণ্ডভণ্ড করে দিয়ে গেল, তুই কিছু বলতে পারিস নি? উচিত ছিলো না বলা?

ওর ভালো লেগেছে ও করেছে, আমি বাধা দেবো কেন?

ইচ্ছে করলে তুই ওকে লজ্জা দিতে পারতিস।

মানুষকে কাঁদাতে খুব ভালো লাগে, না?

আমি বুঝি সবাইকে কাঁদাচ্ছি?

তবে কে?

তুই একটা মিথুক!

তোর মতো কেউ এমন নিষ্ঠুর নয়। আমাকে একা বাড়িতে ফেলে সারাদিন ড্যাংড্যাং করে ঢাকা শহর ঘুরে বেড়ানোর সময় কোনো কিছু মনে থাকে না তোর। যা ভয় লাগে! এই গণ্ডগোলের সময় এতোবড় বাড়িতে একা থাকা যায়, না?

ঠিক আছে, কাল থেকে দেখিস, পায়ে এক্কেবারে তালাচাবি। যদি কোথাও যাই তোকেও নিয়ে যাবো পোঁটলা বেঁধে, যাবি তো?

সকাল পর্যন্ত মনে থাকলে হয়।

কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর হঠাৎ খোকা বললে, আচ্ছা এমন যদি হতো, আমরা চিরকাল ঠিক এখনকার মতোই ছোট থেকে গেলাম, কি হতো তাহলে?

ভালোই হতো—

তোর ইচ্ছে করে?

করেই তো!

সত্যি বলছিস?

না মিথ্যে বলছি, হলো তো!

আচ্ছা ধর, আমি যদি হঠাৎ মরে যাই তোর কি রকম লাগবে, খুব কাঁদবি না? ভেবে দ্যাখ ঝগড়া করার মতো তোর আর কেউ নেই তখন–

আমার খুব মজা হবে বুঝলাম–

মজাই তো! ছাদে বেড়াবো, ছেলেদের দিকে তাকিয়ে হাসবো, প্রেমপত্র লিখবো, বিছানা এলোমেলো করে দেবো, যা ইচ্ছে তাই করে বেড়াবো

ইচ্ছে হলে এখনো তা করতে পারিস!

পারি-ই তো! আমি কি তোর ভয় করি?

আমি বুঝি তাই বলেছি?

ওনার ভয়ে আমার ঘুম হচ্ছে না কিনা—

রেগে যাচ্ছিস কেন, তোকে নিয়ে এক মুশকিলই হয়েছে!

নিজে সাধুপুরুষ–

এই বুড়ি, ও কি রে হঠাৎ ঝুঁকে পড়ে রঞ্জুর একটা হাত ধরে খোকা বললে, চোখে পানি কেন, কাঁদছিস বুঝি? এই পাগলি কাঁদছিস কেন, কান্নার কি আছে–

কোনো উত্তর দিলো না রঞ্জু, কেবল একটু জোরে সে ফুপিয়ে উঠলো। ওর হাত ধরে ঝাকুনি দিয়ে খোকা বললে, কি তাজ্জব কথা, হলো কি তোর? কথায় কথায় ভেঁপু–

মরার কথা তোলার সময় খেয়াল থাকে না!

তাই বুঝি, এর জন্যে এতো ঝড়-বৃষ্টি? আগে তো এ রকম ছিলি না? তুই দেখছি পাগল না করে ছাড়বি না!

কেন তুলবি তুই ওসব বাজে কথা?

ভুল হয়েছে বাবা, মাফ করে দে—

কি অন্যায় করেছি আমি, যে তুই ওসব অলক্ষুণে কথা তুলবি!

আরে বাবা বললেই তো আর কেউ মরে না, মরা কি অতো সহজ!

কি জানিস তুই, কখন কোন কথা লেগে যায়, কখন কোন্ কথা সত্যি হয়ে যায়!

ঠিক আছে, আর কখনো বলবো না, কথা দিচ্ছি!

ভেজা চোখে ওর মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো রঞ্জু। বললে, সব জিনিশ নিয়ে ঠাট্টা-ইয়ার্কি করবি না কিন্তু–

আবার? মাথা খারাপ তোর!

বুক আলগা কর–

খোকার পরনে ছিলো পাঞ্জাবি। দুটো বোতাম খুলে ফেললো সে। রঞ্জু থু থু থু করে তিনবার তার বুকে থুতু দিলো।

যাক বাবা, এ যাত্রা কোনোমতে টিকে গেলাম!

শেয়ার বা বুকমার্ক করে রাখুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *