১.০৯ ‘উচ্চতর আদেশবলে …’

৯. ‘উচ্চতর আদেশবলে …’

[আমেদে ফ্লরেঁসের নোটবই থেকে]

সেই একই দিন। আমাকে মাঝপথেই লেখা থামিয়ে চ’লে যেতে হয়েছিলো, মোরিলিরের মুখ থেকে যে-কাগজের টুকরোটা খসে পড়েছিলো তার তর্জমাটা দেখাবার জন্যে কাপ্তেন মার্সেনে আমায় ডেকে পাঠিয়েছিলেন। তবে আবার বরং ঘটনাক্রম অনুযায়ীই সবকিছু লিখে ফেলি।

আমরা তো স্তম্ভিত দাঁড়িয়ে আছি, তাঁবুর দরজায়, দেখেছি তাঁবুটা ফাঁকা, মোরিলিরের কোনো চিহ্নই নেই কোত্থাও। শুধু দড়িটা প’ড়ে আছে, যেটা ছিলো তার বাঁধন। ভীষণ অসহিষ্ণু হ’য়ে কাপ্তেন মার্সেনে তাঁর সেপাইদের জিগেস করেছেন। কিন্তু সে বেচারারাও আমাদের মতোই চমকে গিয়েছিল। তারা হলফ ক’রে বললে তারা একসেকেন্ডের জন্যেও তাদের পাহারা ছেড়ে নড়েনি। এমনকী সন্দেহজনক কোনো শব্দও তাদের কানে আসেনি। আমরা তো একেবারেই হতভম্ব!

আমরা সবাই তাঁবুর ভেতরে গিয়ে এই-প্রথম খেয়াল ক’রে দেখেছি তাঁবুর কানাতের ওপরে একটা গর্ত কাটা : আর তার ওপারেই একটা গাছের মোটাডাল। সেটাই সব ব্যাখ্যা ক’রে দিয়েছে। বাঁধনটা নিশ্চয়ই আলগা ছিলো, ঠিকমতো গেরো দেয়া হয়নি, মোরিলিরে যে-ক’রেই হোক বাঁধনটা আলগা ক’রে, তাঁবুর খুঁটি ধ’রে বেয়ে উঠেছে ওপরে এবং তারপর পালিয়ে গেছে—বলা যায়- শূন্যপথেই।

আমরা কি ধাওয়া ক’রে যাবো তার পেছন-পেছন? কী ফল হবে তাতে? সম্ভবত পুরো-একটা ঘণ্টা সে হাতে পেয়েছে পালিয়ে যাবার জন্যে। তাছাড়া এই ঝোপে-জঙ্গলেই বা তাকে খুঁজে পাবো কী করে? তার জন্যে শিকারি কুকুর চাই, ব্লাডহাউণ্ড।

এ-বিষয়টার একমত হ’য়েই আমরা অনিবার্যকেই মেনে নিয়েছি। কাপ্তেন তাঁবুটা খুলে নেবার ব্যবস্থা করেছেন-এ কি আবার কোনো কয়েদখানা নাকি?— আর সেপাই চারজনকে ছুটি দিয়ে দিয়েছেন, তার আগে পই-পই ক’রে সাবধান ক’রে দিয়েছেন, এর একটা কথাও যদি প্রকাশ পায় তবে তাদের সকলকেই ভীষণ সাজা পেতে হবে। তারপর তিনি নিজের তাঁবুতে ফিরে গিয়ে সেই আধচিলতে কাগজের ওপরেই হুমড়ি খেড়ে পড়েছেন। এদিকে আসলে কী হয়েছে, স্যাৎ- বেরাই তা খুলে বলবেন তাঁর সঙ্গীদের— যদি অবশ্য এর মধ্যেই গোটা ব্যাপারটা তিনি বেমালুম ভুলে গিয়ে না-থাকেন।

একঘণ্টা পরে কাপ্তেন মার্সেনে আমায় ডেকে পাঠয়েছিলেন, যেমন আমি আগেই বলেছি। আমি তাঁকে দেখতে পেয়েছি মঁসিয় বারজাকের তাঁবুতে, ‘বাকি- সব ইওরোপীয়রাও সেখানে জড়ো হয়েছেন। তাদের সকলের মুখেই হতভম্ব ভ্যাবাচাকা ভাব। মোরিলিরের এই বেইমানির পেছনে কী কারণ থাকতে পারে? এ কি তার নিজেরই মাথার বদবুদ্ধি, না কি অন্য-কোনো তৃতীয় ব্যক্তি তাকে তাতিয়েছে? আমি অবশ্য আগেই এই তৃতীয় ব্যক্তির ব্যাপারটাই সন্দেহ ক’রে এসেছি। হয়তো কিছুক্ষণের মধ্যেই পুরো রহস্যটা খোলশা হ’য়ে যাবে।

‘আরবি লেখা, মার্সেনে ব্যাখ্যা ক’রে বুঝিয়েছেন, ‘যায় ডানদিক থেকে বামে। কিন্তু কাগজের টুকরোটা স্বচ্ছ, তেলতেলে, এটাকে উলটো ক’রে আলোর সামনে ধরলেই আমরা আমাদের মতো ক’রে পড়তে পারবো। এই হচ্ছে তার ফলাফল।’

তিনি একচিলতে কাগজ তুলে দিয়েছেন আমাদের হাতে, বিশ্রীভাবে ছিঁড়েছে মাঝখান থেকে—অসমানভাবে, ঠিক মূল চিরকুটটারই মতো। তার ওপর আমি পড়তে পেরেছি নিচের বয়ানটাকে :

মাসা আ মান গনিগনে তুবাবু
মেমু নিম্বে মান্দো কাফা
বাতাকে মানায়েতা সোফা
আ ওকাতো। বাতু
ই আ কা ফোলো। মান্‌সা আ বে

এই ব্যাসকুটের মর্মোদ্ধার করার ভার যদি আমার ওপর থাকতো! ভেবেই যেন আমার মাথার ভেতরটা একটা চক্কর দিয়ে উঠেছে।

কাগজটা আমরা হাত থেকে হাতে চালান ক’রে দিয়েছি। মাদমোয়াজেল মোর্‌নাস আর স্যাৎ-বেরা সম্ভবত খানিকটা আঁচ করতে পেরেছেন কী লেখা আছে, আর আমি তাঁদের জ্ঞানের বহর দেখে একেবারে তাজ্জব হ’য়ে গেছি। আর মঁসিয় বারজাক আর মঁসিয় পঁসাঁ-তাদের জ্ঞানবুদ্ধির দৌড় আমারই মতো।

‘প্রথম দুটো পঙ্ক্তির শেষকথাগুলো অসমাপ্ত,’ কাপ্তেন মার্সেনে ব্যাখ্যা ক’রে বুঝিয়েছেন। ‘প্রথম পঙক্তির কথাটা হওয়া উচিত তুবাবুলেঙ্গো, যার মানে হ’লো ইওরোপীয়রা, আক্ষরিকভাবে লাল ইওরোপীয়রা, আর দ্বিতীয় পঙ্ক্তিতে ওটা হবে কাফামা, তার মানে এখনও

‘অসমাপ্ত. কথাগুলো সম্পূর্ণ ক’রে নেবার পর ছেঁড়া-ছেঁড়াভাবে এইরকম দাঁড়ায়: ‘প্রভু (অথবা রাজা) এই ইওরোপীয়দের চান না…অথচ যেহেতু তারা এখনও চ’লে আসছে…চিঠিটা সৈন্যবাহিনীকে ডেকে আনবে…তিনি হুকুম দেবেন…[আদেশ ] পালন কোরো…তোমরা শুরু করেছো। প্রভু (অথবা রাজা)…’

আমরা ভ্রুকুটি ক’রে নির্বোধের মতো তাকিয়েছি। এই তর্জমাতেও তেমন- কিছু বোঝবার জো নেই।

‘প্রথম অংশটা সহজেই বোঝা যায়,’ কাপ্তেন মার্সেনে বুঝিয়ে বলেছেন। ‘কোথাও একজন প্রভু আছেন–কিংবা কোনো রাজাই হয়তো হবে—তিনি চান না যে আমরা অমুকতুশুক-কিছু করি। কোনো কারণে আমাদের তাঁর ঝামেলার ।কারণ ব’লে মনে হয়েছে। হারানো আদ্ধেকটায় নিশ্চয়ই কোনো ষড়যন্ত্রের কথা ছিলো—সেটা যে কী তা এ থেকে আমাদের জানার উপায় নেই। পরের দুটো লাইনের মানে বোঝা দায়। ‘চিঠিটা সৈন্যবাহিনীকে ডেকে আনবে’। এ থেকে কিছুই বোঝা যায় না। চতুর্থ লাইনে মোরিলিরেকে কিছু-একটা করতে হুকুম দেয়া হয়েছে। আর যিনি হুকুম দেবেন, এই তিনিটা কিনি তা আমরা জানি না। আর শেষ-কথাগুলোর কোনো মানে আমি অন্তত খুঁজে পাইনি।’

একটু নিরাশ হ’য়েই আমরা পরস্পরের দিকে চাওয়াচাউয়ি করেছি। এতে যেন আমরা হাতে স্বর্গ পেয়ে গেছি!

মঁসিয় বারজাক সংক্ষেপে ব্যাপারটাকে সাজিয়েছেন : ‘অ্যাদ্দিন ধ’রে যা ঘটেছে, বিশেষ ক’রে আজ যা ঘটেছে, তার পরিপ্রেক্ষিতে আমরা কতগুলো সিদ্ধান্তে পৌঁছুতে পারি। প্রিমো : কোনো তৃতীয় ব্যক্তির সুবিধের জন্যে আমাদের গাইড আমাদের সঙ্গে বেইমানি করেছে; কোনো অজ্ঞাত কারণে এই তৃতীয় ব্যক্তি আমাদের অভিযান বন্ধ ক’রে দিতে চায়। সেকুন্দো : এই অজ্ঞাত ব্যক্তিটির নিশ্চয়ই প্রচণ্ড প্রভাব-প্রতিপত্তি আছে, কারণ একেবারে কোনোক্রিতেই সে এই গাইডকে আমাদের ঘাড়ে চাপিয়ে দিতে পেরেছে। তেতিয়ো : এই প্রভাব প্রতিপত্তি বা ক্ষমতা তাই ব’লে এমন দারুণ-কিছু নয় যে সে আমাদের আটকে দিতে পেরেছে- সে শুধু ছেলেমানুষি কতগুলো উপায়েই ঝামেলা পাকাবার চেষ্টা ক’রে এসেছে!’ এবার আমি একটা আপত্তি তুলেছি। ‘মাফ করবেন! এই রহস্যময় অজ্ঞাত ব্যক্তিটি কিন্তু কতগুলো বেশ সাংঘাতিক বিপত্তিই তুলতে চেয়েছে।’

আমি সবাইকে তখন খুলে বলেছি দুং-কোনো গরল সম্বন্ধে আমি কী ভেবেছি, আর কেনিয়ালালার ভবিষ্যদ্বাণী বা হুমকির কথাও আমি বলতে ছাড়িনি। কারণ এখন তো স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে ঐ ভবিষ্যদ্বাণী আসলে একটা হুমকিই ছিলো।

‘মঁসিয় ফ্লরেঁস যে সারগর্ভ সিদ্ধান্তে পৌঁছেলেন,’ মঁসিয় বারজাক বলেছেন, ‘তা বরং আমার বিশ্বাসটাকেই আরো দৃঢ় করে। আমি তাই বলি, আমাদের এই দুশমন—সে যে-ই হোক না কেন—তাকে খুব-একটা ভয় পাবার কিছু নেই। না- হ’লে আমাদের বিরুদ্ধে সে এমন-সব চাল চালতো তা যে আরো-গুরুতর হ’তো তা-ই নয়, মারাত্মকও হ’য়ে যেতে পারতো।’

মঁসিয় বারজাক ঠিকই বলেছেন। প্রজ্ঞার দেবীই, স্বয়ং সোফিয়া, গ্রীকদের ঐ সোফিয়াই তাঁর মুখ দিয়ে কথা কয়েছেন। মঁসিয় বারজাক আরো জুড়ে দিয়েছেন : ‘আমার মত হ’লো এ-ব্যাপারটাকে অবহেলা ক’রে উড়িয়ে দেয়া চলবে না ঠিকই, তবে তাই ব’লে এটাকে ফেনিয়ে-ফাঁপিয়ে মারাত্মক-কিছু ক’রে তোলারও দরকার নেই। অর্থাৎ আমাদের বিচক্ষণভাবে এগুতে হবে, বিচারবিবেচনা ক’রে দেখতে,হবে—তবে বেশি উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার কোনো কারণ নেই।’

আমরা যে সবাই তাঁর কথাতেই সায় দিয়েছি, তাতে আমি অন্তত অবাক হইনি, কারণ আমি আগেই তো সকলের গূঢ় গোপন উদ্দেশ্যগুলো বিশ্লেষণ ক’রে জেনে গিয়েছি। যেটা আমাকে তাজ্জব করেছে, সেটা মঁসিয় বারজাকের এই গোঁ, এই একগুঁয়েমি, এই নাছোড় জেদ। এই সুযোগটা দু-হাতে লুফে নিয়ে তিনি ফিরে গেলেই পারেন-বারজাক মিশনের অভিযান থেকে যে কোনো লাভ হবে না, তা তো বুঝতে কারু আর বাকি নেই।

যা-ই হোক না কেন, আমাদের এখন নতুন গাইড চাই। মাদমোয়াজেল মোর্‌নাস তাঁর নিজের গাইডদেরই মিশনের কাজে লাগাতে অনুরোধ করেছেন; এরা এই দেশটার আগাপাশতলা চেনে, অন্তত এদের চেনা উচিত, সেইজন্যেই তিনি নিজেই এদের কাজে বহাল করেছেন। ব্যাপারটার ফয়সালা ক’রে নেবার জন্যে, তখন, আমরা ৎশুমুকি আর তোঙ্গানেকে তলব করেছি।

শুমুকির ভাবভঙ্গি আমার আদপেই ভালো লাগে না। মুখে সে বলেছে বটে যে আমরা তার ওপর ভরসা রাখতে পারি, কিন্তু ভাবগতিক দেখে মনে হয়েছে সে ভারি-অস্বস্তিতে আছে, একটু যেন সংকোচও আছে তার, আর কথা বলবার সময় একবারও আমি তার চোখে চোখ রাখতে পারিনি-সবসময়েই সে তার চোখ সরিয়ে নিয়েছে অথবা মুখ নামিয়ে নিয়েছে। আমার বিশ্বাস লোকটা যেন আগাগোড়া মিথ্যার মোড়ক দিয়ে মোড়া —সবটাই তার প্রতারক প্রচ্ছদ। আমার মতে, সে মোরিলিরের চাইতে কোনোদিক দিয়েই সুবিধের নয়।

তোঙ্গানে, উলটোদিকে, কিন্তু ভারি সরলসিধে মানুষ। সে সরাসরি ব’লে দিয়েছে এদিককার পথঘাট সে ভালোই চেনে, আমরা যেখানেই যেতে চাই, সেখানেই সে আমাদের নিয়ে যাবে। আরো বলেছে, কুলি আর সহিসরা যাতে বিগড়ে না যায় সে-চেষ্টা সে করবে, তাদের সে সব বুঝিয়ে ব’লে কাজ করতে রাজি করাবে। তার ভাবগতিক সকলেরই মনে ধরেছে : সোজাসুজি পষ্টাপষ্টি সব ব’লে দেয় সে, চোখে চোখ রেখে কথা বলে।

আমি অন্তত ঠিক ক’রে ফেলেছি, বিশ্বাস যদি কাউকে করতেই হয় সে তোঙ্গানেকে; ৎশুমুকিকে—নৈব নৈব চ।

তারপরেই এই দুই নতুন গাইড চ’লে গেছে স্থানীয় লোকদের তুইয়ে-বুইয়ে রাজি করাতে, মিষ্টিকথায় ভুলিয়ে বশ করতে। সরকারি কাহনটাই তারা জানিয়েছে তাদের: মোরিলিরেকে নাকি কুমিরে খেয়ে ফেলেছে, এখন থেকে তারা দুজনেই তার জায়গায় সবকিছুর খবরদারি করবে। কেউ কিছুই বলে না। দুপুরবেলার বিশ্রাম সেরে, আমরা বেরিয়ে পড়েছি।

৯ই ফেব্রুয়ারি। মোরিলিরে সঙ্গে নেই তো কী, অবস্থা যেমন ছিলো তেমনই আছে। ৎশুমুকি আর তোঙ্গানেকে সামনে রেখেও আমরা ভূতপূর্ব গাইডের চেয়ে খুব-একটা দ্রুত চলতে পারিনি।

গাইড দুজন সারাক্ষণ নিজের মধ্যে কথাকাটাকাটিও করেছে—কোন্ পথে যাবে। একবারও তাদের একমত হ’তে দেখিনি। সারাক্ষণ খিটিমিটি, ঝগড়াঝাঁটি লেগেই আছে। আমি সবসময়েই তোঙ্গানের দেখানো পথে চলতে একপায়ে খাড়া আছি—আর অভিজ্ঞতা তো প্রমাণই ক’রে দিয়েছে যে আমি ভুল করিনি। বেশির ভাগ লোকে যদি ভেবে নেয় যে ৎশুমুকিই ঠিক বলেছে, অমনি প্রথম যে-গাঁটা চোখে পড়ে সেখানে এসেই টের পায় যে কোথাও একটা মস্ত গোল বেঁধে গিয়েছে। তারপর আমাদের বেঁকেচুরে যেতে হয়, কখনও এমনকী এমন পথে যেখান দিয়ে লটবহর নিয়ে যাওয়াই যায় না, ফলে আবার আমাদের ফিরে যেতে হয় পুরোনো পথটাতেই- যেখান থেকে ক-ঘণ্টা আগে রওনা হয়েছিলুম। অন্যসময়ে, এই দুজন আফ্রিকির আলোচনা অন্তহীনভাবে সারাদিন ধ’রে চলে— আর আমাদের অকস্মার মতো ব’সে থাকতে হয়। এই অবস্থায় খুব তাড়াতাড়ি চলবার কোনো কথাই ওঠে না। কাজেই আড়াইদিনে কুললে কুড়িমাইল পথও পেরিয়েছি কিনা সন্দেহ হয়। অবস্থাটা অকহতব্য।

আমরা এখনও সেই উপত্যকা ধ’রেই চলেছি, যেখান দিয়ে প্রথম আমরা কোকোরোতে এসে পৌঁছেছিলুম। উপত্যকা ক্রমশ ছড়িয়েই যায়, প্রসারিত হয়, আর আমাদের ডানদিকে, দক্ষিণে, আর-কোনো টিলা বা পাহাড়ই চোখে পড়ে না।

এ-রাস্তাটাই সবচেয়ে সহজ—অত নদীও পেরুতে হয় না, টিলাও ডিঙোতে হয় না। এটাই বাঁচোয়া যে বোঝার ওপর শাকের আঁটির মতো কঠিন পথে আমাদের চলতে হচ্ছে না।

১১ই ফেব্রুয়ারি। আজ সকালে, খুব-ভোরে, আমরা চাষের জমির মাঝখানে এসে পড়েছি। অর্থাৎ বোঝা যাচ্ছে যে কাছেই কোনো গ্রাম আছে। এ-সব খেতখামার হয়তো ভালোই ফসল ফলাতো, যদি-না চাষীদের অবিশ্রাম পোকামাকড়ের সঙ্গে একটা অন্তহীন লড়াই চালিয়ে যেতে হ’তো।

আর এদের মধ্যে সবচেয়ে ভয়ংকর হচ্ছে বল্মীক—উইপোকা। কখনও-কখনও প্রমাণসাইজের মানুষসমান বল্মীকস্তূপ চোখে পড়ে, আর শীতের শুরুতে তারা এই উইয়ের ঢিবি ছেড়ে পাখাওঠা পিঁপড়ের মতোই উড়ে বেড়ায়-তারপর হামলা করে গ্রামগুলোতে, কিন্তু লোকে সব দুর্ভোগের মধ্যেও মজা খুঁজে পেয়ে হতাশা সামলায়। এদের উড়তে দেখলেই শুরু হ’য়ে যায় আমোদপ্রমোদ, মেলা-পরব, আর ভোজের পর ভোজ। আগুনের কুণ্ড জ্বালানো হয় চারপাশে, আর উইপোকাগুলোর পাখা ঝলসে যায়। বাচ্চারা আর মেয়েরা সে-সব কুড়িয়ে নিয়ে সে মাখনে ভাজে। তারপর, শুধু ভুরিভোজ করলেই হয় না কি? কথাতেই তো বলে পানভোজন, অতএব ঢকঢক ক’রে হাঁড়ি-হাঁড়ি মদ গেলে সবাই, আর এত- মদ উড়িয়ে সন্ধেবেলায় দেখা যায় গোটা গাঁটাই মাতাল হ’য়ে পড়েছে।

আটটা নাগাদ গ্রামটা চোখে পড়ে। তর নাম বামা। যেই তার কাছে গিয়ে পৌঁছেছি, অমনি চোখে পড়েছে, দু-র শোভাযাত্রা চলেছে লুগানের মধ্য দিয়ে- ভূতপ্রেতপিশাচ তাড়াতে আর বর্ষার জন্যে প্রার্থনা জানাতে। এই দ্-র সাজ হলো ফোলানো বুকের জামাগায়ে-তাতে শন আর তালপাতা গোঁজা। মাথাগুলো শনের টুপি দিয়ে পুরোপুরি ঢাকা, চোখের জায়গায় দুটো কোটর, মাথার ওপর লাল- একটা কাঠের চূড়া বসানো অথবা কোনো শিকারি পাখির চঞ্চু। নেচে-নেচে আসে তারা, পেছন-পেছন আসে নেই-কাজের সব ভবঘুরে আর বাচ্চার দল-আর তাদের তারা অবিশ্রাম মন্ত্রপড়া ছড়ি দিয়ে পেটায়। যখনই কোনো কুঁড়েবাড়ির পাশ দিয়ে যায়, তারা ঢক ক’রে গেলে দোলো (যব গাঁজিয়ে বানানো পানীয় অথবা তাড়ি)। এ-কথার অর্থই হ’লো একঘণ্টা টহল দেবার পর দু-রা সব বেহেড মাতাল হ’য়ে যায়।

আধঘণ্টা পরে আমরা এসে বামায় পা রেখেছি। ভণ্ডামি ক’রে কাঁচুমাচু মুখে অমনি ৎশুমুকি এসে কাপ্তেন মার্সেনকে বলেছে, কুলি-সহিসরা সবাই ভারি-ক্লান্ত হ’য়ে পড়েছে, আর তারা এক পাও নড়তে চাচ্ছে না, তারা সারা দিন এই বামাতেই কটিয়ে দিতে চায়। কাপ্তেন শুনে ভূত দেখার মতো চমকে উঠেছেন, আর ৎশুমুকির পেছন থেকে তোঙ্গানে তাঁকে ইশারা ক’রে সতর্ক ক’রে দিতে চাইলেও, একটু অবাক গলাতেই জানিয়েছেন, এই অনুরোধের কোনোই দরকার ছিলো না, কারণ আগেই তিনি ঠিক করেছেন যে এখানে তিনি লম্বা সময়ের জন্যে থামবেন। ৎশুমুকি একটু সংকুচিত হ’য়েই কেটে পড়েছে, আর তোঙ্গানে তার হাতদুটো তুলে তার বেজায় বিতৃষ্ণাটা প্রবল ভাবেই প্রকাশ করেছে মলিকের কাছে।

এই অপ্রত্যাশিত ছুটির সুযোগ নিয়ে আমরা গ্রামটা দেখতে বেরিয়ে পড়েছি। গ্রাম সম্বন্ধে বেশ কৌতূহলই হচ্ছিলো : এ-যাবৎ যতগ্রাম আমরা দেখেছি, এ- গ্রামটা যেন তাদের সবার থেকেই আলাদা, অন্যরকম।

ঢোকবার আগে আমাদের গিয়ে আগে উঠতে হয়েছে একটা কুঁড়েবাড়ির ছাতে, তারপর তারা ছাত থেকে ছাতে নিয়ে গেছে আমাদের, যতক্ষণ-না আমরা গিয়ে পৌঁছেছি মোড়লের কাছে।

এই গ্রামপ্রধান বেশ-বুড়োই, মস্ত-এক পাকানো গোঁফ আছে তার, দেখে মনে হচ্ছিলো আগে হয়তো কোনো সেপাইদের দলে ছিলো। লম্বা-একটা তামার পাইপ ফুঁকছে সে, আর সেটা যেই নিভে যাচ্ছে অমনি এক বাচ্চা-চাকর এসে সেটা আবার জ্বেলে দিয়ে যাচ্ছে।

গ্রামপ্রধান আমাদের দেখেই সাদরে অভ্যর্থনা করেছে, আপ্যায়নের ভঙ্গিতে একটু দোলোও দিয়েছে আমাদের। ভদ্রতায় আমরাই বা কম যাবো কেন? আমরাও আমাদের শুভেচ্ছার চিহ্ন হিশেবে কিছু উপহার দিয়েছি, আর তার বুড়ো চোখদুটো তাতে খুশিতে জুলজুল ক’রে উঠেছে। এ-সব ভদ্রতা-বিনিময়ের পর আমরা রীতিমতো পর্যটকদের ধরনে ঘুরে দেখতে বেরিয়েছি এই বামা গ্রাম।

চকের মধ্যে এক নাপিত খোলা হাওয়ায় ব’সে তার ব্যাবসা জমিয়ে বসেছে। তার আশপাশেই জমিয়ে বসেছে কয়েকটি ছোটোছেলে, তারা হাত-পায়ের নখ কেটে দেয়, পুরোনো একজোড়া কাঁচি আছে তাদের। একেকজনের মক্কেলের কাছ থেকে চার-চার কড়ি মেলে, এটাই তাদের কাজের দস্তুরি, কিন্তু মক্কেলদের কাটা নখগুলো মক্কেলদের ফিরিয়ে দিতে হয় তাদের-আর তারা গিয়ে গর্ত খুঁড়ে সেগুলো তক্ষুনি মাটি দিয়ে বুজিয়ে দেয়। কেন-যে এই অদ্ভুত রীতি এদের, তার কোনো মাথামুণ্ডু আমরা কেউই বুঝতে পারিনি।

কিছুটা দূরে এক হাকিম’ রুগি দেখছে, তাদের নিজেদের চিকিৎসাশাস্ত্র অনুযায়ী। আমরা দূর থেকে দাঁড়িয়ে তার চিকিৎসার একটা নমুনা দেখেছি। এক পঙ্গু, শুকিয়ে হাড্ডিসার, চিমশে, চোখদুটো কোটরে-বসা, জ্বরে থরথর ক’রে কাঁপছে। চারপাশে দর্শকদের ভিড়। তারই মাঝখানে হাকিমসায়েব তাকে মাটিতে শুইয়ে দিয়েছেন, তারপর তার মুখে মাখিয়ে দিয়েছেন ছাই, মুখটা শাদা হ’য়ে গেছে—এই দেশে শাদা হ’লো ভেলকি, ভোজবাজি—তারপর পাশে রেখেছে কাঠের তৈরি ছোট্ট-একটা মূর্তি, বুঝি কোনো সদয় দেবতারই মূর্তি হবে। তারপর, হুংকার দিয়ে, রুগির চারপাশ ঘিরে সে একটা উদ্দাম নৃত্য জুড়ে দিয়েছে-সে-কী হাঁকডাক আর সে-কী লম্ফঝম্প! তারপর রোগের মূল উৎস কোথায়, খুঁজে পেয়ে, সেটা আলতোভাবে ডলতে শুরু ক’রে দিয়েছে; আর তারপরেই, আচমকা, হাতসাফাই ক’রে ওখান থেকে বার ক’রে নিয়ে এসেছে একটা হাড়, সঙ্গে সে-কী উল্লসিত হুংকার! রুগি তক্ষুনি ধড়মড় ক’রে উঠে পড়েছে, চেঁচিয়ে বলেছে সে একেবারে সেরে গেছে—চাঙ্গা বোধ ক’রে চ’লে গেছে। আবারও তাহ’লে প্ৰমাণ হ’য়ে গেছে, আসলে বিশ্বাসই লোকের সব রোগ-তাপ সারিয়ে দেয়।

কিন্তু আমাদের এই রুগি বোধহয় পুরোটা সারেনি তখন। কারণ সন্ধের সময় সে নিজেই ধুঁকতে ধুঁকতে এসে হাজির হয়েছে আমাদের শিবিরে। আমাদেরই কুলি বা সহিসদের কাছে সে শুনেছে যে আমাদের সঙ্গে নাকি এক তুবাব হাকিম আছেন—তা এই শাদা ডাইনি-পুরুৎ যদি তাকে সারিয়ে দেন, কেননা কালো ওঝাটি তাকে পুরোপুরি সারাতে পারেনি! একটু পরীক্ষা ক’রে নিয়ে ডাক্তার শাতোনে তাকে একটোক কুইনিন খাইয়ে দিয়েছেন। রুগি তো ধন্যবাদ দেয়া থামাতেই চায়নি, তবে চ’লে যাবার সময় এমনভাবে ঘন-ঘন মাথা নেড়েছে যে বোঝাই গেছে এই ওষুধ তার আদপেই মনে ধরেনি —ওষুধের সঙ্গে যদি তাল রেখে নৃত্যগীত হুহুংকার লম্ফঝম্ফ নাই থাকলো, তবে সে আবার ওষুধ কী!

১২ ফেব্রুয়ারি। আজও, কালকের মতোই সেই একই বাহানা। বরং আরো- খারাপ, সারাদিনে আমরা কেবল একদফাই চলেছি এবং আগামী কালও এ-অবস্থার

কোনো হেরফের হবে না।

সকালে কিন্তু বেরিয়েছিলুম ভালোভাবেই।

ঠিক যখন আমাদের সারি চলার ছন্দটা খুঁজে পেয়েছে, ছুটতে ছুটতে কালকের সেই রুগি এসে হাজির। সে নাকি এতই ভালো বোধ করেছে যে হাকিমসায়েবকে সে আরেকবার কৃতজ্ঞতা জানাতে চায়। ডাক্তার তাকে কুইনিনের কতগুলো পুলিন্দা দিয়ে দিয়েছেন, সেইসঙ্গে ব’লে দিতে ভোলেননি কীভাবে সেগুলো ব্যবহার করতে হবে।

চলার পথে কোনো গোলমালই হয়নি। চলার ছন্দে একটা জ্যান্ত চাল এসেছে, কোত্থাও কোনো ঝামেলা নেই, লোকলস্করেরও কোনো নালিশ নেই। এমন ভালো দশা আমাদের পোড়াকপালে সইলে হয়।

যখন বিশ্রামের জন্যে থেমেছি, অমনি ৎশুমুকি এসে কাপ্তেন মার্সেনের কাছে কালকের মতোই বায়নাক্কা জুড়ে দিয়েছে : সবাই নাকি বেজায় কাহিল বোধ করেছে। কাপ্তেন জানিয়েছেন ৎশুমুকি ঠিকই বলেছে, আজ রাতে আর আমরা বেরুবো না—কালও সারাদিন বেরুবো না, তারপর এত লম্বা-একটা ছুটির পর, পরশুদিন, একটানা বারোমাইল পথ না-গিয়ে আমরা আর থামবো না।

কাপ্তেন বেশ জোরগলাতেই, প্রায় চেঁচিয়েই, বলেছেন কথাগুলো যাতে কেউ তাঁকে আর ভুল বুঝতে না-পারে। কুলি এবং সহিসরা বুঝতে পারে ভবিষ্যতে অবস্থাটা অন্যরকম হবে। কাপ্তেনের জোরগলায় বলা কথাগুলি তাদের মনে দাগ কেটেছে। তারা এ-ওর মুখের দিকে আড়চোখে তাকাতে তাকাতে তক্ষুনি সে- জায়গা ছেড়ে কেটে পড়েছে।

সেই একই তারিখ, রাত এগারোটা। এই কাহনটা বড্ড-বেশি একঘেয়ে হ’য়ে উঠছে। অসহ্য।

আজ সন্ধেয়, ছটা নাগাদ, তখনও ফুটফুটে দিনের আলো আছে, হঠাৎ আমাদের কানে এসেছে সেই গুমগুম আওয়।জ, কান্কানে আমরা যে-আওয়াজ শুনেছিলুম– আর মোরিলিরের কীর্তিকলাপ যে-রাতে ফাঁস হ’য়ে গিয়েছিলো, সে-রাতে সম্ভবত আমি একাই শুধু শুনেছিলুম।

আজও, অন্যবারের মতো, এই অদ্ভুত আওয়াজটা এসেছে পুবদিক থেকে। প্রথমে ভারি-ক্ষীণ, তবে অত-মৃদু নয় যে আমরা চিনতে বা শুনতে ভুল করবো। তাছাড়া, আমিই তো একা শুনিনি আওয়াজটা। গোটা শিবিরই আকাশের দিকে বিস্ফারিত চোখে তাকিয়েছে-আর আফ্রিকিদের মধ্যে বেশ একটা ভয়ের রেশ জেগে উঠেছে।

দিনের আলো ফটফট করছে, অথচ কিছুই আমরা দেখতে পাচ্ছি না। যেদিকেই তাকাই না কেন, আকাশ পরিষ্কার। এটা ঠিক যে পুবদিকে একটা উঁচু পাহাড়ের চুড়ো আমাদের দৃষ্টি খানিকটা আড়াল করেছে-ফলে সেদিকে যদি আওয়াজটার উৎস ঢাকা প’ড়ে গিয়ে থাকে। আমি দ্রুতবেগে পাহাড়টা বেয়ে উঠতে থাকি। যখন আমি যথাসম্ভব দ্রুতবেগে পাহাড়টার চুড়োয় ওঠবার চেষ্টা করছি, আওয়াজটা ক্রমশ তীব্র থেকে তীব্রতর হয়েছে—তারপরেই হঠাৎ থেমে গিয়েছে। আমি যখন চুড়োয় গিয়ে পৌঁছেছি, তখন চারদিক শুনশান, স্তব্ধ—কিছুই আর সেই স্তব্ধতা ভাঙছে না।

কিন্তু কানে কিছু শুনতে না-পেলেও, কিছুই কি নজরে পড়বে না? আমার সামনে দিগন্ত অব্দি ধু-ধু প’ড়ে আছে উপত্যকা, মাঝে-মাঝে শুধু ঘনঝোপ, আর লম্বা-লম্বা ঘাসের বন। পুরো উপত্যকাটাই ফাঁকা প’ড়ে আছে। মিথ্যেই আমি কষ্ট দিয়েছি চোখকে, মিথ্যেই তাকিয়ে দেখেছি দিগন্তরেখা। কিছুই আমার চোখে পড়েনি।

সেখানেই আমি অতন্ত্র শাস্ত্রীর মতো দাঁড়িয়ে থেকেছি, যতক্ষণ-না রাত্রি নেমেছে। আস্তে-আস্তে ঘনছায়া ছড়িয়ে গেছে উপত্যকায়, চাঁদ এখন শুক্লপক্ষের শেষদিকে পৌঁছেছে, অতএব আজ সে উঠবে দেরিতে, একটুক্ষণের জন্যে। এখানে বোকার মতো দাঁড়িয়ে থেকে আর লাভ নেই। আমি নিচে নামতে শুরু ক’রে দিই।

কিন্তু আদ্ধেকটা পথও নামিনি, অমনি আবার ঐ আওয়াজ শুরু হ’য়ে যায়। সত্যি –এ-যে দেখছি পাগল ক’রে ছাড়বে! যেমন আচমকা থেমে গিয়েছিলো, তেমনি আচমকা আবার শুরু হ’য়ে গেছে আওয়াজটা, তারপর আস্তে-আস্তে আওয়াজের তীব্রতা ক’মে গিয়েছে। যেন সে পুবদিকে ফিরে যাচ্ছে আবার। কয়েক মিনিট পরেই আবার ফিরে এসেছে স্তব্ধতা।

আমি চিন্তিতভাবে নিচে নেমে এসে আমার তাঁবুতে গিয়ে কয়েকটা ছোট্ট তথ্য লিখে রাখি আমার নোটবইতে।

১৩ই ফেব্রুয়ারি। বিশ্রামের দিন। যে যাঁর ইচ্ছে মতো দিন কাটিয়েছেন। মঁসিয় বারজাক সারাক্ষণ পায়চারি করেছেন। তাঁকে দেখে মনে হয়েছে হতভম্ব, এবং উদ্বিগ্নও।

মঁসিয় পঁসাঁ, একটা মস্ত গাছের তলায় ব’সে, তাঁর নোটবইতে কী-সব টুকেছেন, সম্ভবত সে-সব তাঁর দফতরের ব্যাপার। তাঁর পেনসিলের গতিবিধি দেখে মনে হচ্ছে তিনি যেন কীসের হিশেব কষেছেন—কীসের হিশেব? আমি তাঁকে জিগেস করতে পারি বটে, তবে তিনি কি আমার কৌতূহল মেটাবেন? আমার মাঝে- মাঝে সন্দেহ হয়, মঁসিয় পঁসাঁ বোবা কি না।

সাঁৎ-বের্যা?…হুম, সাঁৎ-বেরা কোথায় যেতে পারেন? সম্ভবত আফ্রিকার যাবতীয় মৎস্যকুলের মোকাবিলা করছেন

কাপ্তেন মার্সেনে মাদমোয়াজেল মোরনাসের সঙ্গে খোশগল্প জমিয়েছেন। তাঁদের এ-সময় গিয়ে বিরক্ত করা ঠিক হবে না।

শিবিরের অন্যপ্রান্তে তোঙ্গানে মলিকের সঙ্গে কোথায় যেন চলেছে। তাদেরও সময় কাটাতে কোনোই অসুবিধে হয় না।

কুলি আর সহিসরা এদিকে-ওদিকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে শুয়ে নাক ডাকিয়েছে— আর পাহারার ক-জনা ছাড়া অন্য সেপাইরাও তা-ই করেছে।

আমি? সারাটা দিন কাটিয়েছি কলম চালিয়ে, শাদা কাগজের সঙ্গে যুদ্ধ ক’রে। আমার নোটবইয়ের টুকিটাকিগুলো মিলিয়ে দেখে একটা নিবন্ধ শেষ ক’রে ফেলেছি। শেষ ক’রে তলায় দস্তখৎ বসিয়েছি। ৎশুমুকিকে ডেকে পাঠিয়েছি তারপর—এটাকে ডাকে ফেলবার ব্যবস্থা করতে হবে। ৎশুমুকির কোনো পাত্তাই নেই। একজন সেপাইকে তখন পাঠিয়েছি তাকে তলব দিতে। আধঘণ্টা পরে সে ঘুরে এসে বলেছে ৎশুমুকিকে সে কোত্থাও খুঁজে পায়নি। আমিও তারপর তার খোঁজ করেছি, উঁহু, তার কোনো পাত্তাই নেই। ৎশুমুকি কোথায় উধাও হ’য়ে গিয়েছে, অতএব লেখাটা ডাকে দেবার আশা আপাতত ত্যাগ করতে হবে।

১৪ই ফেব্রুয়ারি। আজ একটা দারুণ জমকালো ব্যাপার ঘটেছে। জমকালো, এবং তুলকালাম। আটটা নাগাদ, কারণ সকালের অনেকটা সময়ই গেছে ৎশুমুকির পাত্তা পেতে, আমরা তাকে ছাড়াই যখন চ’লে যাবার উদ্যোগ করছি, তখন পশ্চিমদিকে, অর্থাৎ বামার দিক থেকে, যেখান থেকে দু-দিন আগে আমরা এসেছি, আমরা দূর থেকে দেখতে পেয়েছি মস্ত-এক ফৌজ আসছে, সশস্ত্র বাহিনী।

আমার আগেই কাপ্তেন মার্সেনে তাদের দেখতে পেয়েছেন এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবার জন্যে নির্দেশ দিয়েছেন। চক্ষের পলকে আমাদের সেপাইরা দুশমনের মহড়া নেবার জন্যে তৈরি হ’য়ে গিয়েছে।

এইসব সতর্কতার অবশ্য কোনোই কারণ ছিলো না। ফরাশি উর্দিগুলো চিনতে আমাদের বেশি দেরি হয়নি। ফরাশি উর্দি বটে, তবে এ-দেশের দরকার মতো তার খানিকটা সংস্কার ক’রে নেয়া হয়েছে। যখন সেই অজ্ঞাত সেনাবাহিনী কাছে এসেছে, আমরা দেখতে পেয়েছি যত-বড়ো ব’লে ভেবেছিলুম, মোটেই তত-বড়ো দল নয়। পুরোদস্তুর সেনার উর্দি পরা কুড়িজন আফ্রিকি সৈন্য, সবাই ঘোড়ার ওপর, সেনাবাহিনীর রাইফেল সমেত সশস্ত্র, আর তিনজন শ্বেতাঙ্গ-তারাও ঘোড়ার পিঠে—একজনের পরনে আবার ঔপনিবেশিক পদাতিক বাহিনীর লিউটেনান্টের উর্দি।

নবাগতদের কাছে আমাদের একজন সার্জেন্টকে পাঠানো হ’লো, তারাও আগেই তাদের একজনকে আমাদের দিকে পাঠিয়েছে। দুই দূত পরস্পরের সঙ্গে কী-সব কথা বলেছে মাঝপথে, তারপর সেই ঘোড়সোয়ারবাহিনী আবার আমাদের শিবিরের দিকে কদম-কদম এগিয়ে এসেছে।

রাইফেল কাঁধে পুরো দলটাই আমাদের শিবিরে ঢুকে পড়েছে, আর তারপর তাদের নেতা অর্থাৎ লিউটেনান্ট কাপ্তেন মার্সেনের দিকে এগিয়ে এসেছে।

‘কাপ্তেন মার্সেনে?’

‘হ্যাঁ, লিউটেনান্ট – ‘

‘লিউটেনান্ট ল্যকুর, ৭২নং ঔপনিবেশিক পদাতিক বাহিনী—এখন একদল সুদানি স্বেচ্ছাসেবীর দল নিয়ে এখানে এসেছি। আমি আসছি বামাকো থেকে, কাপ্তেন—আর সিকাসোর ও-পাশে মাত্র কয়েকদিনের জন্যে আপনার সঙ্গে আমার দেখা হয়নি। তারপর থেকেই আমি আপনাদের পেছন-পেছন আসছি—’

‘কেন?’

‘আপনার নামে একটা সরকারি চিঠি আছে, তাতেই সব জানতে পাবেন।’ কাপ্তেন মার্সেনে চিঠিটা নিয়ে খুলে পড়তে শুরু ক’রে দিতেই তাঁর মুখে একসঙ্গে বিস্ময় আর হতাশার চিহ্ন ফুটে উঠেছে।

‘বেশ। লিউটেনান্ট, আমি গিয়ে মঁসিয় বারজাক আর তাঁর সহযাত্রীদের সব জানাচ্ছি। তারপর থেকে আমি আপনারই অধীনে যা বলবেন- ‘

কাপ্তেন মার্সেনে চিঠিটা নিয়ে আমাদের দিকে এগিয়ে এসেছেন।

‘আপনাকে একটা তাজ্জব খবর শোনাবার আছে, মঁসিয় ল্য দেপুতে। আমাকে আপনাদের ছেড়ে চ’লে যেতে হবে।’

‘আমাদের ছেড়ে চ’লে যাবেন?’

বিস্ময়ের এই অনতিস্ফুট আওয়াজটা এসেছে মাদমোয়াজেল মোরনাসের কাছ থেকে। হঠাৎ কে যেন সমস্ত রক্ত শুষে নিয়েছে তাঁর মুখ থেকে, কোনোরকমে অধর দংশন ক’রে নিজেকে তিনি সংযত রেখেছেন। তাঁর চরিত্রের দৃঢ়তা সম্বন্ধে আমার যদি আগের কোনো ধারণা না-থাকতো, তবে হয়তো ভাবতুম তিনি হয়তো কেঁদেই ফেলবেন। এর মানে কী, কাপ্তেন?’

‘মানে, মঁসিয় ল্য দেপুতে, হ’লো আমাকে সরকারিভাবে এত্তেলা পাঠানো হয়েছে, এক্ষুনি টিমবাক্‌টু গিয়ে হাজিরা দিতে হবে।’

‘সে-যে অচিন্ত্যনীয়!’ মঁসিয় বারজাককে কেউ যেন প্রচণ্ড-একটা ঘুষি কষিয়েছে। কিন্তু, তাহ’লেও, সত্যি,’ বলেছেন কাপ্তেন, এই নিন। চিঠিটা প’ড়ে দেখুন।’ মঁসিয় বারজাকের হাতে তিনি চিঠিটা তুলে দিয়েছেন তারপরে। লিউটেনান্ট ল্যকুরের নিয়ে-আসা এই তলবপত্র পড়তে-পড়তে চোখ কপালে উঠে গেছে মঁসিয় বারজাকের, বারে বারে মুখে রাগের আর নিন্দার ভঙ্গি ফুটে উঠেছে। পড়া শেষ ক’রেই আমাদের দিকে চিঠিটা বাড়িয়ে দিয়েছেন তিনি, যাতে আমরা নিজেরাই এই খামখেয়ালি ভঙ্গিটা সম্বন্ধে ধারণা করতে পারি।

রেপুবলিক ফ্রাঁসেঈ
গুভনম জেনেরাল দ্যু সেনেগল
সের্ক্লু দ্য বামোকো
ল্য কর্নেল :
কাপ্তেন পিয়ের মার্সেনে এবং তাঁর বাহিনীকে এক্ষুনি ডাবো -মার্চ ক’রে সেগু-সিকারো আসতে তলব করা হোক, যাতে নাইজার দিয়ে টিমবাকটু চ’লে আসতে পারেন : সেখানে অতঃপর তাঁকে সেই অঞ্চলের কম্যাণ্ড-কর্নেলের অধীন কার্যভার গ্রহণ করতে হবে। কাপ্তেন মার্সেনের সঙ্গে যত ঘোড়া আছে তাদের সেগু-সিকারোয় আস্তাবলে জমা দিয়ে আসতে হবে।
৭২ ঔপনিবেশিক পদাতিক বাহিনীর লিউটেনান্ট ল্যাকুর, ২০ জুন সুদানি স্বেচ্ছাসেবকের একটি দল নিয়ে, এক্ষুনি এই এত্তেলাপত্ত সিকাসোতে কাপ্তেন মার্সেনের কাছে পৌঁছে দেবেন; কাপ্তেন মার্সেনের অবর্তমানে লিউটেনান্ট ল্যকুরাই নাইজার নদীর বাঁকের অতিসাংসদ অভিযাত্রীবাহিনীর নেতা [প্রথম শাখা ] মঁসিয় ল্য দেপুতে বারজাকের সেবায় আত্মনিয়োগ করে তাঁকে তাঁর গন্তব্যস্থলে পৌঁছে দেবেন। বামোকোর সেক্লু-র কম্যান্ডিং কর্নেল
সাঁৎ-ওবান

আমি যখন পাঠকদের জন্যে জ্বোরোহাতে চিঠিটার একটা নকল করছি, মঁসিয় বারজাক তখন ফোঁস করে উঠেছেন : ‘অকথ্য! অকহতব্য! মাত্র কুড়িজনের একটা পাহারা!… ঠিক যখনই আমরা বিষম-মুশকিলের মধ্যে এসে পড়েছি!… কিন্তু এই চিঠিই এর শেষ কথা হবে না!… পারী ফিরে গিয়েই আমি সংসদে জানাবো কী মধুর ভাবে একজন সাংসদের সঙ্গে ব্যবহার করা হয়েছে এখানে! ‘

‘কিন্তু এদিকে তো হুকুমটা আমাদের মেনে নিতেই হবে।’ কাপ্তেন মার্সেনে তাঁর গলার স্বর থেকে ক্ষোভটাকে দূর করবার কোনো চেষ্টাই করেননি।

মঁসিয় বারজাক কাপ্তেন মার্সেনেকে একপাশে ডেকে নিয়ে গিয়েছেন। কিন্তু আমারও তো সাংবাদিকের কান, বড়ো-বড়ো, খাড়া-খাড়া আমি বেশ-ভালোই শুনতে পেয়েছি।

‘কাপ্তেন, এই হুকুমটা তো জালও হ’তে পারে!’

‘জাল!’ যেন আঁৎকেই উঠেছেন কাপ্তেন। ‘উঁহু, সে-কথা মোটেই ভাববেন না কিন্তু, মঁসিয় ল্য দেপুতে। দুর্ভাগ্যবশত চিঠিটা যে খাঁটি তাতে কোনো সন্দেহই নেই। চিঠিটায় সমস্ত সরকারি সীলমোহর আছে। তাছাড়া আমি কর্নেল সাঁৎ- ওবানের অধীনে কাজ করেছি-আমি তাঁর সইটা চিনি।’

মেজাজখারাপ হ’লে লোকে অনেক আবোলতাবোল কাজ ক’রে ফেলতে পারে –তবে এক্ষেত্রে আমার মনে হয়েছে মঁসিয় বারজাক বড্ড-বাড়াবাড়ি ক’রে ফেলেছেন। ভাগ্যিশ লিউটেনান্ট ল্যকুর তাঁর কথা শুনতে পাননি। শুনে, তিনি অত্যন্ত গ’লে যেতেন না।

মঁসিয় বারজাক আর-কিছু না-বলে গুম হ’য়ে থেকেছেন।

‘মঁসিয় ল্য দেপুতে, অনুগ্রহ ক’রে অনুমতি দিন লিউটেনান্ট ল্যকুরের সঙ্গে আপনার পরিচয় করিয়ে দিই। তারপর আমাকে বিদায় নিতে হবে।’

পরিচয়ের পালা শেষ হ’লে, মঁসিয় বারজাক সরাসরি জিগেস ক’রে বসেছেন : ‘আচ্ছা, লিউটেনান্ট, বলতে পারেন, হঠাৎ এমন-কোনো হুকুম পাঠানো হয়েছে কেন? এ-রকম একটা এত্তেলা?’

নিশ্চয়ই পারি, মঁসিয় ল্য দেপুতে,’ লিউটেনান্ট অমনি জবাব দিয়েছেন। তুয়ারেগ আউএলিমেনেরা খেপে উঠেছে, আমাদের আক্রমণ করবার মতলব এঁটেছে। সেইজন্যেই টিমবাটুর দুর্গদফতরে আরো সৈন্য চাই। হাতের কাছে যাকেই পাচ্ছেন, তাকেই ডেকে নিয়ে গিয়ে কর্নেল দল ভারি করছেন।’

‘কিন্তু আমাদের কী হবে?’ অভিযাত্রীদের নেতা জিগেস করেছেন। ‘আমাদের সুরক্ষার জন্যে মাত্র কুড়িজন লোক কি যথেষ্ট হবে?’

লিউটেনান্ট ল্যকুর শুধু স্মিত হেসেছেন। তাতে কোনো ঝামেলাই হবে না। এ-অঞ্চলটা সম্পূর্ণ শান্তশিষ্ট।’

‘সেটা অবশ্য নিশ্চয় ক’রে বলা যায় না,’ মসিয় বারজাক আপত্তি করেছেন। উপনিবেশ দফতরের মন্ত্রী স্বয়ং সংসদকে জানিয়েছেন এবং কোনোক্রির রাজ্যপালও তা সমর্থন করেছেন-যে নাইজার নদীর আশপাশের অঞ্চলে নাকি অশান্তি লেগেই আছে!’

‘আগে হয়তো তা বলা যেতো,’ লিউটেনান্ট ল্যকুরের মুখে তখনও স্মিতহাসি ‘তবে এখন আর তার কোনো প্রশ্নই নেই। ও-সব অশান্তি এখন প্রাচীন ইতিহাস।

‘কিন্তু আমরা নিজেরা যা দেখেছি…’ এই ব’লে মঁসিয় বারজাক আমাদের অভিজ্ঞতাটা কেমন, তা আদ্যোপান্ত খুলে বলেছেন।

তাতে কিন্তু লিউটেনান্টকে একটুও ঘাবড়ে যেতে দেখা যায়নি। ‘কিন্তু এটা আপনার বোঝা উচিত যে এই অজানা-অচেনা প্রতিদ্বন্দ্বীটি—যিনি আপনাদের অমনভাবে সারাক্ষণ নাজেহাল ক’রে চলেছেন—নিশ্চয়ই খুবই নগণ্য লোক আপনি বলতে চাচ্ছেন, তিনি আপনাদের রাস্তায় কেবলই বাধাবিপত্তি তৈরি ক’রে চলেছেন—কিন্তু একবারও সরাসরি সামনে এসে কোনো বাধা দেননি।… আপনি নিশ্চয়ই খুব ভেবেচিন্তে কথাটা বলেননি, মঁসিয় ল্য দেপুতে।’

মঁসিয় বারজাক যে কী বলবেন, ভেবেই পাননি।

কাপ্তেন মার্সেনে এগিয়ে এসে বলেছেন, ‘তাহ’লে অনুমতি করুন, মঁসিয় ল্যা দেপুতে, আমরা এবার বিদায় নিই।’

অ্যাঁ? এক্ষুনি? এত-শিগগির?’

‘উপায় কী বলুন?’ নাচার হ’য়ে বলেছেন কাপ্তেন মার্সেনে। ‘আমাকে সরকারিভাবে তলব করা হয়েছে। আমাকে আর কালবিলম্ব না-ক’রে সেগু সেকোরো এবং টিমবাক্‌টু গিয়ে হাজিরা দিতে হবে।’

‘তাহ’লে তা-ই করুন, কাপ্তেন, রাগ চেপে তাঁর হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন মঁসি বারজাক, ‘মনে রাখবেন আপনার সঙ্গে আমাদের সকলের শুভকামনা রয়েছে। একসঙ্গে এই ক-দিন আমরা যেভাবে কাটিয়েছি, তা আমরা কেউই ভুলবো না। আপনি যে সারাক্ষণ কী ক’রে অটুট কর্তব্যনিষ্ঠায় আপনার দায়িত্ব পালন ক’রে গিয়েছেন, তা আমরা সকলেই জানি।’

কাপ্তেন খুব নাড়া খেয়ে গিয়ে বলেছেন : ‘ধন্যবাদ, মঁসিয় ল্য দেপুতে তারপর তিনি এক-এক ক’রে আমাদের সকলের কাছ থেকেই বিদায় নিয়েছেন—আর, বলা বাহুল্য হবে যে, সবশেষে বিদায় নিয়েছেন মাদ্‌মোয়াজেল মোরনাসের কাছে। আমি আড়চোখে তাকিয়ে দেখেছি ব্যাপারটা।

‘অভ্যুয়া, মাদমোয়াজেল!’

‘অ্যভুয়া, কাপ্তেন!’

আর-কোনো কথাই নয়। কিন্তু যারা কোনো গোপন সূত্রে বাঁধা প’ড়ে গেছে তাদের কাছে এই ছোট্টকথাগুলোও গভীর-তাৎপর্যে ভরা। তার সঙ্গে মেশানো আছে শুভেচ্ছা, প্রেমপ্রীতি আর প্রতিশ্রুতি। পুনদর্শনায় চ।

কাপ্তেনের মুখে আবার শান্ত দৃঢ়তা। মাদমোয়াজেল মোরনাসের বাড়ানো হাতটায় ঝুঁকে পড়ে আলতো ক’রে চুমো খেয়েছেন তিনি, তারপরেই হনহন ক’রে এগিয়ে গেছেন, লাফিয়ে উঠেছেন তাঁর ঘোড়ার পিঠে, তাঁর বাহিনীর পুরোভাগে নিয়ে গেছেন তাঁর ঘোড়া।

আমাদের দিকে ফিরে শেষবার একটা সেলাম ঠুকে, কাপ্তেন মার্সেনে আকাশে তুলে ধরেছেন তাঁর উন্মুক্ত অসি-অমনি একশোজন ঘোড়সোয়ার কদম-কদম এগুতে শুরু করেছে-তারপর ক-মিনিটের মধ্যেই বাঁক ঘুরে তারা দৃষ্টির বাইরে চলে গেছে।

তারপর এই আমরা, লিউটেনান্ট ল্যকুরের সঙ্গে, এছাড়া আছে তাঁর দুই খাশ সহকারী আর কুড়িজন স্বেচ্ছাসেবী। একঘণ্টা আগেও এদের অস্তিত্বের কথাটাই আমরা জানতুম না। ঘটনাটা এমন তুলকালামবেগে চমকপ্রদভাবে ঘটেছে যে আমরা যেন স্তম্ভিত হ’য়ে গিয়েছি। আমি অবস্থাটা বোঝবার জন্যে শুধু তাকিয়েছি আমাদের নতুন বডিগার্ডদের দিকে, আর অমনি একটা তাজ্জব জিনিশ ঘ’টে গিয়েছে। প্রথম-নজরেই আমার সর্বাঙ্গে যেন একটা শিহরণ খেলে গিয়েছে। হঠাৎ মনে হয়েছে এ-লোকগুলো এমন, এদের সঙ্গে কোনো বনের পাশে নিরিবিলিতে দেখা হওয়াটা মোটেই সমীচীন নয়। কেন যেন আমার সারা গাটাই ছমছম ক’রে উঠেছে।