ইহার পর পাঁচ ছয় দিন

ইহার পর পাঁচ ছয় দিন একটানা ঘটনাহীনভাবে কাটিয়া গেল। ব্যোমকেশ আবার যেন বিমাইয়া পড়িল। সকালে কাগজ পড়া এবং বৈকালে টেবিলের উপর পা তুলিয়া দৃষ্টিহীন চক্ষু শূন্যে মেলিয়া থাকা ছাড়া তাহার আর কাজ রহিল না।

বীরেনবাবুও এ কয়দিনের মধ্যে দেখা দিলেন না‌, তাই তাঁহার তদন্ত কতদূর অগ্রসর হইল‌, জানিতে পারিলাম না। আগন্তুকের মধ্যে কেবল হাবুল একবার করিয়া আসিত। সে আসিলে ব্যোমকেশ নিজের অবসাদ ঝাড়িয়া ফেলিয়া নানাবিধ আলোচনায় তাহাকে প্রফুল্ল করিবার চেষ্টা করিত। কিন্তু হাবুলের মনে যেন একটা বিমর্ষ অবসন্নতা স্থায়ীভাবে আশ্রয় গ্রহণ করিয়াছিল। সে নৈরাশ্যপূর্ণ দীপ্তিহীন চোখে চাহিয়া নীরবে বসিয়া থাকিত‌, তারপর আস্তে আস্তে উঠিয়া চলিয়া যাইত।

বাড়িতে কি হইতেছে না হইতেছে‌, জিজ্ঞাসা করিলেও সে ভালরূপ জবাব দিতে পারিত না। বিমাতার রসনা নরম না হইয়া আরও তীক্ষ্ণ হইয়া উঠিয়াছে‌, তাহার কথার ভঙ্গীতে ইহার আভাস পাইতাম। শেষদিন সে নিশ্বাস ফেলিয়া বলিল‌, ‘বাবা আজ রাত্রে পাটনা যাচ্ছেন; সেখানে য়ুনিভার্সিটিতে লেকচার দিতে হবে।’ বুঝিলাম‌, শোকের উপর অহৰ্নিশি কথার কচকচি সহ্য করিতে না পারিয়া তিনি পলায়ন করিতেছেন। এই নিলিপ্তিস্বভাব বৈজ্ঞানিকের পারিবারিক অশান্তির কথা ভাবিয়া দুঃখ হইল।

সেদিন হাবুল প্ৰস্থান করিবার পর বীরেনবাবু আসিলেন। তাঁহার মুখ দেখিয়া বুঝিলাম‌, বিশেষ সুবিধা করিতে পারেন নাই। যা হোক‌, ব্যোমকেশ তাঁহাকে সমাদর করিয়া বসাইল।

আমাদের বৈকালিক চায়ের সময় হইয়াছিল‌, অচিরাৎ চা আসিয়া পৌঁছিল। তখন ব্যোমকেশ বীরেনবাবুকে জিজ্ঞাসা করিল‌, ‘তারপর-খবর কিছু আছে?’

পেয়ালায় চুমুক দিয়া বিমৰ্ষভাবে বীরেনবাবু বলিলেন‌, ‘কোনও দিকেই কিছু সুবিধা হচ্ছে না। যেদিকে হাত বাড়াচ্ছি কিছু ধরতে ছুঁতে পারছি না‌, প্রমাণ পাওয়া তো দূরের কথা‌, একটা সন্দেহের ইশারা পর্যন্ত পাওয়া যাচ্ছে না। অথচ‌, আমার দৃঢ় ধারণা জন্মেছে যে‌, এর ভেতর একটা গভীর রহস্য লুকোনো রয়েছে; যতই প্রতিপদে ব্যর্থ হচ্ছি‌, ততই এ বিশ্বাস দৃঢ় হচ্ছে।’

ব্যোমকেশ জিজ্ঞাসা করিল‌, ‘মৃত্যুর কারণ সম্বন্ধে নূতন কিছু জানতে পেরেছেন?’

বীরেনবাবু বলিলেন, ‘আমি ডাক্তার সাহেবের সঙ্গে দেখা করেছিলুম। তিনি অবশ্য রিপোর্টের বাইরে যেতে রাজী নন‌, তবু মনে হল‌, তাঁর একটা থিয়োরি আছে। তিনি মনে করেন‌, কোনও অজ্ঞাত বিষের বাষ্প নাকে যাওয়ার ফলেই মৃত্যু হয়েছে। তিনি খুব অস্পষ্ট আবছায়াভাবে কথাটা বললেন বটে‌, তবু মনে হল‌, তাঁর ঐ বিশ্বাস।’

ব্যোমকেশ একটু ভাবিয়া বলিল‌, “উনুন ধরাবার সময় মৃত্যু হয়েছিল‌, এ কথা ডাক্তারকে বলেছিলেন বুঝি?’

‘হ্যাঁ।’

আরও কিছুক্ষণ চুপ করিয়া থাকিয়া ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘যাক। আর এ দিকে? ডাক্তার রুদ্র সম্বন্ধে খোঁজ নিয়েছিলেন?’

‘হ্যাঁ। যতদূর জানতে পারলুম‌, লোকটা নির্জলা পাষণ্ড আর অর্থাপিশাচ। কয়েকজন ধনুষ্টঙ্কারের রোগীর উপর নিজের আবিষ্কৃত ইনজেকশান পরীক্ষা করতে গিয়ে তাদের সাবাড় করেছে‌, এ গুজবও শুনেছি। কিন্তু দুঃখের বিষয়‌, বর্তমান ব্যাপারে তাকে খুনের আসামী করা যায় না। দেবকুমারবাবুর মেয়ের সঙ্গে ওর ছেলের সম্বন্ধ হয়েছিল‌, এ খবরও ঠিক। লোকটা দশ হাজার টাকা বরপণ দাবি করেছিল। দেবকুমারবাবুর অত টাকা দেবার ক্ষমতা নেই‌, কাজেই তাঁকে সম্বন্ধ ভেঙে দিতে হল। ডাক্তার রুদ্র’র ছেলেটা কিন্তু ভদ্রলোক। বাপের সঙ্গে এই নিয়ে তার ভীষণ ঝগড়া বেধে গিয়েছিল। ইতিমধ্যে এ বাড়িতে এই কাণ্ড–মেয়েটি হঠাৎ মারা গেল। তারপর ছোকরাটি শুনলুম বাড়ি ছেড়ে কোথায় চলে গেছে; তার বিশ্বাস‌, তার বাপাই প্ৰকারান্তরে মেয়েটির মৃত্যুর কারণ।’

মন্মথ যে পিতৃগৃহ ত্যাগ করিয়া চলিয়া গিয়াছে‌, এ সংবাদ নূতন বটে‌, কিন্তু আর সব কথাই আমরা পূর্ব হইতে জনিতাম। তাই পুরাতন কথা শুনিতে শুনিতে ব্যোমকেশ একটু অন্যমনস্ক হইয়া পড়িয়ছিল। বীরেনবাবু থামিলে সে প্রশ্ন করিল‌, ‘দেবকুমারবাবুর আর্থিক অবস্থা সম্বন্ধে অনুসন্ধান করবেন বলেছিলেন‌, করেছিলেন না কি?’

‘করেছিলুম। তাঁর আর্থিক অবস্থা ভাল নয়। ধারকার্জ নেই বটে‌, কিন্তু মেয়ের বিয়েতে দশ-বারো হাজার টাকা খরচ করা তাঁর অসাধ্য। লোকটি বোধ হয় বেহিসাবী‌, সাংসারিক বুদ্ধি কম। কলেজ থেকে বর্তমানে তিনি আটশ’ টাকা মাইনে পান। কিন্তু শুনলে আশ্চর্য হবেন‌, এই আটশ’ টাকার অধিকাংশই যায় তার বীমা কোম্পানির পেটে। পঞ্চাশ হাজার টাকার লাইফ ইন্সিওরেন্স করিয়েছেন‌, তাও এত বেশি বয়সে যে প্রিমিয়াম দিয়ে হাতে বড় কিছু থাকে না।’

ব্যোমকেশ বিস্মিতভাবে বলিল‌, ‘পঞ্চাশ হাজার টাকার লাইফ ইন্সিওরেন্স! নিজের নামে করেছেন?’

‘শুধু নিজের নামে নয়—জয়েন্ট পলিসি‌, নিজের আর স্ত্রী নামে। মাত্র এক বছর হল পলিসি নিয়েছেন। দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রী–তিনি মারা গেলে পাছে বিধবাকে পথে দাঁড়াতে হয়‌, এই জন্যেই বোধ হয়। দুজনে একসঙ্গে বীমা করিয়েছেন। এ টাকায় উত্তরাধিকারীদের দাবি থাকবে না।’

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘হুঁ। আর কিছু?’

বীরেনবাবু বলিলেন, ‘আর কি? দেবকুমারবাবুর ছেলে হাবুলের পিছনেও লোক লাগিয়েছিলুম–যদি কিছু জানতে পারা যায়। সে ছোকরা কেমন যেন পাগলাটে ধরনের‌, কলেজে বড় একটা যায় না‌, রাস্তায় ঘুরে বেড়ায়‌, কখনও পার্কে চুপ করে বসে থাকে। আপনার কাছেও রোজ একবার করে আসে‌, জানতে পেরেছি।’

এই সময় হঠাৎ লক্ষ্য করিলাম‌, ব্যোমকেশের সে শৈথিল্য আর নাই‌, সে যেন অন্তরে-বাহিরে জাগ্রত হইয়া উঠিয়াছে। অনেক দিন পরে তাহার চোখে সেই চাপা উত্তেজনার প্রখর দৃষ্টি দেখিতে পাইলাম। কিছু না বুঝিয়াও আমার রক্ত চঞ্চল হইয়া উঠিল।

ব্যোমকেশ কিন্তু বাহিরে কোনও উত্তেজনা প্রকাশ করিল না‌, পূর্ববৎ বিরসস্বরে বলিল‌, ‘হাবুলকে বাদ দিতে পারেন। উঠছেন না কি? থানাতেই থাকবেন তো? আচ্ছা যদি দরকার হয়‌, ফোনে খবর নেব।’

বীরেনবাবু একটু অবাক হইয়া গাত্ৰোত্থান করিলেন। তিনি প্ৰস্থান করিবার পর ব্যোমকেশ কিছুক্ষণ পিছনে হাত দিয়া ঘরময় পায়চারি করিল; দেখিলাম‌, তাহার চোখে সেই-পুরাতন আলো জ্বলিতেছে। বীরেনবাবুকে সে হঠাৎ এমনভাবে বিদায় দিল কেন‌, জিজ্ঞাসা করিতে যাইতেছি। এমন সময় সে চেয়ারের পিঠ হইতে শালখানা তুলিয়া লইয়া বলিল‌, ‘চল‌, একটু বেড়িয়ে আসা যাক। বদ্ধ ঘরে বসে মাথাটা গরম বোধ হচ্ছে।’

দুজনে বাহির হইলাম। অকারণে বাড়ির বাহির হইতে ব্যোমকেশের একটা মজ্জাগত বিমুখতা ছিল; কাজ না থাকিলে সে ঘরের কোণে চুপ করিয়া বসিয়া থাকিতে ভালবাসিত। আমিও তাহার সঙ্গদোষে কুনো হইয়া পড়িয়ছিলাম‌, একাকী কোথাও যাইবার অভ্যাসও ছাড়িয়া গিয়াছিল। তাই আজ তাহার উত্তপ্ত মস্তিষ্ক ফাঁকা জায়গায় বিশুদ্ধ বাতাস কামনা করিতেছে দেখিয়া খুশি হইয়া উঠিলাম।

পথে চলিতে চলিতে কিন্তু খুশির ভাব বেশিক্ষণ স্থায়ী হইল না। জনসঙ্কুল পথে ব্যোমকেশ এমনই বাহ্যজ্ঞানহীন উদভ্ৰান্তভাবে চলিতে লাগিল যে‌, ভয় হইল এখনই হয়তো একটা কাণ্ড বাধিয়া যাইবে। আমি তাহাকে সামলাইয়া লইয়া চলিবার চেষ্টা করিলাম‌, কিন্তু সে অপ্রশমিত বেগে ইহাকে উহাকে ধাক্কা দিয়া‌, একবার এক বৃদ্ধ ভদ্রলোকের পা মাড়াইয়া দিয়া কয়েক মুহুর্ত পরে পুস্তকহস্তা এক তরুণীকে ঠেলা দিয়া দৃকপাত না করিয়া জগন্নাথের অপ্রতিহত রথের মত অগ্রসর হইয়া চলিল। বাস্তবিক‌, এতটা আত্মবিস্মৃত তাহাকে আর কখনও দেখি নাই। তাহার মন যে অকস্মাৎ শিকারের সন্ধান পাইয়া বাহেন্দ্ৰিয়ের সহিত সংযোগ হারাইয়া ছুটিয়াছে‌, তাহা আমি বুঝিতেছিলাম বটে‌, কিন্তু তাহার মনস্তত্ত্ব সম্বন্ধে সম্পূর্ণ উদাসীন পথচারী তাহা বুঝিবে কেন?

ভর্ৎসনা-ভ্রূকুটির স্রোত পিছনে ফেলিয়া কোনক্রমে কলেজ স্কোয়ার পর্যন্ত আসিয়া পৌঁছিলাম। হাস্য-আলাপরত ছাত্রদের আবর্তমান জনতায় স্থানটি ঘূর্ণিচক্রের মত পাক খাইতেছে। আমি আর দ্বিধা না করিয়া ব্যোমকেশের হাত শক্ত করিয়া ধরিয়া ভিতরে ঢুকিয়া পড়িলাম। এখানে আর যাহাই হউক‌, বৃদ্ধ এবং তরুণীকে বিমৰ্দিত করিবার সম্ভাবনা নাই; সুতরাং অশিষ্টতা যদি কিছু ঘটিয়া যায়‌, ফাঁড়াটা সহজেই কাটিয়া যাইবে। আমাদের দেশের ছাত্ররা স্বভাবত কলহপ্ৰিয় নয়।

পুকুরকে কেন্দ্ৰ করিয়া দুইটি জনপ্রবাহ বিপরীত মুখে ঘুরিতেছে; আমরা একটি প্রবাহে মিশিয়া গেলাম‌, সংঘাতের সম্ভাবনা অনেকটা কমিয়া গেল। ব্যোমকেশ তখনও স্থানকাল সম্বন্ধে সম্পূর্ণ অচেতন‌, তাহার ললাট একাগ্রচিন্তার সঙ্কোচনে ভ্রূকুটিবন্ধুর; কাঁধের শাল মাঝে মাঝে স্থলিত হইয়া পড়িতেছে‌, কিন্তু সেদিকে তাহার ভ্রূক্ষেপ নাই।

আমি ভাবিতে লাগিলাম‌, বীরেনবাবুর কথার মধ্যে এমন কি ছিল‌, যাহা ব্যোমকেশের নিষ্ক্রিয় মনকে অকস্মাৎ পাঞ্জাব মেলের এঞ্জিনের মত সক্রিয় করিয়া তুলিয়াছে? তবে কি রেখার মৃত্যু-সমস্যার সমাধান আসন্ন?

সমাধান যে কত আসন্ন‌, তখনও তাঁহা বুঝিতে পারি নাই।

আধা ঘণ্টা এইভাবে পরিভ্রমণ করিবার পর ব্যোমকেশের বাহ্য-চেতনা ধীরে ধীরে ফিরিয়া আসিল; সে সহজ দৃষ্টিতে আমার পানে তাকাইল। বলিল‌, ‘আজ দেবকুমারবাবু পাটনা যাবেন–না?’

আমি ঘাড় নাড়িলাম। ‘তাঁকে যেতে দেওয়া হবে না—‘ ব্যোমকেশ সম্মুখদিকে তাকাইয়া কথা অসমাপ্ত রাখিয়াই ক্ষিপ্রাচরণে অগ্রসর হইয়া গেল! দেখিলাম‌, এক কোণে একখানি বেঞ্চি ঘিরিয়া অনেক ছেলে জড়ো হইয়াছে এবং উত্তেজিতভাবে কথা বলিতেছে। ভিড়ের বাহিরে যাহারা ছিল‌, তাহারা গলা বাড়াইয়া দেখিবার চেষ্টা করিতেছে। তাঁহাদের ভাব দেখিয়া মনে হইল অসাধারণ কিছু ঘটিয়াছে।

সেখানে উপস্থিত হইয়া ব্যোমকেশ একটি ছেলেকে জিজ্ঞাসা করিল‌, ‘কি হয়েছে?’

ছেলেটি বলিল‌, ‘ঠিক বুঝতে পারছি না। বোধ হয়‌, কেউ হঠাৎ বেঞ্চে বসে বসে মারা গেছে।’

ব্যোমকেশ ভিড় ঠেলিয়া ভিতরে ঢুকিল‌, আমিও তাহার পশ্চাতে রহিলাম। বেঞ্চির সম্মুখে উপস্থিত হইয়া দেখিলাম‌, একটি ছোকরা ঠেসান দিয়া বসিয়া আছে–যেন বসিয়া বসিয়া ঘুমাইয়া পড়িয়াছে। মাথা বুকের উপর ঝুঁকিয়া পড়িয়াছে‌, পা সম্মুখদিকে প্রসারিত। অধরোষ্ঠ হইতে একটি সিগারেট বুলিতেছে–সিগারেটে অগ্নিসংযোগ হয় নাই। মুষ্টিবদ্ধ বাঁ হাতের মধ্যে একটি দেশলাইয়ের বাক্স।

একটি মেডিক্যাল ছাত্ৰ নাড়ি ধরিয়া দেখিতেছিল‌, বলিল‌, ‘নাড়ি নেই–মারা গেছে।’

সন্ধ্যা হইয়া আসিতেছিল‌, ভিড়ের মধ্যে ভাল দেখা যাইতেছিল না। ব্যোমকেশ চিবুক ধরিয়া মৃতের আনমিত মুখ তুলিয়াই যেন বিদ্যুদাহতের মত ছাড়িয়া দিল!

আমারও বুকে হাতুড়ির মত একটা প্ৰবল আঘাত লাগিল; দেখিলাম—আমাদের হাবুল।