০৩. নেশা হওয়ার সম্ভাবনা নেই

না, নেশা হওয়ার সম্ভাবনা যে নেই, তা গোলাসে চুমুক দিয়েই বোঝা গেল। আমি মাতাল হতে চাই না কিন্তু একটা ঘোর ঘোর ভাব চাইছিলাম, আমেজ যাকে বলে, যার কোন চিহ্নই এখন আর নেই, সন্ধ্যাবেলার, হুইস্কি বা নীতার জিন, সব যেন গায়ের হয়ে গিয়েছে। এ রকমটা ঠিক হবার কথা নয় যে, প্রায় ছ সাত পেগ পেটে গেল, মিক্সও হল, অথচ শরীরটা একেবারে খটখটে। জার এখানে, এই মিডনাইট বার-এ, হুইস্কিতে কোন স্বাদই নাই, চোট্টার জল মিশিয়ে একেবারে হোল্ড করে দেনা, কারণ জানে, এখানে যারা আসে নেহাত দায়ে পড়েই আসে, কারণ নেশা জমেনি, অন্য বারগুলো বন্ধ হয়ে গেছে, অথচ নেশা করবার ঝোঁক চেপেছে, যতক্ষণ না হবে, ততক্ষণ খেয়েই যাবে, অতএব, পিলাও করপোরেশনকে পানী। অবশ্য অনেক মেয়েমানুষের খোঁজেও এখানে আসে, সেটাও একরকমের দায়ে পড়ে আসাই বলতে হবে, কেননা, কোথায় আবার এত রাত্রে মেয়েমানুষের খোঁজে যাবে, যদিচ রাজ্যের মত বুড়ি বেশ্যাগুলো, পায়ের থেকে মাথা পর্যন্ত রং মেখে, শ্লীভলেস, আঁট খাটো জামা পরে সন্ধ্যের সময় থেকেই, এক বোতল বীয়ার বা যা হোক একটা কিছু নিয়ে (আইন বাঁচিয়ে চলতে হবে তো, তাই খদ্দেরের ছদ্মবেশেই এসে বসতে হয়, কারণ বার তো আর বেশ্যাবৃত্তির জায়গা নয়, তা ছাড়া, বেশ্যাবৃত্তি তো অবার এ মুলুকে বে-আইনি, আহা, কৃপা কর মা, বেশ্যাবৃত্তি বে-আইনি, তাই-নিরোধের আইনে যাতে পড়তে না হয়, সবাইকেই খদ্দের সেজে বসতে হয়, তারপর তোমরা খদ্দেররা কার টেবিলে কে বসেছে, কে কাকে খাওয়াচ্ছে চোখ ইশারায় ডেকে নিয়ে গিয়েছ, কত টাকার রফা করেছে এবং কোথায় যাবে, তা আমার কান পেতে শোনার দরকার নেই।) বসে যায় এবং এদের মধ্য থেকেই যখন খুঁজে নিতে হবে, তখন সেটা দায়ে পড়েই আসা হয়। বিশেষ করে যাদের আবার দিশী মেয়ে ভাল লাগে না, যারা শাড়ীটাড়ি পরে, সেইরকম মেয়ে যাদের ভাল লাগে না, মেমসাহেবের বাতিক, (সে কালীই হোক তার ধলীই হোক, যে-পাড়ার, যে-মুলকের, যে ধর্মেরই হোক, মোটের উপরু। ইংরেজীতে বুকনিওয়ালী মেমসাহেব তাকে হতে হবে। তবু মেমসাহেব তো!) তারা আগে আসে এখানে। এই বার-এর খ্যাতি আবার সেই কারণেই যে মেয়েরা এখানে ভিড় করে, আর মেয়েরা সেখানে ভিড় করে, এই ধরনের মেরে, যাদের আসল লক্ষ্য ঠিক কলকাতার বাসিন্দা নয়, বন্দরের বিদেশী জাহাজী সাইয়া, উপোসী হাঙরের মত যারা এসে ঝাঁপিয়ে পড়ে, ট্যাঁকের কড়ি ফুঁকে দিতে যাদের ভাবনা নেই, কারণ পেটের ভাত জাহাজে বাঁধা, ফিরে গেলে খেতে পাবে ঠিক, তাদের যেখানে ভিড়, সেখানে কর্পোরেশনের জল মদে একটু মিরবে, এ তো জানা কথা। তবে এখানে শুধু বুড়িদের ভিড়, সেটা বললে ঠিক হবে না, দেখলেই বোঝা যায়, ছুড়িরা কারু না কারুর বগলে গলে গিয়েছে, কিংবা কেউ যেটু আগেভাগেই শিকার ধরে কেটে পড়েছে, যদিও কে সে শিকার, তা জানি, না, যার পকেটের টাকা, তাকেই বরাবর শিকার বলে আসা হয়েছে, আমি তা মানি না, কারণ টাকা দিয়ে যারা মেয়ে ধরে, সে কেন শিকারী নয় বুঝতে পারি, না, সে ব্যাটাও বুড়োহাবড়া ঘাগী রুগী সবই হতে পারে, অথচ দুর্নামের ভাগটা মেয়েদের বেলা। আমার মনে হয়েছে, এখানে অল্পবয়সী একটু দেখতে ভাল জোয়ান মেয়ে, পাতে পড়তে পায় না, টেবিলে এসে বসতে না বসতে হাসি, কোন কোন দিল তো মারামারিই লেগে যায়, চেয়ার ছোড়াছুঁড়ি পর্যন্ত গড়ায়, পুলিশকে ডাকতে হয়, তারপর খোকন গুডবয়ের মত চলে যান হাজাত। (লে হালুয়া) তবু বেশ্যারাই শিকারী, আর খদ্দেররা সব শিকার (আহ, বাছারে!) এই সম্পর্ক টাই বাজারে চালু আছে।

আমার উপায় ছিল না, নীতার এ্যাপার্টমেন্ট থেকে পায়ে হেঁটে কাছাকাছির মধ্যে, এই মধ্যরাত্রির শুড়িখানাই ছিল, তাই এসেছি, এবং বোধহয় এখানকার গোলমালের জন্যই, আরো খারাপ লাগছে, নেশা ধরছে না। মিউজিক আর গান। সব সময়েই চলছে, জোড়ায় জোড়ায় দল বেঁধে সব নাচছে, আর সেই একই গান, দি সান ইজ অলরেডি গ্লিমিং অন দি ক্যাকটাস, (এ গান কেন শুঁড়িখানায় বা এ গানটা নীলারই বা প্রিয়, তা জানি না।) নয় তো, মাই লাভ, মাই ডিয়ারেস্ট লাভ। এর সঙ্গে হাততালি আর টুইস্ট, আমার এসব ঠিক এজন্যই ভাল লাগছে না। সেই গোয়ানীজ মেয়েটা, এখানে যে মেয়েটাকে আমার সব থেকে বেশী ভাল লাগে, (কালো কিন্তু চেহারাটা দারুন, এক কথার কড়ামাল।) সেই মেয়েটা সম্ভবত ওর আজকের রাত্রের রফা করে ফেলা লোকটার সঙ্গে নাচতে নাচতেই, আমাকে কয়েকবার হাতছানি দিয়েছে, হেসেছে, যার অর্থ, তোমাকে দেখতে পেয়েছি এইরকম সম্ভাষণ, এবং আমিও সেইরকম ভাবেই হাত তুলে হেসেছি, ঠিক আছে, চালিয়ে যাও, তবু নেশা জমছিল না বলেই, ওকে পাবার মত বা ডেকে একটু খাওয়াবার মত ইচ্ছে হচ্ছিল না। এখানে আসা মানেই একটু হুল্লোড়বাজী করা এবং হুল্লোড়বাজী করতে এলে, ওই মেয়েটাফে না পেলেই আমার মেজাজ খারাপ হয়ে ওঠে, এটা মেয়েটাও জানে, তাই বোধহয় একটু সান্ত্বনাও আমাকে দিতে চাইল। কিন্তু সত্যি বলতে কি, নেশা তা জমছেই না, তার উপরে আমি বেশ ক্লান্তি বোধ করছি, যেন গড়াতে ইচ্ছে করছে, হাই উঠছে, চোখে ঘুম ঘুম ভাব, যেটা মোটেই নেশা বা আমেজ নয়। অথচ মাত্র তো সাড়ে দশটা বাজে, এ সময়ে একেবারে বিছানা দেবার মত অবস্থা তো কোনদিনই হয় না। নাঃ, কেটে পড়া যাক, বাড়ি গিয়ে শুয়ে পড়ি। তা ছাড়া, একটা মোটা-ঠোঁট রোগা মেয়ে, বুক উঁচিয়ে যেভাবে তাকাচ্ছে, টেবিলে উঠে এলেই এক পাত্তর কোন্‌ না গেঁড়িয়ে ছাড়বে, তার আগেই ওঠা ভাল, কেননা, গোয়ানীজ মেয়েটা হলে তবু একটা কথা ছিল, নেশা জমাবার চষ্টা করে দেখা যেত, আর ওই মেয়েটা, যার মুখের দিকে তাকালেই মনে হয়, একটু একটু শরীরে যা তাপ আছে তাও ভুস্‌ হয়ে যাবে, তাকে কাছে আসার সুযোগ না দেওয়াই ভাল। হাত তুলে বেয়ারাকে ইশারায় ডাকে, বিল দিতে বললাম। বেয়ারাকে ছুটতে হল না, ওর উর্দির পকেটেই বিল ছিল, যদিও জানাই ছিল, দু পাত্তর খেয়েছি, অর্থাৎ দু পেগ, (জলের মাপটা তার মধ্যে ধরতে হবে, কতটা, তা অবিশ্যি জানি না।) অতএব দামটা দিয়ে ওঠবার আগে, আর একবার মোটা ঠোঁওয়ালীটার দিকে ফিরে তাকালাম, এবং যা ভেবেছিলাম, ঠিক তাই, চোখাচোখি হতেই একটু হাসল, (উস্‌! দাঁতগুলোও উঁচু, নকল কি না, তাই বা কে জানে। ঠোঁট নাড়ল, যেন আমাকে গুডনাইট জানাল, যার অর্থ, মনে মনে হয়তো বলছে, ওরে শুয়োরের বাচ্চা কেটে পড়লি, একটা পেগ বাজাতে পারলাম না। আমিও একটু ঠোঁট নাড়ার ভঙ্গি করলাম, মনে মনে বললাম, শালুক চিনেছে…!

দারোয়ান দরজা খুলল, সেলাম ঠুকল, যার অর্থ, সিকেটা আধুলিটা যদি আমার হাত দিয়ে বেরোয়। বেরুবে না জানা কথাই, তাই সেলামের জবাব দূরের কথা, দেখতে না পাওয়াটাই হচ্ছে সবচেয়ে বড় সাহেবি ঢঙ, যদিও, কেন জানি না, কাঁধের কাছটা তবু একটু কুঁচকে যায়, আর আমি যেন পরিষ্কার শুনতে পাই, দরোয়ানটা আমার দিকে তাকিয়ে, কুকুরের হাসিটা, হায়েনার হাসিতে বেঁকিয়ে মনে মনে বলছে, শালা ফোকট কা সাব, হোটর মে দারু পীনে আয়া। মনে মনে শুনলাম, এবং আমিও মনে মনে বললাম, হ্যাঁ রে গাড়লদালাল (দালাল মানে পীম্‌প্‌), ওসব আমার জানা আছে—বলে ঘাড়ে একটা ছোট্ট ঝাকুনি দিয়ে রাস্তায় এসে দাঁড়ালাম। না, এখানে ট্যাক্সির অভাব নেই, প্রচুর আসছে, যাচ্ছে, বা এমনিতেও মিটারে, মাথায় আলো জ্বেলে অপেক্ষা করছে, (অনেকটা ওই মোটা ঠোঁট মেয়েটার মত মেয়েটার মত, বেকার বেশ্যার অপেক্ষা যাকে বলা যায়।) কারণ, জানে এখান থেকে ভাল খদ্দের পাওয়া যাবে, কিছু উপরি রোজগারের ব্যবস্থা খুবই স্বাভাবিক, চাই কি তেমন মাতাল হলে, পকেটে উজাড় করে সব কিছু ঝেড়ে দিয়ে, কোথাও শুইয়ে দিলেই হবে।

শীত, হুম্‌ তা মন্দ নয়, অথচ এই শীতটুকু লাগার কথা নয়, গা বেশ গরম থাকারই কথা, কিন্তু কোথায় আমার শরীরে যেন তেজ নেই, তাপ নেই, কী হল, কে জানে। একটি ট্যাক্সির হাতল ধরে, দরজা খুলে ভিতরে বসলাম। ড্রাইভার জিজ্ঞেস করল, কোথায় যেতে চাই, আমি সাউথ উচ্চারণ করলাম। খুশি হয়নি লোকটা বোঝাই গেল, কারণ মাতাল নাই, সঙ্গে মেয়েমানুষ নেই, নিশ্চয় মনে মনে বলছে, শালা কিসমত খারাপ।

কিন্তু, ওটা কে, নীতা নাকি? একটি মেয়েকে দেখে হঠাৎ তাই মনে হল, এবং সঙ্গে সঙ্গই মনে পড়ে গেল, নীতা ওর ঘরে মৃত পড়ে আছে, ওকে এখন এখানে দেখতে পাওয়া অসম্ভব। কে জানে, ঝি-টা এতক্ষণে এসেছে কি না, এসে থাকলেও নিশ্চয়ই ঘরে ঢুকতে পারেনি, চাবির ফুটো দিয়ে নিশ্চয়ই উঁকি মেরে দেখবার চেষ্টা করেছে, যেহেতু ঘরের আলো আমি অফ করিনি, তাই ফুটো দিয়ে হয়তো চোখেও পড়ছে, নীতা খালি গায়ে উপুড় হয়ে শুয়ে আছে। আচ্ছা, কোমরের কাপড়টা ঠিক ছিল তো? আমি তো আর টেনেটুনে দিয়ে আসিনি, সেসব খেয়াল আমার ছিল না, যদিও কোমর অবধি কাপড়ে টানা থাকলেও ঝি যা ভেবেছে, না থাকলেও তাই ভেবেছে, ভেবেছে যে, দিদিমণি আজ হয়তো খুব মাতামাতি করেছে, তাই এলিয়ে পড়ে আছে, যার সঙ্গে সঙ্গেই ভাববার চেষ্টা করছে, কে এসেছিল? এইসব ভাবতে ভাবতে, নিশ্চয় কলিংবেল টিপছে, বাইরে দাঁড়িয়ে নিজেই সে-শব্দ শুনেই, অথচ কোন সাড়া শব্দ না পেয়ে, আবার ফুটো দিয়ে উঁকি মেরেছে, দেখেছে, দিদিমণি যেমন শুয়ে থাকার তেমদি শুয়ে আছে, একটুও নড়াচড়া নেই। তারপরে জানি না বাবা, মরা মানুষ অনেকক্ষণ বাদে বেঁচে উঠেছে, এরকম তো শোনা যায়, সেই যে কে একটা লোক মরে যাবার পর পোড়াতে নিয়ে গিয়ে, শ্মশানে বেঁচে গিয়েছিল, দার্জিলিং-এ না কোথায়, সেও তো আবার খুনেরই ব্যাপার, কী যেন বলে, এক চাঞ্চল্যকর মামলা হয়েছিল, সেরকম হরে যাবার চান্স নেই তো! কেন না, এখন আবার বেঁচে উঠলে ফ্যাসাদ আছে, সত্যি সত্যি খুনের দায়ে পড়ে যাব। অথচ না, সত্যি কী যে বলি, আমি এখন প্রায় ভুলে যেতেই বসেছি, নীতাকে নিজের হাতেই মেরে ফেলেছি, যদিচ, আমার নিজের ধারণা, পাকা খুনীর মত আমি অনেককেই মনে মনে মেরেছি, যার হিসেব করাই দায়, সে হিসেবের মধ্যে আমার বাবা পর্যন্তু বাদ যায় না, তবু সত্যি, নীতাকে অথচ…।

আমরি এখন পরিষ্কার মনে পড়ছে, (না, ঠাণ্ডা বাতাস আসছে, কাচটা ভূলে দিই।) একটা অদ্ভুত স্বপ্ন আমিসপ্তাহ দুয়েক আগেই দেখেছিলাম, যার কোন মাথা-মণ্ডুই আমি বুঝতে পারিনি, এবং সেটা আসলে আমার নিজের কোন ব্যাপারই নয়, যে-ঘটনাটা আমি স্বপ্ন দেখেছিলাম। আমি দেখেছিলাম, নকশাকাটা লোহার রেলিংঘেরা একটা পুকুর, পীচের রাস্তার ধারেই সেই পুকুরটা, যার চারপাশে কী ছিল, সেটা সঠিক স্মরণ করতে পারছি না, যদ্দুর মানে হয়, শ্যাওলা-ধরা দেওয়াল ছিল। পুরনো বাড়ির দেওয়াল হতে পারে, তাতে হয়তো সেকালে বাড়ির মত জানালাও ছিল, আমার মনে পড়ছে না। যাই হোক, রেলিং ঘেরা থাকলেও রাস্তার ফুটপাতের উপর থেকেই সিঁড়ি নিচে নেমে গিয়েছে এবং একদা হয়তো লোহার গেট ছিল, যেটা তখন (আমার স্বপ্নের সময়ে।) আর ছিল না। যদিও, তখন দিনের বেলা, যেন কিছুক্ষণ আগে বৃষ্টি হয়ে গিয়েছে, রাস্তাটা ভেজা ভেজা, আকাশটা কালো কালো, রাস্তায় তেমন লোকজন নেই, অথচ সেটা একটা শহর, কোন শহর, তা কিছুতেই বুঝতে পারি, এখনো পারি না। আমি কোথা থেকেই বা এসেছিলাম, কেনই বা ওই সময়ে ওই দুই পুকুরের ধারে গিয়ে ছিলাম, তাও আমি জানি না, যে কারণে স্বপ্ন মানেই উৎকৃষ্ট গাঁজা বলে আমার ধারণা। আমি সেই পুকুর ধারে, নিচের সিঁড়িতে দেখেছিলান, একটা খালি গা ভিখিরির মত লোক, লাঠি দিয়ে জল খোঁচাচ্ছে। কী আছে দেখবার জন্যে আমিও উঁকি দিয়েছিলাম, এবং জলাটা এত পরিষ্কার, ঠিক যেন কাঁচের চেয়েও পরিষ্কার তলাটা দেখা যাচ্ছিল, যার জন্যে, আমি দেখেছিলাম, একটা ফর্সা মেয়ে জলের তলায় ডুবে আছে। মেয়েটার গায়ে কিছুই ছিল না, সে উপুড় হয়ে পড়েছিল। স্বপ্নে ছাড়া এমনটা কি সম্ভব যে, একটা মারা শরীর জলের তলায় ডুব থাকবে, আবার তা (একেই বোধহয় স্ফটিক স্বচ্ছ জল বলে।) দেখাও যাবে। বলিহারি স্বপ্ন বাবা কে জানে সেদিন পেটে কী পরিমাণ দ্রব্যসম্ভার ছিল। যতদূর মনে পড়ে, লোকটা লাঠি দিয়ে খুঁচিয়ে জলে ডোবা শবটা তুলতে চাইছিল, এবং আমি কেন তার পাশে বসে পড়েছিলাম, তার হাতের লাঠিটা নিয়ে আমিও মৃতদেহটা তুলতে চাইছিলাম, তার কোন কারণই জানি না। সেই ভিখিরির মত লোকটা বা মরা মেয়েটা, কেউ যে আমার পরিচিত না, তাতে কোন সন্দেহ নেই।…যখন এভাবে দেখছিলাম, তখনই হঠাৎ একটা পুলিস ভ্যান আসতে দেখেছিলাম দূর থেকে এবং দেখেই লাঠিটা ফেলে, পীচের রাস্তা পেরিয়ে, একটা কাচা রাস্তা ধরে চোঁচা দৌড় মেরেছিলাম। দুএকবার পিছন ফিরে তাকিয়েও দেখেছিলাম, ভ্যানটা পুকুরের সামনেই দাঁড়িয়ে ছিল, পুলিস নেমে এসেছিল, তাদের সঙ্গে একটা কুকুর। তারা কী যেন জিজ্ঞেস করেছিল সেই ভিখিরির মত লোকটাকে, লোকটা আমাকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছিল, আর সঙ্গে সঙ্গে পুলিস, আমার দিকে দৌড়ুতে আরম্ভ করেছিল। পুলিসের থেকেও অনেক তাড়াতাড়ি কুকুর আমার পিছনে ধাওয়া করেছিল, আমাকে ধরবে ধরবে করতে করতেই স্বপন পারাপারের খেয়া খচ্‌ করে ঠেকে গিয়েছিল, ঘুম ভেঙে গিয়েছিল, এবং বেশ কয়েক সেকেণ্ড সময় লেগেছিল, যাতে আমি বুঝতে পেরেছিলাম, ওটা একটা স্বপ্ন। বুকটা সত্যি আমার ধকধক করছিল, ঘরের চারদিকটা একবার দেখেছিলাম, বিছানাটা হাত দিতে দেখেছিলাম, আমার ধপাস করে শুয়ে গড়েছিলাম, যাক বাবা, তা হলে সত্যি নয়।

এই সে একই কথা, আজকাল তো আবার সবই সায়াণ্টেফিক, কে জানে ওই স্বপ্নের মধ্যেও সে রকম কিছু আছে কি না, তবে নীতার ব্যাপারের সঙ্গে স্বপ্নটার কেন মিলই নেই, এমন কি প্রথম শীতের কলকাতার এই রাত্রি, আজকের এই সবই, যাকে বলে প্রায় গুবলেট হয়ে যাওয়া এই দিনের সঙ্গে কোন মিলই নেই।

দাঁড়াতে হবে।

ট্যাক্সি দাড় করিয়ে আমি ভাড়া মিটিয়ে নামলাম।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *