1 of 2

২৭. শুকনা পর্যন্ত গাড়ি ছুটেছিল

শুকনা পর্যন্ত গাড়ি ছুটেছিল জেট-এর গতিতে। রাস্তা ফাঁকা, দুপাশে চাবাগান, সন্ধ্যে পার হয়ে যাওয়ায় চারধারের নিঃসাড় নির্জনতা অনন্তে ছড়ানো। সুদীপ বসেছিল কল্যাণের সঙ্গে ড্রাইভারের পাশে, ওরা দুজন পেছনে। যেতে যেতে সুদীপ প্রথম মন্তব্য করল, ফ্যান্টাস্টিক!

আনন্দ বারংবার পেছনে তাকাচ্ছিল। কোন দ্রুতগতির হেডলাইট এখনও দেখা যাচ্ছে না। অবশ্য যদি পুলিশ সামান্য আঁচ করতে পারে তাহলে অয়ারলেসে সামনের যে কোন পুলিশ স্টেশনকে জানিয়ে দিলেই হয়ে গেল। পথ একটাই। নির্দিষ্ট এলাকায় পৌঁছাতে গেলে এই পথেই যেতে হবে। সে চাপা গলায় একটু বিরক্ত হয়ে মুখ ফিরিয়ে বলল, তোর হাওয়া খাওয়ার জন্যে হোটেলের বাইরে আসার কি দরকার ছিল! এই সব ছেলেমানুষী কি রকম বিপদ ডেকে আনে দ্যাখ?

অন্ধকার ছিল বলে কেউ কারও মুখ দেখতে পাচ্ছে না। তবু জয়িতা আনন্দকে দেখার চেষ্টা করল, আই অ্যাম সরি। আসলে কল্যাণটা মাঝে মাঝে এমন বোর করে! স্টিল আই অ্যাম সরি।

আনন্দ মুখ ঘোরাল, আমি জানি না সামনে কি আছে!

কল্যাণ খোঁচাটা গায়ে মাখবে না বলে ঠিক করল, তুই রুটটা চেঞ্জ করতে পারিস না?

আনন্দ জবাব দিল, পাহাড়ের সঙ্গে চালাকি করে কোন লাভ নেই।

সুদীপ এবার বলল, আমার ওপর ছেড়ে দে। তারপর হিন্দিতে ড্রাইভারকে জিজ্ঞাসা করল, আপনার বাড়ি কি দার্জিলিং শহরেই?

ড্রাইভার মাথা নাড়ল, আপনি বাংলায় বলুন, আমরা বাংলা বুঝতে পারি।

একটু অস্বস্তি হল সুদীপের, তারপর বলল, সরি, আমি বুঝতে পারিনি।

ড্রাইভার রাস্তার দিকে চোখ রেখে বলল, হ্যাঁ, আমার বাড়ি দার্জিলিং-এ।

এখন ওয়েদার কি রকম?

ঠিকই আছে। লাক থাকলে টাইগার হিলে সানরাইজ দেখতে পাবেন।

ড্রাইভারের সঙ্গী ছোকরাটা শিস দিচ্ছিল। আনন্দ ঘড়ি দেখল। শুকনা ছাড়িয়ে যাওয়ার পর মনে হল পৃথিবীতে কোথাও মানুষ নেই। এক জমাট অন্ধকার চারপাশে দেওয়াল তুলে দাঁড়িয়ে। সুদীপ ড্রাইভারের সঙ্গে আগবাড়িয়ে ভাব জমাতে গিয়ে এখন ঠাণ্ডা হয়ে বসে আছে। ওদের একটু আগের সংলাপ লোকটা কতটা শুনেছে অথবা শুনে কি বুঝেছে তা কে জানে! কপালে যা আছে তা হবে। এখন আর পিছিয়ে যাওয়ার পথ নেই। অসঙ্গত কিছু করলে এই ড্রাইভারই হয়তো পুলিশকে জানিয়ে দেবে তাদের কথা।

ধীরে ধীরে গাড়ি ওপরে উঠছে। হঠাৎ বাঁদিকে তাকাতেই অজস্র আলোর মালা চোখে পড়ল। যেন হীরে জ্বলছে দূরে পৃথিবীর গায়ে। সুদীপ বেশ উত্তেজিত হয়ে আবার বলল, ফান্টাস্টিক! শিলিগুড়ি, না?

ড্রাইভার বলল, হ্যাঁ।

শুধু ওইটুকুই। চোখের আড়ালে চলে গেলে গাড়ির হেডলাইট ছাড়া কোন জীবনের অস্তিত্ব নেই। এবং এই রাত্রে ড্রাইভার যে গাড়িতে স্বচ্ছন্দ হয়ে গাড়ি চালাচ্ছে তা ওদের মোটেই কাম্য নয়। কিন্তু লোকটা প্রতিটি বাঁক নেওয়ার আগেও যেন গতি কমানোর চেষ্টা করছে না। আনন্দ বলল, বাক ঘোরার আগে হর্ন দেওয়ার নিয়ম নয়? ওপাশ থেকে যদি গাড়ি আসে তাহলে টের পাবে না।

দিনের নিয়ম রাত্রে চলে না। ওপাশ থেকে খুব জরুরী, মানে আমাদের মত না হলে, গাড়ি নামবে না। আর কোন গাড়ি যদি আসত তাহলে বহুদূর থেকেই হেডলাইটের আলো দেখতে পেত। এখন তো গাড়ি চালানো আরাম। কোন রিস্ক নেই। একটু পরে যখন কুয়াশা নামবে তখনই ঝামেলা। ড্রাইভারের গলা এখন বেশ স্বাভাবিক।

তিনধারিয়াতেও যখন কেউ পথ আটকাল না তখন মনের চাপ কমল। এবার একটু ঠাণ্ডা লাগছে। ওরা প্রত্যেকেই ফুলসিভ পরে নিতে গিয়ে কল্যাণকে নিয়ে ঝামেলায় পড়ল। ওর প্লাস্টার করা হাতে সোয়েটার ঢুকবে না। আনন্দ একটা চাদর জয়িতার দিকে এগিয়ে দিল, এটা দিয়ে ওকে ভাল করে মুড়ে দে।

বিরক্ত হয়ে কল্যাণ বলল, এই ল্যাঠাটাকে সরাতে হবে এবার। আমার হাত ঠিক হয়ে গিয়েছে। কোন পেন যখন ফিল করি না, তখন অসুবিধে রেখে লাভ কি!

কথাটার জবাবে কিছুই বলল না কেউ। জয়িতা চাদরটা খুলে বলল, একটু হাত আলগা কর। চাদর মোড়া হয়ে গেলে কল্যাণ হাসল। জয়িতা জিজ্ঞাসা করল, হঠাৎ কি হল?

কল্যাণ বলল, ছেলেবেলার কথা মনে পড়ে গেল। শীতকালে মা এইভাবে আমাকে আলোয়ানে মুড়ে দিত। খুব বাচ্চা ছিলাম তখন।

জয়িতা মন্তব্য করল, তোর শৈশবকাল তো এখনও চলছে।

পৌনে দুঘণ্টায় কার্শিয়াং এসে গেল।

ড্রাইভার গাড়িটাকে পার্ক করে বলল, পনেরো মিনিটের জন্যে ডিনার ব্রেক। ইচ্ছে হলে খেয়ে আসতে পারেন।

সুদীপ লাফিয়ে নামল। নেমে বলল, আঃ!

আনন্দ বলল, সবার একসঙ্গে খেতে যাওয়া উচিত হবে না। ব্যাগগুলো রয়েছে। তোরা যা, খেয়ে আয়।

জয়িতা বলল, সবার যাওয়ার কি দরকার? সুদীপ গিয়ে কিছু নিয়ে আসুক। মিনিট দুয়েক বাদে সুদীপ ঘুরে এসে বলল, হোটেল থেকে খাবার দিয়ে যাচ্ছে গাড়িতে। এখানে এত তাড়াতাড়ি সব দোকান বন্ধ হয়ে যায় কে জানত!

আনন্দ তাকিয়ে দেখে নিল চারপাশে। ড্রাইভার এবং ছোকরাটা ধারেকাছে নেই। সে বলল, আমরা দার্জিলিং-এ যাচ্ছি না।

কল্যাণ প্রশ্ন করল, তাহলে রাত্রে থাকব কোথায়?

ঘুম-এ। আনন্দ বলল, দার্জিলিং-এ যাওয়াটা রিস্কি হয়ে যাবে। বারবার কপাল পরিষ্কার নাও হতে পারে। সেখানকার হোটেলগুলোতে পুলিশ এর মধ্যে রুটিন ইনস্ট্রাকশন পাঠাতে পারে। তাছাড়া আমরা যেখানে যেতে চাইছি তার রুট ঘুম থেকেই। যদি এই জিপটা সুখিয়াপোখরি কিংবা মানেভঞ্জন পর্যন্ত পৌঁছে দিত!

সুদীপ বলল, ড্রাইভারটাকে রিকোয়েস্ট করব?

কোন লাভ হবে না মনে হচ্ছে। লোকটা এত রাত্রে উলটো পথে যাবে না। আর ওর কথাবার্তা শুনে মনে হয় ওকে জানিয়ে দেওয়া উচিত নয় আমরা কোথায় যাচ্ছি।

জয়িতা চুপচাপ শুনছিল। এবার বলল, ঘুম-এ নামবি কি বলে?

আনন্দ বলল, সেটা কোন প্রব্লেম নয়। বলব টাইগার হিলে সানরাইজ দেখে কাল দার্জিলিং-এ যাব। এখন দার্জিলিং-এ গিয়ে হোটেলে উঠতে না উঠতেই আবার বের হতে হবে। মিছিমিছি কষ্ট করে কি লাভ!

দ্যাখ! জয়িতা ছোট্ট মন্তব্য করল।

কার্শিয়াং ছেড়ে যত ওপরে উঠছিল তত শীত বাড়ছে। তবু গাড়ির ইঞ্জিন চালু থাকায় একটা তাপ ছড়াচ্ছে। আনন্দ কথা শুরু করল, আপনি কাল ট্যুরিস্ট নিয়ে কখন বের হবেন দার্জিলিং থেকে?

তিনটে নাগাদ। ড্রাইভার জবাব দিল।

তাহলে ঘুমাবেন কখন? এখনই তো দশটা বেজে গেছে।

কি করব, ডিউটি করতে হবে। মালিককে কথা দেওয়া হয়েছে। নইলে এই রাত্রে শিলিগুড়ি থেকে গাড়ি নিয়ে ফিরি? ড্রাইভারের গলার স্বরে অখুশি ফুটে উঠল।

আনন্দ বলল, আমরা তো কাল টাইগার হিলে যাব। পরশু ফিরে আসছি। চার ঘণ্টা হোটেলে থেকে কি হবে? তাছাড়া এগারোটার সময় হোটেলে পৌঁছে তিনটেতে গাড়ি পাব?

ড্রাইভার বলল, এখন তো কোন ড্রাইভারকে পাবেন না। তবে তিনটের সময় ওয়েদার ভাল থাকলে পেয়ে যেতে পারেন। আপনারা কার্শিয়াং-এ থেকে গেলে ভাল করতেন। এখনই গাড়ি ঠিক করে রাখলে ওরা ভোরে আপনাদের ডেকে নিয়ে যেত।

যেন সত্যি বড় ভুল হয়ে গেছে এমন একটা শব্দ করল আনন্দ। তারপর জিজ্ঞাসা করল, আপনি আমাদের এখন টাইগার হিলে পৌঁছে দেবেন? শুনেছি ওখানে নাকি ট্যুরিস্ট লজ আছে।

এখন? মাথা খারাপ। আমি আর কোথাও যেতে পারব না। ড্রাইভার বেশ জোরে বলল।

এরপর অনেকক্ষণ কথা হল না। সুদীপের ঠাণ্ডাটা ভাল লাগছিল। আনন্দ একটু কুঁকড়ে ছিল। জয়িতাকে দেখে ঠিক বোঝা যাচ্ছিল না। কিন্তু কল্যাণের বসার ভঙ্গি দেখেই বোঝা যাচ্ছিল তার খুব শীত করছে।

হঠাৎ আনন্দ জিজ্ঞাসা করল, ঘুম-এ কোন হোটেল নেই?

এবার ড্রাইভার মাথা নাড়ল, ঘুম-এ থাকলে আপনাদের সুবিধে হবে। এখান থেকে টাইগার হিল হেঁটেও যাওয়া যায়। কিন্তু মুশকিল হল ঘুম-এ কোন হোটেল নেই। থাকবেন কোথায়? স্টেশনে থেকে যেতে পারেন যদি ঘর খোলাতে পারেন। তারপর কিছুক্ষণ চুপচাপ থেকে জিজ্ঞাসা করল, এক রাত্রের জন্যে পঞ্চাশ টাকা দেবেন?

কেন? আনন্দর মনে হল লোকটা সাহায্য করতে চাইছে।

তাহলে আমার এক বন্ধুকে বলতে পারি একটা ঘর ছেড়ে দিতে। ওর ভাই কালিম্পং-এ গিয়েছে। ঘরটা খালি আছে। যদি এক বাতের জন্যে পঞ্চাশ পেয়ে যায় খারাপ কি? ওরও লাভ হল, আপনাদেরও উপকার হল!

যেন স্বর্গ পাওয়ার সম্ভাবনা শুনল আনন্দ, দেখুন না, প্লিজ, বড় উপকার হয় তাহলে।

ঘুম স্টেশন ছাড়িয়ে একটা কাঠের বাড়ির সামনে গাড়িটা দাঁড়াল। এখন এখানকার কোন বাড়িতে আলো জ্বলছে না। কল্যাণের মনে হচ্ছিল তার হাড়ের ভেতরে ঠাণ্ডা ঢুকে গেছে। সুদীপ বলল, পৃথিবীর সবচেয়ে উঁচুতে রেলওয়ে স্টেশন হল ঘুম।

জয়িতা প্রতিবাদ করল, না। কাগজে দেখেছি আর একটা স্টেশন হয়েছে কোথাও!

কল্যাণ দাঁতে শব্দ করে বলল, তোদের এখনও তর্ক করার ইচ্ছে হচ্ছে! উঃ, কি ঠাণ্ডা রে বাবা! কলকাতায় এবকম ঠাণ্ডা তিনদিন পড়লে অর্ধেক পপুলেশন কমে যেত।

সুদীপ বলল, এতেই এই! ওয়ালাং চাঙ-এ গেলে তো খাবি খাবি?

কল্যাণ উত্তর দিল না। কিন্তু ওয়ালাং চাঙ নামক জায়গাটায় তো সুদীপও কোনদিন যায়নি। কেউ চাক্ষুষ করেনি। আনন্দ বইপত্র ঘেঁটে ওটাকে আবিষ্কার করেছে। তাই আগে থেকে সেটা সম্পর্কে ভীত হয়ে লাভ কি!

একটু বাদে ড্রাইভার ফিরে এল আর একটা লোককে নিয়ে। লোকটা নির্ঘাৎ ঘুমিয়ে পড়েছিল। কাছে এসে সেলাম করে দাঁড়াল। ড্রাইভার বলল, এ হল আমার বন্ধু। ওর ঘর খালি আছে। ওর সঙ্গে কথা বলুন।

সুদীপ জিজ্ঞাসা করল, আপনার ঘরে আমরা চারজন থাকতে পারব?

লোকটা হিন্দিতে বলল, গরিবের ঘর। দোতলায় বলে খাট নেই। ওখানে ঠাণ্ডা লাগবে না। কিন্তু হুজুরেরা কাল চলে যাবেন তো?

সুদীপ বলল, কাল ভোরেই চলে যাব। শুধু রাতটা কাটাতে চাই।

লোকটা বলল, তাহলে ঠিক আছে। আমার ভাই কাল দুপুরে ফিরবে। তার আগে ঘর খালি করে দিলে চলবে। টাকাটা আগে দিতে হবে কিন্তু।

কেন?

আমার এই বন্ধুর কাছে তিরিশ টাকা ধার নিয়েছিলাম, সেটা ওকে এখনই শোধ করে দেব। আর আমি যে টাকা নিচ্ছি তা কাউকে বলবেন না।

ড্রাইভারকে চুক্তি মতন টাকা দিয়ে দিল সুদীপ। ঘরভাড়াও মিটিয়ে দিল। তারপর মালপত্র নামিয়ে লোকটাকে অনুসরণ করল। মাটিতে নেমে কল্যাণ হিহি করে কাঁপতে লাগল। ওর চাদর পেছন দিকে খুলে গিয়েছিল। আনন্দ সেটাকে ঠিক করে দিল। ড্রাইভার গাড়ি নিয়ে চলে যেতে সুদীপ বলল, ড্রাইভারটা খুব চালু। এই সুযোগে টাকাটা আদায় করে নিল। ব্যাটাকে ঘুম অবধি ভাড়া দিলে হত। সামনেই একটা কুকুর ডেকে উঠতে লোকটা শিস দিল।

দরজা খুলে লোকটা ওদের নিয়ে ভেতরে ঢুকতেই একটা কাঠের সিঁড়ি দেখা গেল। একজন মহিলা লণ্ঠন হাতে নিচের ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে আছেন। এত ঠাণ্ডাতেও তার পরনে উলের ব্লাউজ আর সায়ার ওপরে মোটা কাপড় জড়ানো। লোকটা তাদের কাঠের সিঁড়ি দিয়ে ওপরে নিয়ে এল। মাঝারি সাইজের ঘর। নিচে সতরঞ্চি পাতা। তবে সেটা পাতার ধরনে বোঝা যায় খানিক আগে সেখানে ছিল না। ঘরে একটা ছোট্ট ডিমলাইট জ্বলছে। লোকটা দাঁত বের করে হাসল, এই হল ঘর। অসুবিধে হবে নিশ্চয়ই কিন্তু এর চেয়ে ভাল কিছু নেই। আমার ভাই স্টেশনে কাজ করে।

আনন্দ বলল, ঠিক আছে, ঠিক আছে। এতেই হবে।

জয়িতা বলল, আপনাদের টয়লেটটা কোথায়?

লোকটা টয়লেট শব্দটা বুঝতে পারল না। আনন্দ ওকে সরল করা মাত্র সে নিচে নির্দেশ করল। তারপর মুখ বাড়িয়ে নেপালিতে কিছু বলতেই মহিলা সাড়া দিলেন। লোকটি বলল, ওর সঙ্গে যান, নিয়ে যাবে। আমার বউ।

জয়িতা নেমে গেলে ওরা মালপত্র রেখে আরাম করে সতরঞ্চিতে বসল। ঘরটা কাঠের কিন্তু ঠাণ্ডা কম। লোকটা ওদের দিকে তাকাল কিছুক্ষণ তারপর হাঁটুমুড়ে বসে জিজ্ঞাসা করল, টাইগার হিল যাওয়ার জন্যে কি জিপ দরকার?

আনন্দ বলল, হ্যাঁ। তবে বুঝতে পারছি না ভোর তিনটের সময় উঠে যেতে পারব কিনা। যদি সকাল ছটায় বের হই তাহলে কিছু দেখতে পাব?

লোকটা হাসল, না। তবে টাইগার হিলের দিন গিয়েছে। এখন সবাই সান্দাকফুতে সানরাইজ দেখতে যায়। কিন্তু সাহেবরা যদি ইচ্ছে করেন তাহলে কাল খুব ভোরে উঠে ওই জানালাটা খুলে দিতে পারেন। চোখের সামনে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখতে পাবেন মেঘ না থাকলে। সাহেবরা কি কিছু খাবেন?

সুদীপ বলল, না ভাই, আমরা খেয়ে এসেছি। তোমার কাছে কম্বল আছে? নইলে আবার আমাদের ব্যাগ খুলতে হবে। সে টেবিলের ওপরে রাখা কিছু শীতবস্ত্র দেখিয়ে বলল, ওগুলো আমরা ব্যবহার করতে পারি?

সাহেবরা যদি ইচ্ছে করেন তাহলে করবেন।লোকটা চোখ বন্ধ করল, সাহেবদের কি ড্রিঙ্ক করার ইচ্ছে আছে?

আনন্দ মাথা নাড়ল, আমরা ড্রিঙ্ক করি না।

কিন্তু এই ঠাণ্ডায় ড্রিঙ্ক শরীর গরম করে দেয়। আমার বউ আজকাল কিছুতেই আমাকে ওসব খেতে দেয় না। আপনারা এসেছেন বলে একটা সুযোগ পাওয়া যেত।

লোকটার ধান্দা বোঝা গেল এতক্ষণে। চেহারা দেখলে খুব সুস্থ মনে হয় না। এখন ধরা যাচ্ছে সেটা লিভারের কারণে। সুদীপ বলল, একটু ব্রান্ডি হলে মন্দ হত না। আমি দুটো বোতল এনেছি ইমার্জেন্সির জন্যে। এখন খুলব না।

এবার লোকটা জিজ্ঞাসা করল, ওই মেমসাব কোন সাহেবের বউ?

এতক্ষণে লোকটার সঙ্গ ত্যাগ করতে চাইল আনন্দ। গায়ে পড়া স্বভাবটা আর ঢাকা নেই। সুদীপ বলল, ও কারও বউ না। আমরা বন্ধু।

লোকটা হাসল লাল দাঁত দেখিয়ে, হিন্দি ফিল্মস্টাররা এরকম হয় শুনেছি।

কথাটা শুনে হো হো করে হেসে ফেলল সুদীপ। আর সেই সময় জয়িতা উঠে এল। এসে জিজ্ঞাসা করল, হাসছিস কেন?

সুদীপ বলল, তিনটে ছেলে একটা মেয়ে বন্ধু হিসেবে বাইরে এলে নাকি হিন্দি ফিল্মস্টারের মত দেখায়। ঠিক আছে ভাই। আমরা একটু ঘুমবো এবার।

লোকটার ওঠার ইচ্ছে ছিল না বোধহয়। কিন্তু নিচ থেকে মহিলার ডাক এলে সে উঠল। জয়িতা সতরঞ্চিতে বসে বলল, হরিবল এক্সপেরিয়েন্স। মানুষ যে এত নোংরা টয়লেট ব্যবহার করতে পারে তা আমার জানা ছিল না। খুব চেষ্টায় বমি করিনি। এখনও শরীর গুলোচ্ছে। নরক।

সুদীপ বলল, আমার প্রয়োজন পড়লে আমি রাস্তায় চলে যাব।

জয়িতা ঠোঁট কামড়াল, ঈশ্বর তোদের শুধু সুবিধেই দেননি, চক্ষুলজ্জা বস্তুটিও দিতে ভুলে গেছেন। মেয়েদের তো হাজারটা অসুবিধে দিয়ে পৃথিবীতে পাঠানো হয়েছে।

কল্যাণ চুপচাপ বসেছিল এতক্ষণ। হঠাৎ উঠে টেবিল থেকে একটা কম্বল এক হাতে তুলে নিয়ে শরীরে বিছিয়ে শুয়ে পড়ে বলল, বাইরে কেমন ঠাণ্ডা রে?

বাঘ পালাবে। জয়িতা জবাব দিল।

এ অঞ্চলে বাঘ আছে? সুদীপ প্রশ্নটা ছুঁড়ল।

আমি আর বের হচ্ছি না। কল্যাণ এতক্ষণে যেন উত্তাপ পেল।

আনন্দ ওর দিকে তাকিয়ে বলল, ঘুমিয়ে পড়িস না। আমি আর একবার ডিটেলস সবার সঙ্গে আললাচনা করে নিতে চাই।

তিনজোড়া চোখ এবার আনন্দর মুখের ওপর দৃষ্টি ফেলল। আনন্দ বলল, কিছুদিন আমাদের গাঢাকা দেওয়া প্রয়োজন। ভারতবর্ষের কোথাও আমরা নিরাপদ নই। ধরা পড়লে যাবজ্জীবন তো হবেই ফঁসি হওয়া বিচিত্র নয়। এতদূর পর্যন্ত পুলিশের নজর এড়িয়ে আমরা আসতে পারলাম এটা কম কথা নয় সুদীপ, দ্যাখ তো লোকটা এখনও সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে আছে কিনা!

সুদীপ উঠল। তারপর নিঃশব্দে দরজায় গিয়ে নিচের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে আবার ফিরে এল, বুঝতে পারছি না। সম্ভবত নেই। নিচটা অন্ধকার।

দরজাটা বন্ধ করে দে।

সুদীপ দরজাটা বন্ধ করে টেবিল থেকে আর একটা কম্বল তুলেই বলল, উরেব্বাস, কি দুর্গন্ধ! এই কল্যাণ, তুই ওটার তলায় শুয়ে আছিস কি করে? গন্ধ নেই?।

কল্যাণ বলল, আমার নাক বন্ধ। তাছাড়া ভিখিরির পছন্দ বলে কিছু থাকতে নেই।

সুদীপ কম্বলটা যেখানে ছিল সেখানেই রেখে দিয়ে ফিরে এসে সিগারেট ধরাল। আনন্দ বলল, কাল ভোরে আমরা এখান থেকে বের হব। ঘুম থেকে একটা রাস্তা চলে গেছে—দাঁড়া। আনন্দ ব্যাগ খুলে একটা ম্যাপ বের করল। ম্যাপটা মাঝখানে রেখে সে বলল, রাস্তাটা সুকিয়া পোকরি মানেভঞ্জন বলে দুটো জায়গা হয়ে চলে গেছে রিম্বিক রামাম। রামামে একটা হাইড্রো ইলেকট্রিকাল প্রজেক্ট হচ্ছে। এই অবধি বাস যায়। ফার্স্ট বাস আমরা ঘুম থেকে ধবতে পারি সকাল আটটায়। কিন্তু অতক্ষণ আমরা অপেক্ষা করব না। আমাদের একটা জিপ জোগাড় করতেই হবে। আমরা নামব মানেভঞ্জনে, যদি জিপ তার বেশি যেতে না চায়। আগে ওখান থেকেই ট্রেকাররা সান্দাকফু বেড়াতে যেত। এখন শুনছি জিপ পৌঁছে যাচ্ছে সান্দাকফু পর্যন্ত। কিন্তু তার পরে নয়। ফালুট যেতে হলে হেঁটে যেতে হয় সবাইকে। ম্যাপ বলছে ফালুটের কাছেই নেপাল বর্ডার। সেটা পার হলেই যে গ্রাম তার নাম চ্যাঙ্গথাপু। ওটা ফালুট থেকে মাত্র সাড়ে তিন কিলোমিটার দূরে। অনেক সময় ট্যুরিস্টরা ওই গ্রামে বেড়াতে যায়। আমরা সেটা ছাড়িয়ে আরও ভেতরে ঢুকব। আপাতত আমার টার্গেট ওয়ালাংচুঙ। আরও সাড়ে ছয় কিলোমিটার ওপরে। পথ দুর্গম। কোন সভ্য মানুষ যায় না। উনিশশো সাতান্নতে একজন অস্ট্রেলিয়ান ট্রেক করে ওখানে পৌঁছেছিলেন।

সুদীপ প্রশ্ন করল, পুলিশ স্টেশন?

আনন্দ ম্যাপটা ভাল করে আর একবার দেখল। যতরকম খবর সে সংগ্রহ করতে পেরেছিল সেগুলো বিভিন্ন চিহ্নের মাধ্যমে ম্যাপে লিখে রেখেছিল। দেখে টেখে সে বলল, সুখিয়া পোখরিতে আছে। মানেভঞ্জনে আছে কিনা জানি না। তারপর বিস্তৃত অঞ্চলে কোন থানা নেই। সেই ফালুটে একটা পুলিশ ক্যাম্প আছে। এই পুলিশরা মাঝে মাঝে চ্যাঙ্গথাপুতে বেড়াতে যেতে পারে কিন্তু তার ওপাশে কখনই নয়।

জয়িতা ম্যাপটা দেখছিল, ফালুট কি ওয়েস্ট বেঙ্গলের মধ্যে?

আনন্দ বলল, হ্যাঁ। মজা হল হিমালয়ের এই দিকটা এত নিরীহ যে ভারত নেপাল কেউ বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্সকে এই অঞ্চলে নিয়মিত রাখেনি। যাতায়াতের পথ নেই, জনতি নেই, বছরে আট মাস বরফ পড়ে থাকে, অতএব আক্রমণেরও ভয় নেই। এইটে আমাদের সাহায্য করবে। এখন তোদের আমি শেষবার বলতে চাই, একবার আমরা ওদিকে পা বাড়ালে অনেক কষ্টকে ফেস করতে তৈরি থাকতে হবে। আমরা শুধু একটা নিরাপদ লুকোনোর জায়গা চাইছি। নেপাল পুলিশের চিহ্ন নেই ওখানে। ভারতীয় পুলিশ বর্ডার ক্রস করে ওখানে যাবে না। কিন্তু আমাদের প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করে ওখানে বেঁচে থাকতে হবে। এইটেতে যার আপত্তি থাকে সে বলতে পারে।

কল্যাণ চুপচাপ শুয়েছিল, আপত্তি থাকলে কি করা হবে?

আনন্দ একটু থমকাল, সে থেকে যেতে পারে। যেখানে ইচ্ছে সেখানে যাওয়ার স্বাধীনতা তার থাকল। কিন্তু ধরা পড়ার পর আমাদের অস্তিত্ব জানাতে সে যেন কাল থেকে অন্তত পাঁচটা দিন সময় নেয়।

হঠাৎ সব চুপচাপ হয়ে গেল। কাঠের দেওয়ালে বাইরের বাতাস অদ্ভুত শব্দ তুলছে। সমস্ত পৃথিবীটা যেন আচমকা উধাও হয়ে গেল। প্রথমে কথা বলল জয়িতা, এসব কথা উঠছে কেন তাই আমি বুঝতে পারছি না। তোরা কি যেতে চাইছিস না? প্রশ্নটা সে সুদীপের দিকে তাকিয়ে করল। সুদীপ কাঁধ ঝাকাতে সে দৃষ্টিটা কল্যাণের দিকে ফেরাল।

কয়েক মুহূর্ত ইতস্তত করে কল্যাণ বলল, প্রশ্ন করা মানেই যদি আপত্তি জানানো হয় তাহলে আমি আর কি বলব। কথা হল, বলছিস ওখানে আটমাস বরফ পড়ে। আমরা তাহলে থাকব কোথায়?

দ্যাটস দ্য প্রব্লেম। আনন্দ হাসল, হোটেল কিংবা ধর্মশালা নেই ওয়ালাংচু-এ। একটা ছোট গ্রাম আর তার প্রাগৈতিহাসিক অধিবাসী যাদের সংখ্যা বেশি নয়। ওরা নিশ্চয়ই ঘর বেঁধে থাকে। আমি তেমন বিস্তারিত জানি না। তবে গিয়ে পড়লে কি আস্তানা জুটে যাবে না! ও নিয়ে আমি ভাবি না।

সুদীপ জিজ্ঞাসা করল, ওয়ালাংচুঙ-এর উচ্চতা কত?

তেরো হাজার। মাপ দেখে সঠিক উচ্চতা জানাল আনন্দ।

শব্দদুটো শোনামাত্র তিনটে মুখ একসঙ্গে অবাক-হওয়া-আওয়াজ উচ্চারণ করল।

কল্যাণ শেষ প্রশ্নটা ছুঁড়ল, আমরা অতদূরে পৌঁছাতে পারব তো?

জয়িতা অবাক গলায় বলল, মানে?

পাহাড়ে ওঠার জন্য ট্রেনিং দরকার, তা আমাদের নেই। তাছাড়া তেরো হাজার ফুট উঁচুতে যে ঠাণ্ডা তা সহ্য করার মত—

গরমজামা আমাদের আছে। আনন্দ বলল, আমরা ক্লাইম্বিং-এ যাচ্ছি না। এটা জাস্ট ট্রেকিং। হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছে যাওয়া। উঁচু নিচু পথ পড়বে এই যা। সান্দাকফু-ফালুট পর্যন্ত মেয়েরা যাচ্ছে হেঁটে কোনরকম ট্রেনিং ছাড়া। ভয় পাওয়ার কিছু নেই কল্যাণ। আপাতত এছাড়া কোন উপায় নেই।

আমি ভয় পাচ্ছি তোকে কে বলল! বিস্তারিত জানতে চাওয়া মানে ভয় পাওয়া? তাহলে তো কোন কথাই বলা যাবে না। সে একটু ক্ষুন্ন হয়ে চোখ বন্ধ করল।

আনন্দ ব্যাপারটাকে উপেক্ষা করল, যাঃ, এগারোটা বেজে গেছে। রেডিও স্টেশন বন্ধ। আজ খবরটা শোনা হল না। জয়িতা, এখন থেকে তোর ওপর দায়িত্ব, প্রত্যেকটা নিউজ তুই শুনে আমাদের জানাবি। এবার শুয়ে পড় সবাই। কাল ভোরে দেখা যাক কপালে কি আছে! আনন্দ ব্যাগের দিকে হাত বাড়াল, এটা খুলতে ইচ্ছে করছে না। ওই কম্বলগুলোয় কি প্রচণ্ড দুর্গন্ধ?।

দারুণ। সুদীপ শব্দটা উচ্চারণ করে নিজের ব্যাগে হাত দিল। রাত যত বাড়ছে ঘুম-এ হাওয়ারা প্রবল হচ্ছে। আর সেই সঙ্গে ঠাণ্ডা আরও ঘন হয়ে চারপাশে ঘিরে ধরছে।

 

ঘুম থেকে টাইগার হিলে যাওয়ার শাটল জিপ পাওয়া যাচ্ছিল কিন্তু সুখিয়া পোখরি কিংবা মানেভঞ্জনের জিপ যোগাড় করতে ওদের সাতটা বেজে গেল। মানেভঞ্জন পৌঁছে দিয়ে চলে আসবে। সুদীপ ড্রাইভারকে রাজি করালেও আনন্দ খুশি হচ্ছিল না। মানেভঞ্জনের বাস পাওয়া যাবে আটটা নাগাদ। শুধু ওই অবধি পৌঁছে কি লাভ হবে!

বাস স্ট্যান্ড এলাকাটা এমন যে কোন ড্রাইভারকে অনুরোধ করলে আর পাঁচজনে তা জেনে নিতে দেরি করে না। সেই সাতসকালে রীতিমত ভিড় জমে গেল তাদের ঘিরে। প্রত্যেকেই সাহায্য করতে চায়। কিন্তু সেই সঙ্গে দাম উঠছে।

বিরক্ত হয়ে শেষ পর্যন্ত সুদীপের ঠিক করা জিপেই উঠল ওরা। এখন ঘুমে ঘন কুয়াশা। আকাশের গায়ে একটা ঘোলাটে পর্দা টাঙানো। নির্ঘাৎ আজ যারা টাইগার হিলে যাবে তারা আফসোস করবে। রোদের চিহ্ন নেই, সূর্য উঠেছে কিনা বোঝা যাচ্ছে না। এই ড্রাইভারও একা নয়। তার সঙ্গী ছোকরাটা দেখতে হিন্দি ফিল্মের ভিলেনের মত। চালচলনও তাই। পোশাক দেখে অবাক হতে হয়। ভাড়াটে জিপ ড্রাইভারের হেলপার, কিন্তু পোশাক দেখলে তা মালুম হয় না।

ঘুম থেকে বের হবার মুখে গাড়িটা দাঁড়িয়ে পড়ল। ড্রাইভার বিনীত মুখে জানাল যে সকাল থেকে এক গ্লাসও চা খায়নি, সাহেবরা যদি খাওয়ান তো বড় ভাল হয়। আজ ঘুম ভাঙার পর তৈরি হবার সময় একটি আশাতীত ঘটনা ঘটেছিল। একটা থালায় চার গ্লাস ধূমায়িত চা নিয়ে প্রবেশ করেছিল লোকটা। সঙ্গে সঙ্গে তাকে খুব ভাল লেগে গিয়েছিল সবায়ের। মুহূর্তেই গতরাতের বিরক্তিটা উধাও হয়ে গিয়েছিল। অনেক অনুরোধ সত্ত্বেও দাম নিতে চায়নি।

সুদীপ বলল, মন্দ হয় না আর এক গ্লাস পেলে। ঠিক আছে চা লাগাতে বল।

ওরা দুজন নেমে গেলে আনন্দ বলল, যত তাড়াতাড়ি সুখিয়া পোখরি পেরিয়ে যেতে পারি তত মঙ্গল। চায়ের জন্য খামোক সময় নষ্ট করার কোন মানে হয় না।

সুদীপ মাথা নাড়ল, লোক দুটোকে হাত করতেই হবে। আমার ওপর ব্যাপারটা ছেড়ে দে না। ভিড়ের মধ্যে কথা বলার সময় ও একবার চোখে ইশারা করেছে। মনে হয় অন্য কোন ধান্দা আছে। দেখা যাক।

এই রকম ভোরবেলায় এমন স্যাতসেঁতে প্রকৃতি ভাল লাগার কথা নয়। কিন্তু জয়িতার মন্দ লাগছিল। বিদেশী উপন্যাসের পটভূমিগুলো মনে পড়ছিল ওর। ঠাণ্ডা খুব কিন্তু বাচ্চা বাচ্চা মেয়েগুলো হালকা সোয়েটার পরে স্বচ্ছন্দে কাজকর্ম করছে। কুয়াশায় ভিজে গেছে রাস্তা, বাড়ির চাল এমন কি আকাশটাও। হাতে গরম চায়ের গ্লাস পেয়ে বেশ আরাম লাগল ওর। এখন কল্যাণ আর জয়িতা সামনে বসেছে। ড্রাইভাবের সঙ্গী আনন্দদের সঙ্গে পেছনে। বের হবার আগে সুদীপ আর আনন্দ অনেক কসরৎ করে কল্যাণকে পুলওভার পরাতে পেরেছে। প্লাস্টার-করা হাতটাকে বাইরে রেখেছে সোয়েটারের। তাই সেই হাতাটা ঝুলঝুল করছে। কিন্তু এতে অনেক বেশি আরাম বোধ করছে কল্যাণ। প্রত্যেকের পায়ে পাহাড়ে ওঠার কেডস। বের হবার সময় কল্যাণ মন্তব্য করেছিল, ঠিকঠাক পোশাক থাকলে ঠাণ্ডা কোন ব্যাপারই নয়।

সুদীপ হেসেছিল, এই তত বাঙালি জেগেছে, আর কোন ভয় নেই।

রাস্তাটা চমৎকার। ঘুম পেছনে পড়ে রইল। এই সকালেও কুয়াশার মধ্যে যদিও মাঝেমাঝে ফগলাইট জ্বালতে হচ্ছে তবু প্রকৃতির চটপট পরিবর্তনটা চোখে পড়ছিল। গাছগুলোর চেহারা অনেক ঝকঝকে। পথের ধারে বেশ কিছু ফুল ফুটে আছে। হঠাৎ জয়িতা চেঁচিয়ে উঠল, ওই. দ্যাখ লেডি স্লিপার।

কল্যাণ অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করল, লেডি স্লিপার? মানে?

একটা ফুলের নাম। ন্যাশনাল জিওগ্রাফিতে ছবি দেখেছিলাম।

কল্যাণ বুঝতে পারছিল না ঠিক কোন্ ফুলটা লেডি স্লিপার। তার মনে হল ষই ভাল নম্বর পাক না কেন জয়িতা তার থেকে অনেক বেশি জানে। ন্যাশনাল জিওগ্রাফি সে কখনও হাতে নিয়ে দেখার সুযোগ পায়নি।

ড্রাইভার খুশীমুখে গাড়ি চালাচ্ছিল। এই রকম রাস্তায় গাড়ি চালিয়ে সুখ আছে। বাঁকগুলো খুব আচমকা নয়। শিস থামিয়ে সে জিজ্ঞাসা করল, আপনারা সান্দাকফু হেঁটে যাবেন?

সুদীপ উত্তর দিল, কি আর করা যাবে।

ড্রাইভার বলল, কিছুদিন আগে পর্যন্ত হেঁটে যেতে হত। ট্রেকিং-এর একটা আলাদা মজা আছে। এখন রাস্তা হয়ে যাওয়ায় সান্দাকফু পর্যন্ত বেশির ভাগ ট্যুরিস্ট জিপে যায়। সময় কম লাগে।

ফালুট? সুদীপ ঘনিষ্ঠ হবার চেষ্টা করল।

না। ফালুটে যাওয়ার গাড়ির রাস্তা হয়নি।

কিছুক্ষণ সবাই চুপচাপ। গাড়ি মোটামুটি একই লেভেলে যাচ্ছে। এখনও পথে গাড়ি চলাচলের সময় হয়নি বোধ হয়। কারণ কাউকে সাইড দিতে হচ্ছে না, ওভারটেকের প্রশ্ন নেই। জয়িতা লক্ষ্য করল আকাশ একটু একটু করে পরিষ্কার হচ্ছে। বিরাট বিরাট পাহাড়গুলো নীল চাদর মুড়ি দিয়ে গায়ে গা লাগিয়ে বসে আছে। ধ্যানগম্ভীর শব্দটার মানে বোঝা যায় ওদের দিকে তাকালে। সুদীপ পেছন থেকে জিজ্ঞাসা করল, আপনার এই গাড়ি বোধ হয় সান্দাকফু পর্যন্ত যেতে পারে না। খুব উঁচু?

ড্রাইভার হাসল, কে বলেছে যেতে পারে না। আমি তো গত বুধবার ঘুরে এলাম। ছয়শ টাকা দিয়ে দেবেন, পৌঁছে দিচ্ছি!

ছ’শ? কল্যাণ আঁতকে উঠল।

ফেরার সময় খালি আসতে হবে। আপনারা তো ওখানে একদিন থেকে ফালুটে যাবেন। অতদিন তো থাকব না। তাছাড়া রাস্তা খুব খারাপ। টংলু থেকে বিকেভঞ্জন যাওয়ার পথটা দেখলে একথা বলবেন না।

কল্যাণ তবু বলল, একটু কম করা যায় না?

ঠিক আছে, পঞ্চাশ কম দেবেন। তখন বাস স্ট্যান্ডে বলিনি কেন জানেন?এই রেট শুনলে সবাই খেপে যেত। তাছাড়া বুধবারে গিয়েছি আবার আজ, অন্য ড্রাইভারকে কামাই কবার সুযোগ দেওয়াই নিয়ম। ড্রাইভার হাসল।

সুদীপ বলল, ঠিক আছে। যা বললেন তাই হবে। কতক্ষণ লাগবে সান্দাকফু?

ড্রাইভার দূরে পাহাড়ের গায়ে একটা জনপদ দেখিয়ে বলল, ওই তো সুখিয়া পোখরি।

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *