এক দেশলাই বাক্স ফড়িং আর এক কোটো কেঁচো নিয়ে ওরা তিনজন যখন কোয়াটার্সের পেছন দিয়ে নিজেদের লুকিয়ে চা-বাগানের ভেতর ঢুকে পড়ল তখন আকাশেব মেঘের গায়ে ফাটল দেখা দিয়েছে। সূর্যদেবের হদিশ নেই। কিন্তু তিনি এখন মধ্যগগন অতিক্রম করেছেন সেটা বোঝা যাচ্ছে। যদিও চা-বাগানের ভেতর এখন একটা সাঁতসেতে গন্ধ, শেডট্রিগুলোতে ভিজে ছায়া জড়ানো। তবু এখন দিনটার চেহারা একটু পাল্টাচ্ছে বলে মনে হচ্ছিল। সরু পায়ে চলা পথ দিয়ে ওরা হাঁটছিল। প্ৰথমে বিশু ছিপ হাতে, মাঝখানে খোকন, সবশেষে দীপা। খোকনকে বিশু বলেছে। ছিপ দুটো লোক তিনজন। দীপা ঠিক করল সে কিছুতেই ছিপ হাতছাড়া করবে না। খোকনের মাছ ধরার ইচ্ছে হলে বিশুরটা নিক।

মাথার ওপর এক ঝাঁক টিয়া শব্দ করে উড়ে গেল। দূরে বড় সাহেবের বাংলো দেখা যাচ্ছে। চা-গাছের সবুজ কাপোটের ওপর নৌকোর মত। বাড়িটার আদল ওরকমই। ওরা তিনজন চটপট পায়ে চলছিল। দূরের আসাম রোড দিয়ে মদেশিয়া মেয়েরা সেজেগুজে হাটে চলেছে। তিনজন কোন কথা বলছিল না। ক্রমশ গভীর থেকে গভীর চা গাছের জঙ্গলে ঢুকে গেল ওরা। আর তখনই একটা বীভৎস শব্দ শুনতে পেয়ে বিশু দাঁড়িয়ে পড়ল। দীপা জিজ্ঞাসা করল, কিরে? বিশু ঠোঁটে আঙুল চেপে চুপ করতে বলল।

শব্দটা হচ্ছে থেমে থেমে, গোঙানোর মত। দীপা খোকনের হাত জড়িয়ে ধরল। খোকন বলল, চল ফিরে যাই। মাথার ওপর নানান রঙের পাখি সমানে চিৎকার করে যাচ্ছে ঝাঁকে ঝাঁকে। মাঝে মাঝে শেডট্রি থেকে নেমে আবার ওপরে উঠে যাচ্ছে।

বিশু পায়ে পায়ে এগিয়ে চলল। একটু বাঁক নিয়ে সে হী করে থেমে গেল। তারপর হাত নেড়ে ইশারায় ওদের ডাকল। শব্দটা একটু থামতেই ওরা ছুটে এল। বিশু দেখাল হাত তুলে। কয়েকটা চা গাছ তুলে নেওয়া হয়েছিল কোন কারণে। সেখানে একটা বিশাল পাইথন সাপ স্থির হয়ে তাদের দেখছে। সাপটা নড়ছে না। কারণ ওর মুখের ভেতরে একটা বড়সড় হরিণ ঢুকে আছে। হরিণের সামনের পা দুটো আর শিংওয়ালা মাথাকে গিলতে পারছে না সাপটা। দীপা চিৎকার করে উঠতেই সাপটা নড়বার চেষ্টা করল। খোকন জিজ্ঞাসা করল, কি সাপ রে?

বিশু বলল, অজগর। হবিণটাকে গিলতে পারছে না। কি বিরাট মুখ, না রে!

খোকন বলল, আমাকেও গিলে ফেলবে।

বিশু মাথা নাডল, এখন পাববে না। শিংদুটো আটকে গেছে না! চল, আমরা এদিক  দিয়ে চলে যাই। সে আবার হাঁটতে শুরু করলে বাকি দুজন অনুসরণ করল। দীপা বলল,  ফেবার সময় এই রাস্তা দিয়ে আমি মোটেই আসছি না বাবা।

খোকন জায়গা অতিক্রম করে হালকা গলায় বলল, এই জন্যেই তুই মেয়ে।

সঙ্গে সঙ্গে ভীষণ রাগ হয়ে গেল দীপার। সটান একটা চড় মারল খোকনের মাথায়। মেরে রুখে দাঁডাল! আচমকা চড় খেয়ে চিৎকার করে উঠল, তুই আমাকে মারলি কেন?

দীপা রাগত গলায় বলল,  বেশ করেছি। আমি তোকে সাবধান করে দিচ্ছি। কক্ষনো আমাকে মেয়ে বলবি না। মেয়ে তো কি হয়েছে? তুই যা পারিস আমি তা পারি না? ঢিসকল!

তুই আমাকে ঢিসকল বললি? খোকন প্ৰায় ঝাঁপিয়ে পডল। দীপা ধাক্কা সহ্য করতে না পেরে মাটিতে পড়ে গেল। এবং পড়েই আবার উঠে এগোতে যাওয়ামাত্র পেছনে সাপটা সেই একই গলায় অনেকক্ষণ বাদে গোঙানি শুরু করল। সঙ্গে সঙ্গে থেমে গেল দীপা। খোকনের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল। বিশু দূরে দাঁড়িয়ে চুপচাপ ওদের কাণ্ড দেখছিল। এবার বলল, চলে আয়। ডাকটায় কাজ হল। ওর পেছন পেছন হাঁটতে হাঁটতে এরা দুজন কথা বলছিল না।

একসময় নদীটা দেখা গেল। চা-বাগান আর ফরেস্টের মধ্যে দিয়ে বয়ে গেছে। চওড়ায় বড় জোর ফুট তিরিশেক। স্রোত খুব। ওপাশের ফরেস্টের ছায়া পড়ায় জলের রঙ কালো; মাঝে মাঝে ফুট পাঁচেক জল কিন্তু বেশীর ভাগটাতেই নুড়ি দেখা যাচ্ছে। বিশু নিজে বড় ছিপটা নিয়ে কেঁচো পারাতে বসল। দুটো ছিপই সে একসঙ্গে বয়ে এনেছে। খোকন খপ করে দ্বিতীয় ছিপ নিয়ে নিতেই দীপা চেঁচাল, অ্যাই বিশু, আমার ছিপ যেন আর কেউ না নেয়।

খোকন ছিপ থেকে সুতো খুলতে খুলতে বলল, ছিপের গায়ে কারো নাম লেখা নেই।

দীপা চেঁচাল, বিশু বলেছে বঁড়শি কিনতে আমি পয়সা দিয়েছি।

কথাটা শোনামাত্র খোকন ছিপ ছুঁড়ে ফেলে দিল। তারপর পকেট থেকে একটা মোটা কাঠি বের করল। দীপা দেখল কাঠির গায়ে বেশ খানিকটা সবুজ সুতো জড়ানো। খোকন বলল, বিশু আমাকে কেঁচো দে তো। বান ধরব। দেখি আর কেউ কেমন রুই কাতলা মারে।

দীপা ছিপ তুলে নিয়ে সরে গেল একপাশে। নদীটার মূল স্রোত উল্টোদিকে তাই এপারের এখানটায় জল খানিকটা স্থির। সে দেশলাই বাক্স বের করে একটা ছোট ফড়িং বের করল। করে অসহায় চোখে দুজনের দিকে তাকাল। দুজনেই বঁড়শিতে কেঁচো গাথছে। ফড়িঙের শরীরের ভেতরে বঁড়শি ঢোকানোর সময় একটু লালচে রস বের হয়। কিরকম ঘিন ঘিন করে ওঠে শরীরটা তখন। এখন ওদের কাছে সাহায্য চাইলে খোকন নির্ঘাৎ হাসবে। মরীয়া হয়ে ফড়িঙটাকে বঁড়শিতে গাঁথল দীপা। বাঁকানো বঁড়শিটাকে ফড়িঙের শরীর ঢেকে দিতেই মন ভাল হল। এসব জায়গায় বেশী লোকজন আসে না। মাছ মারারা অবশ্য মাঝে মাঝে জাল ফেলে। তবে সব জায়গায় নয়। ওরা যায় ড়ুড়ুয়া নদীতে। এখানে জাল ফেললে তা নদীর বুকে পাথরে আটকে থাকাই স্বাভাবিক। নদীর গা ঘেঁষে খানিকটা হেঁটে একটু গভীর জল দেখে ছিপ ফেলল দীপা। ফাৎনাটা সবে ড়ুবেছে কি ডোবেনি আমনি সেটা জলের তলায় তলিয়ে গেল। ব্যাপারটা বুঝতেই জোরে টান মারল দীপা। আর সঙ্গে সঙ্গে জলের ওপর রুপোলি ঝিলিক। দীপা আনন্দে চেচিয়ে উঠল, দাখি, আমিই প্ৰথম ধরলাম। সরপুঁটি। বঁড়শি থেকে ছাড়াতে গিয়ে ইঞ্চি দুয়েক লম্বা মাছটার মুখ থেকে রক্ত বের হল। একটা চোরকটা গাছ তুলে নিয়ে তার ডগা মাছের কানকো দিয়ে ঢুকিয়ে মুখের ভেতর থেকে বের করে আনল সে। তারপর মাছটাকে ফেলে রাখল ঘাসের ওপর।

আধঘণ্টার মধ্যে বিশু আর দীপা টপটপ মাছ তুলতে লাগল জল থেকে। দীপা আড়চোখে দেখেছে খোকন বারংবার জায়গা পরিবর্তন করেও কিছু পায়নি। সে পাড় থেকে ঝুঁকে বঁড়শিটাকে জলের মধ্যে ড়ুবিয়ে দিচ্ছে যতক্ষণ না ফাৎনা ওপরে ভাসে। বঁড়শি থাকছে মাটির ওপর। এবার খোকন ওপর থেকে-সুতো নাচাচ্ছে। খাদ্যবস্তুকে জীবন্ত ভেবে কোন জলচর প্রাণী এসে গিললেই ফাৎনা ড়ুববে এবং খোকন সেটাকে টেনে তুলবে। কিন্তু ব্যাপারটাই ঘটছে না। দীপা চিৎকার করে বিশুকে বলল, আমার নটা হল, তোব কটা।

বিশু জবাব দিল, বারোটা।

রুই কাতলা না ধরতে পারি পুঁটিতো ধবছি। দীপা হাসল।

খোকন চলে এল ওর নিজের জায়গা ছেড়ে, এঃ, এই জায়গাটা পুঁটিতে পটিতে ছেয়ে, গেছে। সব তেতো পুঁটি। অন্ধও ধরতে পাবে।

দীপা নিজের মনে বলল, নাচতে না জানলে উঠোন বাঁকা। খোকন সেই কথায় কান না দিয়ে বলল, বিশু, আমি ওপাশ দিয়ে নদী পার হয়ে ফরেস্টের দিকে যাচ্ছি। ওই জায়গায় ভাল মাছ আছে মনে হচ্ছে। অন্ধকার অন্ধকার।

বিশু আর একটা মাছ তুলতে তুলতে বলল,  অন্ধকারেই তো বান মাছ থাকে। তোর বানের বঁড়শি, পুঁটি উঠবে কেন? তাড়াতাডি করিস। সন্ধ্যের আগেই ফিরতে হবে।

খোকন নদীর উজান ধরে এগিয়ে গেল কিছুটা। তারপর নুড়ি দেখতে পেয়ে জলে নামল। দীপার খুব মজা লাগছিল। যেমন পেছনে লাগতে চাওয়া তেমন শাস্তি, জলে নামতে হল তো। সে দেখল কখনও কখনও জল খোকনের হাঁটুর অনেক ওপরে উঠে যাচ্ছে। হাফ প্যান্ট উঁচু করে ধরে পা মেপে মেপে শেষ পর্যন্ত পা্র হয়ে গেল সে। তারপর খানিকটা নিচে এসে ঠিক ওদের বিপরীত দিকে দাঁড়িয়ে বঁড়শি ফেলল জলে। ওর পেছন দিকে গভীর জঙ্গলের অন্ধকার। দীপা আবার নিজের মাছ ধরায় মন দিল। এখানে বোধ হয় আর পুঁটি নেই। বিশুও সরে গেছে অনেকটা ফাৎনাটা নড়ছে অনেকসময় ধরে ভেসে থাকার পরে। হঠাৎ ওপার থেকে খোকন চিৎকার করে উঠল। কিছু একটা টান দিয়ে ওপরে তুলেছে সে। তারপরেই বলল, একটা ইয়া বড় কাঁকডা, কি করব? বিশু দূ্র থেকে উত্তর দিল, পা দাঁড় ভেঙ্গে রাখ।

অতবড় দাঁড় আমি ভাঙতে পারব না। খেপে গেছে।

বিশু জবাব দিল না। খোকন আবার জিজ্ঞাসা করল, কি করব বল না। জলে নেমে যাবে।

অতএর দীপা কথা না বলে পারল না, পাথব দিয়ে মার ওটাকে। শোনামাত্র খোকন একটা পাথর তুলে কাঁকড়াটাকে আঘাত করল। দীপা খুশী হল। মেয়ে বলা হয়েছিল, নিজের ঘটে তো এক ফোঁটা বুদ্ধি নেই। কিন্তু সে আর মাছ ধরতে পারছে না। হঠাৎ মনে হল ওপারে গেলে হত। কিন্তু জল ডিঙিয়ে যেতে সাহস হল না। সে দেখল বিশু জলে নেমে গেল। স্রোতটা হাঁটুর নিচে। সে জিজ্ঞাসা করল গলা তুলে, জলে নামলি কেন?

পাথর ঠোকরা ধরব। স্রোতে পাথরের গায়ে লুকিয়ে থাকে। বিশু জবাব দিল।

এইসময় খোকন আবার চেঁচাল, বান বান বান। দীপা দেখতে পেল জলের ওপরে একটা মোটকা সাপের মত কিছু কিলবিল করছে। লম্বায় দু ফুট হবে। বান মাছ বাড়িতে আসে না। অতএর সে যদি মাছটাকে ধরত তাহলে কোন লাভ হতো না। দীপা নিঃশ্বাস ফেলল। আর তখনই তার চোখ বিস্মফাবিত হল। খোকন যেখানে দাঁড়িয়ে বানমাছটাকে বঁড়শি থেকে খোলার চেষ্টা করছে তার হাত পনের দূরে  একটা ছোট্ট হাতি শুড় দোলাচ্ছে। দেখতে মজার কিন্তু দীপা শুনেছে বাচ্চা হাতির কাছাকাছি মা হাতি থাকরেই। সে চিৎকার করে বলল, খোকন তাড়াতাডি চলে আয়।

খোকন বঁড়শিতে গেঁথে থাকা মাছটাকে দেখিয়ে হাসল, এতবড় মাছ জীবনে ধরেছিস?

আর্তনাদ করল দীপা তোর পায়ে পড়ি চলে আয়। হাতি। সে হাত তুলে দেখাল জঙ্গল টা।

সঙ্গে সঙ্গে খোকন ঘাড় ঘোরাল। আর তারপরেই ওর শরীর জলে ঝাঁপিয়ে পড়ল। খোকনকে লাফাতে দেখে বাচ্চা হাতিটা যেন মজা পেল। ছুটে এল তরতর করে জলের ধারে। আর তখনই পেছন থেকে হুঙ্কার ভেসে এল; বিশু ততক্ষণে জল ছেড়ে উঠে এসেছে। ডাঙায়, পালা দীপা, হাতির সঙ্গে দৌড়ে পারব না আমরা।

দীপা ওর হাত ধরে কেঁদে ফেলল,  খোকনের কি হবে। ও তো এখনও মাঝখানে। বাচ্চাটা জলে নেমে পড়েছে। বিশু কি করবে বুঝতে পারছিল না খোকন তখন দ্রুত চলার কাবণেই বারংবার জলে আছাড় খাচ্ছে স্রোতের ধাক্কায। আবার পড়ি কি মরি করে ছুটছে। বাচ্চাটার সেই অসুবিধে নেই। সে ব্যবধান কমিয়েছে। খুব মজা পাচ্ছে যেন। পেছনে তখন অন্ধকার পাহাড়ের মত মা হাতি এসে দাঁড়িয়েছে। শুড় তুলে সম্ভবত সন্তানকে এগোতে নিষেধ করছে। সন্তান সেই নিষেধ শোনার পাত্র নয়। দেখে সে এবার জলে নামল। তখনই বিপর্যস্ত খোকন এপারে উঠে এল। দীপা ওর হাত ধরে টেনে বলল, দৌড়া।

ছিপ ফেলে রেখে মাছের কথা ভুলে ওরা দৌড়াতে লাগল। একবার পেছন ফিরে তাকিয়ে দীপা দেখল বাচ্চাটা উঠে এসেছে এপারে। কিন্তু কি করবে বুঝতে পারছে না। ওর মাটাকে সে তখন দেখতে পেল না। তিনটে শরীর প্রাণভয়ে দৌড়াচ্ছিল। শুধু খোকন পিছিয়ে পড়ছিল আর চিৎকার করছিল, আমাকে ফেলে যাস না। আমাকে ফেলে যাস না।

প্ৰায় মিনিট দশেক দৌড়বার পর ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে বিশু বলল, ওরা আসছে না। ফিরে তাকিয়ে নির্জন চা-বাগান দেখেও বিশ্বাস হচ্ছিল না দীপার। নিঃশ্বাস নিতে নিতে বলল, বলা যায় না। হাতির অনেক বুদ্ধি। হয়তো অন্য রাস্তা দিয়ে আসছে।

বিশু চারপাশে তাকিয়ে বলল, হাতি তো শুয়ে শুয়ে দৌড়াতে পারে না। এলে চ-গাছের ওপরে দেখা যেত। আর তখন খোকন হাঁপাতে হাঁপাতে ওদের কাছে এসে পৌঁছাল, আমি আর পারছি না। বিশু বলল, একটু দাঁড়িয়ে নে।

আর সেইসময় দীপার নজর পড়ল খোকনের পেছনে। সে চিৎকার করল, ওটা কি? খোকনের হাতে কাঠির সুতোটা জড়িয়ে আছে। আর তার আর এক প্রান্তে বানমাছটা এখনও বঁড়শিতে বিদ্ধ অবস্থায় রয়ে গেছে। অবশ্য তাকে আর বানমাছ বলে চেনা যাচ্ছে না। এতটা পথ খোকন যখন ছুটেছে তখন মাছটা মাটিতে ঘষতে ঘষতে এসেছে। মাটি লাগা একটা মোটকা দড়ি বলে মনে হচ্ছে।

বিশু বলল, সে কিরে! তুই বানমাছটাকে নিয়ে দৌড়ে এলি, বুঝতে পারিসনি?

না। খোকন হাত থেকে সুতোর বাঁধন খুলল অনেক চেষ্টার পর। তারপর বানমাছটাকে সুতোয় ধরে তুলে বলল, ধুয়ে নিলে ঠিক হয়ে যাবে।

দীপা খিলখিল করে হেসে উঠল, তুই কিরে! আমরা মরছি প্ৰাণের ভয়ে আর তুই মাছটাকে নিয়ে দৌড়ালি!

এতে প্ৰমাণ হল আমি মাছ ধরতে পারি তোরা পারিস না। খোকন বলল, বিশু খেপে গেল, চমৎকার। তোর জন্যে আমরা ছিপ মাছ ফেলে দৌড়ে এলাম। আর তুই এই কথা বলছিস! তোকে আমার সঙ্গে আনাই ভুল হয়েছিল।

খোকন বলল, ঠিক আছে, ছিপ সুতো বঁড়শির দাম চল আমি দিয়ে দেব।

বিশু চটপট বলল, তিন টাকা।

দীপা সঙ্গে সঙ্গে ধরিয়ে দিল, কিন্তু মাছগুলো? খোকন মুখ বেঁকিয়ে বলল, ধরেছিস তো কয়েকটা পুঁটি, চার আনাও হবে না। দীপা হাসল, পুঁটি মাছের দাম চার আনা কিন্তু ধরার আনন্দটার দাম? রাতে যখন ভাজা খেতাম তখন ভাবতাম নিজের হাতে ধরা মাছ খাচ্ছি। সেইটের দাম?

খোকন হঠাৎ ঘুরে দাঁড়াল, ঠিক আছে, আমি ওখান থেকে নিয়ে আসছি।

দীপা বলল, থাক, অনেক হয়েছে। তোর ঠাকুমা পুৰ্ণিমার রাতে বাতাবি লেবুর গাছে বসে বাতাবি খায়, ওখানে গেলে তুই অমরস্যার রাতে গাছে বসবি। নাড়ুগোপাল ছেলেকে হারিয়ে মাসীমা কেঁদে অন্ধ হয়ে যাবে। লাগবে না ছিপ।

ওরা ঘুর পথে আসাম রোডের দিকে হাঁটছিল। এই পথে ট্রাক্টর আসে পাতি নিয়ে যেতে তাই ঘাসের পথ বেশ চওড়া। সাপটাকে এড়ানো গেল হাতির তাড়া খেয়ে। কিন্তু বিশুর খুব মন খারাপ ধরা মাছ আর ছিপ ফেলে আসার জন্যে। দীপার চোখের সামনে কেবলই মা হাতিটা ভেসে উঠছিল। বুকের মধ্যে হিম ভাবটা ফিরে আসছিল। সে যদি না চেঁচাতো তাহলে খোকন বুঝতেই পারত না। তাহলে এতক্ষণে ওর শরীরটা নিয়ে হাতিরা ফুটবল খেলত। অথচ এমন অকৃতজ্ঞ একবারও সেটা স্বীকার করল না। ছেলেরা কি এমন অকৃতজ্ঞ হয়? এইসময় চা-বাগানের মধ্যে দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে খোকন বলল, এই, আমার খুব শীত করছে।

দীপার খেয়াল হল। জলে নাকানি চুবুনি খেয়ে খোকনের জামা প্যান্ট ভিজে চপচপে হয়ে গিয়েছিল। এখনও জল ঝরিছে টপটপ করে। শীত করাটা খুব স্বাভাবিক ব্যাপার। সে বলল, তাড়াতাড়ি পা চালা।

খোকন বলল, আমি এই অবস্থায় বাড়িতে যেতে পারব না।

দীপা জিজ্ঞাসা করল, কেন?

বাবা মেরে ছাল ছাড়িয়ে নেবে।

কালো বাঁদব থেকে সাদা বাদব হবি, ক্ষতি কি? দীপা হাসল।

তোবা। আমার বন্ধু নস। সবসময় আমার পেছনে লাগিস! গাঢ় গলায় বলল খোকন।

আর কখনও আমাকে মেয়ে বলে ঠাট্টা করবি?

না।

তিনবাব বল।

না, না, না।

দীপা খুব ভেবে নিয়ে বলল, ঠিক আছে, তুই বাড়ির পেছনে দাঁড়িয়ে থাকবি, বিশু গিয়ে ওর প্যান্ট আর গেঞ্জি এনে তোকে দেবে। তুই তাই পরে বাড়িতে ঢুকে নিজেরটা পরে নিয়ে বিশুকে ফেরত দিবি। ঠিক আছে?

কিন্তু মা দেখেছিল। আমি সার্ট পরে বেরিয়েছি।

মাসীমার মনে নেই। আচ্ছা, সেইসময়। আমি মাসীমার সঙ্গে গল্প কবর।

তোর খুব বুদ্ধি। খোকন আপ্লুত হল।

এইসময় বিশু ঠোঁটে আঙুল চেপে শব্দ করল, চুপ কবার জন্যে। ওরা দাঁড়িয়ে পড়ল। না, কোন গোঙনি শব্দ কানে আসছে না। ওরা বিশুকে ইশারায় কারণ জানতে চাইল। বিশু বলল, চাপা গলায়। আমি যেন শুনতে পেলাম। কেউ সামনে কথা বলছে!

ভূত, নয়, তো! ফিসফিস করে খোকন বলল।

ভূত বলে কিছু নেই, মানুষেই ভূত। সত্যসাধনবাবুর কাছে শোনা কথা উগরে দিল দীপা নিচু গলায়।

ওরা আর একটু এগোলি। এবং তখনই আবার একটা চকচকে শব্দ শুনতে পেল। তারপরই একটি নারী কণ্ঠ বলে উঠিল, তুমি আমাকে করে বিয়ে করবে বল?

পুরুষ কণ্ঠটি বললে, কি আশ্চর্য। চাকরি না পেলে বিয়ে করা যায়?

করে চাকরি পাবে?

চেষ্টা তো করছি। বড় সাহেব যে কি ভাবছে কে জানে। পরশুদিন লক্ষ্মীপাড়া বাগানের সঙ্গে ম্যাচ আছে; যদি জিততে পা্রি, মানে গোল দিতে পারি তাহলে চাকরিটা হতে পাবে।

আমি শ্মশানের কালীবাড়িতে গিয়ে মানত করব।

যা খুশী কর, এখন একটা চুমু দাও তো অনেকক্ষণ ধরে।

দেব। কিন্তু আমাকে ছেড়ে যাবে না তো!

মরে যাওয়ার আগে না।

যদি তোমার বাবা অমত করে?

চাকরি পেয়ে গেলে কে বাবাকে তোয়াক্কা করে। আর একটা দীর্ঘস্থায়ী শব্দ হল। এবং তখনই মেয়েলি গলায় প্রতিবাদ বাজল, না।

কেন?

এসব করলে যদি বাচ্চা হয়ে যায়!

হবে না।

কি করে বুঝলে?

বইতে পড়েছি।

তারপর নিঃশব্দ। কথাগুলো ভেসে আসছিল ডানদিকের চা-গাছের ভেতর থেকে।

হঠাৎ দীপা দৌড়াতে লাগল। প্ৰাণপণে। অন্য দুজন ভ্যাবাচাকা খেয়ে তাকে অনুসরণ করল। একদমে ওরা চা-বাগান ছাড়িয়ে চলে এল আসাম রোডে। এসে দীপা বড় মুখ করে হাঁপাতে লাগল। খোকন জিজ্ঞাসা করল, ওরা চা-গাছের ভেতরে ঢুকে কি করছে রে?

দীপা মাথা নাড়ল, জানিনা।

খোকন আবার জিজ্ঞাসা করল, যদি সাপে কামড়ায়?

দীপা বলল, কামড়াক।

ইস। শ্যামলদাকে সাপে কামড়ালে গোল দেবে কে?

আমি জানিনা।

বিশু জানতে চাইল, মেয়েটা কে রে?

খোকন বলল, মনে হল ললিতা মাসীর গলা।

কি করে বুঝলি?

বাঃ, ললিতা মাসী ওইরকম গলায় কথা বলে।

কিন্তু ললিতা মাসী আর শ্যামলদা কত জায়গা থাকতে চাগাছের ভেতরে লুকিয়ে আছে কেন? ওরা তো একসঙ্গে মাঠেও হাঁটে না।

কি জানি! বড়দের ব্যাপার। আমি বুঝতেই পারিনা।

দীপা কোন কথা বলছিল না। পিচের রাস্তার দিকে তাকিয়ে সে হাঁটছিল। ললিতা মাসী দেখতে মোটেই সুশ্ৰী নয়। অন্তত ছযজন পাত্র এসে দেখে গিয়েছে ওকে। মালবাবুর মেয়ে। যে ছেলেটা এসেছে ওদের বাড়িতে সে ললিতা মাসীর আত্মীয়। মুখ চোখ নেপালির মত। মোটাসোটা। খুব রঙচঙে শাড়ি পরে। বিকেলবেলায় চুলে টেরি কেটে বাবান্দায মোড়া পেতে বসে। বাগানের কারো সঙ্গে যেচে কথা বলে না। সেই ললিতা মাসী চা গাছের ভেতরে শ্যামলদার সঙ্গে কি করছে? কিছুই বুঝতে পারছিল না। দীপা কিন্তু সেই শব্দটা কানে যাওয়ামাত্র মুখে রক্ত জমছিল। মন বলছিল, ব্যাপারটা ভাল নয়। সে হঠাৎ বন্ধুদের বলল, এই, দৌড়াচ্ছি? কে আগে যায় দেখি।

ওর বন্ধুরা কিছু বলার আগেই সে আর দৌড় শুরু করল। খোকন একটু চেষ্টা করেই থেমে গেল। দীপা মুখ ফিরিয়ে দেখল না। তার এখন বন্ধুদের সঙ্গে থাকতে ইচ্ছে করছিল না। আকাশে আবার মেঘ আসছে।

 

বারান্দায় মোড়া পেতে মনোরমা বসেছিলেন। এখন বিকেল। অমরনাথ একটু আগে বেরিয়ে গেছে তাস খেলতে। হাট থেকে মানুষজন ফিরতে আরম্ভ করেছে। মনোরমা চুপচাপ দেখছিলেন। হঠাৎ তাঁর ইচ্ছে হল অনন্তর সঙ্গে কথা বলতে। অনেককাল ধরে লোকটাকে তিনি দেখছেন; কি দক্ষতায় কালীঠাকুর তৈরী করে। ওর হাতে দেবী যেন জীবন্ত হয়ে ওঠেন।

মনোরমা উঠলেন। সিঁড়ি ভেঙ্গে নিচে নামতেই অঞ্জলির গলা পেলেন, কোথায় যাচ্ছেন, মা?

মনোরমা ইচ্ছেটা জানালেন। অঞ্জলি বলল, চলুন, আমিও দেখে আসি।

ওদিকে সব বন্ধ আছে?

হ্যাঁ। খাওয়া-দাওয়ার  বা পান মুখে অঞ্জলিকে বেশ সুখী সুখী দেখায়। মোটাসোটা বেঁটে অথচ মুখখানি লাবণ্যে টলটল। মালবাজারের পোস্টমাস্টার ছিলেন ওর বাবা। চারজন ভাই বোন। এখানকার পোস্টমাস্টারের বউ একদিন সম্বন্ধ আনলেন। ছবি দেখে পছন্দ হল। চোখ দেখে মনে হল এ মেয়ে আর যাই হোক নাকে দড়ি দিয়ে ঘোরাবে না। ছেলের বিয়ে দিয়ে এক পয়সা নেননি শুনে অনেকেই চোখ কপালে তুলেছিল। বউমার পরের বোনের বিয়ের সময় ওর বাবা প্ৰায় সর্বস্বাস্ত হয়েছেন। অনেককাল হয়ে গেল, এখনও এক দিনের জন্যেও বউমার সঙ্গে তাঁর বাক্যালাপ বন্ধ হয়নি। এটাও তো অনেকের কাছে বিস্ময়। নিজেকে পরিস্থিতি হিসেবে বদলে নিতে জানেন তিনি। খুব কষ্ট হয়। কিন্তু শেষপর্যন্ত তো পেরে যান। অন্যের মতের ওপর নিজেও মত চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা অবিরত করে যাওয়ার ফলেই তো অশান্তি হয়। মনে না নিয়েও তো মেনে নেওয়া যায়। আর সেরকম করলে প্ৰথমে অস্বস্তি হলেও শেষপর্যন্ত পরিবেশ যদি শান্ত থাকে তাহলেই শান্তি। অন্যের ব্যাপারে নাক বেশী গলান না বলেই তাঁর ব্যাপারে কেউ নাক গলায় না। এটাও তো স্বস্তির। ধীরে ধীরে পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে তিনি জিজ্ঞাসা করলন, পায়েস হয়ে গিয়েছে?

হ্যাঁ, বাটিতে ঢেলে এলাম। সব না পড়লে তো আবার মনে ধরবে না।

সে গেল কোথায়?

আছে আশেপাশে কোথাও।

তুমি এবার একটু রাশ ধরো।

আপনি ওকে শাসন করুন মা। আমার মাথা গরম হয়ে যায়। এরকম ব্যাটাছেলের মত মেয়ে আমি কখনও দেখিনি। কিছু বললেই জিজ্ঞেস করবে, কেন কি জ্বালা। ছোট দুজন ওকে দেখে দেখে সেটা শিখছে।

তাদের ঘুম ভাঙ্গেনি?

আমি ইচ্ছে করেই ডাইনি। যতক্ষণ ঘুমায় ততক্ষণ শান্তি। ফিরে এসে ডাকব।

বড়বাবুর বাড়ির বারান্দায় তাঁর বাবা বসেছিলান। লুঙ্গি এবং গেঞ্জি পরে। প্রায় পঁচাত্তর বছর বয়স, চোখে ভারি চশমা। ওঁদের দেখামাত্র উঠে চলে গেলেন ভদ্রলোক ভিতরে। একসময় উনি এই বাগানের বড়বাবু ছিলেন। এখন ছেলের আশ্রয়ে আছেন। বেশী কথা বলেন। অঞ্জলি চাপাগলায় বলল, বাঁচা গেল।

অনন্ত চোখ বন্ধ করে কাঠামোর সামনে বসেছিল। মনোরমা বললেন, কেমন আছ অনন্ত?

অনন্ত চোখ খুলল, ভাল মান। আমি ভাল আছি, ঠাকুর গড়তে যখন আসি তখন আমি খুব ভাল থাকি। আপনারা সবাই কুশলে তো?

এই আর কি। তোমাব চুল সাদা হয়ে যাচ্ছে যে।

তা বয়স তো এগোচ্ছে।

ওকথা বলোনা। তোমাকে তো সেই প্রথমদিন থেকে দেখছি। মনোরমার নিজের কথা মনে হল। এখনও একটাও দাঁত পড়েনি, চুলে পাক ধরেনি। বরং অমরনাথের চুলের রঙ পাল্টাতে শুরু করেছে।

অঞ্জলি জিজ্ঞাসা করল, এবার কি ঠাকুরের মুখ পাল্টাবে?

সেই কথাই ভাবছিলাম। চোখ বন্ধ করে মুখ কল্পনা করছিলাম। জানেন মা, মনে হল এবার সেই ঠাকুর গড়ি যিনি শিবের গায়ে সবে পা দিয়েছেন কিন্তু তখনও স্বামী বলে বুঝতে পারেননি। মনে মনে সেই মুখটা কল্পনা করছিলাম। অনন্ত হাসল।

কি রকম? অঞ্জলির কৌতূহল হল।

ক্ৰোধ আছে অথচ তার প্রকাশ নেই, দুঃখ আছে অথচ সেটা রয়েছে চাপা স্নেহ আছে কিন্তু তা বুকের ভেতরে। তাঁর মুখ অনিন্দ্যশ্ৰী, দেবী দুর্গাযাঁর কাছে ম্লান হয়ে যান। তিনি কোন অপরাধ করেছেন বলে বুঝতে পারেননি। তাই লজ্জিত নন। আর সেই কারণেই তাঁর জিহ্বা বাইরে বেরিয়ে আসেনি। তিনি অগ্নিশিখার মত গতিময়ী। সেই দেবীকে কল্পনা করতে গিয়ে মা একটু থমকে গিয়েছি।

মনোরমার খুব ভাল লাগছিল। তৎক্ষণাৎ জিজ্ঞাসা করলেন, কেন অনন্ত?

মা, যাঁকে আমি প্রতিমন গড়ি তিনি রণরঙ্গিণী, উর্ধ্বাঙ্গে বসন নেই, কোমর থেকে হাতের মালা তাঁর লজ্জা নিবারণ করছে। অথচ তাঁকে দেখে মোটেই আমাদের খারাপ লাগছে না কারণ তিনি জিহ্বা বের করে আছেন। তাকালেই সেই জিহ্বার দিকে প্রথমে চোখ যায়। ফলে কুভাবনা মনে আসেনা। দেবী যদি ঠোঁট টিপে থাকেন তাহলে মানুষের মন যে ছোট হয়ে যাবে। সমস্যাটা তো এখানেই। অথচ ওঁকে তো কোন পোশাকে বাঁধা যাবে না মা। অনন্ত চিন্তিত গলায় বলল।

এইসময় বড়বাবুর বাবা বেরিয়ে এলেন, আসুন, আসুন। বাইরে দাঁড়িয়ে কেন? মনোরমা দেখলেন উনি এর মধ্যে পাঞ্জাবি চাপিয়ে এসেছেন। অঞ্জলি বলল, লক্ষ্মীদি কি ঘুমাচ্ছেন মেসোমশাই?

না, না। বউমাকে দেখলাম উঠোনে। যাওনা মা ভেতরে, যাও।

অঞ্জলি চটপট মনোরমাকে বলল, মা, আমি একটু লক্ষ্মীদির সঙ্গে কথা বলে আসি। মনোরমা বুঝতে পারলেন অঞ্জলি বৃদ্ধকে এড়িয়ে যাওয়ার জন্যেই ভেতরে চলে গেল। বড়বাবুর বাবার নাম তেজেন্দ্র। বিপত্নীক মানুষ। তেজেন্দ্র বললেন, আহা, আপনি এ বাড়িতে এসে বাইরে দাঁড়িয়ে থাবেন তা কি হয়। এখানে বসুন। নিজেই একটা চেয়ার ভেতর থেকে টেনে বারান্দায় রাখলেন তিনি। অগত্যা মনোরমাকে সিঁড়ি ভেঙ্গে ওপরে উঠতে হল। সাদা থানের ঘোমটা আর একটু টেনে দিলেন। সন্তর্পণে চেয়ারে বসে মায়ের কাঠামোর দিকে তাকালেন। তেজেন্দ্ৰ তাঁর ইজি চেযারে।

তেজেন্দ্র জিজ্ঞাসা করলেন, আপনার শবীব কি রকম?

এই আর কি? মনোরমার কথা বলতে অস্বস্তি হচ্ছিল।

সাবধানে থাকবেন। বয়স তো হচ্ছে। খাওয়া-দাওয়ার অনিয়ম করবেন না। আমাদের বয়সী মানুষের কাছে গেলেই তো শুধু অসুখের গল্প শুনতে হয়। আমার দেখুন, একদম ফিট। লাস্ট জ্বর হয়েছিল তিরিশ বছর আগে! তাও সেবার জন সাহেবেবী সঙ্গে শিকারে গিয়ে সারারাত বৃষ্টিতে ভিজেছিলাম বলেই জ্বরটা এসেছিল। জনের বউ আমাকে বলত, বাবু, তোমার মত স্বাস্থ্য আমি ব্রিটিশদের মধ্যেও দেখিনি। তাতে জন খুব রেগে গিয়েছিল। বলেই হো হো করে হেসে উঠলেন তেজেন্দ্ৰ।

মনোরমা চুপ করে রইলেন। তেজেন্দ্র একটু অপেক্ষা করেই আবার কথা শুরু করলেন, তা চাকরি যখন করেছি তখন একরকম ছিলাম। বউ চলে গেল। কিন্তু অভাব বুঝিনি। সবাই বলেছিল ছেলের বয়স সতের হলেও তোমার বিয়ে করা উচিত। সময় পাইনি। এখন মনে হচ্ছে ভুল করেছি। ছেলের বিয়ে দিয়ে চাকরি থেকে অবসর নিয়ে আর সময় কাটতে চায় না। কেমন শূন্য লাগে চারধার। আপনার সেরকম মনে হয় না?

মানিয়ে নিতে হয়। এছাড়া অন্য জবাব মাথায় এল না মনোরমার।

ঠিক। মানিয়ে নেওয়া। কিন্তু কতটা? একটা মানুষ নেই যাকে মনের কথা বলি। আর সবাইকে কেমন যেন পর পর বলে মনে হয়। ধরুণ আমার কুঁচকিতে যদি একটা ফোড়া হয় তাহলে তো আর বউমাকে ডেকে বলতে পারি না সেঁক দিতে। এই বয়সে যদি মনের সঙ্গী না থাকে তাহলে বড় কষ্ট। তেজেন্দ্র দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

কোথাও ঘুরে আসুন। ভেতরের দরজার দিকে তাকালেন মনোরমা।

এইই। হরিদ্বারে যাব ভেবেছি। কিন্তু কি হবে গিয়ে। মনে শান্তি পাব? মোটেই না। একা একা কোথাও শান্তি পাব না। আবার দীর্ঘশ্বাস ফেললেন তেজেন্দ্ৰ, আপনি কি হরিদ্বারে গিয়েছেন কখনও?

মনোরমা মাথা নাড়লেন। তেজেন্দ্ৰ ভালভাবেই জানেন মনোরমা যাননি। এই বাগানের কে করে কোথায় যাচ্ছে তা সবাই জানে। তেজেন্দ্র বললেন, অমরনাথকে সেদিন বললাম, তোমার সংসারের জন্যে মা এত খাটছেন, ওঁকে তীর্থদর্শন করিয়ে আন। তা সে বলল বাড়ি ছেড়ে সবাই যাব কি করে। তা আপনি যদি যেতে চান আমার সঙ্গে যেতে পারেন। গুরুদেবের আশ্রম আছে সেখানে চমৎকার পরিবেশ। কোন অসুবিধে হবে না।

না  মনোরমা হাসবার চেষ্টা করলেন, আমি ভালই আছি।

না না কোন সঙ্কোচ করবেন না। আমাদের যা বয়স তাতে একসঙ্গে গেলে কেউ কিছু মনে করবেন না। নিজেরটা তো ভাবতে হবে। আর কতকাল সংসারে জড়িয়ে থাকরেন।

তেজেন্দ্রর কথা শেষ হওয়ামাত্ৰ মনোরমা নাতনিকে দেখতে পেলেন। আসাম রোড থেকে দৌড়ে মাঠে নামছে। যেন পেত্নী তাড়া করেছে ওকে। তিনি চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন, আমি আসছি। বউমাকে বলবেন। মানে দীপা এসে গেছে তো—। মনোরমা আর সেখানে দাঁড়ালেন না। দ্রুত গেটের বাইরে চলে এলেন। তাঁর কান গরম হয়ে যাচ্ছিল। মুখেও তাপ। অনেক অনেকদিন পরে। একি অস্বস্তি!

মনোরমাকে দেখে দীপা দাঁড়িয়ে পডল। ভয়ার্ত মুখ চোখ সেই সঙ্গে হাঁপিয়ে যাচ্ছে। মনোরমা কাছে এগিয়ে গেলেন ঘোমটা মাথায়, কি হয়েছে? কোথায় গিয়েছিলি?

মনোরমার সামনে আর একটু কুঁকড়ে গেল দীপা, মাছ ধরতে।

ওমা! তুই কি করে গেলি? মা জানলে কি হবে জানিস না? মনোরমা এই মূহুর্তে কঠোর হতে পারলেন না। তিনি জানেন তেজেন্দ্র তাঁর বাড়ির গেটের সামনে এসে দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি চাপা গলায় জিজ্ঞাসা করলেন, কি হয়েছে তোর?

কিছু না। খুব দ্রুত মাথা নাড়ল দীপা!

মিথ্যে কথা বলিসনা। মনোরমা একবার গেটের দিকে তাকাতে গিয়ে সামনে নিলেন, তুই একা মাছ ধরতে গিয়েছিলি? বিশু খোকন কোথায়?

পেছনে আসছে।

ওরা তোকে কিছু বলেছে?

না।

তাহলে?

শ্যামলদা–। ঢোঁক গিলল দীপা, শ্যামলদা আর ললিতা মাসী বাগানের ভেতর লুকিয়ে বসে আছে। কিসব কথা বলছিল ওরা।

মনোরমা সোজা হয়ে, দাঁড়ালেন। দীপার কাঁধ ধরে তিনি বাড়ির দিকে হাঁটতে লাগলেন। কিছুটা যাওযার পর চাপা গলায় জিজ্ঞাসা করলেন, মালবাবুর মেয়ে, ললিতা?

হুঁ!

কি বলছিল ওরা?

খারাপ খারাপ কথা।

মনোরমা নিজেকে সামলে নিলেন, হাত মুখ ধুয়ে নাও। কোন কথা খারাপ কোন কথা ভাল তা বোঝার বয়স তোমার হয়নি।

তুমি বলেছিলে আমার বয়সে তোমার বিয়ে হয়ে গিয়েছিল!

[contact-form][contact-field label=”Name” type=”name” required=”true” /][contact-field label=”Email” type=”email” required=”true” /][contact-field label=”Website” type=”url” /][contact-field label=”Message” type=”textarea” /][/contact-form]

.

? দীপা প্রশ্নটা করতেই মনোরম চুপসে গেলেন।

Share This