রাণী না খুনি? (শেষ অংশ)

রাণী না খুনি? (শেষ অংশ)
(অর্থাৎ অপরিচিত ব্যক্তিকে বিশ্বাস করিবার চূড়ান্ত ফল!)
Detective Stories No, ৪1. দারোগার দপ্তর ৮১ম সংখ্যা
প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায় প্রণীত।
সিকদারবাগান বান্ধব পুস্তকালয় ও সাধারণ পাঠাগার হইতে শ্রীবাণীনাথ নন্দী কর্তৃক প্রকাশিত
All Rights Reserved.
সপ্তম বর্ষ। সন ১৩০৫ সাল। পৌষ

রাণী না খনি?
(শেষ অংশ)

প্রথম পরিচ্ছেদ।

বাড়ীওয়ালার বাড়ী পরিত্যাগ করিয়া আমি প্রথমতঃ আমার খানায় গিয়া উপস্থিত হইলাম। সেই স্থান হইতে পূৰ্ব-কথিত কর্ম্মচারীদ্বয়কে সঙ্গে লইয়া পুনরায় কালীবাবুর বাড়ীতে গিয়া উপস্থিত হইলাম। যে সময় আমরা কালীবাবুর নিকট গিয়া উপ স্থিত হইলাম, সেই সময় কালীবাবু ও ত্রৈলোক্য উভয়েই তাহা দিগের গৃহে বসিয়াছিল। আমাদিগকে দেখিয়া ত্রৈলোক চিনিতে পারিল, এবং সেই স্থানে উপবেশন করিতে কহিল। আমরা তিনজনেই সেই স্থানে উপবেশন করিলাম। আমাদিগকে দেখিয়া কালীবাবু কহিল, কি মহাশয়! পুনরায় কি মনে করিয়া? আসামী ধরা পড়িয়াছে না কি?

আমি। আসামী এখনও ধরা পড়ে নাই, ধরিবার চেষ্টাতেই খুরিয়া বেড়াইতেছি। যে মোকদ্দমায় রামজীলালের নামে ওয়ারেন্ট বাহির হইয়াছে, সেই মোকদ্দমার বিষয় আমি এখনও সম্পূর্ণরূপে বুঝিয়া উঠিতে পারিতেছি না। তাই পুনরায় আপনার নিকট আসিয়াছি।

কালী। বলুন, আমাকে কি সাহায্য করিতে হইবে। আমাকে যেরূপ ভাবে সাহায্য করিতে বলিবেন, আমি সেইরূপ ভাবে সাহায্য করিতে প্রস্তুত আছি।

আমি। সবিশেষ কোনরূপ সাহায্য করিবার সময় এখনও সময় উপস্থিত হয় নাই। যখন বুঝিতে পারি, আপনার সাহায্যের সবিশেষ প্রয়োজন হইয়া পড়িয়াছে, তখন আপনার সাহায্য প্রার্থনা করিব। এখন কেবল দুই চারিটী কথা জিজ্ঞাসা করিতে আসিয়াছি মাত্র।

কালী। আমাকে যাহা জিজ্ঞাসা করিতে চাহেন, তাহা আপনি অনায়াসেই জিজ্ঞাসা করিতে পারেন।

আমি। আপনি ঠিক বলুন দেখি, সেই জহরতগুলি কাহার নিমিত্ত আপনি দোকান হইতে খরিদ করিয়া আনিয়াছিলেন?

কালী। সেই সকল জহরত আমি আমার নিজের জন্য খরিদ করিয়াছিলাম না। যাঁহার নিমিত্ত খরিদ করিয়াছিলাম, সে কথা ত আমি পূৰ্বেই আপনাদিগকে বলিয়াছি। যাহার নিমিত্ত, জহরত খরিদ করা হইয়াছিল, তাঁহাকে রামজীলালও স্বচক্ষে দেখিয়া গিয়াছিল।

আমি। তাহাকে রামজীলাল দেখিয়াছিল, তুমি দেখিয়াছিলে, এবং ত্রৈলোক্যও দেখিয়াছিল, এ কথা ত আমরা পূর্বেই শুনিয়াছি। এখন ত আর রামজীলালকে পাইতেছি না যে, তাহাকে জিজ্ঞাসা করিব। সেই নিমিত্তই তোমাদিগকে জিজ্ঞাসা করিতেছি, যে ব্যক্তি জহরত খরিদ করিয়াছিলেন, তিনি কে?

রাণী না খুনী?

কালী। তিনি একজন জমিদার। একথাও পূর্বে আমরা আপনাকে বলিয়াছি।

আমি। পূৰ্ব্বে যাহা বলিয়াছ, তাহাও শুনিয়াছি, এখন যাহা বলিবে তাহাও শুনিব। তিনি কোন্ দেশীয় জমিদার?

কালী। পশ্চিমদেশীয় জমিদার।

আমি। তুমি পূর্বে বলিয়াছিলে, তিনি বাঙ্গালি। এখন বলিতেছ, তিনি পশ্চিমদেশীয়। তোমার কোন কথা প্রকৃত, তাহা এখন আমাকে সবিশেষ করিয়া বলিতে হইতেছে। তুমি জানিও, আমি জানিতে পারিয়াছি, সেই জমিদার কে?

কালী। যদি আপনি জানিতে পারিয়া থাকেন, তাহা হইলে আমাকে আর জিজ্ঞাসা করিবার প্রয়োজন কি?

আমি। প্রয়োজন সবিশেষরূপ আছে বলিয়াই জিজ্ঞাসা করি তেছি। এখন তুমি আমার কথার প্রকৃত উত্তর প্রদান করিবে কি না?

কালী। প্রকৃত কথা কেন বলিব না? আপনি আমাকে প্রতারণা করিতেছেন কেন? আমি এত চেষ্টা করিয়া পরিশেষে যাহার আর সন্ধান করিয়া উঠিতে পারি নাই, তাহাকে আপনি সন্ধান করিয়া বাহির করিবেন কি প্রকারে?

আমি। আমি কিরূপে তাহার সন্ধান করিয়াছি, তাহা তুমি জানিতে চাও?

কালী। যদি অনুগ্রহ করিয়া বলেন।

আমি। কালীবাবু! তুমি মনে করিতেছ যে, তোমার সদৃশ চতুর লোক আর কেহই নাই; কিন্তু তোমার মনে করা কর্তব্য যে, তোমা অপেক্ষা অধিক চতুর লোক, বোধ হয়, অনেক থাকিতে পারে। আচ্ছা আমি কিরূপে সেই জমিদারের অনুসন্ধান করিয়াছি, তাহা তোমাকে বলিতেছি; একটু মনোযোগ দিয়া শুনিলেই অনা য়াসেই তাহা বুঝিতে পারিবে। তুমি রামজীলালকে যে সকল নোট প্রদান করিয়াছিলে, সেই সকল নোট তুমি সেই জমিদার অর্থাৎ যে ব্যক্তি সেই সকল জহরত গ্রহণ করিয়াছেন, তাঁহার নিকট হইতে পাইয়াছ, কেমন একথা প্রকৃত কি না?

কালী। তদ্ভিন্ন সেই সকল নোট আর আমি কোথায় পাইব?

আমি। সেই সকল নোটের মধ্যে অনেকগুলি নম্বরী-নোট আছে?

কালী। আছে, তাহার নম্বর ত আমি আপনাদিগকে দিয়াছি।

আমি। আমাদিগের দেশে যাহার হাতে নম্বরী-নোট পড়ে, তিনি সেই সকল নম্বরী-নোটের নম্বর রাখিয়া থাকেন, একথা বোধ করি তুমি নিশ্চয়ই স্বীকার করিবে?

কালী। নতুবা আমি আপনাকে সেই সকল নোটের নম্বর কিরূপে দিতে পারিলাম?

আমি। তুমি জান, যে সকল নোট সরকার বাহাদুর এদেশে চালাইতেছেন, তাহা কোথা ছাপা হয়, এবং কোথা হইতে প্রথম আমাদিগের দেশে প্রচারিত হয়?

কালী। শুনিয়াছি, সমস্ত নোট বিলাত হইতে ছাপা হইয়া এদেশে আইসে, এবং করেসি আফিস হইতে প্রথমতঃ সেই নোট বাহির হইয়া, ক্ৰমে এদেশীয় লোকের নিকট গিয়া উপস্থিত হয়।

আমি। করেসি আফিস হইতে যে সকল নোট বাহির হয়, তাহার নম্বর করেসি আফিসে থাকে কি না, তাহা তুমি বলিতে

কালী। করেনসি আফিসে নিশ্চয়ই নম্বর রাখিয়া থাকে।

আমি। আর যে সকল নম্বরী-নোট সেই স্থান হইতে যাহাকে দেওয়া হয়, তাহার নাম ও ঠিকানা সেই স্থানে লেখা থাকে; তাহাও বোধ হয়, তুমি অবগত আছ?

কালী। তাহাও রাখিবার খুব সম্ভাবনা।

আমি। তাহা হইলে এখন তুমি বুঝিতে পারিলে যে, আমি তোমার সেই জমিদারের ঠিকানা করিতে পারিয়াছি কি না?

কালী। না মহাশয়! আপনার এই কথায় আমি কিরূপে জানিতে পারি যে, আপনি কিরূপে জমিদার মহাশয়ের ঠিকানা করিতে পারিয়াছেন?

আমি। আমি যাহা বলিলাম, তাহা অপেক্ষা আরও স্পষ্ট করিয়া না বলিলে যে তুমি বুঝিতে পারিবে না, ইহাই আশ্চর্য্য। যাহা হউক, আরও স্পষ্ট করিয়া আমি তোমাকে বলিতেছি। তোমার সেই জমিদার মহাশয়ের নিকট হইতে তুমি যে সকল নোট পাই মাছ, তাহার নম্বর তুমিই আমাদিগকে প্রদান করিয়াছ। ইহার পরই আমি করেসি আফিসে গিয়া জানিতে পারি, কোন তারিখে সেই সকল নোট সর্বপ্রথমে করেসি আফিস হইতে বাহির হয়, এবং কাহাকে প্রদান করা হয়। পরে তাহার নিকট গিয়া জানিতে পারি, সেই নোট তিনি কাহাকে প্রদান করেন। এইরূপে অ সন্ধান করিতে করিতে সেই সকল নোট তুমি যাহার নিকট হইতে প্রাপ্ত হইয়াছ, তাহার নিকট গিয়া উপস্থিত হই, এবং তাহার প্রমুখাৎ জানিতে পারি, যাহা যাহা ঘটিয়াছিল। তিনি আমাকে আরও বলিয়াছেন, যে সকল জহরতের পরিবর্তে তোমাকে সেই সকল নোট প্রদান করা হয়, আবশ্যক হইলে সেই সকল জহরতও তিনি আমাদিগের সম্মুখে উপস্থিত করিবেন। এখন বুঝিতে পারিলে, অনুসন্ধানের কোন্ উপায় অবলম্বন করিয়া এই সকল বিষয় আমি জানিয়া লইয়াছি?

কালী। তাহা এখন বুঝিতে পারিয়াছি।

আমি। এখনও তুমি আমাদিগের নিকট মিথ্যা কথা বলিতেছ কি না, তাহাই জানিবার নিমিত্ত তোমাকে আমি জিজ্ঞাসা করি তেছি, সেই জমিদার কে? কারণ, ইতিপূর্বে তুমি আমাদিগের নিকট কয়েকটা কথা মিথ্যা বলিয়াছ।

কালী। আমি সেই জমিদার মহাশয়ের নাম জানি না।

আমি। তিনি কোন্ দেশীয় লোক?

কালী। পশ্চিমদেশীয়।

আমি। পূর্বে কেন বলিয়াছিলে যে, তিনি একজন বঙ্গদেশীয় জমিদার-পুত্র?

কালী। একথা কি আমি পূর্বে বলিয়াছিলাম?

আমি। বলিয়াছিলে।

কালী। যদি বলিয়া থাকি, তাহা হইলে ভুল-ক্রমে বলিয়া থাকিব।

আমি। তুমি যে সময় তাঁহার বাসায় গিয়া জহরত সকল প্রদান কর, সেই সময় সেই স্থানে আর কে ছিল?

কালী। আর কেহ ছিল বলিয়া, আমার মনে হয় না।

আমি। রামজীলাল?

কালী। রামজীলাল ত ছিলই। কিন্তু মহাশয়! রামজীলাল ঠিক সেই সময় তাহার নিকট গমন করেন নাই, তিনি বাহিরে ছিলেন।

আমি। রামজীলালকে বাহিরে রাখিয়া তুমি একাকীই বাড়ীর ভিতর গমন করিয়াছিলে?

কালী। হাঁ।

আমি। জমিদার মহাশয়ের নিকট হইতে টাকা আনিয়া তুমিই রামজীলালের হস্তে প্রদান কর?

কালী। হাঁ। আমি। জমিদার মহাশয় এখন সেই বাড়ীতে আছেন কি?

কালী। আজ কয়েকদিবস পর্যন্ত আমি সেদিকে যাই নাই। বোধ হয়, থাকিতে পারেন।

আমি। সেই বাড়ীটা তুমি এখন আমাকে দেখাইয়া দিতে পার?

কালী। পারিব না কেন? তবে জিজ্ঞাসা করি, যখন আপনার সহিত তাঁহার সাক্ষাৎ হইয়াছে, তখন আপনি ত তাহার সেই বাড়ী জানেন।

আমি। আমার সহিত তাঁহার সাক্ষাৎ হয় নাই। অপর আর একজন কর্ম্মচারীকে আমি তাঁহার নিকট পাঠাইয়াছিলাম। সেই কর্ম্মচারীকে তিনি যাহা বলিয়াছেন, কেবল তাহাই আমি অবগত আছি মাত্র। আমি নিজে সেই বাড়ী চিনি না, এই নিমিত্তই সেই বাড়ী দেখাইয়া দিবার নিমিত্ত আমি তোমাকে বলিতেছি। যে কর্ম্মচারী সেই বাড়ী দেখিয়া আসিয়াছিলেন, তিনিও এখন এখানে নাই। অপর কোন কাৰ্য্য উপলক্ষে স্থানান্তরে গমন করিয়াছেন।

কালী। তাহা হইলে চলুন, আমি আপনার সহিত গমন করিয়া সেই বাড়ী আমি আপনাকে দেখাইয়া দিতেছি।

কালীবাবুর কথা শুনিয়া আমি সেই স্থানে আর কালবিলম্ব করিলাম না। তাহাকে লইয়া তখনই সেই স্থান হইতে বহির্গত হইলাম। আমি মনে করিয়াছিলাম, আড়গোড়ার সহিসের সাহায্যে আমরা যে বাড়ীর অনুসন্ধান পাইয়াছিলাম, কালীবাবু সেই বাড়ীই আমাদিগকে দেখাইয়া দিবেন; কিন্তু পরে দেখিলাম, আমি যাহা ভাবিয়াছিলাম, কালীবাবু সেই বাড়ী আমাদিগকে দেখাইয়া না দিয়া, অন্য স্থানে অপর একখানি বাড়ী দেখাইয়া দিল। সেই বাড়ীর দরজায় একজন দ্বারবান্ বসিয়া আছে দেখিয়া, তাহাকে দুই একটী কথা জিজ্ঞাসা করিলাম। তাহার নিকট হইতে অবগত হইলাম যে, তাহার মনিব পশ্চিমদেশীয় একজন জমিদার সেই বাড়ীতে ছিলেন; কিন্তু কয়েকদিবস হইল, তাঁহার দেশে গমন করিয়াছেন। আরও জানিতে পারিলাম যে, কালীবাবু সেই দ্বারবানের নিকট পরিচিত। দ্বারবান তাহার মনিবের নিকট অনেকবার কালীবাবুকে দেখিয়াছে। দ্বারবান্ ইহাও বলিল যে, কালীবাবুর নিকট হইতে তাহার মনিব অনেকগুলি মূল্যবান, কাপড় ও জহরত খরিদ করিয়াছেন।

দ্বারবানের নিকট আমি এই সকল কথা অবগত হইয়া আমি পুনরায় কালীবাবুর সঙ্গে তাহার বাড়ীতে গিয়া উপস্থিত হইলাম।

দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ।

কালীবাবুর বাড়ীতে উপস্থিত হইয়া আমি পুনরায় তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলাম, কালীবাবু! তুমি পূর্ব হইতে এ সম্বন্ধে এত মিথ্যা কথা বলিয়া আসিতেছ কেন?

কালী। কেন মহাশয়! আমি কি মিথ্যা কথা কহিলাম?

আমি। আবার বলিতেছ, আমি কি মিথ্যা কথা কহিলাম? যে ব্যক্তি জহরত খরিদ করিয়াছেন, তিনি পূর্বে বঙ্গদেশীয় একজন জমিদার-পুত্র ছিলেন। কিন্তু এখন দেখিতে দেখিতে তিনি একজন পশ্চিমদেশীয় জমিদার হইয়া পড়িলেন?

কালী। উনি বাঙ্গালি কি পশ্চিমদেশীয় লোক, তাহা আমি সেই সময় ঠিক বুঝিয়া উঠিতে পারি নাই।

আমি। ভাল, ইহাই যেন বুঝিতে না পারিয়াছিলে; কিন্তু যাহার বাড়ী তুমি পূৰ্ব্বে জানিতে না, এখন তাহার বাড়ী তুমি কিরূপে আমাকে দেখাইয়া দিতে সমর্থ হইলে?

কালী। তাহার বাড়ী আমি চিনি না, একথা যদি পূর্বে আমি আপনাকে বলিয়া থাকি, তাহাও ভুল-ক্রমে বলিয়া থাকিব।

আমি। ইহাও যদি তুমি ভুল-ক্রমে বলিয়া থাক, তাহা হইলে তুমি পূর্বে কিরূপে বলিয়াছিলে যে, জহরতগুলি সেই জমিদার মহাশয় রামজীলালের নিকট হইতে ত্রৈলোকের ঘরে বসিয়া খরিদ করেন, অথচ এখন দেখিতেছি, তুমি তাহার বাড়ীতে গিয়া তাহার নিকট সেই জহরতগুলি বিক্রয় করিয়া আসিয়াছ? ইহার কোন কথা প্রকৃত?

কালী। ইহার উভয় কথাই প্রকৃত। আমি পূর্বেও বলিয়া ছিলাম, এখনও বলিতেছি যে, আমার কথা সমস্তই প্রকৃত। ইহার মধ্যে একটীও মিথ্যা কথা নাই। আমি জহরতগুলি সেই জমিদার মহাশয়ের বাড়ীতে গিয়া বিক্রয় করিয়া আসি সত্য; কিন্তু টাকা গুলি ত্রৈলোক্যের এই গৃহে বসিয়া আমি রামজীলালের হস্তে প্রদান করি। তিনি উহা উত্তমরূপে গণিয়া-গাথিয়া লইয়া সেই স্থান হইতে চলিয়া যান।

আমি। একথা ত ঠিক নহে, তুমি প্রথমে বলিয়াছিলে, জমিদার-পুত্র ত্রৈলোকের গৃহে বসিয়া সেই সকল জহরত খরিদ করেন, এবং সেই স্থানেই তিনি তাহার মূল্য রামজীলালের হস্তে প্রদান করেন।

কালী। এরূপ কথা বলিয়াছি বলিয়া ত এখন আমার স্মরণ হইতেছে না।

আমি। তাহা হইলে আমাদিগের শুনিবারই ভুল হইয়া থাকিবে। সে যাহা হউক, রাণীজির কথাটা কি?

কালী। রাণীজি আবার কে?

আমি। যে রাণীজি জুড়িগাড়ি করিয়া বড়বাজারে গমন করিয়াছিলেন?

কালী। আমার জানিত কোন রাজি জুড়িগাড়ি করিয়া বড়বাজারে গমন করেন নাই। জমিদার মহাশয় গিয়াছিলেন, সে কথা ত আমি পূর্বেই আপনাদিগকে বলিয়াছি।

আমি। জমিদার মহাশয় বলেন, তিনি জহরত খরিদ করি বার নিমিত্ত বড়বাজারে একবারেই গমন করেন নাই। ইহাতে বোধ হইতেছে, জমিদার মহাশয় মিথ্যা কথা কহিতেছেন?

কালী। তিনি মিথ্যা কথা বলিতেছেন, একথা আমি বলিতে পারি না; তিনি ভুলিয়া গিয়াছেন। বড় মানুষের সকল সময় সকল কথা মনে থাকে না।

আমি। জমিদার মহাশয় যে জুড়িতে করিয়া বড়বাজারে গমন করিয়াছিলেন, সেই জুড়ি তুমি আড়গোড়া হইতে ভাড়া করিয়া আনিয়াছিলে কেন?

কালী। আমি জুড়িগাড়ি ভাড়া করিয়া আনিব কেন?

আমি। কেবল জুড়িগাড়ি নহে, একখানি কম্পাস গাড়িও যে তুমি ভাড়া করিয়া আনিয়াছিলে?

কালী। মিথ্যা কথা।

আমি। মিথ্যা কি সত্য, তাহা পরে জানিতে পারিবে। যে বাড়ীটী তুমি একমাসের নিমিত্ত ভাড়া করিয়াছিলে, তাহাতে কোন রাণীজি আসিয়া বাস করিয়াছিল?

কালী। আমি বাড়ী ভাড়া করি কেন?

আমি। কেন বাড়ী ভাড়া করিবে, তাহা তুমিই জান। তোমার বাড়ী ভাড়া করিবার কারণ আমি জানি না বলিয়াই আমি তোমাকে জিজ্ঞাসা করিতেছি।

কালী। আপনারা এ সকল নূতন মিথ্যা কথা কোথা হইতে বাহির করিলেন? মহাশয়! আমি আপনাকে একটা কথা জিজ্ঞাসা করিতে ইচ্ছা করি; আপনি আমার কথায় রাগ করিবেন না। আপনাদিগের তদারকের গতিই কি এইরূপ? কাজের কথার দিকে আপনারা একবারের নিমিত্ত দৃষ্টিপাত না করিয়া, কেবল বাজে বিষয় অনুসন্ধান করিয়া বেড়াইতেছেন। কোথায় আপ

ফেরারী আসামীর অনুসন্ধান করিবেন, তাহা না করিয়া কেবল কতক বাজে বিষয় লইয়া মিথ্যা মিথ্যা ঘূরিয়া বেড়াইতেছেন। এরূপ ভাবে অনুসন্ধান করিলে, এতক্ষণ ত আসামী ধরা পড়িল!

আমি। আমার কথায় তুমি রাগ করিও না। এই কার্যে যে আমি নূতন ব্রতী, তাহা বোধ হয়, তুমি অবগত আছ। সেই কারণেই সকল কথা সহজে আমি বুঝিয়া উঠিতে পারি না বলিয়াই, ইহার ব্যাপার উত্তমরূপে জানিয়া লইবার নিমিত্তই তোমাকে এতগুলি কথা জিজ্ঞাসা করিলাম, এবং আরও দুই চারিটী কথা জিজ্ঞাসা করিবার ইচ্ছাও আছে। এই সকল বিষয় প্রথমতঃ আমি ভালরূপ অবগত হইয়া, তাহার পর, আসামীর অনুসন্ধানে প্রবৃত্ত হইব, ইহা আমার সম্পূর্ণরূপ ইচ্ছা। এতগুলি টাকা লইয়া রামজীলাল যে এখনও কলিকাতায় আছে, তাহা আমার বোধ হয় না। আমার বিশ্বাস, সে তাহার নিজের দেশে প্রস্থান করিয়াছে। সে বাহা হউক, আমিও তাহাকে অল্পে ছাড়িতেছি না। তাহার নিমিত্ত যদি তাহার দেশে পর্যন্তও আমাকে গমন করিতে হয়, তাহাতেও আমি প্রস্তুত আছি।

আমার এই কথা শুনিয়া কালীবাবু মুখে অতিশয় সন্তোষের ভাব প্রকাশ করিয়া আমাকে কহিলেন, আপনার যদি আর কোন কথা আমাকে জিজ্ঞাসা করিবার প্রয়োজন থাকে, তাহা একটু শীঘ্ন জিজ্ঞাসা করিয়া লউন। কারণ, কোন কাৰ্যান্তরে এখনই গমন কারবার আমার সবিশেষ প্রয়োজন আছে।

কালীবাবু আমাকে এই কথাগুলি বলিল সত্য; কিন্তু সেই সময় তাহার অবস্থা এরূপ পরিবর্তিত হইয়াছে বলিয়া বোধ হইতে লাগিল যে, যেন সে কোনমতেই আমার সম্মুখে দাড়াইতে আর সমর্থ হইতেছে না।

আমি। তোমাকে আমি এখন কেবলমাত্র একটা কথা জিজ্ঞাসা করিতে চাই।

কালী। কি?

আমি। যে পশ্চিমদেশীয় জমিদার তোমার নিকট হইতে জহরত গ্রহণ করিয়াছিলেন, তাহার সমভিব্যাহারে তুমি আর কোন বাড়ীতে গমন করিয়াছিলে কি?

কালী। গিয়াছিলাম বৈকি। ত্রৈলোকের গৃহে তাহাকে কয়েকবার সঙ্গে করিয়া আনিয়াছিলাম। ত্রৈলোক্য ত আপনার সম্মুথেই বসিয়া আছে, তাহাকে জিজ্ঞাসা করুন না কেন; তাহা হইলেই ত জানিতে পারিবেন, আমার কথা সত্য কি না।

আমি। ত্রৈলোক্যকে আমি আর কি জিজ্ঞাসা করিব? তুমি যাহা বলিতেছ, সেও তাহাই বলিবে। তুমি যদি সেই জমিদারকে অপর কোন বাড়ীতে লইয়া না গিয়া থাক, তাহা হইলে আর এক খানি বাড়ী কাহার নিমিত্ত এবং কিসের জন্য ভাড়া করিয়াছিলে?

আমার এই কথা শুনিবামাত্রই ত্রৈলোকের যেন হৃৎকম্প উপস্থিত হইল। সে একবার আমার মুখের দিকে তাকাইয়া কালীবাবুর মুখের দিকে তাকাইতে লাগিল। দেখিলাম, ত্রৈলোকের সঙ্গে সঙ্গে কালীবাবুরও মুখ শুখাইয়া উঠিয়াছে। আরও তাহার মুখ দেখিয়া বেশ বুঝিতে পারিলাম, সে তাহার মনের ভাব গোপন করিতে বিধিমতে চেষ্টা করিতেছে; কিন্তু কোনরূপেই যেন কৃতকার্য হইতে পারিতেছে না।

আমার কথা শুনিয়া কালীবাবু যেন একটু রাগ ভাব প্রকাশ করিল ও কহিল, কি মহাশয়! আপনি আমার সহিত ঠাট্টা করিতেছেন, না বসিয়া বসিয়া স্বপ্ন দেখিতেছেন?

আমি। একরূপ স্বপ্নই বটে; নূতন বাড়ী ভাড়া করার নাম শুনিয়া তোমরা একবারেই চমকাইয়া উঠিলে যে! কোন রাণীজি আসিয়া একমাসকাল বাস করিবেন বলিয়া, একমাসের জন্য কোন বাড়ী তুমি ভাড়া কর নাই?

কালী। না।

আমি। আমি যদি সেই বাড়ী তোমাদিগকে দেখাইয়া দিতে পারি?

কালী। যখন আমি বাড়ী ভাড়া করি নাই, তখন আপনি আমাকে কিরূপে দেখাইয়া দিবেন? আর অপর কোন ব্যক্তির নিমিত্ত যদি একখানি বাড়ী ভাড়াই করিতাম, তাহা হইলেই বা কি ক্ষতি হইত? অপরের নিমিত্ত আমি বাড়ী ভাড়া করিয়াছিলাম, কি না করিয়াছিলাম, তাহার সহিত এ মোকদ্দমার কি সংব আছে, তাহার কিছুই বুঝিয়া উঠিতে পারিতেছি না।

আমি। এই মোকদ্দমার সহিত বাড়ী ভাড়ার কোনরূপ সংস্রব থাকুক, আর না থাকুক, তুমি অপর কোন বাড়ী ভাড়া করিয়াছিলে কি না, তাহাই আমি জানিতে চাই।

কালী। না।

আমি। তাহা হইলে তুমি ও ত্রৈলোক্য, তোমরা উভয়েই আমার সহিত আগমন কর। তুমি আমাকে দেখাইয়া দেও, আর না দেও, আমি সেই বাড়ী তোমাদিগকে দেখাইয়া দিতেছি।

কালী। আমার একটী সবিশেষ প্রয়োজন আছে, এখন আমি আপনার সহিত গমন করিতে পারিব না।

আমি। আমার সহিত যাইতেই হইবে। সহজে তুমি আমার সহিত না যাও, অসহজে যাইবে।

এই বলিয়া আমি কালীবাবু ও ত্রৈলোক্যকে সঙ্গে লইয়া সেই স্থান হইতে বহির্গত হইলাম। তাঁহারা উভয়েই আমার সহিত গমন করিতে অস্বীকৃত হইয়াছিল; কিন্তু আমি তাহা না শুনিয়া একরূপ বলপ্রয়োগ করিয়াই তাহাদিগকে লইয়া সেই স্থান হইতে বহির্গত হইলাম। আমার সমভিব্যাহারী কেবল একজন কর্ম্মচারী সেই স্থানে রহিলেন মাত্র।

তৃতীয় পরিচ্ছেদ।

যাহার নিকট হইতে কালীবাবু বাড়ী ভাড়া লইয়াছিলেন, তাহাকে সেই বাড়ীতে আনিবার নিমিত্ত আমি পূৰ্ব্ব হইতেই বন্দোবস্ত করিয়া রাখিয়াছিলাম। কালীবাবু এবং ত্রৈলোক্যকে একখানি গাড়িতে করিয়া লইয়া, যখন আমি সেই বাড়ীর সম্মুখে গিয়া উপস্থিত হইলাম, তখন আমার বেশ অনুমান হইল যে, উভয়েরই হিতাহিত জ্ঞান যেন তিরোহিত হইয়াছে, এবং উহার আমাকে কি বলিবার নিমিত্ত যেন প্রস্তুত হইতেছে। কিন্তু অতি অল্প সময়ের মধ্যে তাঁহারা তাহাদিগের মনের ভাব কতক পরি মাণে পরিবর্তিত করিয়া লইল; যাহা বলিতে যাইতেছিল, তাহা আর বলিল না।

আমাদিগের সেই স্থানে উপস্থিত হইবার একটু পরেই আর একখানি গাড়ি আসিয়া সেই স্থানে উপস্থিত হইল। উহার মধ্য হইতে দুইজন আরোহী বহির্গত হইলেন। একজন আমারই অধীনস্থ কর্ম্মচারী; অপর ব্যক্তি সেই বাড়ীর অধিকারী। তিনি কালীবাবুকে দেখিয়াই কহিলেন, এই বাবুটাই একমাসের নিমিত্ত আমার বাড়ী ভাড়া লইয়াছিলেন। কালীবাবুকে লক্ষ্য করিয়া কহিলেন, কেমন মহাশয়! এখন আমি এই বাড়ী অপর আর কাহাকেও ভাড়া দিতে পারি?

কালীবাবু তাহার কথায় কোনরূপ উত্তর প্রদান না করিয়া নিতান্ত স্থিরভাবে সেই স্থানে দাঁড়াইয়া রহিল।

বাড়ীর অধিকারী চাবি হস্তে সেই বাড়ীর দরজা খুলিতে গিয়া দেখেন, সেই বাড়ীর সম্মুখে দ্বারবানবেশে একটী লোক বসিয়া রহিয়াছে। তাহাকে দেখিয়াই তিনি জিজ্ঞাসা করিলেন, তুমি কে? আমার বাড়ীর দরজায় রসিয়া রহিয়াছ? সেই ব্যক্তি তাহার কথায় কোনরূপ উত্তর প্রদান না করিয়া, আমার ইঙ্গিত অনুসারে সেই স্থান হইতে উঠিয়া একটু দূরে গিয়া দণ্ডায়মান হইলেন। বলা বাহুল্য, সেই ব্যক্তিও আমাদিগের একজন কর্ম্মচারী। আমাদিগের অবর্তমানে কেহ সেই বাড়ীর ভিতর প্রবেশ করিতে না পারে, এই নিমিত্তই তাঁহাকে সেই স্থানে পূর্ব হইতেই রাখা হইয়াছিল।

বাড়ীর অধিকারী সেই বাড়ীর চাবি খুলিয়া দিলেন। আমরা সকলেই সেই বাড়ীর ভিতর প্রবেশ করিলাম।

আমরা সকলে সেই বাড়ীর ভিতর প্রবেশ করিয়া প্রথমতঃ উপরের, এবং পরিশেষে নীচের সমস্ত ঘরগুলি উত্তমরূপে দেখি লাম। দেখিলাম, সমস্ত ঘরগুলিই খালি, কোন ঘরে কিছুই নাই। এই ব্যাপার দেখিয়া সকলেই সেই বাড়ী হইতে বহির্গত হইবার উদ্যোগ করিতেছেন, এরূপ সময়ে নিম্নের একখানি ঘরের দিকে

আমার নয়ন আকৃষ্ট হইল। বলা বাহুল্য, সেই ঘরের ভিতর আমরা পূৰ্বেই গমন করিয়াছিলাম। আমি পুনরায় সেই ঘরের ভিতর প্রবেশ করিলাম। দেখিলাম, সেই গৃহের মেয়ের প্রস্তরের একস্থানে কতকগুলি মক্ষিকা ঘন ঘন বসিতেছে। এই ব্যাপার দেখিয়া সেই বাড়ীর অপরাপর গৃহগুলি পুনরায় সবিশেষরূপ লক্ষ্য করিয়া দেখিলাম; কিন্তু আর কোন স্থানে মক্ষিকা বসিতে দেখিতে পাইলাম না। সেই বাড়ীটী নুতন প্রস্তুত হইয়াছিল, উহাতে বে সকল নর্দমা বা ময়লা জল প্রভৃতি ফেলিবার স্থান আছে, সেই সকল স্থানও উত্তমরূপে দেখিলাম; কিন্তু আর কোন স্থানেই মক্ষিকা প্রভৃতি বসিতে দেখিতে পাইলাম না। তখন স্বভাবতই আমার মনে কেমন একরূপ সন্দেহের উদয় হইল। আমি আমার মনের ভাব অপরাপর কর্ম্মচারীগণকেও কহিলাম। সকলেই আমার মতে মত দিয়া কহিলেন, এই স্থানটী একবার ভাল করিয়া দেখি বার প্রয়োজন হইয়াছে। সুতরাং সেই স্থানের প্রস্তর কয়েকখানি একবারে উঠাইয়া ফেলিবার প্রয়োজন হইল।

সেই বাড়ীর অধিকারী মহাশয়কে সেই কথা বলাতে তিনি প্রথমতঃ আমাদিগের প্রস্তাবে অসম্মত হইয়া গৃহের প্রস্তর গুলি উঠাইয়া ফেলিতে নানারূপ আপত্তি করিতে লাগিলেন; কিন্তু আমরা কেহই তাহার আপত্তিতে কর্ণপাত না করিয়া, কোদালি ও সাবল প্রভৃতি সংগ্রহ করিতে প্রবৃত্ত হইলাম। সেই সকল দ্রব্য সংগ্রহ করিতেও আমাদিগের কোনরূপ কষ্ট হইল না। সেই বাড়ীর একটী গৃহের ভিতর কতকগুলি চুন, সুরকি, বালী এবং সাবল, কোদালি প্রভৃতি রাখা ছিল। সেই স্থান হইতে সাবল ও কোদালি প্রভৃতি আনাইয়া, সেই স্থানের প্রস্তর উঠাইয়া ফেলা হইল। উঠাইবার সময় বেশ অনুমান হইল, উহা যেন একটু আঙ্গা ভাবে বসান রহিয়াছে, এবং যেন নূতন বসান বলিয়া বোধ হইল। সেই স্থানের দুই তিনখানি প্রস্তর উঠাইতে উঠাইতে সেই স্থান হইতে প্রথমে অল্প, এবং পরিশেরে অধিক পরিমাণে দুর্গন্ধ বাহির হইতে আরম্ভ হইল। যখন সেই স্থান হইতে ক্রমে পচাগন্ধ বাহির হইতে লাগিল, সেই সময় আমাদিগের মনে নানারূপ সন্দেহ আসিয়া উপস্থিত হইতে লাগিল। সেই সময় আমরা সকলে মিলিয়া শীঘ্র শীঘ্র সেই স্থানের মাটী ক্ৰমে উঠাইয়া ফেলিতে লাগিলাম। সেই স্থানের মৃত্তিকা খনন করিতে আমাদিগের সবিশেষ কোনরূপ কষ্ট হইল না; মাটী যতই উঠাইতে লাগিলাম, ততই যেন উহা আপ্পা বোধ হইতে লাগিল।

কালীবাবু ও ত্রৈলোক্য আমাদিগের সহিত সেই সময় সেই স্থানে উপস্থিত ছিল। সেই স্থানের মৃত্তিকা খনন করিতে দেখিয়া তাহাদিগের বাক্যালাপ বন্ধ হইল, মুখ কালিমা বর্ণ ধারণ করিল, চক্ষু যেন ঈষৎ রক্তিমবর্ণ ধারণ করিতে লাগিল। সেই স্থানে কিয়ৎক্ষণ দাঁড়াইয়া, আর তাঁহারা দাড়াইতে পারিল না; নিতান্ত চিন্তিত অন্তঃকরণে সেই স্থানে বসিয়া পড়িল।

সেই স্থান হইতে অধিকাংশ মাটী এইরূপে উঠাইতে উঠা ইতে ক্রমে একটী গলিত মৃতদেহ বাহির হইয়া পড়িল। সেই মৃতদেহ দেখিয়া স্পষ্টই অনুমান হইতে লাগিল, উহা কোন পুরুষের মৃতদেহ। কিন্তু উহা এতদূর বিকৃত ভাব ধারণ করিয়া ছিল যে, উহা কাহার দেহ, তাহা চিনিতে পারা গেল না; কিন্তু আমরা সকলেই অনুমান করিয়া লইলাম, সেই দেহ রামজীলালের দেহ ভিন্ন আর কাহারও দেহ নহে।

মৃত্তিকাগৰ্ভ হইতে সেই মৃতদেহী আমরা সবিশেষ সতর্কতার সহিত উঠাইলাম; দেহ হইতে গলিত মাংস ঋলিত হইতে দিলাম না। সেই দেহ গলিত অবস্থা ধারণ করিয়াছিল সত্য; কিন্তু তাহার পরিধানে যে সকল বস্ত্রাদি ছিল, তাহার একখানিও কোনরূপে নষ্ট হইয়াছিল না।

সেই স্থান হইতে মৃতদেহ বাহির করিবার পর, কালীবাবু ও ত্রৈলোক্যের অবস্থা যে কিরূপ ধারণ করিয়াছিল, তাহার যথাযথ বর্ণনার ক্ষমতা আমার নাই। উঁহাদিগকে দেখিয়া, সেই সময় সহজে অনুমান করা কঠিন হইল যে, উঁহারা জীবিত কি মৃত। দশ বিশ ডাকের কম উঁহাদিগের মুখ হইতে প্রায়ই বাক্য উচ্চারিত হইল না, সহজে কোন কথার উত্তর আর একবারেই পাইলাম না। আমাদিগের প্রশ্নের উত্তরে কেবল উঁহারা বলিতে লাগিল যে, আমরা ইহার কিছুই অবগত নহি। সেই সময়ে আমাদিগের মধ্যে কোন কোন কর্ম্মচারী ত্রৈলোক্যকেই রাণীজি বলিয়া সম্বোধন করিতে লাগিল; কিন্তু ত্রৈলোক্য সেই সকল কথায় কোনরূপ উত্তর প্রদান করিল না।

সেই মৃতদেহ বাহির করিবার পরই একজন কর্ম্মচারীকে বড় বাজারে পাঠাইয়া দেওয়া হইল। অতি অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি রামজীলালের মনিব এবং তাহার দোকানের আর কয়েকজন কৰ্ম্ম চারীর সঙ্গে প্রত্যাবর্তন করিলেন। মৃতদেহ দেখিয়া তাঁহারা রামজীলালের দেহ বলিয়া কোনরূপেই চিনিতে পারিলেন না; কিন্তু তাহার পরিহিত বস্ত্রাদি দেখিয়া তাঁহাদিগের আর চিনিতে বাকী থাকিল না। সকলেই একবাক্যে বলিয়া উঠিলেন, এই মৃতদেহ রামজীলালের।

যখন সেই মৃতদেহ রামজীলালের বলিয়া স্থিরীকৃত হইল, তখন যেরূপ ভাবে আমরা এ পর্যন্ত কালীবাবু ও ত্রৈলোক্যকে রাখিয়াছিলাম, এখন আর তাহাদিগকে সেইরূপে রাখিলাম না। এখন তাঁহারা খুনী মোকদ্দমার আসামীরূপে পরিগণিত হইল। এখন উভয়কেই আমরা বন্ধনাবস্থায় রাখিলাম, এবং উভয়কে পৃথক পৃথক স্থানে রাখিয়া পৃথক পৃথকরূপে অনেক কথা জিজ্ঞাসা করিলাম; কিন্তু ত্রৈলোকের নিকট হইতে কোন কথা প্রাপ্ত হইলাম না। যাহা জিজ্ঞাসা করিলাম, তাহারই উত্তরে সে কহিল, আমি ইহার কিছুই অবগত নহি।

চতুর্থ পরিচ্ছেদ।

কালীবাবুকে আমরা অতিশয় চতুর বলিয়া মনে করিয়াছিলাম, কিন্তু পরিশেষে দেখিলাম, কালীবাবু অপেক্ষা ত্রৈলোক্যই অতিশয় চতুর। তাহাকে অনেক কথা জিজ্ঞাসা করিয়া তাহার কোন রূপই উত্তর পাইলাম না; কিন্তু কালীবাবু পরিশেষে আমাদিগের নিকট সমস্ত কথা স্বীকার করিল। আমি তাহাকে কহিলাম, দেখ কালীবাবু! যেরূপ অবস্থায় তোমরা এখন পতিত হইয়াছ, ইহাতে আর তোমাদিগের কোনরূপেই নিষ্কৃতি নাই। তোমার বিপক্ষে যে সকল প্রমাণ সংগৃহীত হইয়াছে, তাহাতে তুমি নিশ্চয়ই বেশ বুঝিতে পারিতেছ যে, এ যাত্রা তোমাকে ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলিতে হইবে। এখন ও তুমি আমার পরামর্শ শুন, এখনও তুমি প্রকৃত কথা-বল। তাহা হইলে তুমি কতদুর দোষী, তাহার যথার্থ অবস্থা আমরা অবগত হইব। নতুবা নিতান্ত অন্ধকারে থাকিয়া আমাদিগকে এই মোকদ্দমা চালাইতে হইবে। দায়ে পড়িয়া এরূপ অনেক বিষয়ের প্রমাণ হয় ত আমাদিগকে করিতে হইবে যে, বাস্তবিক তুমি হয় ত তাহা কর নাই, বা জান না। এই নিমিত্ত আমি তোমাকে বার বার বলিতেছি, তুমি যাহা যাহা করিয়াছ, তাহা আমাদিগকে স্পষ্ট করিয়া বল।

কালী। আচ্ছা মহাশয়! যখন আমি বেশ বুঝিতে পারিতেছি যে, এ যাত্রা যখন কোনরূপেই আমার নিষ্কৃতি নাই, যে কোন উপায়েই হউক, আপনারা আমাদিগকে ফাঁসিতে ঝুলাইবেন, তখন আমি এই ঘটনার প্রকৃত অবস্থা প্রথম হইতে আরম্ভ করিয়া শেষ পর্যন্ত বলিতেছি।

আমি। এ নিতান্ত ভাল কথা।

কালী। কিছু দিবস অতীত হইল, পশ্চিমদেশীয় সেই জমিদার মহাশয় কলিকাতায় আগমন করেন।

আমি। কোন্ জমিদার?

কালী। যে জমিদার মহাশয়ের বাড়ীতে আমি আপনাকে সঙ্গে করিয়া লইয়া গিয়াছিলাম।

আমি। তাহার পর?

কালী। আমি শুনিয়াছিলাম, তাহার বাড়ীতে একটা বিবাহ কাৰ্য্য সম্পন্ন হইবে। সেই বিবাহের নিমিত্ত কতকগুলি ভাল ভাল কাপড় এবং কিছু জহরত ক্রয় করিবার মানসে এবার তিনি কলি, কাতায় আসিয়া উপস্থিত হন। সেই সকল দ্রব্যাদি ক্রয় করিবার মানসে উপযুপরি কয়েকদিবস পর্যন্ত তিনি নিজেই বাজারে গমন করেন, এবং বাজারে ঘূরিয়া ঘূরিয়া তিনি নিতান্ত তক্ত হইয়া পড়েন। বাজারে গমন করিলেই, বাজারে যে সকল দালাল আছে, তাঁহারা আসিয়া তাহার সহিত মিলিত হয়, ও তিনি যে দ্রব্য ক্রয় করিতে চাহেন, সেই দ্রব্য ক্রয় করিয়া দেওয়াইবার মানসে তাহাদিগের পরিচিত যে সকল দোকানে সেই সকল দ্রব্য পাওয়া যায়, সেই সকল দোকানে তাঁহাকে লইয়া গিয়া তাহাকে সেই সকল দ্রব্য দেখায়। সেই সকল দ্রব্যের মধ্যে তাহার যে কোন দ্রব্য পসন্দ হয়, তাহার মূল্য চতুগুণ করিয়া বলিয়া দেয়। এইরূপে কয়েকদিবস পর্যন্ত অনবরত তিনি দালাল গণের সহিত বাজারে বাজারে ঘুরিয়া বেড়ান; কিন্তু কোন দ্রব্যই তিনি খরিদ করিয়া উঠিতে পারেন না।

আমি এই সংবাদ জানিতে পারিয়া একদিবস তাঁহার বাড়ীতে গিয়া উপস্থিত হইলাম, এবং তাহার সহিত আমি সাক্ষাৎ করি লাম। আমি বড়বাজারের একজন প্রধান দোকানদার এই কথা বলিয়া আমি সঁহার নিকট আমার পরিচয় প্রদান করিলাম ও কহিলাম, আজ কয়েকদিবস পৰ্য্যন্ত দেখিতেছি, আপনি কতক গুলি দ্রব্যাদি ক্রয় করিবার মানসে দালালগণের সহিত দোকানে দোকানে ঘূরিয়া বেড়াইতেছেন। কিন্তু এ পর্যন্ত কোন দ্রব্যই আপনি ক্রয় করিয়া উঠিতে পারেন নাই। আমার বিশ্বাস, যে পৰ্য্যন্ত সেই দালালগণ আপনাকে পরিত্যাগ না করিবে, সেই পৰ্যন্ত আপনি কোন দ্রব্য ক্রয় করিতে পারিবেন না। কারণ, উঁহারা আপনাকে সঙ্গে করিয়া যে কোন দোকানে লইয়া যাইবে, দোকানদার আপনার নিকট তাহারই চতুগুণ মূল্য চাহিয়া বসিবে। কারণ, সেই দ্রব্য যদি আপনার ক্রয় করা হয়, তাহা হইলে যে সকল দালাল আপনার সহিত সেই সময় সেই স্থানে উপস্থিত ছিল, তাহাদিগের প্রত্যেককেই পৃথক পৃথক্‌রূপ দালালী সেই দোকানদারকে দিতে হইবে। দোকানদার পূর্বেই সেই অর্থ যদি আপনার নিকট হইতে গ্রহণ না করিবেন, তাহা হইলে তিনি দালালগণকে সন্তুষ্ট করিবেন কোথা হইতে?

আমার নিজের সকল প্রকার দ্রব্যের দোকান আছে বলিয়াই, আমি আপনার নিকট আসিয়াছি। আমি যেরূপ অল্প মূল্যে আপনাকে দ্রব্যাদি দিতে পারিব, বাজারের অপর কোন ব্যক্তিই তাহা পারিবে না। আমার কথায় যদি আপনার বিশ্বাস

হয়, তাহা হইলে দুই একটী দ্রব্যের ফরমাইস আমাকে দিন, সেই দ্রব্য আনিয়া আমি আপনাকে প্রদান করি। আপনি বাজারে যাচাইয়া দেখুন, সেই দ্রব্যের মূল্য কত। তখন আপনি উহার মূল্য আমাকে প্রদান করিবেন। দেখিবেন, বাজার হইতেও কত কম মূল্যে আমি আমার দ্রব্যাদি বিক্রয় করিয়া থাকি।

আমার কথায় তিনি প্রথমতঃ সম্পূর্ণরূপে বিশ্বাস করিলেন বলিয়া অনুমান হইল। কিন্তু পরিশেষে আমাকে কহিলেন, আচ্ছা, আপনি আমার নিমিত্ত এক থান ভাল কিংখাপ কাপড় আনিবেন।

জমিদার মহাশয়ের এই কথা শুনিয়া আমি সেই দিবস আমার বাসায় চলিয়া আসিলাম; এবং কিছু অর্থ সহ বড়বাজারে গমন করিয়া এক থান অতি উৎকৃষ্ট কিংখাপ কাপড় ক্রয় করিয়া সেই দিবস সন্ধ্যার সময় পুনরায় সেই জমিদার মহাশয়ের বাড়ীতে গিয়া উপস্থিত হইলাম। আমার আনীত কিংখাপ দেখিয়া তাহার বেশ পসন্দ হইল, তিনি উহার দাম জিজ্ঞাসা করিলেন।

উত্তরে আমি কহিলাম, এ কাপড়ের দাম আমি এখন বলিব না। এই কাপড় অদ্য আপনার নিকট রহিল, আপনি ইহা একবার বাজার যাচাইয়া দেখুন, দোকানদারগণ ইহার কি দাম বলিয়া দেয়। আমি কল্য সন্ধ্যার সময় পুনরায় আপনার নিকট আসিব, সেই সময় ইহার দাম আপনাকে বলিব।

আমার প্রস্তাবে জমিদার মহাশয় সম্মত হইলেন, আমিও সেই কাপড় সেই স্থানে রাখিয়া আপনার বাসায় প্রত্যাবর্তন করিলাম।

পরদিবস বৈকালে আমি পুনরায় জমিদার মহাশয়ের বাসায় গিয়া উপস্থিত হইলাম। তিনি আমাকে দেখিয়া সেই কাপড়ের দাম জিজ্ঞাসা করিলেন।

তাহার কথার উত্তরে আমি কহিলাম, মহারাজ! ইহার দাম আমি প্রথমে বলিব না, পশ্চাতে বলিব। এই কাপড় বাজারে যাচাইয়া ইহার কি দাম আপনি জানিয়াছেন, বা আপ নিইবা ইহার কি দাম দিতে ইচ্ছা করেন, তাহা আমি পূৰ্বে জানিতে ইচ্ছা করি। আপনি ইহা মনে করিবেন না যে, আপনি ইহার দাম আমার ন্যায্য দাম অপেক্ষা অধিক প্রদান করিলে, আমি গ্রহণ করিব। সেই কাপড়ের দাম এই কাগজে লিখিয়া আমি এই স্থানে রাখিয়া দিলাম, আমার ন্যায্য দাম অপেক্ষা যদি আপনি অধিক দাম প্রদান করেন, তাহা হইলে আমি অধিক গ্রহণ করিব না। আমার ন্যায্য দামই আমাকে আপনি প্রদান করিবেন।

এই বলিয়া যে দামে আমি সেই কিংখাপ ক্রয় করিয়া আনিয়া ছিলাম, তাহার অর্ধেক দাম একখানি কাগজে লিখিয়া আমি সেই স্থানে রাখিয়া দিলাম। আমার কথা শুনিয়া জমিদার মহাশয় আমার প্রস্তাবে সম্মত হইলেন। তাঁহার কথার ভাবে অনুমান হইল, কি করে সেই কাপড় লওয়া যাইতে পারে, তাহা তিনি যাচাইয়া রাখিয়াছেন। তিনি আমার কথায় আর কোনরূপ দ্বিরুক্তি না করিয়া যে দরে তিনি সেই কাপড় ক্রয় করিতে পারেন, তাহা আমাকে বলিলেন। আমি দেখিলাম, যে দরে আমি উহা ক্রয় করিয়াছিলাম, তাহার অপেক্ষাও প্রায় এক-চতুর্থ অংশ কম করিয়া উহার দাম বলিলেন।

তাহার কথা শুনিয়া আমি একটু কপট আনন্দ প্রকাশ করিলাম ও কহিলাম, আমি আজ প্রকৃতই একজন খরিদ্দার পাইছি। যে ব্যক্তি দ্রব্যের উপযুক্ত দাম না জানেন, তাহার সহিত কেনা-বেচা করা যে কতদুর কষ্টকর কাৰ্য্য, তাহা যিনি করিয়া ছেন, তিনিই বলিতে পারেন। আপনি যে দাম বলিয়াছেন, তাহা এই বন্ত্রের প্রকৃত দাম; কিন্তু এই দ্রব্য কোন কারণ বশতঃ আমার কিছু কম মূল্যে ক্রয় করা ছিল বলিয়াই, আমি আপনাকে আরও কম মূল্যে দিতে পারিতেছি।

এই বলিয়া যে কাগজে আমি উহার খরিদ মূল্যের অর্ধেক দাম লিখিয়া রাখিয়াছিলাম, সেই কাগজখানি তাহার হস্তে প্রদান করিলাম। আমার লিখিত দর দেখিয়া তিনি অতিশয় সন্তুষ্ট হই লেন, এবং আমার লিখিত মত সেই দ্রব্যের মূল্য তিনি তৎক্ষণাৎ আমাকে প্রদান করিলেন। তদ্ব্যতীত গাড়ি ভাড়া বলিয়া আর দুই টাকা আমাকে দিয়া, অন্য আর একটা দ্রব্যের ফরমাইস দিলেন। পরদিবস সেই দ্রব্য বাজার হইতে ক্রয় করিয়া তাহার নিকট লইয়া গেলাম, এবং আমার খরিদ মূল্য অপেক্ষাও কিছু কম মূল্যে উহা আমি তাহার নিকট বিক্রয় করিলাম। ইহাতে তিনি আমার উপর আরও সন্তুষ্ট হইয়া কহিলেন, আপনি কেবলই কি বস্ত্রের কারবার করিয়া থাকেন, না জহরত-আদিও বিক্রয় করেন?

উত্তরে আমি কহিলাম, বস্ত্রাদি আমি অতি অল্প পরিমাণেই বিক্রয় করিয়া থাকি। আমার অধিক কারবার জহরতের। কেন মহাশয় আপনি আমাকে একথা জিজ্ঞাসা করিতেছেন?

জমিদার। আমার কিছু জহরতের প্রয়োজন হইয়াছে; সেই নিমিত্তই আমি আপনাকে জিজ্ঞাসা করিতেছি।

আমি তাহাকে পুনরায় জিজ্ঞাসা করিলাম, আপনার কত টাকার জহরতের প্রয়োজন হইবে? তাহার উত্তরে তিনি কহি লেন, প্রায় দশ হাজার টাকার জহরতের প্রয়োজন।

আমি কহিলাম, এ অতি সামান্য কথা। আপনার কি কি দ্রব্যের প্রয়োজন, তাহার একটা তালিকা প্রস্তুত করিয়া আপনি আমাকে প্রদান করুন, আমি সেই তালিকা অনুযায়ী জহরত আনিয়া আপনাকে প্রদান করিব। আপনি সেই সকল জহরত প্রথমে যাচাই করিয়া দেখিবেন, এবং পরিশেষে তাহার মূল্য আমাকে প্রদান করিবেন।

আমার এই কথা শুনিয়া কি মূল্যের কি কি জহরতের প্রয়োজন, তাহার একটা তালিকা প্রস্তুত করিয়া জমিদার মহাশয় আমাকে প্রদান করিলেন। আমি সেই তালিকা গ্রহণ করিয়া তাঁহার একজন কর্ম্মচারীর দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করিলাম। সেই কর্ম্মচারী সর্বদা জমিদার মহাশয়ের নিকট থাকিতেন, এবং তিনি যাহা বলিতেন, তাহা প্রায়ই তিনি শুনিতেন। আমি বলিতে ভুলিয়া গিয়াছি, জমিদার মহাশয়ের সহিত সাক্ষাৎ হইবার পূর্বেই আমি তাঁহার সহিত সাক্ষাৎ করিয়া, তাঁহার সহিত একরূপ বন্ধুত্ব স্থাপন করিয়াছিলাম। যে দিবস জমিদার মহাশয়ের নিকট কোন দ্রব্য বিক্রয় করিয়া কিছু অর্থ সংগ্রহ করিতে পারিতাম, সেই দিবস তাহা হইতে তাহাকেও কিছু অর্থ প্রদান করিতাম। সুতরাং জমিদার মহাশয়ের নিকট হইতে সৰ্ব্বদা যাহাতে আমি কিছু প্রাপ্ত হই, তিনি তাহাই করিতেন।

জমিদার মহাশয় আমাকে জহরতের ফরমাইস দিলে পরই, তিনি জমিদার মহাশয়কে কহিলেন, যে ব্যক্তি এত টাকার জহরত আপনার নিকট আনয়ন করিবেন, তাঁহাকে উহার নিমিত্ত কিছু অগ্রিম টাকা দেওয়া কর্ত্তব্য। কারণ, অগ্রিম কিছু টাকা প্রদান করিলে যতশীঘ্ন পারিবেন, জহরত লইয়া ইনি আপনার নিকট উপস্থিত হইবেন।

কর্ম্মচারীর কথা শুনিয়া জমিদার মহাশয় একখানি হাজার টাকার নোট বাহির করিয়া আমার হস্তে প্রদান করিলেন। বলা বাহুল্য, সেই স্থান হইতে আসিবার সময় আমি কর্ম্মচারীকে কিছু প্রদান করিয়া আসিলাম। সেই কৰ্ম্মচারীকে আমি মধ্যে মধ্যে কিছু কিছু প্রদান করিতাম বলিয়াই যে তিনি আমার উপর এতদুর অনুগ্ৰহ করিতেন, তাহা নহে। সময় সময় তাহাকে সঙ্গে করিয়া আমার বাসায় আনিতাম ও তাহাকে লইয়া আমি ও ত্রৈলোক্য নানারূপ আমোদ-আহলাদ করিতাম।

সেই টাকা লইয়া আমি সেই স্থান হইতে প্রস্থান করিলাম, এবং আপন বাসায় আসিয়া সেই টাকা ত্রৈলোক্যের হস্তে প্রদান করিলাম। এতগুলি টাকা আমি একবারে কোথায় পাইলাম, জিজ্ঞাসা করায়, আমি ত্রৈলোক্যকে আদ্যোপান্ত সমস্ত ব্যাপার বলিলাম। আমার কথা শুনিয়া ত্রৈলোক্য কহিল, তাহা হইলে সেই জমিদার মহাশয়ের নিকট আর গমন করিবার প্রয়োজন কি? এই হাজার টাকায় এখন অনেক দিবস আমাদিগের চলিবে।

ত্রৈলোক্যের কথার উত্তরে আমি কহিলাম, তাহা কি কখনও হইতে পারে। কারণ, জমিদার মহাশয়ের কর্ম্মচারী আমাদিগের বাসা পর্যন্ত অবগত আছেন। বিশেষতঃ যখন তাঁহারই কথায় বিশ্বাস করিয়া জমিদার মহাশয় আমাকে এই টাকা প্রদান করিয়াছেন, তখন তাহাদিগের নিকট আর গমন না করিলে, সেই কর্ম্মচারীই নিতান্ত বিপদগ্রস্ত হইবেন। সুতরাং তাঁহাকে অবমানিত করিয়া আমার সবিশেষ কোন ফল লাভ হইবে না। অধিকন্তু যদি তাহাদিগের সহিত প্রণয় রাখিয়া চলিতে পারি, তবে এক সহস্র কেন, এরূপ কত সহস্র টাকা আমি তাহাদিগের নিকট হইতে ক্ৰমে গ্রহণ করিতে সমর্থ হইব। তুমি যেরূপ প্রস্তাব করিতেছ, সেই প্রস্তাবে আমি কোনরূপেই সম্মত হইতে পারি না। কিন্তু আমি এক উপায় মনে মনে স্থির করিয়াছি। যাহা ভাবিতেছি, তাহা যদি কার্যে পরিণত করিতে পারি, তাহা হইলে আমাদিগের লাভও যথেষ্ট হইবে, এবং সেই কৰ্ম্ম চারী প্রভৃতি কাহার কোনরূপ অনিষ্ট হইবার সম্ভাবনা থাকিবে না। অথচ সেই জমিদার মহাশয়ের বাড়ীতে আমার খুব পসার থাকিবে।

এই বলিয়া আমি মনে মনে যাহা স্থির করিয়াছিলাম, তাহা ত্রৈলোক্যকে বলিলাম। আমার কথা শুনিয়া ত্রৈলোক্য প্রথমতঃ একবারে হতবুদ্ধি হইয়া সেই স্থানে বসিয়া পড়িল ও কহিল, এরূপ কাৰ্য আমার দ্বারা কখনই হইবে না। কিন্তু সে কি করিবে? আমার প্রস্তাবে পরিশেষে তাহাকে সম্মত হইয়া আমাকে সৰ্ব্বতোভাবে সাহায্য করিতে প্রস্তুত হইতে হইল।

পঞ্চম পরিচ্ছেদ।

পরদিবস অতি প্রত্যূষে আমি আমার বাসা হইতে বহির্গত হইয়া গেলাম। সহরের ভিতর নানাস্থানে অনুসন্ধান করিয়া সুবিধা মত একটা বাড়ী দেখিতে পাইলাম। কোন গতিতে সেই বাড়ী ভাড়া করিতে পারিলে, আমার মনোবাঞ্ছা পূর্ণ করিতে পারিব, এই ভাবিয়া খুঁজিয়া খুঁজিয়া সেই বাড়ীর মালিককে বাহির করিলাম। তাহার সহিত সাক্ষাৎ করিয়া কেবলমাত্র সাতদিবসের নিমিত্ত সেই বাড়ী ভাড়া লইতে চাহিলাম। কিন্তু সামান্য দিবসের নিমিত্ত সেই বাড়ী ভাড়া দিতে তিনি অসম্মত হওয়ায়, পরিশেষে একমাসের নিমিত্তই আমাকে সেই বাড়ী ভাড়া লইতে হইল। কিন্তু যাঁহার বাড়ী, তিনি যে ইহাতেও ন্যায্য ভাড়া গ্রহণ করিলেন, তাহা নহে; নিয়মিত ভাড়া অপেক্ষা প্রায় দ্বিগুণ ভাড়া আমার নিকট হইতে অগ্রিম গ্রহণ করিয়া, তাহার পর তিনি আমার হস্তে সেই বাড়ীর চাবি অর্পণ করিলেন। চাবি আনিয়া আমি সেই বাড়ী খুলিলাম, এবং কতকগুলি আসবাব ভাড়া করিয়া সেই দিবসেই উহার বৈঠকখানা সাজাইয়া ফেলিলাম। গৃহ সাজান হইয়া গেলে, আমি আড়গোড়ায় গমন করিলাম। সেই স্থানে একখানি জুড়িগাড়ি ও একখানি কম্পাস গাড়ি একদিবসের নিমিত্ত ভাড়া করিয়া তাহার অগ্রিম ভাড়া তাহা দিগকে প্রদান করিলাম। তাহাদিগের সহিত আমার এইরূপ বন্দোবস্ত রহিল যে, পরদিবস আমি আড়গোড়ায় গমন করিয়া গাড়ি দুইখানি সঙ্গে করিয়া আনিব।

এই সকল কার্য সম্পন্ন করিতে আমার সমস্ত দিবস অতীত হইয়া গেল। সমস্ত দিবসের মধ্যে আমি আমার বাসায় আর ফিরিতে পারিলাম না। ক্রমে সন্ধ্যা হইল, দেখিতে দেখিতে ক্রমে রাজি নয়টাও বাজিয়া গেল। রাত্রি নয়টার পর আমি আমার বাসায় ফিরিয়া গেলাম, এবং ত্রৈলোক্যকে সম্বোধন করিয়া কহিলাম, আমি যে কাৰ্য্যের নিমিত্ত অদ্য প্রাতঃকালে বাড়ী হইতে বহির্গত হইয়া গিয়াছিলাম, তাহার সমস্তই ঠিক করিয়া আসিয়াছি। ঘর ভাড়া হইয়া গিয়াছে, এই দেখ তাহার চাবি। ঘর দ্রব্যাদিতে সুসজ্জিত করিয়া রাখিয়াছি। এই বলিয়া আমার পকেট হইতে সেই বাড়ীর চাবি বাহির করিয়া তৈলোক্যের হস্তে প্রদান করিলাম।

আমার কথার উত্তরে ত্রৈলোক্য কহিল, চাবি ত দেখিলাম; কিন্তু কিরূপ স্থান ঠিক করিয়াছেন, চলুন একবার যাইয়া দেখিয়া আসি।

ত্রৈলোক্যের সেই কথায় আমি তখন সম্মত হইলাম না, তাহাকে সেই রাত্রিতে আমি সেই স্থানে লইয়া গেলাম না। কহিলাম, আজ রাত্রি অধিক হইয়াছে। বিশেষতঃ সেই স্থান নিকটেও নহে, অনেক দূরে। সে স্থানে গিয়া ফিরিয়া আসিতে আজ রাত্রি কাটিয়া যাইবে, অতএব এখন আর সে স্থানে যাইবার প্রয়োজন নাই। কল্য প্রাতঃকালে একবারে সুসজ্জিত হইয়া আমার সহিত গমন করিও, সেই স্থানে তোমাকে রাখিয়া আমি গাড়ি প্রভৃতি আনিবার নিমিত্ত গমন করিব।

আমার কথায় ত্রৈলোক্য সম্মত হইল, এবং আমার পূর্ব পরামর্শ অনুসারে সে যাহাতে উত্তমরূপে সজ্জিত হইতে পারে, তাহার নিমিত্ত উত্তম উত্তম অলঙ্কার ও বস্ত্রাদি সংগ্রহ করিতে তখন প্রবৃত্ত হইল।

পরদিবস অতি প্রত্যূষে উঠিয়া স্নান আহারের কাৰ্য্য শীঘ্র শীঘ্র সমাধা করিয়া লইলাম। অন্য স্থান হইতে বস্ত্র-অলঙ্কার প্রভৃতি যে সকল উত্তম উত্তম দ্রব্য ত্রৈলোক্য চাহিয়া আনিয়া ছিল, তাহার দ্বারা সেও উত্তমরূপে সজ্জিত হইল। তাহার পর আমি একখানি ঠিকা গাড়ি ডাকাইয়া আনিলাম, এবং আমরা উভয়েই উহাতে আরোহণ করিয়া আমাদিগের বাসা হইতে বহির্গত হইলাম। নানাপথ ও গলির ভিতর দিয়া অনেক দূর গমন করি বার পর, একটী গলির ভিতর আমি যে নূতন বাড়ী ভাড়া করিয়া ছিলাম, সেই বাড়ীর দরজায় গিয়া উপস্থিত হইলাম। দরজার সম্মুখে গাড়ি লাগিলে, আমরা সেই গাড়ি হইতে অবতরণ করি লাম। উহার ভাড়া মিটাইয়া দিলে, গাড়িবান্ তাহার গাড়ি লইয়া

প্রস্থান করিল। আমার নিকট সেই বাড়ীর যে চাবি ছিল, তাহার দ্বারা সেই বাড়ীর দরজা খুলিয়া আমরা উভয়েই তাহার ভিতর প্রবেশ করিলাম। বাড়ীর অবস্থা এবং সুসজ্জিত গৃহের অবস্থা দেখিয়া, ত্রৈলোক্য অতিশয় সন্তুষ্ট হইল। পরিশেষে ত্রৈলোক্য সেই বাড়ীর সদর দরজা ভিতর হইতে বন্ধ করিয়া দিয়া সেই সুসজ্জিত গৃহের একখানি চেয়ারের উপর বসিয়া রহিল। আমি গাড়ি আনিবার মানসে সেই আড়গোড়ায় গমন করিলাম।

আড়গোড়ার গমন করিবামাত্রই একখানি প্রকাণ্ড জুড়ি ও একখানি অতিশয় দ্রুতগামী কম্পাস গাড়ি আমি প্রাপ্ত হইলাম। সেই কম্পাস গাড়িতে উপবেশন করিয়াই জুড়ির সহিত আমি পূর্বোক্ত বাড়ীর দরজায় আসিয়া উপস্থিত হইলাম। আমরা সেই স্থানে আগমন করিবামাত্রই ত্রৈলোক্য ভিতর হইতে সেই বাড়ীর দরজা খুলিয়া দিলে আমি বাড়ীর ভিতর প্রবেশ করিলাম। গাড়ি দুইখানি বাড়ীর সম্মুখেই দাড়াইয়া রহিল।

আমি বাড়ীর ভিতর গিয়া প্রথমতঃ ত্রৈলোক্যের সহিত উত্তমরূপে পরামর্শ আঁটিয়া লইলাম। কিরূপ ভাবে আমাদিগকে কি কি করিতে হইবে, তাহার সমস্ত ঠিক হইয়া গেলে, আমি জুড়িগাড়ির সহিসদ্বয়কে সেই গাড়ির পরদা উত্তমরূপে ঢাকিয়া দিতে কহিলাম। সহিসদ্বয় আমার কথা শুনিয়া উহার পরদা সকল এরূপ ভাবে ফেলিয়া দিল যে, উহার ভিতর বসিলে বাহিরের কোন লোক যে আরোহীকে কোনরূপে দেখিতে পাইবে তাহার আর কোনরূপ সম্ভাবনা রহিল না। ইহার পরই ত্রৈলোক্য বাড়ী হইতে বহির্গত হইয়া সেই জুড়িগাড়ির ভিতর গিয়া উপ বেশন করিল। আমি বাড়ীর চাবি বন্ধ করিয়া দিয়া সেই চাবি ত্রৈলোক্যের হস্তে প্রদান করিলাম। আমিও সেই কম্পাস গাড়িতে উঠিয়া বড়বাজার অভিমুখে উঁহাদিগকে গমন করিতে বলিলাম। আমার নির্দেশ মত উভয় গাড়িই একত্র বড়বাজার অভিমুখে গমন করিল।

ক্রমে গাড়ি গিয়া বড়বাজারে উপস্থিত হইল, এবং রামজী লাল যে দোকানের কর্ম্মচারী ছিল, সেই দোকানের সম্মুখে গিয়া উভয় গাড়িই থামিল। আমি গাড়ি হইতে অবতরণ করিয়া দোকানের ভিতর প্রবেশ করিলাম, ত্রৈলোক্য গাড়ির ভিতরেই বসিয়া রহিল।

আমি দোকানের ভিতর প্রবেশ করিয়া দোকানদারকে কহিলাম, একজন রাণী কতকগুলি জহরত ক্রয় করিবেন, আমি তাহাকে সঙ্গে করিয়া আনিয়াছি, তিনি দোকানের সম্মুখে গাড়ির ভিতর বসিয়া আছেন। তাঁহাকে ভাল ভাল কতকগুলি জহরত দেখাও, যদি কোন জহরত তাহার পসন্দ হয়, তাহা হইলে উনি তাহা নিশ্চয়ই গ্রহণ করিবেন। ইহার নিকট কিছু বেচিতে পারিলে, আপনাদিগের বেশ দুই পয়সা লাভ হইবে, আমারও কিছু উপার্জন হইবে। আমার বোধ হয়, উনি নিজে কোন দ্রব্যের মূল্য আপনাদিগকে জিজ্ঞাসা করিবেন না, কেবল দ্রব্য পসন্দ করিয়া দিবেন। দ্রব্য পসন্দ হইলে আমরা তাহার মূল্য যাহা বলিব, তাহাতেই উনি তাহা গ্রহণ করিবেন। কিন্তু আপনাকে আমি পূর্ব হইতেই সতর্ক করিয়া দিতেছি যে, যদি কোন দ্রব্যের মূল্য উনি জিজ্ঞাসা করেন, তাহা হইলে উহার মূল্য সেই সময় যেন খুব অধিক করিয়া বলা হয়।

দোকানদারকে এইরূপ শিখাইয়া দিয়া তাহাকে সঙ্গে লইয়া আমি দোকানের বাহিরে আসিলাম, এবং সেই জুড়িগাড়ির নিকট দাঁড়াইয়া কহিলাম, এই গাড়িতে রাণীজি আছেন, তিনি অনেকগুলি জহরত ক্রয় করিবেন। আপনি এক একটী করিয়া জহরতের বাক্স তাহার হস্তে প্রদান করুন, ইহার মধ্যে যদি কোন দ্রব্য রাণীজির পসন্দ হয়, তাহা হইলে তাহার দর স্থির করিয়া দিয়া উহার মূল্য গ্রহণ করিবেন। আমার প্রস্তাবে দোকানদার সম্মত হইলেন, এবং এক একটী করিয়া নানা প্রকার জহরতের বাক্স রাণীজির হস্তে প্রদান করিতে লাগিলেন। সেই সকল জহরতের মধ্যে যে সকল জহরত রাণীজি পসন্দ করিলেন, বা যে সকল জহরত আমাদিগের লইয়া যাইবার পরামর্শ ছিল, সেই সকল জহরত ত্রৈলোক্য একটা একটা করিয়া আমার হস্তে প্রদান করিতে লাগিল। এইরূপে কতকগুলি জহরত আমার হস্তে প্রদান করিবার পর আমাদিগের পূর্ব পরামর্শ অনুযায়ী ত্রৈলোক্য আমাকে কহিল, আমি এখন বাসায় যাইতেছি। আপনি এই সকল জহরতের উপযুক্ত দাম দোকানদারের সহিত স্থির করিয়া আমার বাসায় লইয়া আসিবেন। আর হয় দোকানদারকে, না হয় তাহার দোকানের অপর কোন একজন লোককে সেই সঙ্গে লইয়া যাই বেন। আমার বাসায় গেলেই, আমি হয় ইহার নগদ মূল্য প্রদান করিব, না হয় কোন ব্যাঙ্কের উপর একখানি চেক প্রদান করিব। আমার বোধ হয়, এই সকল জহরতের মূল্য আট দশ হাজার টাকার অধিক হইবে না। সুতরাং এই সকল সামান্য দ্রব্যের মূল্য বাকী রাখিবার কোনরূপ প্রয়োজন দেখি না। আমাদিগকে কেবল এই মাত্র বলিবার পরই রাণীজি তাহার গাড়ি চালাইতে কহিলেন। দেখিতে দেখিতে সেই প্রকাণ্ড জুড়ি বড়বাজার অতিক্রম করিয়া চলিয়া গেল।

ত্রৈলোক্য গমন করিবার পর আমি সেই দোকানদারের সহিত একত্র বসিয়া যে সকল দ্রব্য ত্রৈলোক্য পসন্দ করিয়া গিয়াছিল, তাহার মূল্যের একটী তালিকা প্রস্তুত করিলাম। তালিকা প্রস্তুত হইলে, সেই জহরতগুলি লইয়া দোকানদারকে রাণীজির বাসায় গমন করিবার নিমিত্ত অনুরোধ করিলাম; কিন্তু তিনি নিজে না আসিয়া তাঁহার একজন অতিশয় বিশ্বাসী কর্ম্মচারী রামজীলালকে আমার সহিত পাঠাইয়া দিলেন। তিনি সেই সকল গহনার সহিত আমার গাড়িতে আসিয়া উপবেশন করিলেন।

ত্রৈলোক্য বড়বাজার হইতে প্রত্যাগমন করিলে প্রায় একঘণ্টা পরে আমি জহরতগুলির সহিত রামজীলালকে সঙ্গে করিয়া আমাদিগের সেই নূতন বাড়ীতে উপস্থিত হইলাম। সেই স্থানে উপস্থিত হইয়াই আমি আমার সেই গাড়ি বিদায় করিয়া দিলাম। ইতিপূর্বে ত্রৈলোক্যও প্রত্যাবর্তন করিবার পর তাহার জুড়ি বিদায় করিয়া দিয়াছিল।

রামজীলালকে সঙ্গে করিয়া আমি একবারে উপরে উঠিলাম। যে ঘরটী উত্তমরূপে সাজান ছিল, সেই গৃহে তাহাকে বসাইয়া তাহার সহিত দুই চারিটী কথা কহিতেছি, এরূপ সময় রাণীজি বা তৈলোক অন্য ঘর হইতে আসিয়া সেই গৃহে প্রবেশ করিল। আমি রামজীলালের সম্মুখে ত্রৈলোক্যকে কহিলাম, সমস্ত জহরতের দাম প্রায় দশ হাজার টাকা হইয়াছে। দোকানদার মহাশয় নিজে আসিতে পারেন নাই, তিনি তাঁহার এই বিশ্বাসী লোককে জহরতের সহিত আপনার নিকট পাঠাইয়া দিয়াছেন; কিন্তু ইহার মনিব ইহাকে বলিয়া দিয়াছেন যে, অগ্রে টাকা না পাইলে এই সকল জহরত যেন কাহারও হস্তে প্রদান করা না হয়। কারণ, কলিকাতা জুয়াচোরে পরিপূর্ণ।

আমার এই কথা শুনিয়া রাণীজি সেই স্থানে উপবেশন করিয়া রামজীলালের সহিত কথাবার্তা কহিতে লাগিল। সেই অব কাশে আমি একবার নিয়ে গমন করিয়া বাড়ীর ভিতর দিক হইতে সদর দরজা তালাবদ্ধ করিয়া দিয়া পুনরায় উপরে উঠিলাম। পরে যে স্থানে রামজীলাল বসিয়াছিলেন, তাহার এক পার্শ্বে গিয়া উপবেশন করিলাম।

ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ।

আমি সেই স্থানে উপবেশন করিলে পর, ত্রৈলোক্য ওরফে বাণীজি, রামজীলালের নাম জিজ্ঞাসা করিল। উত্তরে রামজী লাল কহিল, রাণজি! আমার নাম রামজীলাল।

ত্রৈলোক্য। আমি যে সকল জহরত পসন্দ করিয়া দিয়া ছিলাম, তুমি সেই সকল জহরতই আনিয়াছ ত?

রামজীলাল। আমি তাহাই আনিয়াছি।

ত্রৈলোক্য। উহার দাম কত হইয়াছে?

রামজীলাল। প্রায় দশ হাজার টাকা।

ত্রৈলোক্য। তুমি কি কি দ্রব্য আনয়ন করিয়াছ দেখি? রামজীলাল। রাণীজি! আমাকে ক্ষমা করিবেন। আমার মনিবের আদেশ আছে যে, অগ্রে দাম না পাইলে এই সকল দ্রব্য কাহারও হস্তে প্রদান করিতে পারিব না।

ত্রৈলোক্য। এত সামান্য টাকার নিমিত্ত তোমার মনিবের এত অবিশ্বাস।

রামজীলাল। আপনাকে আমার কিছুমাত্র অবিশ্বাস নাই। আমার অপরাধ লইবেন না, আমাকে ক্ষমা করিবেন। আমি সামান্য চাকর হইয়া কিরূপে মনিবের আদেশ লঙ্ঘন করিব?

ত্রৈলোক্য। তোমার মনিবের এত অবিশ্বাস করিবার কারণ?

রামর্জীলাল। কয়েকবার জুয়াচোরের হস্তে পড়িয়া তিনি ঠকিয়াছেন, তাহাতেই আমাকে এইরূপ আদেশ প্রদান করিয়াছেন। আপনি ত সবিশেষ জানেন যে, কলিকাতা সহর জুমাচোরগণের দ্বারা পরিপূর্ণ।

আমি এতক্ষণ পর্যন্ত স্থির ভাবে সেই স্থানে বসিয়াছিলাম, রামজীলালের এই সকল কথা শুনিয়া আমি আর স্থির থাকিতে পারিলাম না। রাগের ভাব প্রকাশ করিয়া রামজীলালকে কহিলাম, তুমি জান না, কাহার সহিত কিরূপ ভাবে তুমি কথা কহিতেছ। তুমি জান, রাণীজি একটু রাগ করিলে তোমার মস্তক সহ এই বাটী হইতে প্রস্থান করা কঠিন হইবে?

আমার এই কথা শুনিয়া রামজীলাল যেন একটু ভীত হইল; কিন্তু মনের ভাব গোপন করিয়া মুখে একটু সাহস দেখাইয়া কহিল, কেন, আমি কি অন্যায় কথা বলিয়াছি যে, আমার এই বাটী হইতে মস্তক সহ বাহির হওয়া কঠিন হইয়া উঠিবে? আমি কি চোর? ইহা কি ইংরাজের রাজত্ব নহে? অরাজকের মুলক যে, যাহার যাহা ইচ্ছা হইবে, অনায়াসেই তিনি তাহা করিবেন? দশ হাজার টাকার জহরত বিক্রয় না হইলে আমার মনিব এক বারে গরিব হইয়া যাইবেন না! আমি জহরত বিক্রয় করিব না, চলিলাম। এই বলিয়া রামজীলাল উঠিয়া দাঁড়াইল। এক

রামজীলালের কথা শুনিয়া এবং তাহার অবস্থা দর্শন পুলিস আমি নিতান্ত রাগের ভাব দেখাইয়া বলিলাম, কি! ছোট মুরিবে, কথা! রাণীজিকে এইরূপ ভাবে অবমাননা! এ অবমাননা হবে। স্বচক্ষে দেখিয়া কোনরূপেই সহ করিতে পারি না। এই বলিয়া আমার জুতা সহিত রামজীলালের বক্ষে সবলে এক পদাঘাত করিলাম। আমার লাথি খাইয়া হতভাগ্য রামজীলাল চতুর্দিক অন্ধকার দেখিল, এবং সেই স্থানেই পড়িয়া গেল। পড়িবামাত্রই আমি দ্রুতগতি তাহার বুকের উপর উঠিয়া বলপূর্বক তাহাকে ধরিলাম।

আমি তখন কি করিলাম? আপনারা যাহা কখনও স্বপ্নেও ভাবেন নাই, আজ আমি তাহাই করিলাম। কেবলমাত্র একজন শ্রীলোকের সাহায্যে যে কাৰ্য্য কখনও হইতে পারে বলিয়া আপ নারা একবারও মনে স্থান দেন নাই, আজ আমি তাহাই করিলাম। জন্য বা তস্করেরাও যে কাৰ্যে হস্তক্ষেপ করিতে মনে মনে ঘৃণা বোধ করে, আজ আমি তাহাই করিলাম। রাক্ষস বা পিশাচ গণও যে কার্যের কথা শুনিলে আপনাপন কর্ণে অঙ্গুলি প্রদান করে, আমি আজ তাহাই করিলাম। উঃ! যে কথা বলিতে এখন আমার কণ্ঠবোধ হইয়া আসিতেছে, যে কথা বলিতে এখন আমার হৃদয় বিদীর্ণ হইয়া যাইতেছে, যে কথা বলতে কোনরূপেই এখন আমি আমার চক্ষুজল সম্বরণ করিতে পারিতেছি না, সেই সময় আমি তাহাই কাৰ্যে পরিণত করিয়াছিলাম। যে মহাপাপের আদি নাই, অন্ত নাই, যে মহাপাপের কথা শুনিলেও মহাপাপ না, আমি সেই সময় সেই মহাপাপে লিপ্ত হইতে কোনরূপেই জুখ হইলাম না। বিনা-কারণে ও বিনা-দোষে সেই নিরীহ, প, নিঃসহায় ব্যক্তির উপর সবলে পা দিয়া দাড়াইলাম, য পৰ্য্যন্ত তাহার প্রাণবায়ু একবারে শেষ না হইয়া গেল,–পৰ্যন্ত আর পা উঠাইলাম না। ত্রৈলোক্যও বলপূর্বক তাহার পা দুইখানি চাপিয়া ধরিয়া আমার এই মহাপাপের সম্পূর্ণরূপে সহায়তা করিল। সামান্য টাকার লোভে দেখিতে দেখিতে এই ভয়ানক নৃশংস হত্যাকাণ্ড সমাধা করিলাম।

এই ভয়ানক হত্যাকাণ্ড সমাধা হইবার পর, রামজীলালের মৃতদেহের উপর আমার দৃষ্টি একবার পতিত হইল। সেই দৃষ্টির সঙ্গে সঙ্গে ক্ষণকালের নিমিত্ত আমার মনের ভাবও সবিশেষরূপে পরিবর্তিত হইয়া গেল। চক্ষু দিয়া বিন্দুপাত হইল, সামান্য টাকার উপর ঘৃণা জন্মিল; পরকালের ভীষণ ভাবনা আসিয়া হৃদয় অধিকার করিল। কিন্তু অধিকক্ষণ পর্যন্ত এভাব আমার হৃদয়ে স্থান পাইতে দিলাম না। পরক্ষণেই আবার সে ভাব দূরে পলায়ন করিল। রামজীলালের সমভিব্যাহারে যে সকল জহরত ছিল, তাহার সমস্তগুলি তখন আমরা অপহরণ করিলাম।

রামজীলালের মৃতদেহ লইয়া তখন আমরা কি করিব, মনে সেই ভাবনা আসিয়া উপস্থিত হইল। একবার ভাবিলাম, রাত্রি কালে উহার মৃতদেহ টানিয়া রাস্তায় ফেলিয়া দিব; কিন্তু তাহা বিপদ-জনক বলিয়া মনে হইল। পুনরায় ভাবিলাম, একমাস পর্যন্ত খালি-বাড়ীর ভিতর এই মৃতদেহ আবদ্ধ থাকিলেই সকল গোল মিটিয়া যাইবে; একমাস পরে উহা দেখিয়া কেহই বুঝিতে পারিবে না যে, উহা কাহার মৃতদেহ। সুতরাং আমাদিগের বিপদের সম্ভাবনা অতি অল্পই থাকিবে। কিন্তু পরিশেষে মনে হইল, দুই চারিদিবসের মধ্যেই এই মৃতদেহ পচিয়া যখন ভয়ানক দুর্গন্ধ চতুর্দিকে বহির্গত হইতে আরম্ভ হইবে, তখন পুলিস আসিয়া নিশ্চয়ই এই বাড়ী খুলিয়া বাড়ীর ভিতর প্রবেশ করিবে, এবং সম্মুখেই মৃতদেহ দেখিতে পাইয়া অনুসন্ধানে প্রবৃত্ত হইবে। এরূপ অবস্থায় সকল কথা প্রকাশ হইয়া পড়িষরই সম্পূর্ণরূপ সম্ভাবনা। মনে মনে এইরূপ নানা বিষয়ের কল্পনা করিয়া পরি শেষে একটা উপায় বাহির করিলাম। আমি ও ত্রৈলোক্য উভয়ে মিলিয়া রামজীলালের মৃতদেহ উপর হইতে নীচে নামাইলাম, এবং নীচের একখানি গৃহের মেঝের উপর যে সকল পাথর বসান ছিল, অনেক কষ্টে তাহার তিন চারিখানি উঠাইয়া ফেলি লাম। পরে সেই স্থান হইতে মৃত্তিকা উঠাইয়া ক্ৰমে একটা প্রশস্ত গহ্বর খনন করিলাম। তখন রামজীলালের মৃতদেহ সেই গর্তের ভিতর উত্তমরূপে পুতিয়া ফেলিলাম। তাহার উপর যতদুর মৃত্তিকা ধরিতে পারে, তাহা উত্তমরূপে দুরমুস করিয়া বসাইয়া দিয়া, যে প্রস্তর চারিখানি উঠাইয়া ফেলিয়াছিলাম, তাহাও উত্তমরূপে তাহার উপর বসাইয়া দিলাম। এই সকল কার্য সম্পন্ন করিতে আমাদিগের অতিশয় পরিশ্রম হইল সত্য; কিন্তু এই কাৰ্য্য সম্পন্ন করিবার উপযোগী দ্রব্যাদির নিমিত্ত আমাদিগের কোনরূপ কষ্ট পাইতে হইল না। চুন, সুরকি, সাবল, কোদালী, দুরমুস প্রভৃতি আমাদিগের যে কোন দ্রব্যের প্রয়োজন হইল, তাহার সমস্তই আমরা সেই বাড়ীর একখানি গৃহের ভিতর প্রাপ্ত হইলাম। সেই বাড়ী প্রস্তুত করিবার সময় যে সকল যন্ত্রাদি ব্যবহৃত হইয়াছিল, এবং চুন, সুরকি, বালী প্রভৃতি যে সকল দ্রব্য উদ্বৃত্ত হইয়াছিল, তাহার সমস্তই সেই গৃহের ভিতর রক্ষিত ছিল। কলেও সমস্ত দিবস জল ছিল। সুতরাং কোন দ্রব্যই আমাদিগের অপর কোন স্থান হইতে সংগ্রহ করিতে হইল না। কিন্তু সেই কাৰ্য্য সমাধা করিতে করিতে আমাদিগের সমস্ত দিবস অতিবাহিত হইয়া গেল। মৃতদেহ প্রােথিত হইবার পর, যে সকল মৃত্তিকা প্রভৃতি উদ্বৃত্ত হইয়াছিল, তাহা সেই গৃহ হইতে বাহির করিয়া স্থানান্তরে রাখিয়া দিলাম। সেই গৃহখানি এরূপ ভাবে পরিষ্কার করিয়া রাখিলাম যে, উহার অবস্থা দেখিয়া কাহারও মনে কোনরূপ সন্দেহ না হয়।

রামজীলালের মৃতদেহ এইরূপে মৃত্তিকার ভিতর প্রােথিত করিয়া, ঘর সাজাইবার যে সকল দ্রব্য যে স্থান হইতে ভাড়া করিয়া আনা হইয়াছিল, সেই সকল দ্রব্য ভাড়া সমেত সেই স্থানে পাঠাইয়া দিলাম, এবং সেই বাড়ীর সদর দরজায় তালাবদ্ধ করিয়া একখানি ঠিকা গাড়ি আনিয়া আমরা সে দিবস সেই স্থান হইতে আপন বাসায় ফিরিয়া আসিলাম। বলা বহুল্য, যে সকল জহরত আমরা রামজীলালের নিকট হইতে গ্রহণ করিয়াছিলাম, তাহা আমাদিগের সঙ্গে আনিতে ভুলিলাম না।

পরদিবস অতি প্রত্যূষে আমি সেই জহরতগুলি এবং সেই বাড়ীর চাবি লইয়া বাড়ী হইতে বহির্গত হইয়া গেলাম। যাহার বাড়ী ভাড়া লইয়াছিলাম, তাহাকে যাহা বলিয়া চাবি ফিরাইয়া দিয়া আসিয়াছিলাম, তাহা আপনি পূৰ্বেই সেই বাড়ীওয়ালার নিকট হইতে অবগত হইয়াছেন। বাড়ীর চাবি ফিরাইয়া দিয়া সেই জহরতগুলি সেই পশ্চিমদেশীয় জমিদার মহাশয়ের নিকট লইয়া গেলাম। তিনি যেরূপ ভাবের জহরত আনিবার নিমিত্ত আমাকে ফরমাইস করিয়া ছিলেন, ঠিক সেই মত জহরত দেখিয়া অতিশয় সন্তুষ্ট হইলেন। সমস্ত দ্রব্যই তাঁহার পসন্দ হইল। তিনি সেই সকল দ্রব্য গ্রহণ করিয়া তাহার দাম আমাকে জিজ্ঞাসা করিলেন। তাঁহার কথার উত্তরে আমি কহিলাম, এই সকল দ্রব্য দশ বার হাজার টাকার কম আমরা কাহারও নিকট বিক্রয় করি না; কিন্তু আপনার নিকট আমাদিগের অনেক দ্রব্য বিক্রয় হইবার আশা আছে, অথচ কোন্ দ্রব্যের কি মূল্য, তাহাও আপনি উত্তমরূপে বুঝিতে পারেন। এরূপ অবস্থায় এ সামান্য বিষয় লইয়া আমার আর কিছুই বলিবার আবশ্যক নাই। বিবেচনা করিয়া আপনি আমাকে যে মূল্য বলিয়া দিবেন, আমি সেই মূল্যেই উহা আপনাকে প্রদান করিব।

আমার কথা শুনিয়া জমিদার মহাশয় সেই জহরতগুলি আর একবার উত্তমরূপে দেখিলেন ও কহিলেন, আমার বিবেচনায় এই সকল দ্রব্যের মূল্য নয় হাজার টাকার অধিক বলিয়া অনু মান হয় না।

তাহার কথা শুনিয়া আমি কহিলাম, আপনি যে দাম বলিয়া ছেল, তাহা প্রায় ঠিকই হইয়াছে। এই সকল দ্রব্য আমার নয় হাজার টাকায় খরিদ। সেই মূল্যেও আমি উহা আপনাকে বিক্রয় করিতে পারি। ইহাতে আমার আর এক পয়সাও লাভ হয় না।

আমার কথা শুনিয়া জমিদার মহাশয় আর কোন কথা কহিলেন না। আমাকে এক হাজার টাকা পূর্বেই প্রদান করিয়া ছিলেন, এখন বক্ৰী আট হাজার টাকার নোট আনিয়া আমার হস্তে সেই দ্রব্যের মূল্য বলিয়া প্রদান করিলেন। তদ্ব্যতীত আমার লাভ ও পারিশ্রমিক বলিয়া আরও দুইশত টাকা আমাকে দিলেন।

তিনি আমাকে যাহা প্রদান করিলেন, তাহা নগদ টাকা নহে; নম্বরী-নোট। কতকগুলি হাজার টাকা করিয়া, ও কতক গুলি একশত টাকার হিসাবে। আমি সেই নোটগুলি গ্রহণ করিয়া সেই স্থান হইতে চলিয়া আসিলাম, এবং সমস্তই ত্রৈলোকের হস্তে প্রদান করিলাম। সে দিবস আর কোন স্থানে গমন করিতে বা অপর কোন কার্যে হস্তক্ষেপ করিতে ইচ্ছা হইল না। মনে কেমন একরূপ দুর্ভাবনা আসিয়া উপস্থিত হইল। এই সকল কথা যদি কোনরূপে প্রকাশ হইয়া পড়ে, তাহা হইলে আমাকে কি বলিতে হইবে, বা কোন উপায়ই বা অবলম্বন করিতে হইবে। এইরূপে নানা প্রকার পরামর্শ করিতে করিতে সেই রাত্রি অতিবাহিত করিলাম।

পরদিবস দিবা দশটার সময় সেই নোটগুলি সঙ্গে লইয়া, পুনরায় আমি আমার বাসা হইতে বহির্গত হইলাম, এবং করেনসি আফিসে গমন করিয়া সেই স্থানে সেই নোট গুলি প্রদান করিয়া, তাহার পরিবর্তে কতকগুলি দশ টাকার নোট ও কতক গুলি নগদ টাকা গ্রহণ করিলাম। নোটের পৃষ্ঠে নাম লিখিয়া দিতে বলায়, আমি রামজীলালের নাম ও বড়বাজারের ঠিকানা লিবিয়া দিলাম। বলা বাহুল্য, আমি আমার নাম ও ঠিকানা না দিয়া রামজীলালের নামেই সেই নোট ভাঙ্গাইয়া আনিয়াছিলাম। যাহা হউক, উক্ত সমস্ত টাকাই ত্রৈলোকের হস্তে প্রদান করিলাম।

আমি। ত্রৈলোক্য সেই সকল টাকা কোথায় রাখিয়াছে?

কালী। তাহা আমি বলিতে পারি না। সেই সকল টাকা একটা পিত্তলের কলসীর মধ্যে পুরিতে আমি দেখিয়াছি; কিন্তু পরিশেষে উহা যে কোথায় রাথিয়াছে, তাহা আমি বলিতে পারি না। কিন্তু আমি শুনিয়াছিলাম যে, ত্রৈলোক্য উহা কোন স্থানে মৃত্তিকার মধ্যে পুতিয়া রাখিয়াছে।

আমি। তাহার পর?

কালী। ইহার পর কয়েকদিবস পর্যন্ত আর কোনরূপ গোল যোগ শুনিতে পাইলাম না। তাহার পর পুলিসের লোক আসিয়া অনুসন্ধান করিতে লাগিলেন। তাঁহাদিগকে আমি যাহা বলিয়া ছিলাম, তাহা আপনি পূৰ্বেই জানিতে পারিয়াছেন। যে সকল নোট আমি জমিদার মহাশয়ের নিকট হইতে পাইয়া, করেসি আফিস হইতে ভাঙ্গাইয়া আনিয়াছিলাম, সেই সকল নোট রামজীলাল লইয়া প্রস্থান করিয়াছে, এই কথাই কৰ্মচারী গণকে বলিয়াছিলাম। তাহাও করেনসি আফিসে অনুসন্ধান করিয়া আপনারা অবগত হইতে পারিয়াছিলেন যে, রামজীলালই সেই নোট ভাঙ্গাইয়া লইয়া গিয়াছে। ইহার পরই রামজীলালের নামে ওয়ারেন্ট বাহির হয়।

যে মাজিষ্ট্রেট সাহেব রামজীলালের বিরুদ্ধে ওয়ারেন্ট বাহির করিবার আদেশ প্রদান করেন, তিনি কেবলমাত্র আমার সাক্ষ্য ও করেসি অফিসের একটী বাবুর সাক্ষ্য গ্রহণ করিয়াই সন্তুষ্ট হন, অপর কোন বিষয় অনুসন্ধান না করিয়াই ওয়ারেন্ট প্রদান করেন। তাহার পর আর যাহা ঘটিয়াছিল, তাহা আপনি স্বহস্তেই করিয়াছেন।

কালীবাবুর কথা শুনিয়া এই মোকদ্দমার অবস্থা আমরা অতি পরিষ্কাররূপে বুঝিতে পারিলাম। তখন আমরা কালীবাবু ও ত্রৈলোক্য উভয়কেই এই মোকদ্দমার আসামী করিলাম। পূর্বোক্ত সেই সকল টাকা ত্রৈলোক্য কালীবাবুর নিকট হইতে গ্রহণ করিয়া যে কোথায় রাখিয়াছে, তাহা জানিবার নিমিত্ত ত্রৈলোক্যকে লইয়া সবিশেষরূপে পীড়াপীড়ি করিলাম, তাহার ঘর বাড়ী খুড়িয়া উত্তমরূপে অনুসন্ধান করিলাম; কিন্তু কোনরূপেই সেই টাকা বাহির করিতে পারিলাম না। কালীবাবুও সেই সম্বন্ধে আর কোন কথা বলিতে পারিল না, বা বলিল না।

মোকদ্দমা প্রথমতঃ মাজিস্ট্রেট সাহেবের নিকট প্রেরিত হইল। কেবলমাত্র কালীবাবুর কথা ব্যতীত ত্রৈলোক্যের বিপক্ষে আর কোনরূপ প্রমাণ সংগ্রহ করিতে পারিলাম না। কালীবাবু যে বাড়ী ভাড়া লইয়াছিল, তাহার অধিকারীকে যখন বলিলাম, আপনি আপনার এই ভাড়াটিয়া বাটীতে এই ত্রৈলোক্যকে কখনও আসিতে দেখিয়াছিলেন? তখন তিনি তাহার কিছুই বলিতে পারিলেন না। কেবলমাত্র ইহাই বলিলেন, আমার নিকট হইতে কালীবাবু আমার বাটীর চাবি লইয়া আসিলে, আমার বাটীতে কেহ আসিয়া বাস করিয়াছিল কি না, তাহা জানি না, বা দেখি নাই। জহরতের দোকানেরও কোন ব্যক্তিই রাণীজিকে দেখে নাই; সুতরাং কেহই ত্রৈলোক্যকে সেনাক্ত করিতে পারিল না। সহিস-কোচবান্ দোকানদার প্রভৃতিও কেহই ত্রৈলোক্যকে রাণীজি বলিয়া চিনিতে পারিল না। সুতরাং মাজিষ্ট্রেট সাহেবের নিকট হইতে সে যাত্রা ত্রৈলোক্য নিষ্কৃতি লাভ করিল।

কালীবাবুর নিষ্কৃতির উপায় রহিল না। প্রথমতঃ কালী বাবু বাড়ীওয়ালার নিকট একমাসের বন্দোবস্তে বাটী ভাড়া লইয়া চাবিটা লইয়া আসিয়াছিল বটে; কিন্তু দুই তিনদিবসের মধ্যেই বাটীর প্রয়োজন হইল না বলিয়া, সেই চাবি প্রত্যর্পণ করিয়াছিল। সেই দুই তিনদিবসের মধ্যেই সেই বীভৎস-কাণ্ড সকলের অজ্ঞাত সারে কালীবাবু কর্তৃক সম্পাদিত হইয়াছিল, একথা ত দোষী নিজ মুখেই ব্যক্ত করিয়াছিল। অধিকন্তু বাড়ীওয়ালা, সহিস-কোচবান। প্রভৃতির সাক্ষ্যে ও সেনাক্তে তাহা একরূপ প্রমাণীকৃত হইল; চাক্ষুষ প্রমাণ না থাকিলেও, ঘটনা-পরম্পরায় অবিবোধী সমবায়ত্ব প্রমাণে কালীবাবু দোষ-মুক্ত হইতে সমর্থ হইল না। আড়গোড়ায় গিয়া যাহার নিকট গাড়ি ভাড়া করিয়া ভাড়ার টাকা জমা দিয়া ছিল, কালীবাবু তাহা কর্তৃকও পরিচিত হইল; সহিস-কোচবান্ ত চিনিয়াই ছিল। জহরতের দোকানের মালিক ও আমলাগণ কালীবাবুকে সবিশেষরূপেই চিনিয়াছিলেন; করেসি অফিসে তাঁহার নিকট হইতে নম্বরী-নোট বাইয়া কালীবাবু খুচরা নোট ও নগদ টাকা লইয়া রামজীলালের নাম ও ঠিকানা লিখিয়া দিয়া ছিল, তিনিও কালীবাবুকে ভাল করিয়া দেখিয়া বলিলেন যে, এই ব্যক্তিই রামজীলালের নাম ও ঠিকানা লিখিয়া আট হাজার টাকার নম্বরী-নোট ভাঙ্গাইয়া লইয়াছিল। এইরূপে বিধাতার চক্রে পড়িয়া আজ কালীবাবু আর উদ্ধার পাইল না।

যথাক্রমে কালীবাবুর মোকদ্দমা মাজিষ্ট্রেট সাহেব দায়রায় পাঠাইয়া দিলেন। সেই স্থানে জুরির বিচারে কালীবাবু হত্যাপরাধে দোষী সাব্যস্ত হইল, এবং তাহার কাৰ্য্যের উপযুক্ত দণ্ডই প্রাপ্ত হইল। বিচারে তাহার ফাঁসির হুকুম হইল।

[সম্পূর্ণ]

3 thoughts on “রাণী না খুনি? (শেষ অংশ)

      1. আপনাদের উদোগ গুলা খুবিই ভাল লাগছে।
        যেকোনো মোবাইল দিয়ে বই উপভোগ করা যায়।
        আরো বেশি বেশি বই চাই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *