বাঙালি মুসলমানের সামাজিক ইতিহাস কতিপয় প্রসঙ্গ—হাবিব রহমান

ধূসর অতীতের দীপ্র ছায়া
কাজল রশীদ

বাঙালি মুসলমানের সামাজিক ইতিহাস কতিপয় প্রসঙ্গ—হাবিব রহমান \ প্রকাশক: ধ্রুবপদ \ প্রচ্ছদ: মোবারক হোসেন লিটন \ দাম: ২৫৫ টাকা \ পৃষ্ঠা সংখ্যা: ১৫৭

বাঙালি মুসলমানের সামাজিক ইতিহাসের সঙ্গে কলোনিয়াল ট্রিলজির গভীর আন্তসম্পর্ক বিদ্যমান। মোগল, ইংরেজ ও পাকিস্তান ঔপনিবেশের শানে নজুল, পরম্পরা ও কার্যকারণ ‘ট্রিলজি’তে স্থিত। চর্চা, গবেষণা, ইতিহাস-মনস্কতা, সুলুক সন্ধানের নজির থাকলেও পত্রপুষ্পে বিকশিত হয়ে মহীরুহ হয়নি। চ্যালেঞ্জিং ও বন্ধুর পথে নিবেদনের চেয়ে সহজ সাপেক্ষ গবেষণা ও ইতিহাসচর্চা দৃষ্ট হয়। পুনরাবৃত্তি ও কুম্ভিলকবৃত্তির অভিযোগও রয়েছে।
প্রচল গড্ডলিকায় নয়, বৈরী স্রোতের বিরুদ্ধেও কাউকে না কাউকে দাঁড়াতে হয়। পাদপ্রদীপ জ্বালানোর মতো এঁরাই অতীতের ওপর আলো ছড়ান। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতোই প্রতীতি রাখেন: ‘হে অতীত তুমি ভুবনে ভুবনে/ কাজ করে যাও গোপনে গোপনে।’
হাবিব রহমানের বাঙালি মুসলমানের সামাজিক ইতিহাস কতিপয় প্রসঙ্গ বইয়ের পাঠান্তে উপর্যুক্ত প্রসঙ্গের অবতারণা। গবেষক হাবিব রহমান দীর্ঘদিন থেকে বাংলার সামাজিক ইতিহাস ও চিন্তাশীল বাঙালি মুসলমান লেখক-বুদ্ধিজীবীদের জীবন ও কর্মকাণ্ড নিয়ে অধ্যয়ন, অনুশীলন, সংগ্রহ, বিশ্লেষণ ও সম্পাদন করছেন। তাঁর পরিব্রাজক সত্তা ও ইতিহাসনিষ্ঠা প্রশ্নাতীত।
আলোচ্য বইয়ের সূচিবিন্যাস এরকম— ইংরেজ আমলে বাঙালি মুসলমান সমাজের অধঃপতনের কারন ও মুক্তির উপায়: সাময়িকপত্রের দৃষ্টিতে; সমকালীন নারী ভাবনা, ডা. লুৎফর রহমান ও ‘নারীতীর্থ’; বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন : সাফল্য-অসাফল্যের খতিয়ান; ‘আবদুল্লাহ’: বাঙালি মুসলমানের ক্রান্তিকালের দলিল, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি: বাংলা পত্রিকার ভূমকা; বাঙালি মুসলমানের সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞান।
প্রবন্ধগুলোর মধ্যে আন্তসম্পর্কের কথা বলেছেন লেখক। তাঁর মতে, ‘বিষয়বস্তুগত দিক থেকে আন্তসম্পর্কযুক্ত এই লেখাগুলো একসঙ্গে পাঠকের কাছে উপস্থিত করার অন্যতম উদ্দেশ্য বাংলার মুসলমান সম্প্রদায়ের সমাজ-ইতিহাসের মোটামুটি একটা স্বরূপ তুলে ধরা, যা থেকে শিক্ষা নেওয়ার বা দিশা পাওয়ার কিছু দিকদর্শন আছে।’
গবেষকের এই মত অনেকাংশে সত্য হলেও সর্বাংশে নয়। প্রবন্ধের নাম ও গ্রন্থের নামের যৌক্তিকতায় খটকার উদ্রেক হয়। সময়-পরিসীমার ফারাক জিজ্ঞাস্য হয়ে দাঁড়ায়। কেননা, বাংলার মুসলমান বলতে প্রথমে যে ট্রিলজির কথা বলা হয়েছে, তার পূর্ণাঙ্গ রূপ এখানে অনুপস্থিত। এ সম্পর্কিত আকর প্রবন্ধটির নামকরণ থেকেও তা স্পষ্টত—‘ইংরেজ আমলে বাঙালি মুসলমান সমাজের অধঃপতনের কারণ ও মুক্তির উপায়: সাময়িক পত্রের দৃষ্টিতে।’
গবেষক গুরুত্ববহ সহ-শিরোনাম ব্যবহার করে বিষয়টির গভীরে রেখাপাত করেছেন। এগুলো হলো—শিক্ষা, সমাজ, ধর্ম, অর্থনীতি, রাজনীতি ও ভাষা-সাহিত্য-সংস্কৃতি।
গভীর অধ্যবসায় ও গবেষণাপ্রসূত এই বই বাঙালি মুসলমানের সামাজিক ইতিহাসের বিভিন্ন বিষয়ের প্রতি আলোকপাত করেছে। গবেষক প্রতিটি প্রবন্ধের সঙ্গে প্রয়োজনানুগ তথ্য নির্দেশ দিয়েছেন; যা আগ্রহী পাঠককে সংশ্লিষ্ট প্রসঙ্গের সত্যতা নিরূপণে ও বিষয়ের গভীরে যেতে সহায়তা করবে।
প্রতিটি প্রবন্ধ কৌতূহলোদ্দীপক, বিশেষ করে যারা সমাজ-ইতিহাসের পরিক্রমা জানতে আগ্রহী। গবেষক হাবিব রহমানের বিশেষত্ব হলো, তিনি প্রতিটি প্রবন্ধ বিশ্লেষণ করেছেন প্রথম ও দ্বিতীয় পক্ষের উপস্থিতি নিশ্চিত করে। অন্যদের যুক্তি-তর্কের আলোকে, উপেক্ষা বা অবাঞ্ছিত করে নয়; উপস্থিতি অনিবার্য করেই তিনি মতামত দিয়েছেন, উপসংহার টেনেছেন। যার মধ্য দিয়ে একজন সত্যনিষ্ঠ গবেষকের আদল বা প্রতিমা পূর্ণাঙ্গরূপে ধারণ করেছে এই বই।
গবেষক বাঙালি মুসলমানের সামাজিক ইতিহাস আলোচনায় একেবারে সাম্প্রতিক সময়কেও বিষয়ানুগ করেছেন। এতে বর্তমান সময়ের চালচিত্র, কার্যকারণ এবং তার নেপথ্য বাস্তবতার খসড়া চিত্র পাওয়া যায়। রমনার বটমূলে, যশোরের উদীচীর অনুষ্ঠানে বোমা হামলার প্রসঙ্গকেও তিনি সমাজ-ইতিহাসের আলোকে বিশ্লেষণ করেছেন। শহীদ মিনারে খালি পায়ে হাজার হাজার মানুষের উপস্থিতি চেতনাপ্রসূত নাকি একদিনের উন্মাদনা—সে প্রসঙ্গেও দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। অবশ্য এটি অনিবার্যভাবে প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন। বিশেষ করে, ধর্মের নামে অত্যাচার-অনাচার, আর মাজার-সংস্কৃতি (!) এ দেশে ধর্মের সত্যনিষ্ঠ সেবক নয়, আগাছাদের উল্লম্ফনই দৃষ্ট হয়; যা শুধু বেদনা বা হতাশার নয়, গভীর শঙ্কা ও সর্বনাশের ইঙ্গিতবহ ।
বইটি অতীতচারিতার দলিল হয়েও সমসাময়িকতায় ভাস্বর। বিষয়ের আলোকে, অকাট্য তথ্য-উপাত্তের সহায়তায় আমরা যেমন ইতিহাসের বাঁক বদলকে চেনা ও জানার সুযোগ পাচ্ছি, তেমনই বর্তমান ও অতীত (ইতিহাস) কীভাবে তার ছায়া ও কায়ার উপস্থিতি অনিবার্য করছে, তার প্রেক্ষিত ও প্রেক্ষাপট জানা সম্ভব হচ্ছে।

সূত্র: দৈনিক প্রথম আলো, সেপ্টেম্বর ১৬, ২০১১

শেয়ার বা বুকমার্ক করে রাখুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *