৪১-৫০. জনগণের মধ্যে আন্দোলনও দানা বেঁধে উঠল

৪১.

পরের দিন থেকেই জনগণের মধ্যে আন্দোলনও দানা বেঁধে উঠল। পূর্ণ ধর্মঘট পালিত হল। যাদের আমি নিষেধ করেছিলাম, তারাও প্রায়ই তিন দিনের মধ্যে গ্রেফতার হয়ে গেল। খালেক নেওয়াজ খান, কাজী গোলাম মাহাবুব, আজিজ আহমেদ, অলি আহাদ, আবুল হাসানাত, আবুল বরকত, কে. জি. মোস্তফা, বাহাউদ্দিন চৌধুরী ও আরও অনেকে। এরাই ছিল প্রথম শ্রেণীর কর্মী। বুঝতে আর বাকি রইল না যে, আন্দোলন আর চলবে না। কর্মীরা গ্রেফতার হওয়ার পরে আর আন্দোলন চলল না। ক্লাস শুরু হয়ে গেল, আমরা জেলে রইলাম। বোধহয় ত্রিশ-পঁয়ত্রিশজন ছাত্রনেতা গ্রেফতার হয়েছিল। আমাদের ঢাকা জেলের পাঁচ নম্বর ওয়ার্ডের দোতালায় রাখা হয়েছিল। কয়েকজনকে উচ্চ শ্রেণীর মর্যাদা দিয়েছিল। আর কয়েকজনকে দেওয়া হয় নাই। তাতে আমাদের খুব অসুবিধা হতে লাগল। খাওয়া-দাওয়ার কষ্টও হয়েছিল। তবুও আমরা ঠিক করলাম, এক জায়গায় থাকব এবং যা কিছু পাই ভাগ করে খাব।

জেলে যারা আছে, তাদের মধ্যেও দুইটা গ্রুপ ছিল। তিনজন ছিল উগ্রপন্থী। এদের অন্য ছাত্র বন্দি কমিউনিস্ট বলত। এই তিনজনের মধ্যে একজন ছাত্রলীগের সভ্য ছিল না। আর সকলেই ছাত্রলীগের সভ্য। আমাদের খেলাধুলা করে সময় কেটে যেত। আমার কাছে বরকত থাকত। রাতে বরকত গান গাইত, চমক্কার গাইতে পারত। বইপত্রও কিছু আনা হয়েছিল, জেল লাইব্রেরিতেও বই কিছু ছিল। কিছু সময় সকলেই লেখাপড়া করত। সকলেই ছাত্র, খুব দুষ্টামি করত। আমি ও আজিজ আহমেদ ছিলাম এদের মধ্যে বয়সে বড়। ডাক্তার সাহেবরা জেলে মেডিকেল ডায়েট দিতে পারতেন। এরা দল বেঁধে ডাক্তার সাহেবের জীবন অতিষ্ঠ করে তুলত। বরকত ছিল দুষ্টু বেশি। ডাক্তার সাহেব আসলেই বলত, “আমার পায়ে ব্যথা, কিছু দুধ ও ডিম পাস করে দেন।” সকলেই হেসে ফেলত তার কথায়। রাজনীতি নিয়ে চলত ঘণ্টার পর ঘণ্টা আলোচনা।

একমাত্র বাহাউদ্দিন চৌধুরীর বাবা-মা ঢাকায় ছিলেন। সকলের চেয়ে বয়সে ছোট ছিল সে, আমি খুব স্নেহ করতাম। বাহাউদ্দিনের মা অনেক খাবার দিতেন। সকলকে দিয়েই সে খেত। তবু রাতে সে যখন ঘুমাত তখন দলবল বেঁধে ওর খাবারগুলো খেয়ে ফেলত, না হয় সরিয়ে রাখত। বাহাউদ্দিন কিছু না বলে চুপ করে আমাকে বলত। আমি সকলের সঙ্গে রাগ করতাম। কিন্তু কেউই স্বীকার করত না। রাতে যারা তাস খেলত তারাই এই কাজ করত। বরকত আমার কাছে মিছা কথা বলত না, সব বলে দিত।

খালেক নেওয়াজকে নিয়ে আর এক মহাবিপদ ছিল। ওর গায়ে বড় বড় লোম ছিল। সমস্ত গা লোমে ভরা। ছাত্ররা ছারপোকা ধরে চুপি চুপি ওর শরীরে ছেড়ে দিত। ওর মুখও খুব খারাপ ছিল, অকথ্য ভাষায় গালাগালি করত। আমরা বিকালে ভলিবল খেলতাম। তখন সুপারিনটেনডেন্ট ছিলেন আমীর হোসেন সাহেব। আমাদের খুবই স্নেহ করতেন। যা প্রয়োজন, চাইলেই তিনি আমাদের দিতেন এবং সকলকে হুকুম দিয়েছিলেন আমাদের যেন কোন অসুবিধা না হয়।

একদিন আমার হাতের কজি সরে গিয়েছিল, পড়ে যেয়ে। ভীষণ যন্ত্রণা, সহ্য করা কষ্টকর হয়ে পড়েছিল। আমাকে বোধহয় মেডিকেল কলেজে পাঠানোর ব্যবস্থা হচ্ছিল। একজন নতুন ডাক্তার ছিল জেলে। আমার হাতটা ঠিকমত বসিয়ে দিল। ব্যথা সাথে সাথে কম হয়ে গেল। আর যাওয়া লাগল না। বাড়িতে আমার আব্বা ও মা ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। রেণু তখন হাচিনাকে নিয়ে বাড়িতেই থাকে। হাচিনা তখন একটু হাঁটতে শিখছে। রেণুর চিঠি জেলেই পেয়েছিলাম। কিছু টাকাও আব্ব পাঠিয়ে ছিলেন। রেণু জানত, আমি সিগারেট খাই। টাকা পয়সা নাও থাকতে পারে। টাকার দরকার হলে লিখতে বলেছিল।

জুন মাসের প্রথম দিক থেকে দু’একজন করে ছাড়তে রু করে। এখন আর বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো গোলমাল নাই। শামসুল হক সাহেব মুসলিম লীগ প্রার্থী খুররম খান পন্নীকে পরাজিত করে এমএলএ হয়েছেন। মুসলিম লীগের প্রথম পরাজয় পাকিস্তানে। মুসলিম লীগকে কোটারি করার ফল তাদের পেতে হল। আমরা জেলের মধ্যে খুবই চিন্তিত ছিলাম। হক সাহেব আমার উপর অসন্তুষ্টও হয়েছিলেন; কেন আমি গ্রেফতার হয়েছিলাম, টাঙ্গাইল না যেয়ে! পরে যখন সমস্ত খবর পেলেন তখন দেখতে পেলেন, আমার কোনো উপায় ছিল না।

১৯৪৭ সালে যে মুসলিম লীগকে লোকে পাগলের মত সমর্থন করছিল, সেই মুসলিম লীগ প্রার্থীর পরাজয়বরণ করতে হল কি জন্য? কোটারি, কুশাসন, জুলুম, অত্যাচার এবং অর্থনৈতিক কোন সুষ্ঠু পরিকল্পনা গ্রহণ না করার ফলে। ইংরেজ আমলের সেই বাঁধাধরা নিয়মে দেশ শাসন চলল। স্বাধীন দেশ, জনগণ নতুন কিছু আশা করেছিল, ইংরেজ চলে গেলে তাদের অনেক উন্নতি হবে এবং শোষণ থাকবে না। আজ দেখছে ঠিক তার উল্টা। জনগণের মধ্যে হতাশা দেখা দিয়েছিল। এদিকে ভ্রুক্ষেপ নাই আমাদের শাসকগোষ্ঠীর। জিন্নাহর মৃত্যুর পর থেকেই কোটারি ও ষড়যন্ত্রের রাজনীতি শুরু হয়েছে। লিয়াকত আলী খান এখন সমস্ত ক্ষমতার অধিকারী। তিনি কাউকেও সহ্য করতে চাইছিলেন না। যদিও তিনি গণতন্ত্রের কথা মুখে বলতেন, কাজে তার উল্টা করছিলেন। জিন্নাহকে পূর্ব বাংলার জনগণ ভালবাসত এবং শ্রদ্ধা করত। ঘরে ঘরে জনসাধারণ তার নাম জানত। লিয়াকত আলী খান প্রধানমন্ত্রী। এইটুকু শিক্ষিত সমাজ জানত এবং আশা করেছিল জিন্নাহ সাহেবের এক নম্বর শিষ্য নিশ্চয়ই ভাল কাজ করবেন এবং শাসনতন্ত্র তাড়াতাড়ি দিবেন। জিন্নাহ সাহেব শাসনতন্ত্র দিয়ে গেলে কোনো গোলমাল হওয়া বা ভুল বোঝাবুঝির সম্ভাবনা থাকত কি না সন্দেহ ছিল। যাই তিনি করতেন জনগণ মেনে নিতে বাধ্য হত। জিন্নাহ সাহেব বড়লাট হয়ে প্রচণ্ড ক্ষমতা ব্যবহার করতেন। খাজা সাহেব কোন ক্ষমতাই ব্যবহার করতেন না। তিনি অমায়িক ও দুর্বল প্রকৃতির লোক ছিলেন। ব্যক্তিত্ব বলে তার কিছুই ছিল না।

লিয়াকত আলী আমাদের এই আন্দোলন ভাল চোখে দেখছিলেন না। পূর্ব বাংলার নেতারা তাঁকে ভুল বোঝাতে সক্ষম হয়েছিলেন। পূর্ব বাংলার প্রধানমন্ত্রী নূরুল আমিন সাহেব সরকারি কর্মচারীদের উপর নির্ভর করতেন এবং তাদের রিপোর্টের উপর ভিত্তি করে অত্যাচার করতে শুরু করলেন। টাঙ্গাইল উপনির্বাচনে পরাজিত হয়েও তাদের চক্ষু খুলল না। সরকারি দল তাদের সভায় ঘোষণা করল, যা কিছু হোক, শামসুল হক সাহেবকে আইনসভায় বসতে দেওয়া হবে না। তারা নির্বাচনী মামলা দায়ের করল। শামসুল হক সাহেব ইলেকশনে জয়লাভ করে ঢাকা আসলে ঢাকার জনসাধারণ ও ছাত্রসমাজ তাকে বিরাট সম্বর্ধনা জানাল। বিরাট শোভাযাত্রা করে তাকে নিয়ে ঢাকা শহর প্রদক্ষিণ করল। আমরা জেলে বসে বিজয়ের আনন্দ উপভোগ করলাম। শামসুল হক সাহেব ফিরে আসার পরেই পুরানা লীগ কর্মীরা মিলে এক কর্মী সম্মেলন ডাকল ঢাকায়—ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা ঠিক করার জন্য। ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন সে সভা আহ্বান করা হয়েছিল।

 

৪২.

আমাদের মধ্যে অনেককেই মুক্তি দেওয়া হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত শুধু আমি ও বাহাউদ্দিন চৌধুরী রইলাম। বাহাউদ্দিন চৌধুরীর বয়স খুব অল্প। তাকে না ছাড়বার কারণ হল, সন্দেহ করছিল সে কমিউনিস্ট ভাবাপন্ন হয়ে পড়ছিল। এই সময় অনেককেই কমিউনিস্ট বলে জেলে ধরে আনতে শুরু করেছিল, নিরাপত্তা আইনে। যাকে আমরা বিনা বিচারে বন্দি বলি। এদের মধ্যে অনেকেই ইংরেজ আমলে বহুদিন জেল খেটেছে।

কারাগারের যন্ত্রণা কি এইবারই বুঝতে পারলাম। সন্ধ্যায় বাইরে থেকে তালা বন্ধ করে দিলেই আমার খারাপ লাগত। সূর্য অস্ত যাওয়ার সাথে সাথে সমস্ত কয়েদির কামরায় কামরায় বাইরে থেকে তালা বন্ধ করে দেওয়া হয় গণনা করার পর। আমি কয়েদিদের কাছে বসে তাদের জীবনের ইতিহাস ও সুখ দুঃখের কথা শুনতে ভালবাসতাম। তখন কয়েদিদের বিড়ি তামাক খাওয়া আইনে নিষেধ ছিল। তবে রাজনৈতিক বন্দিদের নিষেধ ছিল না। নিজের টাকা দিয়ে কিনে এনে খেতে পারত। একটা বিড়ির জন্য কয়েদিরা পাগল হয়ে যেত। কিন্তু কর্তৃপক্ষ যদি কাউকেও বিড়ি খেতে দেখত তাহলে তাদের বিচার হত এবং শাস্তি পেত। সিপাহিরা যদি কোনো সময় দয়াপরবশ হয়ে একটা বিড়ি বা সিগারেট দিত কতই না খুশি হত! আমি বিড়ি এনে এদের কিছু কিছু দিতাম। পালিয়ে পালিয়ে খেত কয়েদিরা।

কর্মী সম্মেলনের জন্য খুব তোড়জোড় চলছিল। আমরা জেলে বসেই সে খবর পাই। ১৫০ নম্বর মোগলটুলীতে অফিস হয়েছে। শওকত মিয়া সকলের খাওয়া ও থাকার বন্দোবস্ত করত। সে ছাড়া ঢাকা শহরে কেইবা করবে? আর একজন ঢাকার পুরানা লীগকর্মী ইয়ার মোহাম্মদ খান সহযোগিতা করছিলেন। ইয়ার মোহাম্মদ খানের অর্থবল ও জনবল দুইই ছিল। এডভোকেট আতাউর রহমান খান, আলী আমজাদ খান এবং আনোয়ারা খাতুন এমএলএ সহযোগিতা করছিলেন। আমরা সম্মেলনের ফলাফল সম্বন্ধে খুবই চিন্তায় দিন কাটাচ্ছিলাম। আমার সাথে যোগাযোগ করা হয়েছিল, আমার মত নেওয়ার জন্য। আমি খবর দিয়েছিলাম, “আর মুসলিম লীগের পিছনে ঘুরে লাভ নাই, এ প্রতিষ্ঠান এখন গণবিচ্ছিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। এরা আমাদের মুসলিম লীগে নিতে চাইলেও যাওয়া উচিত হবে না। কারণ এরা কোটারি করে ফেলেছে। একে আর জনগণের প্রতিষ্ঠান বলা চলে না। এদের কোনো কর্মপন্থাও নাই। আমাকে আরও জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, আমি ছাত্র প্রতিষ্ঠান করব, না রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান গঠন হলে তাতে যোগদান করব? আমি উত্তর পাঠিয়েছিলাম, ছাত্র রাজনীতি আমি আর করব না, রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানই করব। কারণ বিরোধী দল সৃষ্টি করতে না পারলে এ দেশে একনায়কত্ব চলবে।

কিছুদিন পূর্বে জনাব কামরুদ্দিন সাহেব ‘গণআজাদী লীগ’ নাম দিয়ে একটা প্রতিষ্ঠান করেছিলেন, কিন্তু তা কাগজপত্রেই শেষ। যাহোক, কোথায়ও হল বা জায়গা না পেয়ে শেষ পর্যন্ত হুমায়ুন সাহেবের রোজ গার্ডেন বাড়িতে সম্মেলনের কাজ শুরু হয়েছিল। শুধু কর্মীরা না, অনেক রাজনৈতিক নেতাও সেই সম্মেলনে যোগদান করেন। শেরে বাংলা এ. কে, ফজলুল হক, মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, আল্লামা মাওলানা রাগীব আহসান, এমএলএদের ভিতর থেকে জনাব খয়রাত হোসেন, বেগম আনোয়ারা খাতুন, আলী আহমদ খান ও হাবিবুর রহমান চৌধুরী ওরফে ধনু মিয়া এবং বিভিন্ন জেলার অনেক প্রবীণ নেতাও যোগদান করেছিলেন। সকলেই একমত হয়ে নতুন রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান গঠন করলেন; তার নাম দেওয়া হল, পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ।’ মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী সভাপতি, জনাব শামসুল হক সাধারণ সম্পাদক এবং আমাকে করা হল জয়েন্ট সেক্রেটারি। খবরের কাগজে দেখলাম, আমার নামের পাশে লেখা আছে নিরাপত্তা বন্দি’। আমি মনে করেছিলাম, পাকিস্তান হয়ে গেছে সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের দরকার নাই। একটা অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান হবে, যার একটা সুষ্ঠু ম্যানিফেস্টো থাকবে। ভাবলাম, সময় এখনও আসে নাই, তাই যারা বাইরে আছেন তারা চিন্তাভাবনা করেই করেছেন।

আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠন হওয়ার কয়েকদিন পরেই আমার ও বাহাউদ্দিনের মুক্তির আদেশ এল। বাইরে থেকে আমার সহকর্মীরা নিশ্চয়ই খবর পেয়েছিল। জেলগেটে গিয়ে দেখি বিরাট জনতা আমাদের অভ্যর্থনা করার জন্য এসেছে মওলানা ভাসানী সাহেবের নেতৃত্বে। বাহাউদ্দিন আমাকে চুপি চুপি বলে, “মুজিব ভাই, পূর্বে মুক্তি পেলে একটা মালাও কেউ দিত না, আপনার সাথে মুক্তি পাচ্ছি, একটা মালা তো পাব।” আমি হেসে দিয়ে বললাম, “আর কেউ না দিলে তোমাকে আমি মালা পরিয়ে দিতাম।” জেলগেট থেকে বের হয়ে দেখি, আমার আব্বাও উপস্থিত। তিনি আমাকে দেখবার জন্য বাড়ি থেকে এসেছেন। আমি আব্বাকে সালাম করে ভাসানী সাহেবের দিকে এগিয়ে গিয়ে তাঁকেও সালাম করলাম। সাথে সাথে আওয়ামী মুসলিম লীগ জিন্দাবাদ, ছাত্রলীগ জিন্দাবাদ’ ধ্বনি উঠল। জেলগেটে এই প্রথম আওয়ামী লীগ জিন্দাবাদ’ হল। শামসুল হক সাহেবকে কাছে পেয়ে তাকে অভিনন্দন জানালাম এবং বললাম, “হক সাহেব, আপনার জয়, আজ জনগণের জয়।” হক সাহেব আমাকে জড়িয়ে ধরলেন এবং বললেন, “চল, এবার শুরু করা যাক।” পরে আওয়ামী মুসলিম লীগ, আওয়ামী লীগ নামে পরিচিত হয়।

আওয়ামী লীগের কয়েকজনকে সহ-সভাপতি করা হয়েছিল। জনাব আতাউর রহমান খান, আবদুস সালাম খান, আলী আহমদ খান, আলী আমজাদ খান ও আরও একজন কে ছিলেন আমার মনে নাই। আওয়ামী লীগের প্রথম ওয়ার্কিং কমিটির সভা হয় ১৫০ নম্বর মোগলটুলীতে। শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক সাহেব তাতে যোগদান করেছিলেন। একটা গঠনতন্ত্র সাব-কমিটি ও একটা কর্মপন্থা সাব-কমিটি করা হল। আমরা কাজ করা শুরু করলাম। শওকত মিয়া বিরাট সাইনবোর্ড লাগিয়ে দিল। টেবিল, চেয়ার সকল কিছুই বন্দোবস্ত করল। আমি জেল থেকে বের হওয়ার পূর্বে একটা জনসভা আওয়ামী লীগ আরমানিটোলা ময়দানে ডেকেছিল। মওলানা ভাসানী সেই প্রথম ঢাকায় বক্তৃতা করবেন। শামসুল হক সাহেবকে ঢাকার জনগণ জানত। তিনি বক্তৃতাও ভাল করতেন। আওয়ামী মুসলিম লীগ যাতে জনসভা না করতে পারে সে জন্য মুসলিম লীগ গুণ্ডামির আশ্রয় গ্রহণ করে। যথেষ্ট জনসমাগম হয়েছিল, সভা যখন আরম্ভ হবে ঠিক সেই মুহূর্তে একদল ভাড়াটিয়া লোক মাইক্রোফোন নষ্ট করে দিয়েছিল এবং প্যান্ডেল ভেঙে ফেলেছিল। অনেক কর্মীকে মারপিটও করেছিল। ঢাকার নামকরা ভীষণ প্রকৃতির লোক বড় বাদশা বাবুবাজারে (বাদামতলী ঘাট) থাকে। বড় বাদশার লোকবল ছিল, তার নামে দোহাই দিয়ে ফিরত এই সমস্ত এলাকায়। তাকে বোঝান হয়েছিল, আওয়ামী লীগ যারা করেছে এবং আওয়ামী লীগের সভা করছে তারা সবাই পাকিস্তান ধ্বংস করতে চায়’—এদের সভা করতে দেওয়া চলবে না। বাদশা মিয়াকে লোকজন জোগাড় করে সভা ভাঙবার জন্য পাঁচশত টাকা দেওয়া হয়েছিল।

বাদশা মিয়া খুব ভাল বংশের থেকে এসেছে, কিন্তু দলে পড়ে এবং ঢাকার হিন্দুমুসলমান দাঙ্গায় শরিক হয়ে খারাপ রাস্তায় চলে গিয়েছিল। দাঙ্গা করে অনেক মামলার আসামিও হয়েছিল। সভায় গোলমাল করে সে চলে গেলে ঐ মহল্লার বাসিন্দা জনাব আরিফুর রহমান চৌধুরী তার কাছে গিয়ে বললেন, “বাদশা মিয়া, আমাদের সভা একবার ভেঙে দিয়েছেন। আমরা আবার সব কিছু ঠিক করে সভা আরম্ভ করছি। আপনি আমাদের কথা প্রথমে শুনুন, যদি পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বলি বা দেশের বিরুদ্ধে বলি তারপরে সভা ভাঙতে পারবেন।” চৌধুরী সাহেবের ব্যবহার ছিল অমায়িক। খেলাফত আন্দোলন থেকে রাজনীতি করছেন। দেশের রাজনীতি করতে সর্বস্ব বিলিয়ে দিয়েছেন। তিনি জন্মগ্রহণ করেছিলেন বরিশালের উলানিয়ার জমিদারি বংশে। বাদশা মিয়া তার দলবল নিয়ে এসে রাস্তায় দাঁড়িয়ে সভার বক্তৃতা শুনতে লাগল। কয়েকজন বক্তৃতা করার পরে বাদশা মিয়া প্রাটফর্মের কাছে এসে বলল, “আমার কথা আছে, আমাকে বলতে দিতে হবে।” কে তাকে বাধা দেয়, বলতে গেলে আরমানিটোলা ময়দান তার রাজত্বের মধ্যে। বাদশা মিয়া মাইকের কাছে যেয়ে বলল, “আমাকে মুসলিম লীগ নেতারা ভুল বুঝিয়েছিল আপনাদের বিরুদ্ধে। আপনাদের সভা ভাঙতে আমাকে পাঁচশত টাকা দিয়েছিল, এ টাকা এখনও আমার পকেটে আছে। আমার পক্ষে এ টাকা গ্রহণ করা হারাম। আমি এ টাকা আপনাদের সামনে ছুঁড়ে ফেলে দিচ্ছি।” এ কথা বলে টাকাগুলি (পাঁচ টাকার নোট) ছুঁড়ে দিল। সভার মধ্যে টাকাগুলি উড়তে লাগল। অনেকে কুড়িয়ে নিল এবং অনেক ছিঁড়ে ফেলল। বাদশা মিয়া আরও বলল, “আজ থেকে আমি আওয়ামী লীগের সভ্য হলাম, দেখি আরমানিটোলায় কে আপনাদের সভা ভাঙতে পারে?” জনসাধারণ ফুলের মালা বাদশা মিয়ার গলায় পরিয়ে দিল। জনগণের মধ্যে এক নতুন আলোড়নের সৃষ্টি হল। মুসলিম লীগ গুণ্ডামির প্রশ্রয় নিয়েছিল একথা ফাঁস হয়ে পড়ল। আওয়ামী লীগের সভা ভাঙতে টাকাও দিয়েছিল একথাও জনগণ জানতে পারল। যদিও এতে তাদের লজ্জা হয় নাই। এই গুণ্ডামির পথ অনেক দিন তারা অনুসরণ করেছে যে পর্যন্ত না আমরা বাধ্য করতে পেরেছি তাদের তা বন্ধ করতে। তারা ঠিক করেছিল, বিরুদ্ধ দল গঠন করতে দেওয়া হবে না। তারা যে জনসমর্থন হারাচ্ছে, কেন তার সংশোধন না করে তারা বিরুদ্ধ দলের উপর নির্যাতন শুরু করল এবং গুণ্ডামির আশ্রয় নিল?

 

৪৩.

আমি জেল থেকে বের হয়েছি, আব্বা আমার জন্য ঢাকায় এসেছেন, আমাকে বাড়ি নিয়ে যাবেন। আমি আব্বাকে বললাম, “আপনি বাড়ি যান, আমি সাত-আট দিনের মধ্যে আসছি।”

আমার টাকার দরকার, বাড়ি না গেলে টাকা পাওয়া যাবে না। বৃদ্ধা মা, আর স্ত্রী ও মেয়েটিকে দেখতে ইচ্ছা করছিল। আমি ফরিদপুরের সালাম সাহেবকেও খবর দিলাম গোপালগঞ্জে একটা সভা করব, তিনি যেন উপস্থিত থাকেন। গোপালগঞ্জে আওয়ামী মুসলিম লীগ সংগঠন হয়ে গেছে। পুরানা মুসলিম লীগ কমিটিকেই আওয়ামী লীগ কমিটিতে পরিণত করে ফেলা হয়েছিল। কারণ, পাকিস্তান সরকার আমাদের বিরোধীদের দিয়ে একটা মহকুমা মুসলিম লীগ অর্গানাইজিং কমিটি গঠন করেছিল।

গোপালগঞ্জে খবর দিয়ে আমি বাড়িতে রওয়ানা করলাম। বোধহয় জুলাই মাসের মাঝামাঝি হবে, জনসভা ডাকা হয়েছিল। সালাম খান সাহেব উপস্থিত হলেন, আমিও বাড়ি থেকে আসলাম। সভায় হাজার হাজার জনসমাগম হয়েছিল। হঠাৎ সকালবেলা ১৪৪ ধারা জারি করা হয়। আমরা সভা মসজিদ প্রাঙ্গণে করব ঠিক করলাম। তাতে যদি ১৪৪ ধারা ভাঙতে হয়, হবে। বিরাট মসজিদ এবং সামনে কয়েক হাজার লোক ধরবে। সালাম সাহেবও রাজি হলেন। আমরা যখন সভা শুরু করলাম, তখন এসডিও মসজিদে ঢুকে মসজিদের ভিতর ১৪৪ ধারা জারি করলেন। আমরা মানতে আপত্তি করলাম, পুলিশ মসজিদে ঢুকলে মারপিট শুরু হল। পুলিশ লাঠিচার্জ করল এবং দুই পক্ষেই কিছু আহত হল। আমি ও সালাম সাহেব সভাস্থান ত্যাগ করতে আপত্তি করলাম। আমাদের গ্রেফতার করা হল। জনসাধারণও মসজিদ ঘিরে রাখল। গুলি করা ছাড়া আমাদের কোর্টে বা থানায় নেওয়া সম্ভবপর হবে না, পুলিশ অফিসার বুঝতে পারল। যতদূর জানা গিয়েছিল, পুলিশ কর্মচারীরা মসজিদের ভিতর ১৪৪ ধারা জারি করতে রাজি ছিল না। এসডিও সাহেব জোর করেই করেছিলেন। মহকুমা পুলিশ অফিসার যখন বুঝতে পারলেন অবস্থা খুবই খারাপ, গোলমাল হবেই, জনসাধারণ রাস্তা বন্ধ করে রেখেছে, তখন আমার ও সালাম সাহেবের কাছে এসে অনুরোধ করলেন, “গোলমাল হলে অনেক লোক মারা যাবে। আপনারা তো এখনই জামিন পেয়ে যাবেন, এদের বলে দেন চলে যেতে এবং রাস্তা ছেড়ে দিতে। আমরা আপনাদের কোর্টে নিয়ে যাব এবং এখনই জামিন দিয়ে দেব।”

সন্ধ্যা হয়ে গেছে, বহুদূর থেকে লোকজন এসেছে। বৃষ্টি হচ্ছে, সন্ধ্যার অন্ধকারে কি হয় বলা যায় না। জনসাধারণের হাতেও অনেক লাঠি ও নৌকার বৈঠা আছে। মহকুমা প্রশাসনের কর্মকর্তারা বিশেষ করে আমাকে বক্তৃতা করে লোকজনকে বোঝাতে বললেন। সালাম সাহেব ও গোপালগঞ্জ মহকুমার নেতাদের সাথে আলাপ-আলোচনা করে ঠিক হল আমি বক্তৃতা করে লোকদের চলে যেতে বলব। আমি বক্তৃত্ম করলাম, বলার যা ছিল সবই বললাম এবং রাস্তা ছেড়ে দিতে অনুরোধ করলাম। মসজিদ থেকে কোর্ট তিন মিনিটের রাস্তা মাত্র। পুলিশ ও আমরা কয়েক ঘণ্টা আটক আছি। জনসাধারণ শেষ পর্যন্ত আমাদের রাস্তা দিল। আমাদের সাথেই জিন্দাবাদ দিতে দিতে কোর্টে এল। রাত আট ঘটিকার সময় আমাদের জামিন পিঁয়ে ছেড়ে দেয়া হল। তারপর জনগণ চলে গেল। এটা আমাদের আওয়ামী লীগের মফস্বলের প্রথম সভা এবং সে উপলক্ষে ১৪৪ ধারা জারি।

পরের দিন আওয়ামী লীগের অফিস করা হল। গোপালগঞ্জ মহকুমা আওয়ামী মুসলিম লীগের কনভেনর করা হয়েছিল কাজী আলতাফ হোসেন এবং চেয়ারম্যান করা হয়েছিল মুসলিম লীগের সভাপতি কাজী মোজাফফর হোসেন এডভোকেটকে। এই সময়ের একটা সামান্য ঘটনা মনে হচ্ছে। আমি ও কাজী আলতাফ হোসেন সাহেব ঠিক করলাম, মওলানা শামসুল হক সাহেবের (যিনি এখন লালবাগ মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল) সাথে দেখা করব। মওলানা সাহেবের বাড়িও আমার ইউনিয়নে। জনসাধারণ তাঁকে আলেম হিসাবে খুবই শ্রদ্ধা করত। আমরা দুইজন রাত দশটায় একটা এক মাঝির নৌকায় রওয়ানা করলাম। নৌকা ছোট্ট, একজন মাঝি। মধুমতী দিয়ে রওয়ানা করলাম। কারণ, তার বাড়ি মধুমতীর পাড়ে। মধুমতীর একদিকে ফরিদপুর, অন্যদিকে যশোর ও খুলনা জেলা। নদীটা এক জায়গায় খুব চওড়া। মাঝে মাঝে, সেই জায়গায় ডাকাতি হয়, আমাদের জানা ছিল। ঠিক যখন আমাদের নৌকা সেই জায়গায় এসে হাজির হয়েছিল আমি তখন ক্লান্ত ছিলাম বলে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। পানির দেশের মানুষ নৌকায় ঘুমাতে কোনো কষ্ট হয় না। কাজী সাহেব তখনও ঘুমান নাই। এই সময় একটা ছিপ নৌকা আমাদের নৌকার কাছে এসে হাজির হল। চারজন লোক নৌকার মাঝিকে জিজ্ঞাসা করল, আগুন আছে কি না? আগুন চেয়েই এই ডাকাতরা নৌকার কাছে আসে, এই তাদের পন্থা। আমাদের নৌকার কাছে এসে জিজ্ঞাসা করল, “নৌকা যাবে কোথায়?” মাঝি বলল, টুঙ্গিপাড়া, আমার গ্রামের নাম। নৌকায় কে? মাঝি আমার নাম বলল। ডাকাতরা মাঝিকে বৈঠা দিয়ে ভীষণভাবে একটা আঘাত করে বলল, “শালা আগে বলতে পার নাই শেখ সাহেব নৌকায়।” এই কথা বলে নৌকা ছেড়ে দিয়ে তারা চলে গেল। মাঝি মার খেয়ে চিৎকার করে নৌকার হাল ছেড়ে দিয়ে ভিতরে ঢুকে পড়ল। মাঝির চিৎকারে আমার ঘুম ভেঙে গিয়েছিল। কাজী সাহেব জেগে ছিলেন, তার ঘড়ি টাকা আংটি সব কিছু লুকিয়ে ফেলেছিলেন ভয়ে। কাজী সাহেব শৌখিন লোক ছিলেন, ব্যবসায়ী মানুষ, টাকা পয়সাও ছিল অনেক। আমি জেগে উঠে জিজ্ঞাসা করলাম, ব্যাপার কি? কাজী সাহেব ও মাঝি আমাকে এই গল্প করল। কাজী সাহেব বললেন, “ডাকাতরা আপনাকে শ্রদ্ধা করে, আপনার নাম করেই বেঁচে গেলাম, না হলে উপায় ছিল না। আমি বললাম “বোধহয় ডাকাতরা আমাকে ওদের দলের একজন বলে ধরে নিয়েছে। দুইজনে খুব হাসাহাসি করলাম, কিন্তু বিপদ হল মাঝিকে নিয়ে। কারণ, যে আঘাত তাকে করেছে তাতে তার পিঠে খুবই ব্যথা হয়েছে। বাধ্য হয়ে কিছুদূর এসে আমাদের এক গ্রামের পাশে নৌকা রাখতে হল। যেখানে খুব ভোরে পৌঁছাব সেখানে প্রায় সকাল দশটায় পৌঁছালাম। মওলানা সাহেব মাদ্রাসায়, তার সাথে আলাপ করে আমাদের বাড়িতে এলাম।

আমি কয়েকদিন বাড়িতে ছিলাম। আব্বা খুবই দুঃখ পেয়েছেন। আমি আইন পড়ব শুনে বললেন, “যদি ঢাকায় না পড়তে চাও, তবে বিলাত যাও। সেখান থেকে বার এট ল’ ডিগ্রি নিয়ে এস। যদি দরকার হয় আমি জমি বিক্রি করে তোমাকে টাকা দিব।” আমি বললাম, “এখন বিলাত গিয়ে কি হবে, অর্থ উপার্জন করতে আমি পারব না। আমার ভীষণ জেদ হয়েছে মুসলিম লীগ নেতাদের বিরুদ্ধে। যে পাকিস্তানের স্বপ্ন দেখেছিলাম, এখন দেখি তার উস্টা হয়েছে। এর একটা পরিবর্তন করা দরকার। জনগণ আমাদের জানত এবং আমাদের কাছেই প্রশ্ন করত। স্বাধীন হয়েছে দেশ, তবু মানুষের দুঃখ-কষ্ট দূর হবে

কেন? দুনীতি বেড়ে গেছে, খাদ্যাভাব দেখা দিয়েছে। বিনা বিচারে রাজনৈতিক কর্মীদের জেলে বন্ধ করে রাখা হচ্ছে। বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসাবে মুসলিম লীগ নেতারা মানবে না। পশ্চিম পাকিস্তানে শিল্প কারখানা গড়া শুরু হয়েছে। পূর্ব পাকিস্তানের দিকে নজর দেওয়া হচ্ছে না। রাজধানী করাচি। সব কিছুই পশ্চিম পাকিস্তানে। পূর্ব বাংলায় কিছু নাই। আব্বাকে সকল কিছুই বললাম। আব্বা বললেন, “আমাদের জন্য কিছু করতে হবে না। তুমি বিবাহ করেছ, তোমার মেয়ে হয়েছে, তাদের জন্য তো কিছু একটা করা দরকার।আমি আব্বাকে বললাম, “আপনি তো আমাদের জন্য জমিজমা যথেষ্ট করেছেন, যদি কিছু না করতে পারি, বাড়ি চলে আসব। তবে অন্যায়কে প্রশ্রয় দেওয়া চলতে পারে না। আমাকে আর কিছুই বললেন না। রেণু বলল, “এভাবে তোমার কতকাল চলবে। আমি বুঝতে পারলাম, যখন আমি ওর কাছে এলাম। রেণু আড়াল থেকে সব কথা শুনছিল। রেণু খুব কষ্ট করত, কিন্তু কিছুই বলত না। নিজে কষ্ট করে আমার জন্যে টাকা পয়সা জোগাড় করে রাখত যাতে আমার কষ্ট না হয়।

আমি ঢাকায় রওয়ানা হয়ে আসলাম। রেণুর শরীর খুব খারাপ দেখে এসেছিলাম। ইত্তেহাদের কাজটা আমার ছিল। মাঝে মাঝে কিছু টাকা পেতাম, যদিও দৈনিক ইত্তেহাদের অবস্থা খুবই খারাপ হয়ে পড়েছিল। পূর্ব বাংলা সরকার প্রায়ই ব্যান্ড করে দিয়েছিল। এজেন্টরা টাকা দেয় না। পূর্ব বাংলায় কাগজ যদিও বেশি চলত।

 

৪৪.

ঢাকায় এসে ছাত্রলীগের বার্ষিক সম্মেলন যাতে তাড়াতাড়ি হয় তার ব্যবস্থা করলাম। এর পূর্বে আর কাউন্সিল সভা হয় নাই। নির্বাচন হওয়া দরকার, আর আমিও বিদায় নিতে চাই। ঢাকার তাজমহল সিনেমা হলে কনফারেন্স হল আমার সভাপতিত্বে। আমি আমার বক্তৃতায় বললাম, “আজ থেকে আমি আর আপনাদের প্রতিষ্ঠানের সভ্য থাকব না। ছাত্র প্রতিষ্ঠানের সাথে জড়িত থাকার আর আমার কোনো অধিকার নাই। আমি আপনাদের কাছ থেকে বিদায় নিচ্ছি। কারণ আমি আর ছাত্র নই। তবে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ যে নেতৃত্ব দিয়েছে, পূর্ব বাংলার লোক কোনোদিন তা ভুলতে পারবে না। বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষার জন্য যে ত্যাগ স্বীকার আপনারা করেছেন এদেশের মানুষ চিরজীবন তা ভুলতে পারবে না। আপনারাই এদেশে বিরোধী দল সৃষ্টি করেছেন। শক্তিশালী বিরোধী দল না থাকলে গণতন্ত্র চলতে পারে না। এটাই ছিল বক্তৃতার সারাংশ। একটা লিখিত ভাষণ আমি দিয়েছিলাম, আমার কাছে তার কপি নাই। নির্বাচন হয়েছিল, দবিরুল ইসলাম তখন জেলে ছিল। তাকে সভাপতি ও খালেক নেওয়াজ খানকে সাধারণ সম্পাদক করা হয়েছিল। দবিরুল সম্বন্ধে কারও আপত্তি ছিল না, তবে খালেক নেওয়াজ খান সম্বন্ধে অনেকের আপত্তি ছিল। কারণ সে কথা একটু বেশি বলত। শেষ পর্যন্ত আমি সকলকে বুঝিয়ে রাজি করলাম। আমার বিদায়ের সময়ের অনুরোধ কেউই ফেলল না। আমি স্বীকার করতে বাধ্য হচ্ছি, আমার মনোনীত প্রার্থী খালেক নেওয়াজ প্রতিষ্ঠানের মঙ্গলের চেয়ে অমঙ্গলই বেশি করেছিল। সে চেষ্টা করত সত্য, কিন্তু কোন সিদ্ধান্ত দেওয়ার ক্ষমতা তার ছিল না। আর অন্যের কথা শুনত, নিজে ভাল কি মন্দ বিবেচনা করত না, বা করার ক্ষমতা ছিল না। একমাত্র ঢাকা সিটি ছাত্রলীগের সম্পাদক আবদুল ওয়াদুদের জন্য প্রতিষ্ঠানের সমূহ ক্ষতি হতে পারে নাই। পরে ওয়াদুদ পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের সম্পাদক হয়েছিল। যদিও আমি সদস্য ছিলাম না, তবু ছাত্রনেতারা আমার সাথে যোগাযোগ রক্ষা করেছেন। প্রয়োজন মত বুদ্ধি পরামর্শ দিতে কার্পণ্য করি নাই। এরাই আমাকে ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠাতা হিসাবে শ্রদ্ধা করেছে।

শামসুল হক সাহেব অনেক পরিশ্রম করে একটা ড্রাফট ম্যানিফেস্টো ও গঠনতন্ত্রের খসড়া করেছেন। আমাদের নিয়ে তিনি অনেক আলোচনা করেছিলেন। আমরা একমত হয়ে ওয়ার্কিং কমিটির সভায় ম্যানিফেস্টো ও গঠনতন্ত্র নিয়ে আলোচনা শুরু করলাম। কয়েকদিন পর্যন্ত সভা হল। দুই একবার শামসুল হক সাহেবের সাথে ভাসানী সাহেবের একটু গরম গরম আলোচনা হয়েছিল। একদিন শামসুল হক সাহেব ক্ষেপে গিয়ে মওলানা সাহেবকে বলে বসলেন, “এ সমস্ত আপনি বুঝবেন না। কারণ, এ সমস্ত জানতে হলে অনেক শিক্ষার প্রয়োজন, তা আপনার নাই।” মওলানা সাহেব ক্ষেপে মিটিং স্থান ত্যাগ করলেন। আমি শামসুল হক সাহেবকে বুঝিয়ে বললে তিনি বুঝতে পারলেন, কথাটা সত্য হলেও বলা উচিত হয় নাই। ফলে হক সাহেব নিজে গিয়ে মওলানা সাহেবকে অনুরোধ করে নিয়ে আসলেন। শামসুল হক সাহেবের রাগ বেশি সময় থাকত না।

মওলানা ভাসানী সাহেবকে ভার দেওয়া হয়েছিল ওয়ার্কিং কমিটির সদস্যদের নমিনেশন দিতে। তিনি যে সমস্ত লোককে নমিনেশন দিয়েছিলেন তা আমার মোটেই পছন্দ ছিল না। তাকে আমি বললাম, “আপনি এ সমস্ত লোক কোথায় পেলেন, আর ওয়ার্কিং কমিটির সদস্য করলেন; এরা তো সুযোগ পেলেই চলে যাবে।” মওলানা সাহেব বললেন, “আমি কি করব? কাউকেই তো ভাল করে জানিও না, চিনিও না। তোমার ছাত্ররা যাদের নাম দিয়েছে, তাদেরই আমি সদস্য করেছি।” আমি বললাম, “দেখবেন বিপদের সময় এরা কি করে!” ওয়ার্কিং কমিটি ড্রাফট ম্যানিফেস্টো গ্রহণ করল এবং কাউন্সিল সভা ডেকে একে অনুমোদন করা হবে ঠিক হল। ড্রাফট ম্যানিফেস্টো ছাপিয়ে দেওয়া হবে, কারও কোন প্রস্তাব থাকলে তাও পেশ করা হবে। জনমত যাচাই করার জন্য আমরা ড্রাফট রাখলাম। তাতে পূর্ব পাকিস্তানকে পূর্ণ আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন দিবার প্রস্তাব করা হল। কেবলমাত্র দেশরক্ষা, বৈদেশিক নীতি ও মুদ্রা কেন্দ্রের হাতে থাকবে। বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করতে হবে এ কথাও বলা হল। আরও অনেক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রোগ্রাম নেওয়া হয়েছিল।

আমরা প্রতিষ্ঠানের কাজে আত্মনিয়োগ করলাম। মওলানা সাহেব, শামসুল হক সাহেব ও আমি ময়মনসিংহ জেলার জামালপুর মহকুমায় প্রথম সভা করতে যাই। জামালপুরের উকিল হায়দার আলী মল্লিক সাহেব আওয়ামী লীগ গঠন করেছেন। ছাত্রনেতা হাতেম আলী তালুকদার যথেষ্ট পরিশ্রম করেছিল এই সভা কামিয়াব করার জন্য। আমরা যখন সভায় উপস্থিত হলাম তখন বিরাট জনসমাগম হয়েছে দেখতে পারলাম। যখনই সভা আরম্ভ হবে, দশ-পনেরজন লোককে চিৎকার করতে দেখলাম। আমরা ওদিকে ভ্রুক্ষেপ না করে সভা আরম্ভ করলাম। জামালপুরের নেতারা ঠিক করেছিল শামসুল হক সাহেব সভাপতিত্ব করবেন আর মওলানা সাহেব প্রধান বক্তা হবেন। সভা আরম্ভ হওয়ার সাথে সাথেই ১৪৪ ধারা জারি করা হল। পুলিশ এসে মওলানা সাহেবকে একটা কাগজ দিল। আমি বললাম, “মানি না ১৪৪ ধারা, আমি বক্তৃতা করব।” মওলানা সাহেব দাঁড়িয়ে বললেন, “১৪৪ ধারা জারি হয়েছে। আমাদের সভা করতে দেবে না। আমি বক্তৃতা করতে চাই না, তবে আসুন আপনারা মোনাজাত করুন, আল্লাহু আমিন।” মওলানা সাহেব মোনাজাত শুরু করলেন। মাইক্রোফোন সামনেই আছে। আধ ঘণ্টা পর্যন্ত চিৎকার করে মোনাজাত করলেন, কিছুই বাকি রাখলেন না, যা বলার সবই বলে ফেললেন। পুলিশ অফিসার ও সেপাইরা হাত তুলে মোনাজাত করতে লাগল। আধা ঘণ্টা মোনাজাতে পুরা বক্তৃতা করে মওলানা সাহেব সভা শেষ করলেন। পুলিশ ও মুসলিম লীগ ওয়ালারা বেয়াকুফ হয়ে গেল।

রাতে এক বাড়িতে খেতে গেলেন মওলানা সাহেব। রাগ, খাবেন না। তিনি থাকতে কেন শামসুল হক সাহেবের নাম প্রস্তাব করা হল সভাপতিত্ব করার জন্য। এক মহাবিপদে পড়ে গেলাম। মওলানা সাহেবকে আমি বুঝতে চেষ্টা করলাম, লোকে কি বলবে? তিনি কি আর বুঝতে চান? তাকে নাকি অপমান করা হয়েছে! শামসুল হক সাহেবও রাগ হয়ে বলেছেন, মওলানা সাহেব সকলের সামনে একথা বলছেন কেন? এই দিন আমি বুঝতে পারলাম মওলানা ভাসানীর উদারতার অভাব, তবুও তাঁকে আমি শ্রদ্ধা ও ভক্তি করতাম। কারণ, তিনি জনগণের জন্য ত্যাগ করতে প্রস্তুত। যে কোন মহৎ কাজ করতে হলে ত্যাগ ও সাধনার প্রয়োজন। যারা ত্যাগ করতে প্রস্তুত নয় তারা জীবনে কোন ভাল কাজ করতে পারে নাইএ বিশ্বাস আমার ছিল। আমি বুঝতে পেরেছিলাম যে, এদেশে রাজনীতি করতে হলে ত্যাগের প্রয়োজন আছে এবং ত্যাগ আমাদের করতে হবে পাকিস্তানের জনগণকে সুখী করতে হলে। মুসলিম লীগ সরকার নির্যাতন চালাবে এবং নির্যাতন ও জুলুম করেই ক্ষমতায় থাকতে চেষ্টা করবে। নির্যাতনের ভয় পেলে বেশি নির্যাতন ভোগ করতে হয়। এখনও মুসলিম লীগের নামে মানুষকে ধোকা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে কিছুটা; কিন্তু বেশি দিন ধোকা দেওয়া চলবে না। মুসলিম লীগের নামের যে মোহ এখনও আছে, জনগণকে বুঝাতে পারলে এবং শক্তিশালী সংগঠন গড়ে তুলতে পারলে মুসলিম লীগ সরকার অত্যাচার করতে সাহস পাবে না।

 

৪৫.

আমরা ঢাকায় ফিরে এলাম এবং আরমানিটোলা ময়দানে এক জনসভা ডাকলাম। কারণ তখন খাদ্য পরিস্থিতি খুবই খারাপ। লোকের দুরবস্থার সীমা নাই। মওলানা সাহেব সভাপতিত্ব করলেন। আতাউর রহমান খান, শামসুল হক সাহেব ও আমি বক্তৃতা করলাম। মুসলিম লীগ চেষ্টা করেছিল গোলমাল সৃষ্টি করতে। বাদশা মিয়া আমাদের দলে চলে আসায় এবং জনগণের সমর্থন থাকায় তারা সাহস পেল না। এতবড় সভা এর পূর্বে আর হয় নাই। বিরাট জনসমাগম হয়েছে। জনসাধারণ ও ঢাকার লোকের ভুল ভাঙতে শুরু করেছে। আর আমরা যারা বক্তৃতা করলাম সকলেই পাকিস্তান আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিলাম। আমাদের রাষ্ট্রের দুশমন’ বললে জনগণ মানতে রাজি ছিল না। কারণ আমরাই প্রথম কাতারের কর্মী ছিলাম।

মওলানা ভাসানী এই সভায় ঘোষণা করলেন, “জনাব লিয়াকত আলী খান ঢাকায় আসছেন অক্টোবর মাসে, আমরা তার সাথে খাদ্য সমস্যা ও রাজবন্দিদের মুক্তির ব্যাপার নিয়ে আলোচনা করতে চাই। যদি তিনি দেখা না করেন আমাদের সাথে, তাহলে আমরা আবার সভা করব এবং শোভাযাত্রা করে তার কাছে যাব।” কয়েকদিন পরেই আমরা কাগজে দেখলাম, লিয়াকত আলী খান ১১ই অক্টোবর ঢাকায় আসবেন। মওলানা সাহেব আমাকে টেলিগ্রাম করতে বললেন, যাতে তিনি ঢাকায় এসে আমাদের একটা ডেপুটেশনের সাথে সাক্ষাৎ করেন। মওলানা সাহেবের নামেই টেলিগ্রামটা পাঠানো হয়েছিল। জনাব শামসুল হক সাহেব একটু ব্যস্ত ছিলেন, কারণ তার বিবাহের দিন ঘনিয়ে এসেছে। আমাকেই পাটির সমস্ত কাজ দেখতে হত। যদিও তার সাথে পরামর্শ করেই করতাম। তিনি আমাকে বললেন, “প্রতিষ্ঠানের কাজ তুমি চালিয়ে যাও। আমাদের মধ্যে এত মিল ছিল যে কোন ভুল বোঝাবুঝির সম্ভাবনাই ছিল না। আমি বুঝতে পারতাম মওলানা সাহেব, হক সাহেবকে অপছন্দ করতে শুরু করেছেন। সুযোগ পেলেই তার বিরুদ্ধে বলতেন। আমি চেষ্টা করতাম, যাতে ভুল বোঝাবুঝি না হয়। যদিও মওলানা সাহেব প্রকাশ্যে কিছু বলতে সাহস পেতেন না। এই সময় একজনের অবদান অস্বীকার করলে অন্যায় করা হবে। বেগম আনোয়ারা খাতুন এমএলএ প্রতিষ্ঠানের জন্য যথেষ্ট কাজ করতেন। দরকার হলে টাকা পয়সা দিয়েও সাহায্য করতেন। আতাউর রহমান সাহেবকে ডাকলেই পাওয়া যেত। তিনি পূর্বে রাজনীতি করেন নাই এবং রাজনৈতিক জ্ঞানও তত ছিল না। লেখাপড়া জানতেন, কাজ করার আগ্রহ এবং আন্তরিকতা ছিল। আমার সাথে তার একটা সম্বন্ধ গড়ে উঠতে লাগল। জেলায় জেলায় সোহরাওয়ার্দী সাহেবের সমর্থকরা আওয়ামী লীগে যোগদান করতে শুরু করল। এই সময় কলকাতায় ইত্তেহাদ কাগজ বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। সোহরাওয়ার্দী সাহেব কলকাতা ত্যাগ করে করাচি চলে গিয়েছেন। মানিক ভাই ঢাকা এসে পৌঁছেছেন প্রায় নিঃস্ব অবস্থায়। তিনিও এসে মোগলটুলীতে উঠেছেন। সোহরাওয়ার্দী সাহেব সামান্য কিছু কাপড় ছাড়া আর কিছু নিয়ে আসতে পারেন নাই। ভারত সরকার তাঁর সর্ব ক্রোক করে রেখেছে। অনেকে শুনে আশ্চর্য হবেন, শহীদ সাহেবের কলকাতায় নিজের বাড়ি ছিল না। ৪০ নম্বর থিয়েটার রোডের বাড়ি, ভাড়া করা বাড়ি। তিনি করাচিতে তাঁর ভাইয়ের কাছে উঠলেন, কারণ তাঁর খাবার পয়সাও ছিল না।

ঢাকার পুরানা নেতাদের মধ্যে কামরুদ্দিন সাহেব যোগদান করেন নাই পার্টিতে। তবে আবদুল কাদের সর্দার আমাদের অর্থ দিয়েও সাহায্য করছিলেন। তাঁর অর্থবল ও জনবল দুইই ছিল। ঢাকার খাজা বংশের সাথে জীবনভর মোকাবেলা করেছেন। গরিবদের সাহায্য করতেন, তাই জনসাধারণ তাকে ভালবাসত। আমরা এখনও জেলা কমিটিগুলি গঠন করতে পারি নাই। তবে দু’একটা জেলায় কমিটি হয়েছিল। চট্টগ্রামে এম, এ, আজিজ ও জহুর আহমদ চৌধুরীর নেতৃত্বে এবং যশোরে খড়কীর পীর সাহেব ও হাবিবুর রহমান এডভোকেটের নেতৃত্বে। মশিয়ুর রহমান সাহেব ও খালেক সাহেব সাহায্য করেছিলেন, কিন্তু প্রকাশ্যে তখনও যোগদান করেন নাই। ফরিদপুরে সালাম খান সাহেবের নেতৃত্বে অর্গানাইজিং কমিটি গঠন করা হয়েছে। ১৯৪৯ সালের ভিতরেই আমরা সমস্ত জেলায় প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলব ঠিক করেছি। ছুটি থাকলেই আমরা সমস্ত জেলায় বের হব। সাড়া যা পাচ্ছি তাতে আমাদের মধ্যে একটা নতুন মনোবলের সৃষ্টি হয়েছিল।

নবাবজাদা লিয়াকত আলী খান মওলানা সাহেবের টেলিগ্রামের উত্তর দেওয়ারও দরকার মনে করলেন না। আমরা জানতে পারলাম তিনি ১১ই অক্টোবর ঢাকায় আসবেন। তিনি প্রেস রিপোর্টারদের কাছে বললেন, “আওয়ামী লীগ কি তিনি জানেন না।”

আমরা ১১ই অক্টোবর আরমানিটোলা ময়দানে সভা আহ্বান করলাম। আমাদের একটা মাইক্রোফোন ছিল, যখন আমাদের কর্মীরা সভার প্রচার করছিল ঘোড়ার গাড়ি করে নবাবপুর রাস্তায়, তখন বেলা তিনটা কি চারটা হবে, একদল মুসলিম লীগ কর্মী-গুণ্ডাও বলতে পারা যায়, আমাদের কর্মীদের মেরে মাইক্রোফোনটা কেড়ে নিয়ে যায়। একটা ঘোড়ার গাড়িতে মাত্র তিনজন কর্মী ছিল। কোন আইনশৃঙ্খলা দেশে নাই বলে মনে হচ্ছিল। কর্মীরা এসে আমাকে খবর দিল মোগলটুলী আওয়ামী লীগ অফিসে। আমি আট-দশজন কর্মী নিয়ে আলোচনা করছিলাম। আমাদের কর্মীরা কয়েকজনের মুখ চিনতে পেরেছে, কারণ পূর্বে একসাথেই কাজ করেছে। আমি বললাম, “এ তো বড় অন্যায়। চল, আমি এদের কাছে জিজ্ঞাসা করে আসি আর অনুরোধ করি মাইক্রোফোনটা ফেরত দিতে। যদি দেয় ভাল, না দেয় কি করা যাবে! থানায় একটা এজাহার করে রাখা যাবে। আমার সাথে ছাত্রলীগের নূরুল ইসলাম (পরে ইত্তেফাঁকে কাজ করত), আর চকবাজারের নাজির মিয়া এবং আবদুল হালিম (এখন ন্যাপের যুগ্ম সম্পাদক। তখন সিটি আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক ছিল) আমরা ভিক্টোরিয়া পার্কের কাছে ওদের অফিসে রওয়ানা হলাম। কারণ, আমি খবর নিলাম ওরা ওখানেই আছে। কো-অপারেটিভ ব্যাংকের উপর তলায়ই তারা ওঠাবসা করে। আমি সেখানে পৌঁছে দেখলাম, ওদের কয়েকজন দাঁড়িয়ে আলাপ করছে। আমি ইব্রাহিম ও আলাউদ্দিনকে চিনতাম, তারাও মুসলিম লীগের কর্মী ছিল আমাদের সাথে। বললাম, “আমাদের মাইক্রোফোনটা নিয়েছ কেন? এ তো বড় অন্যায় কথা! মাইক্রোফোনটা দিয়ে দাও।” আমাকে বলল, “আমরা নেই নাই, কে নিয়েছে জানি না“। নূরুল ইসলামের কাছ থেকেই কেড়ে নেবার সময় এরা উপস্থিত ছিল। নূরুল ইসলাম বলল, “আপনি তো দাঁড়ান ছিলেন, তখন কথা কাটাকাটি চলছিল।”

এই সময় ইয়ার মোহাম্মদ খান, হাফিজুদ্দিন নামে আরেকজন আওয়ামী লীগ কর্মীকে নিয়ে রিকশায় যাচ্ছিলেন। আমি ইয়ার মোহাম্মদ সাহেবকে ডাক দিলাম এবং বললাম ঘটনাটা।  ইয়ার মোহাম্মদ খান সাহেব ঢাকার পুরানা লোক। বংশমর্যাদা, অর্থ বল, লোকবল সকল কিছুই তাঁর আছে। তিনি বললেন, “কেন তোমরা মাইক্রোফোনটা কেড়ে নিয়েছ, এটা কি মগের মুল্লুক”। এর মধ্যে একজন বলে বসল, “নিয়েছি তো কি হয়েছে?” ইয়ার মোহাম্মদ হাত উঠিয়ে ওর মুখে এক চড় মেরে দিলেন। হালিমও এক ঘুষি মেরে দিল। পিছনে ওদের অনেক লোক লুকিয়ে ছিল, তারা আমাদের আক্রমণ করল। হালিম ওদের কাছ থেকে ছুটে ওর মহল্লার দিকে দৌড় দিল লোক আনতে। প্রেসিডেন্সি লাইব্রেরীর মালিক হুমায়ুন সাহেব বের হয়ে ইয়ার মোহাম্মদ খানকে তার লাইব্রেরীর ভিতরে নিয়ে গেলেন। এরা বাইরে বসে গালাগালি শুরু করল। আমিও রিকশা নিয়ে ছুটলাম আওয়ামী লীগ অফিসে, সেখানেও আমাদের দশ-বারজন কর্মী আছে। ওরা ঠিক পায় নাই—আমি যখন চলে আসি, না হলে আমাকেও আক্রমণ করত। হাফিজুদ্দিন রিকশা নিয়ে ইয়ার মোহাম্মদ খান সাহেবের মহল্লায় খবর দিল। সাথে সাথে তার ভাই, আত্মীয়স্বজন মহল্লার লোক যে যে অবস্থায় ছিল এসে হাজির হল। ভিক্টোরিয়া পার্কে হালিমও তার মহল্লা থেকে লোক নিয়ে হাজির হল। যারা এতক্ষণ ইয়ার মোহাম্মদ খানকে গালাগালি করছিল কে কোথা দিয়ে পালাল খুঁজে পাওয়া গেল না।

খাজা বাড়ির অনেক লোক এদের সাথে ছিল। একজন মন্ত্রীও উপরের তলায় বসে সব কিছু দেখছিলেন, তাঁর দলের কীর্তিকলাপ। আমি এসে দেখলাম, পুলিশ এসে গেছে। ইয়ার মোহাম্মদকে নিয়ে এরা শোভাযাত্রা করে মহল্লায় যেয়ে মুসলিম লীগ অফিস আক্রমণ করল। কারণ লীগ অফিস রায় সাহেবের বাজারেই ছিল। কয়েকজন গুপ্তা প্রকৃতির লোক এই মহল্লায় ছিল। গুণ্ডামি করত, ছাত্রদের মারত টাকা খেয়ে। তাদের ধরে নিয়ে মহল্লায় বিচার বসল। ঢাকার মহল্লার বিচার ছিল, মসজিদে নিয়ে হাজির করত এবং বিচারে দোষী সাব্যস্ত হলে মারা হত—এটিই হল এদের কোর্টকাচারী। রায় সাহেবের বাজার দিয়ে কোন ছাত্র শোভাযাত্রা বা আমাদের কর্মীদের দেখলে আক্রমণ এবং মারপিট করা হত। অনেক কর্মী ও ছাত্রকে মার খেতে হয়েছে। এই দিনের পর থেকে আর কোনোদিন এই এলাকায় কেউ আমাদের মারপিট করতে সাহস পায় নাই।

 

৪৬.

ইয়ার মোহাম্মদ খানও এর পর থেকে সক্রিয় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করতে শুরু করলেন। তাতে আমাদের শক্তিও ঢাকা শহরে বেড়ে গেল। আমিও মহল্লায় মহল্লায় ঘুরে একদল যুবক কর্মী সৃষ্টি করলাম। এই সময় সমসাবাদ ও বংশালের একদল যুবক কর্মী আওয়ামী লীগে যোগদান করল। সমসাবাদও আরমানিটোলা ময়দানের পাশেই ছিল। আরমানিটোলার সভার বন্দোবস্ত এখন এরাই করতে শুরু করে। ফলে মুসলিম লীগ শত চেষ্টা করেও আর গোলমাল সৃষ্টি করতে পারছিল না আমাদের সভায়।

১১ই অক্টোবর আরমানিটোলায় বিরাট সভা হল। সমস্ত ময়দান ও আশপাশের রাস্তা লোকে ভরে গেল। শামসুল হক সাহেব বক্তৃতা করার পর আমি বক্তৃতা করলাম। মওলানা পূর্বেই বক্তৃতা করেছেন। আমি শেষ বক্তা। সভায় গোলমাল হবার ভয় ছিল বলে ভাসানী সাহেব প্রথমে বক্তৃতা করেছেন। ভাসানী সাহেব আমাকে বললেন, শোভাযাত্রা করতে হবে। সেইভাবে বক্তৃতা কর। আমি বক্তৃতা করতে উঠে যা বলার বলে জনগণকে একটা প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করলাম, “যদি কোন লোককে কেউ হত্যা করে, তার বিচার কি হবে?” জনগণ উত্তর দিল, “ফাঁসি হবে। আমি আবার প্রশ্ন করলাম, “যারা হাজার হাজার লোকের মৃত্যুর কারণ, তাদের কি হবে?” জনগণ উত্তর দিল, “তাদেরও সি হওয়া উচিত। আমি বললাম, “না, তাদের গুলি করে হত্যা করা উচিত।” কথাগুলি আজও আমার পরিষ্কার মনে আছে। তারপর বক্তৃতা শেষ করে বললাম, “চলুন আমরা মিছিল করি এবং লিয়াকত আলী খান দেখুক পূর্ব বাংলার লোক কি চায়!”

শোভাযাত্রা বের হল। মওলানা সাহেব, হক সাহেব ও আমি সামনে চলেছি। যখন নবাবপুর রেলক্রসিংয়ে উপস্থিত হলাম, তখন দেখলাম পুলিশ রাস্তা বন্ধ করে দিয়ে বন্দুক উঁচা করে দাঁড়িয়ে আছে। আমরা আইন ভাঙবার কোনো প্রোগ্রাম করি নাই। আর পুলিশের সাথে গোলমাল করারও আমাদের ইচ্ছা নাই। আমরা রেল স্টেশনের দিকে মোড় নিলাম শোভাযাত্রা নিয়ে। আমাদের প্ল্যান হল নাজিরাবাজার রেললাইন পার হয়ে নিমতলিতে ঢাকা মিউজিয়ামের পাশ দিয়ে নাজিমুদ্দীন রোড হয়ে আবার আরমানিটোলা ফিরে আসব। নাজিরাবাজারে এসেও দেখি পুলিশ রাস্তা আটক করেছে, আমাদের যেতে দেবে না। তখন নামাজের সময় হয়ে গেছে। মওলানা সাহেব রাস্তার উপরই নামাজে দাঁড়িয়ে পড়লেন। শামসুল হক সাহেবও সাথে সাথে দাঁড়ালেন। এর মধ্যেই পুলিশ টিয়ার গ্যাস ছেড়ে দিল। আর জনসাধারণও ইট ছুঁড়তে শুরু করল। প্রায় পাঁচ মিনিট এইভাবে চলল। পুলিশ লাঠিচার্জ করতে করতে এগিয়ে আসছে। একদল কর্মী মওলানা সাহেবকে কোলে করে নিয়ে এক হোটেলের ভিতরে রাখল। কয়েকজন কর্মী ভীষণভাবে আহত হল এবং গ্রেফতার হল। শামসুল হক সাহেবকেও গ্রেফতার করল। আমার উপরও অনেক আঘাত পড়ল। একসময় প্রায় বেহুশ হয়ে একপাশের নর্দমায় পড়ে গেলাম। কাজী গোলাম মাহাবুবও আহত হয়েছিল, তবে ওর হুঁশ ছিল। আমাকে কয়েকজন লোক ধরে রিকশায় উঠিয়ে মোগলটুলী নিয়ে আসল। আমার পা দিয়ে খুব রক্ত পড়ছিল। কেউ বলে, গুলি লেগেছে, কেউ বলে গ্যাসের ডাইরেক্ট আঘাত, কেউ বলে কেটে গেছে পড়ে যেয়ে। ডাক্তার এল, ক্ষতস্থান পরিষ্কার করল। ইনজেকশন দিয়ে আমাকে ঘুম পাড়িয়ে দিল, কারণ বেদনায় খুব কষ্ট পাচ্ছিলাম। প্রায় ত্রিশজন লোক গ্রেফতার হয়েছিল। চট্টগ্রামের ফজলুল হক বিএসসি, আবদুর রব ও রসুল নামে আরেকজন কর্মী মাথায় খুব আঘাত পেয়েছিল। তারাও গ্রেফতার হয়ে গিয়েছিল। আমার আত্মীয়, ফরিদপুরের দত্তপাড়ার জমিদার বংশের সাইফুদ্দিন চৌধুরী ওরফে সূর্য মিয়া আমার কাছেই ছিল এবং আমাকে খুব সেবা করল। সে রাত দুইটা পর্যন্ত জেগে ছিল। এমন সময় মোগলটুলীর আমাদের অফিস, যেখানে আমি আছি, পুলিশ ঘিরে ফেলল এবং দরজা খুলতে বলছিল। লোহার দরজা, ভিতরে তালা-খোলা ও ভাঙা এত সহজ ছিল না। সাইফুদ্দিন চৌধুরী আমাকে, কাজী গোলাম মাহাবুব ও মফিজকে ডেকে উঠাল এবং বলল, “পুলিশ এসেছে তোমাদের গ্রেফতার করতে।”

আমি যখন ঘুমিয়ে ছিলাম, ইনজেকশন নিয়ে, তখন ভাসানী সাহেব খবর দিয়েছিলেন, আমি যেন গ্রেফতার না হই। আমার শরীরে ভীষণ বেদনা, জ্বর উঠেছে, নড়তে পারছি না। কি করি, তবুও উঠতে হল এবং কি করে ভাগব তাই ভাবছিলাম। শওকত মিয়া আগেই সরে গেছে। রাস্তাঘাট তারই জানা। তিনতলায় আমরা থাকি, পাশেই একটা দোতলা বাড়ি ছিল। তিনতলা থেকে দোতলায় লাফিয়ে পড়তে হবে। দুই দালানের ভিতরে ফারাকও আছে। নিচে পড়লে শেষ হয়ে যাব। তবুও লাফ দিয়ে পড়লাম। কাজী গোলাম মাহাবুব ও মফিজও আমাকে অনুসরণ করল। সাইফুদ্দিন রাজনীতি করে না, তাকে কেউ চিনে না। সে একলাই থাকল। আমরা যখন ছাদ থেকে নামছি তখন পাশের বাড়ির সিড়ির উপর একটা বালতি ছিল। পায়ে লেগে সেটা নিচে পড়ে গেল। আর বাড়িওয়ালা চিঙ্কার করে উঠল। আমরা চুপ করে দাঁড়িয়ে পড়লাম। পুলিশ দরজা ভাঙতে ব্যস্ত, এদিকে নজর নাই। আমরা বস্তি পার হয়ে বড় রাস্তায় পড়ব এমন সময় পুলিশও দরজা ভেঙে ঢুকে পড়েছে। আমাদের মৌলভীবাজারের ভিতর ঢুকতে হবে। তিনজন পুলিশ এই রাস্তা পাহারা দিছিল। একবার তিনজন হেঁটে এপাশে আসে, আবার অন্যদিকে যায়। আমরা যখন দেখলাম, তিনজন হেঁটে সামনে অগ্রসর হচ্ছে তখন পিছন থেকে রাস্তা পার হয়ে গেলাম। ওরা বুঝতে পারল না। মৌলভীবাজার পার হয়ে আমরা এগিয়ে এসে এক বন্ধুর বাড়িতে আশ্রয় নিলাম। রাতটা সেখানেই কাটালাম। ভোরে ওদের দুইজনকে বিদায় দিলাম। কারণ, ওদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা নাই। সামনে পেলে গ্রেফতার করতে পারে। আমি আবদুল মালেক সর্দারের মাহুতটুলির বাড়িতে রইলাম। সেখান থেকে আমি পরের দিন সকালে ক্যাপ্টেন শাহজাহানের বাড়িতে উপস্থিত হলাম। তার স্ত্রী বেগম নূরজাহান আমাকে ভাইয়ের মত স্নেহ করতেন। তিনি রাজনীতি করতেন না। আমি আহত ও অসুস্থ, কোথায় যাইআর কেইবা জায়গা দেয় তখন ঢাকায়! ভদ্রমহিলা আমার যথেষ্ট সেবা করলেন, ডাক্তারের কাছ থেকে ঔষধ আনালেন।

দুই দিন ওখানে ছিলাম। আইবির লোকেরা সন্দেহ করল, আমি এ বাড়িতে থাকতে পারি, কারণ প্রায়ই আমি এ বাড়িতে বেড়াতে আসতাম। দুইজন আইবি অফিসার এদের এখানে এসেছে রাত আটটায়। ঠিক এই সময় একজন কর্মী সেখানে উপস্থিত হয়ে বেগম নূরজাহানকে জিজ্ঞাসা করতে যাবে আমি কোথায়—আইবি অফিসারদের দেখে তার মুখের ভাব এমন হয়ে গেল যে, তাদের আর বুঝতে বাকি রইল না, আমি কোথায় আছি। আমি কিন্তু পাশের ঘরেই শুয়ে আছি আর এদের আলাপ শুনছি। বেগম নূরজাহান খুবই চালাক ও বিচক্ষণ। তিনি ওদের চা খেতে দিয়ে আমাকে ডেকে দোতলা থেকে নিচে নিয়ে গেলেন এবং বললেন অবস্থাটা। আমি বললাম, “একটা চাদর দেন। কারণ, আমার একটা পাবি ও লুঙ্গি ছাড়া আর কিছুই ছিল না। ভাগ্য ভাল, ভদ্রমহিলা নিজেই দিনে এই দুইটাকে ধুয়ে দিয়েছিলেন। চাদর এনে আমাকে নিয়ে রাস্তা দেখিয়ে দিলেন। আমি বেরিয়ে আসলাম, আইবিরা তখনও বাড়িতেই বসে আছে। এই অফিসারদের দুইজন গার্ডও বাইরে পাহারা দিচ্ছিল, আমি বুঝতে পারলাম। তাদের চোখকেও আমার ফাঁকি দিতে হল।

তখন মওলানা ভাসানী ইয়ার মোহাম্মদ খানের বাড়িতে থাকতেন। তাঁর সাথে আমার দেখা করা দরকার; কারণ তাঁকে এখনও গ্রেফতার করা হয় নাই। তাকে জিজ্ঞাসা করা দরকার, তিনি কেন আমাকে গ্রেফতার হতে নিষেধ করেছেন? আমি পালিয়ে থাকার রাজনীতিতে বিশ্বাস করি না। কারণ, আমি গোপন রাজনীতি পছন্দ করি না, আর বিশ্বাসও করি না। রিকশা করে এক সহকর্মীর বাড়িতে যেয়ে তাঁকে সাথে নিলাম এবং ইয়ার মোহাম্মদের বাড়ির উদ্দেশে রওয়ানা করলাম। পিছন দিক থেকে ঢুকবার একটা রাস্তা আছে, সেই রাস্তায় ছদ্মবেশে বাড়ির ভিতর ঢুকে পড়লাম। পাহারায় থাকা গোয়েন্দা বিভাগের লোকেরা আমাকে চিনতে পারল না। মওলানা সাহেব ও ইয়ার মোহাম্মদ আমাকে দেখে খুব খুশি হন। আমি অনেকটা সুস্থ হয়ে উঠেছি। মওলানা সাহেবকে জিজ্ঞাসা করলাম, “কি ব্যাপার, কেন পালিয়ে বেড়াব?”

নবাবজাদা লিয়াকত আলী খান লীগ সভায় ঘোষণা করলেন, “যো আওয়ামী লীগ করেগা, উসকো শের হাম কুচাল দে গা।” তিনি যদিও বলতেন, গণতন্ত্রে বিশ্বাস করেন, কিন্তু কোনো বিরুদ্ধ দল সৃষ্টি হোক তা তিনি চাইতেন না। তাঁর সরকারের নীতির কোন সমালোচনা কেউ করে তাও তিনি পছন্দ করতেন না। নিজের দলের মধ্যে কেউ বিরুদ্ধাচরণ করলে তাকেও বিপদে ফেলতে চেষ্টা করেছেন, যেমন নবাব মামদোত। পশ্চিম পাঞ্জাব সরকারের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন মামদোত। জিন্নাহর বিশ্বস্ত একজন ভক্ত ছিলেন। জিন্নাহর হুকুমে নবাবি ছেড়ে দিয়ে তিনি বিরাট সম্পত্তি ত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিলেন। লিয়াকত আলী খান যে মুসলিম লীগ ছাড়া অন্য কোন বিরোধী দল সৃষ্টি হোক চান না, তার প্রমাণ পরে তাঁর বক্তৃতার মধ্য থেকে ফুটে উঠেছিল। ১৯৫০ সালে মুসলিম লীগ কাউন্সিল সভায় তিনি ঘোষণা করেছিলেন:

I have always said, rather it has always been my firm belief, that the existence of the league not only the existence of the league, but its strength is equal to the existence and strength of Pakistan. So far, as I am concemed, I had decided in the very beginning, and I reaffirm it today, that I have always considered myself as the Prime Minister of the League. I never regarded myself as the Prime Minister chosen by the members of the Constituent Assembly.

তিনি জনগণের প্রধানমন্ত্রী হতে চান নাই, একটা দলের প্রধানমন্ত্রী হতে চেয়েছেন। রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক দল যে এক হতে পারে না, একথাও তিনি ভুলে গিয়েছিলেন। একটা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে অনেকগুলি রাজনৈতিক দল থাকতে পারে এবং আইনে এটা থাকাই স্বাভাবিক। দুঃখের বিষয়, লিয়াকত আলী খানের উদ্দেশ্য ছিল যাতে অন্য কোনো রাজনৈতিক দল পাকিস্তানে সৃষ্টি হতে না পারে। “যে আওয়ামী লীগ করেগা উসকো শের কুচাল দে গা”— একথা একমাত্র ডিকটেটর ছাড়া কোনো গণতন্ত্রে বিশ্বাসী লোক বলতে পারে না। জিন্নাহর মৃত্যুর পরে সমস্ত ক্ষমতার অধিকারী হয়ে তিনি ধরাকে সরা জ্ঞান করতে শুরু করেছিলেন।

মওলানা সাহেব আমাকে বললেন, “তুমি লাহোর যাও, কারণ সোহরাওয়ার্দী সাহেব লাহোরে আছেন। তাঁর এবং মিয়া ইফতিখারউদ্দিনের সাথে সাক্ষাৎ কর। তাঁদের বল পূর্ব বাংলার অবস্থা। একটা নিখিল পাকিস্তান পার্টি হওয়া দরকার। পীর মানকী শরীফের সাথে আলোচনা করে সোহরাওয়ার্দী সাহেবের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগকে সারা পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে পারলে ভাল হয়। সোহরাওয়ার্দী সাহেব ছাড়া আর কেউ এর নেতৃত্ব দিতে পারবেন না।”

করাচি থেকে লিয়াকত আলী খান সোহরাওয়ার্দী সাহেবকে অকথ্য ভাষায় গাল দিয়ে বলেছেন, “ভারত কুকুর লেলিয়ে দিয়েছে। অথচ জিন্নাহ সাহেব সোহরাওয়ার্দী সাহেবকে একদিনের জন্যেও মন্দ বলেন নাই। একেই বলে অদৃষ্টের পরিহাস! লিয়াকত আলী খানকে নির্বাচনে পাস করাতে সমগ্র আলিগড়ে মুসলিম ছাত্রদের নামতে হয়েছিল। রফি আহমেদ কিদোয়াই প্রায়ই তাকে পরাজিত করে দিয়েছিলেন, যদি মুসলিম ছাত্ররা আলিগড় থেকে না যেত। জিন্নাহর ছায়ায় বসে দিল্লি থেকে বিবৃতি দেওয়া ছাড়া তিনি কি যে করেছেন পাকিস্তান আন্দোলনে, আমার জানা নাই। সোহরাওয়ার্দী সাহেব বাংলার প্রধানমন্ত্রী না হলে আর মুসলিম লীগ গড়ে না তুললে কি যে হত তা বলা কষ্টকর। জিন্নাহ সাহেব সেটা জানতেন, তাই তিনি কিছুই বলেন নাই।

সোহরাওয়ার্দী সাহেব লাহোরে নবাব মামদোতের মামলা নিয়েছেন।১৯ এটাও লিয়াকত আলী সাহেবের কীর্তি! নবাব মামদোতকে বিপদে ফেলার জন্য আর একজনকে সাহায্য করা। কারণ নবাব মামদোত একটু কমই গ্রাহ্য করতেন লিয়াকত আলী খানকে। আমি ভাসানী সাহেবকে বললাম, “কি ভাবে যাব? ভারতবর্ষ হয়ে যেতে হবে। আমি যে পাকিস্তানী, তার প্রমাণ লাগবে, তাহলেই পশ্চিম পাকিস্তানে ঢুকতে দিবে। তখনও পাসপোর্ট ভিসা চালু হয় নাই। গরম কাপড়ও বাড়িতে রয়েছে। টাকা পয়সাও হাতে নাই। ওদিকে আবার পূর্ব পাঞ্জাবে মুসলমান পেলেই হত্যা করে। কি করে লাহোর যাব বুঝতে পারছি না। আমার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা ঝুলছে। খুঁজে বেড়াচ্ছে পুলিশ।” ভাসানী সাহেব বললেন, “তা আমি কি জানি! যেভাবে পার লাহোর যাও। সোহরাওয়ার্দী সাহেবের সাথে দেখা কর এবং তাঁকে সকল কিছু বল।” ১৯৪৯ সালের প্রথম দিকে ঢাকায় মওলানা ভাসানী, মিয়া ইফতিখারউদ্দিন, আরও অনেকে সোহরাওয়ার্দীর সাথে সাক্ষাৎ করেন এবং সিদ্ধান্ত নেন যদি মুসলিম লীগে কোটারি করা হয়, তবে নতুন পার্টি করা হবে। সোহরাওয়ার্দী সাহেব মত দেন। এখন শহীদ সাহেব ও মিয়া সাহেবের সাহায্য প্রয়োজন। তাঁদের সম্পর্ক ভাল।

আমি তাঁর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে চলে আসলাম। আমার একটা গরম আচকান ছাড়া আর কিছুই ছিল না। আমার মামা জাফর সাদেকের কাছ থেকে সামান্য কিছু টাকা ধার নিলাম। আর ইত্তেহাদে আমার কিছু টাকা পাওনা ছিল সেখান থেকে সামান্য কিছু পেলাম। তাই নিয়ে রওয়ানা করলাম। লাহোর পর্যন্ত কোনোমতে পৌঁছাতে পারলে হয়, সোহরাওয়াদ সাহেব আছেন কোন অসুবিধা হবে না। আমি অনেক কষ্টে লাহোর পৌঁছালাম। পূর্ব বাংলার পুলিশকে আমার অনেক কষ্টে ফাঁকি দিতে হয়েছিল। আমার জন্য অনেক বাড়ি খানা তল্লাশি হচ্ছিল। বাড়িতেও পুলিশ গিয়ে খবর এনেছে আমি বাড়ি যাই নাই।

 

৪৭.

লাহোরে তখন ভীষণ শীত। আমার তা সহ্য করা কষ্টকর হচ্ছিল। কোনোদিন লাহোর যাই নাই। মিয়া ইফতিখারউদ্দিন সাহেব ছাড়া কেউ আমাকে চিনত না। সোহরাওয়ার্দী সাহেব নবাব মামদোতের বাড়িতে থাকতেন, একথা আমি জানি। এক দোকানের সামনে মালপত্র রেখে আমি নবাব সাহেবের বাড়িতে ফোন করলাম। সেখান থেকে উত্তর এল, সোহরাওয়ার্দী সাহেব লাহোরে নাই, বাইরে গেছেন, দুই দিন পরে ফিরবেন। আমার কাছে মাত্র দুই টাকা আছে, কি করব? কোথায় যাব ভাবছিলাম, মালপত্রই বা কোথায় রাখি? বেলা তখন একটা, ক্ষিধেও লেগেছে, সকাল থেকে কিছুই পেটে পড়ে নাই। দুইটা টাকা মাত্র, কিছু খেলেই তো শেষ হয়ে যাবে। অনেক চিন্তা করে মিয়া সাহেবের বাড়িতে ফোন করলাম। মিয়া সাহেব লাহোরে আছেন, কিন্তু বাড়িতে নাই। আমি একটা টাঙ্গা ভাড়া করে মিয়া সাহেবের বাড়ির দিকে রওয়ানা করলাম। ঠিকানা লেখা ছিল। আমি যখন সুটকেস ও সামান্য বিছানা নিয়ে তাঁর বাড়ির সামনে নামলাম, দারোয়ান বলল, সাহেব বাড়িতে নাই। একটা বাইরের ঘরে বসতে দিল। সুটকেসটা বাইরেই একপাশে রেখে দিলাম। আমার নাম ও ঠিকানা কাগজে লিখে দিলাম, মিয়া সাহেব আসলে তাকে দিতে। মিয়া সাহেব এসে কাগজটা দেখেই বের হয়ে এলেন, আমাকে চিনলেন এবং খুব আদর করলেন। আমার অবস্থা দেখে তাড়াতাড়ি একটা রুম ঠিক করে দিয়ে গোসল করে নিতে বললেন। একসাথে খানা খাবেন এবং পূর্ব বাংলার অবস্থা শুনবেন। বরিশালের এস, এ. সালেহ মিয়া সাহেবকে ও শহীদ সাহেবকে চিঠি পাঠিয়েছিলেন এবং আমি যে লাহোর যেতে পারি একথাও জানিয়েছিলেন। সালেহ আমার বাল্যবন্ধু ও নূরুদ্দিন সাহেবের চাচাতো ভাই। পাকিস্তান আন্দোলনে একসাথে অনেক দিন কাজ করেছি। মিয়া সাহেব, বেগম সাহেবা ও আমি একসাথে খানা খেয়ে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্বন্ধে আলোচনা করলাম। পূর্ব বাংলার সকল খবর দিলাম। মওলানা ভাসানীর কথাও বললাম, সরকারের অত্যাচারের কাহিনীও জানালাম। মিয়া সাহেব মন্ত্রিত্ব ত্যাগ করেছেন, আমাকে বললেন, “দেখ, কিছুদিনের জন্য রাজনীতি আমি ছেড়ে দিয়েছি। সক্রিয় অংশগ্রহণ করব না, আমার নিজের কিছু কাজ আছে।”

তিনি আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, “মুসলিম লীগের অবস্থা কি?” আমি বললাম, “নির্বাচন হলেই মুসলিম লীগকে আমরা পরাজিত করতে পারব এবং সে পরাজয় হবে শোচনীয়।” মিয়া সাহেব বিশ্বাস করতে চাইলেন না। বেগম ইফতিখারউদ্দিন বললেন, “হলে হতেও পারে, কারণ কিছুদিন পূর্বেও তো এক আন্দোলন পূর্ব বাংলায় হয়ে গেল। বেগম সাহেবা রাজনীতি বুঝতেন এবং দেশ-বিদেশের খবরও রাখেন, যথেষ্ট লেখাপড়াও তিনি করেছেন বলে মনে হল।

রাতে আমার ভীষণ জ্বর হল। মিয়া সাহেব ব্যস্ত হয়ে ডাক্তার ভাকলেন। ঔষধ কিনে দিলেন, দুই দিনেই আমার জ্বর পড়ে গেল। মিয়া সাহেবের বাড়িতে এই একটাই অতিথিদের থাকবার ঘর ছিল। সোহরাওয়ার্দী সাহেবের ভাই প্রফেসর শাহেদ সোহরাওয়ার্দী লাহোরে আসবেন এবং মিয়া সাহেবের বাড়িতে থাকবেন। তাই দুই দিনের মধ্যেই আমার ছেড়ে যাওয়া উচিত হবে। আলাপ-আলোচনার মধ্যেই সেটা বুঝতে পারলাম।

মিয়া সাহেব আমার জন্য অন্য বন্দোবস্ত করতে রাজি আছেন জানালেন। সোহরাওয়ার্দী সাহেব ফিরে এসেছেন, ফোন করে জানলাম। আজ আর জ্বর নাই। ভীষণ শীত। বেলা এগারটার সময় নবাব সাহেবের বাড়িতে পৌঁছালাম। শহীদ সাহেব লনে বসে কয়েকজন এডভোকেটের সাথে মামলা সম্বন্ধে আলোচনা করছিলেন। আমি কাছে যেয়ে সালাম করতেই তিনি উঠে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরে আদর করলেন এবং জিজ্ঞাসা করলেন, “কিভাবে এসেছ? তোমার শরীর তো খুব খারাপ, কোথায় আছ?” আমাকে সকলের সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন। সকলকে বিদায় দিয়ে আমাকে নিয়ে বসলেন। আমি সকল ইতিহাস তাঁকে বললাম। প্রত্যেক কর্মী ও নেতাদের কথা জিজ্ঞেস করলেন। পূর্ব বাংলার অবস্থা কি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে তাও জিজ্ঞাসা করলেন। বাংলাকে তিনি যে কতটা ভালবাসতেন তার সাথে না মিশলে কেউ বুঝতে পারত না। শহীদ সাহেব বললেন, তার আর্থিক অবস্থার কথা। মামলাটা না পেলে খুবই অসুবিধা হত। তিনি আমাকে যেতে দিলেন না মিয়া সাহেবের বাসায়। একসাথে থানা খেলাম, নবাব মামদোত উপস্থিত ছিলেন। তাঁকেও আমাদের অবস্থার কথা বললেন। তিনিও পূর্ব পাকিস্তানের অবস্থা এক এক করে জিজ্ঞাসা করলেন।

বিকালবেলা খান গোলাম মোহাম্মদ খান লুথাের ও পীর সালাহউদ্দিন (তখন ছাত্র) শহীদ সাহেবের সাথে দেখা করতে এলেন। গোলাম মোহাম্মদ খান লুখোরকে সীমান্ত প্রদেশ থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে। তার সীমান্ত প্রদেশে যাওয়া নিষেধ। তিনি সীমান্ত আওয়ামী মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক। আমাকে পেয়ে তিনি খুব খুশি হলেন। শহীদ সাহেব তাকে বললেন, একটা হোটেল ঠিক করে দিতে, যেখানে আমি থাকব। অল্প খরচের হোটেল হলেই ভাল হয়। পীর সালাহউদ্দিন তখন পাঞ্জাবের ছাত্রনেতা। কর্মী হিসাবে তার নাম ছিল।

আমি রাতেই মিয়া সাহেবের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে হোটেলে চলে এলাম। মিয়া সাহেব বললেন, জায়গা থাকলে তোমাকে হোটেলে যেতে দিতাম না। আমি বললাম,

অসুবিধা হবে না।

শহীদ সাহেব আমাকে নিয়ে দোকানে গেলেন এবং বললেন, “কিছু কাপড় আমার বানাতে হবে, কারণ দুইটা মাত্র স্যুট আছে, এতে চলে না। তিনি নিজের কাপড় বানানোর হুকুম দিয়ে একটা ভাল কম্বল, একটা গরম সোয়েটার, কিছু মোজা ও মাফলার কিনে নিলেন এবং বললেন, কোনো কাপড় লাগবে কি না! আমি জানি শহীদ সাহেবের অবস্থা। বললাম, না আমার কিছু লাগবে না। তিনি আমাকে যখন গাড়িতে নিয়ে হোটেলে পৌঁছাতে আসলেন, জিনিসগুলি দিয়ে বললেন, “এগুলি তোমার জন্য কিনেছি। আরও কিছু দরকার হলে আমাকে বোলো।” গরম ফুলহাতার সোয়েটার ও কম্বলটা পেয়ে আমার জানটা বাঁচল। কারণ, শীতে আমার অবস্থা কাহিল হতে চলেছিল।

 

৪৮.

সকালেই শহীদ সাহেবের কাছে যেতাম আর রাতে ফিরে আসতাম। তাঁর সাথেই কোর্টে যেতাম। নবাব সাহেবের ভাইদের সাথেও আমার বন্ধুত্ব হয়ে উঠেছিল। এর তিন দিন পরে লুখোর সাহেব আমাকে এসে বললেন, “চল, আমরা ক্যাম্বেলপুর যাই। সেখানে সীমান্ত আওয়ামী লীগের কার্যকরী কমিটির সভা হবে। তুমি পীর মানকী শরীফ ও অন্যান্য নেতাদের সাথে আলোচনা করতে পারবে। আমিও তোমার সাথে একমত। আমাদের দুই প্রদেশের আওয়ামী লীগ নিয়ে একটা নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগ গঠন করা উচিত-সোহরাওয়ার্দী সাহেবের নেতৃত্বে।” আমরা দুইজন শহীদ সাহেবের কাছে এলাম। শহীদ সাহেব বললেন, “যাও, আলাপ করে এস। হলে তো ভালই হয়, আমিও পাঞ্জাবে নবাব সাহেবের সাথে আলাপ করেছি।”

শহীদ সাহেব আমাকে কিছু টাকা দিলেন। আমরা দুইজন একসাথে সুন্দখোর সাহেবের মোটর গাড়িতে চড়ে ক্যাম্বেলপুর রওয়ানা হলাম রাত দশটায়। লুখোর সাহেব নিজেই গাড়ি চালান। তিনি গাড়ি চালিয়ে রাওয়ালপিন্ডি পৌঁছালেন ভোের রাতের দিকে। আমরা বিশ্রাম করলাম, সকালে নাশতা করে আবার রওয়ানা করলাম ক্যাম্বেলপুরের দিকে। এগার-বারটার মধ্যে সেখানে পৌঁছালাম। এই আমার জীবনের প্রথম পাঞ্জাব প্রদেশের ভিতরে বেড়ান। আমার ভালই লাগল পঞ্চনদীর এই দেশটাকে।

পূর্ব পাঞ্জাব ও পশ্চিম পাঞ্জাবের ভয়াবহ দাঙ্গার স্মৃতি আজও মানুষ ভোলে নাই। লক্ষ লক্ষ মোহাজের এসেছে পশ্চিম পাঞ্জাবে, তবে বেশি অসুবিধা হয় নাই। কারণ পশ্চিম পাত্ৰাব থেকেও লক্ষ লক্ষ হিন্দু এবং শিখ চলে গিয়েছে। মুসলমানরা তা দখল করে নিয়েছে। ক্যাম্বেলপুর যাওয়ার পূর্বে আমি একটা বিবৃতি দিয়েছিলাম, পূর্ব বাংলায় কি হচ্ছে তার উপরে; মওলানা ভাসানী, শামসুল হক সাহেবের কারাগারে বন্দিত্ব, রাজনৈতিক কর্মীদের উপর নির্যাতন ও খাদ্য সমস্যা নিয়ে। পাকিস্তান টাইমস, ইমরোজ ভালভাবেই ছাপিয়ে ছিল। কারণ, মিয়া সাহেব তখন এই কাগজ দুইটির মালিক ছিলেন। এই সময় সম্পাদক ও বিখ্যাত কবি ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ ও তাঁর সহকর্মী জনাব মাজহারের সাথে আমার পরিচয় হয়। এই দুইজনকে বিদ্বান, বুদ্ধিমান ও জ্ঞানী বললে ভুল হবে না। বাংলা ভাষা অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হওয়া উচিত—মিয়া সাহেব ও ঐ দুইজনই তখন তা সমর্থন করেছিলেন। আমাদের দাবি যে ন্যায্য একথাও স্বীকার করেছিলেন। আমি বিবৃতি লিখে শহীদ সাহেবকে দেখিয়েছিলাম। তিনি দেখে দিয়েছিলেন।

আমরা ক্যাম্বেলপুর পৌঁছালাম। ডাকবাংলো পীর সাহেবের জন্য রিজার্ভ ছিল। কিছু সময়ের মধ্যে পেশোয়ার, মর্দান ও অন্যান্য জায়গা থেকে সীমান্ত আওয়ামী লীগের কর্মকর্তা ও সদস্যরা এসে পৌঁছালেন। এখানে সভা করার উদ্দেশ্য হল জনাব লুখোর পাত্ৰাব ছেড়ে সীমান্ত প্রদেশে যেতে পারেন না। এইখানেই আমার প্রথম পরিচয় হয় পীর মানকী শরীফ, সর্দার আবদুল গফুর, সর্দার সেকেন্দার, ভূতপূর্ব মন্ত্রী শামীম জং ও আরও অনেক নেতার সাথে। তাঁদের সভা অনেকক্ষণ চলল। আমাকে তাঁদের সভায় যোগদান করতে অনুমতি দিয়েছিলেন। ডাকবাংলোয়ই সভা হল। বন্দুকধারী দুইজন পাহারাদার ডাকবাংলো পাহারা দিয়েছিল, যাতে গোয়েন্দা বিভাগের কেউ কাছে আসতে না পারে। রাত পর্যন্ত সভা চলল, আমি সভায় বক্তৃতা করলাম ইংরেজিতে। এক ভদ্রলোকনাম মনে নাই, পশতুতে সকলকে বুঝিয়ে দিলেন। আমি যে নিখিল পাকিস্তানভিত্তিক প্রতিষ্ঠান গড়া উচিত বলে প্রস্তাব দিলাম এই নিয়ে আলোচনা শুরু হল। আমি বুঝতে পারলাম, প্রায় সকলেই শেষ পর্যন্ত রাজি হলেন। গোলাম মোহাম্মদ লুন্দখোরের বক্তৃতার পরে তারা সিদ্ধান্ত নিলেন, তিনজন প্রতিনিধি শহীদ সাহেবের সাথে আলোচনা করবেন এবং তাঁকে নেতৃত্ব নিতে অনুরোধ করবেন। রাতে সভা শেষ হল। আটক ব্রিজ পার হতে হলে বিশেষ অনুমতি প্রয়োজন হত। পীর সাহেবের অনুমতিপত্র ছিল, তিনি দলবল নিয়ে রাতেই চলে গেলেন। কয়েকজন ডাকবাংলোয় থাকল। লুখোর সাহেব আমাকে নিয়ে একটা ছোট্ট হোটেলে আসলেন। সেখানে খাওয়া-দাওয়া করে রাত কাটালাম। পাঞ্জাবের শীত যে কি ভয়ানক এই রাতে তা একটু বেশি বুঝলাম।

আমি পূর্ব বাংলার মানুষ, একটা গরম চাদর গায়ে দিয়েই শীতকাল কাটিয়ে দিতে পারি। এখানে তো গরম কাপড়ের ওপর গরম কাপড়, কম্বলের ওপর কম্বল তারপর ঘরের মধ্যে আগুন জ্বালিয়ে ঘুমানোর চেষ্টা করতে হয়; তবুও ঘুম হবে কি না বলা কষ্টকর। পীর সাহেব পূর্ব বাংলার অবস্থা শুনে খুবই দুঃখিত হলেন এবং আমাকে সীমান্ত প্রদেশে কাইয়ুম খান কি কি অত্যাচার করছে তাও বললেন। অনেক নেতা ও কর্মীকে জেলে দিয়েছে। কোন সভা করতে গেলেই ১৪৪ ধারা জারি করছে, লাঠিচার্জ ও গুলি করতে একটুও দ্বিধাবোধ করছে না। অত্যাচার চরম পর্যায়ে চলে গেছে। পূর্ব বাংলার অত্যাচার সীমান্তের অত্যাচারের কাছে কিছুই না বলতে হবে। লুখোরকে জেলে দিয়েছিল। মুক্তি দিয়ে সীমান্ত প্রদেশের সীমানা পার করে দিয়েছে। এখন তিনি লাহোরে আছেন।

পরের দিন সকালে আমরা রওয়ানা করলাম। আমি অনুরোধ করলাম, এত কাছে এসে আটক ব্রিজ ও আটক ফোর্ট না দেখে যাই কি করে! মাত্র কয়েক মাইল। লুন্দােের সাহেব রাজি হলেন, আমাকে আটক ব্রিজে নিয়ে গেলেন। আমি ব্রিজ পার হয়ে সীমান্ত প্রদেশে ঢুকলাম। লুন্দরে সাহেব একজন লোক সাথে দিয়েছিলেন। ছোট্ট ছোট্ট কয়েকটা ফলের দোকান। ফল কিনে নিয়ে ফিরলাম। আটক ফোর্টের ভিতরে যাওয়ার অনুমতি লাগে, কারণ কিছু যুদ্ধবন্দি সেখানে আছে। কয়েকজন শিখকে কাজ করতে দেখলাম দূর থেকে। আমি ফিরে আসার পরে আবার লুবোর সাহেব গাড়ি ছাড়লেন লাহোরের দিকে। আবার রাওয়ালপিন্ডি ফিরে এলাম। এখানেই বিশ্রাম করলাম কিছু সময়। লুন্দখোর সাহেবকে অনেক লোকে জানে দেখলাম। তিনি মাঝে মাঝে গাড়ি রেখে হুক্কা খান। যেখানেই তিনি গাড়ি থামান—কোনো হোটেল বা রেস্টুরেন্টে ঢুকলে প্রথমেই হুক্কা এনে সামনে। দেয় খান সাহেবের। এরা প্রায় সকলেই সীমান্ত প্রদেশের লোক বলে মনে হল। আমরা ঝিলাম, গুজরাট ও গুজরানওয়ালায় থেমে চা খেয়েছি। রাত প্রায় দশটায় লাহোরে পৌঁছালাম। আমাকে হোটেলে দিয়ে তিনি চলে গেলেন এবং বললেন, আগামীকাল সকালে আমাকে নিয়ে সোহরাওয়ার্দী সাহেবের কাছে যাবেন এবং কি সিদ্ধান্ত হয়েছে রিপোর্ট দিবেন।

এই সময় পাঞ্জাবের নবাব মামদোতের দলের মুসলিম লীগে স্থান হয় নাই। তিনি তখনও কোন দল করেন নাই। তবে করবেন ভাবছেন, তার প্রোভা মামলা শেষ হবার পরে। অনেক ভাল ভাল কর্মী ও নেতা শহীদ সাহেবের কাছে আসা যাওয়া শুরু করেছেন, তাঁরা সকলেই প্রায় পুরানা লীগ কর্মী। শহীদ সাহেব একটা জনসভায় যোগদান করবেন বলে মত দিয়েছেন। আমরা মোটরে গিয়েছিলাম। সারগোদা জেলায় এই সভা হবে। আমাকে বললেন সাথে যেতে। আমার কাজ কি! রাজি হলাম। সারগোদায় অনেক মোহাজের এসেছে, তাদের দুরবস্থার সীমা নাই। শহীদ সাহেব বক্তৃতা করলেন। আমাকে বক্তৃতা করতে অনেকে অনুরোধ করলেন, আমি বললাম, “স্যার, না জানি উর্দু, না জানি পাঞ্জাবি; ইংরেজিতে কেউ বুঝবে না, কি বক্তৃতা করব!” তিনি বললেন, থাক, প্রয়োজন নাই। আমাকে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হল। আমি সালাম জানিয়ে বসে পড়লাম। সুদূর সারগোদা জেলায়ও শহীদ সাহেব জনপ্রিয় ছিলেন এইবার প্রথম বুঝলাম।

লাহোরে যে হোটেলে আমি থাকতাম তার দুইটা রুম ভাড়া নিয়ে মিস্টার আজিজ বেগ ও মিস্টার খুরশিদ (যিনি আজাদ কাশ্মীরের প্রেসিডেন্ট ছিলেন) সাপ্তাহিক গার্ডিয়ান কাগজ বের করতেন। এরা পাকিস্তান টাইমসে আমার বিবৃতি দেখেছিলেন এবং বিবৃতির কিছু কিছু অংশ গার্ডিয়ান কাগজে প্রকাশ করেছিলেন। আমি তাদের সাথে দেখা করলাম এবং সকল বিষয় আলোচনা করলাম। গার্ডিয়ান প্রতিনিধি আমার সাথে দেখা করে একটা সাক্ষাতের রিপোর্ট বের করলেন। আস্তে আস্তে লাহোরের রাজনীতিবিদরাও জানতে পারলেন, আমি লাহোরে আছি। গোয়েন্দা বিভাগও যে আমার পিছু লেগেছে সে খবরও হোটেলের ম্যানেজার আমাকে বলে দিলেন এবং আরও বললেন, সকল সময়ের জন্য একজন লোক আপনাকে অনুসরণ করছে। আমি তো টাঙ্গায় বা হেঁটে চলতাম, ওরা আমাকে সাইকেলে অনুসরণ করত। পীর সালাহউদ্দিনের মারফতে আমি পাঞ্জাব মুসলিম ছাত্র ফেডারেশনের এক প্রতিনিধির সাথে সাক্ষাৎ করলাম এবং অল পাকিস্তান ছাত্র প্রতিষ্ঠান হওয়া দরকার এ বিষয়ও আলোচনা করলাম। মিস্টার ফাহমী, মিস্টার নূর মোহাম্মদ (দিল্লি থেকে এসেছেন) এবং আরও কয়েকজন ছাত্রনেতা তখন প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা ছিলেন, তারাও আমার সাথে একমত হলেন। আমি কয়েকদিন তাঁদের ল’কলেজ হোস্টেলে গিয়েও আলাপ করলাম। আমি তাঁদের বললাম, “যদিও আমি এখন আর ছাত্র প্রতিষ্ঠানে নাই, তবুও আপনারা যদি রাজি হন অল পাকিস্তান ছাত্র প্রতিষ্ঠান করতে, পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগকে রাজি করাতে পারব। তারা রাজি হলেন এবং কিভাবে তা গঠন হবে সে পস্থাও ঠিক হল। তাঁরা একটা গঠনতন্ত্র লিখে আমাকে দিলেন। আমি তাঁদের কথা দিলাম ঢাকা যেয়েই ছাত্রলীগ নেতাদের মাঝে আমি পৌঁছে দিব আপনাদের মতামত। তারা আপনাদের কাছে চিঠি লিখবে এবং একসাথে পাঞ্জাব ও বাংলা থেকে ঘোষণা বের হবে।

 

৪৯.

এ সময় একটা দুঃখজনক ঘটনা ঘটে গেল। আমি একদিন মিয়া সাহেবের সাথে দেখা করতে পাকিস্তান টাইমসের অফিসে যাই। তখন প্রায় সকাল এগারটা। মিয়া সাহেব সেখানে নাই। আমি কিছু সময় দেরি করলাম। মিয়া সাহেব আসলেন না। আমার কাজ ছিল শহীদ সাহেবের সাথে। হাইকোর্টে যাব তার সাথে দেখা করতে। যখন আমি বের হয়ে কিছুদূর এসেছি, তিন চারজন লোক আমার কাছে এসে জিজ্ঞাসা করল, আমার বাড়ি কোথায়? আমি বললাম, “পূর্ব পাকিস্তানে।” হঠাৎ একজন আমার হাত, আর একজন আমার জামা ধরে বলল, “তোম পাকিস্তান কা দুশমন হ্যায়”। আরেকজন একটা হান্টার, অন্যজন একটা ছোরা বের করল। আমি হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে বললাম, “আপনারা আমাকে জানেন, আমি কে?” তারা বলল, “যা, জানতা হ্যায়।” আমি বললাম, “কথা শোনেন, কি হয়েছে বলুন, আর যদি লড়তে হয় তবে একজন করে আসুন।” একজন আমাকে ঘুষি মারল, আমি হাত দিয়ে ঘুষিটা ফিরালাম। অনেক লোক জমা হয়ে আছে। কয়েকজন ভদ্রলোক আমাকে জিজ্ঞাসা করল, কি হয়েছে? আমি বললাম, “কিছুই তো জানি না। এদের কাউকেও চিনিও না। আমি পূর্ব বাংলা থেকে এসেছি। পাকিস্তান টাইমস অফিসে এসেছিলাম মিয়া সাহেবের সাথে দেখা করতে। এরা কেন আমাকে মারতে চায়, বুঝতে পারলাম না। কয়েকজন ভদ্রলোক ও কয়েকজন ছাত্রও ছিল। তারা ওদের কি যেন বলল, আর একজন ওদের ওপর রাগ দেখাল, ওরা সরে পড়ল। আমি ল’কলেজ হোস্টেলে গেলাম, কাজমীকে খবর দিতে। কাজমী ছিল না হোস্টেলে। একটা টাঙ্গা নিয়ে হাইকোর্টে আসলাম সোহরাওয়ার্দী সাহেবের কাছে। কিছুই পেলাম না, ভীষণ রাগ হয়েছে। বিকালে তার সাথে নবাব সাহেবের বাড়িতে যেয়ে সকল ঘটনা বললাম। শহীদ সাহেব নবাব সাহেবকে জানালেন। সন্ধ্যার পূর্বেই হোটেলে চলে এলাম। কাজমী সন্ধ্যার পরে হোটেলে এসে সবকিছু শুনে নিজেই সেই জায়গায় চলে গেল কয়েকজন ছাত্র নিয়ে এবং দোকানদারদের কাছে জিজ্ঞাসা করল। তারা বলেছিল যে, যারা আমাকে আক্রমণ করেছিল তারা ঐ জায়গার কেউ নয়। বাইরের কোথাও থেকে এসেছিল। বোঝা গেল মুসলিম লীগ ওয়ালাদের কাজ। এখানেও গুণ্ডা লেলিয়ে দিয়েছে। লুথাের আমাকে বলল, “সাবধানে থেকো।”

আমি এই ঘটনা আর কাউকে বললাম না। নবাব সাহেবকে পাঞ্জাবের বড় বড় সরকারি কর্মচারীরা সম্মান করত। আমার উপর আক্রমণের কথাটা সেখানেও পৌঁছে ছিল। আমার অসুবিধা ছিল ভাল উর্দু বলতে পারতাম না। আর সাধারণ পাঞ্জাবিরাও ভাল উর্দু বলতে পারে না। পাঞ্জাবি ও উর্দু মিলিয়ে একটা খিচুড়ি বলে। যেমন আমি বাংলা ও উর্দু মিলিয়ে খিচুড়ি বলতাম। এই সময় পাঞ্জাবে প্রগতিশীল লেখকদের একটা কনফারেন্স হয়। মিয়া সাহেব আমাকে যোগদান করতে অনুরোধ করলেন। আমি যোগদান করলাম। লেখক আমি নই, একজন অতিথি হিসাবে যোগদান করলাম। কনফারেন্স দুই দিন চলল। লুথাের সাহেবও যোগদান করেছিলেন, বেচারার গাড়িটি বাইরে রেখে সভায় যোগদান করেছিলেন; কে বা কারা গাড়িটায় আগুন লাগিয়ে দিয়েছিল। লুথাের সাহেবের বাহনটাও নষ্ট হয়ে গেল। ইংরেজরা ১৯৪২ সালের আন্দোলনে তাঁর বাড়িটি পুড়িয়ে দিয়েছিল। কারণ, তখন তিনি সীমান্ত কংগ্রেসের সভাপতি ছিলেন। জেল থেকে বের হয়ে মুসলিম লীগে যোগদান করেছিলেন। লুথাের আমাকে বললেন, “লাহোরে এ সকল ঘটনা হয়ে থাকে, তবে আমি পাঠান, আমাকে এরা ভয় করে। সামনে কিছুই বলতে বা করতে সাহস পাবে না, তাই পিছন থেকে আঘাত করার চেষ্টা করছে।”

 

৫০.

প্রায় এক মাস হয়ে গেল, আর কতদিন আমি এখানে থাকব? “ঢাকায় মওলানা সাহেব, শামসুল হক সাহেব এবং সহকর্মীরা জেলে আছেন। সোহরাওয়ার্দী সাহেবকে বললাম। তিনি বললেন, “ঢাকায় পৌঁছার সাথে সাথেই তারা তোমাকে গ্রেফতার করবে। লাহোরে গ্রেফতার নাও করতে পারে।” আমি বললাম, “এখান থেকে গ্রেফতার করেও আমাকে ঢাকায় পাঠাতে পারে। কারণ লিয়াকত আলী সাহেবও ক্ষেপে আছেন। পূর্ব বাংলার সরকার নিশ্চয়ই চুপ করে বসে নাই। তারা কেন্দ্রীয় সরকারকে খবর পাঠিয়েছে পাঞ্জাব সরকারকে হুকুম দিতে। সে খবর এসে পৌঁছাতেও পারে। এখানেও আমি তো চুপ করে নাই। তাই যা হবার পূর্ব বাংলায় হোক, পূর্ব বাংলার জেলে ভাত পাওয়া যাবে, পাঞ্জাবের রুটি খেলে আমি বাঁচতে পারব না। রুটি আর মাংস খেতে খেতে আমার আর সহ্য হচেছ না। আর জেলে যদি যেতেই হবে, তাহলে আমার সহকর্মীদের সাথেই থাকব।” শহীদ সাহেব বললেন, তবে যাবার বন্দোবস্ত কর। কি করে কোন পথে যাবা, তিনি জিজ্ঞেস করলেন। আমি বললাম, “রাস্তা তো একটাই, পূর্ব পাঞ্জাব দিয়ে আমি যাব না। প্লেনে লাহোর থেকে দিল্লি যাব, সেখান থেকে ট্রেনে যাব। ভারতবর্ষ হয়ে যেতে হলে একটা পারমিটও লাগবে। ভারতের ডেপুটি হাইকমিশনার পারমিট দেওয়ার মালিক। লাহোরে তাদের অফিস আছে।” আমি আরও বললাম, “মিয়া সাহেবকে বলেছি, তিনি ডেপুটি হাইকমিশনারকে বলে দেবেন। কারণ, তাঁকে তিনি জানেন।” শহীদ সাহেব আমাকে প্রস্তুত হতে বললেন। এই সময় পূর্ব বাংলার সিএসএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ কয়েকজন বন্ধু লাহোরের সিভিল সার্ভিস একাডেমিতে ছিলেন। তাঁদের সাথে দেখা করতে গেলাম। অনেকের সাথে দেখা হল। একজন সরকারি দলের ছাত্রনেতা ছিলেন, তিনি বাংলা ভাষা আন্দোলনের বিরোধিতা করেছিলেন। আমার সাথে তাঁর পরিচয় ছিল। আমাকে বললেন, “আপনি আমার কাছে চা খাবেন। কারণ আমি বুঝতে পেরেছি লাহোরে এসে, যে বাংলা ভাষার দাবি আপনারা করেছিলেন তা ঠিক ছিল, আমিই ভুল করেছিলাম। বাঙালিদের এরা অনেকেই ঘৃণা করে।” আমি কোন আলোচনা করলাম না সেখানে বসে, কারণ সেটা উচিত না। এরা এখন সকলেই সরকারি কর্মচারী, কেউ কিছু মনে করতে পারেন।

আমি পারমিট পেলাম, দেরি হল না, কারণ মিয়া সাহেব বলে দিয়েছেন। পারমিটে ছিল, তিন দিনের মধ্যে ভারতবর্ষ ত্যাগ করতে হবে। তিন দিনের বেশি ভারতবর্ষে থাকতে পারব না। আমি হিসাব করে দেখলাম, তিন দিনের মধ্যেই পূর্ব বাংলায় ঢুকতে পারব। শহীদ সাহেব আমার হোটেলের টাকা শোধ করে দিলেন, দিল্লি পর্যন্ত প্লেনের টিকিট কিনে দিলেন। তখন ওরিয়েন্ট এয়ারওয়েজ ছিল পাকিস্তানে। আর সামান্য কিছু টাকা দিলেন, যাতে বাড়িতে পৌঁছাতে পারি। পাকিস্তানের টাকা বেশি নেওয়ার হুকুম নাই। বোধহয় তখন ছিল পঞ্চাশ টাকা পাকিস্তানী এবং পঞ্চাশ টাকা ভারতবর্ষের। ভারতবর্ষের টাকা পাওয়া কষ্টকর। সোহরাওয়ার্দী সাহেব নবাবজাদা জুলফিকারকে (নবাব সাহেবের ছোট ভাই) বললেন, আমাকে প্লেনে তুলে দিতে। কারণ, একটা খবর পেয়েছিলেন আমাকে গ্রেফতার করতে পারে এয়ারপোর্টে। আমাকে গ্রেফতার করলে যাতে শহীদ সাহেব তাড়াতাড়ি খবর পেতে পারেন, সেজন্যেই তাকে সঙ্গে দেওয়া হয়। আমাকে নিয়ে তিনি এয়ারপোর্ট পৌঁছালেন। আমার মালপত্র আলাদা করে রাখল দেখলাম। আমাকে একজন কর্মচারী উপরের একটা ঘরে নিয়ে গেলেন। আমার পারমিট দেখলেন। মালপত্র ভালভাবে তল্লাশি করলেন এবং বললেন, “আপনি এখানে বসুন, কোথাও যাবেন না।” নবাবজাদা জুলফিকার সাহেব আমার কাছে আসলেন এবং বললেন, “মনে হয় কিছু একটা করবে। প্লেন ছাড়ার সময় হয়ে গেছে কিন্তু প্লেন ছাড়ছে না।” প্যাসেঞ্জারদের একবার চড়তে দিল, আবার নামিয়ে নিয়ে আসল। বোধহয় উপরের হুকুমের প্রতীক্ষায় রয়েছে। নবাবজাদা খবর আনলেন এবং বললেন, আপনার ব্যাপার নিয়েই প্লেন দেরি হচ্ছে। এক ঘণ্টা পর প্লেন ছাড়ার অনুমতি পেল এবং আমাকে বলল, “আপনি যেতে পারেন। আমি নবাবজাদার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে প্লেনে উঠলাম এবং তাঁকে অনুরোধ করলাম, শহীদ সাহেবকে ঘটনাটা বলতে। আমি বুঝতে পারলাম, আমাকে যেতে দিবে, না আটক করবে, এই নিয়ে দেরি করছে। বোধহয় শেষ পর্যন্ত দেখল, বাংলার ঝাট পাঞ্জাবে কেন? তিন দিনের মধ্যেই ভারত ত্যাগ করতে হবে। পূর্ব বাংলা সরকারকে খবর দিলেই আমাকে হয় দর্শনায়, না হয় বেনাপোলে গ্রেফতার করতে পারবে। আমি যে ভারতবর্ষে থাকতে পারব না একথা পারমিটে লেখা আছে। কলকাতার সরকারি কর্মচারীরা খবর পেলে আমাকে কলকাতার জেলের ভাতও খাওয়াতে দ্বিধাবোধ করবে না, কারণ আমি শহীদ সাহেবের দলের মানুষ।

সোহরাওয়ার্দী সাহেবকে ছেড়ে আসতে আমার খুব কষ্টই হচ্ছিল, কারণ জীবনের বহুদিন তার সাথে সাথে ঘুরেছি। তার স্নেহ পেয়েছি এবং তাঁর নেতৃত্বে কাজ করেছি। বাংলাদেশে শহীদ সাহেবের নাম শুনলে লোকে শ্রদ্ধা করত, তার নেতৃত্বে বাংলার লোক পাকিস্তান আন্দোলনে শরিক হয়েছিল। যার একটা ইঙ্গিতে হাজার হাজার লোক জীবন দিতে দ্বিধাবোধ করত না, আজ তাঁর কিছুই নাই। মামলা না করলে তার খাওয়ার পয়সা জুটছে না। কত অসহায় তিনি! তার সহকর্মীরা—যারা তাকে নিয়ে গর্ববোধ করত, তারা আজ তাঁকে শত্রু ভাবছে। কতদিনে আবার দেখা হয় কি করে বলব? তবে একটা ভরসা নিয়ে চলেছি, নেতার নেতৃত্ব আবার পাব। তিনি নীরবে অত্যাচার সহ্য করবেন না, নিয়েই প্রতিবাদ করবেন। পূর্ব বাংলায় আমরা রাজনৈতিক দল সৃষ্টি করতে পারব এবং মুসলিম লীগের স্থান পূর্ব বাংলায় থাকবে না, যদি একবার তিনি আমাদের সাহায্য করেন। তার সাংগঠনিক শক্তি ও বলিষ্ঠ নেতৃত্ব জাতি আবার পাবে।

শেয়ার বা বুকমার্ক করে রাখুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *