শূকরছানা

শূকরছানা

কুকুরগুলোর খাওয়া দেখছিল ছেলেটা। তিনটে জিভ একসঙ্গে পড়ছে থালাতে, সপসপ শব্দ হচ্ছে। যে যত তাড়াতাড়ি জিভ নাড়তে পারবে তার পেটে তত বেশি খাওয়ার যাবে। ছেলেটা জুলজুল করে দেখল, কি দ্রুত খাবারগুলো শেষ হয়ে গেল। খাবার বলতে মোটা চালের ভাত পেঁকির শাকের চচ্চড়ি। কুকুর তিনটে একদম নেড়ি, তবে তিনটেই মদ্দা। মাদি কুকুর রাখতে চায় না লোকটা। এই তিনটের পেছন-পেছন একটা মাদি এসেছিল কদিন আগে। কোত্থেকে এল বোঝা যায়নি। কারণ মাইল দুয়েকের মধ্যে লোকবসতি বলতে কিছু নেই। তবু এসে গিয়েছিল কুকুরটা লোকটার চোখে পড়েছিল আগে। মাদিটা কেমন লাজুক-লাজুক মুখ করে এ তিনটের চারপাশে ঘুরছিল। কিন্তু বেশিক্ষণ দেরি হয়নি, একটা লম্বা বাঁখারি নিয়ে ছুটে গিয়েছিল লোকটা। কেঁউ-কেঁউ চিৎকার শুনেও কুকুরগুলো চুপচাপ লেজ নাড়তে লাগল। লোকটা মাদিটাকে কোথায় যেন পার করে দিয়ে এল। এসে ছেলেটার দিকে চোখ পাকিয়ে বলল, এসব চলবে না, আমার বাড়িতে ধাষ্টামো চলবে না, এই শুয়োরের বাচ্চা, শুনতে পাচ্ছিস? ছেলেটি ঘাড় নেড়েছিল।

ছেলেটা সবকিছু গুছিয়ে ভাবতে পারে না। আসলে কিছু ভাবতেই ওর ইচ্ছে করে না। কিন্তু একটা জিনিস ছেলেটা দারুণ বোঝে। হাঁড়িতে যখন চাল ফোটে, নাদুস-নুদুস ভাতগুলো যখন হাঁড়িতে ওলটপালট খায় তখন ছেলেটা ওপরের দিকে মুখ তুলে বড় বড় বাতাস টানে নাক দিয়ে। তখন ওর কালো পিঠ-পেট এক হওয়া ছোট্ট শরীরটা কাঁপতে থাকে। কিন্তু লোকটার হিসেব মাপা, কুকুর তিনটে কতটা ভাত পাবে, ছেলেটা কতটা খাবে একদম হিসেব করা।

এখানে ও অবশ্য অল্প কদিন এসেছে। নাগর-কাটা বাজার থেকে তুলে নিয়ে এসেছিল লোকটা। গাছতলায় বাজারের শেষ প্রান্তে যে ঝাঁকড়া গাছটা, তার তলায় দাঁড়িয়েছিল ও। হনহন করে আসছিল লোকটা। কাঁধে একটা ঝুড়ি, হাতে মুরগি ঝোলানো। ওকে দেখে থমকে দাঁড়িয়েছিল। তারপর কাছে এসে বিকৃত শব্দ করে ঘ্যাসঘ্যাসে গলায় বলেছিল, অ্যাই ঘর কোথায়? লোকটার মুখ দেখে, আঙুলগুলো দেখে গলাটা শুকিয়ে গিয়েছিল ছেলেটার। লোকটা আবার হেঁকেছিল, এই শালা শুয়োরের বাচ্চা, বাপ আছে? ঘাড় নেড়েছিল ছেলেটি এবার।

মা আছে?

আবার ঘাড় নেড়েছিল।

লোকটা কী ভাবল, তারপর পেটে একটা খোঁচা দিয়ে বলল, অ্যাই, ভাত খাবি?

ছেলেটা চলে এসেছিল পেছন-পেছন। অনেকটা পথ রোদ্র মাথায় করে ওরা এসেছিল। তারপর এই জঙ্গলের ধারে, এই বড়সড় বাড়িটায় ঢুকে লোকটা ঘুরে দাঁড়িয়েছিল, একদম পাঁয়তাড়া করবি না। বসে-বসে গেলাতে তোকে আনিনি। সকাল থেকে উঠে ঘাস কাটবি। কুকুর আছে তিনটে, সেগুলোকে চান করাবি আর এই সব কলাগাছ, আখগাছ দেখছিস, পাহারা দিবি। সকালবেলা আর সন্ধেবেলা দুটো ভাত দেব, মন ভরে খাবি। বাবুয়ানা করলে লাথি মেরে বের করে দেব-খেয়াল থাকে যেন। এই সময় ও কুকুরগুলোকে দেখতে পেল। লোকটার পায়ের কাছে এসে লেজ নাড়ছে। কুকুরগুলো নেড়ি আর লোম ওঠা।

কুকুরগুলোর খাওয়া হয়ে গেলে ছেলেটা উঠল। কী রোদ বাপস! বাড়িতে অনেকগুলো ঘর। সবটাই তালা দেওয়া। শুধু লোকটার ঘর ছাড়া। উঠোনের ওপাশে ছোট-ছোট চালাঘর আছে। তিনটে। একটাতে ও থাকে আর একটায় কুকুরগুলো। ছেলেটা বাগানে এল। প্রচুর কলাগাছ। লোকটা বস্তা দিয়ে কলাগুলো বেঁধে রেখেছে। বাদুড় বসতে পারে না। পাকলেই ঝুড়ি করে লোকটা বাজারে নিয়ে যায়। বাড়িটা তো লোকটার নয়, ছেলেটা বুঝতে পারে। কারণ লোকটা কথায়-কথায় অন্য একজনের কথা বলে। বাড়িটা নাকি তার।

আখগাছগুলো বেশ মোটাসোটা, অনেকখানি জায়গা জুড়ে গাছগুলো। হাত বোলাল ছেলেটা। খসখসে গা, কিন্তু ভেতরটা রসে টইটুম্বুর। একটা গাছের কোমর ধরে অনেকখানি নামিয়ে আনল ও, তারপর ছেড়ে দিতেই সটান খাড়া হয়ে গেল সেটা, দোল খেতে লাগল। লোকটা চোখ পাকিয়ে বলেছিল, খবরদার, গাছের গায়ে হাত দিয়েছ কি হাত এক্কেবারে ভেঙে ফেলব। আমার সব গোনা গাছ, হ্যাঁ।

পাছার কাছটাতে খানিকটা ছেঁড়া, সামনের বোতামগুলো নেই, প্যান্টটা খানিক তুলে। আখগাছগুলোর গায়ে পেচ্ছাপ করল ছেলেটা। করতে করতে কুকুরগুলোর কথা মনে পড়তেই একটা ঠ্যাঙ তুলে ধরল, ফিসফিস করে বলল, শালা!

এই সময় লোকটার গলা শুনতে পেল ও। হাঁকডাক করছে; গলায় যেন খুশি-খুশি ব্যাপার। ছেলেটা পাথর হয়ে আখগাছের ভেজা জায়গাটা দেখল। লোকটার নজরে পড়লে খেয়ে ফেলবে। প্রথম দিন লোকটাকে দেখেছিল ও। বাজার থেকে আনা মুরগিটার গলায় খপাত করে ছুরিটা বসিয়ে ধড়টা হাতে ধরেছিল লোকটা। রক্ত ফিনকি দিয়ে বেরিয়েছিল, মুখ-চোখে ছোপ ধরেছিল লোকটার। তারপর পটাপট পালকগুলো ছিঁড়ে ছিঁড়ে ফেলেছিল অনায়াসে। ছাড়ানো মুরগিটাকে দেখতে একদম ন্যাংটো বাচ্চার মতন।

মুখ-চোখ ঘামে ভেজা, গায়ের ফতুয়াটা সপসপে, বিরাট দেহ নিয়ে লোকটা হাঁপাচ্ছিল। ছেলেটা বিস্ময়ে দেখল লোকটার হাতে একটা দড়ি, দড়ির প্রান্তে একটা বড়সড় পেটমোটা সারাগায়ে। কাদামাখা শুয়োর দাঁড়িয়ে। ওকে দেখেই খিঁচিয়ে উঠল লোকটা, এই শালা শুয়োরের বাচ্চা, ডেকে-ডেকে গলা শুকিয়ে গেল, আমার এখানে নবাবি মারাতে এসেছে, আঁ!

লোকটা রেগে গেছে জব্বর। না হলে ওকে তুই করে বলত। ছেলেটা চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। দাঁড়িয়ে শুয়োরটার দিকে তাকাল। বেশ বড়সড় শুয়োরটা। কুতকুতে চোখে দেখছে। পেটের কাছটা বেশ ফোলা। গায়ে চাপ-চাপ কাদা শুকিয়ে আছে। এ এখানে কি খাবে? এ-বাড়িতে কাদা নেই, শুয়োরেরা যা খায় তার কিছুই নেই। তারপরই ওই কুকুরগুলোর কথা মনে পড়ল। মনে হতেই ও অসহায় লোকটার দিকে তাকাল।

অ্যাই, আজ থেকে এ এখানে থাকবে। এর সেবাযত্ন করবি। এই শুয়োরের বাচ্চা, কথা বলছিস না যে! লোকটা খিঁচিয়ে উঠতেই ও ঘাড় নাড়ল। লোকটা খুশি হল। তারপর সামনের বারান্দার গায়ে-গায়ে বসা তিনটে নেড়ির দিকে এগিয়ে গেল। লোকটার সঙ্গে শুয়োরটাকে দেখে কুকুর তিনটে হইচই করেনি কিছু। গায়ে গা লাগিয়ে বসেছিল শুধু। লোকটা এগিয়ে একটার মাথায় চাপড় মারল, ওটার পেছনে লাগিস না, যদি দেখতে পাই, শালা, মেরে তাড়াব। খ্যাটন বন্ধ হবে। তারপর ছেলেটাকে হেঁকে বলল, হাঁ করে দেখছিসটা কি, যা ওকে নিয়ে যা, কুয়োর পাড়ে নিয়ে গিয়ে বাঁধ। ছেলেটা নিচু হয়ে লোকটার ফেলে রাখা দড়ির প্রান্ত কুড়িয়ে নিয়ে কুয়োর দিকে এগোতেই শুয়োরটা কেমন দুলকি চালে পেছন-পেছন চলে এল। কুয়োর ধারে একটা ছোট্ট খুঁটি আছে, ছেলেটা দড়ি সেখানে বাঁধতেই লোকটা বলল, নে এবার জল তোল, ওকে ভালো করে স্নান করা। গা থেকে বড় কটু গন্ধ বেরুচ্ছে রে। ওকে একটু ভদ্দরলোক কর। বলে লোকটা ফতুয়া খুলে দাওয়ায় গিয়ে বসল। শুয়োরটার দিকে তাকিয়ে ছেলেটা ফোঁসফোঁস করে কিছু বাতাস টানল নাক দিয়ে। এই আর একটা কাজ বাড়ল। বালতি নামিয়ে দিল সে কুয়োতে। জলে ওর মুখ নড়ছে। ঝুঁকে পড়ে দেখল ছেলেটা। মুখ দেখলেই ওর কান্না পায়। পেটের ভেতরটা। কেমন করতে থাকে। অথচ লোকটা কিছু বোঝে না। বোঝে না যে ওর ভীষণ খিদে পেয়েছে। লোকটা, যা রান্না হয়, তার তিন ভাগ খায়। কি খায় বাপস! তরকারি না থাক, পেঁয়াজ দিয়ে কাঁচালঙ্কা দিয়ে, কমসে কম কাগজি লেবু দিয়ে গপগপ করে ভাতগুলো পেটের মধ্যে পুরে দেয়। আর খাওয়ার সময় বাঁ-হাতটা লোমভরতি উরুতে আদর করে বোলায়। কুকুরগুলোও কম খায় না। চোখ-কানাটার পেটে বেশি গর্ত। তবু ওদের পেট ভরে না। সপাসপ মেরে দিয়েই মুখ তুলে তাকায়। যেন আর একটু দাও, এরকম ভাব। তারপর ও নিজে যখন বসে, আঃ, ভাতগুলোকে। সামনে রেখে আদর করতে ইচ্ছে করে। পাঁচ আঙুল চওড়া করে মুঠোয় ধরলে ক-বারেই শেষ–তাই ও একটা-একটা করে ভাত মুখে দেয়। অনেকক্ষণ, অ-নে-কক্ষণ ধরে ভাত খাওয়া যায়। ওই সুখেই এখানে থাকা। কিন্তু এই শুয়োরটা কী খাবে, এখানে তো কেউ এঁটো ফেলে রাখে না। তবে কি লোকটা আর একটু চাল বাড়াবে? কুতকুতে চোখে তাকাল ছেলেটা।

শালা বড্ড গরম পড়েছে। বৃষ্টির নামগন্ধ নেই। লোকটা ফতুয়া দিয়ে গায়ের ঘাম মুছছিল। খাটো ধুতিটা হাঁটুর ওপর তুলে দিয়ে একটু আরাম করে বসল ও। এ মাসে এখনও টাকা এল না। এই এক হয়েছে। তোর বাড়ি ঘর দেখব, মাসে তিরিশটা টাকা দিবি, তাও যদি সময়মতো না পাঠাস–লোকটার চোখ পড়ল ছেলেটার দিকে। কুয়োর ভিতর ঝুঁকে দাঁড়িয়ে আছে, অ্যাই শুয়োরের বাচ্চা, নিজের সুরত দেখছ, আঁ? জল তোল।

চমকে উঠে তাড়াতাড়ি জল তুলল ছেলেটা। তুলে বালতিটা উপুড় করে ঢেলে দিল শুয়োরের গায়ে। জল গায়ে পড়তেই হঠাৎ চমকে গিয়ে শুয়োরটা ছুটতে চেষ্টা করল। চি-চিঁ শব্দ তুলে বিরক্তি প্রকাশ করল। কিন্তু দড়িটা বড্ড ছোট। ছেলেটা আবার জল তুলল, এবার শুয়োরটা চুপচাপ দাঁড়িয়ে নিজের গায়ে জল নিল। বাহারে বাহা, শুয়োরটাকে বেশ ভদ্দর বলে মনে হচ্ছে। হরিশ মেথরের শুয়োর। সেই কবে কুড়িটা টাকা পেত ও, তাগাদা দিয়ে-দিয়ে হয়রান, শেষে আজ হরিশ এই শুয়োরটাকে ধরিয়ে দিল। আরও কিছু টাকা চেয়েছিল অবশ্যি, হবে-হবে বলে কাটিয়েছে। যা পাওয়া যায়। তা টাকাটার সুদ বলেও তো একটা কথা আছে। দু-মাইল জঙ্গল ঠেঙিয়ে তাগাদা দিয়ে যাওয়া–সেটা?

এই শুয়োরের বাচ্চা, ওভাবে জল ঢাললে আমার গুষ্টির পিণ্ডি হবে। শালা মন রাখছ আমার। ভালো করে ধর শুয়োরটাকে, নারকেলের ছোবড়া দিয়ে ঘষে কাদাগুলো তোল–ওরকম। মেয়েছেলে ব্যাপার এখানে নেহি চলেগা। লোকটা কথাগুলো বলে রান্নাঘরে গিয়ে ঢুকল। সকালে রান্না করে গিয়েছে। ওর থালাভরতি ভাত ঢাকা দেওয়া–না, কেউ ছোঁয়নি। কুকুরের কৌটো খালি। ছেলেটার থালানা, ফরসা হয়নি। তবে হাত পড়েছে। লোকটা যেরকম রেখে গিয়েছিল সেরকম নেই। শালার পেটে রাবণের চিতা। কিন্তু শুয়োরটাকে কী খেতে দেওয়া যায়। এখানে কাদা নালা নেই। জঙ্গলের মধ্যেই ছেড়ে দেবে ওটাকে। ছেলেটাকে পিছন-পিছন রাখতে হবে, যাতে না পালায়।

উঁকি দিল লোকটা। ছেলেটা উপুড় হয়ে নারকেলের ছোবড়া ঘষছে চোখ-মুখ খিঁচিয়ে। আর শুয়োরটা, বাঃ, বেশ চুপচাপ দাঁড়িয়ে। চেহারাই পালটে গেল দেখছি। কে বলবে শালা হরিশ মেথরের ডেরায় পয়দা। এগিয়ে গেল ও, কাছে থেকে শুয়োরটাকে দেখল। স্নান করানো হয়ে গিয়েছিল। ছেলেটা লোকটার দিকে তাকাল। লোকটা একগাল হাসল, তারপর শুয়োরটাকে টেনে রোদ্দুরে দাঁড় করাল, তুই তো ভালোই স্নান করাস। আজ আমার পিঠে সাবান ঘষবি। তা যাই বলিস, শুয়োরটাকে এখন বেশ লাগছে। তোর চেয়ে ও দেখতে ভালো। তুই শালা শুয়োরের বাচ্চা, তোর গায়ের ময়লা স্নান করলেও উঠবে না।

আরও কিছুক্ষণ পরে লোকটা কুয়োর পারে জাবড়ে বসেছিল। কালো বিরাট লোমশ শরীরে জল চিকচিক করছিল। চোখ বুজে বসেছিল লোকটা। ভেদা ধুতি গুটিয়ে কুঁচকির ওপরে নিয়ে এসেছে। পিঠে সাবান ঘষছিল ছেলেটা।

লোকটা বলল, অ্যাই ভালো করে ঘষ, জোরে-জোরে। আচ্ছা এই, তুই কথা বলিস না কেন?

ছেলেটা চুপ করে থাকল খানিক, তারপর আবার ধুধুলের ছোবড়া ঘষতে লাগল পিঠে।

তোর তো সব সময় খিদে পায়, কিন্তু তুই হাসিস না কেন? কাঁদতে পারিস? বলেই একটা খোঁচা দিল ছেলেটার পেটে। গক করে আওয়াজ হল মুখ দিয়ে, ছেলেটার মনে হল, পেটের ভেতর মোচড় দিয়ে উঠল, চোখের সামনেটা ঘুলিয়ে যাচ্ছে। হঠাৎই ভেউ-ভেউ করে কেঁদে উঠল। ছেলেটা। শুয়োরটা মুখ তুলে এদিকে তাকাল রোদ্দুরে গা শুকোতে শুকোতে।

হ্যাঁ, তাহলে তুই কাঁদতে জানিস। কিন্তু খবরদার, আর কান্নাকাটি নেহিচলেগা। আমাকে কোনও শালা কাঁদতে দেখেনি কখনও। মারব এক থাবড়া, চোপ! গর্জন করে উঠল লোকটা। শরীর। চমকে উঠে কেঁপে যেতে ছেলেটা চুপ করল। তারপর আবার ছোবড়া হাতে তুলে নিল।

শুয়োরটাকে আজ একটু ভাত দিবি, বুঝলি! প্রথম দিন তো। বাড়িতে নতুন কেউ এলে তাকে। কিছু দিতে হয়। তোর একটু কম পড়বে–তা হোক, প্রথম দিন, শুয়োরটা যেন না খেয়ে থাকে। অবশ্যি কাল থেকে ওকে জঙ্গলে নিয়ে গেলেই হবে। তবে দেখবি গু-ফু যেন না খায়। সাবান মাখা হয়ে গিয়েছিল লোকটার, বালতিটা নিয়ে এবার উঠে দাঁড়াতেই ছেলেটা সরে এল। কয়েক মুঠো ফুলের মতো ভাত থেকে ওই শুয়োরটাকে দিতে হবে ভাবতেই ওর পেটের ভেতর থেকে একটা চিৎকার ছিটকে বেরিয়ে আসতে-আসতে লোকটার প্রায় ন্যাংটো বিশাল চেহারাটার দিকে চোখ পড়তেই গলা কাছে আটকে গেল। আটকে গিয়ে সারা শরীরে ঝুলতে লাগল।

খালি ঘরটায় শুয়োরটাকে রাখা হল। প্রথম দিন সন্ধে হতেই শুয়োরটা টানা চিৎকার শুরু করল। কান পাতা দায়। লোকটা তিনবার বাঁশ নিয়ে ঢুকল ঘরে। আওয়াজটা শুনতে পেল ছেলেটা। সন্ধের আগেই খাওয়া-দাওয়ার পাট চুকেছে ওদের। এবেলা ও আর ভাত দেয়নি শুয়োরটাকে। লোকটার আঙুলের খোঁচায় এখনও পেটের মধ্যে টনটন করছে। পেটে হাত দিয়ে ও বুঝতে পারে কতটুকু জায়গায় ভাত পড়ে আছে। শুয়োরটারও বোধহয় খিদে পেয়েছে। একটু ভাত পেটে পড়লে বোধহয় কাঁদত না। বাঁশের ঘা খেয়ে শেষপর্যন্ত চুপ করল ওটা। শব্দটা এত প্রবল যে ছেলেটার হাত-পা কেমন সিঁটিয়ে গিয়ে সে কুণ্ডুলি পাকিয়ে শুয়ে রইল চুপচাপ।

ক্রমশ শুয়োরটা ছেলেটাকে বুঝে গেল। লোকটার কাছে বড় একটা ঘেঁষত না, কিন্তু ছেলেটা যখন সকালে দড়ি ধরে জঙ্গলে নিয়ে যেত ও চুপচাপ চলে আসত। হাত দিয়ে আওয়াজ করলে কাছে। আসত। খাওয়ার কথা মনে পড়তেই ছেলেটা লাঠি দিয়ে শুয়োরটার ফোলা-ফোলা পেটে খোঁচা মারত, শুয়োরটা কিছু বলত না। এক-এক সময় জঙ্গলের ভিতর শুয়োরটা যখন পেটভরতি খেয়ে নিয়েছে তখন ওর আদর করতে ইচ্ছে করত। শুয়োরের পাশে বসে ওর গলায় পিঠে ফোলা ফোলা নরম পেটে হাত বোলাতে ছেলেটার আরাম লাগত। শুয়োরটা কিছু বলত না। পেটে হাত পড়লেই আদুরে বেড়ালের মতো গা এগিয়ে দিত।

হঠাৎ একদিন ভোর হয়ে গেলে ছেলেটা লোকটার চিৎকার শুনতে পেল। লোকটা ওকে ডাকছে। বাইরে বেরিয়ে এসে ও দেখল লোকটা শুয়োরের ঘরে। উঁকি মারল ও। তারপরে কেমন অবাক হয়ে গেল। শুয়োরটা পাশ ফিরে শুয়ে আছে। আর ওর কোল ঘেঁষে কুকুরের বাচ্চার মতো অনেকগুলো নাদুস-নাদুস শুয়োর কিলবিল করছে।

দাঁত বের করে হাসল লোকটা, দ্যাখ রে, কতগুলোকে পয়দা করেছে একসঙ্গে। বেশ মোটাসোটা, কি বলিস! হরিশ মেথর বলেছিল পেটে বাচ্চা আছে, কিন্তু এত তাড়াতাড়ি হবে কে জানত! তা তুই রোজ স্নান করাতিস তাই এরকমটা হল। বেশ ভদ্দর চেহারা, আঁ! তারপর কি মনে পড়তেই খিঁচিয়ে উঠল, ম্যাজিক দেখছ শালা, শুয়োরের বাচ্চা, যা উনুন ধরা।

দু-দিন কাটতে ছেলেটা ঠিক করল এবার পালাবে। এভাবে আর থাকা যায় না। লোকটা একটু। চাল বাড়াচ্ছে না। এদিকে বাচ্চাগুলোকে নিয়ে শুয়োরটা জঙ্গলে যেতে পারে না। ফলে ওকে ভাত খাওয়াতে হচ্ছে। কুকুরগুলো দিনরাত কেঁউ-কেউ করছে। ওর নিজের ভাত অর্ধেক। যেদিন। পালাবে ঠিক সেদিন লোকটা ওকে হাঁক দিল, এই শুয়োরের বাচ্চা, এদিকে আয়। ছেলেটা গিয়ে দাঁড়াতেই লোকটা বলল, অ্যাই আমি হাটে চললাম। তুই শুয়োরটাকে জঙ্গলে নিয়ে যা। আমি। এগুলোকে বিদায় করে আসি। দেখতে মোটাসোটা, চোখ ফুটে গেছে, দর ভালোই পাওয়া যাবে। বাড়িতে ভিড় বাড়িয়ে লাভ নেই। বলে লোকটা বাচ্চাগুলোকে একটা ঝুড়ির মধ্যে তুলল, তারপর সেটাকে মাথায় নিয়ে হনহন করে বেরিয়ে গেল হাটের দিকে। নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিল না ও। লোকটা মাঝে-মাঝে হঠাৎ ভালো হয়ে যায়। শুয়োরটাকে জঙ্গলে নিয়ে গেল, বাচ্চাগুলো যখন বিদায় হল, তখন আর চলে যাওয়ার কোনও মানে হয় না। হঠাৎ ভাতের কথা ভেবে ও রান্নাঘরে ঢুকল। ঢুকে অবাক হয়ে দেখল লোকটা আজ রাঁধেনি। কী ব্যাপার, ঠিক বুঝতে না পেরে ও চালের কৌটোগুলো দেখতে লাগল। নাঃ, কোথাও চাল নেই। লোকটা তাই। রান্না করতে পারেনি। কখন হাট থেকে ফিরে আসবে, বাচ্চাগুলোকে বিক্রি করে চাল আনবে, রান্না করবে, কখন ভাত হবে, সেই ভাত খাবে–ছেলেটা ঠিক করল পালাবে, নির্ঘাত পালিয়ে যাবে। ওর কান্না পাচ্ছিল।

হাটে এসে লোকটা দেখল জমজমাট। ভাগ্যিস শুয়োরটাকে নিয়ে গিয়েছিল ও, নইলে তো আজ শালা হরিমটর। লোকটা শুয়োরপট্টিতে এল। আসতেই দেখল, হরিশ মেথর দাঁড়িয়ে আছে। বটতলায়। ঝুড়ি নামাতেই ও এগিয়ে এল। তারপর মুখটা কেমন করে বলল, বিইয়েছে বুঝি!

লোকটা ঘাড় নাড়ল, হ্যাঁ।

হরিশ বাচ্চাগুলোর গায়ে হাত বোলাল, বেশ হয়েছে দেখছি। এগুলো তুমি ফাউকা পেয়ে গেলে, মালটা কদিন পরে নিলে এগুলো আমার হত।

লোকটা হাসল, কপাল, বুঝলে হরিশ! ওটা আসল আর এগুলো হচ্ছে সুদ। কত খরচা হয়ে গেল শুয়োর নিয়ে তার হিসেব রাখো!

হরিশ একবার বলতে চেষ্টা করল টাকার কথা, লোকটা চাপা দিল চটপট। উঠে যাওয়ার সময় হরিশ বলল, সবকটা বেচো না, বুঝলে। একটা রেখে দিও। নইলে মা-টা জ্বলেপুড়ে মরবে।

কথাটা মনে ধরল লোকটার। পাইকারদের কাছে ভালো দরে একটা বাদে সব বিক্রি করে চাল ডাল কিনল ও। তারপর একটা বাচ্চা বগলে নিয়ে নি-নি দুপুরে নাগরাকাটার বাজার থেকে মাঠ ভেঙে ফিরে চলল ঝুড়ি মাথায়।

বাড়ির কাছাকাছি এসে লোকটা একটু থমকে দাঁড়াল। না, সেরকম কিছু নয়। হরিশ মেথরের কথা শুনে ও ভেবেছিল বাড়ি ফিরে দেখবে শুয়োরটা চেঁচিয়ে বাড়ি মাত করছে। কিন্তু কোনও আওয়াজ শুনতে পেল না ও। ছোঁকরাটা ওকে সামলালো কী করে কে জানে। ওটাকে এবার বিদায় করা দরকার। অনেক হয়েছে। কাজের বেলায় কিছু নেই, শুধু খ্যাটন আর খ্যাটন।

বাড়িতে ঢুকল ও। কেমন চুপচাপ সব। গেল কোথায়! লোকটা একবার হাঁক দিল, অ্যাই শুয়োরের বাচ্চা! কোনও সাড়া পেল না সে। ছেলেটার ঘরে উঁকি দিল ও। না নেই এখানে। বেরিয়ে এসে আখের খেতটা দেখল। তারপর মনে পড়ল, নিশ্চয় জঙ্গলে গিয়েছে। সে-রকমটাই বলে গিয়েছিল। এখন এই বাচ্চাটাকে কোথায় রাখে। শুয়োরের ঘরটার দিকে এগিয়ে গেল ও। দরজা খুলে বাচ্চাটাকে ভেতরে গলিয়ে দিল। কুঁই-কুঁই করছে বাচ্চাটা। কী মনে করে একবার উঁকি দিল ও। দিয়েই একটু হতভম্ব হয়ে পড়ল প্রথমটায়। পেছন ফিরে শুয়োরটা শুয়ে আছে। কেমন মা-মা মুখ করে ঘুরে তাকাল লোকটার দিকে, বাচ্চাটা গুটগুট করে মায়ের কাছে গিয়ে দাঁড়াল। শুয়োরটা একবার দেখল শুধু, তেমন আমল দিল না। মুখ ঘুরিয়ে শুয়ে রইল।

কয়েক পা এগিয়ে গেল লোকটা। অন্ধকার স্যাঁতসেঁতে ঘর। শুয়োরটার ওপাশে ছেলেটার ঠ্যাং দেখতে পেল ও। দেহ শুয়োরের শরীর আড়াল করে রেখেছে।

ব্যাপারটা কী। ঘুমুচ্ছে নাকি শালা! এই জঙ্গলে যাওয়া হয়েছে! মাথায় রক্ত উঠে গেল লোকটার। শুধু অন্ন ধ্বংস। মেরেই ফেলবে আজ। মানুষের বাচ্চা–শালা উকুন পোষা। এর চেয়ে শুয়োর। পুষলে বছরে দু-বার বিয়োত। কয়েক পা এগিয়ে চুলের মুঠি ধরতে হাত বাড়িয়ে লোকটা কেমন কুঁকড়ে গেল। তারপর বড়-বড় চোখ মেলে নিঃশব্দে দেখল, ছেলেটা ঘুমুচ্ছে। মুখে-চোখে কেমন খুশি-খুশি ভাব। আর তার ময়লা পুরু হয়ে থাকা কালো ঠোঁটের চাপে শুয়োরের বাঁটটা তিরতির করে নড়ছে।

শেয়ার বা বুকমার্ক করে রাখুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *