1 of 2

০৩. সুদীপকে ছেড়ে দেবার পর

সুদীপকে ছেড়ে দেবার পর আনন্দ কফি হাউসে ঢুকেছিল।

রাত বাড়লে অল্পবয়সী ছেলেরা যারা প্রেসিডেন্সি বা য়ুনিভার্সিটিতে পড়ে তারা কফি হাউসে থাকে না। এই সময়টায় বয়স্ক মানুষের ভিড়। হৈ-চৈ হয় না। কেমন একটা গম্ভীর-গম্ভীর ভাব। শুধু রাতের আইন-কলেজের কিছু ছাত্রছাত্রী জমিয়ে আড্ডা মারে এক দিকে। আনন্দ চারপাশে একবার তাকাতেই সুরথদাকে দেখতে পেল। সুরথদা ওর দিকে তাকিয়ে হাসছেন। সুরথদার সঙ্গে যে দাড়িওয়ালা ভদ্রলোক বসেছিলেন তাকে আনন্দ চেনে না। সুরথদা ইঙ্গিতে তাকে বসতে বলায় আনন্দ চেয়ার টানল।

দাড়িওয়ালা ভদ্রলোক তখন বলছিলেন, চারধারে আপাত শান্তি-শান্তি ভাব কিন্তু এই ব্যাপারটাই আমার কাছে খারাপ লাগছে। খুব খারাপ ব্যাপার।

সুরথদা বললেন, খারাপ কেন?

আরে ভাই, পাড়ার মাস্তানরা উধাও, কোন পরিটিক্যাল জঙ্গী অ্যাক্টিভিটিস নেই, কলকাতার মানুষ তো ভেবেই নিচ্ছে তারা পরম শান্তিতে বাস করছে। বাট এটা তো সত্যি নয়!

কোনটে সত্যি?

সেদিন মনুমেন্টের তলায় মিটিং হয়ে গেল। অর্গানাইজেশন কাজ শুরু করেছে। আরে আমার বাড়িতেও লিফলেট দিয়ে গেছে। খুব থ্রিলিং।

থ্রিলিং?

খুব। আমার মশাই একটা হবি আছে। আমি সব দলের মিটিং অ্যাটেন্ড করি। এদেরটাও করেছিলাম। কিন্তু পাবলিক যখন শান্তিতে মজে আছে তখন এদের কথা কি কানে ঢুকবে? খুব অশান্তি, চারপাশে ধুন্ধুমার কাণ্ড, প্রাণ অতিষ্ঠ হলেই পাবলিক পরিবর্তন চায় মশাই। দাড়িওয়ালা ভদ্রলোক কফিতে চুমুক দিলেন। তারপর বেয়ারাকে ডেকে একটি কফির দাম মিটিয়ে উঠে দাঁড়ালেন, যাক, অনেকক্ষণ সময় কাটানো গেল। আপনি একা ছিলেন, আমিও, এখন আপনি দোকা হলেন, আমি যাই। নমস্কার।

ভদ্রলোক চলে গেলে আনন্দ জিজ্ঞাসা করল, উনি কে সুরথদা?

চিনি না। তোমার জন্যে বসেছিলাম উনি এলেন। সুরথদা বললেন, তুমি নিশ্চয়ই ভাবছ আমি কেন উটকো লোকের সঙ্গে রাজনীতি নিয়ে কথা বলছি? লোকটা তো পুলিশের কেউ হতে পারে। আমি ইচ্ছে করেই বলেছি। আমি যে বুদ্ধিমান নই, রাজনীতি নিয়ে তেমন আগ্রহ নেই, এটা লোকটাকে বোঝানোর দরকার ছিল। যাক, ছেড়ে দাও এসব কথা। তোমার খবর বল, গিয়েছিলে?

হ্যাঁ। কিন্তু এদিকে দুটো কাণ্ড ঘটেছে। আমার হোস্টেলে কেউ এসেছিল খোঁজ-খবর নিতে। আমি কখন ফিরি, কার কার সঙ্গে মিশি এইসব ব্যাপার।

দ্বিতীয়টা?

আজ মিটিং-এ আমি মাথা ঠাণ্ডা রাখতে পারিনি।

সুরথদা চুপ করে থাকলেন কিছুক্ষণ। তারপর বললেন, কফি খাবে?

আনন্দ মাথা নাড়ল, না।

সুরথদা কাউন্টারের দিকে তাকিয়ে বললেন, অবশ্য খেতে চাইলে খাওয়াতে পারতাম না হয়তো। ওরা কফি হাউস আজকের মত বন্ধ করছে। চল বাইরে বেরিয়ে কথা বলি।

কলেজ স্ট্রিটে দাঁড়িয়ে সুরথদা বললেন, প্রথমটা নিয়ে ভাবনার কোন কারণ নেই। যে কেউ তোমার খোঁজে আসতে পারে। তোমার দেশের লোকজন খবর নিতে পারেন, তুমি জানো না। কিন্তু মিটিং-এ মাথা গরম করার কোন মানে নেই। আমি তোমাকে বলেছি বিপদ ডেকে আনবে না। আমোক মানুষকে সামনাসামনি চটাবে না। মতের অমিল হলে চেপে যাবে, পরে নিজের মত করে চাপানো সিদ্ধান্তটা কাজে লাগাবে।

আনন্দ এক-চোখো ট্রামটাকে ছুটে আসতে দেখল। ঝড়ের মত শব্দ তুলে ওটা পার হয়ে গেলে সে বলল, কিন্তু আমার সঙ্গে ওঁদের মতের কোন মিল হচ্ছে না। ওঁরা যে পথে চলতে চাইছেন সেটা পথই নয়।

সুরথদা বললেন, দ্যাখো আনন্দ, পঁচাত্তর পর্যন্ত আমি জেলে ছিলাম। বাঁ চোখটায় কোনদিন দেখতে পাব না। সুতরাং আমি মূল্য দিয়েছি। পঁয়ষট্টি থেকে পঁচাত্তর এই এগারোটা বছর আমার জীবনে খুবই মূল্যবান সময়। এই অভিজ্ঞতার কোন দাম নেই কি?

আনন্দ একটু অসহিষ্ণু গলায় বলল, সুরথদা, আমি সবই বুঝতে পারছি। কিন্তু যেভাবে দলের সবাই ভাবছেন সেটাকে আমার কার্যকরী বলে মনে হচ্ছে না।

সুরথ হাসলেন, তুমি কি ভাবছ আমি জানি না, তবে তোমার বয়স অল্প, একটা কথা খুব সত্যি জেনো, হঠকারিতা থেকে কোন ফল পাওয়া যায় না। আমরাও পাইনি।

সুরথদার দিকে তাকাল আনন্দ। উত্তর কলকাতার একটা স্কুলে পড়ান সুরথদা। ঠাণ্ডা প্রকৃতির মানুষ। বিয়ে-থা করেননি। সে জিজ্ঞাসা করল, আপনি কি মনে করেন ওরা যেভাবে এগুচ্ছে তাতে শেষপর্যন্ত সফল হওয়া যাবে?

আশা করতে দোষ কি?

আমি ভরসা পাচ্ছি না। শুধু বিপক্ষকে গালাগাল করলেই সাফল্য পাওয়া যায় না। জনসাধারণকে কাজের মাধ্যমে বুঝিয়ে দিতে হয় আমরা তাদের উপকার করতে চাই। এটা না করলে আমরা কখনও তাদের সঙ্গে পাব না।

সুরথদা আনন্দর কাঁধে হাত রাখলেন, তোমার হোস্টেলে কেউ খোঁজখবর করতে গিয়েছিল শুনেই তুমি নার্ভাস হচ্ছ, অথচ মাসের পর মাস পুলিশের ভয়ে আমরা কি না করেছি। সেসব গল্প তো তুমি জানো। আর শুধু পুলিশ নয়, রাজনৈতিক দলের গুণ্ডারাও আমাদের পেছনে পাইপগান নিয়ে তাড়া করেছিল। আসলে ব্যাপারটা তো ছেলেখেলা নয়। সমস্ত কিছু খতিয়ে দেখতে হবে। তুমি কি করতে চাইছ এইটে পরিষ্কার হওয়া দরকার। শুধু আবেগ নয়, রাজনৈতিক শিক্ষা সবার আগে প্রয়োজন। তুমি একটু আগে জনসাধারণকে কাছে পাওয়ার কথা বলছিলে না? তোমাকে একটা উদাহরণ দিচ্ছি। ধরো, একটা দল ঠিক করল পশ্চিমবাংলার মানুষ সুখে নেই, তাদের সুখী করতে হবে। তাদের রাজনৈতিক সামাজিক এবং অর্থনৈতিক স্বাধীনতা দিতে হবে, নিরাপত্তা দিতে হবে। প্রতিটি মানুষকে মানুষের মত বাঁচার ব্যবস্থা করে দিতে হবে। বিপ্লবের ফলশ্রুতিতে যে পরিবর্তিত অবস্থার কথা আমরা ভাবি তাই সৃষ্টি করতে হবে। কিন্তু এই দেশে এখনই সশস্ত্র বিপ্লব সম্ভব নয়। সি পি এম-এর সাংগঠনিক ক্ষমতা এবং কংগ্রসের শক্তির বেড়াজাল থেকে বেরিয়ে এসে দেশের মানুষ বিপ্লবে ঝাঁপিয়ে পড়বে না। নকশালরা সে চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছে। অথচ এই দল নিশ্চেষ্ট হয়ে বসেও থাকতে চায় না। তখন তারা একটি অভিনব পরিকল্পনা নিল। নির্বাচনের পাঁচ বছর আগে ওরা প্রতিটি বিধানসভা কেন্দ্রের জন্য একজন প্রার্থী নির্বাচন করল। তাকে নির্দেশ দেওয়া হল এই পাঁচ বছর সে তার এলাকার মানুষের প্রতিটি সমস্যার পাশে দাঁড়াবে। নিজের ব্যবহার এবং কাজের মাধ্যমে জনসাধারণের ভালবাসা অর্জন করবে। স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে সে মানুষের সেবায় লাগবে। পাঁচ বছর ধীরে ধীরে সে এইভাবে মানুষের আস্থা দখল করবে। তারপর নির্বাচন এলে সে যখন প্রার্থী হয়ে সামনে আসবে তখন মানুষ তাকে ভালবেসেই ভোট দেবে। এই পাঁচ বছরে তারা জেনে যাবেই প্রতিটি বিধানসভা কেন্দ্রে এমনি একটি মানুষ মানুষের সেবা করে যাচ্ছে। আর সেই মানুষের দল সামগ্রিকভাবে চাইছে দেশের পটপরিবর্তন। এইবার আনন্দ, তুমিই বল, নির্বাচনের ফল কি হবে? অনেকক্ষণ একটানা কথা বলে একটু ক্লান্ত সুরথদা আগ্রহের সঙ্গে তাকালেন।

আনন্দ বুঝতে পারছিল না কি উত্তর হওয়া উচিত। তবে এটা ঠিক এই দলের সভ্যদের কেউ কেউ জিততে পারেন কিন্তু সবাই জিতবেন বা দল নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করবে এই আশা করা অন্যায়। সে এই কথাই বলল।

সুরথদা বললেন, কেন? পাঁচ বছরের সেবার কোন দাম দেবে না জনসাধারণ?

আনন্দ বলল, আসলে এখন প্রত্যেক মানুষ একটা অভ্যাসের মধ্যে এসে গিয়েছে। হয় সি পি এম নয় কংগ্রেস, ভোট দেবার সময় এই দুটোই ওদের লক্ষ্য হয়। অচেনা কোনও দলের প্রার্থী এককভাবে কিছু করছে এবং সেটা যতই ভাল কাজ হোক না কেন, ভোট দেবার সময় সেটা বোধহয় তারা ভাববে না।

সুরথদা বললেন, কথাটা অর্ধসত্য। নোন ডেভিল ইজ বেটার দ্যান আননোন! ঠিক আছে। তবে এদেশের মানুষ নির্বাচনের সময় আবেগের দ্বারাই পরিচালিত হয়ে থাকে। মিসেস গান্ধীকে যখন হত্যা করা হল তখন কংগ্রেস যদি রাজীব গান্ধীর বদলে প্রণব মুখার্জিকে প্রধানমন্ত্রী করে নির্বাচন চাইত তাহলে হেরে ভূত হয়ে যেত। আসলে দেশের মানুষ এখনও দেখতে চায় যে দলকে তারা ভোট দিচ্ছে তাদের নেতা কে? তার প্রতি আস্থা রাখা যায় কিনা। জ্যোতিবাবু যদ্দিন সি পি এম-এর নেতা থাকবেন তদ্দিন পশ্চিমবঙ্গে কংগ্রেস ক্ষমতায় আসবে না। পাঁচ বছর কাজ করেও ওই দল একটিও আসন পাবে না যদি তাদের নেতা জনসাধারণের শ্রদ্ধাভাজন না হন। নকশাল আন্দোলনে কি প্রকৃত অর্থে কোন নেতা ছিলেন? চারু মজুমদার কিংবা কানু সান্যাল কি জনসাধারণের কাছে গ্রহণীয় নেতা, সেই সময়ে? এখনও ব্যক্তিপূজার মানসিকতা এই দেশ থেকে দূর হয়নি। তাই তুমি যা ভাবছ তা আমাদের সেই হঠকারী ভাবনার রূপান্তর না হয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত কি হল?

আমরা অ্যাকশনে নামছি।

তুমি সুদীপ কল্যাণ?

আর জয়িতা!

হোয়াই জয়িতা?

ও নিজেকে যোগ্য মনে করে। তাছাড়া আমরাও ওকে মেয়ে বলে মনে করি না।

কিন্তু আফটার অল সে মেয়ে!

হতে পারে। কিন্তু তার ব্যবহার এবং আচরণে মেয়েলিপনা নেই।

ব্যাপারটা আর কে কে জানে?

আজকে যে তিনজনের সঙ্গে কথা বলেছি তারা আর আপনি।

যদি ধরা পড়?

পড়ব। অন্তত কাগজে খবরটা বের হবে। চারটে তরুণ ছেলেমেয়ে একটা পরিকল্পিত অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে গিয়েছিল। হয়তো এই ঘটনা আমাদের মত অনেককে উদ্বুদ্ধ করতে পারে। সুরথদা, আমরা পুলিশের গলা কাটতে যাচ্ছি না, মূর্তি ভাঙার বোকামিও করব না। আসল কাজ করতে না পারার অক্ষমতায় বোকার মত নকল বিদ্রোহ-বিদ্রোহ ভাব সৃষ্টি করব না। আমরা সেইসব জায়গায় আঘাত করতে চাই যা মানুষের ভাল ভাবে বেঁচে থাকার পথটাকে আইনের ফাঁকির সুযোগ নিয়ে নোংরা করে দিতে চাইছে। উই উইল ড়ু ইট ওয়ান আফটার অ্যানাদার। খুব নির্লিপ্তর মত কথাগুলো বলল আনন্দ।

সুরথদা কিছুক্ষণ ওর কঠিন মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলেন। তারপর নিচু গলায় বললেন, ঠিক আছে। আমি সেন্ট্রাল কমিটির সঙ্গে কথা বলব। তোমাদের মত ব্রাইট ছেলেকে আমরা পেয়েছি, স্পষ্টই বলছি আমরা তোমাদের হারাতে চাই না।

ঠিক এই সময় একটি পুলিশের ভ্যান বউবাজারের দিক দিয়ে ছুটে আসছিল। ভ্যানটা এগিয়ে যেতে যেতে থমকে দাঁড়াল। সুরথদা বললেন, একসময় এই বস্তুটিকে দেখলে আমার হৃদকম্প হত। ইনি কি উদ্দেশ্যে এমন আচমকা দাঁড়ালেন?

ভ্যানটার দিকে তাকিয়ে আনন্দর অস্বস্তি হচ্ছিল। কোন কারণ নেই, তবু। ভ্যানের দরজা খুলে একজন পুলিশ অফিসার নেমেই চিৎকার করলেন, কি রে সুরথ

তারপর ট্রাম রাস্তাটা পেরিয়ে সামনে এসে দাঁড়িয়ে মাথা থেকে টুপিটা খুললেন ভদ্রলোক, কি ব্যাপার, চিনতে পারছিস না?

ও তুই! কি খবর? সুরথদাকে ঠিক স্বচ্ছন্দ বলে মনে হল না।

চলছে গুরু। পুলিশের চাকরি করলে যেমন চলে আর কি! ওঃ, কতদিন বাদে তোর সঙ্গে দেখা হল। প্রায় পনেরো বছর, তাই না? রাউন্ডে ওয়েছিলাম, হঠাৎ তোর দিকে নজর পড়ল। মনে হল এ মালকে আমি চিনি। দ্যাখ ভুল করিনি।

না, ভুল করিসনি।

সেদিন রাইটার্সে সৌমিত্রর সঙ্গে দেখা হল। আরে ইকনমিক্স পড়ত, মনে নেই? ও শালা এখন সেক্রেটারি হয়ে গেছে। আমাকে চিনতে পরেও ভাল করে কথা বলল না। মানতেই হবে, আফটার অল আমি একটা সাব-ইন্সপেক্টর, কলেজের বন্ধুরা কেউ কাউকে মনে রাখবে কেন? আমার সঙ্গে কথা বলতে তোর আবার অস্বস্তি হচ্ছে না তো? হো হো করে হাসলেন ভদ্রলোক।

না না। তুই পুলিশে চাকরি করছিস পেটের প্রয়োজনে।

ঠিক তাই। কিন্তু তুই বোধহয় একটা কথা জানিস না।

কি ব্যাপার?

সেভেনটি ওয়ানে আমি বউবাজার থানায় ছিলাম। একদিন রাত এগারোটায় হুকুম এল ডেঞ্জারাস নক্সালাইট নেতা লুকিয়ে আছে আমাদের এলাকায়। ইমিডিয়েটলি তাকে অ্যারেস্ট করতে হবে। গাড়ি নিয়ে ছুটলাম। সাফিসিয়েন্ট সেপাই ছিল সঙ্গে। নম্বর মিলিয়ে বাড়িটার সামনে গিয়ে হকচকিয়ে গেলাম। মেলোমশাইকে জিজ্ঞেস করিস আমি পনের মিনিট সময় ফালতু নষ্ট করেছিলাম। উল্টোপাল্টা প্রশ্ন করে মেসোমশাইকে আটকে রেখে বাড়ির সবাইকে জানিয়ে দিয়েছিলাম কেন এসেছি। পনেরো মিনিট পরে যখন অ্যাকশন নিলাম তখন তুই হাওয়া হয়ে গেছিস। ভদ্রলোক একটা সিগারেট ধরালেন, ওপরওয়ালা জানলে আমার চাকরি চলে যেত। কিন্তু আমি কি করে কলেজের বন্ধুকে সুযোগ না দিয়ে অ্যারেস্ট করি ব?

ধন্যবাদ। সুরথদা যেন ব্যাপারটা আনন্দের সঙ্গে নিলেন না, তুই নিজের হাতে কটা মানুষ মেরেছিস এতকাল?

হিসেব করিনি। কেউ যখন আমাকে খুন করতে চেয়েছে তাকে মেরেই আমাকে বাঁচতে হয়েছে। সুভাষচন্দ্র বোস কত মানুষকে খুন করেছেন?

মানে? আনন্দ এবার প্রশ্ন না করে পারল না।

আজাদ হিন্দ ফৌজের সর্বাধিনায়ক ছিলেন সুভাষ বসু।তারই হুকুমে ফৌজ যুদ্ধ করেছে ব্রিটিশদের সঙ্গে। অতএব প্রতিটি শত্রুর মৃত্যুর পেছনে সুভাষ বসুর নিশ্চয়ই দায়িত্ব ছিল। সুভাষ বসকে কি খুনী বলবে?

সুরথদা বললেন, চমৎকার যুক্তি। তবে তুই যা বললি তাই যদি করে থাকিস তাহলে একটা ধন্যবাদ পাওনা ছিল, দিলাম। অবশ্য তোর জাতভাইরা আমার চোখটাকে নষ্ট করেছে এটাও সত্যি ঘটনা।

হঠাৎ কথাবার্তা থেমে গেল। আনন্দ বুঝতে পারছিল যে-আবেগ নিয়ে ভদ্রলোক ভ্যান থেকে নেমে এসেছিলেন সেটা এখন উধাও হয়ে গেছে। সুরথদার কাটা কাটা কথাই এই আবহাওয়াটা তৈরি করল। শেষপর্যন্ত আনন্দই বলল, সুরথদা, আমার দেরি হয়ে গেছে অনেক। আমি কাল সম্ভব হলে আপনার সঙ্গে কথা বলব। সুরথদা নীরবে মাথা নাড়লেন।

পা চালাল আনন্দ। কিছুটা এগিয়ে ডান দিকে মোড় ঘোরার আগে সে পেছনে তাকাল। দূরে দুটো ছায়ামূর্তি এখনো কথা বলছে। আর দুটো সিগারেটের আগুন দেখা যাচ্ছে। সুরথদাও সিগারেট ধরিয়েছেন। এবং তখনই আনন্দ বুঝতে পারল সে ছিল বলেই সুরথদা ওইভাবে কথা বলছিলেন। একজন পুলিশ অফিসারের সঙ্গে অন্তরঙ্গ হয়ে কথা বললে যদি আনন্দ কিছু ভেবে বসে তাই ছাড়-ছাড় ভাব দেখাচ্ছিলেন। হঠাৎ পুরো ব্যাপারটা তেতো হয়ে গেল আনন্দর কাছে। পুলিশ অফিসার একসময় পুরোনো বন্ধুত্বের জন্যে উপকার করেছিলেন সুরথদার। অথচ নিজের ইমেজ বাচাবার জন্যে এতক্ষণ অভিনয় করলেন সুরথদা। এখন নিশ্চয়ই তার চেহারা স্বাভাবিক হয়েছে। আনন্দর সুদীপের কথা মনে পড়ল। সুদীপ সুরথাকে পছন্দ করে না। প্রসঙ্গ উঠলেই বলে, বহুৎ জালি লোক। আনন্দ ওকে বহুবার এইরকম শব্দ ব্যবহার করতে নিষেধ করেছে। কিন্তু সুরথদার মাধ্যমেই তো দলের সঙ্গে যোগাযোগ তাদের। সুদীপ বলে, দ্যাখো ভাই, নকশাল আন্দোলন যারা করেছিল তারা খুব হিম্মতবাজ, নো ডাউট। কিন্তু এখন তো সব ওই ইমেজ নিয়েই হিরো হয়ে বসে আছে। খাচ্ছে দাচ্ছে আর ফ্যাট গ্যাদার করছে। জিজ্ঞাসা করলে হিস্ট্রি ঝাড়বে। আরে তার রেজাল্ট কি হল! যা ছিল তাই রইল, মাঝখান থেকে নাম কিনল। জয়িতা এর সঙ্গে যোগ করেছিল, বাবার ক্লাবে রোজ ড্রিঙ্ক করতে আসেন এক ভদ্রলোক। জেল-টেল খেটেছেন, তাত্ত্বিক নকশাল ছিলেন, এখন পাবলিক রিলেশনস অফিসার। সবাই খুব খাতির করে। সুদীপ মাথা নাড়ে, এই মালটাও সেই সুযোগ খুঁজছে।

সুদীপ কিংবা জয়িতার সঙ্গে একমত নয় আনন্দ। ওরা সবসময় ওইরকম চড়া দৃষ্টিতে সবকিছু দ্যাখে। প্রাচুর্যের মধ্যে বাস করে চারপাশে যা দেখেছে তাতেই এই দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি হয়েছে। কল্যাণ সেদিক দিয়ে বেশ চুপচাপ। কোন ব্যাপারে চট করে মন্তব্য করে না। শুধু মাঝে মাঝে বলে, কিছু একটা করো। এভাবে ভাল লাগছে না। সুদীপ কিংবা জয়িতার সঙ্গে ওর সম্পর্ক ভাল কিন্তু বোঝাই যায় আনন্দর ওপরেই সে নির্ভরশীল। আজ পর্যন্ত আনন্দ কল্যাণকে ঠিক বুঝে উঠতে পারল না। ওদের অর্থনৈতিক অবস্থা খুব ভাল নয় এটুকু সে জানে কিন্তু কোনদিন নিজের বাড়িতে ও কাউকে নিয়ে যায়নি।

হোস্টেলের সামনে এসে দাঁড়াল আনন্দ। রাস্তাটায় আলো নেই। গেট বন্ধ। কিছু দিন আগে এই হোস্টেলের একটা ছেলেকে হৃদয়ঘটিত ব্যাপারে খুন করা হয়েছে। তারপর থেকে কর্তৃপক্ষ খুব কঠোর হয়েছেন। খবরের কাগজে লেখালেখি এবং পুলিশী তৎপরতায় আনন্দর অবস্থা বেশ করুণ হয়েছিল তখন। কিন্তু এত বড় হোস্টেলের ছাত্রদের ম্যানেজ করা সুপারের পক্ষে সম্ভব নয়। শুধু আতঙ্ক সৃষ্টি করে শান্তি বজায় রাখার চেষ্টা।

দরজা খোলার দরকার নেই। আনন্দ চিৎকার করে দারোয়ানকে ডাকল। তিনবারের বার সাড়া মিলল, কৌন হ্যায় জী?

নিজের নাম বলে খাঁজে পা রেখে কাঠের গেটের ওপর উঠে বসল আনন্দ। তাকে দেখতে পেয়ে দারোয়ান ভীত গলায় বলল, আমার নোকরি খতম হয়ে যাবে বাবু।

ওপাশে একটা মই আছে। দারোয়ান সেটাকে কাছে নিয়ে আসতে চটপট নেমে এল আনন্দ। তারপর বলল, আর বেশি দিন জ্বালাব না, ভয় নেই।

লম্বা করিডোর দিয়ে নিজের ঘরের সামনে এসে দেখল দরজা বন্ধ। ড়ুপ্লিকেট চাবি আনন্দর পকেটে আছে। সুরজিৎ এখনও ফেরেনি। এখন হোস্টেল অন্ধকার। হয়তো ডাইনিং রুমে গিয়ে হুজ্জত করলে কিছু খাবার পাওয়া গেলেও যেতে পারে কিন্তু সেই ইচ্ছে করল না আনন্দর। সুপারের সঙ্গে তার সম্পর্ক ভাল নেই। খাবার চাইতে গেলে নানান প্রশ্নের সামনে দাঁড়াতে হবে। হাত মুখ ধুয়ে জামাকাপড় ছেড়ে টানটান হয়ে শুয়ে পড়ল সে। এবং তখনই মনে হল খিদেটা পাচ্ছে। একটা রাত না খেয়ে থাকলে কোন অসুবিধে হবার কথা নয়। তাছাড়া ভারতবর্ষের লক্ষ লক্ষ মানুষ প্রতি রাত্রি অনাহারে কাটায়। সুতরাং ব্যাপারটা কিছুই নয়। চোখ বন্ধ করল সে। কিন্তু তা সত্ত্বেও ঘুম আসছে না।

হঠাৎ এখন মায়ের কথা মনে পড়ল আনন্দর। মা শব্দটা উচ্চারণ করলে যে চেহারাটা মনে আসে তার সঙ্গে বিন্দুমাত্র পার্থক্য নেই। একা একটার পর একটা বাধা ডিঙিয়ে মাথা উঁচু করে বেঁচে আছেন এখনও। আনন্দ যখন প্রেসিডেন্সিতে পড়তে এসেছিল তখন তিনি বলেছিলেন, আমি তোমার কাছে কোন প্রত্যাশা করি না। বড় হয়েছ, নিজে কি করবে তা নিজেই বিচার করো। কর্মফল তুমিই ভোগ করবে। আমি তোমার খাওয়া থাকা পড়ার খরচ দিতে পারব আগামী ছয় বছর।

মাকে কখনও আবেগের শিকার হতে দ্যাখেনি সে। বাবা ছিলেন খুব আমুদে মানুষ। কথায় কথায় মন খারাপ করতেন, মন ভাল হতেও সময় লাগত না বেশি। তখন ডায়মন্ডহারবারের বাড়িতে ওরা থাকত না। ওই বাড়ির দায়িত্ব ছিল এক কাকার ওপর। বাবা মাঝে মাঝে যেতেন সেখানে দেখাশোনার জন্যে। তখন বেশ ছোট আনন্দ। নিচু ক্লাসে পড়ে। বাবা চাকরি করত ভাল। রকমারি খাবারদাবার হত রোজ। শনি রবিবার গাড়িতে করে বেড়াবার রেওয়াজ ছিল। ওই বয়সেই আনন্দর মনে হত বাবা মাকে প্রচণ্ড ভালবাসে। তাকে যা বাসে তার চেয়েও বেশি। এবং মা-ও তাই। এটা কি করে পাঁচ বছরের ছেলের বোধে এল তা এখন বুঝতে পারে না আনন্দ। কিন্তু সেই অনুভূতিটার কথা কথা মনে আছে। মাঝরাত্রে ঘুম ভেঙে দেখেছে বাবা আর মা ব্যালকনিতে পাশাপাশি বসে আছে চুপচাপ। ওদের ফ্ল্যাটটা ছিল চারতলায়। ব্যালকনিতে দাঁড়ালে অনেকটা আকাশ দেখা যেত। সেখানে একটা ছোট বেতের সোফা ছিল। মা বাবা অত রাত্রে প্রায় জড়িয়ে ধরে কেন চুপচাপ বসে থাকত তা আনন্দ তখন বোঝেনি। কিন্তু সেই সময় হিংসে হত। সে জিজ্ঞাসা করত, আমি কি তোমাদের সঙ্গে বসতে পারি?

চমকে উঠে বাবা বলতেন, আরে, হ্যাঁ, চলে এস।

আর মা উঠে দাঁড়াতেন, না। তোমাকে আসতে হবে না। চল আমি তোমার সঙ্গে শুচ্ছি। কাল সকালে স্কুল আছে। এইটুকুনি ছেলে মাঝরাত্রে জেগে বসে থাকবে!

কেমন একটা স্বপ্নের মত ছিল দিনগুলো। বাবা প্রায়ই ট্যুরে যেতেন। ফিরতেন যখন কিছু না কিছু আনতেন ওর জন্যে। আর ওর সঙ্গে অদ্ভুত সব রসিকতা করতেন যার অর্থ ও বুঝতে পারত না বেশিরভাগ সময়। একদিন গড়ের মাঠের কাছে গাড়িতে বসে ওর তেষ্টা পেয়ে গিয়েছিল। জল খেতে চেয়েছিল সে। বাবা একটা রেস্তোরাঁর দিকে গাড়ি ঘুরিয়ে তাকে বলেছিলেন, শোন, বড় হয়ে কোনও মেয়ের কাছে জল চাইবে না।

মা বলেছিলেন, আঃ কি বলছ?

সে জিজ্ঞাসা করেছিল, কেন?

বাবা উত্তর দিয়েছিলেন হেসে, আনন্দ, জল দাও বললেই সে চণ্ডালিকা হয়ে যাবে। এখন কথাগুলো মনে পড়লে লোকটাকে খুব ভাল লাগে তার। নরম মনে হয়। ঘটনাটা তার মনে আছে। বাবা গিয়েছিলেন জামসেদপুরে। তিনদিনের কাজ ছিল। ঠিক একদিন পরে টেলিফোনটা বাজল। তখন টেলিফোন বাজলেই ছুটে যেত সে। কেউ তোলার আগেই হ্যালো বলতে বেশ মজা লাগত। হ্যালো বলতেই ওপাশে কেউ ইংরেজিতে প্রশ্ন করল। তদ্দিনে দুটো শব্দ শিখেছিল আনন্দ। হোন্ড অন বলে রিসিভার নামিয়ে রেখে মাকে ডাকতে ছুটেছিল। মা তখন বাথরুম থেকে বেরিয়ে তোয়ালেতে খোঁপা জড়িয়ে হাউসকোটের বোম আঁটছিলেন, সহজ পায়ে এগিয়ে এসে রিসিভার তুলে কানে দিয়ে বললেন, হেলো!

উৎসুক হয়ে তাকিয়ে ছিল আনন্দ। ওর বিশ্বাস ছিল ফোনটা বাবার। অপারেটর লাইন ধরে মাকে দিচ্ছে। ও একবার বাবার সঙ্গে কথা বলতে চাইছিল। কিন্তু আনন্দ অবাক হয়ে দেখল মায়ের মুখটা রক্তশূন্য হয়ে গেল। থর থর করে কাঁপতে লাগলেন মা। রিসিভারটা টেবিলের ওপর রেখে থপ করে বসে পড়লেন পাশের চেয়ারে। দুহাতে তার মুখ ঢাকা, শরীর প্রচণ্ড কাঁপছে। আনন্দ কিছুই বুঝতে পারছিল না। সে রিসিভারটা কানে তুলে যান্ত্রিক শব্দ শুনল। সেটাকে যথাস্থানে রেখে দিয়ে মায়ের দিকে তাকাল সে। মা হঠাৎ এক পাশে ঢলে পড়লেন। তার চোখ বন্ধ। দাঁতে দাঁত লেগে গেছে। আনন্দ চিৎকার করে মায়ের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। দৃশ্যটা স্পষ্ট মনে আছে এখনও। তাদের ফ্ল্যাটে কেউ ছিল না। কাজের লোকটাও দেশে গিয়েছিল। মায়ের শরীরটাকে আঁকড়ে ধরে সে ঝাকাতে চেষ্টা করেছিল প্রাণপণে। শেষ পর্যন্ত মা চোখ খুললেন। এবং তখন সেই মাকে তার একদম অচেনা মনে হচ্ছিল। দুহাতে তার কাঁধ ধরে তাকিয়ে ছিলেন কিছুক্ষণ। সে উদভ্রান্তের মত জিজ্ঞাসা করেছিল, তোমার কি হয়েছে মা?

মা ঠোঁট কামড়েছিলেন। তারপর অদ্ভুত গলায় বলেছিলেন, আমাদের এখনই জামসেদপুর যেতে হবে আনন্দ। তোমার বাবা–।

বাবা যেতে বলেছে?

না। তোমার বাবা নেই। আজ সকালে তাকে হোটেলে মৃত অবস্থায় পাওয়া গেছে। তিনি ঘুমের বড়ি খেয়েছেন। কেঁদো না, তুমি কাঁদলে আমি শক্ত হতে পারব না।

তাকে নিয়ে মা একা গিয়েছিলেন জামসেদপুরে। সেখানে তাদের চেনাশোনা মানুষ কেউ ছিল না। পাগলের মত মা থানাপুলিশ করে শেষ পর্যন্ত ওখানকার কয়েকজন বাবার অফিসের লোকের সাহায্যে মৃতদেহ সৎকার করেছিলেন। কলকাতায় ফিরে এসে মা ভীষণ চুপচাপ হয়ে গিয়েছিলেন। খবর পেয়ে কলকাতার বাড়িতে যেসব আত্মীয়স্বজন এসেছিলেন তারা নিজের মত বাবার মৃত্যু নিয়ে জল্পনা-কল্পনা করতেন। মা কোনদিন সেই আলোচনায় অংশ নেননি। মাস কয়েক বাদে মা কলকাতার পাট চুকিয়ে চলে এলেন ডায়মন্ডহারবারে। বাবার পৈতৃক বাড়িতে। আনন্দর বাকি স্কুলজীবন কেটেছে ডায়মন্ডহারবারে। বাবার রেখে যাওয়া টাকার সুদে কোনরকমে চলে গিয়েছে দিনগুলো। নিজেকে একদম পালটে ফেলেছেন মা। গ্রামের স্কুলে এখনও পড়াচ্ছেন। অদ্ভুত কিছু নিয়মের পরিখায় জীবনটাকে প্রবাহিত করেছেন তিনি।

আজও বাবার মৃত্যুটা আনন্দর কাছে রহস্য হয়ে রইল। একটা হাসিখুশী মানুষ, সব ব্যাপারেই যাকে তৃপ্ত বলে মনে হত, তিনি কি কারণে গাদা গাদা ঘুমের ওষুধ খেতে যাবেন বাড়ি থেকে অনেক দূরে হোটেলে বসে? সেই হোটেলে গিয়ে জানা গিয়েছিল, ঘুমোত যাওয়ার আগে মাকে টেলিফোনে ধরার চেষ্টা করেছিলেন বাবা। অপারেটর কিছুতেই লাইন দিতে পারেনি। কি কথা বলতে চেয়েছিলেন বাবা? বড় হয়ে আনন্দ একদিন সরাসরি মাকে প্রশ্নটা করেছিল। মা ওর মুখের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, জানি না। এত চেষ্টা করলাম তবু জানলাম না। এখন মনে হয় না জানতে চাওয়াই ভাল। যে পৃথিবী থেকে অকালে স্বেচ্ছায় চলে যায় সে নিশ্চয়ই পৃথিবীতে সুখী ছিল না। তার দুঃখের কারণটা জানতে চেয়ে এখন আর আমি কি করতে পারি!

খিদেটা কিছুতেই মরছিল না। আর খিদে না গেলে ঘুমও আসবে না। আনন্দ উঠে বসল। গতবার যখন ডায়মন্ডহারবারে গিয়েছিল তখনই মায়ের সঙ্গে সে সোজা কথা বলে নিয়েছিল। সে যা ভাবছে, যা যা করবে বলে পরিকল্পনা করছে তার বিশদ বিবরণ মাকে জানিয়েছে। মা চুপচাপ শুনেছেন, তারপর কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ করে বলেছিলেন, তুমি নিজে যা ঠিক মনে করবে সেটাই করবে। আমি তোমার পড়াশুনার খরচ দিচ্ছি মানে এই নয় বিনিময়ে তোমার কাছে কিছু আশা করছি। তবে শুধু আমি একটি কথা বলব, সাহস আর হঠকারিতা এক জিনিস নয়।

কথাটা আনন্দ ভালভাবেই জানে। এই দেশে, এই সামাজিক এবং গণতান্ত্রিক কাঠামোয় বিপ্লব সম্ভব নয়। ঠিক এই মুহূর্তে বিপ্লবের কথা কেউ উচ্চারণও করছে না। চারপাশের বিস্তর অন্যায় অবিচারের সঙ্গে মানুষ চমৎকার খাপ খাইয়ে নিয়েছে। এমন কি সে নিজে যে দলের সঙ্গে যুক্ত তারাও বিপ্লবের কথা বলে না। অথচ ওইরকম একটা বাতাবরণ তৈরি করে নিজেদের জঙ্গী চেহারায় দেখতে ভালবাসে।

কানাঘুষো শুনেছিল কিছুদিন আগে থেকেই। এবার ডায়মন্ডহারবারে গিয়ে স্বচক্ষে দেখে এল। জায়গাটার নাম দেওয়া হয়েছে প্যারাডাইস। কয়েকটা নিরীহ গ্রামবাসীর সামনে বড় পাঁচিল তুলে বিশাল এলাকা ঘিরে রাখা হয়েছে। এই এলাকার মধ্যে তৈরি হয়েছে মনোরম উদ্যান। বিভিন্ন জায়গা থেকে নিয়ে আসা গাছের চারা এখন বড় হয়েছে। ফুল ফুটছে সারা বছর। সমস্ত বাগানটা যাতায়াতের জন্যে সিমেন্টের সরু পথ যা বিভিন্ন কটেজের গা ঘেঁষে পাক খেয়েছে। এই কটেজগুলোর অধিকাংশই এয়ার কন্ডিশনড। এক রাত্রের জন্যে প্রায় আড়াইশো থেকে চারশো টাকা দক্ষিণা দিতে হয় সেখানে থাকতে হলে। এছাড়া আছে সুইমিং পুল; টেনিস এবং ব্যাডমিন্টন খেলার জায়গা। আর আছে কুঁড়েঘর। যার দেওয়াল নেই, মাথার ওপর খড়ের চাল, চারপাশের চারটে খুটির ওপর পর্দা গোটানো আছে, ইচ্ছে করলেই দেওয়াল তৈরি করে নেওয়া যায়। কুঁড়েঘরে ফ্যান আছে, আলো আছে, মোটা গদি পাতা নিচে। উর্দিপরা শিক্ষিত বেয়ারারা খাবার নিয়ে ঘোরাঘুরি করে দিনরাত সরু প্যাসেজ দিয়ে। খুব শক্তিশালী জেনারেটর চালায় প্যারাডাইস। খাবারের দাম আশেপাশের গ্রামবাসীর কল্পনারও বাইরে। এইরকম একটা স্বর্গের মত বাগানে প্রবেশ করতে গেলেই টিকিট কাটতে হয় মোটা টাকায়। তাতে শুধু ঘুরে বেড়ানো যায়। থাকা এবং খাওয়ার জন্যে আলাদা দাম দিতে হবে। এক সপ্তাহের বাজারের দাম খুইয়ে গ্রামের কোন মানুষ এখানে ঢোকেনি আজ পর্যন্ত। এই উদ্যান গ্রামের মানুষের কাজে লাগে না। গ্রাম থেকেও উদ্যানের মালিক কোন কিছু সংগ্রহ করে না। এইরকম পাণ্ডববর্জিত জায়গা, ডায়মন্ডহারবারের বাঁক যেখানে অনেক কিলোমিটার দূরে সেখানে রাস্তার পাশে ওই উদ্যান কেন তৈরি হল? এত টাকা খবচ করে কেন আসবে লোকে এখানে থাকতে? প্রশ্নটা গ্রামের মানুষের মনে জেগেছিল। উত্তর পেতে দেবি হয়নি। দিনবাত গাড়ি আসছে। শিক্ষিত প্রহরী দিয়ে ঘেরা এই উদ্যানের গেট খুলে গাড়িগুলো ঢুকে যাচ্ছে ভেতরে। সেখানে কি হচ্ছে গ্রামের মানুষের জানা নেই। তবে বেশির ভাগ গাড়িতেই মহিলা থাকছেন। কেউ কয়েক ঘণ্টা, কেউ গোটা রাত, কেউ বা তিনটে দিন কাটিয়ে ফিরে যায় কলকাতায়। প্রথম প্রথম গ্রামের ছেলেমেয়েরা ভিড় করে দেখত এইসব মানুষদের ঢোকা বা বের হবার সময়। আইনের সাহায্যে তাদের সেখানে আসা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। গ্রামের মানুষ নিষ্ফল গজরায়, মুখরোচক গল্প তৈরি করে। অতি বড়লোকদের অবৈধ কাজের বাগানবাড়ি ওটা। ছেলেমেয়েদের শাসন করে ওদিকে না যেতে। কিন্তু ব্যাপারটার প্রভাব পড়ছে অল্পবয়সীদের ওপর। অথচ কেউ নেই প্রতিবাদ করার। দুটো রাজনৈতিক দল এখন গ্রামে সক্রিয়। তারা বলেছে শান্তিপূর্ণ উপায়ে কাউকে বিরক্ত না করে, শান্তি বিঘ্নিত না করে যদি স্বাস্থ্যনিবাস চালায় তাহলে প্রতিবাদ করার কোনও রাস্তা নেই। প্যারাডাইসের মালিক প্রতি মাসে তিন জায়গায় মোটা টাকা খরচ করে থাকে এটা এখন প্রচারিত। দুটো রাজনৈতিক দল এবং পুলিশের আরও হাজারটা সমস্যা আছে। স্বাস্থ্যনিবাসকে ব্যভিচারের উদ্যান ভাবার কোন কারণ তারা খুঁজে পান না।

সুদীপকে নিয়ে আনন্দ জায়গাটাকে ভাল করে দেখে এসেছে। কোন রকম ছিদ্র রাখেননি প্যারাডাইসের মালিক। সাধারণত গাড়ি ছাড়া ভেতরে প্রবেশ নিষেধ। তবে সঙ্গে মেয়ে থাকলে রিকশায় কেউ কেউ ঢুকে গেছে। চোখ বন্ধ করলেই আনন্দ দেখতে পায় সমস্ত গ্রাম ঘুটঘুটে অন্ধকার আর প্যারাডাইসে আলোর ঢল নেমেছে।

সুদীপ কল্যাণের সঙ্গে সরাসরি স্পষ্ট কথা হয়ে গেছে। দ্বিধা জয়িতাকে নিয়ে। মেয়েটা কথা বলে কাট কাট। যদিও ওকে কখনও মেয়ে বলে মনে হয় না আনন্দর। কলেজে ঢোকার পর থেকেই চারজনে কখন এক হয়ে গেল টের পায়নি। মেয়ে বলে কোন সহানুভূতি দেখাতে গেলে প্রচণ্ড খেপে যায় জয়িতা। অতএব ওকে দলে নেওয়া ছাড়া উপায় নেই। আজ পার্টির সঙ্গে কথাবার্তা বলে কোন লাভ হল না। ওদের কথার সঙ্গে সুরথদার কোনও পার্থক্য নেই। ঠিক এই অবস্থায় চিরদিন থাকলে চারজনেই জয়েন্ট এন্ট্রেল দিয়ে সুখী ভারতীয় নাগরিক হতে পারত। সেই যোগ্যতা তাদের ছিল। কল্যাণ বলে কিছু একটা করো। সুদীপ বলে একটা ঢেউ তুলে খতম হয়ে যাই ক্ষতি নেই। যদিও রাজনৈতিক শিক্ষা এই উদ্দামতাকে সমর্থন করে না। আনন্দর টেবিলের রাজনীতির বইগুলো কখনই এই কথা বলবে না। তবু মনে হচ্ছে থিয়োরির বাইরে গেলে কেমন হয়। নিজেদের ক্ষমতানুযায়ী ধাক্কা দিতে পারলে কেউ কেউ হয়তো এগিয়ে আসবে। ভারতবর্ষের মানুষের দুরবস্থার জন্যে কোনও রাজনৈতিক দল বা সরকার দায়ী নয়। দায়ী তারা নিজেরাই। এই অলস কর্মবিমুখ শুধু পেতে-চাওয়া এবং নিজেরটা বোঝার মানুষগুলোকে একাত্তর সাল কোন নাড়া দিতে পারেনি। টুকরো টুকরো ঘটনার মাধ্যমে তারাও কিছু করতে পারবে না। কিন্তু নিজের কাছে কৈফিয়ৎ দিতে পারবে। অন্তত তৃপ্ত হতে পারবে।

ঘরে কোন খাবার নেই, কাল সকালের আগে জুটবে না, আনন্দ আর একবার ঘুমোবার চেষ্টা করল।

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *