মৌনমুখর

৭ শিহরণ – দেবারতি মুখোপাধ্যায়

প্রথম প্রকাশ: বইমেলা ২০১৯, মাঘ ১৪২৫

দিলাম
ভ্রাতৃসম
ধ্রুব (শুভদীপ ভট্টাচার্য)-কে৷

প্রকাশকের কথা

দেব সাহিত্য কুটীর থেকে এবারের বইমেলায় প্রকাশিত হল দেবারতি মুখোপাধ্যায়-এর ‘৭ শিহরণ’ বইটি৷ এই বইটি লেখিকার সাতটি প্রাপ্তমনস্ক থ্রিলারের সংকলন৷ এখানে রয়েছে রুদ্ধশ্বাস সাতটি উপন্যাসিকা যেগুলির পরতে পরতে আঁকা হয়েছে রোমাঞ্চকর আতঙ্ক এবং উন্মোচিত হয়েছে বেশ কিছু অজানা সত্য, যেগুলি মানব মনের অন্ধকার অলিগলিতে হানা দিয়েছে৷ ছানবিন করে তুলে এনেছে বিচিত্র সব বিকৃতিকে৷ প্রতিটি উপন্যাসিকাতেই রয়েছে অপরাধী কিন্তু এরা কেউ তথাকথিত দাগি আসামী নয়৷ বরং, এখানে চারপাশের সুস্থ স্বাভাবিক মানুষের মনের অবচেতনে লুকিয়ে থাকা ক্লেদেরই খোঁজ করা হয়েছে৷

কোথাও কোথাও আবার উঠে এসেছে আদিম অরণ্যের কোনো বিলুপ্তপ্রায় উপজাতির-হাড়-হিম করা নানান প্রথা৷ কোনোটিতে উল্লেখিত হয়েছে অদ্ভুত কোনো অসুখের কথা৷ যার কবলে পড়ে মানুষ হয়ে উঠেছে ষড়রিপুকে অতিক্রম করে যাওয়া অপার্থিব কোনো সামাজিক কিছু প্রথার প্রভাব এবং সভ্য-অসভ্য জগতের সীমারেখা লীন হয়ে গেছে এই সংকলনের উপন্যাসিকাগুলিতে৷

প্রকাশক
কলকাতা বইমেলা
জানুয়ারি ২০১৯

.

মৌনমুখর

এক

চোট পেলে কি কেউ সেই আঘাত সহ্য করতে করতে ঘুমিয়ে পড়তে পারে? তাও আবার অবেলার ঘুম? আঘাতের তীব্রতাতেই তো ঘুম আসবে না৷ তন্দ্রার ছোট ছোট জালগুলো শক্ত হয়ে একে অপরের সঙ্গে জোড়ার আগেই যন্ত্রণার অনুভূতিতে সেই সূক্ষ্ম বাঁধনগুলো ছিঁড়ে যাবে৷

কিংশুক কিন্তু ওই অবস্থাতেই দিব্যি ঘুমোতে পারে৷ একটু আগেই সে অন্যমনস্ক হয়ে চলতে গিয়ে বাঁ পায়ে হোঁচট খেয়েছিল৷ খুব সামান্য হোঁচট নয়, বাঁ পায়ের বুড়ো আঙুলের নখটা প্রায় উঠে আসার জোগাড় হয়েছিল৷ মুহূর্তখানেকের জন্য পাটাকে অসাড় মনে হয়েছিল ওর৷ কিছুক্ষণ চেপে ধরে থেকে বারবার জলের ঝাপটা দিয়ে প্রায় মিনিট পনেরো পরে ব্যথা একটু কমেছিল৷

তারপর একটা পাথরের ওপর বসে দূরের ঝিম ধরা সূর্য দেখতে দেখতে ও স্রেফ ঘুমিয়ে পড়েছিল৷ ঘুমের মধ্যে বেশ অনেকদিন পরে ছেঁড়া ছেঁড়া স্বপ্নে দেখছিল শিবাঙ্গীকে৷ শেষের দিকের দাম্ভিক পাত্তা না দেওয়া শিবাঙ্গী নয়, প্রথম দিককার উচ্ছল শিবাঙ্গী৷ সেই যেদিন দুজনে দুর্গাপুর থেকে ট্রেন ধরে বর্ধমানের কৃষ্ণসায়রে গিয়েছিল৷ শিবাঙ্গী একটা রঙিন প্রজাপতির মতো উড়ে বেড়াচ্ছিল গোটা বাগানটায়, আর লাজুক মুখে পিঠে অফিসের ঢাউস ব্যাগ নিয়ে হাঁটলেও কিংশুকের মনে হচ্ছিল পৃথিবীর সব সুখ বুঝি দলা পাকিয়ে ওর কাছেই এসে জমা হয়েছে…!

এখন কী একটা পোকা কামড়াতে ধড়মড়িয়ে ও ঘুম ভেঙে উঠে দেখল, সন্ধে প্রায় নেমে এসেছে৷ শীতের বিকেল, তায় এদিকটা একেবারে ফাঁকা, পাঁচটা বাজতে না বাজতেই চারদিক অন্ধকার হয়ে আসে৷ কখনো-সখনো কোনো পথভোলা কুকুর ছাড়া এখন এখানে কেউ নেই৷

কিংশুক গলায় মাফলারটা ভালো করে বেঁধে উঠে দাঁড়াল৷ ও একাই এসেছিল৷ রোজই আসে৷ শীতে প্রায় শুকিয়ে থাকা বাঁকা নদীর দু’পাশে বালি আর নুড়িকাঁকর মেশানো চর, তার মাঝে মেলা বড় বড় পাথর ছড়ানো৷ সেরকম একটা পাথরের ঢিবির ওপরে গালে হাত দিয়ে বসে থাকে কিছুক্ষণ, উদাস চোখে আকাশপাতাল ভাবে৷ খুব ঘুম পেলে নরম ঘাসের ওপর চিত হয়ে শুয়েও পড়ে মাঝেমধ্যে৷

তারপর হঠাৎ একসময় ঝুপ করে সন্ধে নামে দূরের পিপুল গাছের পাতায় পাতায়৷ পাখিরা এদিক থেকে ওদিক ডানা ঝাপটাতে ঝাপটাতে উড়ে যায়৷ নরম চাদরের মতো ধোঁয়াটে সাদা কুয়াশায় ঢেকে যেতে থাকে চারদিক৷ শেষে যখন মশার কামড়ে সারা শরীর জ্বলতে থাকে, তখন কিংশুক উঠে দাঁড়ায়৷ একটা চাপা নিঃশ্বাস ফেলে অন্ধকারে ছায়ামূর্তির মতো ফিরে যেতে থাকে গ্রামের দিকে৷

তার দৈনিক অবসরযাপনের সময় শেষ৷ এবার আবার অবসাদের জীবনে ফিরে যাওয়া৷ আবার সেই বাড়িতে গিয়ে নিত্যদিনের অভিযোগ শোনা, বাবার খকখক কাশি, ভাইবোনের অভাবক্লিষ্ট মুখ আর মায়ের মুখঝামটা খাওয়া৷

তবে এখনই সে বাড়ি যাবে না৷ এখন সে যাবে একটা টিউশনি পড়াতে৷ এমনিতে সারাদিন ধরে বাড়িতে গাদা গাদা টিউশনির ব্যাচ পড়ালেও প্রতিদিন দুপুর থেকে সে মুখিয়ে থাকে সন্ধের জন্য, তার সবচেয়ে শাঁসালো টিউশনিটার জন্য৷

পরক্ষণেই নিজেকে শুধরে নেয় কিংশুক৷ না, শুধু টাকার জন্যই নয় মোটেই, কিছুটা বাচ্চাটার জন্যেও৷ নাহলে ও ক্লাস এইট, নাইনের নীচে আজকাল পড়ায়ই না, খামোখা ওয়ানের একটা বাচ্চাকে পড়াতে রাজি হবে কেন? শুধুই কি গ্রামের সবচেয়ে মান্যগণ্য ব্যক্তি প্রোফেসর অনুপ বড়ুয়ার ছেলে বলে? নাকি এতগুলো টাকার জন্য? নাকি, ছোট থেকে ওর মতো গরিবগুর্বো অথচ মাথা ভালো ছেলেমেয়েদের অনুপ বড়ুয়া সাহায্য করে আসেন, সেই কৃতজ্ঞতাবোধ থেকে?

এই সবকটাই একটা না একটা কারণ, তবে গৌণ৷ মুখ্য কারণটা হল অনুপ বড়ুয়ার একমাত্র ছেলে সাড়ে ছয় বছরের তুতুনের মিষ্টি মুখ আর নিষ্পাপ কথাবার্তা৷ সত্যি বলতে কি, সারাদিনের অবসাদ, ক্লান্তি, হতাশা নিমেষে উধাও হয়ে যায় যখন বাচ্চাটা আধো আধো কচি গলায় নানারকমের প্রশ্ন করে৷ কিংশুক পায়ে ব্যথা নিয়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটলেও তুতুনের কথা মনে পড়তেই ওর ঠোঁটের কোণে একটা আলতো হাসি খেলে গেল৷ হাঁটতে হাঁটতে ও টের পেল শুধু বাঁ পা নয়, হাতের কবজির কাছটায় যেন ছিঁড়ে গেছে কিছুটা৷ আলো প্রায় কমে এসেছে, ও ভালো করে দেখতে চেষ্টা করেও বুঝতে পারল না, অথচ জায়গায় জায়গায় জ্বলছে বেশ৷

অনুপ স্যার বলেই দিয়েছিলেন, ‘‘আমি তো অত দেখতে পারি না৷ কলেজ, শিক্ষাসমিতি, গ্রামের নানা সভা সামলে সময়ও পাই না৷ যে যাই বলুক, আমি তো জানি, তুই একসময় এই বিহারপুর গ্রামের সবচেয়ে ব্রাইট স্টুডেন্ট ছিলি৷ যদি একটু ছোট ভাইপোটাকে সন্ধেবেলা সময় দিস…৷’’ তারপর একটু থেমে বলেছিলেন, ‘‘ওই সময়ে তোর ব্যাচের ইনকাম নিয়ে চিন্তা করিস না৷ সে আমি পুষিয়ে দেব৷ আমি শুধু চাইছি, এই ছোটবেলা থেকে ওর ভিতটা ভালো করে তৈরি হোক৷ শুধু বইয়ের পড়াশোনা নয়, নানা ধরনের জানা অজানা বিষয়ে৷ আমার মনে হয় তুই-ই সবচেয়ে ভালো পারবি৷’’

কিংশুক তখন নতমুখে বড়ুয়াবাড়ির বিশাল বারান্দায় দাঁড়িয়েছিল৷ কথা সে চিরকালই কম বলে, শুধু একপাশে মাথা হেলিয়ে সম্মতি জানিয়েছিল, তারপর মৃদুকণ্ঠে বলেছিল, ‘‘কাল সন্ধে থেকে আসব তাহলে স্যার৷’’

ছ’মাস আগের সেই কথাগুলো ভাবতে ভাবতে আবার অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিল কিংশুক, ফলত আলগোছে একটা রাস্তার একটা নুড়িপাথরে একটু আগের ব্যথায় টাটিয়ে ওঠা বুড়ো আঙুলটা লাগতেই ও যন্ত্রণায় ‘উহ’ করে উঠল৷ কিন্তু তবুও থামল না, ঘড়িতে এর মধ্যেই ছটা পনেরো৷ তুতুন নিশ্চয়ই বইখাতা নিয়ে বৈঠকখানা ঘরে ওর অপেক্ষায় বসে আছে৷ আরো দেরি করলে মুশকিল৷ ও চলার গতি আরো বাড়িয়ে দিল৷

নদীর চর পেরিয়ে গ্রামের মধ্যে ঢুকে ও একটু থামল৷ দূরে সামন্তদের বিশাল বাড়িটা যেন অন্ধকারে দানবের মতো দাঁড়িয়ে আছে৷ এত বড় সাবেক আমলের বাড়ি, অথচ সাকুল্যে লোক থাকে হাতে গোনা৷ তবে এ আর আশ্চর্যের কী, কিংশুক ভাবল৷ ওদের এই গোটা বিহারপুর গ্রামটাই এখন প্রায় পরিত্যক্ত একটা পাড়াগাঁয়ে পরিণত হয়েছে৷ দুর্গাপুর শহর থেকে মাত্র ন’কিলোমিটার দূরে এই গ্রাম, আগে তবু লোকজন থাকত এখানে, বাসে করে কিংবা সাইকেলে চেপে চাকরি বা রোজগার করতে যেত দুর্গাপুরে৷ কিন্তু ইদানীংকালে বেশিরভাগ পরিবারই দুর্গাপুরে বা একেবারে কলকাতায় শিফট করে যাচ্ছে৷

ফলত এই বিহারপুর গ্রামটায় ছোট বড় পাকাবাড়িগুলো বলতে গেলে জনশূন্য হয়ে পড়ে থাকে৷

তবু তাদেরই মধ্যে যে ক’টা শিক্ষিত ভদ্র পরিবার এখনো বিহারপুরেই রয়ে গেছে, তাদের মধ্যে বড়ুয়াবাড়ি হল নামকরা৷ অনুপ বড়ুয়া এই চল্লিশ বিয়াল্লিশ বছর বয়সেই দুর্গাপুর আর ই কলেজের প্রোফেসর, আর তাঁর বাবা শ্যামাকান্ত বড়ুয়া ছিলেন বিহারপুর গ্রামের একমাত্র প্রাইমারি স্কুলের হেডমাস্টার৷ শ্যামাকান্ত বড়ুয়ার মতো কিছু শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষের একজোট প্রচেষ্টায় সেইসময় বিহারপুর গ্রামের তবু কিছুটা উন্নতি হয়েছিল৷ দুর্গাপুর থেকে ইলেক্ট্রিসিটি, টেলিফোনের লাইন সব এসে পৌঁছেছিল এখানে৷

তার ওপর একাত্তরের যুদ্ধের পর গ্রামের বাইরের দিকের দামোদরের চরে এসে ঘাঁটি গেড়েছিল পূর্ববঙ্গের কিছু সবহারানো মানুষ৷ তারাও সুখে দুঃখে মিলেমিশে ধীরে ধীরে বিহারপুরেরই মানুষ হয়ে উঠেছিল৷ কিন্তু গত কয়েকবছরে ক্রমাগত শহরে চলে যাওয়া বাড়তে থাকায় বিহারপুর এখন অনেক নির্জন হয়ে পড়েছে৷

ভাবতে ভাবতে কিংশুক আগুরিপাড়া দিয়ে দ্রুতপায়ে বড়ুয়াবাড়ির দিকে হাঁটছিল, হঠাৎ পেছন থেকে একটা চেনা গলায় ও চমকে তাকাল৷ রাস্তার টিমটিমে আলোয় দেখল ভোম্বল মোটরবাইক থেকে নেমে পাশে এসে ফ্যাকফ্যাক করে হাসছে, ‘‘কী রে কখন থেকে আলো ফেলছি৷ কোথায় যাচ্ছিস?’’

‘‘এই, অনুপস্যারের বাচ্চাটাকে পড়াতে৷’’ কিংশুক সহজ গলায় উত্তর দিল, ‘‘কবে এলি? দেখা করে আসবি চল স্যারের সঙ্গে৷’’

‘‘না ভাই৷ বেকার হ্যাজানোর টাইম নেই৷ আজই এসেছি৷’’ ভোম্বল ফস করে একটা সিগারেট ধরিয়ে বলল, ‘‘তা ছাড়া আমার সঙ্গে অনুপদা’র তেমন কথা নেই এখন৷’’

ভোম্বল আগে অনুপস্যারকে এ অঞ্চলের সবার মতো ‘স্যার’ বলত, তবে দুর্গাপুরে থিতু হওয়ার পর থেকে ইদানীং অনেককেই দাদা বলা শুরু করেছে, সেটা লক্ষ করেছে কিংশুক৷ ও একটু অবাক হয়ে বলল, ‘‘কথা নেই! কেন?’’

‘‘আরে ভাই আর বলিস না৷ দুর্গাপুরের সাকসেস স্কুলের নাম তো শুনেছিস৷ লাখদুয়েক টাকা ডোনেশন তো লাগেই, সঙ্গে অ্যাডমিশন টেস্টেও পাশ করতে হয়৷ আমার ছেলেটার জন্য তিন অবধি দিতে তৈরি ছিলাম, কিন্তু টেস্টে চার নম্বর শর্ট হচ্ছিল৷ অনুপ বড়ুয়ার কত হোল্ড তো জানিসই দুর্গাপুরে, তার ওপর ওই স্কুলের ও হল অ্যাডভাইসরি কমিটির মেম্বার, একবার বললেই হয়ে যেত৷ মুখের ওপর বলে দিল, পারব না৷ ভাবতে পারিস? এদিকে নিজের ছেলেটা ড্যাং ড্যাং করে ভরতি হয়ে গেল৷ শালা নিজের গ্রামের লোকের জন্য যে এইটুকু করে না …৷’’

কিংশুকের পায়ের টনটন তো ছিলই, মাথার ভেতরটাও আচমকা দপদপ করতে শুরু করল ওর৷ বিহারপুর গ্রামে থেকে কেউ যদি বলে অনুপ বড়ুয়া গ্রামের লোকের জন্য কিছু করে না, তবে সেটা শুধু জলজ্যান্ত মিথ্যে নয়, অকৃতজ্ঞতাও বটে৷

ও কথা আর না বাড়িয়ে মাথা নেড়ে বলল, ‘‘আসি৷’’

 কারও সঙ্গে বেশি কথা বলতে ভাল লাগে না৷ বিশেষ করে ভোম্বলজাতীয় লোকেদের সঙ্গে তো নয়ই৷

ভোম্বল কিন্তু ছাড়ার পাত্র নয়, বলতে লাগল, ‘‘আর তুই ওইটুকু বাচ্চাকে কী পড়াস?’’

‘‘ওই টুকটাক৷ জ্ঞানবিজ্ঞান, বাংলা অঙ্ক ইংরেজি, এইসব৷’’ কিংশুক এগোতে শুরু করল৷

‘‘অ! আমি একটু হাটতলার দিকে গেছিলাম৷ ছেলের বিকেলবেলা আবদার, নান্টুর দোকানের ঘুগনি খাবে৷ তাই আনতে গেছিলাম৷’’ ভোম্বল হাত নেড়ে বলল, ‘‘আজ তো আমাদের অফিসে ছুটি ছিল, তাই ভাবলাম ঘুরে আসি গ্রামে৷’’

কিংশুক কাষ্ঠ হেসে তাকিয়ে রইল৷ ওর নিজের মতো বেকারের কী বা ছুটি কী বা কাজ!

ভোম্বলের চেহারা অনেক চিকনাই হয়েছে৷ ওর গালের ওপর ভনভন করছে একটা মাছি৷

ভোম্বলের হঠাৎ কী যেন মনে পড়ে গেল, ‘‘ভালো কথা, রেলের গ্রুপ ডি’র ফর্ম ফিল আপ করেছিস ভাই? কাল তো পরীক্ষা৷’’

কিংশুক দায়সারা উত্তর দিল, ‘‘হ্যাঁ, ওই আর কি!’’

‘‘হ্যাঁ, ভালো করে পরীক্ষা দিবি৷ কারেন্ট অ্যাফেয়ারসটা ঠিকমতো পড়েছিস তো?’’ ভোম্বল আরো কাছে এসে বলল, ‘‘আর শোন, আমাদের বর্ধমান মিউনিসিপ্যালিটিতে সুইপারের পোস্ট বেরিয়েছে৷ আজই নোটিশ দেখলাম৷ তোর জন্য ফর্ম নিয়ে আসব পরের সপ্তাহে বাড়ি এলে৷ অ্যাপ্লাই করে দিবি, বুঝলি?’’

শীতের সন্ধে, তার ওপর মাফলারটা গলাতেই রয়ে গেছে, কানে মাথায় জড়ানো হয়নি৷ আর নদীর ধারটা কনকনে ঠান্ডা৷ কিংশুক টের পেল, ওর মাথা-ব্যথাটা এবার গলাতেও ছড়িয়ে পড়ছে৷ কেমন একটা জ্বরজ্বর লাগছে৷ তেতো গলায় ও বলল, ‘‘ভাই আসি৷ পরে কথা হবে৷’’

আগুরিপাড়াটা এমনিই নির্জন, এখানকার অর্ধেকবাড়িই তালাবন্ধ পড়ে থাকে৷ জনশূন্য রাস্তায় ভোম্বল আর ওর বাইকটা তেলরং ছবির সিল্যুয়েট হতে হতে মিলিয়ে গেল৷ কিংশুক সেদিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে আবার হাঁটতে লাগল৷

আর হাঁটতে হাঁটতে বিহারপুর গ্রামের একসময়ের সবচেয়ে মেধাবী ভালো ছেলেটার মুখ দিয়ে অজান্তেই একটা অকথ্য চার অক্ষরের গালাগাল বেরিয়ে এল৷

দুই

বসুন্ধরা রান্নাঘরেই ছিলেন৷ রান্না যে বিশেষ কিছু বাকি আছে তা নয়৷ রাতের রান্না সারা হয়ে গেছে, শুধু রুটি করা বাকি, সে দাশুকাকাই করে দেবে৷ তবু রোজই সন্ধেবেলাটা বসুন্ধরা রান্নাঘরে নানারকমের মুখরোচক জলখাবার নিজের হাতে বানাতে ভালবাসেন৷ তুতুন স্কুল, খেলাধুলো সেরে এসে খেতে চায়, কিছুক্ষণ পর ওর বাবাও এসে পড়েন৷ তা ছাড়া তুতুনের মাস্টার আসে৷ তাকেও দিতে হয়৷

আজ বসুন্ধরা বাদাম দিয়ে চিঁড়ের পোলাও বানিয়েছেন৷ কিছুটা করে পোলাও নিয়ে দুটো প্লেটে ভাগ করলেন, বাকিটা কড়াইতেই চাপা দিয়ে রেখে দিলেন৷ তুতুনের বাবা কলেজ থেকে ফিরলে ওটা আবার গরম করে দেবেন৷

প্লেট দুটো হাতে নিয়ে তিনি একটু গলা তুলে ডাকলেন, ‘‘দাশুকাকা-আ-আ৷ খাবারটা নীচে দিয়ে এসো৷’’

দাশুকাকা এমনিই একটু কানে খাটো, তার ওপর ভরসন্ধেবেলা তার আবার গোয়াল পরিষ্কার করার রোগ৷ বসুন্ধরা বুঝলেন যতই চেঁচান, দাশুকাকার কানে কথা যাবে না৷ তিনি আর দ্বিরুক্তি না করে রান্নাঘরের হুড়কোটা সাবধানে টেনে দিয়ে দু’হাতে প্লেট নিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নামতে লাগলেন৷

আট বছর আগে যখন বিয়ে হয়ে এ বাড়িতে এসেছিলেন, প্রথম প্রথম যেন কোনো দিশা পেতেন না৷ এত বড় বাড়ি, তার পেটে এতগুলো ঘর, গোয়াল, পুকুর, বাগান, সব মিলিয়ে জমজমাট কাণ্ড৷ দুর্গাপুরে বাপের বাড়িতে ছোট একতলা বাড়িতে মানুষ হওয়া বসুন্ধরার সঙ্গে বাগানের গাছগুলো, এমনকি বাড়ির দেওয়ালগুলোও যেন লুকোচুরি খেলত৷

বাড়িটা বানিয়েছিলেন বসুন্ধরার স্বামী অনুপ বড়ুয়ার দাদু নলিনী বড়ুয়া৷ তিনি ছিলেন আদতে আসামের লোক৷ আসাম থেকে তিনি যখন বাংলায় আসেন, তখন নাকি এই বিহারপুরে মাত্র কয়েক ঘর মানুষের বসবাস৷ তিনি দুর্গাপুরে চাকরি নেন আর এই গ্রামে পেল্লায় বাড়িটা তৈরি করেন৷ বাড়িটা যে খুব পুরোনো তা নয়, বড়জোর চল্লিশ-বিয়াল্লিশ বছরের হবে৷ কিন্তু বাড়িটার আদ্যিকালের প্যাটার্নের জন্য বেশি সাবেকি লাগে৷ বাইরে থেকে দেখে আন্দাজও করা যায় না বাড়িটা কত বড়৷ ঢোকার দরজাটা ছোট, ঢুকেই বড় উঠোন, মাঝখানে অনেকটা ফাঁকা জায়গা, তার একপাশে তুলসীমঞ্চ, অন্যপাশে গোয়ালঘর৷

গোয়ালে এখনো দুটো গোরু আছে৷ দাশুকাকাই সব দেখভাল করে, গোয়ালাও আসে রোজ সকালে দুধ দুইতে৷ উঠোন পেরিয়ে স্কুলবাড়ির ডিজাইনে লম্বা একটেরে বারান্দা, তাতে সার দিয়ে পরপর ঘর৷ মাঝখান দিয়ে দোতলায় যাওয়ার সিঁড়ি, সিঁড়ির দু’পাশে চারটে করে ঘর৷ একতলা দোতলা মিলিয়ে গোটা বাড়িতে একই মাপের ষোলোটা ঘর৷ এতগুলো ঘর যে বসুন্ধরার দাদাশ্বশুর কী ভেবে বানিয়েছিলেন ভগবানই জানেন!

এইসব ভাবতে ভাবতে বসুন্ধরা সিঁড়ি দিয়ে নামছিলেন, হঠাৎ থমকে গেলেন৷ সিঁড়ি দিয়ে কেউ একজন ওপরে উঠে আসছে৷

সাবেক প্যাটার্নের জন্য এই আরেক সমস্যা, সিঁড়িতে কোনো আলো নেই৷ বসুন্ধরার স্বামী আত্মভোলা পড়াশোনা নিয়ে থাকা মানুষ, তাঁকে বারবার বলেও কোনো লাভ হয়নি৷

বসুন্ধরা একটু সন্ত্রস্ত হয়ে থেমে গিয়ে বললেন, ‘‘কে?’’

‘‘আ-আমি কিংশুক৷’’ ছায়াটা অন্ধকারে কুঁকড়ে গেল, ‘‘তুতুন এখনো নীচে নামেনি দেখে খোঁজ নিতে আসছিলাম৷’’

বসুন্ধরা ভ্রূ কুঁচকে বললেন, ‘‘নামেনি মানে? ও তো কখন নীচে গিয়ে বৈঠকখানা ঘরে বসে আছে৷ আজ তো তাড়াতাড়ি খেলে চলে এসেছিল, মুখ হাত ধুয়েই নীচে চলে গেল৷’’ বসুন্ধরা সিঁড়ি দিয়ে আবার ওপরে উঠে এসে প্লেট দুটো টেবিলে রাখলেন, তারপর চিৎকার করলেন, ‘‘ও দাশুকাকা, কোথায় গেলে গো? একবার ওপরে এসো৷’’

আরো দুবার হাঁক দিয়ে বসুন্ধরা কিংশুক ছেলেটার পেছন পেছন সিঁড়ি দিয়ে নামতে লাগলেন৷ এই ছেলেটা গ্রামেই থাকে, বামুনদের ছেলে, বিয়ে হয়ে আসা ইস্তক দেখছেন৷ এখন ত্রিশ-বত্রিশ বয়স হতে চলল৷ পড়াশোনায় নাকি খুব ভালো ছিল, কিন্তু চাকরিবাকরি কিছুই তো পেল না৷ অবস্থাও খুব খারাপ৷ এই ছাত্র পড়িয়ে কত টাকা আয় হয় কে জানে! তার ওপর এত লাজুক, কথাই বলতে চায় না বেশি৷ বসুন্ধরার চোখে চোখ রেখে তো নয়ই৷ বিয়ে-থা’ও বোধহয় করবে না৷ আর করে বউকে খাওয়াবেই বা কী! বসুন্ধরা সাবধানে সিঁড়ি দিয়ে নামছিলেন৷

তবে তুতুনের এই মাস্টারকে খুব পছন্দ৷ কতবার বসুন্ধরা কোনো কাজে নীচে এসে দেখেছেন, তুতুন পড়তে পড়তে সটান মাস্টারের কোলে উঠে বসে আছে৷

কপট রাগে তিনি তখন ধমক দিয়েছেন, ‘‘ও কী হচ্ছে তুতুন? মাস্টারের কোলে কেউ ওঠে বুঝি? যাও বিছানায় গিয়ে বোসো৷’’

কিংশুক তখন আড়ষ্ট গলায় উত্তর দিয়েছে, ‘‘না, পড়া হয়ে গেছে৷ এখন ওকে গল্প শোনাচ্ছি৷ আমার কোনো অসুবিধে হচ্ছে না৷’’

বসুন্ধরা তখন হাসি চেপে সরে গিয়েছেন৷ তাঁর স্বামী বলেন এখন থেকেই ছেলেকে লেখাপড়ায় বেশি চাপ দিতে হবে না৷ তার চেয়ে নানারকমের গল্প শুনে মনের পরিধিটা বড় করুক৷

তা হবে, বসুন্ধরা স্বামীর ওপরে এই ব্যাপারে কোনো কথা বলেন না৷ তাঁর স্বামী ছাত্রাবস্থায় বিহারপুরের তো বটেই, গোটা দুর্গাপুর অঞ্চলেরই চোখধাঁধানো ছাত্র ছিলেন, একসময় বিহারপুর গ্রাম থেকে মাধ্যমিকে স্ট্যান্ডও করেছিলেন৷ পরে দুর্গাপুর আর ই কলেজ থেকেই ইঞ্জিনিয়ারিং, মাস্টার্স করে ডক্টরেট করেন, তারপর ওই কলেজেই অধ্যাপনা শুরু করেন৷ মাঝে কিছুদিন বিদেশেও ছিলেন৷ এত পণ্ডিত মানুষ, তিনি নিশ্চয়ই ছেলের কীসে ভালো হবে তা বসুন্ধরার চেয়ে ভালো বুঝবেন৷

নীচে নেমে বৈঠকখানা ঘরে তো নয়ই, কোনো ঘরেই তুতুনকে বসুন্ধরা খুঁজে পেলেন না৷ এর মধ্যে দাশুকাকা গোয়াল থেকে চলে এসেছে, সেও বাড়ির আশপাশ, বাগান সব খুঁজে দেখল৷ কিন্তু তুতুনকে কোথাও পাওয়া গেল না৷ বসুন্ধরার শাশুড়ি, অর্থাৎ অনুপ বড়ুয়ার মা সন্ধেবেলা আফিম খেয়ে ঝিমোন বলে নীচের এই শোরগোল তাঁর কানে পৌঁছল না, না হলে এখুনি হাঁউমাউ করে তিনি বাড়ি মাথায় তুলতেন৷

দিশেহারাভাবে বসুন্ধরা কিংশুককে বললেন, ‘‘কোথায় গেল বলুন তো! এই তো দশ মিনিট আগে ওপর থেকে হাত-পা ধুয়ে নীচে গেল৷’’

কিংশুকও কী করবে ভেবে পাচ্ছিল না৷ যে ঘরে তুতুন পড়ে, সেই ঘরের আলো জ্বলছিল, তুতুনের বইগুলোও বিছানার ওপর রাখা ছিল৷ কিন্তু বাচ্চাটা গেল কোথায়? চিন্তিতমুখে ও বড়ুয়াবাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল৷ এই বাড়ির পাশেই তার দুটো বন্ধু থাকে, মিকাই আর পরেশ, হাঁকডাক করে তাদের নিয়ে এল৷

মিনিট দশেকের মধ্যেই পাড়ার কিছু লোকজনও চলে এল৷ ছেলেরা টর্চ জ্বালিয়ে খুঁজতে বেরোল পাড়ায়৷ প্রোফেসর বড়ুয়া এখনো কলেজ থেকে ফেরেননি, দুশ্চিন্তা বাড়বে বলে তাঁকে কেউ ফোনও করল না৷

বিহারপুরের পঞ্চায়েত প্রধান বাবলু সমাদ্দারের বাড়ি পাশেই৷ খবর পেয়ে তিনি এসে বসুন্ধরাকে বললেন, ‘‘তুতুন কাছেপিঠে ওর কোনো বন্ধুর বাড়ি যায়নি তো বউমা?’’

বসুন্ধরা অনেকক্ষণ নিজেকে শক্ত রেখেছিলেন, কিন্তু নিজেকে প্রাণপণ সংবরণ করা সত্ত্বেও ধীরে ধীরে তাঁর দু’চোখ জলে ভরে আসছিল৷ বুকের ভেতরটা চিন্তায় কেমন তোলপাড় করছে৷ তাঁর ওইটুকু দুধের ছেলেটা ভর সন্ধ্যাবেলা নীচের ঘরে পড়তে বসে কোথায় চলে গেল?

বাবলু সমাদ্দারের সঙ্গে এমনিতে জমিজমা নিয়ে একটু বাদানুবাদ আছে, মাসকয়েক আগে পাঁচিল তোলা নিয়েও কিছু গরম বাক্যবিনিময় হয়েছিল৷ কিন্তু এখন তো সেই সময় নয়, উনিও ভালোভেবেই ছুটে এসেছেন৷

বসুন্ধরা মুখে আঁচল চাপা দিয়ে মাথা নাড়লেন, ‘‘এখানে ওর তেমন কোনো বন্ধু নেই কাকাবাবু৷ বিকেলটা যা একটু সামনের মাঠে বল নিয়ে ছোটাছুটি করে, একা একাই৷’’

কথাটা সত্যি৷ তুতুন এমনিতে বেশ হাসিখুশি, বয়সের ধর্ম মেনে বেশ ছটফটে হলেও এই বিহারপুর গ্রামে তার তেমন কোনো সঙ্গীসাথি নেই৷ কারণ সে পড়ে দুর্গাপুরের স্কুলে, এখানে খুব একটা মেশে না৷ বাড়ির গাড়ি তাকে রোজ স্কুলে দিয়ে আসে, নিয়ে আসে৷ আজও স্কুল থেকে গাড়ি তাকে নিয়ে এসেছিল বিকেল চারটে নাগাদ, তাকে বাড়িতে নামিয়ে ওই একই গাড়ি ফের চলে গিয়েছিল দুর্গাপুর৷ প্রোফেসর বড়ুয়াকে আনতে৷

বড়ুয়াবাড়ির সামনেটা গ্রামের কাঁচা রাস্তা, তার ওপাশে একফালি ফাঁকা জায়গা, তুতুন সেখানেই আপনমনে খেলত৷ দাশুকাকা বাড়ির মধ্যে থেকে মাঝে মাঝে এসে লক্ষ রাখত৷

‘‘আশ্চর্য তো! তাহলে বাচ্চাটা গেল কোথায়?’’ চিন্তিত গলায় বাবলু সমাদ্দার পাশের বাগদিপাড়ার একটা ছেলেকে ফোন করলেন, ‘‘কীরে তোরা ভালো করে খুঁজছিস তো?…না বলা যায় না, ছোট ছেলে, হয়তো আপনমনে তোদের পাড়ায় চলে গেছে পেছনদিক দিয়ে…মন্টেদের বল ওলাইচণ্ডীতলাটা একবার দেখতে…আমাকে ফোন করে জানাবি কিন্তু!’’ ফোনটা রেখে তিনি বসুন্ধরাকে বললেন, ‘‘তুমি চিন্তা কোরো না বউমা, আমার ছেলেরা সবাই খুঁজতে বেরিয়েছে৷ এক্ষুনি পেয়ে যাবে তুতুনকে৷ অনুপ বাড়ি ফিরলে ওর গাড়ির ড্রাইভারকেও বলছি সড়কের দিকটা …৷’’

বিহারপুর প্রধানত উগ্রক্ষত্রিয় অর্থাৎ আগুরিদের গ্রাম৷ এখানে আগুরিপাড়াটা সবচেয়ে বড়, এ ছাড়া আছে বাগদিপাড়া, দুলেপাড়া, বেনেপাড়া৷ বামুনপাড়াও আছে একটু দূরে, বাঁকা নদীর পাশে, যদিও সেখানে এখন ব্রাহ্মণ ঘরের সংখ্যা সাকুল্যে তিন-চারটে৷ বাবলু সমাদ্দারের ছেলেরা তো খুঁজছিলই, কিংশুক আর তার বন্ধুরাও আধঘণ্টার মধ্যেই সম্ভব অসম্ভব সব জায়গা চষে ফেলল, খেতের আলগুলোও বাকি রাখল না৷ কিন্তু তুতুনকে কোথাও পাওয়া গেল না৷

শ্রান্ত ভগ্ন মনে কিংশুক বড়ুয়াবাড়িতে এসে যখন ঢুকল, তখন ঘড়িতে সাড়ে সাতটা৷ অনুপ বড়ুয়া ফিরে এসেছেন, উন্মাদের মতো একে তাকে ফোন করছেন, তাকে ঘিরে নানারকমের শলাপরামর্শ করছে পাড়ার বয়স্করা৷

ওদিকে বসুন্ধরা ভেতরে বারবার অজ্ঞান হয়ে পড়ছেন, তাঁকে জল-বাতাস দিয়ে শান্ত করার চেষ্টা করছেন প্রতিবেশী মহিলারা৷

কিংশুকের ভেতরটা কেমন যেন আলোড়ন হচ্ছিল৷ ছোট থেকে সে এই গ্রামে জন্মেছে, বড় হয়েছে, এমন ঘটনা কখনো দেখেনি৷ বিহারপুরের মতো ছোট গ্রাম থেকে ভরসন্ধেবেলা একটা বাচ্চা ছেলে নিখোঁজ হয়ে যাওয়াটা খুব একটা স্বাভাবিক ব্যাপারও নয়৷ পাড়াগাঁ হলেও এখানে রাস্তাঘাটে আলোর ব্যবস্থা বেশ প্রতুল, তা ছাড়া এত ছোট গ্রাম বলে সবাই সবাইকে চেনে৷ তুতুন ছোট ছেলে, তাকে ওই সময়ে একা কেউ রাস্তায় দেখলে ঠিক বাড়িতে ফেরত দিয়ে যেত৷ তা ছাড়া এই গ্রামে বড়ুয়াবাড়ির আলাদা কদর৷

এমনিতেই কাল গ্রুপ ডি পরীক্ষা দিতে কলকাতা যেতে হবে বলে তার মনটা খিঁচড়ে ছিল৷ আর ভালো লাগে না এতটা ঠেঙিয়ে পরীক্ষা দিতে যেতে৷ বিকেল থেকেই মন কু ডাকছিল, বলা নেই কওয়া নেই, বুড়ো আঙুলে হঠাৎ চোট লাগল, তার ওপর রাস্তায় ভোম্বলের সেই চিমটি দেওয়া কথা তো আছেই৷ কিন্তু বিপদটা যে এইদিক দিয়ে আসবে ও কল্পনাও করতে পারেনি৷

কালও এইসময় ও তুতুনকে পড়িয়ে এ’বাড়ি থেকে বেরিয়েছে, যাওয়ার সময় স্যারের হাত ধরে তুতুন সুরেলা গলায় বলেছে, ‘‘ও স্যার, তুমি কাল আমাকে মামদো ভূতের গল্পটা বলবে তো?’’

কিংশুক তুতুনের গাল টিপে দিয়ে বলেছিল, ‘‘হোমওয়ার্কটা করে রাখবি, তাহলেই বলব৷’’

তুতুন তখন ঠোঁট ফুলিয়ে মাথা দুলিয়ে বলেছিল, ‘‘আমি করে রাখি না বলো? আমি তো গুড বয়, রোজ হোমওয়ার্ক করি৷’’

অত মিষ্টি একটা শিশু … কয়েক মিনিটের মধ্যে ভোজবাজির মতো কোথায় উবে গেল?

বাড়ির ভেতর থেকে আসা মৃদু কান্নার শব্দের জন্যই হোক বা তুতুনের নিষ্পাপ মুখটা মনে পড়ার জন্য, নিজের অজান্তেই কিংশুকের চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়তে লাগল৷

কী বিপদ হল ওইটুকু বাচ্চার?

তিন

ইদানীং চাকরির পরীক্ষা দিতে আসার সময় আলাদা করে কোনো উদ্বেগ বা অনুভূতি কাজ করে না কিংশুকের মধ্যে৷ ওই সেই যন্ত্রের মতো সকালবেলা বেরিয়ে সেন্টারে পৌঁছনো, পরীক্ষার হলে বসে অবজেক্টিভ কোয়েশ্চেনের উত্তর গোল্লা পাকিয়ে মার্ক করা, তারপর ঘণ্টা বাজলে জমা দিয়ে বেরিয়ে এসে নির্বিকার মুখে বাসে চেপে হাওড়া পৌঁছে ট্রেন ধরা৷ বেশিরভাগ পরীক্ষার বয়সও আর নেই, তাই এখন ঝামেলাও কমে গেছে অনেক৷ আর এই সমস্ত পরীক্ষায় পঙ্গপালের মতো ভিড় হয়, হাজারখানেক সিটের জন্য লাখপঞ্চাশেক ছেলেমেয়ের মারামারি৷ আর পোষায় না যেন!

বছরসাতেক আগে যখন প্রথম পরীক্ষা দিতে শুরু করেছিল, তখন অবশ্য খুব আগ্রহ থাকত৷ মা সকালে উঠে দইয়ের ফোঁটা পরিয়ে দিত কপালে, ও পরিষ্কার শার্ট প্যান্ট পরে নতুন পেন-পেন্সিল নিয়ে বেরিয়ে পড়ত৷ এমনিতে সারাদিন একের পর এক টিউশনি থাকত, কিন্তু পরীক্ষা থাকলেই সেগুলো বন্ধ করে দিত৷ ব্যাংক, রেল, রাজ্য সরকার, কেন্দ্রীয় সরকার, সিভিল সার্ভিস কোনো কিচ্ছু বাদ দিত না৷ বাদ দেবেই বা কেন? হোক গরিবের ছেলে, হোক ওর বাবা সামান্য আনাজওয়ালা, ওদের ব্যাচে বিহারপুরের সবচেয়ে ভালো ছেলে তো ও-ই ছিল৷

কিন্তু তারপর একে একে স্বপ্ন ভাঙতে শুরু করল৷ কোনোটায় প্রিলিমিনারিতে উতরে মেইন পরীক্ষায় কেটে যায়, কোনোটায় দুটোই পাশ করে ইন্টারভিউয়ের পর দ্যাখে নাম নেই৷

হল থেকে বেরিয়ে একটা সিগারেট ধরিয়ে বাসে ওঠে কিংশুক, আনমনে ভাবতে থাকে, এই করতে করতে এতগুলো বছর কেটে গেল৷ প্রথম প্রথম মা একটা ধাপ পেরোলেই ওলাইচণ্ডীতলায় মানত করত, রাতদিন ঠাকুরের আসনে মাথা ঠুকত, তারপর আস্তে আস্তে সেই ভক্তির জায়গা নিল হতাশা অস্থিরতা, শেষে বিরক্তি৷

মাঝে একবার সব ছেড়েছুড়ে দুর্গাপুরে একটা প্রাইভেট কোম্পানিতে মেডিক্যাল রিপ্রেজেন্টেটিভের কাজ নিয়েছিল কিছুদিন৷ বি. এসসি-টা বায়োসায়েন্সে করেছিল বলে ওই চাকরিটা পেতে খুব একটা অসুবিধা হয়নি৷ মাইনে আহামরি না হলেও খুব খারাপ ছিল না৷ কিন্তু হাড়ভাঙা খাটুনি আর ক্রমাগত চাকরি হারানোর রক্তচক্ষুর ভয় সামলাতে সামলাতে ক্রমশ বুঝেছিল এর চেয়ে ওর টিউশনি পড়ানো অনেক শান্তির৷

তারপর বৈশাখের ঝড়ের মতো জীবনে এল শিবাঙ্গী৷ এসে যেন কয়েক মাসের মধ্যে লণ্ডভণ্ড করে দিয়ে গেল সবকিছু৷ সেই এপিসোড মনে পড়তেই মাথার ভেতর যেন পোকা কিলবিল করতে থাকে ওর৷

সেই যে ভয়ঙ্কর ডিপ্রেশন…সেই যে ভয়ঙ্কর পরিণতি…কীভাবে যে টলতে টলতে সব ছেড়েছুড়ে বাড়ি ফিরেছিল সেসময়, সেটা ও-ই জানে৷ আতঙ্কে, হতাশায় কারও সঙ্গে কথা বলত না তখন ও৷ সেই সময়েও এই অনুপ বড়ুয়াই ত্রাতা হয়ে এগিয়ে এসেছিলেন, পুলিশি ঝুটঝামেলা থেকে ওকে মুক্ত করতে উদ্যোগ নিয়েছিলেন৷

সময় সবকিছুকেই থিতিয়ে দেয়৷ ধীরে ধীরে ও-ও মূলস্রোতে ফিরেছিল৷ বিহারপুরে ফিরে আবার শুরু করেছিল সরকারি চাকরির প্রস্তুতি৷ সঙ্গে টিউশনি৷ সেসময় মা ওকে অনেক মনোবল জুগিয়েছিল৷ তখনো হয়তো মা’র মনে আশা ছিল৷

কিন্তু শেষে যেদিন ওর থেকে পড়াশোনায় অনেক খারাপ ভোম্বলও বর্ধমান মিউনিসিপ্যালিটিতে লোয়ার ডিভিশন ক্লার্কের চাকরি জুটিয়ে ফেলল, সেদিন মা বলেই ফেলল, ‘‘ভোম্বলও পেয়ে গেল, আর তুই পেলি না! সারাদিন বসে বসে বাড়ির অন্ন ধ্বংস করছিস, লজ্জা করে না তোর? ওই ক-টা টিউশনির টাকায় কী হয়?’’

মনে পড়লে আজও চোয়াল শক্ত হয়ে ওঠে কিংশুকের৷

ভোম্বল ছিল ওদের স্কুলের মার্কামারা ছেলে, ক্লাস সেভেন থেকেই সবরকম নেশায় সে হাত পাকিয়ে ফেলেছিল৷ দামোদরের চরে বসে ভোম্বল যখন অবলীলায় একের পর এক সিগারেট ফুঁকত, কিংশুক তখন ওদের টিমটিমে মাটির ঘরের একচিলতে ঘরের নিবু নিবু আলোয় ত্রিকোণমিতি কষত৷ গ্রামের সবাই মাথা দুলিয়ে বলত, আহা! লালু নিজে আনাজ বেচলে কী হবে, ওর ছেলেটা একদিন গ্রামের মুখ উজ্জ্বল করবে গো!

কিন্তু তা হল না৷ ভোম্বল দাস জাতে নাপিত হলে কী হবে, তার বাবা রতন দাস ছিল দুর্গাপুর স্টিল প্ল্যান্টের জুনিয়র ইঞ্জিনিয়ার৷ ছেলে কোনোমতে টেনেটুনে গ্র্যাজুয়েট হতেই তাকে পাঠিয়ে দিল কলকাতার এক নামজাদা কোচিং সেন্টারে, সরকারি চাকরির কোচিং নিতে৷ ততদিনে দুর্গাপুর কলকাতা মিলিয়ে ওদের খানচারেক ফ্ল্যাট, বছরে দুবার দেশভ্রমণ করলে কী হবে, ভোম্বল দিব্যি জাতে নাপিত হওয়ার সুবিধা পেয়ে যেতে লাগল৷

তখন কলকাতায় পরীক্ষা দিতে গেলেই কিংশুক ওর সঙ্গে দেখা করত, কখনো কখনো রাত হয়ে গেলে ভোম্বলের ফ্ল্যাটে থেকেও যেত৷ তখনই দেখত, যে পরীক্ষার ফর্ম কিংশুক ফিল আপ করেছে নিজের রক্তজল করা টিউশনির পাঁচশো টাকা দিয়ে, সেই পরীক্ষাতেই ভোম্বল বসছে মাত্র পঞ্চাশ টাকায়৷ যতই দিনে দুশো টাকা ধোঁয়ার পেছনে ওড়াক, ভোম্বল যে জাতে নাপিত! আর কিংশুক? যতই তার বাবা পঞ্চাশ টাকা উপায় করতে সারাদিন কাবার করে ফেলুক, যতই তার মা রান্নার কাজ নিক, সে যে কুলীন ব্রাহ্মণ!

শুধু তাই নয়, ভোম্বল প্রতিটা পরীক্ষার আগে ফ্রিতে সরকারের পক্ষ থেকে কোচিংও পেতে লাগল৷ ফলে, বিহারপুর গ্রামের ধ্যাড়ানো ছেলে দু-বছর ধরে মোটা টাকার কোচিং ইন্সটিটিউটে, সরকারের ফ্রি টিউশনে একটা কেরানির চাকরি জুটিয়ে ফেলল৷ সবচেয়ে মজার কথা, যে চাকরিটা পেল, তাতে সব মিলিয়ে ভোম্বল পেয়েছিল পঞ্চান্ন, আর কিংশুক? ওই একই পরীক্ষায় সাতাত্তর৷ কিন্তু তবুও কিংশুক ডাক পেল না, আর ভোম্বলের চাকরিটা হয়ে গেল৷ কোটায়৷

পুড়তে পুড়তে সিগারেটটা কখন ছোট হয়ে এসেছিল কিংশুক খেয়ালই করেনি, হাতে আগুন এসে লাগতেই চমকে উঠে অবশিষ্ট অংশটা জানলা দিয়ে ফেলে দিল৷ যে ভোম্বল স্কুলের প্রতিটা পরীক্ষায় ওর থেকে টুকত, পরীক্ষার আগে করুণ মুখে ওর বাড়ি এসে সাজেশন নিয়ে যেত, সে-ই কিনা ওকে এখন স্যুইপারের পোস্টে অ্যাপ্লাই করার পরামর্শ দিচ্ছে৷ শালা!

আর কিংশুকের নিজেরও দোষ কিছু কম নেই, ও নিজেও সেটা বোঝে৷ সারাদিনে যদি চোদ্দ থেকে পনেরো ঘণ্টা টিউশনি পড়াতে হয়, নিজে কখন পড়বে? কিন্তু না করেও উপায় নেই৷ বাবার কাশিটা দিন দিন বেড়েই চলেছে, মাঝে মাঝেই সকালবেলা উঠে আর বাজারে বসতে পারছে না, ঘুষঘুষে জ্বর আসছে৷ মা একা আর কত টানবে! ওদিকে কিংশুকের পরে দুটো ছোট ছোট ভাইবোন, একজন পড়ে সিক্সে, অন্যজন জড়বুদ্ধি, নিজের কাজটুকুও সে করতে পারে না ঠিকমতো৷

আজ পরীক্ষা দিতে আসার ইচ্ছেও ছিল না, একে তুতুন নিরুদ্দেশ হয়ে যাওয়ার পর গোটা গ্রামে একটা অদ্ভুত নীরবতা থমথম করছে৷ সকালে উঠেও ভেবেছিল আসবে না, কিন্তু মা’র ক্রমাগত খিটখিটে শেষে বিরক্ত হয়ে বেরিয়ে পড়েছিল৷

ভাবতে ভাবতে হাওড়া স্টেশন প্রায় এসে গিয়েছিল, হঠাৎ ফোন বেজে উঠতে ও বাসের হাতল ধরে উঠে দাঁড়িয়ে রিসিভ করল, ‘‘হ্যালো?’’

ওপাশ থেকে মিকাইয়ের গলা শোনা গেল, ‘‘তুই কোথায়?’’

‘‘এই তো, এবার ট্রেন ধরব৷ কেন?’’ কিংশুক রাস্তার গাড়ির আওয়াজের মধ্যে চেঁচিয়ে বলল৷

ওপাশে মিকাই যেন একটু থমকে গেল, ‘‘একটু তাড়াতাড়ি ফিরে আয়৷’’ তারপর সামান্য কাঁপা গলায় বলল, ‘‘আজ একটু আগে নদীর চরে তুতুনের বডি ভেসে উঠেছে৷’’

কিংশুকের মাথাটা কেমন ঘুরে গেল হঠাৎ, সিটের সামনের হ্যান্ডলটা শক্ত করে ধরে ও কোনোমতে বলতে পারল, ‘‘ক-কী বলছিস তুই এসব!’’

‘‘ঠিকই বলছি৷ কাঁকসা থানা থেকে পুলিশ আসছে৷ আমরা সবাই এখানেই রয়েছি৷ তুই যত তাড়াতাড়ি সম্ভব চলে আয়৷’’ মিকাইয়ের কথাটা শেষ হতেই ফোনটা পিঁ পিঁ শব্দ করে কেটে গেল৷

কিংশুকের মাথাটা প্রচণ্ড ঘুরছিল৷ এমন কেন হয়? বারবার? বারবার ওর কাছের মানুষগুলোকে কেন এভাবে কেড়ে নেয় ওপরওয়ালা? ওর চোখের সামনেটা কেমন যেন কালো হয়ে আসছিল, ব্লগ ব্লগ আওয়াজে মনে পড়ে যাচ্ছিল একবছর আগের সেই ঘটনাটা৷ সমরেশের সেই গ্যাঁজলা ভর্তি মুখ, উলটোনো স্থির চোখের মণি …৷

শিহরনে, আতঙ্কে কিংশুক চোখ বুজে ফেলল৷ কন্ডাকটরের ‘‘হাওড়া এসে গেছে, হাওড়া হাওড়া!’’—এর মাঝে বাসের মেঝেতে দড়াম করে ওর পাঁচ ফুট দশ ইঞ্চির শরীরটা অচেতন হয়ে পড়ে গেল৷

চার

বিহারপুর গ্রাম কাঁকসা থানার আন্ডারে৷ থানার ওসি বিপুলকেতন বসু তাঁর জিপগাড়িতে করে যখন বিহারপুর গ্রামে এসে পৌঁছলেন, ততক্ষণে বাঁকা নদীর চরে লোক থিকথিক করছে৷ বাঁকা দামোদরের একটা মৃতপ্রায় শাখানদী, একসময় গোটা বর্ধমান জেলায় অনেক জলের জোগান দিলেও কালের নিয়মে এখন প্রায় নালায় পরিণত হয়েছে৷ বর্ষাকাল ছাড়া অন্যসময় হাঁটু অবধি মেরেকেটে জল থাকে৷ এমন নদীতে সাঁতার না জানলেও ডুবে যাওয়া খুব আশ্চর্য ব্যাপার৷ তার চেয়েও আশ্চর্যের ব্যাপার, তুতুন সন্ধ্যাবেলা বাড়ি থেকে বেরিয়ে বাঁকা নদীর চরে গেল কী করে৷

ফুট চারেকের লাশটাকে ভাসতে দেখলেও এতক্ষণ পুলিশ আসার অপেক্ষায় কেউ সেদিকে যায়নি৷ বিপুলকেতন গাড়ি থেকে নেমেই কনস্টেবলদের নির্দেশ দিলেন বডি ডাঙায় নিয়ে আসার জন্য৷

আশপাশে ক্রমাগত মানুষের ভিড় আর গুঞ্জন বেড়েই চলেছে৷ বিপুলকেতন ভিড় পাতলা করতে বলে সরু চোখে চারপাশটা দেখতে লাগলেন৷ এখানকার পঞ্চায়েত প্রধান বাবলু সমাদ্দারের জেলা রাজনীতিতে বেশ দাপট আছে, সে কারণে খবর পেয়েই সঙ্গে সঙ্গে ছুটে এসেছেন তিনি৷ তা ছাড়া অনুপ বড়ুয়া, মানে যাঁর ছেলে মারা গেছে, তিনিও এখানকার বেশ মান্যগণ্য লোক, দুর্গাপুরেও ভালো পরিচিতি আছে৷

মিনিট দশেকের মধ্যেই তুতুলের লাশটা ধরাধরি করে ডাঙায় নিয়ে আসা হল৷ পুলিশ যতই ভিড় পাতলা করার চেষ্টা করুক, সবাই ওইটুকু শিশুর ক্ষতবিক্ষত মৃতদেহটা দেখে চমকে উঠল৷ বাবলু সমাদ্দার পোড় খাওয়া লোক, সারাজীবন রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থেকে খুন-রাহাজানি কম দেখেননি, তাঁর মুখ দিয়ে পর্যন্ত অস্ফুটে বেরিয়ে এল, ‘‘ই-ইশ! এ কী!’’

চমকে ওঠারই কথা৷ জলের মধ্যে সারারাত পড়ে থেকে তুতুনের হাত পা শরীর সাদা হয়ে সিঁটিয়ে গেছে, রক্তশূন্য ঠোঁট দুটো ফ্যাকাশে হয়ে খোলা রয়েছে সামান্য৷ পেট কিছুটা ফোলা, বোঝাই যাচ্ছে জল ঢুকে রয়েছে৷ কিন্তু সেসব আতঙ্কের কারণ নয়৷ সবাই কেঁপে উঠছে তুতুনের মাথার দিকে চেয়ে৷ কোনো নির্দয় জন্তু ভারী কিছু দিয়ে আঘাত করে থেঁতলে দিয়েছে তুতুনের মাথাটার একপাশ৷ রক্ত-ঘিলু-মাংসে মাখামাখি হয়ে থাকা সেই ক্ষতবিক্ষত জায়গাটা জলে-কাদায় বীভৎস দেখাচ্ছে৷

বিপুলকেতন সেদিকে কিছুক্ষণ তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে রইলেন, তারপর এস আই রামেশ্বরকে ডাকলেন, ‘‘দুর্গাপুরে খবর পাঠাও৷ ফরেনসিকের লোক পাঠাতে হবে৷ আজ বিকেলের মধ্যেই পোস্টমর্টেমে পাঠাব, সেটাও জানিয়ে রেখো৷ আর একটা ম্যাটাডোর আনাও, ঠিকমতো প্রিজার্ভ করে যেন বডি নিয়ে যায়৷’’

এস আই রামেশ্বর বিহারপুরেরই পাশের গ্রাম ন’ডিহার ছেলে৷ অনুপ বড়ুয়াকে সে খুব ভালো করে চিনত৷ বসের কথায় ঘাড় নেড়ে মুখ দিয়ে একটা আপশোশের শব্দ করে বলল, ‘‘আহা, ওইটুকু ছেলেকে কীভাবে মেরেছে দেখেছেন স্যার? কোনো জানোয়ার-টানোয়ার হবে কি?’’

‘‘সেটা এখনো বুঝতে পারছি না৷’’ বিপুলকেতন কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে বিড়বিড় করলেন, ‘‘চরটা ভালো করে খেয়াল করছ? এপাশটায় জনবসতি শুরু হয়ে যাচ্ছে, বাকি দিকগুলো জলায় ঢাকা৷ শীতকালে ওই রুক্ষ জলায় কি কোনো ভয়ঙ্কর জন্তু এসে ঘাঁটি গাড়ল নাকি! কিন্তু জানোয়ার শুধু মাথা থেঁতলে দেবে কেন! শরীরে তো অন্য কোনো আঘাত নেই৷’’

এস আই রামেশ্বর বলল, ‘‘তবে কি ডুবিয়ে মেরেছে স্যার?’’

বিপুলকেতন বডিটাকে ভালো করে জরিপ করতে করতে বললেন, ‘‘হাত-পা ফোলা নয়৷ পেটটাও লক্ষ করো৷ ডুবে মরলে আরো অনেক বেশি জল শরীরে ঢুকত, এত অল্প ফোলা থাকত না৷ আমার মনে হয় পোস্টমর্টেমে ফুসফুসে কোনো জল পাওয়া যাবে না৷ মাথার ওই ইনজুরিটাই মৃত্যুর কারণ৷ পরে ডুবিয়ে দেওয়া হয়েছে৷’’

বাবলু সমাদ্দার অনেকক্ষণ ধরে দাঁড়িয়েছিলেন চরে, এবার এগিয়ে এসে বললেন, ‘‘এ কী সর্বনেশে কাণ্ড বলুন দিকি স্যার আমাদের গ্রামে৷ এত বচ্ছরে কোনোদিনও এত বড় ঘটনা এখানে ঘটেনি৷’’

বিপুলকেতন কিছু না বলে তাকালেন বাবলু সমাদ্দারের দিকে৷ শুধু রামেশ্বর নয়, অনেকেই হাবেভাবে বলেছে এই সমাদ্দার অতি ঘোড়েল লোক৷ আগের পার্টি ক্ষমতায় থাকার সময় প্রচুর সুবিধা নিয়েছে, এখন সিংহাসন বদল হতেই সুবিধাবাদীর মতো নতুন দলে চলে এসেছে৷ চ্যাংড়া বয়সে বোমাবাজিও নাকি করত, এখন হয়তো বয়সের সঙ্গে একটু শুধরেছে৷ বিপুলকেতন আগের বছর এই গ্রামের এক অনুষ্ঠানে এসেছিলেন, তখনই আলাপ হয়েছিল সামান্য৷

বড়ুয়াবাড়ির সঙ্গে এর কোনো জমিজমা বা অন্য কিছু সংক্রান্ত কোনো ঝামেলা-টামেলা ছিল না তো? কাছাকাছিই তো বাড়ি দুজনের৷ বিপুলকেতনের ফুকলুকে মনে পড়ে গেল৷ ফুকলু এই বিহারপুরেরই ছিঁচকে চোর, দু-একবার খুচখাচ জেল খেটেছে৷ এখন খবরাখবর সাপ্লাই করে থানায়, পুলিশের খোঁচড়৷

বিপুলকেতন পকেট থেকে নোটবুক বের করে লিখে রাখলেন, থানায় গিয়েই ফুকলুকে ডেকে পাঠাতে হবে৷

একটা বড় নিঃশ্বাস নিয়ে তিনি বললেন, ‘‘সত্যিই স্ট্রেঞ্জ! বাচ্চাটার বাড়িতে খবর পাঠানো হয়েছে?’’

বাবলু সমাদ্দার বললেন, ‘‘হ্যাঁ৷ এত খারাপ লাগছে! ঠাকুমা এখনো বেঁচে, অনুপ আর ওর বউয়ের না জানি কী …!’’ বলতে বলতে সামনের দিকে তাকিয়ে ওঁর গলাটা যেন কেঁপে গেল৷

তিন-চারজন লোকের সঙ্গে অনুপ উদ্ভ্রান্তের মতো এদিকে ছুটে আসছেন৷

এবার যে মর্মান্তিক দৃশ্যটা ঘটবে, তা বাবলু সমাদ্দার সহ্য করতে পারবেন না, দাঁতে দাঁত চেপে তিনি অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে সরে যেতে লাগলেন তফাতে৷ একপলকের জন্য তাঁর মনে হল, পুত্রহারা পিতার এই বুকফাটা হাহাকার কি ঘটতে না দিলেই চলছিল না? পরক্ষণেই তাঁর মনে হল, নাহ, এ জিনিস লুকিয়ে রাখার নয়৷ অনুপের বৃদ্ধা মা আর স্ত্রীর কথা ভেবে তাঁর গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল৷

কিংশুক যখন এসে পৌঁছল, তখন বিকেল হয়ে গেছে৷ তুতুনের বডি কাঁকসা থানা নিয়ে চলে গেছে৷ গোটা বিহারপুরে বিরাজ করছে মৃতুপুরীর গুমোট নৈঃশব্দ্য৷ প্রতিটা পাড়ার মানুষ যেন জোরে কথা বলতেও ভুলে গেছে৷

দুর্গাপুর স্টেশনে সাইকেল রেখে কিংশুক কলকাতা গিয়েছিল, গ্রামে ঢুকতে গেলে সাইকেল চালিয়ে হাটতলা দিয়ে ঢুকতে হয়৷ ও লক্ষ করল, বিকেল হয়ে গেলেও একটা দোকানও আজ খোলেনি৷ শুধু কানাইদার চায়ের দোকানে গম্ভীরমুখে বসে ফিসফাস আলোচনা করছে কয়েকজন৷

কষ্টে ওর বুকের ভেতরটা আবার দলা পাকিয়ে উঠল৷ মিকাইয়ের কাছে শোনার পর থেকে ওর ভেতরটা ভেঙেচুরে যাচ্ছে৷ গোটা ট্রেনটা সবার সামনে কাঁদতে না পারলেও নিজেকে কন্ট্রোল করতে করতে এসেছে ও৷ চোখ বন্ধ করলেই মনের আয়নায় ভেসে উঠেছে দুদিন আগের সেই দৃশ্যটা, ‘‘ও স্যার, তুমি কাল আমাকে মামদো ভূতের গল্পটা বলবে তো?’’

ও দোনোমনা করেও বড়ুয়াবাড়ির দিকে সাইকেল চালাল৷ কিন্তু কাছাকাছি এসে আর এগোতে পারল না৷

প্রায় একশোফুট দূর থেকে আকাশ বাতাস বিদীর্ণ করে দেওয়া বুকফাটা কান্নার আওয়াজ ভেসে আসছে বড়ুয়াবাড়ি থেকে৷ কী যে মর্মন্তুদ সেই কান্না, তা নিজের কানে না শুনলে সত্যিই উপলব্ধি করা সম্ভব নয়৷

তেতোমুখে ও সাইকেলের মুখ ঘোরাল৷ মাথার ভেতর আবার সেই যন্ত্রণাটা শুরু হচ্ছে৷ সঙ্গে কাল বাঁ পায়ের সেই আঘাতটাও টনটন করছে সকাল থেকে জার্নিতে৷

সাইকেলটা ঘুরিয়ে প্যাডলে চাপ দিয়ে উঠতে যাবে, হঠাৎ পেছন থেকে কে যেন বলে উঠল, ‘‘কী রে পরীক্ষা কেমন হল?’’

ভোম্বলের হাতে একটা দামি মোবাইল, গায়ে ঘিয়েরঙা একটা চাদর জড়ানো৷ কিংশুক উত্তর না দিয়ে বলল, ‘‘অনুপস্যারের বাড়ি গিয়েছিলিস বুঝি?’’

‘‘না না৷’’ ভোম্বল একটা সিগারেট ধরাল, বড় একটা ধোঁয়া ছেড়ে বলল, ‘‘ব্যাপারটা খুবই প্যাথেটিক রে৷ সকাল থেকে এতসব ডামাডোলে আজ আর ফিরলাম না৷ এত খারাপ লাগছে!’’

‘‘তোর তো লাভই হল৷’’ কিংশুক তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে কিছুক্ষণ ওর দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, ‘‘ছেলের সাকসেসে অ্যাডমিশন পাকা হয়ে গেল৷ এবারের সেশানে না হলেও পরের সেশানে৷’’

ভোম্বল এবার একটু চমকে উঠে বলল, ‘‘তার মানে? এসব কী বলছিস তুই!’’

‘‘কেন ঠিকই তো বলছি!’’ কিংশুক বলল, ‘‘একটাই তো সিট ছিল, তাতে নিজের যোগ্যতায় ভরতি হয়েছিল তুতুন৷ সে তো আর নেই, সেই সিটে তোর ছেলে এবার ভরতি হবে৷ কী ভাগ্য তোর মাইরি!’’

ভোম্বলের মুখ লাল হয়ে গেছে, উত্তেজিত মুখে সে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু বড়ুয়াবাড়ির দিক থেকে দুটো ছেলেকে আসতে দেখে কিংশুক ভোম্বলকে একরকম উপেক্ষা করেই এগিয়ে গেল৷ ফালতু লোকেদের ও পাত্তা দেয় না৷ সে যে যত চাকরিই করুক না কেন!

এদিকেই হেঁটে আসছে দুজন৷ পাড়ার ছেলে, পার্থ আর বংশী৷ দুজনের মুখই ম্লান৷

ও বলল, ‘‘কী রে, কী অবস্থা?’’

‘‘আর অবস্থা!’’ বংশী ছলছলে চোখে বলল, ‘‘স্যারের মা’কে তো ধরে রাখা যাচ্ছিল না, তাঁকে আপাতত ঘুমের ওষুধ দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে রাখা হয়েছে৷ আর বউদি বারবার অজ্ঞান হয়ে যাচ্ছে৷ চোখে দেখা যাচ্ছে না মাইরি৷’’

কিংশুক একটা ঢোঁক গিলল৷ বলল, ‘‘শ্মশানের কাজটা কখন …৷’’

‘‘দাঁড়াও, কাল আগে দুর্গাপুর থেকে পোস্টমর্টেমের রিপোর্ট আসুক, তারপর তো বডি রিলিজ করবে৷’’ পার্থ বিড়বিড় করল, ‘‘যা নৃশংসভাবে মাথাটা থেঁতলে দিয়েছে, দেখলে তুমি আঁতকে উঠতে কিংশুকদা৷ মানুষ আজকাল সত্যিই পশু হয়ে গেছে৷’’

কিংশুক অবিশ্বাসের ভঙ্গিতে তাকাল, ‘‘থেঁতলে দিয়েছে মানে? মিকাই তো ওসব কিছু বলল না … তুতুন ডুবে মারা যায়নি?’’

পাঁচ

অনুপ বড়ুয়া থম মেরে নীচের বারান্দায় বসেছিলেন৷ চোখে শূন্য দৃষ্টি, হাত দুটো কাঁপছে তিরতির করে৷ থেকে থেকে কেমন গুঙিয়ে উঠছেন তিনি৷ যেটা ঘটে গেছে, সেটা এখনো যেন বিশ্বাস করে উঠতে পারছেন না৷

গোটা বাড়িটায় একটা মৃত্যুর গন্ধ যেন অদৃশ্য হয়ে ভেসে বেড়াচ্ছে৷ দোতলা থেকে ভেসে আসছে নারীকণ্ঠের জান্তব বুকের ভেতর ওলটপালট করে দেওয়া বিলাপ৷ অনুপ বড়ুয়া এখানে একা বসে নেই৷ তাঁর কাঁধে এসে মাঝেমধ্যেই হাত রাখছেন নানা আত্মীয়স্বজন৷ দুর্গাপুর থেকে তাঁর শ্বশুরবাড়ির সকলে চলে এসেছেন৷ এ ছাড়া এসেছেন অনুপ বড়ুয়ার দিদি, তিনি থাকেন কলকাতায়৷ বৈঠকখানা আর আশপাশের ঘরগুলোতেও মৃদুস্বরে গুঞ্জন করছে অনেক লোক৷

থানার ওসি বিপুলকেতন এতক্ষণ দাশরথিকে জেরা করছিলেন৷ কিন্তু দাশরথির কান্নার দমকে কথা এত জড়িয়ে যাচ্ছে যে সে কী বলছে কিছুই বোঝা যাচ্ছে না৷

বিপুলকেতন বারকয়েক চেষ্টা করে হাল ছেড়ে দিলেন৷ এই চাকরটা বিশেষ কিছু জানে না, শুধু একই কথা আউড়ে যাচ্ছে সন্ধেবেলা সে গোয়ালঘরে ছিল৷ এবাড়িতে সে পঁয়ত্রিশ বছর ধরে কাজ করছে, অনুপ বড়ুয়াকেও ছোট থেকে দেখছে৷ এখন এত বড় সর্বনাশ যে তাকে দেখতে হবে তা সে স্বপ্নেও ভাবতে পারেনি৷ গোয়ালটা আজই ভাল করে পরিষ্কার করার দুর্মতি তার কেন হল!

বিপুলকেতন অনুপ বড়ুয়াকে বলে বেরিয়ে এলেন বড়ুয়াবাড়ি থেকে৷ জিপ কিছু দূরে দাঁড়িয়ে আছে, এস আই রামেশ্বর কনস্টেবলদুটোকে নিয়ে কোথাও গেছে, এলেই কাঁকসার দিকে রওনা হতে হবে৷ কিছু কিছু সময় আসে যে নিজের পেশার ওপর সত্যিই একটা বিরক্তভাব চলে আসে৷ মনে হয় এই পেশায় না থাকলে এগুলো এভাবে প্রত্যক্ষ ফেস করতে হত না৷

বিপুলকেতন ভারাক্রান্ত মনে সিগারেট ধরালেন৷ আর তখনই তাঁর চোখে পড়ল বাড়ির উল্টোদিকের ফাঁকা জায়গাটায় একটা লোক চাদরমুড়ি দিয়ে দাঁড়িয়ে তাঁকে ইশারা করছে৷

বিপুলকেতনের ভ্রূ কুঁচকে গেল৷ কে লোকটা? থানার ওসিকে এইভাবে ইশারা করে ডাকার সাহসই বা হয় কী করে? বিপুলকেতন মুখে কিছু বললেন না৷ দুপাশে তাকিয়ে দেখলেন সবাই বাড়ির ভেতরে, বাইরে কেউ নেই৷ তিনি রাস্তা টপকে গিয়ে লোকটার মুখোমুখি হলেন, ‘‘কী ব্যাপার?’’

লোকটা ফিসফিসিয়ে বলল, ‘‘স্যার! ছোট মুখে একটা বড় কথা বলব, যদি অভয় দেন৷’’

‘‘কী বলতে চাও বলো?’’ বিপুলকেতন জিজ্ঞেস করলেন৷

লোকটা এদিক-ওদিক তাকিয়ে নিয়ে বলল, ‘‘ইয়ে, বাচ্চাটার মাস্টারটাকে আমি কাল বাঁকা নদীর চর থেকে ওইসময়েই আসতে দেখেছিলাম স্যার!’’

‘‘বাচ্চাটার মাস্টার মানে?’’ বিপুলকেতন জিজ্ঞেস করলেন, ‘‘যে কাল ওকে পড়াতে এসেছিল?’’

‘‘হ্যাঁ স্যার৷ রোজই আসে৷’’ লোকটা চাদর থেকে ঠোঁট দুটো সামান্য ফাঁক করে বলে যাচ্ছিল, ‘‘কাল আমি নিজের চোখে ওকে দেখেছি৷ আপনি ওকে জিজ্ঞেস করুন ভালো করে৷ ওদিকে তো কেউ যায় না৷ ও কেন গিয়েছিল?’’

…………………..

‘‘তুমি কে? কী নাম তোমার?’’ বিপুলকেতন প্রশ্ন ছুড়লেন৷

‘‘আমার নাম ভোম্বল দাস৷ আমার এই গ্রামেই বাড়ি, এখন চাকরি করি বর্ধমান মিউনিসিপ্যালিটিতে৷ ছুটিছাটায় বাড়ি আসি৷ ওই মাস্টার আমার ছোটবেলার বন্ধু৷’’

‘‘তুমি কী করে জানলে ও কাল বাঁকার চরে গিয়েছিল? তুমিও কি ওখানে ছিলে?’’

‘‘না৷ আমি বাঁকার চর থেকে বেরিয়েই যে আগুরিপাড়া, তার মুখে ওকে দেখেছিলাম৷ চর থেকে এদিকে আসছিল৷’’ ভোম্বল কেমন সাপের মতো ফিসফিসিয়ে বলে যাচ্ছিল, ‘‘স্যার! আপনাকে কিছু ব্যাপার বলার আছে৷ আপনি শুনবেন?’’

***

কাঁকসা থানাটার আন্ডারে অনেকগুলো ছোটবড় গ্রাম হলেও ভোটের সময় ছাড়া তেমন খুব একটা চাপ নেই৷ এ অঞ্চলটা মোটামুটি শান্তি-১প্রবণই বলা চলে৷ বিপুলকেতনের বাড়ি এদিকে নয়, উত্তর কলকাতায়৷ এখানে থানা লাগোয়া কোয়ার্টারে তিনি থাকেন৷ তাঁর পরিবার অবশ্য কলকাতাতেই থাকে৷

বিহারপুর গ্রাম থেকে ফিরে দুপুরবেলা খাওয়াদাওয়া সেরে তিনি যখন নিজের চেয়ারে গিয়ে সবে বসেছেন, হাবিলদার শিউচরণ এসে সেলাম ঠুকল, ‘‘হুজুর! একঠো আদমি আয়া হ্যায় বিহারপুর সে৷ আপকো মিলনা চাহতে হ্যায়৷’’

বিপুলকেতন মৌরী চিবোচ্ছিলেন৷ শীতের দুপুর, ভাত খেলেই দুপুরবেলাটা কেমন ঘুমঘুম পায়৷ চোখ দুটো জুড়ে আসছিল, জোর করে খুলে বললেন, ‘‘ভেজ দো৷’’

বিহারপুর গ্রাম থেকে আবার কে এল?

দু-পাল্লার দরজাটা ফাঁক করে যে লোকটা ঢুকল, তাকে বিপুলকেতন আগে কখনো দেখেছেন বলে মনে করতে পারলেন না৷ মাথাভর্তি ঝাঁকড়া চুল, যার মধ্যে অকালেই অনেকগুলো পেকে গেছে, গায়ে ময়লা একটা গেঞ্জি আর সাধারণ প্যান্ট৷ গোটা চেহারাটা কেমন বিধ্বস্ত, চোখগুলো ঈষৎ লাল হয়ে আছে৷ ঘরে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে কেমন একটা দুর্গন্ধে সারা ঘরটা ভরে গেল৷

বিপুলকেতন নাক কুঁচকে বললেন, ‘‘বলুন কী চাই?’’

লোকটা একটু ইতস্তত করে বলল, ‘‘স্যার, আমি কিংশুক, কিংশুক চক্রবর্তী৷ বিহারপুরে থাকি৷’’

বিপুলকেতন একটু অধৈর্যের ভঙ্গিতে তাকালেন৷ লোকটার কথা শুনলেই বোঝা যায়, তার মধ্যে আত্মবিশ্বাসের চূড়ান্ত অভাব রয়েছে৷ কথা বলছে বিপুলকেতনের সঙ্গে, এদিকে তাকিয়ে রয়েছে মাটির দিকে, সঙ্গে হাতের আঙুলগুলোকে থেকে থেকে চটকাচ্ছে৷ এই ধরনের লোকেদের দু-চক্ষে দেখতে পারেন না বিপুলকেতন৷ তিনি একটু বিরক্ত হয়ে বললেন, ‘‘ কী ব্যাপার বলুন?’’

কিংশুক বিপুলকেতনের বাজখাঁই গলায় আরো একটু কুঁকড়ে গেল৷ বলল, ‘‘না মানে, আমি অনুপ স্যার, মানে অনুপ বড়ুয়ার ছেলেকে পড়াতাম৷’’

বিপুলকেতনের চোখমুখ মুহূর্তে অন্যরকম হয়ে গেল, ‘‘ওহ আপনিই? বসুন৷’’ তারপর গলা নামিয়ে বললেন, ‘‘হ্যাঁ, আমি ডঃ বড়ুয়াকে বলে এসেছিলাম আপনি যেন আমার সঙ্গে একবার দেখা করেন৷ যদিও এখনো ময়নাতদন্তের রিপোর্ট এসে পৌঁছয়নি, তবু আমার আপনাকে কিছু জিজ্ঞাস্য ছিল৷’’

কিংশুক অবাক হয়ে বলল, ‘‘আমাকে তো কেউ আসতে বলেনি স্যার৷ আমি নিজেই এসেছি৷ অনুপ স্যারের সঙ্গে তারপর থেকে আমার এখনো দেখাও হয়নি৷’’ কিংশুক ঝুঁকে পড়ল সামনের দিকে, ‘‘স্যার, তুতুনের এই হাল কে করেছে তা আমি জানি৷’’

‘‘আপনি জানেন?’’ বিপুলকেতন রীতিমতো অবাক হলেন৷

কিংশুক একটা লম্বা শ্বাস নিয়ে বলল, ‘‘অনুপ বড়ুয়া আমাদের গ্রামের একজন শ্রদ্ধেয় মানুষ, জানেন নিশ্চয়ই৷ গ্রামের প্রচুর ছেলেমেয়েকে পড়ায় সাহায্য থেকে শুরু করে অনেক ভালো কাজ উনি করেন৷ কিন্তু আমার এক বন্ধু আছে, তার সঙ্গে কদিন আগেই বড়ুয়াস্যারের ঝামেলা হয়েছে৷’’

‘‘কী ঝামেলা?’’

‘‘ভোম্বল, মানে আমার বন্ধু ওর ছেলেকে বাঁকা পথে দুর্গাপুরের সাকসেস স্কুলে ভরতি করতে চেয়েছিল, কিন্তু তাতে বড়ুয়াস্যার কোনো হেল্প করেননি৷ এদিকে ওই একই বছরে তুতুন, মানে বড়ুয়াস্যারের ছেলে চান্স পেয়ে গেছিল সাকসেসে৷ নিজের ছেলে পেল না, পেতে বড়ুয়াস্যার হেল্পও করলেন না, বড়ুয়াস্যারের ছেলে পেয়ে গেল, সেই আক্রোশে ভোম্বলের পক্ষে এমন কাজ করা অসম্ভব কিছু নয়৷’’

‘‘ভোম্বল দাস! ছেলেকে স্কুলে অ্যাডমিশন করায়নি বলে এভাবে খুন করবে?’’ বিপুলকেতন অবিশ্বাসের ভঙ্গিতে মাথা নাড়লেন, ‘‘এটা একটু বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে৷’’

‘‘সাকসেস স্কুলের কেমন ক্রেজ আপনি তো জানেন৷ আর তা ছাড়া আপনি ভোম্বল দাসকে চেনেন না বলে বলছেন স্যার৷’’ কিংশুক স্থিরভাবে বলে যেতে লাগল, ‘‘ও বরাবরই রগচটা৷ স্কুলে আমরা একসঙ্গে পড়তাম৷ সামান্য কারণে অনেক রক্তারক্তি করেছে ও৷ আমাদের এক স্যার ওকে একদিন ক্লাসে মেরেছিলেন বলে স্যারের দু-বছরের ছেলেকে ও দেড়দিন লুকিয়ে রেখেছিল, নেহাত ভোম্বলের বাবার কাকুতিমিনতিতে ওই স্যার পরে থানাপুলিশ করেননি তাই৷ এছাড়াও ও অনেক মারামারি করেছে সামান্য কারণে৷’’

‘‘হুঁ৷’’ বিপুলকেতন ভ্রূ কুঁচকে চিন্তা করে চলেছিলেন, ‘‘কিন্তু আপনার এটা কী করে মনে হল ও খুন করতে পারে?’’

‘‘ও তো এখন আর গ্রামে থাকে না৷ বাপের পয়সার জোর আর শিডিউলড কাস্ট কোটায় চাকরি বাগিয়েছে, বউ-ছেলে নিয়ে থাকে বর্ধমানে, কিন্তু যেদিন তুতুনকে মারা হয়েছে, সেদিনই ও গ্রামে এসেছিল৷ আমার সঙ্গে দেখা হয়েছিল বিকেলে৷’’

‘‘কোথায় দেখা হয়েছিল?’’

‘‘আগুরিপাড়ার দিকটায়৷’’ কিংশুক বলল, ‘‘আমি বাঁকার চর থেকে ফিরে যাচ্ছিলাম তুতুনকে পড়াতে, মাঝরাস্তায় ওর সঙ্গে দেখা৷ আমি বললাম বড়ুয়াস্যারের সঙ্গে দেখা করে আসবি চল, কিন্তু তখন এড়িয়ে গেল৷ মিথ্যে কথাও বলল একটা৷’’

বিপুলকেতন বললেন, ‘‘কী মিথ্যে কথা?’’

‘‘বলল ও হাটতলায় নান্টুর দোকানে ঘুগনি আনতে গেছিল৷ কিন্তু আমি আজই জানতে পেরেছি নান্টু ক’দিনের জন্য পুরী গেছে, ওর দোকানই খুলছে না৷’’

‘‘সে নাহয় হল৷ কিন্তু আপনি বাঁকা নদীর চরে কেন গিয়েছিলেন? ওদিকটা তো কেউ যায় না তেমন৷’’

কিংশুকের এবার মুখচোখ আচমকা শক্ত হয়ে উঠল, ‘‘আমি যাই৷ রোজ৷ একা সময় কাটাতে৷ সারাদিনের টিউশনির মাঝে ওইটুকুই আমার অবসর৷’’

বিপুলকেতন মাথা নাড়লেন, ‘‘আচ্ছা, কাল আপনি কখন গিয়েছিলেন?’’

‘‘রোজ যেমন যাই৷’’ কিংশুক কাঁধ নাচিয়ে বলল, ‘‘চারটে নাগাদ৷ ফিরে আসি সাড়ে পাঁচটা-সোয়া ছ’টা বাজলে৷ ওখান থেকেই আমি সরাসরি তুতুনকে পড়াতে যেতাম৷’’

‘‘কালও কি সোয়া ছ’টাতেই ফিরেছিলেন?’’

‘‘হ্যাঁ, ওইরকমই হবে৷’’

‘‘যখন গিয়েছিলেন তখন কাউকে কি ওখানে দেখতে পেয়েছিলেন? বা কোনো আওয়াজ বা চিৎকার শুনতে পেয়েছিলেন কি?’’ বিপুলকেতন জিগ্যেস করলেন৷

কিংশুক ঘাড় নাড়ল, ‘‘না৷ আমি কাউকে দেখতেও পাইনি, কোনো আওয়াজও শুনিনি৷ তা ছাড়া আমি জলের কাছে যাইনা৷ বালির দিকটায় বসে থাকি৷ কাল এমনিই আমার পায়ে চোট লেগেছিল৷ কিছুক্ষণ হাওয়া খেতে খেতে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম, তারপর ফিরে আসি৷’’ কিংশুক উঠে দাঁড়াল, ‘‘আমার মনে হল ভোম্বলের ব্যাপারটা আপনাকে জানানো উচিত, তাই এসে জানিয়ে গেলাম৷ চলি৷’’

ছয়

বাসন্তী যখন নিজের শ্রান্ত শরীরটাকে টেনে হিঁচড়ে বাড়িতে নিয়ে ঢোকেন, তখন তাঁদের বামুনপাড়ার অধিকাংশ বাড়িই অন্ধকার হয়ে যায়৷ এমনিতেই গ্রামে গঞ্জে লোকে ন’টার মধ্যে খেয়ে শুয়ে পড়ে, সেখানে তাঁর ফিরতে ফিরতে বেজে যায় প্রায় সাড়ে দশটা৷ কিছু করার নেই৷ চারটে বাড়িতে পরপর রান্না করা, শেষের বাড়িটায় আবার ছেলেবউ এসেছে দু-তিনদিনের জন্য৷ এতজনের রান্না, দেরি তো হবেই৷

বাঁশের দরমাটা হাত দিয়ে ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই একটা আঁশটে গন্ধ পেলেন বাসন্তী৷ বিকেলে রান্না করতে বেরোনোর আগে নিজেদের রান্না তিনি সব করে রেখে গিয়েছেন, রান্নাঘরও ধুয়েমুছে ঝকঝকে করা আছে৷ তবে এই গন্ধটা কীসের?

মাটির টিমটিমে বাড়িটায় সাকুল্যে দুটো ঘর৷ বাসন্তী উঁকি মেরে দেখলেন, একটায় ছোট ছেলেমেয়ে দুটো ঘুমিয়ে পড়েছে, অন্যটায় ওদের বাবা ক্লান্ত দেহে শুয়ে আছে৷ বড়টা কোথায় গেল? এতক্ষণে তো সব পড়ানো শেষ হয়ে যায় অন্যদিন!

বাসন্তী একটু উঁকিঝুঁকি মারতেই লক্ষ করলেন বাড়ির বাইরে ঝোপঝাড়ের মধ্যে কিংশুক পাথরের মতো বসে আছে৷ অন্ধকার থাকায় তিনি বাড়ি ঢোকার সময় দেখতে পাননি ওকে৷

বাসন্তী ঝোপের মধ্যে এগিয়ে গিয়ে বড়ছেলের গায়ে এক ঠেলা দিলেন, ‘‘কী রে? পাগল হয়ে গেলি নাকি তুই? এই ঠান্ডায় এত রাতে বাইরে এভাবে ঘাসের ওপর বসে আছিস? গায়ে একটা চাদরও জড়াসনি!’’

কিংশুক যেন শুনতেই পেল না মায়ের কথা, অনুভব করতে পারল না মায়ের স্পর্শ৷ সে একমনে দূরের আকাশের দিকে তাকিয়ে কী যে ভেবে চলেছে!

বাসন্তী আবার ছেলেকে ধরে ঝাঁকালেন, ‘‘কী রে? কানে কথা যাচ্ছে না? এবারে নিউমোনিয়া বা জ্বরজারি কিছু একটা বাধিয়ে বসলে কে দেখবে তোকে? একে আমি মরছি হাজার জ্বালায় …!’’

কিন্তু কিংশুকের কানে এবারেও কিছু প্রবেশ করল বলে মনে হল না, বরং কেমন একটা ফ্যাসফেসে গলায় ও বলে উঠল, ‘‘ভোম্বলকে শেষ করতেই হবে মা! তুমি কি আমাকে একটু সাহায্য করবে?’’

বাসন্তী হকচকিয়ে গেলেন, বললেন, ‘‘মানে! এসব কী বলছিস তুই!’’

‘‘ঠিকই বলছি৷’’ কিংশুক হিসহিসিয়ে বলল, ‘‘ভোম্বল আমার তুতুনকে খুন করেছে৷ ওকে আমি কিছুতেই ছাড়ব না৷’’

বাসন্তী আরো অবাক হয়ে বললেন, ‘‘ভোম্বল? তুই ঠিক জানিস?’’

‘‘হ্যাঁ৷’’ কিংশুক দাঁতে দাঁত চিপে বলল, ‘‘শালা নিজে এস সি কোটায় চাকরি পেল, তারপর নিজের ছেলেকে ঘুষ দিয়ে সাকসেস স্কুলে ঢোকাতে চাইছিল৷ অনুপস্যার সাহায্য করেননি, উল্টে তুতুন নাকের ডগা দিয়ে চান্স পেয়ে গিয়েছিল৷ সেই রাগে … ওকে আমি খুব ভালো করে চিনি৷’’

বাসন্তী তবু আধা অবিশ্বাসের ভঙ্গিতে বললেন, ‘‘কিন্তু আমি আজও রান্না করতে গিয়ে দেখে এলাম, ওদের বাড়ির সবারই খুব মনখারাপ৷ ভোম্বলেরও৷’’

‘‘ওসব সাজানো নাটক৷’’ কিংশুকের স্বর থেকে অপরিসীম ঘৃণা ঝরে পড়ছিল, ‘‘পুলিশকে আমি সব বলেছি৷ কিন্তু সব জেনেও ওরা কিচ্ছু করবে না৷ ভোম্বল বহাল তবিয়তে ঘুরে বেড়াবে৷ পয়সার জোরে৷’’

বাসন্তী বিস্ফারিত চোখে শুনছিলেন৷

‘‘কিন্তু আমি ওকে ছাড়ব না৷ ওকে শেষ করব আমি৷ আর তাতে তুমি আমাকে সাহায্য করবে৷’’ কিংশুক জিভ বের করে ঠোঁটের উপরের অংশটা মুছল৷

বাসন্তী একটা চাপা নিঃশ্বাস ফেললেন৷ চিরকাল এই জ্যেষ্ঠ সন্তান তাঁর কাছে প্রাণাধিক প্রিয়৷ ছোট দুটো ছেলেমেয়ে থাকলেও কিংশুক বরাবর অন্তর্মুখী বলেই হোক কিংবা পড়াশোনায় ভালো বলে, খড়কুটোর মধ্যে ওকে আঁকড়ে ধরে বাঁচতে চেয়েছেন বাসন্তী৷ ভেবেছেন এই ছেলেই একদিন তাঁর সব অভাব, অনটন, দুঃখ দূর করবে৷

হ্যাঁ এটা ঠিক যে, কিংশুক সেভাবে কিছুই করতে পারেনি৷ না একটা ভালো চাকরি জোটাতে পেরেছে, না বাড়ির অবস্থা কিছুটা ফিরেছে৷ এখনো এই বয়সেও বাসন্তীকে চার বাড়ি রান্না করতে হয়, ওদের বাবাকে ভোররাতে গিয়ে আনাজ এনে বসতে হয় বাজারে৷

এই যে আশা করেও না পাওয়ার বেদনা, তা থেকে কখনো-সখনো বড়ছেলেকে অকথা-কুকথা বললেও সবকিছুর শেষে তবু কিংশুকই বাসন্তীর প্রাণ৷ এখনো মনের মাঝে টিমটিম করে জ্বলে আশা, হয়তো সত্যিই কোনোদিন ভগবান মুখ তুলে চাইবেন, কিংশুক একটা ভালো চাকরি পাবে৷

কিন্তু দিন দিন বাসন্তীর সেই প্রাণসম পুত্র কি অচেনা হয়ে উঠছে? সেই অন্তর্মুখী লাজুক পড়াশোনা নিয়ে থাকা ছেলেটা কিনা শেষে খুন করতে চাইছে?

বাসন্তী কথা বাড়ালেন না৷ ক্ষীণ গলায় জিজ্ঞাসা করলেন, ‘‘কী করতে হবে?’’

কিংশুক এবার বাঁ হাতটাকে সামনে এনে মুঠোটা খুলতেই যে আঁশটে গন্ধটা বাসন্তী ঘরে ঢোকার পর থেকে পাচ্ছিলেন, সেটা চতুর্গুণ বৃদ্ধি পেয়ে নাকে এসে ঝাপটা মারল৷

বাসন্তী জিনিসটা কী জিগ্যেস করার আগেই কিংশুক বিড়বিড় করল, ‘‘ভোম্বলের চায়ে কাল সকালে মিশিয়ে দেবে এটা৷ মেশানোর পর কোনো গন্ধ পাওয়া যাবে না৷ আর সঙ্গে সঙ্গে কিছু হবেও না৷ হবে বেশ কিছুক্ষণ পর৷’’

‘‘এটা তুই কোত্থেকে পেলি?’’ বাসন্তী প্রশ্ন করলেন৷

‘‘সেটা জেনে তুমি কী করবে?’’ কিংশুকের গলার স্বর যেন অস্বাভাবিক রুক্ষ হয়ে উঠল৷ এক মুহূর্ত শ্বাস নিয়ে ও বলল, ‘‘আমি বানিয়েছি৷’’

অনেকক্ষণ পর গভীর রাতে বাসন্তী যখন পা টিপে টিপে কিংশুকের ঘরে যাচ্ছিলেন, তখন ঘড়ির কাঁটা দুয়ের ঘর ছুঁয়েছে৷ কিংশুকের ঘর বলতে বড় ঘরটা, যেখানে কিংশুক, ওর ভাই পলাশ আর ওদের বাবা ঘুমোয়৷ মেয়েকে নিয়ে বাসন্তী শোন পাশের গুমটি ঘরটায়৷ মেয়েটা এমনিই, ঠিক স্বাভাবিক নয়, বয়স পনেরো হলেও কোনো মানসিক বিকাশ নেই, বাসন্তীকে সবদিক সামলে মেয়েকেও সব করিয়ে দিয়ে তারপর শুতে হয়৷ বিছানায় মাথা দেওয়া মাত্র সারাদিনের শেষে বাসন্তীর চোখ যেন ঘুমে জুড়ে আসে৷

কিন্তু আজ এতরাতেও বাসন্তী একফোঁটা ঘুমোতে পারেননি৷ কেমন এক অজানা আশঙ্কায় তাঁর মনের ভেতরটা দুলে উঠছে৷

শীতের নিঝুম রাত৷ বাইরে কনকনে ঠান্ডা, তাঁর ওপর বাইরের দিকটার প্লাস্টিকের ছাউনিটা আগের মাসেই ঝড়ে উড়ে যাওয়ায় সেখান দিয়ে কনকনিয়ে ঠাণ্ডা হাওয়া ঢুকছে৷ চাঁদের নরম আলোও সেই ফাঁক দিয়ে এসে পড়েছে বাসন্তীদের মাটির দালানে৷

বাসন্তী সেই জ্যোৎস্না আলোয় কাঁপা কাঁপা হাতে শাড়ির আঁচল থেকে কিংশুকের দেওয়া জিনিসটা বের করলেন৷ একটা ছোট্ট দলা পাকানো ঠোঙা, তার মধ্যে গুঁড়োমতো কিছু পদার্থ৷ বিশ্রী আঁশটে গন্ধটা ঝাপটা মারল তাঁর নাকে৷

ছেলেটার নানারকম গুঁড়োমশলা মিশিয়ে ওষুধ বানানো শখ৷ একসময় তো ওই নিয়েই পড়েছিল৷ এখনো কলকাতার দিকে গেলে নিয়ে আসে, সাধারণ জ্বরজারি বা পেটখারাপ হলে বিভিন্নরকম গুঁড়ো বেটে খাইয়ে দেয়৷ আজ অবধি এগুলোয় উপকারই পেয়েছেন বাসন্তী৷

কিন্তু আজ ঠোঙাটার দিকে তাকালেই বাসন্তীর বুকের ভেতরটা হিম হয়ে যাচ্ছে৷

বাসন্তী ঢোঁক গিললেন৷ আড়চোখে একবার তাকালেন ঘরের দিকে৷ তারপর চোখ ফেরালেন বাড়ির বাইরের উঠোনে৷ এত খাটনি সামলেও সেখানে সাধ্যমতো শাকসবজি বসিয়েছেন তিনি৷ বাড়ির রান্নাতেও খাওয়া যায়, ভালো ফলন হলে ওদের বাবা গিয়ে বাজারে বিক্রিও করে টুকটাক৷

কিংশুকদের ঘরে ঢুকেই বাসন্তী শব্দটা পেলেন৷ মৃদু গোঙানির শব্দ আসছে কিংশুকের খাটের কাছ থেকে৷ পাশেই অঘোরে ঘুমোচ্ছে পলাশ৷ নীচে মোটা তোশকে ওদের বাবা৷

বাসন্তী তড়িৎপায়ে এগিয়ে গিয়ে হাত রাখলেন কিংশুকের গায়ে৷ নিকষ কালো অন্ধকারেও অনেকক্ষণ থাকতে থাকতে চোখ সয়ে আসে৷ বাসন্তী তাই এই অন্ধকারেও বুঝতে পারলেন কিংশুকের গা যে শুধু জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে তাই নয়, প্রলাপ বকা শুরু হয়েছে ওর৷ অচেতন ঘোরের মধ্যে মাথাটা খুব মন্থর লয়ে ঝাঁকাচ্ছে ও, সঙ্গে বিড়বিড় করছে কিছু৷

বাসন্তী মনে মনে ভয় পেয়ে গেলেও থামলেন না৷ তিনি লড়াকু মহিলা, জীবনযুদ্ধে প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করতে করতে সমস্ত অনিশ্চয়তার মোকাবিলাতেই তৈরি থাকেন৷ দ্রুত পায়ে রান্নাঘরে গিয়ে একটা বাটিতে ঠান্ডা জল আর কিছুটা ন্যাকড়া ভিজিয়ে নিয়ে এলেন তিনি৷ তারপর একটুও শব্দ না করে ফিরে এসে বড়ছেলের কপালে জলপটি দিতে লাগলেন৷

প্রচণ্ড জ্বরের তীব্রতার মধ্যে জলের ঠান্ডা স্পর্শ পেয়েই বোধ হয় কিংশুক খুব পরিষ্কারভাবে উচ্চারণ করে উঠল, ‘‘ভোম্বলরা সব শেষ করে দেবে মা! সব! এখনো সময় আছে! ওদের খতম করতেই হবে!’’

সাত

তুতুন খুন হওয়ার ঠিক তিনদিনের মাথায় দুটো ঘটনা ঘটল৷

এক, গ্রামের ধনী ব্যক্তি রতন দাসের জলজ্যান্ত জোয়ান ছেলে ভোম্বল দুর্গাপুর স্টেশন থেকে বাইক চালিয়ে ফিরছিল রাতের বেলা৷ কিছু অজ্ঞাত আততায়ীর আক্রমণে লুটিয়ে পড়ে প্রাণ হারানো তার রক্তাক্ত মৃতদেহ উদ্ধার হল পরের দিন সকালে৷

আর দুই, কিছুতেই না কমতে প্রচণ্ড জ্বর আর ভুল বকা নিয়ে কিংশুক ভরতি হল গ্রামের একমাত্র স্বাস্থ্যকেন্দ্রে৷ বাসন্তীই ভরতি করে এলেন৷

তুতুন আর ভোম্বল, পরপর এইভাবে দুটো মানুষের আকস্মিক মৃত্যুতে গোটা বিহারপুর গ্রামেই একটা প্রচণ্ড আতঙ্কের স্রোত বয়ে গেল৷ ভোম্বল দাস বউ-ছেলে নিয়ে বর্ধমানে থাকত৷ এখানকার বাড়িতে থাকে তার বাবা-মা৷ ছুটিতে সে বাড়ি এসেছিল, তারপর তুতুনের খুন জাতীয় নানা চাঞ্চল্যকর ঘটনায় তিন-চারদিন রয়ে গিয়েছিল৷ খুন হওয়ার দিন রাতে সে কোনো এক কাজে গিয়েছিল দুর্গাপুর, সেখান থেকে বাইক চালিয়ে ফিরছিল৷ দুর্গাপুর থেকে বিহারপুর প্রায় ন-কিলোমিটার রাস্তা, তার মধ্যে অনেকটাই দামোদরের পাশ দিয়ে৷ গ্রামের কাছাকাছি আসার পর দুভাবে ঢোকা যায়৷ একটা নদীর পার দিয়ে, অন্যটা হাটতলা দিয়ে৷ নদীর দিকটা তাড়াতাড়ি হবে বলেই সম্ভবত ভোম্বল ওদিকটা বেছেছিল৷

শীতের রাত, ও মাফলার-জ্যাকেট পরে জোরে বাইক চালাচ্ছিল৷ হঠাৎ কেউ বা কারা তাকে লক্ষ্য করে পাথর ছুড়তে থাকে৷ এলোপাতাড়ি পাথরের আঘাত তার শরীরে, মাথায় এসে লাগতেই সে লুটিয়ে পড়ে৷

বাইকটা সজোরে গিয়ে ধাক্কা মারে পাশের এক গাছের গুঁড়িতে৷ বিহারপুর ঢোকার আগেই যে চর, সেখানেই পরের দিন সকালে গ্রামের লোকেরা তাকে পড়ে থাকতে দ্যাখে৷ আশপাশে নদীর অনেক ছোট-বড় পাথর পড়েছিল৷

ভোম্বল দাসের খবরটা পেয়ে এবার আর বিপুলকেতন পার্টি বা কারও নির্দেশের অপেক্ষা করলেন না, সঙ্গে সঙ্গে জিপ নিয়ে এসে হাজির হলেন বিহারপুরে৷ এস আই রামেশ্বরকে প্রায় তৎক্ষণাৎ বডি পোস্টমর্টেমে পাঠানোর নির্দেশ দিয়ে ঝুঁকে পড়লেন৷

রামেশ্বর লক্ষ করছিল, ভোম্বলের খবরটা পাওয়া থেকেই বিপুলকেতনের মুখচোখ বদলে গিয়েছিল৷ যেন প্রচণ্ড চিন্তায় ডুবে গিয়েছিলেন তিনি৷ ও প্রয়োজনীয় সমস্ত নির্দেশ কনস্টেবলদের দিয়ে বিপুলকেতনের কাছে আসতেই বিপুলকেতন চিন্তিত মুখে বললেন, ‘‘আমি একবার প্রোফেসর বড়ুয়ার বাড়ি যাচ্ছি রামেশ্বর৷ তুমি এদিকটা সামলাও৷’’

রামেশ্বর বলল, ‘‘ঠিক আছে স্যার৷ কিন্তু, যে খুন হল, ওই ভোম্বল দাস, তার বাড়ি যাবেন না?’’

‘‘পরে৷’’ বিপুলকেতন আর কথা না বাড়িয়ে জিপে উঠে একাই রওনা দিলেন বড়ুয়াবাড়ির দিকে৷ একহাত স্টিয়ারিঙের ওপর রেখে অন্য হাতে ফোন করলেন, ‘‘হ্যালো, প্রোফেসর বড়ুয়া৷ আমি একবার আপনার বাড়ি আসছি মিনিটকয়েকের জন্য৷ আপনি আছেন তো?’’

ওপাশ থেকে অনুপ বড়ুয়ার ভারাক্রান্ত কণ্ঠস্বর শোনা গেল, ‘‘আমি তো দুর্গাপুর গিয়েছিলাম৷ গাড়িতে ফিরছি৷ আপনি আধঘন্টা পর এলে ভালো হয়৷’’

‘‘আচ্ছা৷ সে ঠিক আছে৷’’ বিপুলকেতন প্রশ্ন করলেন, ‘‘দুর্গাপুর হঠাৎ … কোনো কাজে কি?’’

‘‘হ্যাঁ, ওই আর কি! বসুন্ধরাকে বাপের বাড়িতে রেখে এলাম৷ এখানে আর সামলানো যাচ্ছিল না৷ চারদিকে এত স্মৃতিচিহ্ন, পাগলের মতো করছিল … ও’বাড়িতে কিছুদিন থাক, তারপর নাহয় …! আমার মা’কেও দিদি নিয়ে গেছে৷’’ বিপুলকেতন স্পষ্ট বুঝতে পারলেন শেষের দিকে অনুপ বড়ুয়ার গলাটা ধরে এল৷

‘‘ঠিক করেছেন৷’’ বিপুলকেতন তাড়াতাড়ি বললেন, ‘‘আমার কোনো তাড়া নেই৷ আপনি ধীরেসুস্থে আসুন৷’’

ফোনটা রেখে বিপুলকেতন আরো একটা ফোন করলেন৷ কথা বললেন কয়েক সেকেন্ড৷ তারপর গাড়ির গতিমুখ সোজা ঘুরিয়ে দিলেন বাঁকা নদীর দিকে৷

গতকাল সকালে দুর্গাপুর থেকে তুতুনের পোস্টমর্টেমের রিপোর্ট এসে পৌঁছেছে৷ বিপুলকেতনের অনুমান সঠিক ছিল৷ কোনো ধাতব দণ্ড দিয়ে খুব জোরে আঘাত হানা হয়েছিল বাচ্চাটার মাথায়৷ দণ্ডটার মুখটা ধারালো নয়, ভোঁতা ছিল৷ সেইজন্য আঘাতের জায়গাটা অমন থেঁতলে গিয়েছে৷ আর, মাথাটা থেঁতলে দেওয়ার পরও শিশুটার দেহে প্রাণ ধুকপুক করছিল, সেই অবস্থায় তাকে জলে চুবিয়ে দেওয়া হয়৷ ফলে, জলে ডুবে মৃত্যু হলে যতটা জল ফুসফুসে ঢোকার কথা, ততটা ঢোকেনি, আবার মরে যাওয়ার পর ডুবিয়ে দেওয়ার চেয়ে বেশি ঢুকেছে৷ আর সেই কারণেই মৃত্যুর কারণ হিসেবে জলে ডোবাকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে৷

ঝড়ের বেগে গাড়ি চালাতে চালাতে বিপুলকেতনের মুখটা ক্রমশ ফুলে উঠছিল৷ রাগে৷ কে বা কারা এমন মর্মান্তিকভাবে খুন করতে পারে একটা নিষ্পাপ শিশুকে? তার ওপর আজ আরেকটা খুন৷ কোনো ছিনতাইকারীর দল বলে তো মনে হচ্ছে না, ভোম্বলের হাতের দামি ঘড়িটা ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেলেও সেটা হাতেই ছিল৷

এই ভোম্বল দাস লোকটাই সেদিন ফিসফিসিয়ে তাঁকে বলেছিল যে সে কিংশুক চক্রবর্তীকে সন্দেহ করে৷ কিংশুক চক্রবর্তী আবার থানায় গিয়ে বলে এল সে সন্দেহ করে ভোম্বলকে৷ কোনো ক্লু তো মিলছেই না, উল্টে মাঝখান থেকে ভোম্বল খুন হয়ে গেল৷ কী হচ্ছে এই বিহারপুরে?

বাঁকা নদীর চরটা বার্ধক্যে উপনীত হওয়া এক রুগ্ন সাপের মতো এঁকেবেঁকে জড়িয়ে রেখেছে গোটা গ্রামটাকে৷ মৃতপ্রায় এক নদী, তাতে জল সাকুল্যে হাঁটু অবধি, মাটির চেয়ে বালির পরিমাণ অনেক বেশি৷ নদীর ওপারে দুর্ভেদ্য জঙ্গল, তা প্রসারিত হয়েছে দামোদরের অন্য এক শাখা পর্যন্ত৷ নদীর এপারে অনেকটা জায়গা নদীর সমান্তরালে বালির চর, তার পাশ দিয়ে চলে গেছে মাটির রাস্তা৷ সেই রাস্তা গিয়ে মিশেছে গ্রামের অন্য সীমান্তে দামোদরের চরে৷

বিপুলকেতনের মনে পড়ল, তুতুনের দেহ উদ্ধারের দিনই এস আই রামেশ্বর বলছিল, নকশাল আমলে এই বালির চরে কত অসংখ্য লাশ যে এনকাউন্টারে পুঁতে ফেলা হয়েছিল তার কোনো সঠিক হিসেব নেই৷ সেই থেকেই নাকি গ্রামের মানুষজন এদিকে খুব একটা আসে না৷

বিপুলকেতন গাড়িটা মাটির রাস্তায় দাঁড় করিয়ে অলস পায়ে ইতিউতি হাঁটতে লাগলেন বালির চরে৷

কিংশুক বলে ছেলেটা নাকি রোজ বালির চরে এসে বসে থাকে৷ কেন আসে? ওর ভয় করে না? সেদিনও যদি ও এসে বসে থাকে, তাহলে তুতুন বা তুতুনের খুনিকে দেখতে পেল না কেন?

পরক্ষণেই বিপুলকেতন চোখ সরু করে দূরে তাকালেন৷ বাঁকার চর নেহাত ছোট জায়গা নয়৷ তুতুনের লাশ যেখানে ভাসছিল সেখানটা এখান থেকে পাঁচশো মিটার তো হবেই৷ বিপুলকেতন পকেট থেকে তাঁর সেই নোটবুকটা বার করে লিখে রাখলেন, কিংশুক কোনখানটায় এসে বসে থাকে, সেটা জানতে হবে৷

‘‘স্যার, ওদিকটায় বেশি যাবেন না, চোরাবালি আছে মাঝেমধ্যে, ধড়াস করে পা ঢুকে গেলে আরেক বিপত্তি বাধবে৷’’

এই জনবিহীন প্রান্তরে মনুষ্যকণ্ঠে বিপুলকেতন চমকে মুখ তুলে দেখলেন, পায়ে পায়ে ফুকলু হেঁটে আসছে এদিকে৷ নাহ, ছেলেটা কাজের আছে৷ ফোন করে ডাকতে না ডাকতেই চলে এসেছে৷

বিপুলকেতন বললেন, ‘‘আয়৷ কিছু খোঁজ পেলি?’’

ফুকলু নিমের কাঠির মতো কী একটা দিয়ে দাঁত খোঁচাতে খোঁচাতে বলল, ‘‘ভোম্বল দাস সম্পর্কে আপনার ইনফো ঠিক৷ ছেলেটা বড়লোক বাপের বখে যাওয়া ছেলে ছিল, স্কুল আর কলেজ লাইফে অনেক মারপিটের রেকর্ড আছে৷ তারপর বড় হয়ে বাপ কলকাতায় পড়তে পাঠায়, তখন বোধহয় একটু শুধরে গিয়ে চাকরিটা পায়৷ তবে এখন মিউনিসিপ্যালিটিতে হেবি ঘুষ খায়৷ নিজের পারসেন্টেজ ছাড়া একটা ফাইল ওপরে ফরোয়ার্ড করে না৷’’

বিপুলকেতন মন দিয়ে শুনছিলেন৷ ফুকলু থামতেই প্রশ্ন করলেন, ‘‘ইদানীং কারও সঙ্গে ঝামেলা-টামেলা?’’

‘‘সেরকম কিছুর খবর নেই৷’’ ফুকলু কাঁধ নাচাল, ‘‘তবে মিউনিসিপ্যালিটি অফিসে পাত্তিখোর হিসেবে বদনাম আছে৷ সেই আক্রোশে কেউ যদি …৷’’

‘‘হুম৷’’ বিপুলকেতন বললেন, ‘‘আর ওই কিংশুক চক্রবর্তী?’’

‘‘ও ছেলেটা আদ্যন্ত ভালো৷ ছোট থেকে স্কুলে ফার্স্ট হত, গরিব কিন্তু স্বভাবচরিত্র খুব ভালো৷ এখন টিউশনি পড়ায়৷ কোনো বদ নেশা নেই৷’’ ফুকলু চোখ বুজে বলে যাচ্ছিল, হঠাৎ কী যেন মনে পড়ার ভঙ্গিতে বলল, ‘‘ও হ্যাঁ৷ এই কিংশুকের মা তো লোকের বাড়ি বাড়ি রান্না করে, ভোম্বলদের বাড়িতেও করে৷’’

‘‘আর ওর ওই বাঁকা নদীর চরে বসে থাকার ব্যাপারটা?’’ বিপুলকেতন বললেন৷

‘‘ওটা সবাই জানে৷’’ ফুকলু যেন গুরুত্বই দিল না, ‘‘ও রোজই এখানে এসে বসে থাকত৷ গ্রামের সবাই জানে৷ আসলে অত ভালো ছেলে হয়েও চাকরিবাকরি কিছু পায়নি তো, একটু আত্মভোলা টাইপ হয়ে গেছে আর কি! টিউশনি পড়ায় গাদা গাদা, এদিকে অমন ভুলোমন স্বভাবের জন্য অর্ধেক ছেলেই মাইনে দেয় না ঠিকমতো৷’’

‘‘সেসবই ঠিক আছে৷’’ বিপুলকেতন মাথা নাড়লেন, ‘‘কিন্তু সেদিন বাচ্চাটাকে এখানে এসে মারা হল, আর ও চরে বসেও টের পেল না?’’

ফুকলু ভাবতে ভাবতে বলল, ‘‘না, সেটা কিন্তু হতেই পারে স্যার৷ ও একটা নির্দিষ্ট জায়গাতেই বসে থাকে৷ বামুনপাড়ার সামনে দিয়ে যে রাস্তাটা গিয়ে চরে মিশেছে, সেইখানে৷ আর বাচ্চাটার লাশ তো ভেসে উঠেছিল বড়ুয়াবাড়ির পেছনের চরে৷ দুটোর মধ্যে বেশ খানিকটা দূর৷’’

‘‘বড়ুয়াবাড়ির পেছনের চরে মানে?’’ বিপুলকেতন সন্দিগ্ধ স্বরে বললেন, ‘‘এই গ্রামে আরো কোনো বড়ুয়াবাড়ি আছে নাকি? অনুপ বড়ুয়ার বাড়ি তো চর থেকে অনেক দূরে!’’

‘‘ওমা, আপনাকে এইটা কেউ দেখায়নি বুঝি? দেখেছেন স্যার, ফুকলু ঘোষ কেমন কাজের খবরটা ঠিক দিয়ে দেয়! আসুন এদিকে৷’’ ফুকলু এবার দাঁত বের করে হেসে চরের দিকে এগিয়ে গিয়ে নদীর সঙ্গে সমান্তরালে হাঁটতে লাগল৷ বিস্মিত মুখে বিপুলকেতনও ওর পিছু নিলেন৷

প্রায় মিনিট পাঁচেক হাঁটার পর বিপুলকেতন জায়গাটা চিনতে পারলেন৷ এমনিতেও পুলিশ দিয়ে চরের ওই জায়গাটা সিজ করা আছে, তা ছাড়া পাশের ঝাঁকড়া বটগাছটাও একঝলক দেখলেই চেনা যাচ্ছে৷ ওই বটগাছটার পাশেই ভাসছিল তুতুনের লাশ৷

 ফুকলু কিন্তু জায়গাটার মুখোমুখি এসে উল্টোদিকে হাঁটতে লাগল৷ উল্টোদিকে কাঁচা রাস্তা পেরিয়ে এসে একটা বিক্ষিপ্ত ঝোপঝাড় মেশানো জঙ্গলে খচরমচর করে এগোতে থাকল৷ বিপুলকেতন ওর গতির সঙ্গে তাল মেলাতে মেলাতে বললেন, ‘‘কোথায় যাচ্ছিস বল তো তুই!’’

ফুকলু উত্তর না দিয়ে আরো তিন-চার মিনিট হেঁটে একটা পাঁচিলের সামনে এসে দাঁড়াল৷ পাঁচিলের ওপাশে বিশাল আমবাগান৷ এদিক থেকেই বড় বড় আমগাছগুলো দেখা যাচ্ছে বেশ৷

‘‘এটা কোথায়?’’ বিমুঢ় বিপুলকেতন জিগ্যেস করলেন৷

‘‘হেঁহেঁ, এখনো বুঝতে পারছেন না স্যার?’’ ফুকলু দাঁত বের করে আঙুল তুলে দেখাল, ‘‘ওই দেখুন আমগাছের ফাঁক দিয়ে কোনাকুনি বড়ুয়াবাড়ির ছাদ দেখা যাচ্ছে৷ এটা তো ওদের বাড়ির পেছনদিকের আমবাগান৷’’

বিস্মিত বিপুলকেতন এবার ভালো করে লক্ষ করলেন৷ আরে! ফুকলু তো ঠিকই বলেছে৷ আগের দিন তিনি খেয়াল করেননি, বড়ুয়াবাড়ির পেছনের আমবাগান দিয়ে সোজা বেরিয়ে এসে সোজা হাঁটলেই তো বাঁকার চর!

বিপুলকেতন পাঁচিলটাকে ভাল করে নিরীক্ষণ করতে করতে বললেন, ‘‘তাহলে সেদিন যখন প্রোফেসর বড়ুয়া লাশটা দেখতে গেলেন, ওদিক দিয়ে ঘুরে ঘুরে গেলেন কেন?’’

ফুকলু বলল, ‘‘এদিকের রাস্তাটা দেখছেন না স্যার? জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে, আগাছায় কী হয়ে গেছে৷ এটা আগে ছিল বড়ুয়াবাড়ির মেথরগলি, এদিক দিয়ে মেথর যেত আসত৷ এখন আর কেউ ব্যবহার করে না৷’’

বড়ুয়াবাড়িটা নিঃসন্দেহে বিশাল বাড়ি৷ বাড়ির ভেতরে অনেক জায়গা তো বটেই, বাইরেও দুপাশে আমবাগান বাড়িটাকে আশপাশের বাড়িগুলো থেকে একটা আলাদা দূরত্বে রেখেছে৷ দুদিকের আমবাগানেরই শেষে রয়েছে পাঁচিল৷ বাঁদিকে তাকিয়ে বিপুলকেতন বাবলু সমাদ্দারের বাড়িটা দূরে দেখতে পেলেন৷ বড়ুয়াদের আমবাগান শেষে পাঁচিল, তারপরেই শুরু হয়েছে সমাদ্দারের বাড়ি৷ বিপুলকেতনের মনে পড়ে গেল, ফুকলু কাল সকালেই থানায় গিয়ে বলে এসেছিল কয়েকমাস আগে এই পাঁচিল নিয়ে দু-তরফে ঝামেলা হয়েছে৷

বিপুলকেতন কাউকে ডাকলেন না, ফুকলুকে নিয়ে পাঁচিল আর বাড়ির মাঝের খোলা অংশ দিয়ে ঢুকে পড়লেন ভেতরে৷

আট

‘‘এখন কেমন আছেন?’’ মুখের ওপর ঝুঁকে পড়ে জিজ্ঞেস করলেন ডাক্তার৷

কিংশুক অতিকষ্টে চোখ খুলল৷ প্রথমে কিছুই দেখতে পেল না, সব কিছু ঝাপসা৷ রামধনু রঙের কেমন সব তরঙ্গ ভেসে চলেছে চোখের গহ্বর দিয়ে৷

বেশ কিছুক্ষণ পর ও ডাক্তারের হাসি হাসি মুখটা দেখতে পেল৷

আহ! মাথায় কী ব্যথা! কিংশুক আবার চোখ বুজে ফেলল৷ হাত দুটোকে মুচড়ে আড়মোড়া ভাঙতে গেল, কিন্তু পারল না৷ সর্বাঙ্গে প্রচণ্ড ব্যথা৷

অমনি হাঁ হাঁ করে উঠলেন ডাক্তার, ‘‘অত জোরে এখনই হাত পা ছাড়ানোর চেষ্টা করবেন না, খিঁচ লেগে যেতে পারে৷’’

কিংশুক কোনো উত্তর দিল না, কিন্তু আড়মোড়া ভাঙা থামিয়ে তাকাল সামনের দিকে৷

‘‘আপনি এখন বিহারপুর স্বাস্থ্যকেন্দ্রে আছেন৷’’ স্মিতমুখে বললেন ডাক্তার, ‘‘একটা বিশ্রী জ্বর হয়েছিল আপনার৷ কাল জোরালো ওষুধের জন্য সারাদিন ঘুমিয়েছেন৷ এখন টেম্পারেচার আর তেমন নেই৷ তবু হাতপায়ে ব্যথা আছে বলে রিস্ক নিইনি, ব্লক হাসপাতালে ব্লাড টেস্টের জন্য পাঠিয়েছি৷ আশা করি কালকের মধ্যে এসে যাবে রিপোর্ট৷’’

কিংশুক একটা হাই তুলে বলল, ‘‘আপনাকে আগে দেখেছি৷ গ্রামের মধ্যে একটা হেলথ ক্যাম্প হয়েছিল৷ সেখানে গিয়েছিলেন৷ আলাপ হয়নি কখনো৷ আসলে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে অনেকদিন আসা হয়নি৷ কোথায় বাড়ি আপনার?’’

‘‘আমার বাড়ি পুরুলিয়ায়, ঝাড়গ্রামের দিকে৷’’ ডাক্তারবাবু সেই একইরকম হাসিমুখে হাতজোড় করলেন, ‘‘আমার নাম পবন কিস্কু৷ আপনাদের এখানে এসেছি দেড়বছর হল৷’’

কিংশুক প্রতিনমস্কার করতে গিয়ে হাল ছেড়ে দিল৷ হাত দুটোর ওপর মনে হচ্ছে ভারী কোনো ওজন চাপিয়ে রাখা হয়েছে৷ চোখ দিয়ে সৌজন্যবিনিময় করে ও বলল, ‘‘আমার মা …৷’’

‘‘উনি আপনাকে ভরতি করে দিয়ে গিয়েছেন৷ আসলে আপনার এক ছাত্র তো কয়েকদিন আগে…৷’’ ডঃ কিস্কু থেমে গেলেন, ‘‘সেই মানসিক ট্রমা থেকেই মনে হয় আপনার ওই জ্বরটা এসেছিল৷ চিন্তার কিছু নেই৷ আজকের দিনটা অবজারভেশনে থাকুন, কাল সকালে ছেড়ে দেব৷ আমি রেবাদি, মানে নার্সকে বলছি আপনার ব্রেকফাস্টটা দিতে৷’’ শেষ কথাটা বলে উঠে দাঁড়ালেন ডঃ কিস্কু৷

কিংশুক কিছু বলল না, শুয়েই রইল৷ ডাক্তারের শেষ কথাগুলোয় ওর অকস্মাৎ আবার মনে পড়ে গেল তুতুনের কথা৷ মনে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভেতরে ভেতরে এক কষ্টে যেন অস্থির হতে লাগল ওর মন৷

কান টেনে মাথা নিয়ে আসার মতোই ওর ভোম্বলের কথা মনে পড়ল, আর সঙ্গে সঙ্গে রাগে, আক্রোশে ওর স্নায়ুগুলো উত্তেজিত হয়ে উঠল৷

বাসন্তী যখন এলেন, ততক্ষণে কিংশুকের ব্রেকফাস্ট খাওয়া হয়ে গেছে৷ সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ব্রেকফাস্ট মানে দু-পিস পাউরুটি, একটা কলা আর দুটো ডিমসেদ্ধ৷ খারাপ নয় মোটেই৷ কিংশুক উদাসচোখে জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে ছিল৷

এই স্বাস্থ্যকেন্দ্রটা গ্রামের একটু বাইরের দিকে৷ এদিকটা অত আসা হয় না এমনিতে৷ কিংশুকের মনে পড়ল, এর পাশেই একটা ছোট ফুলের বাগান আছে, নার্সারি জাতীয়৷ এই শীতের মধ্যে তুতুনকে এখানে ফুল চেনাতে নিয়ে আসার কথা ছিল ওর৷ কোথা থেকে কী সব হয়ে গেল৷

বাসন্তী এসেই এদিক-ওদিক তাকিয়ে একটু আড়ষ্টভাবে বললেন, ‘‘আমি কিন্তু তোর ওই জিনিসটা খাবারে মেশাইনি৷ সেদিন রাতেই ফেলে দিয়েছিলাম৷’’

কিংশুক কী একটা ভাবছিল, মায়ের কথায় ভ্রূ কুঁচকে বলল, ‘‘মানে? কী মেশানোর কথা বলছ?’’

বাসন্তী পোড় খাওয়া মহিলা৷ চটজলদি বুঝে নিলেন, এখানে কে কী শুনে ফেলতে পারে ভেবে ছেলে এড়িয়ে যেতে চাইছে৷ তার মানে ভোম্বলের ব্যাপারটা এর মধ্যেই ওর কানে এসে পৌঁছেছে৷ তিনি আর কথা বাড়ালেননা, বললেন, ‘‘তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে নে৷ আজ বিকেলে যদি ছেড়ে দেয়, দেখি একবার কথা বলে!’’

কিংশুক বলল, ‘‘তুতুনের ব্যাপারটার পুলিশ কোনো কিনারা করতে পারল?’’

বাসন্তী মাথা নাড়লেন, ‘‘না না৷ গ্রামে একটার পর একটা যা অনাসৃষ্টি কাণ্ড হচ্ছে! সকাল থেকে রাত অবধি দেখছি নানা জায়গায় পুলিশ৷ না তুতুন, না ভোম্বল কোনোটারই কিনারা হয়নি৷’’

কিংশুক আনমনে জানলার দিকে তাকিয়েছিল, মায়ের শেষ কথাটায় ঝট করে মুখ ঘুরিয়ে বলল, ‘‘ভোম্বল মানে? এর মধ্যে ভোম্বল কোথা থেকে এল? ভোম্বলকে কি পুলিশ অ্যারেস্ট করেছে?’’

বাসন্তী বললেন, ‘‘ওমা আমি ভাবলাম তোকে কেউ বলেছে বুঝি৷ তুই যেদিন ভোররাতে এখানে ধুম জ্বর নিয়ে ভরতি হলি, তার আগের রাতেই তো ভোম্বল মারা গেছে৷ তুতুন খুন হওয়ার পর থেকে কদিন তো এখানেই ছিল, অফিস করছিল এখান থেকেই৷ সেদিন রাতের বেলা দুর্গাপুর থেকে বাইক চালিয়ে আসছিল, কারা পাথর ছুড়ে মেরে ফেলেছে৷ সে যা অবস্থা! আমি তো দুদিন ধরে কাজে গিয়ে আবার ফিরে আসছি, রান্নাই চড়েনি ওদের বাড়িতে৷ তার ওপর ভোম্বলের দুধের বাচ্চাটা কিছুই বুঝছে না, ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রয়েছে … সে চোখে দেখা যাচ্ছে না৷’’

কিংশুকের মুখে যেন চাপ চাপ রক্ত জমা হয়েছে, একটা টোকা দিলেই তা ছলকে পড়বে বাইরে৷ বিস্ফারিত চোখে ও তাকিয়ে রইল মা’র দিকে৷

‘‘ভোম্বল কে?’’ ডঃ কিস্কু কখন পর্দা সরিয়ে ঘরে ঢুকেছেন, ওরা টেরই পায়নি৷

বাসন্তী শশব্যস্তে উঠে দাঁড়ালেন, ‘‘ওই যে ছেলেটা বাইকে খুন হল ডাক্তারবাবু৷ আমার ছেলের বন্ধু তো, ওরা একই ক্লাসে পড়ত৷’’

নতুন এই ডাক্তারের কাছে বাসন্তীর কৃতজ্ঞতার শেষ নেই৷ গত কয়েকদিনে কীভাবে সারাক্ষণ নজর রেখে কিংশুককে সুস্থ করে তুলেছেন ইনি, তা মা হয়ে নিজের চোখে দেখেছেন বাসন্তী৷ তাড়াতাড়ি নিজের বসার টুলটা তিনি এগিয়ে দিলেন ডাক্তারবাবুর দিকে৷

কিন্তু ডঃ কিস্কু বসলেন না, ঝুঁকে পড়ে কিংশুকের চোখের নিচদুটো একবার দেখলেন, তারপর বললেন, ‘‘পুলিশ তো এখনো বোধ হয় কোন কিনারা করতে পারেনি!’’

‘‘না না৷’’ বাসন্তী বললেন, ‘‘কি যে হচ্ছে আমাদের গ্রামে, সবাই চিন্তায় অস্থির হয়ে যাচ্ছে৷ আপনি তো বেশীদিন আসেননি এখানে, বিশ্বাস করুন ডাক্তারবাবু, বিহারপুর খুব শান্ত এলাকা, কোনোদিন এখানে বড়সড় মারামারিও হয়নি৷ হঠাৎ করে কি যে শুরু হয়েছে!’’

***

অনুপ বড়ুয়া বললেন, ‘‘কিংশুক ছেলেটা পড়াশোনায় খুব ভালো ছিল, কিন্তু বড্ড মুখচোরা৷ সাতচড়ে রা কাড়ে না, আপনার মুখে দিকে তাকিয়েও কথা বলবে না৷’’

বিপুলকেতন বললেন, ‘‘বছরদুয়েক আগে ও একবার দুর্গাপুরে গিয়েছিল চাকরি করতে, তারপর হঠাৎই সব ছেড়েছুড়ে গ্রামে চলে আসে কিছু একটা গণ্ডগোল হয়েছিল বলে৷ সেইসময় আপনি নাকি ওকে অনেক হেল্প করেছিলেন৷ ব্যাপারটা কী একটু বলুন তো!’’

বিপুলকেতন বড়ুয়াবাড়ির বিশাল দালানটায় একটা চেয়ার পেতে বসেছিলেন৷ এত বড় বাড়িটা যেন মৃত্যুপুরীর মতো থমথম করছিল৷ কোনো সাড়াশব্দ নেই৷ সেই বুড়ো চাকরটাই বা কোথায় গেল, মনে মনে ভাবলেন তিনি৷

অনুপ বড়ুয়া একটা ফ্যাকাশে চাদর জড়িয়ে বসেছিলেন৷ এই ক’দিনেই যেন মনে হচ্ছে তাঁর বয়স অন্তত কুড়ি বছর বেড়ে গেছে৷ মুখে ক’দিনের না কামানো দাড়ি, মাথার চুল অবিন্যস্ত, চোখে যেন দুটো করমচা ফুটে রয়েছে৷

‘‘এসবের সঙ্গে তুতুনের সম্পর্কটা কী আমি তো ঠিক…!’’ অনুপ বড়ুয়া বিপুলকেতনের প্রশ্ন শুনে বললেন, ‘‘ওটা এমন কিছু ব্যাপার নয়৷ কিংশুক দুর্গাপুরে যখন বাড়িভাড়া করে থাকত, ওর রুমমেট একদিন রাতে ঘুমের ওষুধ খেয়ে আত্মহত্যা করে৷ সেইসময় দুর্গাপুরে ওর কোনো চেনা পরিচিত কেউ না থাকায় পুলিশ অকারণে ওকে হ্যারাস করছিল৷ আমি তখন ওই ঝামেলা থেকে বেরোতে ওকে সাহায্য করেছিলাম৷’’

বিপুলকেতন বললেন, ‘‘কিংশুক দুর্গাপুরে কোথায় চাকরি করত?’’

‘‘একটা ওষুধ কোম্পানিতে৷ সমরেশ, মানে যে আত্মহত্যা করে, সে আর কিংশুক ছিল খুব বন্ধু, যাকে বলে হরিহর আত্মা৷ দুজনে একইসঙ্গে দুর্গাপুরের একটা কলেজে বায়োসায়েন্স পড়েছিল৷ তার কিছুদিন পর একইসঙ্গে ওই কোম্পানিতে ঢোকে৷’’ অনুপ বড়ুয়া বললেন৷

‘‘কী কাজ ছিল ওদের?’’ বিপুলকেতন জিজ্ঞেস করলেন৷

‘‘আমার অত ডিটেইল মনে নেই, তবে যতদূর মনে পড়ছে ওই ওষুধকোম্পানির সেলসে ছিল ওরা৷’’ অনুপ বড়ুয়া বললেন, ‘‘কিংশুক আর সমরেশ দুজনেই বায়োসায়েন্সের ছাত্র ছিল৷ ডাক্তারদের ভিজিট করে ওষুধের স্যাম্পল দেখিয়ে বাজার ধরাটা ছিল ওদের প্রধান কাজ৷ তো সেই কাজে এত টার্গেট আর চাপ ছিল, যে ওদের কেউই খুশি ছিল না৷ আমার সঙ্গে দেখা হলে মাঝেমাঝেই কিংশুক বলত যে, আর পোষাচ্ছে না, এবার ছেড়ে দেবে৷ এরকমই একটা সময় সমরেশ হঠাৎ একদিন রাতে অনেকগুলো ঘুমের ওষুধ খেয়ে আত্মহত্যা করে৷’’

‘‘তারপর?’’

‘‘যেমন হয়, পুলিশ কিংশুককে জেরা করতে শুরু করে৷ কারণ সেদিন রাতে সমরেশ আর কিংশুক পাশাপাশি ঘরে শুয়েছিল, ভোরে উঠে কিংশুকই সমরেশকে মৃত অবস্থায় প্রথম দ্যাখে৷’’ অনুপ বড়ুয়া বললেন, ‘‘সমরেশ যেহেতু কোনো সুইসাইড নোট লিখে যায়নি, পুলিশ কিংশুককে অনেকভাবে হ্যারাস করছিল, অথচ ওর কোনো দোষ ছিল না৷ সমরেশ নিজের প্রেমিকার সঙ্গে মনোমালিন্যের জন্য আত্মহত্যা করেছিল৷ আমি তখন কিংশুককে যতটুকু পারি সাহায্য করেছিলাম৷ বেচারা বন্ধুকে খুব ভালোবাসত, তার অমন পরিণতি দেখে কেমন ট্রমাটিক হয়ে পড়েছিল …৷’’

‘‘আপনি কী করে বুঝেছিলেন যে সমরেশ প্রেমের কারণে সুইসাইড করেছিল?’’

অনুপ বড়ুয়া একটু থেমে গিয়ে বললেন, ‘‘না মানে, আর তো কোনো কারণ ছিল না৷ সমরেশ তার কিছুদিন আগেই একটা ভালো সরকারি চাকরি পেয়ে গিয়েছিল, সেই মাসটাই ছিল তার দুর্গাপুরে শেষ৷ ওর প্রেমিকার সঙ্গে আগের কয়েকদিন ধরে কিছু ব্যাপার নিয়ে ঝগড়া হচ্ছিল, সেটা কিংশুকই পুলিশকে জানিয়েছিল৷ ওদের বাড়িওয়ালাও জেরায় একই কথা বলেছিল৷’’

বিপুলকেতন বললেন, ‘‘তাহলে পুলিশ নিশ্চয়ই ওর প্রেমিকাকেও ইন্টারোগেট করেছিল?’’

‘‘হ্যাঁ৷ করেছিল৷’’ অনুপ বড়ুয়া মাথা নাড়লেন, ‘‘আমি ওদিকটা অত জানি না, তবে সম্ভবত মেয়েটার স্ট্রং অ্যালিবাই ছিল৷ ফলে কোন কিছু প্রুভ করা যায়নি৷ কেস ধামাচাপা পড়ে যায়৷’’

বিপুলকেতন উত্তর দিলেন না৷ হাতটা থুতনির নীচে রেখে গভীর চিন্তায় যেন ডুবে গিয়েছেন তিনি৷

অনুপ বড়ুয়া বললেন, ‘‘আমাদের গ্রামের কেউই ব্যাপারটা তেমন ভালো করে জানে না৷ আসলে এখানকার বেশিরভাগ লোকই তো অশিক্ষিত, কিছু না বুঝেই ভুলভাল গুজব রটিয়ে দেবে, তাই…৷’’

‘‘বুঝলাম৷’’ বিপুলকেতন উঠে দাঁড়ালেন৷ তাঁর ভারী চেহারা, অনেকক্ষণ একটানা বসে থাকলে প্যান্টটা ভুঁড়ির নিচে নেমে যায়৷ দু-হাতে প্যান্টটাকে তুলে নিয়ে তিনি বললেন, ‘‘শেষ প্রশ্ন, দুর্গাপুরের কোন থানায় এটা ঘটেছিল?’’

‘‘ওরা থাকত কোক ওভেন কলোনিতে৷ ওই থানাতেই৷’’ অনুপ বড়ুয়া বললেন৷

নয়

ডঃ কিস্কু অনেকক্ষণ ধরে একটা অদ্ভুত শব্দ পাচ্ছিলেন৷ শব্দের তীব্রতা খুব বেশি না হলেও একটানা হয়ে চলেছিল৷ তিনি তবু বিছানা ছেড়ে ওঠেননি৷ সারাটাদিন একমাত্র ডাক্তার হিসেবে অনেক পরিশ্রম হয়৷ খুব এমারজেন্সি কিছু না হলে শীতের রাতে লেপের তলা থেকে বেরিয়ে নীচে যেতে কারই বা ভালো লাগে?

দিন যেন আর কাটছে না এই পাণ্ডববর্জিত জায়গায়৷ ডঃ কিস্কু মাঝেমধ্যে হাঁপিয়ে ওঠেন৷ আর বছর দুই কাটিয়ে দিতে পারলে যদি দুর্গাপুরেও পোস্টিং পাওয়া যায়, তখন একটু বিনোদনের সুযোগ থাকবে৷ এম ডি-র এন্ট্রান্স পরীক্ষাটাও ভালো করে দেওয়া যাবে৷ কী আছে কপালে কে জানে!

নার্স রেবাদি নীচে নাইট ডিউটিতেই আছে৷ শব্দটা শুরু হয়েছিল বারোটা নাগাদ, তখন ডঃ কিস্কু বিছানায় শুয়ে শুয়েই নীচে ফোন করেছিলেন, রেবাদিও জড়ানো গলায় উত্তর দিয়েছিল, ‘‘ইঁদুরের খুব উৎপাত হয়েছে ডাক্তারবাবু৷ কাল কল বসাব৷ ওই পেশেন্টটা ঘুমিয়ে পড়েছে৷ হালকা অ্যাসপিরিন দিয়েছিলাম৷’’

ডঃ কিস্কু বিছানায় শুয়েছিলেন মানে যে ঘুমোচ্ছিলেন তা কিন্তু নয়৷ যতই ক্লান্তিতে চোখের পাতা ভারী হয়ে আসুক, কী একটা চিন্তায় যেন বারবার ভেঙে যাচ্ছিল তন্দ্রা৷

তাঁর ষষ্ঠেন্দ্রিয় কেমন যেন একটা অশুভ বার্তা পাঠাচ্ছে মস্তিষ্কে৷ ডঃ কিস্কু সেটা ঠিক ধরতে পারছেন না৷ যে পেশেন্টটা নীচে ভরতি রয়েছে, তার কি কোনো সমস্যা হচ্ছে? নাকি প্রিয়তম ছাত্রের এমন মৃত্যুতে সে প্রচণ্ড শক পেয়েছে বলে ভুল বকছে!

খটকাটা লেগেছিল গতকালই, কিন্তু জ্বরের প্রলাপ ভেবে ডঃ কিস্কু তেমন পাত্তা দেননি৷ কিন্তু আজ দুপুরে যখন শরীরে টেম্পারেচার ছিল না, তখনো ছেলেটা সেই একই কাণ্ড করে চলেছিল৷ তারপর ওর মা’র কিছু কথা শুনে …!

 পবন কিস্কু মনে মনে আরো কিছু কথা সাজিয়ে নিয়ে ফোন করলেন ইন্দ্রনীল চ্যাটার্জিকে৷ ইন্দ্রনীলদা মেডিক্যাল কলেজে ওঁর সিনিয়র ছিল, খুব ভালো ছাত্র, এখন সায়কিয়াট্রিতে এম ডি করছে৷

ইন্দ্রনীলদা ফোন ধরেই বিরক্তিতে চেঁচিয়ে উঠলেন, ‘‘শালা তোদের জন্য সারাদিন ডিউটি করে এসে একটু শান্তিতে ঘুমোতেও পারব না৷ ফোন করার আর টাইম পেলি না পবন? রাত আড়াইটে?’’

ডঃ কিস্কু হেসে ফেললেন৷ ইন্দ্রনীলদার সেই চেঁচিয়েমেচিয়ে কথা বলার অভ্যাসটা আর গেল না৷ তবে সেই ফার্স্ট ইয়ার থেকেই তো দেখছে, মানুষটা যেমনই পরোপকারী, তেমনই স্পষ্টবাদী৷ এইকারণে মেডিকেল কলেজে ইন্দ্রনীলদার একটা বিশাল ফ্যান ফলোয়িং ছিল৷

পবন কিস্কু গলায় একটু কৃত্রিম মধু ঢেলে বললেন, ‘‘আহা রাগ করো কেন! আমাদের কিবা দিন কিবা রাত! আর তোমাকে সবসময়েই মনে পড়ে৷ তুমি ছাড়া আমাদের কে আছে বলো?’’

‘‘রাতদুপুরে ছেঁদো তেল না মেরে বল কী চাস৷’’ ইন্দ্রনীলদা বলল৷

পবন কিস্কু বললেন, ‘‘দেখো, আমার হেলথ সেন্টারে একটা পেশেন্ট অ্যাডমিট হয়েছে কালকে৷ প্রথমে ভেবেছিলাম সাধারণ হেমোর্যাজিক ফিভারের কেস৷ গায়ে টেম্পারেচার ছিল, সঙ্গে সামান্য খিঁচুনি৷ আমি সিম্পল অ্যাসিটেমিনোফেন আর প্যারাসিটামলের ওপর রেখেছিলাম৷ ব্লাড স্যাম্পল নিয়ে ব্লক হসপিটালে ডেঙ্গু টেস্টের জন্য পাঠিয়েছি৷ রিপোর্ট এখনো আসেনি, কিন্তু একটা অন্য জিনিস নোটিশ করছি৷ দেখলে মনে হবে পেশেন্ট ঘুমোচ্ছে, কিন্তু আসলে ঘুমোচ্ছে না, কেমন একটা ঘোরের মধ্যে চলে গিয়ে অদ্ভুত কথাবার্তা বলছে৷ এদিকে ব্লাড প্রেশার, হার্টবিট সব স্বাভাবিক৷’’

ইন্দ্রনীলদা একটা হাই তুলে বললেন, ‘‘মাইল্ড হাইপোভোলেমিয়া হতে পারে৷ রক্তে প্লাজমা কমে গেলে হয়, তখন পেশেন্ট ভুল বকে৷ সোডিয়াম পুশ করে দেখেছিস?’’

‘‘না ইন্দ্রনীলদা, ভুল বকছে না, পেশেন্ট হ্যালুসিনেট করছে৷ চোখ খুলে সামনে কাউকে দেখে চিৎকার করছে, আর কণ্ঠস্বরও পাল্টে যাচ্ছে৷ অথচ কিছু পরেই স্বাভাবিক হয়ে যাচ্ছে, তখন আগের ঘটনাটা মনেও করতে পারছেনা৷ এটা অন্য কিছু মনে হচ্ছে আমার৷ তাই তোমায় ফোন করলাম৷’’

ইন্দ্রনীলদা এবার একটু থমকে গেল৷ বলল, ‘‘ডিসোসিয়েসিভ অ্যামনেশিয়া নয় তো? সিম্পটমগুলো আরেকবার ভালো করে বল তো?’’

ফোন রাখতে রাখতে প্রায় আধঘণ্টা কেটে গেল৷ ডঃ কিস্কু ফোন রেখে ঘুমিয়ে পড়ার আগে পর্যন্ত গভীর চিন্তায় মগ্ন রইলেন৷ চিন্তার মধ্যে তাঁর একবারও মনে হল না যে, একটু আগের সেই একটানা শব্দটা এখন আর পাওয়া যাচ্ছে না৷

ঘুম ভাঙল ভোর পাঁচটায়৷ কোনো পেশেন্ট ভরতি থাকলে প্রতিদিনই এই সময় একবার রুটিন ভিজিটে যান ডঃ কিস্কু৷ অলস পায়ে উঠে গায়ে ভালো করে শালটা জড়িয়ে নিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নামতে শুরু করলেন তিনি৷ আগে এই গ্রামীণ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে কোনো বেড ছিল না, রুগিদের শুধু দেখা হত আউটডোরে, ডঃ কিস্কু এখানে জয়েন করার পরে পরেই দশটা বেডের একটা ওয়ার্ড করা হয়েছে৷ এতে অবশ্য ডঃ কিস্কুর ভালোই হয়েছে৷ জ্বরে বা ডায়রিয়াতে কাতরে পড়া রুগিকে আগে ব্লক হাসপাতালে রেফার করতে কেমন যেন লাগত, তার চেয়ে এখানেই প্রাথমিক সার্ভিসটুকু দেওয়া যাচ্ছে৷

স্বাস্থ্যকেন্দ্রটা একটা ছোট দোতলা বাড়ি, মাঝখান দিয়ে দরজা, সামনে একচিলতে বাগান৷ দরজার উল্টোদিকে পরপর দুটো ঘর৷ একটায় রুগি থাকে, অন্যটায় আউটডোরে ডাক্তার বসেন৷ দোতলায় একটাই ঘর৷ তাতে ডঃ কিস্কু থাকেন৷ একা মানুষ, খুব অসুবিধা কিছু হয় না৷ দামু বলে একটা ছেলে এসে দু’বেলার খাবার দিয়ে যায়৷

ডঃ কিস্কু রুগির ঘরটায় ঢুকে দেখলেন রেবাদি নিজের চেয়ারে বসে ঘুমচ্ছে৷ মাথাটা টেবিলের ওপর হেলানো, গায়ের মোটা চাদরটা গুটিসুটি মেরে সারা মাথায় জড়ানো৷

আর জ্বরের পেশেন্টটা যে বেডে শুয়েছিল, সেটা ফাঁকা৷

ডঃ কিস্কুর বুকের ভেতরটা একমুহূর্তের জন্য ছলকে উঠলেও স্নায়ুর ওপর তীব্র নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখে প্রথমেই তিনি গিয়ে বাথরুমটা চেক করলেন৷ দরজা খোলা, কেউ নেই৷ তারপর চলে গেলেন বাইরে৷ বাইরের গেটও খোলা৷ সারারাতের কোন দারোয়ান এখানে থাকে না, গেটের বাইরে তখনো হলুদ আলোটা জ্বলছে৷ দূরে কুয়াশা জমাট বেঁধে ধূসর হয়ে রয়েছে৷

ডঃ কিস্কু আবার উদ্ভ্রান্তের মতো ভেতরে চলে এলেন৷ রেবাদিকে মৃদুস্বরে ডাকলেন, ‘‘রেবাদি, বেডে ওই পেশেন্টটা নেই৷’’

রেবাদি ধড়ফড় করে উঠল, চোখ বড়বড় করে বলল, ‘‘এ কী! ডাক্তারবাবু …আমি তো সারারাতই জেগে নজর রাখছিলাম, মাঝেমাঝে এপাশ-ওপাশ করছিল, কিন্তু আর কিছু তো করেনি৷ এই একটুখানি চোখটা লেগে গিয়েছিল আমার …!’’

ডঃ কিস্কুর কানে আর কিছু ঢুকল না, দিশেহারার মতো অফিসের ভেতর থেকে নিজের স্কুটারটা বের করে তিনি বেরিয়ে গেলেন৷

দশ

শীত গ্রীষ্ম বর্ষা, প্রতিদিন বিপুলকেতন পাক্কা ছ’টায় উঠে পড়েন৷ তারপর তাঁর কাজ হল কিছুক্ষণ কোয়ার্টারের সামনের গাছগুলোয় জল দেওয়া, তারপর ব্যায়াম করা৷ বিপুলকেতন মোটা হতে পারেন, পুলিশের উর্দি পরলে তাঁর ভুঁড়ি শরীর থেকে অনেকটা বেরিয়ে থাকতে পারে, কিন্তু তাই বলে কেউ তাঁকে এই অপবাদ দিতে পারবে না যে তিনি সহজেই হাঁপিয়ে যান বা ফিট নন৷

রাজ্যপুলিশের তরফ থেকে তিনি বেশ কয়েকবার পুরস্কৃত হয়েছেন তাঁর অসীম এনার্জি ও সাহসিকতার জন্য৷ রিটায়ারমেন্টের আর বছর দশেক বাকি, এইসময় তিনি একটু ধরাকরা করলেই বাড়ি থেকে যাতায়াত করা যায় তেমন কোনো পোস্টিং পেতে পারতেন, কিন্তু ওসব তাঁর ধাতে নেই৷ সেইজন্য স্ত্রী-কন্যার অভিযোগের অন্ত নেই, কিন্তু বিপুলকেতন সেসবে পাত্তা দেন না৷ তিনি কাজের মানুষ, কলকাতায় সদর অফিসে হাজারো কর্তার নীচে বসে মাছি তাড়ানোর থেকে এই বনগাঁয়ে শিয়ালরাজা থাকা অনেক ভালো৷

বিপুলকেতনের কোয়ার্টার থেকে কাছেই থানাটা দেখা যায়৷ বিপুলকেতন থানার দিকে তাকিয়ে নিঃশ্বাস বন্ধ করে হাত দুটোকে বেঁকিয়ে পায়ের আঙুল ছোঁয়ার চেষ্টা করছিলেন, এমন সময় তাঁর চোখে পড়ল একটা লোক বেশ হন্তদন্ত হয়ে থানার সামনে স্কুটার থেকে নামছে৷

বিপুলকেতন কৌতূহলী চোখে কিছুটা এগিয়ে গেলেন৷ ততক্ষণে লোকটা বেশ দ্রুতগতিতে থানায় ঢুকে পড়েছে৷ বিপুলকেতন কাছাকাছি এসে দেখলেন হাবিলদার শিউচরণ থানার গেটের সামনে গুটিসুটি মেরে ঢুলছে৷ বিপুলকেতন মুখে কিছু বললেন না, শুধু মৃদু ঠেলা দিয়ে এগিয়ে গেলেন৷

শিউচরণ ধড়মড় করে জেগে উঠে সামনে কাউকে দেখতে না পেয়ে একটা পেল্লায় সেলাম ঠুকে দিল৷ তারপর আবার ঢুলতে লাগল৷

বিপুলকেতন ভেতর ঢুকে দেখলেন, লোকটা কাউকে দেখতে না পেয়ে এদিক-ওদিক তাকাচ্ছে৷ কাঁকসা থানায় এত সকালে আর কাকেই বা পাবে! আজ নাইট ডিউটি ছিল রামেশ্বরের, নিশ্চয়ই সে ব্যাটা ভেতরে গিয়ে ঘুমোচ্ছে৷ আরেকজন এস আই শঙ্করের অফ ছিল, সে ছুটিতে গেছে৷

বিপুলকেতন গলাখাঁকারি দিয়ে বললেন, ‘‘কী চান বলুন?’’

লোকটা পেছন ফিরে তাকাল, বলল, ‘‘আমি বিহারপুর থেকে আসছি৷ আচ্ছা, এই থানার ওসি বা কোনো অফিসার…৷’’

‘‘আমিই ওসি৷ বলুন?’’

লোকটা যেন হাতে স্বর্গ পেল৷ বলল, ‘‘স্যার, আমি বিহারপুর হেলথ সেন্টারের ডাক্তার৷ আমার নাম পবন কিস্কু৷ আপনি…আপনি একবার শিগগির আমার সঙ্গে বিহারপুর চলুন, একটা খুব বড় বিপদ ঘটে যেতে পারে যে-কোনো মুহূর্তে৷’’

‘‘আবার বিহারপুর?’’ বিপুলকেতন বললেন, ‘‘কী বিপদ?’’

এগারো

কাঁকসা থানার জিপটা ঝড়ের গতিতে দামোদরের পার ঘেঁষে বিহারপুরের দিকে ছুটছিল৷ জিপের ঊর্ধ্বশ্বাস গতিতে নদীর বালিগুলো বিদ্যুৎকণার মতো লাফিয়ে সরে পথ করে দিচ্ছিল৷ জিপের মধ্যে বসেছিলেন ডঃ কিস্কু, বিপুল কেতন, এস আই রামেশ্বর আর দুজন কনস্টেবল৷ ডঃ কিস্কুর মুখ গম্ভীর, আর বিপুলকেতন উত্তেজনায় নখ খেয়ে যাচ্ছেন৷ টেনশন হলে নখ খাওয়া তাঁর বহুদিনের স্বভাব৷ জুনিয়র থাকার সময়ে এই নিয়ে কর্তাদের কাছে কত বকুনি খেয়েছেন তার ইয়ত্তা নেই৷

জিপটা বিহারপুরের কাছাকাছি এসে গ্রামের মধ্যে হাটতলা দিয়ে ঢুকল না, একটা মোড়ে অপেক্ষা করছিল ফুকলু, তাকে তুলে নিয়ে গাড়িটা বরং বাঁকা নদীর চর ধরে এগিয়ে চলল দূরে৷ এখনো বিহারপুর গ্রাম বলতে গেলে ঘুমিয়ে, পুলিশের জিপ যে গ্রামে ঢুকেছে, সেটা অনেকেই জানতে পারল না৷

মিনিট পনেরো পরে বাঁকা নদীর চরে যখন জিপটা এসে দাঁড়াল, ঘড়িতে তখন সবে সকাল সাতটা৷ এখনো কুয়াশায় ঢেকে আছে চারদিক৷ সূর্যদেব গাঢ় কমলা রঙে ঢেকে রেখেছেন নিজেকে৷ দূরের হাঁটুজলের বাঁকা নদীতে দু-একটা পরিযায়ী পাখি এসে ঠোঁটে করে জল ঠোকরাচ্ছে, পরক্ষণেই ডানা ঝাপটে উড়ে গিয়ে বসছে দূরে৷ গোটা চরেই একটা নিঃশব্দ নিঝুম ভাব, যেন থমকে গিয়েছে চারপাশ৷

বিপুলকেতন জিপ থেকে লাফিয়ে নেমে কাউকে দেখতে পেলেন না৷ ছোট ছোট সবুজ আগাছা বালির মধ্যে ইতস্তত ছড়ানো রয়েছে চারদিকে৷ মাঝে মাঝে মাথা উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে বুনো গাছ৷ শীতের হিমেল হাওয়ায় সেই গাছের নাম না জানা পাতাগুলো কাঁপছে তিরতির করে৷

বিপুলকেতন সমস্ত ঝোপগুলো সার্চ করে দেখতে বললেন কনস্টেবল দুজনকে৷ তারপর ফুকলুর দিকে তাকালেন, ‘‘ও কোনখানটায় বসে থাকে জানো ফুকলু?’’

ফুকলুও এদিক-ওদিক খুঁজছিল৷ আচমকা ফোন পেয়ে সে একটা পাতলা শার্ট পরেই হন্তদন্ত হয়ে বেরিয়ে এসেছে, এখন নদীর ধারে এসে ওর বেশ শীত করছিল৷ বলল, ‘‘স্যার, এইখানটাতেই তো বসে থাকত …৷’’

বিপুলকেতন হাতের লাঠিটা দিয়ে ছোট ঝোপগুলো টোকা দিয়ে দেখছিলেন৷ বললেন, ‘‘ডঃ কিস্কু, কোনখানটা থাকতে পারে আপনি কোনো ধারণা করতে পারেন? চর তো নেহাত ছোট জায়গা নয়৷’’

ডঃ কিস্কু উত্তর দিলেন না৷ বিপুলকেতন আর দুবার প্রশ্নের পুনরাবৃত্তি করেও কোনো উত্তর না পেয়ে পেছন ফিরে দেখলেন এস আই রামেশ্বর কনস্টেবল দুজনকে দিয়ে জায়গাটা সার্চ করাচ্ছে, ওদিকে ফুকলুও ইতিউতি খুঁজছে৷

কিন্তু ডঃ কিস্কু কোথাও নেই৷

কী হল ব্যাপারটা! বিপুলকেতন বিস্মিত চোখে এগিয়ে এসে ডাকলেন, ‘‘ডাক্তারবাবু! কোথায় গেলেন আপনি?’’

কোনো উত্তর পাওয়া গেল না৷ বিপুলকেতন রামেশ্বরের দিকে এগিয়ে যেতে যেতে বললেন, ‘‘অদ্ভুত ব্যাপার! ডঃ কিস্কু তো আমাদের সঙ্গেই গাড়ি থেকে নামলেন!’’

রামেশ্বর পেছন ফিরে বিপুলকেতনকে কিছু বলতে যাচ্ছিল, তার আগেই উল্কার গতিতে ঘটনাটা ঘটে গেল৷

রামেশ্বর বিস্ফারিত চোখে আঙুল তুলল বিপুলকেতনের পেছনে, তারপর বিপুলকেতন কিছু বুঝে উঠতে পারার আগেই এক মাইক্রোসেকেন্ডের মধ্যে সে ছুটে এল, এসে বিপুলকেতনকে ধাক্কা মেরে সরিয়ে দিল একপাশে৷ বিপুলকেতন তাঁর অতবড় শরীরটাকে নিয়ে বালির মধ্যে ছিটকে পড়লেও পরক্ষণেই ক্ষিপ্রগতিতে উঠে দাঁড়ালেন৷ আর উঠে দাঁড়িয়ে যে রক্তহিম করা দৃশ্যটা দেখলেন, তাতে এত বছরের অভিজ্ঞতা সত্ত্বেও নিজের অজান্তেই তাঁর শিরদাঁড়া দিয়ে একটা হিমকুচি নেমে গেল৷

একটা বিকৃতদর্শন লোক, তার মাথার চুলগুলো মুখের ওপর এলোমেলো হয়ে ছড়িয়ে পড়ে কেমন বিসদৃশ হয়ে রয়েছে, গালের খোঁচা খোঁচা দাড়ির ওপরেও রুক্ষতার প্রলেপ, একটা পাথর দিয়ে বিশাল জোরে আঘাত হেনেছে সামনের গাছের কাটা গুঁড়িটার ওপর, ঠিক যেখানটা এক সেকেন্ড আগেও বিপুলকেতন দাঁড়িয়েছিলেন, সেইখানটা এখন গুঁড়িটা দু-ভাগে দ্বিখণ্ডিত হয়ে হাঁ হয়ে গেছে৷

বিপুলকেতন আরো লক্ষ্য করলেন, লোকটার চোখ দিয়ে যেন অপরিসীম ঘৃণা ঝরে পড়ছে, ঠোঁটের দু-কোণ দিয়ে গড়িয়ে নামছে উত্তেজনার লালা৷ কিন্তু সেই ঘৃণা বা উত্তেজনা যেন এই শিকার ভ্রষ্ট হওয়ার জন্য নয়, সে যেন অন্য কিছু খুঁজছে৷ তার লক্ষ্য যেন অন্য কিছু৷

লোকটা পেছন ঘুরতেই বিপুলকেতন দেখতে পেলেন তার পায়ের কাছের ঝোপে এলিয়ে পড়েছে দুটো চটি পরা পা, শরীরের ঊর্ধ্বাঙ্গ ঝোপের মধ্যে ঠেসে ঢুকিয়ে দেওয়া৷ পা দুটো ঈষৎ কাঁপছে তিরতির করে৷

বিপুলকেতন চটি দুটো চিনতে পারলেন৷ ভোরবেলা এই চটি দুটো পরেই ডঃ কিস্কু গিয়েছিলেন কাঁকসা থানায়৷

ওদিকে লোকটার আঘাত লক্ষ্যভ্রষ্ট হতেও সে যেন আঘাত হেনেই এই দিকটা সম্পূর্ণ ভুলে গেছে৷ সে এখন পেছন ফিরে বালিতে অচৈতন্য পা দুটোকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে নদীর দিকে, হাতে তুলে নিয়েছে আর একটা পাথর৷

টলতে টলতে এগোচ্ছে সে, আসুরিক শক্তিতে সে যেন উন্মত্ত, চলতে চলতে সে বিকৃত গলায় চিৎকার করে আকাশ বাতাস খানখান করে দিচ্ছে, ‘‘তোদের মরতেই হবে৷ অনেক সুযোগ নিয়েছিস তোরা৷ তোরা আমাদের শেষ করে দিচ্ছিস! মর! মর তোরা!’’

বিপুলকেতন একঝলক তাকালেন রামেশ্বরের দিকে৷ সেও বুঝি কেমন হকচকিয়ে গেছে৷ এমন ভয়ঙ্কর দৃশ্যের সামনে পড়ে সে স্থবির হয়ে গেছে যেন!

বিপুলকেতন আর দেরি করলেন না৷ লোকটা ডঃ কিস্কুর মাথায় পাথরটা থেঁতলে দেওয়ার জন্য হাতটা ওপরদিকে তুলতেই বিপুলকেতনের রিভলভারের অব্যর্থ নিশানা এসে তার হাতটাকে এফোঁড় ওফোঁড় করে দিল৷ একবার নয়, বারবার দুবার৷ তারপর তৃতীয় এবং শেষবারের মতো রিভলভারটা গর্জে উঠল লোকটার হাঁটু তাক করে৷

মাত্র কয়েক সেকেন্ড৷ তারপরই লোকটা বালিতে লুটিয়ে পড়ে নিশ্চল হয়ে গেল৷ চরাচরের যে পাখিগুলো অকস্মাৎ বিকট শব্দে এদিক-ওদিক ভয়ে উড়ে যাচ্ছিল, তারাও বুঝি সবাই এদিক ফিরে তাকিয়ে দেখল সাতসকালে নদীর পারে মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যে ঘটে যাওয়া এই বীভৎস দৃশ্যটা৷

বিপুলকেতনের স্নায়ুগুলো এই কয়েক মুহূর্তের উত্তেজনায় ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল, তারই মধ্যে মিটার তিনেক দূর থেকেও তিনি স্পষ্ট দেখতে পেলেন লোকটার গুলি খাওয়া রক্তাক্ত হাতটা লাল হয়ে গেছে, তবু তার মধ্যে জ্বলজ্বল করছে উল্কি করা একটা নাম, ‘শিবাঙ্গী!’

বারো

 ডঃ ইন্দ্রনীল চ্যাটার্জি বললেন, ‘‘ডিসোশিয়েসিভ আইডেন্টিটি ডিজঅর্ডার৷ এটা অবশ্য আমাদের ডাক্তারি পরিভাষার নাম, আপনাদের ভাষায় মাল্টিপল পারসোনালিটি ডিজঅর্ডার৷ একটা প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের মধ্যে অনেকগুলো সম্পূর্ণ আলাদা মানুষের উপস্থিতি৷ যেগুলো বিভিন্ন সময় এতটাই প্রকট হয়ে ওঠে, যে সে মাঝে মাঝেই আসল মানুষটাকে কন্ট্রোল করতে শুরু করে৷’’

বিপুলকেতন, অনুপ বড়ুয়া আর পঞ্চায়েত প্রধান বাবলু সমাদ্দার হতভম্ব মুখে শুনছিলেন৷ বিহারপুর গ্রামের একমাত্র স্বাস্থ্যকেন্দ্রেই এখন সবাই বসে আছেন ওঁরা৷ অদূরেই রুগির বেডে মাথায় মোটা ব্যান্ডেজ জড়িয়ে আধশোয়া হয়ে বসে রয়েছেন ডঃ পবন কিস্কু৷ সকালের সেই রুদ্ধশ্বাস ঘটনার পর বেশ কয়েক ঘণ্টা কেটে গেছে৷

ডঃ চ্যাটার্জি থামতেই বাবলু সমাদ্দার সবিস্ময়ে বলে উঠলেন, ‘‘এরকম সত্যিই হতে পারে?’’

‘‘হতে পারে কী বলছেন!’’ ডঃ ইন্দ্রনীল চ্যাটার্জি বললেন, ‘‘কত আছে! প্রায় দেড়শো বছর আগে ফ্রান্সে একজন ডিসোশিয়েসিভ আইডেন্টিটি ডিজঅর্ডারের রুগি ছিল৷ সেটা আমাদের সায়কিয়াট্রিতে এখনো বিস্ময়কর কেসগুলোর মধ্যে একটা৷ লোকটার নাম ছিল লুই ভিভেট৷ তার মা ছিল একজন বারবণিতা, সবদিক থেকে খুব ডিস্টার্বড ছিল লোকটার শৈশব৷ ডাক্তাররা তার মধ্যে দশটা পুরো আলাদা আলাদা মানুষের অস্তিত্ব পেয়েছিলেন৷ সেই দশটা লোক মাঝে মাঝেই ওকে চালাত, তখন ওর আর কোনো হুঁশ থাকত না৷’’

‘‘আলাদা আলাদা মানুষ মানে … দশটা আত্মা? ভর করা জাতীয় কিছু?’’ ইন্দ্রনীল চ্যাটার্জি থামতে না থামতে জিজ্ঞেস করলেন বাবলু সমাদ্দার৷

‘‘আহা আত্মা-টাত্মা নয়, ভূতপ্রেতের ব্যাপারই নয় এগুলো৷ এটা পুরো মানসিক রোগ৷ কিম নোবেল বলে ইংল্যান্ডে এক মহিলা ছিল, সে তো আরো ভয়ঙ্কর৷ ছোটবেলায় বাবা-মা’র দৈনিক ঝগড়া দেখে আর আত্মীয়দের হাতে নির্যাতিত হতে হতে সে ভেতর ভেতর প্রচণ্ড হিংস্র হয়ে এই রোগের শিকার হয়ে পড়েছিল৷ তার মধ্যে প্রায় একশোর কাছাকাছি সত্তার খোঁজ পাওয়া গিয়েছিল, যেগুলোর প্রত্যেকটাই ছিল সাংঘাতিক ধ্বংসাত্মক৷’’

‘‘কীরকম?’’ বাবলু সমাদ্দার হাঁ করে শুনছিলেন৷

‘‘একটা ঘটনা বলছি শুনুন৷ কিম একটা কোম্পানির গাড়ি চালাত, স্বাভাবিক সময়ে সে পুরো নর্মাল থাকত৷ তার ভেতরের একটা সত্তার নাম ছিল জুলি৷ সেই জুলি একদিন কিমের নিজস্ব সত্তাকে ছাপিয়ে গিয়ে গাড়িটাকে নিয়ে গিয়ে পার্কিং লটের একগাদা গাড়ির মধ্যে ধাক্কা দিয়ে দিল৷ পরমুহূর্তেই কিন্তু কিমের নিজস্ব সত্তাটা ফিরে এল, ও আর মনেই করতে পারল না যে ওরই ভেতরের একটা সত্তা এই কাজটা করেছে৷ সে সোজা চলে গেল থানায় ডায়রি করতে যে কেউ একটা তার গাড়ি দিয়ে অন্য গাড়িদের ধাক্কা দিয়েছে৷ ডায়রি করে ফেরার পথে সে আবার নানারকম হুমকি পেতে লাগল৷ সেই হুমকিগুলোও কিন্তু সম্পূর্ণ তার মনগড়া, নিজের ভেতরের সত্তারাই তাকে ফুঁসে উঠে হুমকি দিচ্ছিল৷ এইভাবে একটা সত্তা হুমকি দিতে দিতে তার নিজেরই মুখে অ্যাসিড ঢেলে দিল, কেউ আবার ওর বাড়িতে আগুন লাগিয়ে দিল৷ মানে এগুলো সবই কিম নিজে নিজেই করল৷ নিজেই নিজের মুখে অ্যাসিড ছুড়ল, নিজেই নিজের বাড়িতে আগুন লাগাল৷ কিন্তু করার সময়ে সে বুঝতেই পারল না যে সে করল৷ বুঝতে পারছেন?’’ ডঃ চ্যাটার্জি একটানা বলে দম দিলেন৷

‘‘কী সাংঘাতিক ব্যাপার!’’ রামেশ্বর অস্ফুটে বলল, ‘‘এটাকেই কি স্কিজোফ্রেনিয়া বলে?’’

‘‘না সেটা অন্য জিনিস৷ সেক্ষেত্রে মানুষ যা নেই তা দ্যাখে, যে মানুষের অস্তিত্ব নেই তাকে অনুভব করতে শুরু করে৷ কিন্তু কোনো অবস্থাতেই সেই অস্তিত্ব তাকে কন্ট্রোল করে না৷ এটা স্কিজোফ্রেনিয়ার চেয়ে অনেকগুণ বেশি জটিল মানসিক রোগ৷’’ ডঃ চ্যাটার্জি বললেন, ‘‘কোর্টেও এই রোগ নিয়ে অনেক বিতর্ক হয়েছে৷ কোনো রুগি নিজের অন্য সত্তার হয়ে কোনো খুন করেছে, এমন উদাহরণও আছে, কিন্তু সেক্ষেত্রে বিভিন্ন দেশের আদালত দ্বিধায় পড়ে গেছে৷ কারণ খুনটা তো আসলে রুগি নিজে করেনি, করেছে তার একটা সত্তা, তার হয়ে রুগি কেন শাস্তি পাবে? অনেকে দাবি করেছে এইসব কিছুই না, সব ওদের অভিনয়৷’’

বাবলু সমাদ্দার নিজের মনেই মাথা নাড়লেন দুপাশে, ‘‘অভিনয় করে কেউ নিজের মুখে নিজে অ্যাসিড ছুড়তে পারে নাকি?’’

‘‘সেইজন্যই আমরা সায়কিয়াট্রির লোকেরা বিশ্বাস করি এটা সত্যিই এক জটিল রোগ৷ আমাদের মস্তিষ্ক এতটাই জটিল যে সবকিছুর ব্যাখ্যা এখনো করা যায় না পুরোপুরি৷ দিনের পর দিন প্রচণ্ড দুঃখ-কষ্ট-বৈষম্যের শিকার হলে এই রোগে মানুষ আক্রান্ত হতে পারে৷ এক্ষেত্রেও সেটাই হয়েছে৷ ভারতের সামাজিক কাঠামো বা যে-কোনো কারণের জন্যই হোক, আমাদের দেশে এই রোগ কিন্তু খুব একটা দেখা যায় না৷ প্রধানত পশ্চিমের দেশগুলোতে, যেখানে আধুনিক জীবনযাত্রা, অস্থির দাম্পত্য, সেসবেই এটা বেশি দেখা গেছে৷ তাই কাল রাতে পবন যখন আমায় পুরো ব্যাপারটা ন্যারেট করল, আমি আর দেরি করিনি, ভোর হতে না হতেই গাড়ি বের করে চলে এসেছি এখানে৷ এসে দেখি এর মধ্যেই এত কিছু ঘটে গেছে!’’ ডঃ চ্যাটার্জি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন৷

ডঃ কিস্কুর মাথার ব্যান্ডেজটা ড্রেসিং করছিলেন রেবাদি, সেই অবস্থাতেই ডঃ কিস্কু বললেন, ‘‘আমি যখন পুরো ব্যাপারটা সন্দেহ করছিলাম ইন্দ্রনীলদা, তখনো আমি কারণটা বুঝতে পারিনি৷ কিংশুক চক্রবর্তী ছেলেটা প্রথম দিন রাতেই যখন ঘুমের মধ্যে বিড়বিড় করছিল যে ভোম্বলদের শেষ করে দিতে হবে, তখনো বুঝিনি৷ বুঝতামও না, যদি না ওসিসায়েব বুঝিয়ে বলতেন!’’

বিপুলকেতন বললেন, ‘‘আমার প্রথম সন্দেহ হয়েছিল ভোম্বলকেই৷ কারণ কিংশুক আমার অফিসে এসে বলেছিল যে ভোম্বলের প্রোফেসর বড়ুয়ার ওপর চাপা আক্রোশ রয়েছে৷ কিন্তু তারপর যখন ভোম্বল ওইভাবে খুন হল, তখন আমি পুরো ব্যাপারটাকে অন্যভাবে ভাবতে শুরু করলাম৷ তার আগে ভোম্বলই আমাকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইনফরমেশনটা দেয়৷ প্রোফেসর বড়ুয়াকে জিজ্ঞাসাবাদ করে আমি তখন আরো ডিটেইলে জানতে পারি৷’’

ডঃ কিস্কু জিজ্ঞেস করলেন, ‘‘কী ইনফরমেশন?’’

‘‘দুর্গাপুরে থাকাকালীন ওর এক প্রেমিকা ছিল, শিবাঙ্গী৷ কিংশুক বরাবরের মুখচোরা হলেও শিবাঙ্গীকে সে প্রাণ দিয়ে ভালোবেসেছিল৷ কিন্তু, শিবাঙ্গী সম্ভবত ওর ওই সামান্য সেলসের চাকরি নিয়ে খুশি ছিল না৷ এই নিয়ে প্রায়ই ওদের মধ্যে কথাকাটাকাটি হত৷ কিংশুক আর সমরেশ একসঙ্গে একটা বাড়িভাড়া করে থাকত, সেখানে প্রায়ই শিবাঙ্গী আসত৷ সমরেশ আর কিংশুক দুজনেই খুব বন্ধু ছিল৷ দুজনেই কাজের জায়গায় হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে এসে ঘরে সরকারি চাকরির জন্য পড়ত৷ এরকম যখন অবস্থা, তখন দুম করে সমরেশ একদিন একটা চাকরি পেয়ে গেল৷ আর তারপর থেকেই শিবাঙ্গী ক্রমশ সমরেশের প্রতি ঝুঁকতে লাগল৷’’

‘‘আমি এসব কিছুই জানতাম না!’’ বিস্মিত অনুপ বড়ুয়া বললেন৷

‘‘আপনি কী করে জানবেন?’’ বিপুলকেতন বললেন, ‘‘আপনাকে তো কিংশুক নিজে যা জানে, তাই বলেছিল৷ ওর অন্য সত্তারা কে কী ভাবছে, কে কী করছে সেটা তো ও আপনাকে বলেনি, ওর জানার কথাও নয়৷ এই কেসটা দুর্গাপুর কোক ওভেন কলোনি থানার এখনো একটা স্ট্রেঞ্জ কেস হয়ে পড়ে আছে, যার কোনো কিনারা হয়নি৷ সমরেশ আত্মহত্যা করেছিল স্লিপিং পিল খেয়ে৷ সে নিজে মেডিকেল রিপ্রেজেন্টেটিভ ছিল, তাই তার পক্ষে ঘুমের বড়ি জোগাড় করা খুব কঠিন ছিল না৷ সেই একই সন্দেহ করা যেতে পারত কিংশুকের প্রতিও৷ কিন্তু ঘটনাস্থলে পাওয়া গেল মেয়েদের একটা চুলের ক্লিপ৷ ওটা হয়তো আগে থেকেই ছিল, কিন্তু ওটাই পুরো তদন্তকে ভুল পথে চালিত করল৷ কিংশুকদের বাড়িওয়ালা জানত যে শিবাঙ্গী প্রায়ই ওদের বাড়িতে আসে, তাই নিয়ে সে দু-বন্ধুকেই আগে সতর্ক করেছিল৷ চুলের ক্লিপ পাওয়া যেতেই সবাই ধরে নিল, সেদিনও নিশ্চয়ই শিবাঙ্গী এসেছিল৷ আর ওর প্রত্যক্ষ মদতেই হোক বা পরোক্ষ, তার সঙ্গে মনোমালিন্যেই বিচলিত হয়ে সমরেশ সুইসাইড করেছে৷ এতে কিংশুকের কোন হাত নেই৷ সে বেচারা অন্য ঘরে ঘুমচ্ছিল, এসবের কিছুই জানে না৷ প্রোফেসর বড়ুয়া মাঝখান থেকে ঢুকে নিজের প্রভাব খাটিয়ে কিংশুককে আরো তাড়াতাড়ি সন্দেহের কবল থেকে মুক্ত করলেন৷’’

সবাই নিশ্চুপ বিস্ময়ে শুনছে৷ গোটা ঘরটায় বোধহয় পিন পড়লেও শব্দ হবে৷

‘‘কিন্তু পুলিশ শিবাঙ্গীকেও কিছু করতে পারল না৷ তার স্ট্রং অ্যালিবাই ছিল৷ সে সেদিনই সকালের মেল ট্রেনে বাবা-মা’র সঙ্গে ঘুরতে চলে গিয়েছিল দক্ষিণ ভারত৷ কাজেই কেসটা আস্তে আস্তে ধামাচাপা পড়ে গেল৷

এই পুরো ব্যাপারটা জানার পর আমি তুতুন আর ভোম্বলের ব্যাপারটা নতুন করে ভাবতে শুরু করলাম৷ সমরেশ, তুতুন, ভোম্বল, এই তিনটে হত্যাতেই কমন লিঙ্ক একজন, সে হল কিংশুক৷ এমন কি হতে পারে যে, এই কিংশুক বলে ছেলেটার মধ্যেকার কোনো অবচেতন ব্যক্তিত্ব ওকে দিয়ে এই অপরাধগুলো করাচ্ছে? তুতুন তার মাস্টার কিংশুককে ভীষণ ভালোবাসত৷ কাল ফুকলু বড়ুয়াবাড়ির পেছন দিয়ে সোজা বাঁকা নদীর চরে যাওয়ার পরিত্যক্ত গলিটা দেখাতে উপলব্ধি করলাম, সেদিন পড়াতে এসে কিংশুক যদি তুতুনকে ভুলিয়েভালিয়ে পেছন দিক দিয়ে বাঁকার চরে নিয়েও যায়, কারও জানার কথা নয়৷ তার আগের অনেকটা সময় মিসেস বড়ুয়া দোতলায় রান্নাঘরে ছিলেন, আর ওদের বুড়ো চাকর দাশরথি ব্যস্ত ছিল গোয়ালে৷’’

‘‘আমার মনে হয় ঠিক সেটাই ঘটেছিল৷’’ মাথা নেড়ে বললেন ডঃ ইন্দ্রনীল চ্যাটার্জি৷

‘‘তারপর দেখুন, যেদিন রাতে ভোম্বল দুর্গাপুর থেকে বাইক চালিয়ে ফিরছিল, সেদিন রাতে কিংশুকের যে ধুম জ্বর ছিল তা ওর মা-ই জানিয়েছিল ডাক্তার কিস্কুকে৷ জ্বরের ঘোরে যার মধ্যে ওই সত্তা ভর করছে, জ্বরের ঘোরে তার পক্ষে নদীর চরে যাওয়াও অসম্ভব কিছু নয়৷ কিংশুকদের বাড়ি বামুনপাড়ায়৷ আর তার পাশ দিয়েই ভোম্বল ফিরছিল৷ পুরোনো বন্ধুত্ব, ভোম্বলই হয়তো কথায় কথায় কিংশুককে বলে রেখেছিল সেদিন সে দুর্গাপুর যাবে৷ কিংশুক স্বাভাবিক অবস্থায় যেটা শুনেছিল, সেটাই উপযুক্ত সুযোগ বলে ধরে নিয়েছিল ওর দ্বিতীয় সত্তা৷’’

‘‘মানে দুটো সম্পূর্ণ আলাদা সত্তা৷ একটা সত্তা বৈষম্যের বিরুদ্ধে মূক হয়ে থেকে অবসাদে হতাশায় ভোগে, অন্য সত্তায় সেই হতাশাই কোলাহলমুখর হয়ে জন্ম দেয় চূড়ান্ত হিংসার৷’’ ডঃ চ্যাটার্জি বললেন, ‘‘পবন আমাকে তুতুনের ঘটনাটা পুরো বিশদে বলেছে৷ আমার যেটা মনে হয়, কিংশুক রোজ বাঁকা নদীর চরে গিয়ে একা একা বসে থাকত৷ সেদিন বসে থাকতে থাকতে তার মধ্যে হিংস্র সত্তাটার আবির্ভাব হয়৷ আর সব রাগ গিয়ে পড়ে নিষ্পাপ ওই শিশুটার ওপরে৷ হ্যাঁ, যে কিংশুক তুতুনকে প্রাণ দিয়ে ভালোবাসত, সেই কিংশুকেরই অন্য একটা সত্তা বাড়ির পেছন দিক দিয়ে ঢোকে তুতুনের ঘরে৷ তুতুন তখন পড়তে বসেছিল৷ প্রিয় মাস্টারের কথায় সহজেই ভুলে সে তার সঙ্গে চলে যায়৷ কেউ জানতেও পারে না৷ কিংশুকের সেই হিংস্র সত্তা নদীর চরে গিয়ে প্রথমেই তুতুনের মাথায় পাথর থেঁতলে দেয়৷ তখনো ওইটুকু শরীরে প্রাণ ছিল৷ কিন্তু তারপর মৃত্যু নিশ্চিত করতে তাকে ডুবিয়ে দেয় জলের মধ্যে৷ ওইটুকু জলে কেউ ডুবে মরতে পারেনা৷ কিন্তু চেপে ধরে থাকলে তো মরবেই৷ এভাবেই তুতুনের প্রাণবায়ু নিভে যায়৷’’

‘‘চুপ করুন! আপনি প্লিজ চুপ করুন!’’ স্থান কাল পাত্র ভুলে চিৎকার করে ওঠেন প্রোফেসর বড়ুয়া৷ তাঁর মুখচোখ থরথর করে কাঁপছে, গাল দিয়ে নেমে আসছে জলের ধারা, ‘‘আ-আপনি আর বলবেন না৷ আমি সহ্য করতে পারছি না!’’

ইন্দ্রনীল চ্যাটার্জি সঙ্গে সঙ্গে অপরাধীর ভঙ্গিতে সম্মতি জানিয়ে চুপ করে গেলেন৷

কিন্তু বিপুলকেতন থামলেন না৷ একজন পুত্রশোকে কাতর বাবার বিরহ তাঁর ভেতরে আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছে৷ তিনি বললেন, ‘‘তারপরই কিংশুক কিন্তু আবার স্বাভাবিক হয়ে যায়৷ রোজকার মতো সে পড়াতে যায় বড়ুয়াবাড়িতে, গিয়ে তুতুনকে দেখতে না পেয়ে সে-ই খোঁজ নিতে যায় ওপরে৷ তারপর সবার সঙ্গে মিশে বাচ্চাটার চিন্তায় উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠে৷ আমি তাকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জেরা করেছিলাম৷ সে বলেছিল সেদিন সে বাঁকা নদীর চরে বসে থাকলেও কোনো আওয়াজ শুনতে বা কাউকে দেখতে পায়নি কারণ নদীর হাওয়ায় সে ঘুমিয়ে পড়েছিল, তার আগে ধাক্কাও খেয়েছিল কোনো পাথরে৷ আসলে সে ঘুমিয়ে পড়েনি, তার অবচেতনের সেই ব্যক্তিত্বটা জাগ্রত হয়েছিল বলেই তার নিজস্ব সত্তার কোনো চেতনা ছিল না৷ পায়ের আঘাতটাও তুতুনকে নিয়ে আসার সময় বা মারার সময়েই হয়েছিল৷’’

‘‘কিন্তু তুতুন, ভোম্বল বা ডঃ কিস্কু, তারা কী অপরাধ করেছে যে তাদের মারতে গিয়েছিল কিংশুক?’’

বিপুলকেতন বললেন, ‘‘এটাই সবচেয়ে বড় চমক৷ আমি খুনের মোটিভগুলো ধরতে পারছিলাম না৷ কিন্তু সেদিন কোক ওভেন থানার থেকে কেসটা ডিটেইলে স্টাডি করেই আমার মাথায় কারণটা স্ট্রাইক করল৷ সমরেশের পদবি ছিল বাস্কে৷ সমরেশ বাস্কে৷ সে শিডিউলড ট্রাইব কোটায় সরকারী চাকরি পেয়েছিল, অন্যদিকে কিংশুক জেনারেল কাস্টের হওয়ায় কিছুতেই পাচ্ছিল না, তার ওপর কিংশুকের প্রেমিকাও ঢলে পড়েছিল সমরেশের দিকে৷ কিংশুক যেদিন আমার কাছে থানায় এসে বলেছিল সে ভোম্বলকে সন্দেহ করে, সেইদিনই অবস্থাপন্ন ঘরের ছেলে হয়েও রিজার্ভড ক্যাটেগরিতে ভোম্বল দাস যে চাকরি পেয়েছিল সেটা সে অত্যন্ত শ্লেষের সঙ্গে বলেছিল আমাকে৷ বলতে বলতে যে তার মুখ বিরক্তিতে বিদ্বেষে বেঁকে যাচ্ছিল, সেটা আমি লক্ষ করেছিলাম৷ তাই আজ ভোরে যখন ডঃ কিস্কু আমাকে বললেন যে কিংশুক জ্বরের ঘোরে বারবার বলছে ভোম্বলদের মরতেই হবে, আমি তখনই উপলব্ধি করি যে, ভোম্বলদের বলতে কিংশুক এখানে বলতে চাইছে ভোম্বলদের মতো রিজার্ভড ক্যাটেগরির ছেলেমেয়েরা৷ সমরেশ বা ভোম্বল দুজনেই ওর চেয়ে খারাপ বা একই মানের ছাত্র হয়েও তারা চাকরি পেয়ে গিয়েছিল, সেখানে ও পায়নি, উল্টে দিনের পর দিন ভয়ঙ্কর হতাশা গ্রাস করেছিল ওকে৷ ভোম্বল ওকে পরীক্ষার কথা বললে ও সেটাকে অন্যভাবে নিতে শুরু করেছিল৷ সেই হতাশা থেকেই ওর মধ্যে জন্ম নিয়েছিল অন্য একটা হিংস্র সত্তা, যে একে একে সরাতে শুরু করেছিল শত্রুদের৷’’

‘‘কিন্তু আমার ছেলেটা?’’ ককিয়ে উঠলেন প্রোফেসর বড়ুয়া, ‘‘আমার ছেলে তো দূর, আমাদের বাড়ি কেউ কখনো ওকে কোনোদিনও অপমান করিনি৷ বরং যতটা পেরেছি সাহায্য করেছি৷ বরাবর৷ আমার এতবড় সর্বনাশ ও কেন করল?’’

‘‘হ্যাঁ৷ কিন্তু ওই যে বাক্যটা…ভোম্বলদের মরতে হবে! ওটা একটা বড় সূত্র৷’’ বিপুলকেতন বললেন, ‘‘কিংশুক নিজে তুতুনকে প্রাণ দিয়ে ভালোবাসত৷ ঠিক যেমন ভালোবাসত সমরেশকে৷ কিন্তু, ওর ভেতরের সেই অশুভ সত্তাটা বারবার মাথা চাড়া দিয়ে উঠে বোঝাত, যে তুতুনও কিন্তু শিডিউলড ট্রাইব পরিবারের ছেলে৷ কিংশুক কোনোভাবে দুর্গাপুরে থাকার সময়েই হয়তো সেটা জানতে পেরেছিল, আমিও আপনার কলেজ থেকে কনফার্ম করেছি৷ অত বড়লোক হয়ে, প্রোফেসরের ছেলে হয়েও তুতুনও তো বড় হয়ে ওই সুবিধাটাই ভোগ করবে, এই রাগ আর হিংসাই ওর ওই সত্তাকে মনে হয় রাগে অন্ধ করে দেয়৷’’

প্রোফেসর অনুপ বড়ুয়া বিস্ময়ে শোকে পাথর হয়ে গেলেন৷

ডঃ কিস্কুর দিকে তাকালেন বিপুলকেতন, ‘‘আচ্ছা কিংশুক জ্বরের ঘোরে আর কী কী বলেছিল এঁদের বলুন তো ডাক্তারবাবু?’’

ডঃ কিস্কু বললেন, ‘‘কিংশুক চোখ বন্ধ করেই কেমন সুরেলা গলায় কাউকে ডাকছিল৷ কোনো বাচ্চাকে ভুলিয়েভালিয়ে কোথাও নিয়ে যাওয়ার হলে আমরা যেমনভাবে ডাকি৷ সেখানে বারবার বলছিল, আমি তোমার কাকা হই, তোমার বাবার বেস্ট ফ্রেন্ড আমি৷ আমার সঙ্গে নদীর চরে বেড়াতে যাবে? তারপর বারবার সুর করে কাউকে ডাকছিল সে৷’’

বিপুলকেতন মাথা নাড়লেন, ‘‘এই কথাটাতেই আমি বুঝতে পারি, এরপর টার্গেট হবে ভোম্বল দাসের বাচ্চা ছেলেটা৷ কারণ কিংশুকের ওই দ্বিতীয় সত্তা রিজার্ভড ক্যাটেগরির কোনো বংশকে বাড়তে দেবে না৷ এটাই তার প্রতিহিংসা৷’’

অনুপ বড়ুয়া মাথা নিচু করে চশমাটা খুলে চোখ মুছছিলেন৷ অনেক কষ্টেও তিনি নিজেকে সংবরণ করতে পারছেন না৷ তুতুন চলে যাওয়ার পর এই কদিন স্ত্রী-মা’র মুখ চেয়ে শক্ত পাথরের মতো অটল থেকেছেন তিনি, আজ যেন আগ্নেয়গিরির লাভার মতো ভলকে ভলকে বেরিয়ে আসতে চাইছে কষ্টটা৷

‘‘কী সাংঘাতিক!’’ বাবলু সমাদ্দারের মুখ দিয়ে অস্ফুটে বেরিয়ে এল, ‘‘আচ্ছা, আপনি কেন প্রথমে নদীর চরেই গেলেন? কিংশুকদের বাড়ি গেলেন না কেন স্যার?’’

বিপুলকেতন বললেন, ‘‘আমি কিংশুকের দিক থেকে ভাবার চেষ্টা করছিলাম৷ ওর অবচেতন মনের সেই শয়তান সত্তাটা বারবার ভোম্বলের ছেলেকে নদীর চরে বেড়াতে নিয়ে যেতে চাইছিল৷ তাই প্রতিহিংসার তাড়নায় প্রথমে সেখানে যাওয়াটাই স্বাভাবিক৷ সেখানে গিয়ে কাউকে না পেলে তখন যেতাম ভোম্বলের বাড়ি, তারপর কিংশুকের বাড়ি৷ কিন্তু আমি বুঝতে পারিনি যে নদীর চরে গিয়ে কাউকে না পেয়ে ও ডাক্তারবাবুকে আক্রমণ করে বসবে৷’’

‘‘আসলে নদীর চরে গিয়ে তখন ও শত্রুদলের কাউকে শেষ করতে চাইছে, কিন্তু পাচ্ছে না৷ সেইসময় হঠাৎ ও দেখতে পেয়ে যায় ডঃ কিস্কুকে৷ ওর মনে পড়ে যায় ডাক্তারের পদবিটা, আগের দিনই যেটা ও কথায় কথায় জানতে পেরেছিল৷ তাই অতর্কিতে হামলা চালায় ওঁর ওপর৷’’ রামেশ্বর এতক্ষণে মুখে খুলল, ‘‘না হলে দেখলেন না স্যার, আপনাকে প্রথমে মারতে এলেও আমি ঠেলে সরিয়ে দেওয়ার পর কিন্তু আমাদের দিকে আর মনোযোগ দেয়নি, ওর তখন শরীরমন জুড়ে শুধু একটাই তৃষ্ণা, ডঃ কিস্কুকে এই পৃথিবী থেকে সরাতে হবে৷’’

‘‘ঠিক তাই৷’’ ইন্দ্রনীল চ্যাটার্জি বললেন, ‘‘আসলে কিংশুক মাল্টিপল পারসোনালিটি ডিজঅর্ডারের এক ভয়াবহ উদাহরণ৷ পবন কালই জেনেছে, ছোট থেকে বাড়িতে ওকে নিদারুণ দারিদ্র্যের সঙ্গে সংগ্রাম করতে হয়েছে৷’’

ডঃ কিস্কু মাথা নেড়ে সায় দিলেন, ‘‘হ্যাঁ৷ ওর মা এখনো খুব পরিশ্রম করে, ওই ভোম্বলের বাড়িতেই তাকে রান্না করতে হয়৷ এটা ওর কাছে একটা বিরাট অপমান ছিল৷ গ্রামের স্কুলের আদ্যন্ত সেরা ছেলে হয়েও জীবনযুদ্ধে সে ঠিকমতো ফোকাস না থাকার জন্যই হোক বা যে-কোনো কারণে, ক্রমশ পিছিয়ে পড়েছিল৷ ওর মুখচোরা স্বভাবের জন্য হয়ত ইন্টারভিউতেও ও তেমন নজর কাড়তে পারত না৷ ছোট থেকে সবার প্রশংসার পাত্র হয়েও বড় হয়ে সবার প্রচ্ছন্ন তাচ্ছিল্য আর উপহাস তার মধ্যে জন্ম দিয়েছিল এই রাগের৷ আর সামনে যেহেতু ভোম্বল আর সমরেশ দুজনেই ছিল উদাহরণ, ও শিখণ্ডী হিসেবে খাড়া করেছিল এই রিজার্ভেশন সিস্টেমটাকে৷ যত রাগ গিয়ে পড়েছিল ওটার ওপর৷ তাই ভেতরে ভেতরে জন্ম নিয়েছিল এক অন্য সত্তা, যে কিনা প্রতিশোধ নিতে নেমেছিল৷ যাদের ও এমনিতে ঘৃণা করত, কিংবা যাদের ভালোবাসত, তাদের প্রত্যেককেই শুধু রিজার্ভড ক্যাটেগরি হওয়ার অপরাধে খতম করার লক্ষ্যে ছুটছিল সেই সত্তা৷’’

‘‘ও এখন কোথায়?’’ অনেকক্ষণ পর ধরা গলায় প্রশ্ন করলেন প্রোফেসর অনুপ বড়ুয়া৷

বিপুলকেতন বললেন, ‘‘আপাতত পুলিশি হেফাজতে বর্ধমান মেডিকেল কলেজে পাঠানো হয়েছে৷ গুলি দুটো বের করতে হবে৷ তারপর ওয়ারেন্ট নিয়ে যাব আমরা৷’’

‘‘কিন্তু, ডঃ চ্যাটার্জি তো বললেন, বিদেশের আদালত এই রুগিদের দোষী সাব্যস্ত করে না!’’ প্রোফেসর বড়ুয়া অস্ফুটে বিড়বিড় করলেন৷

বিপুলকেতন বুঝতে পারলেন, পুত্রহারা পিতা ভাবছেন তাঁর সন্তানের ঘাতক ছাড়া পেয়ে যাবে কি না৷

তিনি চেয়ার থেকে উঠে এগিয়ে গিয়ে অনুপ বড়ুয়ার কাঁধে হাত রেখে নরম কণ্ঠে বললেন, ‘‘এটা বিদেশ নয় প্রোফেসর বড়ুয়া৷ এটা ভারতবর্ষ৷ কিংশুকের যাতে কঠোর সাজা হয়, তেমনভাবেই চার্জশিট বানাব আমি৷ ওসব রোগের বাহানা দিয়ে কিস্যু হবে না৷’’

প্রোফেসর বড়ুয়া কিছুক্ষণ থম মেরে বসে রইলেন৷ তারপর অশ্রুসজল চোখে বললেন, ‘‘কিন্তু সত্যিই তো কিংশুক আমার ছেলেকে মারেনি বলুন! সে যে আমার ছেলেটাকে কতখানি ভালোবাসত, আমি, আমার স্ত্রী বসুন্ধরা … আমরা সবাই নিজের চোখে দিনের পর দিন দেখেছি৷ তুতুনকে তো মারল ওর ভেতরের সেই অন্য লোকটা৷ আর সত্যিই তো ওসিসায়েব, আমাদের দেশে এত বৈষম্য কেন? কেন গরিবের ছেলে হয়েও কিংশুক কোনো সুযোগ পাবে না, আর আমরা পাব? কবে কোন যুগে উঁচু জাতরা আমাদের অত্যাচার করেছে, শোষণ করেছে বলে আমরা এখন উল্টোটা করব কেন? সমতাটাই তো লক্ষ্য হওয়া উচিত সাহেব, একবার এই দল জোর খাটাবে, আরেকবার ওই দল, সেটা তো কাম্য নয়!’’

বিপুলকেতন এবার হতভম্ব হয়ে গেলেন, কী বলবেন কথা খুঁজে পেলেন না৷

অনুপ বড়ুয়া চোখের জল মুছে উঠে দাঁড়ালেন, ‘‘আপনি ওর বিরুদ্ধে চার্জশিট পেশ করুন ওসিসায়েব, আমিও ওর হয়ে উকিল দেব৷’’

এবার বিপুলকেতন শুধু নয়, সবাই চমকে তাকালেন প্রোফেসর বড়ুয়ার দিকে৷

কিন্তু অনুপ বড়ুয়া ধীর লয়ে বলে যেতে লাগলেন, ‘‘ওকে তো সারিয়ে তুলতে হবে৷ যে অপরাধী নয়, সে কেন আর পাঁচটা দাগি আসামির সঙ্গে জেল খাটবে? আমি আমাদের দেশের রিজার্ভেশনের বিরুদ্ধেও জনস্বার্থ মামলা করব৷ কেন কেউ শুধুমাত্র তার জাতের বিনিময়ে কোনো সুযোগ পাবে? আমি কোনো সংরক্ষণ চাই না, চাই শুধু সবার সমান অধিকার৷ সেটুকু পেলেই হবে৷’’

‘‘শুনুন প্রোফেসর…৷’’ বাধা দিয়ে কিছু বলতে গেলেন বিপুলকেতন৷

হাত দিয়ে ইশারায় ওসিসাহেবকে থামিয়ে দিয়ে একটা বড় নিঃশ্বাস নিলেন প্রোফেসর বড়ুয়া, ‘‘আর কোনো কিংশুককে যেন এমনভাবে হতাশায় ডুবে মৌন হতে হতে হিংস্র হয়ে যেতে না হয়! আর কোনো কিংশুকের হাতে পড়ে আমার ছেলেটার মতো দশা যেন কারও না হয় স্যার …!’’

সবাইকে বিস্ময়ে স্থবির করে রেখে তুতুনের বাবা দুর্গাপুর আর ই কলেজের নামকরা অধ্যাপক প্রোফেসর অনুপ বড়ুয়া চোখের জল মুছলেন৷

তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে হাঁটা দিলেন বাইরের দিকে৷

1 Comment
Collapse Comments

এমন ঘটনা ঘটে যায় নীরবে কারা পড়ে বুঝবে বা জানবে অসতের দল ভারি হচ্ছে ক্রমশ, তবুও লেখাটা ভাবায়।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *