ভূমিকা – কমিউনিস্ট পার্টির ইশতেহার

১৮৭২ সালের জার্মান সংস্করণের ভূমিকা

কমিউনিস্ট লীগ ছিল শ্রমিকদের এক আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান, তখনকার অবস্থা অনসারে তার গুপ্ত সমিতি হওয়া ছাড়া উপায় ছিল না। ১৮৪৭ সালের নভেম্বরে লণ্ডনে এর যে কংগ্রেস বসে তা থেকে নিম্নস্বাক্ষরকারীদের উপর ভার দেওয়া হয়, পার্টির একটি বিশদ তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক কর্মসূচি রচনা করতে প্রকাশের জন্য। নিচের ‘ইশতেহারটির উৎপত্তি হয় এইভাবে। ফেব্রুয়ারি বিপ্লবের* কয়েক সপ্তাহ আগে এর পাণ্ডুলিপিটি ছাপা হবার জন্য লণ্ডনে যায়। জার্মান ভাষায় প্রথম প্রকাশের পর, জার্মানি, ইংল্যান্ড ও আমেরিকা থেকে এটি জার্মান ভাষায় অন্তত বারটি বিভিন্ন সংস্করণে পানঃপ্রকাশিত হয়েছে। ইংরেজীতে, শ্ৰীমতী হেলেন ম্যাকফারলেনের অনুবাদে, এর প্রথম প্রকাশ হয়েছিল লণ্ডনের Red Republican-এ (লাল প্রজাতন্ত্রী) ১৮৫০ সালে এবং পরে ১৮৭১ সালে আমেরিকায় অন্তত তিনটি স্বতন্ত্র অনুবাদের মাধ্যমে। ফরাসী অনুবাদ প্রথম বের হয়। প্যারিসে ১৮৪৮ সালের জুন অভ্যুত্থানের সামান্য আগে, আবার সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে নিউ ইয়র্কের Le Socialiste পত্রিকায়। আরও একটি অনুবাদের কাজ এখন চলেছে। জার্মান ভাষায় প্রথম প্রকাশিত হবার কিছু পরেই লণ্ডনে পোলীয় অনুবাদ বের হয়েছিল। উনিশ শতকের সপ্তম দশকে জেনেভা শহরে প্রকাশিত হয় এর রুশ অনুবাদ। প্রথম প্রকাশের অল্পদিনের মধ্যেই এর অনুবাদ হয়। ডেনিশ ভাষাতেও।

গত পঁচিশ বছরে বাস্তব অবস্থা যতই বদলে যাক না কেন, এই ‘ইশতেহার’এ যে সব সাধারণ মূলনীতি নির্ধারিত হয়েছিল তা আজও মোটের ওপর ঠিক আগের মতোই সঠিক। এখানে ওখানে সামান্য দু’একটি কথা আরও ভাল করে লেখা যেত। সর্বত্র এবং সবসময়ে মূলনীতিগুলির ব্যবহারিক প্রয়োগ নির্ভর করবে তখনকার ঐতিহাসিক অবস্থার উপর, ‘ইশতেহার’এর ভিতরেই সে কথা রয়েছে। সেইজন্য দ্বিতীয় অধ্যায়ের শেষে যেসব বিপ্লবী ব্যবস্থার প্রস্তাব আছে তার উপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়নি। আজকের দিনে হলে এ অংশটা নানা দিক থেকে অন্যভাবে লিখতে হত। গত পাঁচিশ বছরে আধুনিক যন্ত্রশিল্প যে বিপুল পদক্ষেপে এগিয়ে গেছে, সঙ্গে সঙ্গে শ্রমিক শ্রেণীর পার্টি সংগঠন উন্নত ও প্রসারিত হয়েছে; প্রথমে ফেব্রুয়ারি বিপ্লবে, পরে আরও বেশী করে প্যারিস কমিউনে, যেখানে প্রলেতারিয়েত এই সব প্রথম পুরো দাই মাস ধরে রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল করেছিল, তাতে যে বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জিত হয়েছে তার ফলে এই কর্মসূচী খুঁটিনাটি কিছু ব্যাপারে সেকেলে হয়ে পড়েছে। কমিউন বিশেষ করে একটি কথা প্রমাণ করেছে যে : ‘তৈরি রাষ্ট্রযন্ত্রটা শুধু দখলে পেয়েই শ্রমিক শ্রেণী তা নিজের কাজে লাগাতে পারে না।‘ (ফ্রান্সে গৃহযুদ্ধ; আন্তর্জাতিক শ্রমজীবী মানুষের সমিতির সাধারণ পরিষদের বিবৃতি, লণ্ডন, ট্রুলাভ, ১৮৭১, ১৫ পৃষ্ঠা দ্রষ্টব্য** সেখানে কথাটা আরও বিশদভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।) তাছাড়া একথাও স্বতঃস্পষ্ট যে, সমাজতন্ত্রী সাহিত্যের সমালোচনাটি আজকের দিনের হিসাবে অসম্পূর্ণ, কারণ সে আলোচনার বিস্তার এখানে মাত্র ১৮৪৭ পর্যন্ত; তাছাড়া বিভিন্ন বিরোধী দলের সঙ্গে কমিউনিস্টদের সম্পর্ক সম্বন্ধে বক্তব্যগুলিও (চতুৰ্থ অধ্যায়ে), সাধারণ মূলনীতির দিক থেকে ঠিক হলেও, ব্যবহারিক দিক থেকে সেকেলে হয়ে গেছে, কেননা রাজনৈতিক পরিস্থিতি একেবারে বদলে গেছে, এবং উল্লিখিত রাজনৈতিক দলগুলির অধিকাংশকে ইতিহাসের অগ্রগতি এ জগৎ থেকে ঝেঁটিয়ে বিদায় দিয়েছে।

কিন্তু এই ‘ইশতেহার’ এখন ঐতিহাসিক দলিল হয়ে পড়েছে, একে বদলাবার কোনও অধিকার আমাদের আর নেই। সম্ভবত পরবর্তী কোনো সংস্করণ বার করা যাবে। যাতে ১৮৪৭ থেকে আজ অবধি ব্যবধান কালটুকু নিয়ে একটা ভূমিকা থাকবে; বর্তমান সংস্করণ এত অপ্রত্যাশিতভাবে বেরল যে আমাদের পক্ষে তার সময় ছিল না।

কার্ল মার্কস। ফ্রেডারিক এঙ্গেলস
লণ্ডন, ২৪শে জুন, ১৮৭২

* ১৮৪৮ সালে ফ্রান্সের ফেব্রুয়ারি বিপ্লব।–সম্পাঃ।
** কাল মার্কস ও ফ্রেডরিক এঙ্গেলস, রচনা-সংকলন, প্রথম খন্ড, দ্বিতীয় অংশ দ্রষ্টব্য।–সম্পাঃ


১৮৮২ সালের রুশ সংস্করণের ভূমিকা

‘কমিউনিস্ট পার্টির ‘ইশতেহার’এর প্রথম রুশ সংস্করণ, বাকুনিনের অনুবাদে, সপ্তম দশকের গোড়ার দিকে* ‘কলোকোল’ পত্রিকার ছাপাখানা থেকে প্রকাশিত হয়েছিল। সেদিন পশ্চিমের কাছে এটা (‘ইশতেহার’এর রুশ সংস্করণ) মনে হতে পারত একটা সাহিত্যিক কৌতূহল-বস্তু মাত্র। আজ তেমন ভাবে দেখা অসম্ভব।

তখনো পর্যন্ত (ডিসেম্বর, ১৮৪৭) প্রলেতারীয় আন্দোলন কত সীমাবদ্ধ স্থান জড়ে ছিল সেকথা সবচেয়ে পরিষ্কার করে দেয় ‘ইশতেহার’এর শেষ অধ্যায়টা: বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন বিরোধী দলের সঙ্গে কমিউনিস্টদের সম্পর্ক। রাশিয়া ও যক্তরাষ্ট্রের উল্লেখই নেই। এখানে। সে যুগে রাশিয়া ছিল ইউরোপের সমস্ত প্রতিক্রিয়াশীলতার বিরাট শেষ-নির্ভর, আর দেশান্তরগমনের ভিতর দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র গ্রহণ করছিল ইউরোপীয় প্রলেতারিয়েতের উদ্বত্ত অংশটাকে। উভয় দেশই ইউরোপকে কাঁচামাল যোগাত, আর সেই সঙ্গে ছিল তার শল্পজাত সামগ্রীর বাজার। সে যুগে তাই দুই দেশই কোনো না কোনো ভাবে ছিল ইউরোপের চলতি ব্যবস্থার স্তম্ভ।

আজ অবস্থা কত বদলে গেছে! ইউরোপ থেকে নবাগত লোকের বসতির দরুনই উত্তর আমেরিকা বহৎ কৃষি-উৎপাদনের যোগ্য ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে, তার প্রতিযোগিতা ইউরোপের ছোট বড় সমস্ত ভূসম্পত্তির ভিত পর্যন্ত কাঁপিয়ে তুলেছে। তাছাড়া এর ফলে যুক্তরাষ্ট্র তার বিপুল শিল্পসম্পদকে এমন উৎসাহভরে ও এমন আয়তনে কাজে লাগাতে সমর্থ হয়েছে যে শল্পক্ষেত্রে পশ্চিম ইউরোপের, বিশেষ করে ইংলন্ডের যে একচেটিয়া অধিকার আজো রয়েছে, তা অচিরে ভেঙে পড়ুতে বাধ্য। এ দটি ব্যাপার আবার আমেরিকার উপরেই বিপ্লবী প্রতিক্রিয়া ঘটাচ্ছে। গোটা রাষ্ট্র ব্যবস্থার ভিত্তিতে যে কৃষকের ছোট ও মাঝারি ভূসম্পত্তি ছিল, তা ক্ৰমে ক্ৰমে বৃহদায়তন খামারের প্রতিযোগিতায় অভিভূত হয়ে পড়ুছে; সেইসঙ্গে শিল্পাঞ্চলে এই প্রথম ঘটছে গণ প্রলেতারিয়েত ও অবিশ্বাস্য পুঁজি কেন্দ্রীভবনের বিকাশ।

তারপর রুশদেশা! ১৮৪৮-৪৯ সালের বিপ্লবের সময় শুধু ইউরোপীয় রাজন্যবাগ নয়, ইউরোপের বুর্জোয়া শ্রেণী পর্যন্ত সদ্যজাগরণোন্মুখ প্রলেতারিয়েতের হাত থেকে উদ্ধার পাবার একমাত্র উপায় দেখেছিল রাশিয়ার হস্তক্ষেপে। জার-কে তখন ঘোষণা করা হয়ে ছিল ইউরোপে প্রতিক্রিয়ার প্রধান নেতা হিসাবে। সেই জার। আজ বিপ্লবের কাছে গাৎচিনায় যাদ্ধবন্দীর মতন, আর ইউরোপে বিপ্লবী আন্দোলনের পুরোভাগে এসে দাঁড়িয়েছে রাশিয়া।

আধুনিক বুর্জোয়া সম্পত্তির অনিবার্য আগতপ্ৰায় অবসান ঘোষণা করাই ছিল ‘কমিউনিস্ট ‘ইশতেহার’এর লক্ষ্য। কিন্তু রাশিয়াতে দেখি দ্রুত বর্ধিষ্ণু পুঁজিবাদী জয়াচুরি ও বিকাশোন্মুখ বুর্জোয়া ভূসম্পত্তির মাখামাখি রয়েছে দেশের অর্ধেকের বেশি জমি জড়ে চাষীদের যৌথ মালিকানা। সুতরাং প্রশান ওঠে যে অত্যন্ত দাবলি হয়ে এলেও জমির উপর মিলিত মালিকানার আদি রূপে এই রুশ অবশ্চিনা (obshchino)** কি কমিউনিসট সাধারণ মালিকানার উচ্চতর পর্যায়ে সরাসরি রূপান্তরিত হতে পারে? না কি পক্ষান্তরে তাকেও যেতে হবে। ভাঙনের সেই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যা পশ্চিমে ঐতিহাসিক বিবর্তনের ধারা হিসাবে প্রকাশ পেয়েছে?

এর একমাত্র যে উত্তর দেওয়া আজ সম্ভব তা হল এই: রাশিয়ায় বিপ্লব যদি পশ্চিমে প্রলেতারীয় বিপ্লবের সংকেত হয়ে ওঠে যাতে দুই বিপ্লব পরস্পরের পরিপারক হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে রুশদেশে ভূমির বর্তমান যৌথ মালিকানা কাজে লাগতে পারে কমিউনিস্ট বিকাশের সূত্রপাত হিসাবে।

কার্ল মার্কস–ফ্রেডারিক এঙ্গেলস
লণ্ডন, ২১শে জানুয়ারি, ১৮৮২

——————

* উল্লিখিত সংস্করণটি প্রকাশিত হয় ১৮৬৯ সালে। তারিখটা এঙ্গেলস ভুলভাবে দিয়েছেন।–সম্পাদক
**অবশ্চিনা–গ্রামীণ সমাজ।–সম্পাদক


১৮৮৩ সালের জার্মান সংস্করণের ভূমিকা

বৰ্তমান সংস্করণের ভূমিকা হায় আমাকে একলাই সই করতে হবে। ইউরোপ ও আমেরিকার সমগ্র শ্রমিক শ্রেণী যাঁর কাছে সবচাইতে বেশি ঋণী সেই মার্কস হাইগেট সমাধি-ভূমিতে শান্তিলাভ করেছেন। তাঁর সমাধির উপর ইতিমধ্যেই প্রথম তৃণরাজি মাথা তুলেছে। তাঁর মৃত্যুর পর ‘ইশতেহার’এ সংশোধন বা সংযোজন আরো অভাবনীয়। তাই এখানে স্পষ্টভাবে নিম্নলিখিত কথাগালি আবার বলা আমি প্রয়োজন মনে করি :

‘ইশতেহার’এর ভিতরে যে মলচিন্তা প্রবাহমান তা হল এই : ইতিহাসের প্রতি যুগে অর্থনৈতিক উৎপাদন এবং যে সমাজ-সংগঠন তা থেকে আবশ্যিকভাবে গড়ে ওঠে তা-ই থাকে সে যুগের রাজনৈতিক ও মানসিক ইতিহাসের মলে, সুতরাং (জমির আদিম যৌথ মালিকানার অবসানের পর থেকে) সমগ্র ইতিহাস হয়ে এসেছে শ্রেণীসংগ্রামের ইতিহাস, সামাজিক বিবর্তনের বিভিন্ন পর্যায়ের শোষিত ও শোষক, অধীনস্থ ও অধিপতি শ্রেণীর সংগ্রামের ইতিহাস; কিন্তু এই লড়াই আজ এমন পৰ্যায়ে এসে পৌঁছেছে যে শোষিত ও নিপীড়িত শ্রেণী (প্রলেতারিয়েত) নিজেকে শোষক ও নিপীড়ক শ্রেণীর (বুর্জোয়া) কবল থেকে উদ্ধার করতে গেলে সেইসঙ্গে গোটা সমাজকে শোষণ, নিপীড়ন ও শ্রেণী-সংগ্রাম থেকে চিরদিনের মতো মুক্তি না দিয়ে পারে না। — এই মূল চিন্তাটি পুরোপুরি ও একমাত্র মার্কসেরই চিন্তা*।

একথা আমি বহবার বলেছি। কিন্তু ঠিক আজকেই এ বক্তব্য ‘ইশতেহার’এর পুরোভাগেও রাখা প্রয়োজন।

ফ্রেডারিক এঙ্গেলস
লণ্ডন, ২৮শে জুন, ১৮৮৩

—————

* ইংরেজী অনুবাদের মুখবন্ধে আমি লিখেছিলাম : ‘ডারউইনের মতবাদ জীববিজ্ঞানের ক্ষেত্রে যা করেছে, আমার মতে এই সিদ্ধান্ত ইতিহাসের বেলায় তাই করতে বাধ্য। ১৮৪৫ সালের আগেকার কয়েক বছর ধরে আমরা দুজনেই ধীরে ধীরে এই সিন্ধান্তের দিকে এগিয়ে চলেছিলাম। স্বতন্ত্রভাবে আমি কতটা এদিকে অগ্রসর হয়েছিলাম তার শ্রেষ্ঠ নিদর্শন আমার “ইংলন্ডে শ্ৰমিক শ্রেণীর অবস্থা” বইখানি। কিন্তু যখন ১৮৪৫ সালের বসন্তকালে ব্রাসেল্‌স্‌ শহরে মার্কসের সঙ্গে আমার আবার দেখা হল, তখন মার্কস ইতিমধ্যেই সিদ্ধান্তে পৌঁছে গিয়েছেন। এখানে আমি যে ভাষায় মূলকথাটা উপস্থিত করলাম প্রায় তেমন পরিষ্কারভাবেই তিনি তখনই তা আমার সামনে তুলে ধরেছিলেন।’ (১৮৯০ সালের জার্মান সংস্করণে এঙ্গেলসের টীকা।)


১৮৮৮ সালের ইংরেজী সংস্করণের ভূমিকা

মেহনতী মানুষের সংগঠন ‘কমিউনিস্ট লীগ’ প্রথমটা ছিল পুরোপুরি জার্মান ও পরে আন্তর্জাতিক, এবং ১৮৪৮ সালের আগেকার ইউরোপ মহাদেশের রাজনৈতিক অবস্থাতে তাকে অনিবার্যভাবে হতে হয় গুপ্ত সমিতি। এই ‘ইশতেহার’ প্রকাশিত হয়েছিল তারই কর্মসূচি হিসাবে। ১৮৪৭ সালের নভেম্বরে লীগের লণ্ডন কংগ্রেসে মার্কস ও এঙ্গেলসের উপর ভার দেওয়া হয়েছিল একটা বিশদ তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক পার্টি কর্মসূচি প্রকাশের জন্য প্রস্তুত করতে। ১৮৪৮-এর জানায়ারিতে জার্মানে লেখা পান্ডুলিপিটি ২৪শে ফেব্রুয়ারির ফরাসী বিপ্লবের কয়েক সপ্তাহ আগে লণ্ডনে মাদ্রাকরের কাছে পাঠানো হয়। ১৮৪৮ সালের জন অভ্যুত্থানের সামান্য আগে এর ফরাসী অনুবাদ প্যারিসে প্রকাশ হয়। শ্ৰীমতী হেলেন ম্যাকফারলেন কৃত প্রথম ইংরেজী অনুবাদ বের হয়। ১৮৫০ সালে লণ্ডনে জজ জলিয়ান হানির Red Republican পত্রিকায়। ডেনিশ ও পোলীয় সংস্করণও প্রকাশিত হয়েছিল।

১৮৪৮ সালের জন মাসে প্রলেতারিয়েত ও বুর্জোয়ার প্রথম মহাসংগ্রাম, প্যারিস অভ্যুত্থানের পরাজয় ইউরোপীয় শ্রমিক শ্রেণীর সামাজিক ও রাজনৈতিক দাবিকে ফের কিছদিনের মতো পিছনে হটিয়ে দিল। তারপর থেকে ফেব্রুয়ারি বিপ্লবের আগেকার মতো ফের কেবল মালিক শ্রেণীর নানা অংশের মধ্যেই ক্ষমতা দখলের লড়াই চলতে থাকে; শ্রমিক শ্রেণীকে নেমে আসতে হয় রাজনৈতিক অস্তিত্বের লড়াইটুকুতে, মধ্য শ্রেণীর র‍্যাডিকাল দলের চরমপন্থী অংশ রূপে দাঁড়াতে হয় তাদের। যেখানেই স্বাধীন প্রলেতারীয় আন্দোলনে জীবনের লক্ষণ দেখা গেল, সেখানেই তাকে দমন করা হল নির্মমভাবে। এইভাবেই, সে সময়ে কলোন শহরে অবস্থিত কমিউনিস্ট লীগের কেন্দ্ৰীয় কমিটিতে হানা দেয় প্রাশিয়ার পুলিশ। তার সভ্যরা গ্রেপ্তার হল এবং আঠারো মাস কারাবাসের পর ১৮৫২ সালের অক্টোবরে তাদের বিচার হয়। এই প্ৰসিদ্ধ “কলোন কমিউনিসটদের বিচার” চলেছিল ৪ঠা অক্টোবর থেকে ১২ই নভেম্বর; বন্দীদের সাতজনকে তিন থেকে ছয় বছরের কারাদন্ড দেওয়া হল এক দুর্গের অভ্যন্তরে। দন্ড ঘোষণার অব্যবহিত পরে, বাকি সভ্যরা লীগ সংগঠনকে আনষ্ঠানিকভাবে তুলে দেয়। আর ‘ইশতেহার’ সম্বন্ধে মনে হল যে এরপর থেকে তার ভাগ্যে বিস্মৃতির নির্বন্ধ।

ইউরোপীয় শ্রমিক শ্রেণী যখন শাসক শ্রেণীর উপর আর একটা আক্রমণের মতো পৰ্যাপ্ত শক্তি ফিরে পায়, তখন আবির্ভূত হয় আন্তর্জাতিক শ্রমজীবী মানুষের সমিতি (International Working Men’s Association)। ইউরোপ ও আমেরিকার সমগ্ৰ জঙ্গী প্রলেতারিয়েতকে এক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সংগঠিত করার বিশেষ উদ্দেশ্য থাকার দরুন এই সমিতি কিন্তু ইশতেহার এ লিপিবদ্ধ মলনীতিগুলি সরাসরি ঘোষণা করতে পারেনি। আন্তর্জাতিকের কর্মসূচি বাধ্য হয়েই এতটা উদার করতে হয় যাতে তা গ্রহণীয় হয় ইংরেজ ট্রেড ইউনিয়ন, ফ্রান্স-বেলজিয়ম-ইতালি ও স্পেনের প্রুধোঁবাদী, এবং জার্মান লাসালপন্থীদের(1) কাছে। এই কর্মসূচি মার্কস রচনা করেছিলেন এই সকল দলের সন্তোষ বিধান করে; মিলিত কাজ ও পারস্পরিক আলোচনার ফলে শ্রমিক শ্রেণীর বৃদ্ধিগত যে বিকাশ ছিল সুনিশ্চিত, তার উপরেই তিনি পূর্ণ আস্থা রেখেছিলেন। পুঁজির সঙ্গে সংগ্রামের ঘটনা ও দুর্বিপাকেই, জয়লাভের চাইতেও পরাজয়ে শ্রমিকদের এই জ্ঞানোদয় না হয়ে পারেনি যে তাদের সাধের নানা টোটকাগুলি (nostrums) অপৰ্যাপ্ত, শ্রমিক শ্রেণীর মুক্তির আসল শত সম্বন্ধে পূর্ণতর অন্তদৃষ্টির পথ না কেটে পারেনি। মার্কস ঠিকই বুঝেছিলেন। ১৮৬৪ সালে আন্তর্জাতিক সৃষ্টির সময় শ্রমিকরা যে অবস্থায় ছিল তা থেকে একেবারে ভিন্ন মানষ হয়ে তারা বেরিয়ে আসে। ১৮৭৪ সালে আন্তর্জাতিক ভেঙে যাবার সময়। ফ্রান্সে প্রুধোঁবাদ, জার্মানিতে লাসালপন্থা তখন মুহূর্ষু; এমনকি রক্ষণশীল ইংরেজ ট্রেড ইউনিয়নগলিও, তাদের অধিকাংশ বহুদিন যাবৎ আন্তর্জাতিকের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে থাকলেও, ধীরে ধীরে এতদূর পর্যন্ত এগিয়ে এসেছে যে গত বছর সোয়ানসি শহরে তাদের সভাপতি তাদের নামেই ঘোষণা করতে পারলেন: ‘ইউরোপীয় ভূখন্ডের সমাজতন্ত্র আমাদের কাছে আর বিভীষিকা নেই।‘ বস্তৃত, সকল দেশের মেহনতী মানুষের মধ্যে ইশতেহারের নীতিগুলি অনেক পরিমাণে ছড়িয়েছে।

তাই ‘ইশতেহার’ আবার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। ১৮৫o সালের পর তার মূল জার্মান পাঠ কয়েকবার পুনর্মুদ্রিত হয়েছে সুইজারল্যান্ড, ইংলণ্ড ও আমেরিকাতে। ১৮৭২ সালে নিউ ইয়র্কে ইংরেজী অনুবাদ হয়েছিল, অনুবাদটি সেখানকার Woodhull and Claflin’s Weekly-তে প্রকাশিত হয়। এই ইংরেজী পাঠ থেকে একটা ফরাসী অনুবাদ হয় নিউ ইয়র্কের Le Socialiste পত্রিকায়। এরপর কিছুটা বিকৃতি সহ অন্তত আরও দুটি ইংরেজী অনুবাদ আমেরিকায় প্রকাশিত হয়েছে, তার মধ্যে একটি পুনর্মুদ্রিত হয়েছে ইংলন্ডে। প্রথম রুশ অনুবাদ বাকুনিনের করা, সেটি জেনেভা শহরে গেৎসেনের ‘কলোকোল’ অফিসে প্রকাশিত হয়। ১৮৬৩ আন্দাজ; দ্বিতীয় অনুবাদ করেন বীরনারী ভেরা জাসুলিচ(2), তা বের হয় ১৮৮২ সালে জেনেভাতেই। এক নতুন ডেনিশ সংস্করণ পাওয়া যাবে কোপেনহাগেনে ১৮৮৫ সালের Social-demokratisk Bibliothek-এ; নতুন এক ফরাসী অনুবাদ আছে প্যারিসে ১৮৮৫ সালের Le Socialiste পত্রিকায়। শেষেরটি অনুসরণে একটা স্পেনীয় অনুবাদ মাদ্রিদে ১৮৮৬ সালে প্ৰস্তুত ও প্রকাশিত হয়। জার্মান পুনর্মুদ্রণের সংখ্যা অশেষ, খব কম করেও অন্তত বারো। কয়েক মাস আগে কনস্ট্যাণ্টিনোপল থেকে একটা আমেনিয়ান অনুবাদের কথা ছিল, কিন্তু তা প্রকাশিত হয়নি শুনেছি এই জন্য যে প্রকাশক মার্কসের নামাঙ্কিত বই বের করতে সাহস পাননি। আর অনুবাদক লেখাটা নিজের বলে প্রচার করতে গররাজী হন। অন্যান্য ভাষায় আরও অনুবাদের কথা আমি শুনেছি কিন্তু নিজের চোখে দেখিনি। সুতরাং ইশতেহারের ইতিহাস অনেকাংশে আধুনিক শ্রমিক আন্দোলনের ইতিহাসই প্রতিফলিত করছে; আজকের দিনে সমগ্র সমাজতন্ত্রী সাহিত্যের সবচেয়ে প্রচারিত, সর্বাধিক আন্তর্জাতিক সাহিত্য-কীর্তি এইটেই; সাইবেরিয়া থেকে কালিফোর্নিয়া পর্যন্ত লক্ষ লক্ষ মেহনতী মানুষে একে মেনে নিয়েছে নিজেদের সাধারণ কর্মসূচি হিসাবে।

কিন্তু লেখার সময়ে একে সমাজতন্ত্রী ইশতেহার বলা সম্ভব ছিল না। ১৮৪৭ সালে সমাজতন্ত্রী নামে বোঝাত একদিকে বিভিন্ন ইউটোপীয় মতবাদের অ্নুগামীদের : যেমন ইংলন্ডে ওয়েন-পন্থী, ফ্রান্সে ফুরিয়ে-পন্থীরা, উভয়েই তখন সংকীর্ণ গোষ্ঠীর পর্যায়ে নেমে গিয়ে ধীরে ধীরে লোপ পাচ্ছিল; অন্যদিকে বোঝাত অতি বিচিত্র সব সামাজিক হাতুড়েদের, এরা নানাবিধ তুকতাকে পুঁজি ও মনাফার কোনও ক্ষতি না করে সব প্রকার সামাজিক অভিযোগের প্রতীকার করার প্রতিশ্রুতি দিত। উভয় ক্ষেত্রের লোকেরাই ছিল শ্রমিক আন্দোলনের বাইরে, উভয়েরই চোখ ছিল ‘শিক্ষিত’ সম্প্রদায়ের সমর্থনের দিকেই। শ্রমিক শ্রেণীর যেটুকু অংশ নিতান্ত রাজনৈতিক বিপ্লবের অপব্যাপ্ততা বুঝেছিল, সমাজের সম্পৰ্ণে বদলের প্রয়োজনীয়তা ঘোষণা করেছিল, সেই অংশ তখন নিজেদের কমিউনিস্ট নামে পরিচয় দিত। অবশ্য এ ছিল একটা কাঁচা, অমার্জিত, নিতান্তই সহজবোধের কমিউনিজম; তব এতে মূলকথাটা ধরা পড়েছিল এবং শ্রমিক শ্রেণীর মধ্যে এর এতটা প্রভাব ছিল যে এ থেকে জন্ম নেয়। ফ্রান্সে কাবে-র ও জার্মানিতে ভাইতলিং-এর ইউটোপীয় কমিউনিজম। তাই ১৮৪৭ সালে সমাজতন্ত্র ছিল বুর্জোয়া আন্দোলন আর কমিউনিজম শ্রমিক শ্রেণীর। অন্তত ইউরোপ মহাদেশে সমাজতন্ত্র ছিল ভদ্ৰস্থ; আর কমিউনিজম ছিল ঠিক তার বিপরীত। আর প্রথম থেকেই যেহেতু আমাদের ধারণা ছিল যে ‘শ্রমিক শ্রেণীর মুক্তি হওয়া চাই শ্রমিক শ্রেণীরই নিজস্ব কাজ, তাই দুই নামের মধ্যে কোনটা আমরা নেব সে সম্বন্ধে কোন সংশয় ছিল, না। তাছাড়া আজ পর্যন্ত আমরা এ নাম বর্জন করার দিকেও যাইনি।

যদিও ‘ইশতেহার’ আমাদের দুজনের রচনা, তবু আমার মনে হয় আমার বলা উচিত যে, এর মূলে রয়েছে যে-প্রধান বক্তব্য সেটা মার্কসেরই নিজস্ব। সে বক্তব্য হল এই : ইতিহাসের প্রতি যুগে অর্থনৈতিক উৎপাদন ও বিনিময়ের প্রধান পদ্ধতি এবং তার আবশ্যিক ফল যে সামাজিক সংগঠন তাই হল একটা ভিত্তি যার ওপর গড়ে ওঠে সে যুগের রাজনৈতিক ও মানসিক ইতিহাস এবং একমাত্র তা দিয়েই এ ইতিহাসের ব্যাখ্যা করা চলে; সুতরাং মানবজাতির সমগ্র ইতিহাস (জমির উপর যৌথ মালিকানা সম্পাবলিত আদিম উপজাতীয় সমাজের অবসানের পর থেকে) হল শ্রেণীসংগ্রামের ইতিহাস, শোষক এবং শোষিত, শাসক এবং নিপীড়িত শ্রেণীর সংগ্রামের ইতিহাস; শ্রেণী-সংগ্রামের এই ইতিহাস হল বিবর্তনের এক ধারা যা আজকের দিনে এমন পর্যায়ে পৌঁছিয়েছে যেখানে একই সঙ্গে গোটা সমাজকে সকল শোষণ, নিপীড়ন, শ্রেণী-পাৰ্থক্য ও শ্রেণী-সংগ্রাম থেকে চিরদিনের মতো মুক্তি না দিয়ে শোষিত ও নিপীড়িত শ্রেণীটি–অর্থাৎ প্রলেতারিয়েত–শোষক ও শাসকের, অর্থাৎ বুর্জোয়া শ্রেণীর কর্তৃত্বের কবল থেকে নিজেকে মুক্ত করতে পারে না।

ডারউইনের মতবাদ জীববিজ্ঞানের ক্ষেত্রে যা করেছে, আমার মতে এই সিদ্ধান্ত ইতিহাসের বেলায়। তাই করতে বাধ্য। ১৮৪৫ সালের আগেকার কয়েক বছর ধরে আমরা দরজনেই ধীরে ধীরে এই সিদ্ধান্তের দিকে এগিয়ে চলেছিলাম। সর্বতন্ত্রভাবে আমি কতটা এদিকে অগ্রসর হয়েছিলাম তার শ্রেষ্ঠ নিদর্শন আমার ‘ইংলন্ডে শ্রমিক শ্রেণীর অবস্থা’ বইখানি।(3) কিন্তু যখন ১৮৪৫ সালের বসন্তকালে ব্রাসেলস শহরে মার্কসের সঙ্গে আমার আবার দেখা হল, তখন মার্কস ইতিমধ্যে সিদ্ধান্তে পৌঁছে গিয়েছেন। এখানে আমি যে ভাষায় মূল কথাটা উপস্থিত করলাম প্রায় তেমন পরিষ্কারভাবেই তিনি তখনই তা আমার সামনে তুলে ধরেছিলেন।

১৮৭২ সালের জার্মান সংস্করণে আমাদের মিলিত ভূমিকা থেকে নিম্নলিখিত কথাগালি উদ্ধত করছি:

‘গত পাঁচিশ বছরে বাস্তব অবস্থা যতই বদলে যাক না কেন, এই ‘ইশতেহার’এ যে সব সাধারণ মূলনীতি নির্ধারিত হয়েছিল তা আজও মোটের ওপর ঠিক আগের মতোই সঠিক। এখানে ওখানে সামান্য দু’একটি কথা আরও ভাল করে লেখা যেত। সর্বত্র এবং সবসময় মূলনীতিগুলির ব্যবহারিক প্রয়োগ নির্ভর করবে তখনকার ঐতিহাসিক অবস্থার উপর, ‘ইশতেহার’এর ভিতরেই সে কথা রয়েছে। সেইজন্য দ্বিতীয় অধ্যায়ের শেষে যেসব বিপ্লবী ব্যবস্থার প্রস্তাব আছে তার উপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়নি। আজকের দিনে হলে এ অংশটা নানা দিক থেকে অন্যভাবে লিখতে হত। ১৮৪৮-এর পর থেকে আধুনিক যন্ত্রশিল্প যে বিপুল পদক্ষেপে এগিয়ে গেছে, সঙ্গে সঙ্গে শ্রমিক শ্রেণীর পার্টি সংগঠন উন্নত ও প্রসারিত হয়েছে, প্রথমে ফেব্রুয়ারি বিপ্লবে, পরে আরও বেশী করে প্যারিস কমিউনে, যেখানে প্রলেতারিয়েত এই সব প্রথম পরো দুই মাস ধরে রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল করেছিল, তাতে যে বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জিত হয়েছে তার ফলে এই কর্মসূচি খুঁটিনাটি কিছু ব্যাপারে সেকেলে হয়ে পড়েছে। কমিউন বিশেষ করে একটা কথা প্রমাণ করেছে যে: “তৈরি রাষ্ট্রযন্ত্রটা শুধু দখলে পেয়েই শ্রমিক শ্রেণী তা নিজের কাজে লাগাতে পারে না।” (ফ্রান্সে গৃহযদ্ধ; আন্তর্জাতিক শ্রমজীবী মানুষের সমিতির সাধারণ পরিষদের বিবৃতি, লণ্ডন, ট্রুলাভ, ১৮৭১, ১৫ পৃষ্ঠা দ্রষ্টব্য; সেখানে কথাটা আরও বিশদভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।) তাছাড়া একথাও স্বতঃস্পষ্ট যে, সমাজতন্ত্রী সাহিত্যের সমালোচনাটি আজকের দিনের হিসাবে অসম্পূর্ণ, কারণ সে আলোচনার বিস্তার এখানে মাত্র ১৮৪৭ পর্যন্ত; তাছাড়া বিভিন্ন বিরোধী দলের সঙ্গে কমিউনিস্টদের সম্পর্ক সম্বন্ধে বক্তব্যগলিও (চতুর্থ অধ্যায়ে), সাধারণ মূলনীতির দিক থেকে ঠিক হলেও, ব্যবহারিক দিক থেকে সেকেলে হয়ে গেছে, কেননা রাজনৈতিক পরিস্থিতি একেবারে বদলে গেছে, এবং উল্লিখিত রাজনৈতিক দলগালির অধিকাংশকে ইতিহাসের অগ্রগতি এ জগৎ থেকে ঝেঁটিয়ে বিদায় দিয়েছে।

‘কিন্তু এই ‘ইশতেহার’ এখন ঐতিহাসিক দলিল হয়ে পড়েছে, একে বদলাবার কোনও অধিকার আমাদের আর নেই।‘

মার্কসের ‘পুঁজি’ বইটির বেশির ভাগটার অনুবাদক, মিঃ স্যামুয়েল মুর এই অনুবাদ করেছেন। আমরা দজনে মিলে এর সংশোধন করেছি; কয়েকটি ঐতিহাসিক উল্লেখের ব্যাখ্যা হিসাবে কিছু টীকা আমি সংযোজন করেছি।

ফ্রেডরিক এঙ্গেলস
লণ্ডন, ৩০শে জানুয়ারি, ১৮৮৮

—————
1) লাসাল আমাদের কাছে ব্যক্তিগতভাবে সবাদাই কবীকার করতেন যে তিনি মাকাসের শিষ্য এবং সেই হিসাবে ইশতেহারের উপরেই তাঁর ভিত্তি। কিন্তু ১৮৬২-৬৪ সালের প্রকাশ্য আন্দোলনে তিনি রান্মের ক্রেডিটের সাহায্যে উৎপাদক সমবায়ের দাবির বেশি অগ্রসর হননি। (এঙ্গেলসের টীকা।)
2) অনুবাদ করেছিলেন গ, ভা, প্লেখানভ; স্বয়ং এঙ্গেলস পরে ‘রাশিয়ায় সামাজিক সম্পর্ক” প্রবন্ধের পানশাচ অংশে কথাটা লিখে গেছেন।–সম্পাঃ
3) ‘The Condition of the Working Class in England in 1844.’ By Frederick Engels. Translated by Florence K. Wishnewetzky, New York, Lovell–London.
W. Reeves, 1888. (এঙ্গেলসের টীকা)


১৮৯o সালের জার্মান সংস্করণের ভূমিকা থেকে

‘ইশতেহারের’ একটা নিজস্ব ইতিহাস আছে। সংখ্যায় তখন পর্যন্ত বেশি নয়, বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের এহেন অগ্ৰণীদের কাছ থেকে এর প্রকাশকালে জুটেছিল সোৎসাহ অভ্যর্থনা (প্রথম ভূমিকায় উল্লিখিত অনুবাদগুলিই তার প্রমাণ), কিন্তু ১৮৪৮ সালের জুনে প্যারিস শ্রমিকদের পরাজয়ের পর যে প্রতিক্রিয়া আরম্ভ হয়, তার চাপে বাধ্য হয়ে একে পশ্চাদপসারণ করতে হল; এবং ১৮৫২ সালের নভেম্বরে কলোন কমিউনিস্টদের দন্ডাজ্ঞার পর শেষপর্যন্ত ‘আইন অনুসারে’ তাকে আইন বহির্ভূত করা হয়। ফেব্রুয়ারি বিপ্লব থেকে যে শ্রমিক আন্দোলন শুরু হয়েছিল, লোকচক্ষু থেকে তার অপসারণের সঙ্গে সঙ্গে ‘ইশতেহার’ও অন্তরালে যায়।

শাসক শ্রেণীদের ক্ষমতার উপর নতুন আক্রমণের পক্ষে পর্যাপ্ত শক্তি যখন ইউরোপের শ্রমিক শ্রেণী আবার সংগ্রহ করতে পারল তখন আন্তর্জাতিক শ্রমজীবী মানুষের সমিতির উদয় হয়। তার লক্ষ্য ছিল ইউরোপ ও আমেরিকার গোটা জঙ্গী শ্রমিক শ্ৰেণীকে একটি বিরাট বাহিনীতে সুসংহত করা। সুতরাং ইশতেহারে লিপিবদ্ধ নীতি থেকে তা শহর হতে পারে না। এমন কর্মসূচি তাকে নিতে হয় যা ইংরেজ ট্রেড ইউনিয়ন, ফরাসী, বেলজীয়, ইতালীয় ও স্পেনীয় প্রুধোঁবাদী এবং জার্মান লাসালপন্থীদের(1) কাছে যেন দরজা বন্ধ না করে। এই কর্মসূচি–আন্তর্জাতিকের নিয়মাবলীর মুখবন্ধ(2) মার্কস রচনা করলেন এমন নিপুণ হাতে যে বাকুনিন ও নৈরাজ্যবাদীরা পর্যন্ত তা স্বীকার করে। ‘ইশতেহারে’ বর্ণিত নীতিগুলির শেষপর্যন্ত বিজয়ী হবার ব্যাপারে মার্কস পুরোপুরি ও একান্তভাবে নির্ভর করেছিলেন শ্রমিক শ্রেণীর বৃদ্ধিগত বিকাশের উপর, মিলিত লড়াই ও আলোচনা থেকে যার উদ্ভব অনিবার্য। পুঁজির সঙ্গে লড়াই-এর নানা ঘটনা ও বিপৰ্যয়, সাফল্যের চাইতে পরাজয়ই বেশি করে, সংগ্রামীদের কাছে প্রমাণ না করে পারে না যে তাদের আগেকার সবরোগহর দাওয়াইগুলি অকেজো, শ্রমিকদের মুক্তির সঠিক শত গলির সম্যক উপলব্ধির পক্ষে তাদের মনকে তৈরি না করে পারে না। মার্কস ঠিকই বঝেছিলেন। ১৮৬৪ সালে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠার সময়কার শ্রমিক শ্রেণীর তুলনায় ১৮৭৪ সালে আন্তর্জাতিক উঠে যাবার সময়কার শ্রমিক শ্রেণী সম্পৰ্ণে অন্যরকম হয়ে ওঠে। ল্যাটিন দেশগলিতে প্রুধোঁবাদ ও জার্মানির স্বকীয় লাসালপন্থা তখন মরণোন্মুখ; এমন কি চরম রক্ষণশীল ইংরেজ ট্রেড ইউনিয়নগুলি পর্যন্ত ধীরে ধীরে এগিয়ে চলেছিল এমন একটা পৰ্যায়ে যখন ১৮৮৭ সালে তাদের সোয়ানসি কংগ্রেসের সভাপতি তাদের তরফ থেকে বলতে পারলেন যে: ‘ইউরোপীয় ভূখন্ডের সমাজতন্ত্র আমাদের কাছে আর বিভীষিকা নেই।‘ অথচ ১৮৮৭ সালের ইউরোপীয় ভূখন্ডের সমাজতন্ত্র প্রায় পুরোপুরিই ‘ইশতেহারে’ ঘোষিত তত্ত্ব মাত্র। সুতরাং কিছুটা পরিমাণে ‘ইশতেহারের’ ইতিহাসে ১৮৪৮ সালের পরবর্তী আধুনিক শ্রমিক শ্রেণীর আন্দোলনের ইতিহাসটাই প্রতিফলিত। বর্তমানে সমগ্র সমাজতন্ত্রী সাহিত্যের মধ্যে এটি নিঃসন্দেহেই সবচেয়ে বেশি প্রচারিত, সর্বাধিক আন্তর্জাতিক সৃষ্টি, সাইবেরিয়া থেকে কালিফোর্নিয়া পর্যন্ত সকল দেশে লক্ষ লক্ষ শ্রমিকের সাধারণ কর্মসূচি হয়ে দাঁড়িয়েছে তা।

তবুও প্রথম প্রকাশের সময় আমরা একে সমাজতন্ত্রী ‘ইশতেহার’ বলতে পারতাম না। ১৮৪৭ সালে দাই ধরনের লোককে সমাজতন্ত্রী গণ্য করা হত। একদিকে ছিল বিভিন্ন ইউটোপীয় মতবাদের সমর্থকেরা, বিশেষ করে ইংলন্ডে ওয়েন-পন্থী ও ফ্রান্সে ফুরিয়ে-পন্থীরা, অবশ্য ততদিনে উভয়েই সংকীর্ণ গোষ্ঠীতে পরিণত হয়ে ধীরে ধীরে লোপ পাচ্ছিল। অন্যদিকে ছিল অশেষ প্রকারের সামাজিক হাতুড়ে যারা সামাজিক অবিচার দূর করতে চাইত নানাবিধ সর্বরোগহর দাওয়াই ও জোড়াতালি প্রয়োগ করে–পুঁজি ও মুনাফার বিন্দমাত্র ক্ষতি না করে। উভয় ক্ষেত্রেই এরা ছিল শ্রমিক আন্দোলনের বাইরের লোক এবং সমর্থনের জন্য তাকিয়ে ছিল বরং ‘শিক্ষিত’ সম্প্রদায়ের দিকে। নিতান্ত রাজনৈতিক বিপ্লব যথেস্ট নয় এবিষয়ে স্থিরনিশ্চয় হয়ে শ্রমিক শ্রেণীর যে অংশটি সেদিন সমাজের আমলে পুনর্গঠনের দাবি তোলে, তারা সে সময় নিজেদের কমিউনিস্ট বলত। তখন পর্যন্ত এটা ছিল অমার্জিত, নিতান্ত সহজবোধের, প্রায়শই অনেকটা স্থূল কমিউনিজম মাত্র। তবুও ইউটোপীয় কমিউনিজমের দুটি ধারাকে জন্ম দেবার মতো শক্তি এর ছিল–ফ্রান্সে কাবে-র ‘আইকেরীয়’ (Icarian) কমিউনিজম এবং জার্মানিতে ভাইতলিং-এর কমিউনিজম। ১৮৪৭ সালে সমাজতন্ত্র বলতে বোঝাত একটা বুর্জোয়া আন্দোলন, কমিউনিজম বোঝাত শ্রমিক আন্দোলন। ইউরোপীয় ভূখন্ডে অন্তত তখন সমাজতন্ত্র ছিল বেশ ভদ্রস্থ, আর কমিউনিজম ছিল ঠিক তার বিপরীত। ততদিন আগেই যেহেতু আমাদের অতি দঢ় মত ছিল যে, ‘শ্রমিক শ্রেণীর মুক্তি হওয়া চাই শ্রমিক শ্রেণীরই নিজস্ব কাজ, তাই দুই নামের মধ্যে কোনটি বেছে নেব। সে সম্বন্ধে আমাদের কোনও দ্বিধা ছিল না। পরেও কখনো নাম বর্জন করার কথা আমাদের মনে আসেনি।

‘দুনিয়ার মজুর এক হও!’ বেয়াল্লিশ বছর আগে, প্রথম যে প্যারিস বিপ্লবে প্রলেতারিয়েত তার নিজস্ব দাবি নিয়ে হাজির হয় ঠিক তারই পূর্বক্ষণে আমরা যখন পথিবীর সামনে এই কথা ঘোষণা করেছিলাম, সেদিন অতি অল্প কণ্ঠেই তার প্রতিধ্বনি উঠেছিল। ১৮৬৪ সালের ২৮শে সেপ্টেম্বর কিন্তু পশ্চিম ইউরোপের অধিকাংশ দেশের শ্রমিকেরা আন্তর্জাতিক শ্রমজীবী মানুষের সমিতিতে হাত মেলায়, এ সমিতির সমিতি অতি গৌরবর্জনক। সত্যকথা, আন্তর্জাতিক বেঁচে ছিল মাত্র নয় বছর। কিন্তু সকল দেশের শ্রমিকদের যে চিরন্তন ঐক্য এতে সৃষ্টি হয়েছিল, সে ঐক্য যে আজও জীবন্ত এবং আগের তুলনায় অনেক বেশি শক্তিশালী, বৰ্তমান কালটাই তার সর্বোত্তম সাক্ষ্য। কেননা ঠিক আজকের দিনে যখন আমি এই পংক্তিগুলি লিখছি তখন ইউরোপ ও আমেরিকার প্রলেতারিয়েত তাদের লড়বার শক্তি বিচার করে দেখছে, এই সর্বপ্রথম তারা সংঘবদ্ধ, সংঘবদ্ধ একক বাহিনী রূপে, এক পতাকার নিচে, একটি উপস্থিত লক্ষ্য নিয়ে: ১৮৬৬ সালে আন্তর্জাতিকের জেনেভা কংগ্রেসে ও আবার ১৮৮৯ সালে প্যারিস শ্রমিক কংগ্রেসে যা ঘোষিত হয়েছিল। সেইভাবে আইন পাশ করে সাধারণ আট ঘণ্টা শ্রমদিন চালু করতে হবে। আজকের দিনের দশ্য সকল দেশের পুঁজিপতি ও জমিদারদের চোখে আঙ্গল দিয়ে দেখিয়ে দেবে যে আজ সকল দেশের শ্রমিকেরা সত্যই এক হয়েছে।

নিজের চোখে তা দেখবার জন্য মার্কস যদি এখনও আমার পাশে থাকতেন!

ফ্রেডারিক এঙ্গেলস
লণ্ডন, ১লা মে, ১৮৯o

———–
1) লাসাল আমাদের কাছে ব্যক্তিগতভাবে সর্বদাই স্বীকার করতেন যে তিনি মার্কসের ‘শিষ্য’ এবং সেই হিসাবে ‘ইশতেহারই’ তাঁর মতের ভিত্তি। তাঁর যে ভক্তরা রাষ্ট্ৰীয় ক্রেডিটের সাহায্যে উৎপাদক সমবাদ্য সম্বন্ধে তাঁর দাবির চেয়ে এগিয়ে যেতে চায়নি, যারা গোটা শ্রমিক শ্রেণীকে রাষ্ট্রীয় সাহায্যের সমর্থক এবং স্বাবলম্বনের সমর্থক এই দুই ভাগে ভাগ করতে চাইত, তাদের কথা অবশ্য সসম্পূর্ণ স্বতন্ত্র। (এঙ্গেলসের টীকা।)
2) কাল মার্কস ও ফ্রেডরিক এঙ্গেলস, রচনা-সংকলন, প্রথম খণ্ড, দ্বিতীয় অংশ দ্রষ্টব্য।– সম্পাদক