সল্টলেকের বাড়ি

সল্টলেকের বাড়ি

শ্রাদ্ধ-শান্তি চুকে যাওয়ার পর আর কিছু করার থাকে না। যে কয়েকজন আত্মীয় এসেছিলেন তাঁরা ফিরে গেলেন যে-যার সংসারে। আগামীকাল সকালে বড়মেয়ে-জামাই যাবে ম্যানচেস্টারে, ব্রিটিশ এয়ারওয়েজে। মায়ের মৃত্যুর খবর পেয়ে চটজলদি চলে এসেছিল স্বা তাঁকে নিয়ে। কোনওরকমে ছুটি ম্যানেজ করেছিল জামাই। আর থাকতে পারছে না। ছোট্ট মেয়ে এসেছিল কানাডা থেকে। সেও ফিরে যাচ্ছে কাল। দিল্লি হয়ে। তার স্বামী আসেনি।

সন্ধের মুখে দোতলায় ব্যালকনিতে বসেছিলেন বিমলকান্তি। আর কয়েকদিন পরে বিরাশি পূর্ণ হবে তার। প্রত্যেক বছর ওই দিন শুরু হলেই মেয়েদের ফোন আসত। স্ত্রী পায়েস করে দিত। দুপুরে। সামনের বার হয়তো ফোনদুটো আসবে, পায়েস তৈরি হবে না। প্রায় বাহান্ন বছর। একসঙ্গে থাকলে যত ঝগড়াঝাঁটি হোক না কেন, কিছু অভ্যেস এমনভাবে শেকড় বসায় যে তার অস্তিত্ব একজন চলে যাওয়ার আগে বোঝা যায় না। এই বাড়িও তো তৈরি হয়েছিল স্ত্রীর ইচ্ছায়। তখন সল্টলেকের নাম শুনলে কলকাতার মানুষের নাক কুঁচকে যেত। বালি আর আগাছায় ভরতি। রাস্তাঘাট নেই, জলের অভাব, দুদিনেই বাড়ি ধ্বসে যাবে। কিছুটা গেলেই বিদ্যেধরী নদী। শেয়াল ডাকে দিন-দুপুরে। এগার হাজার টাকা কাঠায় সরকার লিজে জমি দিচ্ছে। সেই লিজের মেয়াদ শেষ হতে কত পুরুষ চলে যাবে। লিজ তো নামকো ওয়াস্তে, ওটা মালিকানার কম নয়। স্ত্রী জোর করেছিলেন অ্যাপ্লিকেশন দিতে। ভাড়া বাড়িতে থাকার ইচ্ছে হচ্ছিল না তাঁর। নকসালরা যখন আন্দোলন শুরু করেছে তখন লটারিতে নাম উঠল।

একটু-একটু করে বাড়ি হল। মনের মতো বাড়ি। মেয়েদের বিয়েও হল এই বাড়ি থেকে। সল্টলেকের চেহারাটা এখন বদলে গেছে। এগারো হাজার টাকার জায়গায় চার লাখ দিলেও জমি পাওয়া যাচ্ছে না। আর কিছু না পান বাড়ির ব্যাপারে তৃপ্তি পেয়ে গেছেন ভদ্রমহিলা।

‘কী ভাবছ বাবা?’

বিমলকান্তি লক্ষ করেননি কখন দুই মেয়ে তাঁর পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে। একটু হাসার চেষ্টা করলেন, ‘ভাবছিলাম এই বাড়ি তোদের মায়ের ইচ্ছায় হয়েছিল।’

মেয়েরা কথা বলল না কিছুক্ষণ। শেষপর্যন্ত বড়মেয়ে বলল, ‘আমরা তোমাকে একটা কথা বলতে চাই।’

‘হঠাৎ অনুমতি নেওয়ার দরকার হল? সামনে আয়।’

মেয়েরা চেয়ারে বসল। বড়মেয়ে বলল, ‘আমরা ফিরে গিয়েই স্পনসরশিপ পাঠাব। তুমি ভিসা করে চলে এসো।’

‘কী করব ওখানে গিয়ে?

‘কিছু করবে না। তুমি নিজের মতো থাকবে। কিন্তু আমাদের সঙ্গে থাকবে। ছয় মাস আমার কাছে, ছয় মাস ছোটর কাছে।’ বড়মেয়ে বলল।

হাসলেন বিমলকান্তি, ‘দ্যাখ, তোদের নিজস্ব সংসার হয়েছে। তার একটা আলাদা চেহারা হয়েছে যা তোরাই দিয়েছিস। সেখানে আমি গিয়ে থাকলে তোদেরই অস্বস্তি হবে।’

ছোটমেয়ে প্রতিবাদ করল, ‘বিন্দুমাত্র নয়! আমাদের সংসারের সবকিছু মায়ের আদলে তৈরি। গিয়ে দেখবে কিছুই অপরিচিত ঠেকছে না।’

কথা চলল অনেকক্ষণ। শেষপর্যন্ত বিমলকান্তিকে ওরা প্রশ্ন করল, ‘তুমি একা এই বাড়িতে কী করে থাকবে? কার সঙ্গে কথা বলবে? রান্নার লোক কামাই করলে কী খাবে? তুমি কখনও রান্নাঘরে ঢোকনি। যদি অসুখ করে কে তোমাকে দেখবে?’

বিমলকান্তি হাসলেন, ‘রান্নার লোক কামাই করলে হোম ডেলিভারিকে ফোনে খাবার দিতে বলব। অসুস্থ হলে নার্সিংহোমে চলে যাব।’

বড়মেয়ের গলা বুজে এল, ‘এভাবে তুমি বলতে পারলে?’

এবার হাল ছেড়ে দিলেন বিমলকান্তি, ‘বেশ! তোদের ইচ্ছে মেনে নিলাম কিন্তু এই বাড়ির কী হবে?’

ছোটমেয়ে বলল, ‘আপাতত তালা বন্ধ থাক।’

বিমলকান্তি বললেন, ‘সম্পর্ক এবং বাড়ি ব্যবহার না করলে নষ্ট হয়ে যায়। তার ওপর সল্টলেকে চোরের সংখ্যা প্রচুর। খালি বাড়ি দেখলে ওরা দু-হাত তুলে নাচবে।’

বড়মেয়ে বলল, ‘তাহলে ভাড়া দিয়ে দাও।’

বিমলকান্তি বললেন, ‘ভাড়া দিলে সমস্যা বাড়বে। বাড়ির সমস্যা হলে আমাকে জানাতে পারবে ভাড়াটে। জানালেও আমি তো ওদেশে থেকে সুরাহা করতে পারব না। তা ছাড়া নিয়মিত ভাড়া আমার হয়ে কে নেবে?’

‘তোমার নামে ব্যাঙ্কে জমা দেবে।’ ছোটমেয়ে বলল।

‘যদি না দেয়?’ বিমলকান্তি মাথা নাড়লেন।

এবার বড়মেয়ে বলল, ‘এত ঝামেলা করে কী লাভ? বাড়িটা বিক্রি করে দাও।’

‘বিক্রি?’ চোখ তুললেন বিমলকান্তি।

‘হ্যাঁ। দ্যাখো বাবা, তুমি বলবে এটা মায়ের ইচ্ছেয় হয়েছিল। একটা সেন্টিমেন্টের ব্যাপার। যার জন্যে হয়েছিল সেই মানুষই যখন চলে গেল তখন ওসব ভাবার কোনও কারণ নেই।’ বড়মেয়ে বলল, ‘তোমার জামাই বলল, এই বাড়ির দাম এখন অন্তত পঞ্চাশ লক্ষ টাকা।’

‘দেখি। একটু ভাবি।’ বিমলকান্তি মাথা নাড়লেন।

একটু বাদে পরিচিত একজন অ্যাটর্নিকে ফোন করলেন বিমলকান্তি। ভদ্রলোকের নাম রতু মুখার্জি। শ্রাদ্ধে এসেছিলেন। রতুবাবুকে মেয়েদের ইচ্ছের কথা জানালেন।

রতুবাবু হাসলেন, ‘দাদা, আমরা যারা সল্টলেকে বাড়ি করেছি তাদের এই সমস্যায় পড়তেই হবে। হয় স্বামীকে নয় স্ত্রীকে। কিন্তু আপনার জামাই একটু ভুল বলেছেন।’

‘কীরকম?

