০২. প্রিয়াংকা

০২. প্রিয়াংকা

এরকম সময়ে আমি ঠিক করলাম আমি বাসা থেকে পালিয়ে যাব। আগেই করা উচিত ছিল, কেন করি নাই সেটা ভেবেই আমার অবাক লাগল। আত্মহত্যা করার বিষয়টা অনেকবার চিন্তা করেছি কিন্তু বাসা থেকে পালানোর কথা একেবারেই চিন্তা করি নাই। আত্মহত্যা করার সাহস হয় নাই কিন্তু বাসা থেকে পালানোর বিষয়টা আমার কাছে খুব সহজ মনে হতে লাগলো। রান্নাঘরের স্টোররুমে তেলাপোকা আর ইঁদুরের মাঝখানে আমি যদি ঘুমাতে পারি তাহলে রাস্তাঘাটে-ফুটপাথে কিংবা রেল স্টেশনে ঘুমাতে অসুবিধা হবে কেন? আমি কল্পনা করতে শুরু করলাম সবাইকে ছেড়েছুড়ে বহুদূরে কোথাও চলে গেছি–কোন পাহাড়ের কাছে কিংবা সমুদ্রের তীরে। একা একা সেখানে ঘুরে বেড়াচ্ছি, কেউ আমাকে কিছু বলছে না, ঘেন্না করছে না, বকাবকি করছে না, মারধর করছে না। বহুদিন আগে যখন আমি টেলিভিশন দেখতে পারতাম তখন টেলিভিশনে একবার বেদেদের ওপরে একটা অনুষ্ঠান দেখেছিলাম, তারা সবাই মিলে নৌকায় নৌকায় ঘুরে বেড়াচ্ছে। নৌকায় তাদের ঘরবাড়ি, নৌকায় তাদের সংসার, নৌকায় তাদের সবকিছু। খুঁজে খুঁজে এরকম বেদে নৌকা খুঁজে বের করে তাদের সাথে চলে যাব। আমিও বেদে হয়ে যাব।

বাসা থেকে পালিয়ে যাবার শুধু একটা সমস্যা–সেটা খুব ভাবনাচিন্তা করে করা যায় না। কাজেই আমি ঠিক করলাম কোন একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে বাসা থেকে বের হয়ে যাব আর ফিরে আসব না। আমি মোটামুটি নিশ্চিত আমি বাসায় ফিরে আসি নাই বাসার কেউ সেটা অনেক দিন জানবে না। হয়তো দুলি খালা সেটা প্রথমে লক্ষ্য করবে, বাসায় বলার চেষ্টা করবে কিন্তু আম্মু শুনতে চাইবেন না। আম্মু যেহেতু শুনতে চাইবেন না তাই আপু আর ভাইয়াও কিছু করতে পারবে না, নিজেরা নিজেরা হয়তো এখানে সেখানে একটু খোঁজখবর নেবে তারপর হাল ছেড়ে দেবে। কয়দিন পরে আস্তে আস্তে সবাই ভুলে যাবে। আগে হলে এই পুরো ব্যাপারটা চিন্তা করে আমার ভয়ংকর একটা অভিমান হতো, আকজাল কিছুই হয় না। মানুষের ভেতর ভাল ভাল যেসব অনুভূতিগুলি থাকে আমার সেগুলি শুকিয়ে শেষ হয়ে গেছে। নিজের ভিতরে সেগুলি শেষ হয়ে গেছে বলে অন্যের ভেতরে সেগুলো থাকতে পারে সেটাও আমার আর বিশ্বাস হয় না। যাকেই দেখি তাকেই মনে হয় নিষ্ঠুর।

যেদিন বাসা থেকে পালাব ঠিক করলাম সেদিন একটু সকাল সকাল বের হয়েছি, সরাসরি রেল স্টেশনে গিয়ে কোন একটা ট্রেনের ছাদে গিয়ে বসব ঠিক করেছিলাম কিন্তু খানিক দূর গিয়ে মনে হলো শেষবারের মতো একবার স্কুল থেকে ঘুরে আসি। কেন সেটা মনে হলো কে জানে! একজন মানুষের জীবনে একটা ছোট ঘটনা সবকিছু ওলটপালট করে দেয় আমার সেদিনের স্কুলে যাবার ঘটনাটা ছিল সেরকম একটা ঘটনা, আমার জীবনের সবকিছু সেই ঘটনার জন্যে অন্যরকম হয়ে গেল।

ক্লাসরুমে জানালার কাছাকাছি একটা সিট আমার জন্যে নির্দিষ্ট করে রাখা আছে, সেখানে কেউ বসতে সাহস পায় না। আমাদের ক্লাসের ছেলেরা আর মেয়েরা একে অন্যের সাথে মিশে না, মেয়েরা সামনে কয়েকটা বেঞ্চে বসে, ছেলেরা বসে পিছনে। ছেলেরা পিছনে বসলেও শুধু যে আমার সিটে কেউ বসে না তা নয়, আমার পাশেও বসতে চায় না। কিন্তু সেদিন ক্লাসে গিয়ে দেখি আমার সিটে একজন বসে আছে। কোন একজন ডানপিটে ধরনের বা গাধা টাইপের ছেলে হলে কথা ছিল–যে বসে আছে সে একটা মেয়ে। নতুন এসেছে বলে কিছু জানে না। আমাদের ক্লাসের মেয়েগুলো অহংকারী ধরনের, কখনো হাসে না, সবসময় মুখ গম্ভীর করে থাকে। দেখলেই মনে হয় কেউ বুঝি তাদের আচ্ছা করে বকাবকি করেছে কিংবা ধরে জোর করে তেতো কোন ওষুধ খাইয়ে দিয়েছে, সেই জন্যে মুখগুলো এরকম ভোঁতা! তবে এই মেয়েটা তাদের মতো না, সম্পূর্ণ অন্যরকম। মেয়েটার চোখে-মুখে হাসি, চোখগুলো কেমন যেন চকচক করছে। পিছনের ডেস্কে হেলান দিয়ে বসে এমনভাবে পা দুলাচ্ছে যে দেখে মনে হবে তার বুঝি খুব আনন্দ হচ্ছে। মেয়েটার আহ্লাদি ভাব দেখেই আমার মেজাজ একটু গরম হয়ে গেলো। আমি কাছাকাছি গিয়ে বললাম, সরো।

মেয়েটা পা দোলানো বন্ধ করে বলল, কোথায় সরব?

আমি মেঘের মতো গলায় বললাম, মেয়েরা সামনে বসে। ছেলেদের সাথে বসে না।

মেয়েটার হাসি হাসি মুখ এবারে একটু গম্ভীর হলো। বলল, ছেলেদের সাথে বসলে কী হয়?

 

আমি এখন তার সাথে একটা আলোচনা শুরু করে দেব সেটা তো হতে পারে না, তাই মুখ খিচিয়ে একটা ধমক দিয়ে বললাম, খবরদার বলছি, ভাদর ভ্যাদর করবে না। তোমাকে সরতে বলেছি সরো।

ক্লাসের অন্য যে কোন মেয়ে হলে আমার এই ধমক খেয়ে ভ্যাঁ করে কেঁদে ফেলতো, কিন্তু এই মেয়ের কিছু হলো না। আমার দিকে এমনভাবে তাকালো। যেন আমি খুব একটা মজার কথা বলেছি। তার মুখে হাসি হাসি ভাবটা ফিরে এলো এবং আবার সে পা দোলাতে শুরু করল। আমি আবার হুংকার দিলাম, কী হলো কথা কানে যায় না?

আমার ধমক শুনে ক্লাসের অন্য সবাই ঘুরে তাকিয়েছে, সোজাসুজি তাকাতে সাহস পাচ্ছে না তাই চোখের কোণা দিয়ে আমাকে দেখার চেষ্টা করছে। আমার মেজাজ আরো খারাপ হয়ে গেলো, আমি আবার মুখ-চোখ খিচিয়ে হাত নেড়ে হুংকার দিয়ে বললাম, এটা আমার সিট, এখান থেকে সরো।

আমি যখন এভাবে মুখ-চোখ খিঁচিয়ে হুংকার দিয়ে কথা বলি তখন কেউ আমার দিকে তাকাতেই সাহস পায় না কিন্তু এই মেয়ে একেবারে সোজা আমার চোখের দিকে তাকিয়ে রইল, চোখে ভয়-ডর তো নেই-ই উল্টো মনে হলো। কৌতুক। যেন আমি হাসির একটা নাটক করছি আর সে সেই নাটকটা খুব উপভোগ করছে। আমি টেবিলে থাবা দিয়ে আরেকটা ধমক দিতে যাচ্ছিলাম তখন মেয়েটা বলল, ঠিক আছে, আমি তোমাকে তোমার সিটে বসতে দেব কিন্তু তার আগে তোমাকে একটা কাজ করতে হবে।

কী কাজ?

তুমি এরকম রাগ হয়ে কথা বলতে পারবে না। তোমাকে সুইট করে কথা বলতে হবে!

আমি একেবারে থতমত খেয়ে গেলাম। মেয়েটার নিশ্চয়ই পুরোপুরি মাথা খারাপ তা না হলে কেউ এভাবে কথা বলে? মেয়েটা মুখে হাসি ফুটিয়ে বলো, তুমি বলো, প্লি-ই-জ তুমি এখান থেকে সরে বসো, তাহলে আমি তোমাকে তোমার সিট ছেড়ে দেব।

মেয়েটার কথার মাঝে কী ছিল কে জানে, আমাদের চারপাশে যারা দাড়িয়ে ছিল তাদের অনেকেই হি হি করে হেসে উঠল। আমাকে নিয়ে কেউ হাসলে আমি একেবারে সহ্য করতে পারি না, আমার মাথায় একেবারে রক্ত চড়ে গেল। আমি তখন ডেস্কের ওপর রাখা মেয়েটার খাতা বই ব্যাগ টান দিয়ে ছুড়ে নিচে ফেলে দিয়ে বললাম, আমার সাথে ঢং করো? ঢং করো আমার সাথে?

মেয়েটা এবারে একটু অবাক হয়ে তাকালো, মাথা নেড়ে বলল, আমি আজকে প্রথম দিন তোমাদের স্কুলে এসেছি আর তুমি আমার সাথে এরকম ব্যবহার করলে? মেয়েটা নিজের ঠোঁট কামড়ে ধরে একটু অপেক্ষা করে বলল, আমি মনে খুব কষ্ট পেলাম।

মানুষ যে সুন্দর করে বা ভাল করে কথা বলতে পারে আমি সেটা ভুলেই গেছি। আমার সাথে কেউ ভাল ব্যবহার করে না, আমিও করলাম না। বললাম, মেয়ে বলে বেঁচে গেলে। ছেলে হলে এমন উঁচা দিতাম যে তখন খালি মনে শরীরের গিটটুতে গিটটুতেও কষ্ট পেতে!

মেয়েটা আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল আমি তাকে সেই সুযোগ না দিয়ে ক্লাসরুম থেকে বের হয়ে এলাম। বের হওয়ার সময় লক্ষ্য করলাম ক্লাসের বেশ কয়েকটা ছেলেমেয়ে মেয়েটার কাছে ছুটে গেলো, নিশ্চয়ই আমার সম্পর্কে খোঁজখবর দিয়ে সাবধান করে দেবে। ক্লাসে ফিরে আসার পর মেয়েটা যে আমার থেকে দূরে নিরাপদ একটা জায়গায় বসবে সে বিষয়েও আমার কোন সন্দেহ নেই। ক্লাস শুরু হতে এখনো দেরি আছে। আমি ততক্ষণ স্কুলের বাউন্ডারি ওয়ালে পা ঝুলিয়ে বসে চারপাশের সবকিছু দেখে সময় কাটাই। আমার কোন বন্ধু নাই, কোন আপনজন নাই–আমি সব সময় একা একা থাকি।

ঘণ্টা পড়ার পর ক্লাসে ফিরে এসে দেখলাম মেয়েটা আমার জায়গাটা ছেড়ে দিয়ে একটু সরে বসেছে। কিন্তু পুরোপুরি সরে গিয়ে নিরাপদ জায়গায় বসে নি। আমাকে দেখে খুব মনোযোগ দিয়ে আমাকে লক্ষ্য করল কিন্তু কিছু বলল না। আমি সরাসরি তার দিকে তাকালাম না, তাই বুঝতে পারলাম না তার চোখের দৃষ্টিতে ভয় বা ঘেন্না কোনটা আছে। ঘেন্না থাকাটাই স্বাভাবিক। আজকাল কেউ আমাকে দেখতে পারে না।

প্রথম পিরিয়ডে বাংলা। বাংলা স্যারের নাম তোফাজ্জল হোসেন সরকার ছেলেরা ডাকে তোফাজ্জল হোসেন রাজাকার সংক্ষেপে রাজাকার স্যার। এই নামের পিছনে একটা কারণ আছে, স্যারের ধারণা মুক্তিযুদ্ধের পুরো ব্যাপারটা ভুয়া, ইন্ডিয়া যুদ্ধ করে দেশটা দখল করে ফেলেছে। ক্লাসেও সেটা আকারে ইঙ্গিতে আমাদের বোঝানোর চেষ্টা করেন। বাংলা বইয়ে বীরশ্রেষ্ঠদের গল্প পড়ার সময় স্যার ফাক ফাক করে হাসেন যেন পুরো বিষয়টা একটা তামাশা। রবীন্দ্রনাথের কবিতাগুলো ক্লাসে পড়ান না, কেউ সেটা নিয়ে প্রশ্ন করারও সাহস পায় না। বাংলাদেশের সাথে যখন পাকিস্তানের ক্রিকেট খেলা হয় তখনও এই স্যার বাংলাদেশকে সাপোর্ট না করে পাকিস্তানকে সাপোর্ট করেন।

ঘণ্টা পড়ার কিছুক্ষণ পর তোফাজ্জল হোসেন সরকার খাতাপত্র নিয়ে ক্লাসে ঢুকলেন। চুকে সবসময় স্যার সারা ক্লাসে একবার চোখ বুলিয়ে নেন, আজকেও চোখ বুলালেন এবং আমার পাশে এই নতুন মেয়েটিকে বসে থাকতে দেখে কেমন যেন চমকে উঠলেন। খানিকক্ষণ ভুরু কুঁচকে তাকিয়ে থেকে বললেন, তু-তুমি এখানে কেন?

মেয়েটা বলল, আমি নতুন এসেছি স্যার।

মেয়েটা নতুন এসেছে, যেটুকু দেখেছি তাতে মনে হচ্ছে মাথায় একটু পাগলামোর ধাচ আছে তাই স্যারের প্রশ্নটা ঠিক বুঝতে পারল না। স্যার আসলে জানতে চাচ্ছিলেন সে মেয়ে হয়ে ছেলেদের সাথে কেন বসেছে। স্যার রাজাকার টাইপের মানুষ, কোন ছেলে আর মেয়েকে কথা বলতে দেখলেই খুব বিরক্ত হন–ক্লাসে পাশাপাশি বসতে দেখলে তার তো মেজাজ খারাপ হতেই পারে। স্যার বললেন, নতুন এসেছ তো বুঝতেই পারছি। তা পিছনে বসেছ কেন? সামনে আস।

ইঙ্গিতটা একেবারে স্পষ্ট, মেয়ে হয়ে ছেলেদের সাথে পিছনে বসেছ কেন, সামনে চলে এসো। মেয়েটা ইঙ্গিতটা হয় বুঝতে পারল না কিংবা না বোঝার ভান করল, ফিক করে একটু হেসে ফেলে বলল, না স্যার। পিছনেই ভাল। আমি সব সময় পিছনে বসি।

স্যার বললেন, পি-পিছনে বসে?

জি স্যার।

কেন?

পিছনে বসলে সবাইকে দেখা যায়। খুব ইন্টারেস্টিং মনে হয়।

আমাদের রাজাকার স্যার মনে হয় কিছুই বুঝতে পারলেন না, খানিকক্ষণ মুখ হাঁ করে মেয়েটার দিকে তাকিয়ে রইলেন, তারপর টোক গিলে বললেন, ইন্টারেস্টিং?

জি স্যার।

আস্তে আস্তে তার মুখটা মেঘের মতো কালো হলো, স্যার ফোঁস করে একটা নিঃশ্বাস ফেলে বললেন, তুমি স্কুলে কী পড়াশোনা করতে এসেছ না ইন্টারেস্টিং কাজ করতে এসেছ?

মেয়েটার চেহারায় একটা হাবা হাবা ভাব আছে কিন্তু মেয়েটা অসম্ভব চালু, স্যারের প্রশ্নের উত্তরে একটুও চিন্তা না করে সাথে সাথে বলল, ইন্টারেস্টিং উপায়ে পড়াশোনা করতে এসেছি স্যার।

মেয়েটার কথা শুনে ক্লাসের অনেকে খিকখিক করে হেসে ফেলল, স্যার তখন আরো রেগে গেলেন, ধমক দিয়ে বললেন, চোপ, সবাই চোপ।

সবাই চুপ করে যাবার পর স্যার তার রেজিস্টার খাতা খুলে গম্ভীর গলায় রোল নম্বর ডাকতে শুরু করলেন। নতুন মেয়েটার রোল নম্বর বাহান্ন, নাম প্রিয়াংকা।

রোল কল শেষ করে স্যার পড়াতে শুরু করলেন। ক্লাসের শুরুতেই তার মেজাজ খারাপ হয়ে গেছে তাই আজকে আমাদের কপালে দুঃখ আছে। স্যার বই দেখে একটা প্যারাগ্রাফ শেষ করেই জয়ন্তকে একটা প্রশ্ন জিজ্ঞেস করলেন। জয়ন্ত ক্লাসের সবচেয়ে ভাল ছাত্র, উত্তরটা ঠিকভাবে দিয়ে দিল, স্যার মনে হলো তখন আরেকটু রেগে গেলেন। আমরা ভাবলাম জয়ন্তকে আরো কঠিন একটা প্রশ্ন করবেন। জয়ন্তকে পড়াশোনার প্রশ্ন করে আটকানো খুব কঠিন, তবে রাজাকার স্যারের অসাধ্য কিছু নেই। যতক্ষণ পর্যন্ত জয়ন্ত একটা ভুল উত্তর না দিচ্ছে স্যার প্রশ্ন করে যেতেই থাকবেন এবং তখন তাকে আচ্ছা মতন পেটাবেন–স্যার প্রায় সব ক্লাসেই হিন্দু ছেলেদের পেটান। কিন্তু আজকে জয়ন্তের কপাল ভাল, স্যার জয়ন্তকে ছেড়ে দিলীপকে ধরলেন। দিলীপের পড়াশোনায় একেবারে মন নেই, ক্লাসে এসে উদাস মুখে বসে থাকে। সে কী বুদ্ধিমান না বোকা সেটা আমরা এখনও ঠিকভাবে ধরতে পারি নাই। স্যারেরা কিছু জিজ্ঞেস করলে প্রশ্ন শেষ হবার আগেই মাথা নেড়ে বলে, জানি না। স্যার।

আজকেও তাই হলো, সাথে সাথে রাজাকার স্যার এসে খপ করে দিলীপের চুলের মুঠি ধরে তাকে হিড়হিড় করে টেনে এনে পেটাতে শুরু করলেন। স্যারের মনে কোন দয়ামায়া নেই, একেবারে পশুর মতো পেটাতে পারেন আজকে মনে হয় রাগটা আরেকটু বেশি, ধরেই যেভাবে মারতে শুরু করলেন তার কোন তুলনা নেই।

ঠিক তখন একটা বিচিত্র ঘটনা ঘটল, যার জন্যে রাজাকার স্যার দূরে থাকুক আমরা কেউ প্রস্তুত ছিলাম না। আমার পাশে বসে থাকা মেয়েটা তড়াক করে লাফ দিয়ে ওঠে, না স্যার, না স্যার বলে চিৎকার করতে করতে ক্লাসের সামনে ছুটে গেল। স্যার কিছু বোঝার আগেই সে দিলীপকে ধরে স্যারের হাত থেকে ছুটিয়ে নেয়। দিলীপের সামনে দাঁড়িয়ে সে মাথা নেড়ে বলে, না স্যার, প্লিজ। আপনি মারবেন না।

স্যারের কয়েক সেকেন্ড লাগল বুঝতে কী হচ্ছে, যখন বুঝতে পারলেন তখন একেবারে হতভম্ব হয়ে গেলেন। দেখতে দেখতে স্যারের মুখ রাগে বিকৃত হয়ে গেলো, কিছুক্ষণ বিস্ফারিত চোখে প্রিয়াংকার দিকে তাকিয়ে রইলেন তারপর চিৎকার করে বললেন, সরে যাও আমার সামনে থেকে বেয়াদব মেয়ে।

এতো বড় ধমক খেয়েও মেয়েটার এতটুকু ভাবান্তর হলো না, বরং মনে হলো তার মুখে একটা হাসি ফুটে উঠল। মুখটা হাসি হাসি রেখেই অনুনয়ের গলায় বলল, না স্যার। প্লিজ। আমি স্যার এই ক্লাসে নতুন এসেছি–ক্লাসের সবাই আমার বন্ধু। একজন বন্ধুর সামনে আরেকজন বন্ধুকে মারলে তার খুব লজ্জা হয় স্যার। প্লিজ স্যার–লজ্জা দেবেন না স্যার।

লজ্জা? লজ্জা হয়? স্যার দাঁত কিড়মিড় করে বললেন, আমার সাথে তুই মশকরা করিস? এইখানে কারো ভিতরে কোন লজ্জা-শরম আছে? যতো সব বেহায়া-বেয়াদব বেজন্মার দল-

রাজাকার স্যারের এতো বড় হুংকারের মাঝেও মেয়েটা ঘাবড়ালো না। ঠাণ্ডা গলায় বলল, না স্যার, লজ্জা আছে। আমাদের সবার ভেতরে লজ্জা আছে। আমাদের মারলে ব্যথাটা সহ্য করতে পারি, কিন্তু স্যার লজ্জাটা সহ্য করতে পারি না।

আমি এইবারে নড়েচড়ে মেয়েটার দিকে তাকালাম। সত্যিই তো, আমার আম্মু যখন আমাকে নির্দয়ভাবে মারেন একটু পরেই আর ব্যথার অনুভূতিটা থাকে না। তখন শুধু থাকে লজ্জা আর অপমান। এই মেয়েটা তো সত্যি কথাই বলছে। আমরা ছোট হতে পারি তাই বলে আমাদের মান-অপমান নেই, লজ্জা নেই–সেটা তো সত্যি নয়। এই প্রথমবার পাগলাটে ধরনের নতুন মেয়েটাকে আমি একটু গুরুত্ব দিয়ে লক্ষ্য করলাম। হালকা-পাতলা শ্যামলা একটা মেয়ে। ছোট ছোট করে চুল কেটেছে, অনেকটা প্রায় ছেলেদের মতো, চোখে-মুখে এক ধরনের তীব্র অনুভূতির ছাপ, দেখে মনে হচ্ছে দিলীপকে রাজাকার স্যারের হাত থেকে রক্ষা করাটাই বুঝি তার জীবনের সবকিছু। যাকে রক্ষা করার জন্যে মেয়েটা এতো বড় একটা বিপদের ঝুঁকি নিয়েছে সেই দিলীপকে কিন্তু মোটেও বিচলিত দেখা গেলো না। সে মোটামুটি উদাস উদাস মুখে পুরো ব্যাপারটা নির্লিপ্তভাবে দেখছে, দেখে মনে হচ্ছে এখানে কী হচ্ছে তাতে তার কিছু আসে যায় না।

রাজাকার স্যার কেমন যেন বিস্ফারিত চোখে মেয়েটার দিকে তাকিয়ে রইলেন। কেউ যদি স্যারকে না চিনে তাহলে তার কাছে স্যারের চেহারাটা মনে হয় ভালই মনে হবে কিন্তু আমরা তাকে একেবারে দুই চোখে দেখতে পারি না। বলে কখনোই তার চেহারাটাকে ভাল মনে হয় নি। এখন রেগে যাবার পর তার চেহারাটাকে আরো খারাপ মনে হতে থাকে তাকে ঠিক মানুষ নয় একটা খ্যাপা কুকুরের মতো দেখাতে থাকে। স্যারের সব রাগ মনে হয় এইবার মেয়েটার ওপরে এসে পড়ল। তার চোখ-মুখ লাল হয়ে গেল, নাকের গর্তগুলো বড় হয়ে গেল, মুখ থেকে দাঁতগুলো বের হয়ে এলো আর তাকে দেখাতে লাগলো ভয়ংকর। স্যারের এই চেহারাটা দেখেও মেয়েটা ভয় পেলো না, বেশ ঠাণ্ডা। মাথায় বলল, প্লিজ স্যার আপনি মারবেন না। একজনকে মারলে কোন লাভ হয় না স্যার।

আমি স্যারের দিকে তাকিয়ে ছিলাম, স্যার রাগে অন্ধ হয়ে গেছেন, দিলীপকে নয় এখন এই খ্যাপা মেয়েটাকে মেরে বসবেন। আমি দেখতে পাচ্ছি তার হাত উপরে উঠে আসছে, আমি জানি এখন খপ করে মেয়েটার চুল ধরে একটা হ্যাচকা টান দিয়ে নিজের কাছে নিয়ে আসবেন, তারপর মুখের মাঝে মারবেন। মেয়েটা কিছু লক্ষ্য করল বলে মনে হলো না, সে আগের মতোই ঠাণ্ডা গলায় বলতে লাগল, স্যার আপনি আমার কথা বিশ্বাস না করলে অন্যদের জিজ্ঞেস করেন। জিজ্ঞেস করেন স্যার।

রাজাকার স্যার জিজ্ঞেস করার কোন উৎসাহ দেখালেন না, মেয়েটার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে গেলেন তখন আমি দাড়িয়ে চিৎকার করে বললাম, স্যার।

স্যার মাথা ঘুরে তাকালেন। চোখ লাল করে বললেন, কী?

আমি ঠিক করেছি পালিয়ে যাব, এই স্কুলে আর আমাকে আসতে হবে না! আমি ইচ্ছে করলে যা খুশি করতে পারি, কেউ আমাকে কিছু বলতে পারবে না, কেউ কিছু করতেও পারবে না। এটাই আমার সবচেয়ে বড় সুযোগ। এই সুযোগটা হাত ছাড়া করা ঠিক হবে না। আমি হাত ছাড়া করলাম না; মুখ গম্ভীর করে বললাম, কাউকে মারবেন না।

প্রিয়াংকা নামের এই মেয়েটি কী সুন্দর গুছিয়ে কথা বলতে পারে, রাজাকার স্যারের ভয়ংকর চোখ রাঙানির সামনেই সে ঠাণ্ডা মাথায় কথা বলে যাচ্ছে। আমার অবস্থা ঠিক তার উল্টো। আমি গত কয়েক বৎসর বলতে গেলে কারো সাথে কথা বলি নাই, কীভাবে কথা বলতে হয় আমি সেটা ভুলেই গেছি। তাই আমি যখন বললাম, কাউকে মারবেন না। সেটা শুনালো এরকম : খবরদার! কাউকে মারবেন না। মারলে একেবারে খুন করে ফেলব।

আমার কথা শুনে রাজাকার স্যার একেবারে থতমত খেয়ে গেলেন। কিছুক্ষণ আমার দিকে হাঁ করে তাকিয়ে রইলেন, তারপর কয়েকবার চেষ্টা করে

বললেন, কী বললি?

আমি বললাম, বলেছি যে কাউকে মারবেন না।

আমার গলার স্বরটা এবারে আগের থেকেও ভয়ানক শোনালো। কথা বলে অভ্যাস নেই বলে যেটাই বলি সেটাই ভয়ানক শোনায়, এবারের কথাটা শোনালো এরকম : একটা কথা কয়বার বলতে হয়? শেষবারের মতো বলছি। শুনে রাখেন, খবরদার আমাদের ক্লাসের কোন ছেলের গায়ে হাত তুলবেন না। যদি তুলেন তাহলে খবর আছে। খুন করে রাস্তায় লাশ ফেলে দেব! আমাকে চেনেন না? জন্মের মতো সিধে করে দেব।

আমার কথায় ম্যাজিকের মতো কাজ হলো। রাজাকার স্যার কেমন যেন মাছের মতো খাবি খেতে লাগলেন। সারা ক্লাশে একটা গুঞ্জন শুরু হলো–ক্লাসের ছেলে-মেয়েদের যখন খুশি মারপিট করার বিরুদ্ধে প্রতিবাদের গুঞ্জন। রাজাকার স্যার দুর্বল গলায় বললেন, চুপ।

কিন্তু কেউ চুপ করল না বরং গুঞ্জনটা আরো বেড়ে গেল। আমি চারিদিকে তাকিয়ে বললাম, চুপ। সাথে সাথে পুরো ক্লাস চুপ করে গেলো।

রাজাকার স্যার বিস্ফারিত চোখে আমার দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন, মারলে কী করবি?

আমি বললাম, মেরে দেখেন কী করি।

আমার কথা শুনে সারা ক্লাসে একটা আতংকের শিহরণ বয়ে গেল, আমি স্পষ্ট দেখলাম ভয়ে ছেলে-মেয়েদের গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠেছে। ছেলে-মেয়েদের থেকে বেশি ভয় পেলেন রাজাকার স্যার, মাছের মতো খাবি খেতে লাগলেন। স্যার কী করবেন বুঝতে পারছিলেন না, আমি তাই মেঘের মতো গলার স্বরে বললাম, দিলীপ, তুই তোর জায়গায় গিয়ে বস। প্রিয়াংকা তুমিও চলে আস।

আমার কথা শুনে দিলীপ সুড়ুৎ করে নিজের জায়গায় এসে বসে পড়ল। প্রিয়াংকাও কী করবে বুঝতে না পেরে নিজের জায়গায় ফিরে এলো। রাজাকার স্যার আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন, আমিও সোজা তার চোখের দিকে তাকিয়ে রইলাম। চোখ থেকে আগুন বের হওয়া বলে একটা কথা আছে, আমি সেটাই চেষ্টা করলাম। গত কয়েক বছর আমি মোটামুটি একটা পশুর মতো সময় কাটিয়েছি। আমার আচার-ব্যবহার, কথাবার্তা সবকিছু পশুর মতো হয়ে গিয়েছে, চোখের দৃষ্টিটাও মনে হয় সেইরকম হিংস্র হয়ে গেছে, রাজাকার স্যার সেই চোখের দিকে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকতে পারলেন না, চোখ সরিয়ে নিলেন।

স্যার কিছুক্ষণ ক্লাসের মাঝখানে দাঁড়িয়ে রইলেন তারপর বইটা হাতে নিয়ে কাঁপা গলায় বললেন, একত্রিশ পৃষ্ঠায় দুই নম্বর প্রশ্নের উত্তর লেখ। কথা বলবি না।

কেউ কোন কথা বলল না, খাতা খুলে প্রশ্নের উত্তর লিখতে শুরু করল।

প্রিয়াংকা তার খাতা খুলতে খুলতে নিচু গলায় বলল, তপু।

আমি প্রিয়াংকার দিকে তাকালাম, বললাম, কী হলো?

থ্যাংক ইউ তপু। তারপর সে হাত বাড়িয়ে আমার হাতটা একবার স্পর্শ করল।

আমি কিছু না বলে সামনের দিকে তাকালাম। আহা! কতোদিন পরে একজন আমার সাথে ভাল করে, সুন্দর করে কথা বলল। কেউ যখন এরকম ভালাবাসা নিয়ে কথা বলে তখন কী ভালই না লাগে। হঠাৎ করে আমার চোখে পানি এসে গেল।

আমি ভেবেছিলাম আমার চোখের সব পানি শুকিয়ে গেছে, আসলে শুকায় নি। বুকের ভিতরে গভীরে কোন একটা জায়গায় এখনো মনে হয় অনেক চোখের পানি জমে আছে।

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *