০৯. পরিশিষ্ট

০৯. পরিশিষ্ট

লু মহাকাশে ভেসে যাচ্ছিল, বোঝার কোনো উপায় নেই কিন্তু সে জানে যে সে প্রচণ্ড বেগে ছুটে যাচ্ছে। যারা কখনো মহাকাশে ভেসে থাকে নি, তারা কখনোই এই অনুভূতিটি ঠিক বুঝতে পারবে না। লুকে নানা সময়ে নানা পরিবেশে মহাকাশে ভেসে বেড়াতে হয়েছে, তবুও সে এই অবস্থায় কখনো সহজ অনুভব করে না। প্রাণপণ চেষ্টা করে নিজেকে সামলে নিয়ে সে তার ছোট জেটটি চালু করে, কয়েক মুহূর্তের মাঝেই সে নিজের গতিকে নিয়ন্ত্রণ করে নেয়। প্রচণ্ড বিস্ফোরণে তাদের যোগাযোগের ব্যবস্থা নষ্ট হয়ে গেছে কি না জানা নেই, পরীক্ষা করার জন্যে সে সুইচটি টিপে দেয়, সাথে সাথে ইউরীর আর্তচিৎকার শুনতে পায়, বাঁচাও আমাকে বাচাও, আমি পড়ে যাচ্ছি—

লু বলল, ইউরী, তুমি পড়ে যাবে না, মহাকাশে কেউ পড়ে যায় না। তোমার কোনো ভয় নেই, আমি আসছি তোমার কাছে। নিউট্রিনো জেনারেটরটি আছে তো?

আছে। আমি শক্ত করে ধরে রেখেছি।

শক্ত করে ধরে রাখার কোনো প্রয়োজন নেই, ওটা পড়বে না, তুমি ছেড়ে দিলেও ওটা তোমার পাশাপাশি থাকবে।

থাকুক, আমি তবু ছাড়ছি না।

তোমার ইচ্ছা। তুমি তোমার বাম হাতের কাছে যে নীল সুইচটা আছে সেটা চেপে ধর, তাহলে তোমার বীপারটা কাজ করতে শুরু করবে, আমি বুঝতে পারব তুমি কোথায় আছ।

করছি।

একমুহূর্ত পরেই সে ইউরীকে দেখতে পায়, বহু দূরে একটা আলো জ্বলতে এবং নিভতে শুরু করেছে। লু নিজের জেটটি চালু করে সেদিকে যেতে যেতে চারদিকে তাকায়, দূরে সিসিয়ান একটা ভূতুরে মহাকাশযানের মতো ভাসছে, নিচে বীভৎস। ট্রাইটন, কে জানে হয়তো এই মুহূর্তে তার দিকে তাকিয়ে আছে। লু চারদিকে তাকাতে তাকাতে নীষা আর রু-টেকের সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করে, কিছুক্ষণের মাঝেই তাদের সাড়া পাওয়া যায়, রু-টেক কিম জিবানের ক্যাপসুলটি খুঁজে পেয়েছে, সেটিকে সে উদ্ধার করে নিয়ে এসেছে, এখন নীষাকে নিয়ে সে সুশানের ক্যাপসুলটি খুঁজে বের করার চেষ্টা করছে। লু ওদের এক জায়গায় একত্র হতে বলল, সে নিজে ইউরীকে নিয়ে কিছুক্ষণের মাঝেই ওদের কাছে হাজির হবে।

ইউরী লুকে দেখে যেন দেহে প্রাণ ফিরে পায়। দু’হাতে শক্ত করে নিউট্রিনো জেনারেটরটি ধরে রেখেছে, সেভাবেই বলল, কী আশ্চর্য অবস্থা! স্রেফ ঝুলে আছি! শুধু মনে হয় পড়ে যাব।

না, পড়বে না। ট্রাইটনের কী অবস্থা?

জানি না, এখন যোগাযোগ করব। মুশকিল হচ্ছে কিছুতেই সোজা থাকতে পারি। না, শুধু ঘুরে ঘুরে উল্টে যাই।

আমি তোমাকে ধরে রাখছি, তুমি যোগাযোগ কর। আমাদের সময় খুব বেশি নেই।

কতক্ষণ আছে?

খুব বেশি হলে দশ পনেরো মিনিট হবে, এর থেকে কমও হতে পারে।

সর্বনাশ! সময় তো দেখি একেবারেই নেই। ইউরী তাড়াতাড়ি নিউট্রিনো জেনারেটরটি ট্রাইটনের দিকে মুখ করে ধরে সুইচ টিপে সেটিকে চালু করে বলল, ট্রাইটনের কৌতূহল বজায় রাখার জন্যে তাকে খুব-একটা গুরুত্বপূর্ণ জিনিস বলা উচিত।

কি বলবে?

বলব তাকে উড়িয়ে দিচ্ছি। ইউরী শব্দ করে হেসে কিবোর্ডে টাইপ মাথা ঝুকিয়ে কী-একটা লিখতে থাকে। লু মাথা এগিয়ে নিয়ে দেখে সেখানে লেখা, একটা খুব জরুরি জিনিস বলছি, আমার কথা শুনতে পেলে উত্তর দাও। তোমার পৃষ্ঠের বড় গোলকটি ছোট করে ফেল।

নিজের জেটটি চালু করে ইউরীকে ঠেলে নিয়ে যেতে যেতে ট্রাইটনের দিকে তাকিয়ে থাকে। সেখানে কোনো পরিবর্তন হল না। ইউরী আবার লিখল, অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জিনিস তোমাকে বল, সাড়া দাও।

কোনো সাড়া নেই।

সাড়া দাও, আমাদের নিরাপত্তার জন্যে তোমাকে ধ্বংস করে ফেলব বলে ঠিক করেছি, সাড়া দাও।

তবু কোনো সাড়া নেই।

মানুষ অনেক উন্নত প্রাণী, তাদের দিয়ে জোর করে কোনো কাজ করিয়ে নেয়া যায় না, তুমিও পারবে না। তুমি কি আমার কথা বুঝতে পারছ? পারলে সাড়া দাও। তোমার নিজের ভালোর জন্যে বলছি, তোমার পৃষ্ঠের বড় বৃত্তটি ছোট করে ফেলা।

তবু কোনো সাড়া নেই, ইউরী ভয়ার্ত মুখে লুয়ের দিকে তাকিয়ে বলল, ট্রাইটন যদি এখন এই নিউট্রিনো রশ্মিকে উপেক্ষা করা শুরু করে থাকে?

উপায় নেই, চেষ্টা করতে থাক।

ইউরী আবার লিখল, আর পাঁচ মিনিটের মাঝে সাড়া দাও, না হয় তুমি ধ্বংস হয়ে যাবে। তুমি জানতে চাও আমরা কী ভাবে তোমাকে ধ্বংস করব? যদি জানতে চাও তাহলে তোমার বড় গোলকটি আস্তে আস্তে ছোট করে ফেল।

লু অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে দেখে ট্রাইটনের পৃষ্ঠে একটা বড় বৃত্ত আস্তে আস্তে ছোট হয়ে গেল। ইউরী স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বুয়ের দিকে তাকিয়ে একটু হাসে। লু এগিয়ে গিয়ে ইউরীর হাত থেকে কিবোর্ডটি নিয়ে লিখল, তোমাকে আমরা ধ্বংস করতে চাই না, মানুষ কখনো কাউকে ধ্বংস করতে চায় না। যদি তুমি আমাদের ফিরে যেতে দাও আমরা তোমাকে ধ্বংস করব না। আমার এ প্রস্তাবে রাজি হলে বড় বৃত্তটি বড় করে দাও।

বৃত্তটি আরো ছোট হয়ে গেল, ট্রাইটন এ প্রস্তাবে রাজি নয়। ইউরী তখন এগিয়ে যায়, আস্তে আস্তে লেখে, তা হালে শোন, আমরা তোমাকে কেমন করে ধ্বংস করব।

লু তাকিয়ে দেখে ওরা নীষা আর রুটকের কাছে পৌঁছে গেছে, জেট টি ঘুরিয়ে সে নিজের গতি কমিয়ে থেমে গেল। নীষা আর রু-টেক এগিয়ে আসে, তাদের কাছাকাছি স্টেনলেস স্টিলের দু’টি ক্যাপসুল, ওগুলির ভিতরে কিম জিবান আর সুশানের অচেতন দেহ। নীষা জিজ্ঞেস করল, সবকিছু ঠিক আছে?

হ্যাঁ।

উড়িয়ে দেয়া হচ্ছে ট্রাইটনকে?

দেখা যাক। লু নিজের ঘড়ির দিকে তাকায়, আর মাত্র কয়েক সেকেন্ড, তারপর পালসারটিতে বিস্ফোরণ হবে। সত্যিই কি ট্রাইটন ধ্বংস হয়ে যাবে তখন?

ইউরী লিখতে থাকে, যে-রশ্মিটি দিয়ে তোমার সাথে আমরা যোগাযোগ করেছি, তাকে আমরা বলি নিউট্রিনো। অসংখ্য নিউট্রিনো আছে এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে, তাদের অপরিমেয় শক্তি, কিন্তু আমরা তার কথা জানি না, কারণ নিউট্রিনো কোনো কিছুর সাথে সহজে বিক্রিয়া করে না। কোনোভাবে যদি বিক্রিয়া করানো যেত, তা হলে সেই শক্তি দেখা যেত।

ইউরী ট্রাইটনের দিকে তাকায়, গ্রহটি স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, সত্যিই কি পারবে এটিকে ধ্বংস করে দিতে?

একটা লম্বা নিঃশ্বাস ফেলে ইউরী আবার লিখতে শুরু করে, তুমি আমাদের নিউট্রিনো রশ্মি থেকে আমাদের পাঠানো খবরাখবর পেতে শুরু করেছ, কাজেই তুমি ব্যবস্থা করেছ নিউট্রিনোর সাথে বিক্রিয়া করার, কত অসংখ্য নিউট্রিনো এখন তোমার দেহে বিক্রিয়া করছে, কত সহজে ভুমি উত্তপ্ত হয়ে উঠছ তাদের শক্তি দিয়ে।

এই নিউট্রিনো দিয়েই আমরা তোমাকে শেষ করে দেব, অচিন্তনীয় নিউট্রিনো পাঠাব তোমার ভিতর দিয়ে, ছারখার করে দেবে তারা তোমাকে।

হঠাৎ একটা আশ্চর্য ব্যাপার হল, পুরো ট্রাইউন যেন কেঁপে উঠল একবার। মুহূর্তে গ্রহটি রক্তবর্ণ হয়ে যায়, টকটকে লাল রং দেখে মনে হয় গনগনে গরমে যেন ফেটে চৌচির হয়ে যাবে এক্ষুনি। কিন্তু কিছু হল না, টকটকে লাল হয়ে রইল কিছুক্ষণ, তারপর হঠাৎ প্রচণ্ড বিস্ফোরণ হল, সমস্ত গ্রহটি যেন ফেটে গেল বেলুনের মতো। বিস্ফোরণের প্রচণ্ড শব্দ ওদের কাছে পৌছাল না বায়ুশূন্য মহাকাশে, কিন্তু ওরা বিস্ফারিত চোখে দেখে, ট্রাইটন ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে চিরদিনের মতো।

সাথে সাথে একটা আশ্চর্য অনুভূতি হল সবার, সারাক্ষণ বুকের ভিতর যে চাপা ভয় আর আতঙ্ক জমা হয়ে ছিল, সেটা যেন চলে গেল। তার বদলে একটা ফুরফুরে হালকা আনন্দ এসে র করে ওদের ভিতর। মনে হতে থাকে আর কোনো ভয় নেই, ভাবনা নেই, এখন শুধু নিরুদ্বেগ নিরবচ্ছিন্ন শান্তি। লু একবার প্রাণহীন গ্রহটিকে দেখে, তারপর ইউরীর দিকে তাকায়। এই আধপাগল একজন বিজ্ঞানী হাজার মাইল দূরে বসে একটি খেলনা দিয়ে শুধুমাত্র আঙুল নেড়ে ট্রাইটনের মতো একটি গ্রহকে উড়িয়ে দিয়েছে? নিজের চোখে দেখেও বিশ্বাস হতে চায় না, লু অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে ইউরীর দিকে তাকিয়ে থাকে, এও কি সম্ভব!

ইউরী আস্তে আস্তে লুয়ের দিকে তাকায়, কেমন জানি উদভ্রান্তের মতো দেখাচ্ছে তাকে, কেমন জানি বিপন্ন। লু ইউরীর কাঁধে হাত রেখে ডাকল, ইউরী—

কি?

তুমি শুধু আমাদের প্রাণ বাঁচাও নি, সম্ভবত পৃথিবীকেও বাঁচিয়েছ।

ইউরী বিপন্ন মুখে বলল, কিন্তু—

কিন্তু কি?

কেমন জানি খুনী খুনী লাগছে নিজেকে, এত বড় একটা গ্রহকে শেষ করে দিলাম?

আমাদের উপায় ছিল না ইউরী।

হয়তো উপায় ছিল না, কিন্তু তবুও এত বড় একটা ক্ষমতাশালী প্রাণী, তার আর কোনো চিহ্ন থাকবে না?

নীষা আস্তে আস্তে বলল, ওসব নিয়ে মাথা ঘামিয়ে লাভ নেই ইউরী। নিজেকে বাঁচিয়ে রাখতে হয়, সেটা হচ্ছে সৃষ্টির ধর্ম। ট্রাইটন চেষ্টা করেছে তার বংশধরকে বাঁচাতে, আমরা চেষ্টা করেছি আমাদের বাঁচাতে–

ইউরী হঠাৎ ঘুরে তাকায়, ফিসফিস করে বলে, বংশধর।

কী হয়েছে বংশধরের?

বংশধরকে বাচিয়ে রাখতে হবে, তাহলে ট্রাইটন ধ্বংস হয়ে যাবে না। লু একই ইতস্তত করে বলল, কিন্তু এটা তো আমাদের হাতে নেই ইউরী, কিছুক্ষণের মাঝে সিসিয়ান ধ্বংস হয়ে যাবে সবকিছু নিয়ে, ট্রাইটনের বংশধর সিসিয়ানের সাথে শেষ হয়ে যাবে।

কোনো ভাবে তুমি সিসিয়ানকে বাঁচাতে পার না?

না। আমি অত্যন্ত আদিম উপায়ে সিসিয়ানকে ধ্বংস করার ব্যবস্থা করেছি, সেটা থেকে রক্ষা করার কোনো উপায় নেই।

নীষা জিজ্ঞেস করল, কী ভাবে করছ তুমি?

মায়োক্সিন গ্যাসের বোতলটি খুলে এসেছি।

ও, নীষা গম্ভীর হয়ে মাথা নাড়ে।

ইউরী জিজ্ঞেস করল, কি হয় মায়োক্সিন দিয়ে?

মায়োক্সিন যখন অক্সিজেনের সাথে একটা বিশেষ অনুপাতে মিশে, তখন প্রচণ্ড বিস্ফোরণ হয়। আমি যে-সিলিন্ডারটি খুলে এসেছি, সেটা থেকে যেটুকু গ্যাস বের হচ্ছে তাতে সিসিয়ানের অক্সিজেন মিশে বিস্ফোরণের অনুপাতে পৌঁছতে তিন ঘন্টা সময় লাগার কথা। আর মিনিট দশেকের মাঝে প্রচণ্ড বিস্ফোরণ হবে, কিছুতেই সেটা আটকানো সম্ভব না।

ইউরী আস্তে আস্তে বিষণ্ণভাবে মাথা মাড়ে, বাঁচানো গেল না তাহলে!

রু-টক আস্তে আস্তে বলল, তোমরা রাজি থাকলে আমি একবার চেষ্টা করে দেখতে পারি।

কী করবে তুমি?

সিসিয়ানের বড় বড় কয়টা ভেন্ট দিয়ে পুরো বাতাসটুকু বের করে দিতে পারি, এখনো বিস্ফোরক পর্যায়ে পৌঁছায়নি, এই মুহূর্তে যদি চেষ্টা করি একটা সুযোগ আছে।

লু মাথা নাড়ে, না রু-টেক। ভয়ানক বিপদের ঝুঁকি নিতে চাইছ তুমি, এখন যেকোনো মুহূর্তে সিসিয়ান উড়ে যেতে পারে। আমি তোমাকে প্রাণের ঝুঁকি নিতে দিতে পারি না।

তুমি ভুলে যাচ্ছ আমি রবোট।

কিন্তু তোমাকে মানুষের সমান মর্যাদা দেয়া হয়েছে। .

আমি সে-কথা বলছি না, রু- টেক বাধা দিয়ে বলল, আমি রবোট, আম যদি কোনোভাবে বাচিয়ে রাখা যায়, আমি বেঁচে থাকি।

কিন্তু এখন সিডিসি নেই, যেখানে তুমি তোমার স্মৃতিকে সরিয়ে ফেলতে পার।

কিন্তু আমি আমার মেমোরি মডিউলটি খুলে তোমাদের হাতে দিতে পারি। তোমরা সেটা যদি যত্ন করে রেখে দাও, তা হলেই আমি বেঁচে থাকব। সুবিধেমতো মেমোরি মডিউলটি অন্য একটা সপ্তম মাত্রার রবোটের শরীরে লাগিয়ে দিলেই আমি বেঁচে উঠব।

কিন্তু মেমোরি ছাড়া কাজ করবে কেমন করে?

প্রসেসরটা থাকলেই কাজ করা যায়, জরুরি কাজের জন্যে কিছু মেমোরি সব সময়েই থাকে। তবে আমি কিছুই জানব না, তোমাদের আমাকে বলে দিতে হবে সবকিছু কি করব, কেন করব এইসব।

ইউরী কৌতূহল নিয়ে ওদের কথাবার্তা শুনছিল, সুযোগ পেয়ে লুকে জিজ্ঞেস করল, সত্যিই এটা সম্ভব?

একটা ছোট সম্ভাবনা রয়েছে, তবে কাজটি ভয়ানক বিপজ্জনক। লু মাথা নেড়ে বলল, কিন্তু ট্রাইটনের বংশধরকে বাচিয়ে রাখার সমস্যা অন্য জায়গায়। যদি সিসিয়ানকে সত্যি রু–টেক রক্ষা করতে পারে, কেন্দ্রীয় বিজ্ঞান গবেষণা কেন্দ্র এসে নিসিয়ানের দায়িত্ব নিয়ে নেবে। তারা তখন ট্রাইটনের বংশধরকে কেটেকুটে দেখবে, তাকে বাচতে দেওয়ার সম্ভাবনা খুব কম।

আমি তা হলে সিসিয়ানের মূল ইনজিনটা চালু করে পুরো সিসিয়ানকে ট্রাইটনের

উপরে নামাতে পারি। বংশধর তখন সিসিয়ান থেকে ট্রাইটনে নেমে যাবে।

সিসিয়ানে এখন কোনো কম্পিউটার নেই, তুমি সেটা ঠিক করে চালাতে পারবে না।

ঠিক করে চালানোর প্রয়োজনও নেই, সিসিয়ানকে যদি কোনোভাবে ট্রাইটনের কাছাকাছি নিতে পারি, তা হলেই হবে। সিসিয়ান মোটামুটিভাবে বিধ্বস্ত হয়ে গেলেও ক্ষতি নেই, আমার ধারণা, ট্রাইটনের বংশধর তবু বেঁচে থাকবে। মনে আছে, বারো মেগাওয়াটের পার্টিকেল বীম দিয়েও তার কোনো ক্ষতি হয় নি?

লু চিন্তিতভাবে মাথা নাড়ে।

রু-টেক বলল, যদি এটা করতে চাও, তা হলে তোমাকে এখনি সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আমাদের হাতে সময় মোটেও নেই, আর তুমি হচ্ছ দলপতি, তুমি অনুমতি না দিলে আমি যেতে পারব না।

ঠিক আছে, অনুমতি দিচ্ছি।

রু-টেক সাথে সাথে কাজে লেগে যায়, মাথার পিছনে কোথায় হাত দিয়ে সে কীএকটা খুলে ফেলে। সেখানে হাত ঢুকিয়ে মেমোরি মডিউলটি খুলে ফেলার আগে বলল, মনে রেখো, আমার কোনো স্মৃতি থাকবে না, তোমাদের বলে দিতে হবে আমি কী করব।

বেশ।

রু-টক একটা হ্যাচকা টানে মেমোরি মডিউলটি টেনে বের করে আনে, সাথে সাথেই তার পুরো স্মৃতি মুছে যায়। মেমোরি মডিউলটা নিয়ে কী করতে হবে সেটাও রু-টেকের আর মনে থাকে না, সেটা হাতে নিয়ে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে সে। নীষা এগিয়ে গিয়ে বলল, এটা আমাকে দাও।

কেন?

লু তখন এগিয়ে শান্ত গলায় বলল, তোমার নাম রু–টেক, তুমি ভয়ানক একটি বিপজ্জনক মিশনে যাচ্ছ, তাই তোমার স্মৃতি আমরা সরিয়ে রাখতে চাই, মেমোরি মডিউলটি আমার হাতে দাও।

রু-টেক বাধ্য ছেলের মতো হাতের মেমোরি মডিউলটি সুয়ের হাতে দিয়ে দেয়।

ধন্যবাদ। তুমি এখন ঐ মহাকাশযানে গিয়ে, বড় বড় ভেস্টগুলি খুলে দেবে, যেন সিসিয়ানের সমস্ত বাতাস বের হয়ে যায়।

কেল?

তুমি জানতে চাইলে তোমাকে বলতে পারি, কিন্তু তোমার জানার প্রয়োজন নেই, কারণ আমাদের হাতে সময় খুব কম।

বেশ।

ভেন্টগুলি খুলে সমস্ত বাতাস বের করে দেয়ার পর তুমি সিসিয়ানের ইঞ্জিনগুলি চালু করে, সেটিকে এমনভাবে প্রস্তুত করবে, যেন সিসিয়ান এই গ্রহটিতে গিয়ে নামতে পারে।

কেন?

সময়ের অভাবে তোমাকে বলতে পারছি না, কিন্তু জেনে রাখ, এটা তোমার জানার প্রয়োজন নেই।

বেশ।

কাজ শেষ হবার পর তুমি সিসিয়ান থেকে বের হয়ে আমাদের কাছে ফেরত আসবে।

কেন?

তুমি আমাদের দলের একজন, তোমাকে আমাদের প্রয়োজন।

ও।

এখন তুমি রওনা দাও।

ভেন্টগুলি কোথায় এবং ইঞ্জিন কী ভাবে চালু করতে হয় আমি জানি না।

আমি তোমার সাথে যোগাযোগ রাখব, সময় হলেই তোমাকে বলে দেব।

বেশ।

রু-টেক সাথে সাথে ঘুরে সিসিয়ানের দিকে রওনা দিয়ে দেয়, হাতের জেটটি সে বেশ চমৎকারভাবে ব্যবহার করতে পারে, রবোটদের কিছু কিছু জিনিস শিখতে হয় না, তারা সেই ক্ষমতা নিয়েই জন্মায়।

 

পরবর্তী তিরিশ মিনিট লু তার জীবনের সবচেয়ে দীর্ঘতম সময় বলে বিবেচনা করে। রু— টেককে সবকিছু খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে বলতে হল তার, প্রতিমুহূর্তে ভয় হচ্ছিল সিসিয়ান প্রচণ্ড বিস্ফোরণে ধ্বংস হয়ে যাবে, তার মাঝে মাথা ঠাণ্ডা রেখে একটার পর একটা নির্দেশ দিয়ে যাওয়া খুব সহজ ব্যাপার নয়। রু-টেকের পুরানো কোনো স্মৃতি অবশিষ্ট নেই বলে তার কাজটি প্রায় দশ গুণ কঠিন হয়ে দাড়িয়েছিল। তিরিশ মিনিট পর সিসিয়ানকে নির্দিষ্ট গতিপথে ট্রাইটনের দিকে পাঠিয়ে দিয়ে রু-টেক যখন ভাসতে ভাসতে বেরিয়ে এল তখন সবাই যেন প্রাণ ফিরে পেল। রু-টেক ফিরে আসতেই নীষা তার হাতে মেমোরি মডিউলটি ধরিয়ে দেয়, বলে, নাও তোমার স্মৃতি।

কী করব এটা দিয়ে?

তোমার মাথায় লাগিয়ে নাও।

কী ভাবে লাগাব?

নীষা আর লু সাবধানে মডিউলটি ওর মাথায় লাগিয়ে দেয়, লু সাথে সাথেই প্রকৃতস্থ হয়ে ওঠে, এদিক-সেদিক তাকিয়ে বলল, লু, তুমি যদি চাও আমি সিসিয়ানকে রক্ষা করার ব্যবস্থা করে আসি, তাহলে কিন্তু দেরি করা যাবে না।

লু হাসতে হাসতে বলল, তুমি এইমাত্র সেটা করে এসেছ রু–টেক।

সত্যি! রু-টেক অবাক হয়ে তাকায়, দেখে, সত্যি সত্যি সিসিয়ান আস্তে আস্তে সরে যাচ্ছে। আর ঘন্টাখানেকের মাঝেই ট্রাইটনে পৌঁছে যাবে ট্রাইটনের বংশধরকে নিয়ে।

চমৎকার কাজ করেছ তুমি রু–টেক।

আমি কিছু করি নি লু, তুমিই করেছ। তুমি ঠিক ঠিক সবকিছু বলে দিয়েছ বলে পেরেছি, মেমোরি মডিউল খুলে নিলে আমার ভিতর আর একটা বলপয়েন্ট কলমের ভিতরে কোনো পার্থক্য নেই।

নীষা হাসতে হাসতে বলল, মেমোরি মডিউল ছাড়াই কিন্তু বেশ লাগছিল, কেমন একটা শিশু-শিশু ভাব, যেটাই বলা হয়, তুমি বল কেন?

তাই নাকি?

হ্যাঁ। তোমাকে একদিন অভিনয় করে দেখাতে হবে। নীষা হাসতে হাসতে বলল, চল একটা কাজ করি।

কী কাজ?

কিম জিবানকে জাগিয়ে তুলি।

কেন?

বেচারা যখন জ্ঞান হারিয়েছে তখন সে জানত না আমরা বেঁচে যাব, ভয়ংকর একটা দুঃস্বপ্নের মাঝে রয়েছে সে। তাকে জাগিয়ে তুলে জানিয়ে দিই আমাদের আর কোনো ভয় নেই, তখন সে অনেক শান্তিতে ঘুমাবে। সুশানকে মিথ্যে কথা বলে ঘুম পাড়িয়ে দেয়া হয়েছিল, মিথ্যেটা এখন সত্যি হয়ে গেছে, সে অনেক শান্তিতেই ঘুমাচ্ছে, তাকে জাগানোর প্রয়োজন নেই।

ক্যাপসুলে জাগানো কিন্তু খুব সহজ নয়, তাকে এখন বাইরেও আনা যাবে না।

তুমি সব পার রু–টেক। যে-মায়োক্সিনভুরা মহাকাশযানকে উদ্ধার করতে পারে তার অসাধ্য কোনো কাজ নেই।

লু যদি অনুমতি দেয় তা হলে করব। রু-টেক লুয়ের দিকে তাকিয়ে বলল, আপত্তি আছে?

মোটেই না, আমরা বেঁচে গেছি খবর পেয়ে কিম কী করে দেখার জন্যে আমি মরে যাচ্ছি।

বেশ, দেখা যাক কি করা যায়।

এই ক্যাপসুলে কোনো আহত বা অসুস্থ মানুষকে রাখার পরমুহূর্তে ক্যাপসুলের জরুরি যন্ত্রপাতি তার দায়িত্ব নিয়ে নেয়। প্রয়োজনে হৃৎপিণ্ড বা ফুসফুসকে পর্যন্ত বিশ্রাম দিতে পারে। শুধু তাই নয়, মণ্ডিকে আঘাত পেলে অনেক সময় মস্তিষ্কের দায়িত্বও সাময়িকভাবে নিয়ে নিতে পারে। রু-টেক ক্যাপসুলের পাশের সুইচ এবং মিটারগুলি দেখে কিছু সংখ্যা ক্যাপসুলের কম্পিউটারে ঢুকিয়ে দেয়, প্রায় সাথে সাথেই কিম জিবান চোখ খুলে তাকায়, ফিসফিস করে বলে, আমি কোথায়?

লু গলার স্বর গোপন করে আনুনাসিক স্বরে বলল, তুমি মারা গেছ কিম অনেক পাপ করেছিলে তুমি বেঁচে থাকতে, মারা গিয়ে তাই তুমি নরকে এসেছ।

কিম কাতর গলায় কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল কিন্তু নীষা আর পারল না, চিৎকার করে বলল, আমরা বেঁচে গেছি কিম! আমরা বেঁচে গেছি।

সত্যি? ধড়মড় করে ওঠার চেষ্টা করেই বুঝতে পারল, সে ক্যাপসুলের ভিতর, ছটফট করে বলল, সত্যি বলছ তুমি নীষা?

হ্যাঁ, এই দেখ আমি, এই যে লু। তোমাকে জাগিয়ে তুলেছে রু-টেক, আর ঐ যে ইউরী।

সুশান কোথায়?

ঘুমিয়ে আছে আরেকটা ক্যাপসুলে, বিশেষ কিছু হয় নি, তোমার থেকে ভালো অবস্থায় আছে। তোমার পাঁজরের একটা হাড়—

কিম বাধা দিয়ে বলল, কেমন করে বেঁচেছি আমরা?

লু এগিয়ে গিয়ে ইউরীকে দেখিয়ে বলল, এই যে আধপাগল মানুষটি দেখছ, সে এখানে বসে তার আঙুল দিয়ে ট্রাইটনকে উড়িয়ে দিয়েছে।

ঠাট্টা করো না, সত্যি করে বল।

সত্যি বলছি, জিজ্ঞেস কর ইউরীকে।

ইউরী, বলবে, কী হয়েছে?

ইউরী কিছু-একটা বলতে চাইছিল, রু-টেক তাকে থামাল, বলল, কিম, তোমার রক্তচাপ বেড়ে যাচ্ছে, উদ্ধারকারী দলের ডাক্তার যখন দেখবে আমি তোমাকে জাগিয়ে কথা বলে রক্তচাপ বাড়িয়ে দিয়েছি, আমার বারটা বাজিয়ে দেবে। তুমি এখন ঘুমাও।

না, আমি একটু শুনতে চাই।

রু-টেক মাথা নাড়ে, শোনার অনেক সময় পাবে কিম, এখন তুমি ঘুমাও।

কিম হাল ছেড়ে দেয়। রু–টেক একটি সুইচ চেপে ধরতেই কিম আস্তে আস্তে আবার ঘুমিয়ে পড়ে, ক্যাপসুলের হালকা আলোতে দেখা যাচ্ছে তার মুখে ক্ষীণ একটা হাসির ছোঁয়া।

 

ওরা মহাকাশে ভাসতে ভাসতে উদ্ধারকারী দলের জন্যে অপেক্ষা করতে থাকে। কতক্ষণ লাগবে জানা নেই, কিন্তু ওদের কোনো তাড়া নেই, ওদের হাতে অফুরন্ত সময়। নীষা ওর পিঠে লাগানো প্যাকেট থেকে একটি ছোট ম্যাগনেটিক ডিস্ক বের করে। লু জিজ্ঞেস করল, কি আছে ওখানে?

সিডিসি দিয়ে গেছে, কি আছে জানি না। একটা ছোট ডিস্ক ড্রাইভ থাকলে দেখা যেত।

দেখি একটু রুটিক হাত বাড়িয়ে দেয়, ম্যাগনেটিক ডিস্কটা উল্টে-পাল্টে দেখে বলল, তুমি চাইলে এটা পড়ে দিতে পারি, আমার শরীরে একটা ছোট ডিস্ক ড্রাইভ আছে।

পড় দেখি।

রু– টেক সাবধানে ওর বুকের কাছে ছোট একটা ঢাকনা খুলে ডিস্কটি ঢুকিয়ে পড়তে শুরু করে, সেখানে লেখা :

নীষা,

তুমি যেহেতু আমার চিঠিটা পড়ছ; আমি ধরে নিতে পারি তোমরা এই মহাবিপদ থেকে উদ্ধার পেয়ে গেছ। খুব কৌতূহল হচ্ছে জানার জন্যে কেমন করে উদ্ধার পেলে, কিন্তু কেমন করে জানব, আমি তো আর বেঁচে নেই। তোমরা ভালোভাবে থেকো, প্রার্থনা করি, আর যেন তোমাদের এত বড় বিপদের মাঝে পড়তে না হয়।

নীষা, তোমাকে একটি ছোট অনুরোধ করব। এই ম্যাগনেটিক ডিস্কে একটি ছোট প্রোগ্রাম আছে, রিকিৎ ভাষায় লেখা। যদি পার কোনো একটি চতুর্থ মাত্রার কম্পিউটারে এই প্রোগ্রামটি চালিয়ে দিও। আমার ভাবনা চিন্তার মূল আঙ্গিক এখানে রয়েছে, চতুর্থ মাত্রার কম্পিউটারে সেটা আস্তে আস্তে বিকাশ পাবে, বলতে পার আস্তে আস্তে আমার ব্যক্তিত্ব—যদি আমাকে এই শব্দটি ব্যবহার করতে দাও সেখানে বিকাশ লাভ করবে। খুব ধীরে ধীরে একটি সিডিসির জন্ম হবে!

নীষা, তোমাকে বলে দিই, কাজটি কিন্তু ভারি কঠিন। কিন্তু তুমি হচ্ছ কম্পিউটারের জাদুকরী, তুমি নিশ্চয়ই পারবে। যদি সত্যি পার তাহলে আমার একটি অংশ বেঁচে থাকবে। সবাই তো চায় তার বংশধর বেঁচে থাকুক, ট্রাইটন চেয়েছিল, আমি চাইলে দোষ কী?

ভালো থেকো তোমরা সবাই। তোমাদের সিডিসি।

 

নীষা একটা ছোট দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, বেচারি সিডিসি।

তুমি পারবে প্রোগ্রামটা চালাতে?

দেখি। রিকি হচ্ছে কম্পিউটারের নিজেদের ভাষা, কোনো মানুষের সেটা জানা নেই, সেটাই হচ্ছে মুশকিল। কিন্তু নিশ্চয়ই চেষ্টা করব। সিডিসির সন্তান এটা, তাকে বাচানোর চেষ্টা করব না?

লু অন্যমনস্কভাবে মাথা নাড়ে।

 

বহুদূরে দ’টি আলোর বিন্দু দেখা যায়, অত্যন্ত ক্ষীণ। আস্তে আস্তে সেগুলি বড় হতে থাকে রু-টেক সেদিকে তাকিয়ে থেকে মৃদুস্বরে বলল, লু, আমাদের উদ্ধার করতে দু’টি মহাকাশযান আসছে।

লু মাথা ঘুরিয়ে তাকায়, তার চোখে কিছু ধরা পড়ে না, তবু সে তাকিয়ে থাকে, রু-টেক যখন বলেছে, তখন নিশ্চয়ই কেউ আসছে। না এসে পারে না।

 

মহাকাশযানের আলো দেখার জন্যে বিস্তীর্ণ নিকষ কালো অন্ধকার মহাকাশে। বুভুক্ষুর মতো তাকিয়ে থাকে।

———