‘সরকারের সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী আপনি লিজে পাওয়া জমি বিক্রি করতে পারেন না। ফলে ওই জমির ওপর তৈরি বাড়িও সরাসরি বিক্রি করতে পারছেন না।’

‘সে কি! এই বাড়ি আমার টাকায় তৈরি। প্রয়োজনে বিক্রি করতে পারব না?’

‘পারবেন। বাড়ি আপনি বিক্রি করতে পারবেন কিন্তু জমি ছাড়া।’

‘জমি ছাড়া বাড়ি কী করে বিক্রি করব?’

‘ওইটাই তো ফ্যালাসি।’

‘কী বলছেন রতুবাবু! আমাদের পাড়ার তিনটি বাড়ি অবাঙালিরা কিনেছে।‘

‘সরকার প্রথম দিকে কিছু জমি সরাসরি বিক্রি করেছিল। তাদের মালিকের সেই জমি বাড়ি বিক্রি করতে বাধা নেই। কিন্তু লিজের জমিতে তৈরি বাড়ি বিক্রি করতে চাইলে রেজিস্ট্রি হবে না। সরকার ট্যাক্স নেবে না। কিন্তু আইন যেখানে কড়া সেখানে ফাঁকও তৈরি হয়। যিনি আপনার বাড়ি নেবেন তিনি আপনাকে একশো বছরের জন্যে বাড়ি ভাড়া নিয়ে একসঙ্গে সেই ভাড়ার টাকা দিয়ে দখল নিতে পারেন। সরকারের আপত্তি নেই। আপনি গিফট করে দিতে পারেন ব্ল্যাকে টাকা নিয়ে। তবে সেই গিফট কার্যকর হবে আপনি মারা গেলে। সরকারের আপত্তি নেই। আপনি পাওয়ার অফ অ্যার্টনি দিতে পারেন সারা জীবনের জন্যে, সরকারের আপত্তি হবে না। কিন্তু বিক্রি করতে পারবেন না। যারা কিনছে তারা এইভাবে মালিক হচ্ছে।’ অ্যার্টনি বললেন, ‘ফলে ন্যায্য দাম যা হওয়া উচিত বাড়িওয়ালা তার থেকে অনেক কমে দিতে বাধ্য হচ্ছেন?

কিন্তু এটা তো বেআইনি ব্যাপার।’ বললেন বিমলকান্তি।

‘অর্ধেক আইনি। আপনি একজনকে একশো বছরের জন্যে ভাড়া দিতেই পারেন। ইচ্ছে করলে কাউকে বাড়ি দান করতে পারেন।’

কিন্তু দান করলেই সে মালিক হবে না, তাই তো বললেন?

‘হ্যাঁ। আপনার মৃত্যু পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।’

মেয়েরা চলে গেল। তারা বিশ্বাস করতে পারছিল না বিমলকান্তির কোনও অধিকার নেই ওই বাড়ি সরাসরি বিক্রি করার। জামাইরা দলিল দেখল। তাদের মুখও গম্ভীর হল। ছোটমেয়ে বলল, ‘রতুবাবু যেমন বলছেন তেমন করো। সবাই তো তাই করছে। আইন নিয়ে তোমাকে মাথা ঘামাতে হবে না। আমরা গিয়েই স্পনসরশিপ পাঠিয়ে দিচ্ছি।’

মেয়েরা চলে গেলে রতুবাবুকে ওদের ইচ্ছে কথা জানালেন বিমলকান্তি।

পরের রবিবার সকালে রতুবাবু দুজনকে নিয়ে দেখা করতে এলেন। লোকদুটো পুরো বাড়িটা ঘুরে দেখে বলল, ‘আপনার কাজের লোক নেই?

‘আজ আসেনি।’ বিমলকান্তি বিমর্ষমুখে জানালেন।

রতুবাবু উদ্বিগ্ন হলেন, ‘তাহলে?’

‘হোম ডেলিভারির খাওয়ার খাব।’

রতুবাবু এবার লোকদুটোকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কেমন লাগল বাড়ি?’

‘ভালোই। বেশ যত্ন করে তৈরি হয়েছে।’ একজন বলল।

দ্বিতীয়জন জিজ্ঞাসা করল, ‘দামটা–?’

বিমলকান্তি জামাইয়ের মুখ মনে করে বললেন, ‘পঞ্চাশ।’

‘অসম্ভব’। প্রথমজন যেন আগুনের ছোঁয়া খেল, ‘অসম্ভব’।

দ্বিতীয়জন বলল, ‘দেখুন, বাড়ি নিচ্ছি কিন্তু কিনতে পারছি না। কী বিরাট রিস্ক। আপনাকে তো কোনও রিস্ক নিতে হচ্ছে না। আমাদের টাকা যে-কোনও মুহূর্তেই জলে চলে যেতে পারে।’ বিধাননগরের চেয়ারম্যান তো হুমকি দিয়েছেন বেআইনিভাবে নেওয়া বাড়ির লিস্ট বানাবেন।

মিইয়ে গেলেন বিমলকান্তি, ‘তাহলে?

‘দেখুন। আমরা ভদ্রলোক। পঁচিশের বেশি পারব না।’

অনেক বলার পর রতুবাবুর কথা মেনে ঠিক হল আঠাশ। মাসে দু-হাজার টাকা ভাড়া হলে বছরে চব্বিশ হাজার একশো বছরে চব্বিশ লাখ। এটা চেকে দেওয়া হবে। বাকিটা ক্যাশে। হঠাৎ দ্বিতীয়জন জিজ্ঞাসা করল, ‘আপনার বয়স কত?’

বিরাশি হতে চলল।’

‘বিরাশি। আপনার বাবা কত বছরে গত হয়েছেন?

‘আশিতে।’

‘তাহলে ঠিক আছে।’

‘মানে?’

‘আপনি মারা না গেলে তো উইলের প্রবেট নিতে পারব না। হে-হে। খারাপ শোনাচ্ছে। কিন্তু যা সত্যি তা বলাই ভালো।’

খুব রাগ হয়ে গেল বিমলকান্তির, ‘যদি আমি একশো বছর বেঁচে থাকি? নীরদ সি চৌধুরী তো বেঁচে ছিলেন।’

‘যাঃ। আপনি এত নিষ্ঠুর হতে পারবেন না।’ লোকটি হাসল।

লেনদেন সইসাবুদ চুকে গেল। মেয়েদের পাঠানো কাগজ এসে গেছে। দরখাস্ত করতেই দুই কনস্যুলেট ভিসা দিয়ে দিলেও দেশ ছেড়ে চলে যেতে দ্বিধায় ছিলেন বিমলকান্তি। এই সময় রতুবাবুর ফোন এল, ‘কবে যাচ্ছেন?’

‘দেখি।’

‘আর দেখবেন না। নেক্সট ফ্লাইট ধরুন। আমি টিকিট করিয়ে দিচ্ছি।’

‘হঠাৎ?

‘আপনার একশো বছর বাঁচার ইচ্ছেয় ওরা ভয় পেয়েছে। আমার এক ক্লায়েন্ট গতকাল খুন হয়ে গেল বাহাত্তরে পা দিয়ে। তিনিও গিফট করেছিলেন। যারা নিয়েছিল তাদের আর মালিকানা। পেতে অসুবিধে হবে না। তাই বলছিলাম আপনার এদেশে না থাকাই ভালো।’

রতুবাবুর কথায় শিড়দাঁড়া কনকন করে উঠল বিমলকান্তির। এই বাড়ি দান করে খুন হওয়ার চেয়ে বিদেশে গিয়ে মরা ঢের ভালো।

শেয়ার বা বুকমার্ক করে রাখুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *