পুতুলের খেলা

পুতুলের খেলা

পশ্চিমবঙ্গ সরকারের একজন বড় অফিসারকে ধরে দিল্লির বঙ্গভবনে থাকার সুপারিশপত্র জোগাড় কর ফেলল সুদীপ্ত। রাজধানী এক্সপ্রেসে টিকিট কাটা হয়েছে। তিনটে দিন দিল্লিতে থাকলে একটা ব্যবস্থা ঠিক হয়ে যাবে বলে তার ধারণা।

ল্যান্সডাউনে পিনাকী মিত্রের বাড়ি। মিনিবাস ধরে সেখানে চলে এল সুদীপ্ত। পিনাকী বড় ব্যাবসায়ী, বছর তিনেক হল সিরিয়াল ব্যাবসায় নেমেছেন। এখন পর্যন্ত তাঁর অভিজ্ঞতা সুখের নয়। তখনও প্রাইভেট চ্যানেলের রবরবা শুরু হয়নি। অনুষ্ঠান দেখতে হলে দূরদর্শনই ভরসা। পরিচালক হরেন ঘোষ তাঁকে ডিডি-টুতেই সিরিয়াল চালাতে বলেছিল। ডিডি-ওয়ানে এত বড় লাইন যে পাঁচ বছরেও জায়গা পাওয়া যাবে না। কিন্তু ডিডি-টু-তে যে বিজ্ঞাপন কম পাওয়া যায়, তার দামও কম এবং সেই টাকা ফিরে পেতে হিমসিম খেতে হয়, এসব অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করে। ব্যাবসা গুটিয়ে সরে দাঁড়ালেন না পিনাকী। তদ্দিনে তিনি জেনে গিয়েছেন ডিডি-ওয়ানের প্রাইম টাইমে স্লট পাওয়া মানে রোজ সোনার ডিম পাওয়া। কলকাতায় কোনওরকম প্রশ্রয় পাচ্ছিলেন না। কিন্তু দূরদর্শনের করিডোরে যারা ঘুরে বেড়ায় তারা জানাল দিল্লির মান্ডি হাউসের। মেজকর্তার অনুমতি আনলে এক্ষুনি ডিডি-ওয়ানে স্লট দিতে বাধ্য হবেন স্টেশন ডিরেক্টার।

দিল্লির মান্ডি হাউসে কোনও বাঙালি অফিসার আছেন কিনা খোঁজ নিতে থাকলেন পিনাকী। তদ্দিনে সুদীপ্তর সঙ্গে পরিচয় হয়েছে। শিক্ষিত ভদ্র ছেলে। পুণে থেকে পাশ করেছে। ইতিমধ্যে দুটো তেরো পর্বের সিরিয়াল করে পরিচিতি পেয়েছে। এই সুদীপ্তই তাঁকে খবরটা এনে দিল, ‘মান্ডি হাউসের দু-নম্বর কর্তার নাম রতিকান্ত যাঁর ওপর বাংলা বিহার অসমের দায়িত্ব দেওয়া আছে।’

‘রতিকান্ত? বাঙালি?’ কপালে ভাঁজ পড়ল পিনাকীর।

‘হ্যাঁ। তাই তো শুনলাম।

‘আমি এক রতিকান্তকে চিনতাম। রতিকান্ত চৌধুরী। আমরা একসঙ্গে কলেজে পড়েছি।’

‘ইনিও চৌধুরী।’ সুদীপ্ত আশার আলো দেখল। ডিডি-ওয়ানে একটা বড় সিরিয়াল না করলে এই লাইনে টিকে থাকাই মুশকিল হবে।

সাতদিন বাদে সুদীপ্তকে ডেকে পাঠালেন পিনাকী। বললেন, ‘দিল্লি যেতে হবে হে। তুমিও সঙ্গে চলো। কাল রাত্রে রতিকান্তর সঙ্গে টেলিফোনে কথা হল।’

‘তার মানে উনি সত্যি আপনার সহপাঠী ছিলেন?’

‘অফকোর্স। পুরোনো বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে-করতে শেষপর্যন্ত জানতে পারলাম ও আমাদের রতি। আমার পয়সায় কয়েক ডজন চা আর মোগলাই পরোটা খেয়েছে সেসময়। কিন্তু খুব অলস ছিল। অনার্সে অর্ডিনারি মার্কস পেয়েছিল। তারপর কী করেছে এতদিন জানতাম না। ও আই এ এস পরীক্ষায় পাশ করেছে, এস সি বলে দ্রুত প্রমোশন পেয়েছে তা গতকাল জানার পর কাল রাত্রে ফোন করেছিলাম।’

‘চিনতে পারলেন?’ সুদীপ্ত উত্তেজিত।

‘একেবারেই। বলল, চলে আয় দিল্লিতে, ফোনে কথা হয় না। আমি তো টেকনিক্যাল দিকটা ঠিক জানি না, তুমিও চলো প্রপোজাল নিয়ে। আমি উঠব বড় শালির বাড়িতে, তুমি হোটেলে। যদি বঙ্গভবনে ম্যানেজ করতে পারো তাহলে খুব ভালো হয়।’

এক বন্ধুর মাধ্যমে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সেই অফিসারের কাছে পৌঁছে সে অবাক হয়েছিল, ভদ্রলোক তার নাম জানেন। এ দেশে একশোটা ভালো গল্প লিখেও যে নাম করা যায় না, একটি মাঝারি মাপের ছবি করে সারাজীবন তাই ভাঙিয়ে পরিচালক সেজে থাকা যায়। সুপারিশপত্র পেয়ে গিয়েছিল সে।

কিন্তু পিনাকীবাবুর কথা শুনে একেবারে মিইয়ে গেল সে। ভদ্রলোক যেতে পারবেন না। উনি না গেলে দিল্লিতে যাওয়ার কথাই ওঠে না। রতিকান্ত ওঁর সহপাঠী কিন্তু জনসাধারণের কাছে তিনি। জবরদস্ত অফিসার। আর দিল্লিতে না যাওয়া মানে তার একটা বড় কাজের সম্ভাবনা শেষ হয়ে যাওয়া। চেষ্টা করলে ডিডি-টু-তে স্লট জোগাড় করে সিরিয়াল তৈরি করা যায় কিন্তু এখন আর কোনও প্রযোজক ওই চ্যানেলে টাকা ঢালতে রাজি হবেন না। খবরটা ভালো ভাবে প্রচারিত যে ডিডি-টু-এর সিরিয়ালে বিজ্ঞাপনদাতারা বিজ্ঞাপন দিতে রাজি নন। তার কারণ ডিডি-টু-র প্রচারসীমা খুবই সীমিত। এখন একমাত্র ভরসা ডিডি-ওয়ান। পিনাকীবাবু না গেলে তার দরজাও বন্ধ।

পিনাকীবাবু জানালেন তাঁর শ্যালিকা খুব অসুস্থ। থাকেন ভাগলপুরে। কাল সকালে কলকাতায় ওঁকে নিয়ে আসছেন ভায়রাভাই। সম্ভবত বাইপাস করাতে হবে। তিনি ছাড়া ওঁদের কোনও আত্মীয় নেই কলকাতায়। ডাক্তার, নার্সিংহোম ইত্যাদি ঠিক করার দায়িত্ব তাঁকেই নিতে হবে। এই অবস্থায় দিল্লিতে যাওয়া সম্ভব নয়। রতিকান্তর সঙ্গে তিনি টেলিফোনে অ্যাপয়েন্টমেন্ট স্থির করেছিলেন এই খবর আসার আগে। পিনাকী বললেন, ‘সুদীপ্ত তুমি কাল একাই চলে যাও।’

হকচকিয়ে গেল সুদীপ্ত, ‘আমি একা যাব?’

‘আমি রতিকান্তকে ফোন করে দিচ্ছি। ও কী বলে শুনে এসো।’

‘আমি গেলে কোনও কাজ হবে না দাদা।’ সুদীপ্ত বলল।

‘কাজ যে আমি গেলেই হবে তার কি কোনও নিশ্চয়তা আছে? এবার তুমি গিয়ে সব শুনে এস, পরের বার আমি তোমার সঙ্গে যাব।’ পিনাকী নির্দেশ দিলেন।

*

সুদীপ্ত জানে সে গেলে কোনও কাজ হবে না। বহু বছর না দেখা বন্ধু সামনে এলে রতিকান্তবাবুর যে প্রতিক্রিয়া হত, তার বিন্দুমাত্র তাকে দেখে হবে না। যাতায়াতের টিকিট ছাড়া পিনাকীবাবু। তাকে যে তিন হাজার টাকা থাকা-খাওয়ার খরচ বাবদ দিয়েছেন সেটাও জলে যাবে। বেশ কিছুকাল কাজের খোঁজে থাকায় পকেটের অবস্থা সঙ্গীন। দিল্লি না গিয়ে ওই টাকা নিয়ে কলকাতায় থেকে গেলে কিছুকাল স্বস্তি মিলত। কিন্তু তাতে নতুন কাজ পাবেই এমন নিশ্চয়তা ছিল না। রাজধানী এক্সপ্রেসের কামরায় বসে সুদীপ্ত নিজেকে বলল, ‘কখন কার কপালে কী জুটবে তা আগে থেকে কি বলা যায়!’

ট্রেনটা একটু দেরিতে পৌঁছাল। স্টেশন থেকে অটো নিয়ে বঙ্গভবনে যেতেই ঘর পেয়ে গেল। স্নান সেরে তৈরি হয়ে লিফটের সামনে দাঁড়াতেই ওদের দেখতে পেল। প্রচণ্ড সেজেছে মেয়েটি। একটু খাটো, তেমন ফরসা নয় কিন্তু যৌবনসর্বস্ব শরীর। চোখে রোদ চশমা। সঙ্গের প্রৌঢ়টির হাতে চামড়ার ব্যাগ। মেয়েটি চাপা গলায় বলল, ‘কেন যে এখানে ওঠা হল, দিল্লিতে কি আর হোটেল ছিল না?’

‘এমনিতে তো খারাপ না। মন্ত্রীরা তো এখানেই ওঠেন।’

‘আমরা যেজন্যে এসেছি মন্ত্রীরা তো সেজন্যে আসেন না।’

লিফট এসে গিয়েছিল। ওদের পেছন-পেছন সুদীপ্তও লিফটে ঢুকল। মেয়েটি একবার মুখ ফিরিয়ে তাকে দেখে নিল।

নিচে নেমে ওরা বেরিয়ে গেলে সুদীপ্ত রিসেপশনে গিয়ে জানতে চাইল মান্ডি হাউস কতদূরে? জানল, বেশিদূরে নয়। তবে প্রথমবার গেলে অটো নিলে সুবিধে হবে।

বঙ্গভবনের রেস্টুরেন্টে দুপুরের খাওয়া সেরে অটো নিয়ে সে যখন মান্ডি হাউসে পৌঁছাল তখন দুপুর দুটো। গেট পেরিয়ে বাঁ-দিকে রিসেপশন। সেখানে বেজায় ভিড়। স্লিপ হাতে নিয়ে লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে। আধঘণ্টা বাদে সুদীপ্ত সুযোগ পেল। রিসেপশনিস্ট স্লিপটা দেখে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আগে থেকে অ্যাপয়েন্টমেন্ট করা আছে? রতিকান্তজির সঙ্গে অ্যাপয়েন্টমেন্ট ছাড়া দেখা করা যায় না!’

সুদীপ্ত ঘাড় নাড়ল। স্লিপের দিকে আঙুল তুলে দেখাল, ‘ইনি ওঁর খুব বন্ধু। ওঁর সঙ্গে কথা হয়ে গেছে। টেলিফোনে।’

সঙ্গে-সঙ্গে ইন্টারকমে যাচাই করলেন রিসেপশনিস্ট। তারপর একটা পাস ইস্যু করে বললেন, ‘ওপাশের দরজা দিয়ে চলে যান। ফিফথ ফ্লোর।’

সুদীপ্ত পাস নিয়ে ঘুরে দাঁড়াতেই চমকে উঠল, ঠিক তার পেছনে দাঁড়িয়ে আছেন বঙ্গভবনের সেই সুন্দরী। খানিকটা তফাতে তাঁর সঙ্গী প্রৌঢ়।

রিসপেশনিস্ট তাঁকে বললেন, ‘আজকের ভিজিটার্স লিস্টে আপনার নাম নেই। আপনি ফোনে কথা বলে কালকে অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিন।’

‘আশ্চর্য! উনি তো টেলিফোন ধরছেন না।’

‘কী বলছেন আপনি! এই ভদ্রলোক তো টেলিফোনে কথা বলেছেন।’ সুদীপ্তকে দেখিয়ে দিলেন রিসেপশনিস্ট।

এবার ভদ্রমহিলা মুখ ফেরালেন, ‘আপনি কি বাঙালি?’

‘হ্যাঁ।’

‘ওছ। খুব ভালো হল। আমার একটা উপকার করবেন?’ মহিলার মুখে নয়, গলায় উদ্বেগ।

‘বলুন।’

‘আপনি তো রতিকান্তবাবুর কাছে যাচ্ছেন, ওঁকে বলবেন আমি এখানে অপেক্ষা করছি। খুব জরুরি দরকার। উনি যদি রিসেপশনে ফোন করে বলে দেন–।’

‘চেষ্টা করব!’

‘প্লিজ!’

সুদীপ্ত পা বাড়াল। কয়েক পা যেতেই পেছন থেকে গলা ভেসে এল, ‘ও মশাই, শুনছেন! এই যে, আপনাকে ডাকছি।’

সুদীপ্ত পেছনে তাকাতেই দেখতে পেল সুন্দরী মহিলার সঙ্গী বয়স্ক মানুষটি এক হাত মাথার ওপর তুলে দোলাচ্ছেন।

‘আমাকে বলছেন?’ চেঁচিয়ে জিজ্ঞাসা করল সুদীপ্ত।

‘অদ্ভুত ব্যাপার মশাই। আপনি জিজ্ঞাসা করলেন না রতিকান্তকে কী নাম বলবেন, আর ইনিও সেটা আপনাকে জানাতে ভুলে গেলেন। রতিকান্তবাবুকে তো ওঁর নামটা বলতে হবে!’

‘কী নাম?’ বিরক্ত হচ্ছিল সুদীপ্ত।

‘কুসুম।’ ভদ্রলোক বললেন, ‘কুসুম মিত্র।’

শোনামাত্র হাঁটা শুরু করল সুদীপ্ত। অসম্ভব, এরকম কোনও সিনে সে যাবেই না। কলকাতা থেকে। মান্ডি হাউসে এসে রতিকান্তর সঙ্গে দেখা করতে চাইছেন কেন তা বোঝার মতো বয়স হয়েছে। তার। মিছিমিছি যারা নিজের সর্বনাশ নিজেই করে তাদের দলে সে নেই। তবে কুসুম নামটা। খারাপ না। কুসুম শুনলে আজকাল ডিমের কুসুম মনে পড়ে। তবে দিশি মুরগির ডিম, ব্রয়লারের। নয়। আগে ওই কুসুমের পাশে কুমারী অথবা সুন্দরী বসিয়ে দিয়ে ভারী নাম তৈরি হত। কিন্তু আর যাই হোক, এটা বলতে হবে, পিনাকীবাবু জিন্দাবাদ। সেই কলকাতায় বসে টেলিফোনে অ্যাপয়েন্টমেন্ট জোগাড় করে ফেলেছেন ভদ্রলোক।

দুজনকে জিজ্ঞাসা করে লিফটে চেপে ওপরে এল সুদীপ্ত। সামনেই সিকিউরিটি। তাকে স্লিপটা দেখাতে হল। সেটা দেখার পর লোকটা আঙুল তুলে ভিজিটার্স কর্নার দেখিয়ে দিল। সেখানে দাঁড়ানো একজন পিওন তাকে বসতে বলে স্লিপ নিয়ে ভেতরে চলে গেল। সুদীপ্ত দেখল দরজার গায়ে বিরাট নেমপ্লেটে লেখা রয়েছে ‘রতিকান্ত চৌধুরী’।

চেয়ারে বসে চারপাশে তাকাল সুদীপ্ত। দুজন মানুষ খুব গম্ভীর ভঙ্গিতে আলোচনায় ব্যস্ত। বোঝাই যাচ্ছে এঁরা রতিকান্ত চৌধুরীর সাক্ষাৎপ্রার্থী। মহিলাকে খুব চেনা-চেনা মনে হল সুদীপ্তর। রোগা, ফরসা, বয়স্কা মহিলাকে সে কোথায় দেখতে পারে? চমক্কার উচ্চারণে ইংরেজি বলছেন শুনতে পেল সুদীপ্ত, সেই গলা কানে আসতেই মনে পড়ে গেল। ইনি একজন বিখ্যাত অ্যাঙ্কার। ইংরেজিতে দারুণ-দারুণ প্রোগ্রাম করেন।

বেয়ারা এসে ওঁদের সামনে দাঁড়াতেই ভদ্রমহিলা উঠে দাঁড়ালেন, সঙ্গী ভদ্রলোককে ইশারায় বসতে বলে এগিয়ে গেলেন বন্ধ দরজার দিকে। ভদ্রলোক উসখুস করতে লাগলেন। ঘড়ি দেখলেন। তারপর সুদীপ্তর দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘ইউ আর ফ্রম?

সুদীপ্ত বলল, ‘কলকাতা।’

‘ও, খুব ভালো শহর।’ ভদ্রলোক ইংরেজিতে বললেন, ‘আপনি প্রোডিউসার না ডিরেক্টার?

‘ডিরেক্টার।’

‘অদ্ভুত। সাধারণত প্রোডিউসাররাই এখানে আসেন। দিস ম্যান, রতিকান্ত, ইজ এ টাফ গাই। ওঁর সঙ্গে আগে আলাপ হয়েছে?’

মাথা নাড়ল সুদীপ্ত, না।

‘খুব শক্ত লোক। এই যে আমরা, একটার-পর-একটা হিট প্রোগ্রাম করে যাচ্ছি–তবু ওঁকে খুশি করতে পারছি না।’ ভদ্রলোক ব্যাগ থেকে একটা বই বের করে চোখ রাখলেন।

প্রায় আধঘণ্টা বাদে ভদ্রমহিলা বেরিয়ে এলেন গম্ভীর মুখে। ভদ্রলোক জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কী বললেন উনি?’

‘উনি তো কখনও না বলেন না। সাতদিন পরে ফোন করতে বলেছেন।’ বেশ বিরক্ত ভঙ্গিতে কথাগুলো বলতে-বলতে লিফটের দিকে হাঁটতে লাগলেন মহিলা। পড়ি কী মরি করে ভদ্রলোক তাঁকে অনুসরণ করলেন। এবং তখনই বেয়ারা এসে জানাল সুদীপ্তর ডাক পড়েছে।

বেশ বড় ঘর। টেবিলটি পরিষ্কার। টেবিলের ওপাশে ষাটের কাছাকাছি যে মানুষটি বসে আছেন তিনি বহুদিন ট্রামবাস চড়েননি, রাস্তায় হাঁটেননি, চওড়া কপাল, চুল সেঁটে আছে মাথায় পিছনমুখী হয়ে। ফরসা গোলমুখ তুলে তাকালেন সুদীপ্তর দিকে। কয়েক মুহূর্ত, তারপর মোহনহাসি হাসলেন, ‘আসুন ভাই, বসুন। বলুন, আমি কী করতে পারি!’

পিনাকীদা–’ সুদীপ্তর গলা শুকিয়ে গেল।

‘সিগারেট খান?’

‘মানে?’ হকচকিয়ে গেল সুদীপ্ত।

‘আমি সিগারেট খাই এটা আমার স্ত্রী চান না। কিন্তু মাঝে-মাঝেই আমার খেতে ইচ্ছে করে, এই এখন যেমন করছে। আছে?’ হাত বাড়ালেন রতিকান্ত।

বেশ নার্ভাস ভঙ্গিতে প্যাকেট আর দেশলাই এগিয়ে দিল সুদীপ্ত। সে মাঝারি দামের সিগারেট খায়। কিন্তু দেখল ভদ্রলোক প্যাকেট থেকে একটা সিগারেট বের করে বেশ গুছিয়ে ধরিয়ে টান দিলেন, ‘আঃ, অনেকদিন বাদে পরিচিত গন্ধ পেলাম। তা ভাই, আপনি কলকাতার কোথায় থাকেন?’

‘উত্তর কলকাতায়। বাগবাজারে।’ সুদীপ্ত জবাব দিতে টেলিফোন বেজে উঠল। হাত বাড়িয়ে রিসিভার তুলে রতিকান্ত বললেন, ‘ইয়েস! ও, কী সব আজেবাজে সিরিয়াল দেখাচ্ছেন? প্রাইম টাইমটা দু-মাসের মধ্যে খালি করে ফেলুন। না, না, দু-মাস অনেক সময়, চল্লিশটা এপিসোড। দেখাতে পারবেন। কি? না, আজও ডিসিশন ফাইনাল হয়নি। যেমন চলছে চলতে দিন।’ রিসিভার নামিয়ে রেখে রতিকান্ত আবার ধোঁয়া টানলেন, ‘বাগবাজারের রসগোল্লাকে এখন অনেকেই পেছনে ফেলে দিয়েছে কিন্তু হোয়াট অ্যাবাউট তেলেভাজা? বেগুনি, আলুর চপ, এখন স্ট্যান্ডার্ড কীরকম?

প্রাইম টাইমের সিরিয়াল দু-মাস পরে বন্ধ হয়ে যাবে শোনার পর বেশ উত্তেজিত হয়েছিল সুদীপ্ত। ওই স্লটটা যদি রতিকান্ত তাদের দেন। কিন্তু শেষ প্রশ্ন কানে আসতেই কীরকম মিইয়ে গেল। ব্যাপারটা। কোনওরকমে ঘাড় নাড়ল, ‘ভালো, বেশ ভালো।’

‘গুড। বাঙালির সব কিছুই তো হারিয়ে যাচ্ছে, এটা আছে শুনে ভালো লাগল। আপনি বাগবাজারের লোক, হেদোর কাছে নকুড়ের দোকানের নাম শুনেছেন?’

মাথা নাড়ল সুদীপ্ত, হ্যাঁ।

‘ফ্যান্টাস্টিক সন্দেশ করত ওরা। জলভরা তালশাঁস। উঃ! আছে এখনও?’

‘হ্যাঁ। আছে।’

‘কেসি দাস, গাঙ্গুরাম, জলযোগের পয়োধি, কত নাম মনে পড়ছে।’ বলতে-বলতে চোখ বন্ধ করলেন রতিকান্ত। যেন স্মৃতির গভীরে ডুব দিয়েছেন।

‘স্যার!’ শেষপর্যন্ত না ডেকে পারল না সুদীপ্ত।

চোখ খুললেন রতিকান্ত, পিনাকীর খবর কী?

‘উনি আপনার সঙ্গে দেখা করতে আসবেন বলে টিকিট কেটেছিলেন। কিন্তু হঠাৎ ওঁর এক আত্মীয়া ভাগলপুর থেকে চিকিৎসার জন্যে কলকাতায় আসায় আটকে গিয়েছেন। আমাকে বললেন আপনার সঙ্গে দেখা করতে।’ সুদীপ্ত বলল।

‘কেন?’

‘স্যার, আমরা চেষ্টা করেও কলকাতায় কাজের সুযোগ পাচ্ছি না।’

‘সেটা তো অনেকেই পাচ্ছে না। জায়গা নির্দিষ্ট অথচ কাজ করতে চাইছেন অনেকে। সবাইকে তো সুযোগ দেওয়া সম্ভব নয়।’ রতিকান্ত কথা শেষ করতেই টেলিফোন বাজল। ইংরেজিতে। কয়েকটা কথা বলে রিসিভার রেখে বললেন, ‘আমাকে যে এখনই উঠতে হবে ভাই। কোথায় উঠেছেন।’

‘বঙ্গভবনে।’

‘একলা এসেছেন না সঙ্গে কেউ আছে?

‘আমি একলাই এসেছি।’

‘সন্ধের পরে ওদিকে আমার যাওয়ার কথা আছে। ঘরে থাকবেন, যদি সময় পাই গিয়ে কথা বলব। উত্তর কলকাতা নিয়ে কথা বলতে আমার ভালো লাগে।’ উঠে দাঁড়ালেন রতিকান্ত। সুদীপ্ত হতভম্বের মতো বেরিয়ে এল। তড়িঘড়ি মান্ডি হাউসের বাইরে এসে একটা এসটিডি বুথ খুঁজে বের করে সে পিনাকীবাবুর নাম্বার ঘোরাল। দিল্লি থেকে কলকাতার ফোনের সংযোগ এত চটজলদি হবে আশা করেনি সুদীপ্ত। পিনাকীবাবুর গলা শুনল, ‘হ্যালো।’

‘আমি দিল্লি থেকে সুদীপ্ত বলছি।’

‘ও, হ্যাঁ, বলো, কী খবর? দেখা হয়েছে?’

‘হ্যাঁ।’

‘কীরকম ব্যবহার করল?’

‘আমি ঠিক বুঝতে পারলাম না।’

‘আশ্চর্য! একটা লোক কথা বলল, নিশ্চয়ই বাংলায় বলেছে, আর তুমি তার মানে বুঝতে পারলে না?’

‘উনি প্রথমে বললেন সবাইকে সুযোগ দেওয়ার জায়গা নেই। তার আগে কাউকে নির্দেশ দিয়েছেন প্রাইম টাইমের স্লটের একটা সিরিয়াল বন্ধ করে দিতে। ওই ব্যাপারে কথা বলার সুযোগই পেলাম না। অবশ্য উনি বলেছেন হয়তো আজ সন্ধের পরে আমার সঙ্গে কথা বলতে বঙ্গভবনে আসতে পারেন। এটা কথার কথা!’ সুদীপ্ত বলল।

‘হতে পারে। আবার নাও হতে পারে। তুমি সন্ধে থেকে ঘরেই থাকবে। তার আগে এখন এক বোতল দামি হুইস্কি আর কাজুবাদাম কিনবে রাত্রে আমি ফোন করব।’ পিনাকীবাবু লাইন কেটে দিলেন।

টাকা দিয়ে বাইরে এসে দাঁড়াল। সর্বনাশ! এখন সে হুইস্কি কিনবে কোত্থেকে? তার সমস্ত খরচ মিটিয়ে দিয়েও পিনাকীবাবু তাকে পঞ্চাশ হাজার টাকার একটা বান্ডিল দিয়ে বলেছিলেন, ‘যদি বোঝো কাজ হবেই তাহলে এটা থেকে খরচ করতে পারো।’

এখন পর্যন্ত টাকাটা কাউকে দেওয়ার প্রশ্ন ওঠেনি। রতিকান্ত চৌধুরী পিনাকীবাবুর বন্ধু। বন্ধুর কাছে কেউ ঘুষ নেয় না। তা ছাড়া ভদ্রলোককে দেখে মনে হয়েছে অত্যন্ত কঠিন প্রকৃতির মানুষ। অতগুলো টাকা সঙ্গে থাকায় অস্বস্তি আছেই, যেমন এনেছিল তেমনি ফিরিয়ে নিয়ে গেলে তবে অস্বস্তি দূর হবে।

সুদীপ্ত চারপাশে তাকাল। এটা অফিস পাড়া। মদের দোকান থাকার কথা নয়। সে সোজা রাস্তা ধরে হাঁটতে লাগল। মিনিট পনেরো বাদে সে যেখানে পৌঁছাল তার দু-ধারে নানান ধরনের দোকান এবং রেস্টুরেন্ট। সে সাইনবোর্ডগুলো লক্ষ করল। না মদের দোকানের কোনও চিহ্ন। নেই। হঠাৎ তার মনে পড়ে গেল গোবিন্দর কথা। গোবিন্দ একজন সিনিয়ার অ্যাসিস্টেন্ট ডিরেক্টার। কুড়ি বছরের ওপর লাইনে আছে কিন্তু এখনও নামের আগে ডিরেক্টার শব্দটা বসেনি। অথচ খুব ভালো কাজ জানে। অনেকে পরিচালনা করতে আসে কিছু না জেনে, শুধু গোবিন্দর ওপর নির্ভর করে। এ ব্যাপারে গোবিন্দর কোনও আক্ষেপ নেই। মজা করে কথা বলে, নিজেকে নিয়ে রসিকতা করতে বাধে না। সেই গোবিন্দর কাছে গল্পটা সে শুনেছিল। রোজ রাত্রে চার পেগ হুইস্কি না খেলে গোবিন্দর ঘুম আসে না। গোবিন্দ বলেছিল, ‘বুঝলে ভাই, নতুন শহরে গিয়েছি, মালের দোকান কোথায় জানি না। এসব ব্যাপারে রিকশাওয়ালারা বেশ সাহায্য করে। সেদিন আবার রিকশা স্ট্রাইক। কাউকে যে জিজ্ঞাসা করব, দাদা, মালের দোকান কোথায়, তাতেও আটকাচ্ছে। তবু লজ্জার মাথা খেয়ে একজনকে জিজ্ঞাসা করলাম। সে কয়েক মুহূর্ত আমার দিকে তাকিয়ে এমন ভাবে জানি না বলল যেন আমি কোনও সংক্রামক রোগের রুগি। শেষপর্যন্ত মাথায়। এল। দুজন বয়স্ক ভদ্রলোক কথা বলছিলেন। তাঁদের কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘অধ্যাপক পি কে ভট্টাচার্যের বাড়িটা কোথায় বলতে পারেন?’

শুনে ওঁরা চিন্তিত হলেন। একজন আর একজনকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কে বলুন তো? প্রণব কুমার ভট্টাচার্য? উনি তো মারা গিয়েছেন!’

দ্বিতীয়জন জিজ্ঞাসা করলেন, ‘পাড়া বা রাস্তার কোনও নাম জানেন?’

‘আমাকে লিখে দিয়েছিল। কাগজটা হারিয়ে ফেলেছি।’

‘এভাবে তো খুঁজে পাবেন না। শহরটা তো ছোট নয়। কোন কলেজের অধ্যাপক?’

‘লোক্যাল কলেজের।’

‘তাহলে কলেজে যান। দুটো কলেজ আছে এখানে। তবে এখন তো বন্ধ।’

‘মুশকিলে পড়লাম।’

‘কলেজের কাছে থাকেন? একজন জানতে চাইলেন।’

‘না-না। ও, মনে পড়েছে। উনি যে গলিতে থাকেন তার মোড়ে একটা ফরেন লিকারের দোকান আছে। হ্যাঁ, তাই তো শুনেছি।’

এবার প্রথম ভদ্রলোক মাথা নাড়লেন, ‘সোজা চলে যান। ডান দিকে নয়, মোড় থেকে বাঁ-দিকে ঘুরে একটু হাঁটলেই দোকানটা দেখতে পাবেন। কিন্তু তার পাশে তো কোনও গলি নেই। দেখুন, ওখানে গিয়ে খোঁজ করলে হয়তো লোকে বলে দেবে।’

‘ওঁদের ধন্যবাদ দিয়ে আমি সোজা মালের দোকানে পৌঁছে গেলাম। বুঝলে হে!’

সুদীপ্তর মনে হল এখন এখানে গোবিন্দর ফর্মুলা ব্যবহার করা যেতে পারে। সে চারপাশে তাকিয়ে একটু দূরে একজন লোককে দেখতে পেল যাকে গোবেচারা বলে ভাবা যেতে পারে। লোকটির দিকে এগিয়ে যেতেই সে মদের দোকান দেখতে পেল। ছোট দোকান কিন্তু সাইনবোর্ড পড়তে অসুবিধে হচ্ছে না।

লোকটিকে পাশ কাটিয়ে দোকানে ঢুকে পড়ে সে বোতালগুলোর দিকে তাকাল। কোনও খদ্দের ছিল না সেই সময়। দোকানদার হিন্দিতে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কী নিতে চান বলুন।

বোতলগুলোর ওপর সাঁটা লেবেলে তখন সুদীপ্তর চোখ। বলল, ‘হুইস্কি।’

‘কী হুইস্কি নেবেন?’

ফাঁপড়ে পড়ল সুদীপ্ত। সে মদ্যপান করে না। মদ বলতে হুইস্কি, জিন, ভদকা, রাম অথবা বিয়ারের কথাই সে জানে। অথচ এই লোকটি তাকে অজ্ঞ ভাববে সেটাও ঠিক নয়।

সুদীপ্ত গম্ভীর গলায় বলল, ‘মোটামুটি দামি কী আছে?

লোকটি দেখালো বোতল, ‘খুব ভালো স্বাদ। টেস্ট করে কেউ খারাপ বলেননি।’

কড়কড়ে সাড়ে চারশো টাকা দিয়ে বোতলটি কিনল সুদীপ্ত। লোকটি ক্যারিব্যাগের ভেতর বোতলটি দেওয়ায় রাস্তায় হাঁটতে অসুবিধে হল না সুদীপ্তর।

রোদ পড়ে গিয়েছিল। দিনের বেলায় বুঝতে পারেনি, বঙ্গভবনে ফেরার মুখে টের পেল সুদীপ্ত, ঠান্ডা-ঠান্ডা লাগছে। অর্থাৎ দিল্লিতে শীত তাহলে যাই-যাই করছে। লিফটে চেপে ওপরে উঠে তালা খুলে ঘরে ঢুকল সে। আলো জ্বালল। এই ঘর বেশ সভ্যভব্য, যে-কোনও লোককে আপ্যায়ন করা যায় এখানে। কিন্তু চেয়ার একটা, আর একটা আনাতে হবে। বোতলটা টেবিলে রাখতে খেয়াল হল তার। কাজুবাদাম কেনা হয়নি, আবার বেরুতে হবে। তারপরেই গ্লাসের দিকে নজর গেল। কীরকম মোটাসোটা গ্লাস। মুশকিল হল, রতিকান্ত চৌধুরী আদৌ আসবেন কিনা। বোঝা যাচ্ছে না। ভদ্রলোক স্রেফ আড্ডা মারতে তার কাছে আসবেন কেন? তা ছাড়া উনি। বঙ্গভবনে এসে কার খোঁজ করবেন? সে ওঁর ঘরে ঢুকে নিজের নাম বলার আগে বলতে যাচ্ছিল, পিনাকীদা আমাকে আপনার কাছে পাঠিয়েছেন। আমি সুদীপ্ত। কিন্তু ভদ্রলোক তাকে কথা শেষ করতে না দিয়ে সিগারেটের প্রসঙ্গ তুলেছিলেন। অতএব এখানে এলেও তার নাম বলে খোঁজ নিতে পারবেন না সে কোন ঘরে আছে। হতাশ হয়ে চেয়ারে বসে পড়তেই খেয়ালে এল। সে তো নিজের নাম লিখে স্লিপ দিয়েছিল বেয়ারার হাতে। রেফারেন্স হিসেবে পিনাকীদার নাম দিয়েছিল। রতিকান্ত যদি স্লিপটা ফেলে না দিয়ে থাকেন তাহলে স্বচ্ছন্দে চলে আসতে পারেন।

সে বেল বাজাল। বেয়ারা এলে বলবে কাজুবাদাম কিনে আনতে আর একটা ভালো গ্লাস দিতে। এই সময় দরজায় শব্দ হল। এত তাড়াতাড়ি লোকটা এসে গিয়েছে বলে খুশি হল সে। সুদীপ্ত চেঁচিয়ে বলল, ‘কাম ইন।’

দরজা ঠেলে যিনি সামনে এসে দাঁড়ালেন তাঁকে মোটেই আশা করেনি সুদীপ্ত। তারপরে দ্বিতীয়জনও দেখা দিলেন।

‘নমস্কার। আপনি নিশ্চয়ই ওঁকে আমার কথা বলেননি!’ ভদ্রমহিলার মুখ-চোখ থমথমে। গলার স্বরও ঈষৎ রাগত।

সুদীপ্ত কিছু বলতে গিয়েও কথা খুঁজে পেল না।

এবার ভদ্রলোক বললেন, ‘আমরা একটু কথা বলতে চাই, ভেতরে আসতে পারি?’

‘হ্যাঁ, আসুন।’ সুদীপ্ত বাধ্য হল বলতে।

ভদ্রমহিলা সোজা চলে এসে চেয়ারে বসলেন। ভদ্রলোক বিছানায়। সুদীপ্ত দাঁড়িয়ে।

‘আপনি দাঁড়িয়ে রইলেন কেন?’ ভদ্রমহিলা সুদীপ্তকে জিজ্ঞাসা করলেন।

‘ঠিক আছে, বলুন।’

দ্বিতীয় চেয়ার নেই, বসতে হলে খাটে বসতে হয়, সুদীপ্ত মনে-মনে বলল, ‘ন্যাকা।’

ভদ্রলোক ভদ্রমহিলাকে বললেন, ‘তুমি বলো।’

‘না। তুমি শুরু করো।’ ভদ্রমহিলা মাথা দোলালেন।

‘দেখুন ভাই, আপনি এবং আমরা কলকাতা থেকে এসেছি। আমরা বাঙালি। এই প্রবাসে এসে আমরা যদি পরস্পরকে সাহায্য না করি তাহলে খুব আক্ষেপের ব্যাপার হবে।’

‘আমি কীভাবে সাহায্য করব বুঝতে পারছি না।’

‘বলছি। আপনি তো বাংলা সিরিয়ালের ব্যাপারে রতিকান্ত চৌধুরীর সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন? তাই না? আপনি কী করেন?

‘সিরিয়াল পরিচালনা করি।’

‘তার মানে আপনি কোনও প্রযোজকের হয়ে সিরিয়ালের জন্যে এখানে এসেছেন। অ্যাপয়েন্টমেন্টটা নিশ্চয়ই কলকাতা থেকে করেছিলেন?

‘হ্যাঁ। আমার প্রযোজক টেলিফোনে ওটা করে দিয়েছিলেন।’

ওরা মুখ চাওয়াচাওয়ি করল।

ভদ্রলোক বললেন, ‘তা আজ কাজের কাজ কিছু হল?’

‘না। এখনও হয়নি।’

সহজে হবে না। এই লোকটি গভীর জলের মাছ।’ ভদ্রলোক বললেন।

‘আঃ। বড় বাজে কথা বলো।’ ভদ্রমহিলা ঝাঁঝিয়ে উঠলেন, ‘আপনাকে কি আবার যেতে বলেছেন উনি?’

সুদীপ্ত কী বলবে ভেবে না পেয়ে মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলল।

ভদ্রমহিলা ঘড়ি দেখলেন, ‘ও বাবা। অনেক দেরি হয়ে গিয়েছে। তুমি যাও, নিয়ে এসো।’

‘তুমি?

‘আমি একটু পরে ঘরে যাচ্ছি।’ ভদ্রমহিলা বললেন।

ভদ্রলোক চলে গেলে ভদ্রমহিলা হাসলেন, ‘আপনাকে খুব বিরক্ত করেছি, না? আসলে আমরা খুব সমস্যায় পড়েছি। আমার একটা ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি আছে, অন্যের হয়ে নানান। রকমের কাজ করে দিই আমরা। তিনজন সিরিয়াল-প্রযোজক আমার কাছে এসেছেন। এঁদের দুজনের মেগা সিরিয়াল চলছিল কিন্তু আচমকা সেটা বন্ধ করার জন্যে একমাসের নোটিশ দেওয়া হয়েছে। এর ফলে বিশাল ক্ষতি হবে প্রযোজকের। তাঁরা নিজেরা চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছেন ওপর তলার মন পেতে। তাই আমাদের দায়িত্ব দিয়েছেন। যদি আমরা বন্ধ করার নোটিশ তুলে নিতে কর্তৃপক্ষকে রাজি করাতে পারি তাহলে ওঁরা উপযুক্ত দক্ষিণা দেবেন আমাদের। এখন এটা আমাদের প্রেস্টিজ ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমাদের ব্যাবসার ভবিষ্যত নির্ভর করছে এই কেসে সাফল্যের ওপর।’ভদ্রমহিলা চুপ করলেন।

সুদীপ্ত অবাক হয়ে শুনছিল। প্রায়ই কানে আসত, ওই সিরিয়াল সরকার বন্ধ করে দিচ্ছে, ওই সিরিয়ালকে আর এক্সটেনশন দেওয়া হবে না মান ভালো নয় বলে। কিন্তু সেইসব সিরিয়ালকে আবার সক্রিয় করতে যে ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি এগিয়ে এসেছে তা তার জানা ছিল না।

সুদীপ্ত নিচুস্বরে বলল, ‘আমি কী করতে পারি বুঝতে পারছি না।’

‘কাল কখন ওঁর সঙ্গে দেখা করবেন?

‘এখনও ঠিক হয়নি। উনি ফোনে বলবেন।’

‘ফোনে? আপনাকে করতে বলেছেন?’

মাথা নেড়ে মিথ্যে কথা বলল সুদীপ্ত, ‘উনি নিজে করবেন বলেছেন।’

‘মাইগড। আপনি তো খুব লাকি। একটা রিকোয়েস্ট করব?

‘বলুন!’

‘আমি আপনার সঙ্গে ওঁর কাছে যাব!’

‘বেশ। উনি ফোন করলে ওঁকে বলব।’

‘না, বলবেন না। না বলে গেলে উনি কথা বলতে বাধ্য হবেন।’

কিন্তু যদি আমার ওপর রেগে যান?’

হাসলেন ভদ্রমহিলা, ‘যাতে না রাগেন সেই দায়িত্ব আমি নিচ্ছি। শুধু এই উপকারটুকু করার জন্যে আপনাকে আমি পাঁচ হাজার টাকা দেব।’

অবাক হল সুদীপ, ‘এসব না করে আপনি সোজা ওঁর বাড়িতে চলে যান না।’

‘অনেকে সেই চেষ্টা করেছেন। মিস্টার চৌধুরী তাঁদের চিরদিনের জন্যে বাতিল করেছেন।’ ভদ্রমহিলা উঠলেন, ‘আমি তিনতলার প্রথম বাঁ-দিকের ঘরে উঠেছি। আড্ডা মারতে ইচ্ছে করলে চলে আসতে পারেন।’ দরজার দিকে এগিয়ে গেলেন তিনি।

শেষপর্যন্ত সুদীপ্ত প্রশ্নটা না করে পারল না, ‘আপনার নাম কুসুম, তাইতো?’

মিষ্টি হাসলেন ভদ্রমহিলা, ‘মেয়েদের নাম একবার শুনলে দেখছি ভোলেন না।’

চুপচাপ শুয়েছিল সুদীপ্ত। কলকাতায় থাকলে এই ভরসন্ধেতে শুয়ে থাকার কথা ভাবতেই পারত না। কিন্তু দিল্লিতে সে কোথায় যাবে। পিনাকীবাবুর সহপাঠী রতিকান্ত, শুধু এটুকু তথ্য তাকে আশান্বিত করেছিল। ভেবেছিল দিল্লিতে এলেই কাজ হয়ে যাবে। সে একটা ভালো সিরিয়াল পরিচালনা করতে চায় যা দেখে দর্শকরা খুশি হবে। কিন্তু আজ রতিকান্তর সঙ্গে কথা বলে মনে হয়েছে খালি হাতেই ফিরতে হবে।

কলকাতায় যে ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টের সংস্থা সিরিয়াল বাঁচানোর বা নতুন সিরিয়াল বের করার দায়িত্ব নিয়েছে তা জানা ছিল না। পিনাকীবাবুও জানতেন না। জানলে তাকে দিল্লিতে পাঠাতেন না। এরা অর্ডার বের করে নিয়ে গেলে দক্ষিণা দিয়ে দিতেন। কুসুমদেবী যে সহজে রণে ভঙ্গ দেবেন না তাতে কোনও সন্দেহ নেই।

দরজায় শব্দ হল। তন্দ্রা এসেছিল সুদীপ্তর। তবু শব্দটা কানে যেতে শুয়ে-শুয়েই বলল, ‘কাম ইন, দরজা খোলা আছে।’

যিনি দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকলেন তাঁকে আশাই করেনি সুদীপ্ত। এক লাফে উঠে বসল সে, ‘আপনি? আসুন, আসুন।‘

‘সেকি! আমি তো আপনাকে বলেছিলাম, আসতে পারি।’ রতিকান্ত চৌধুরী চেয়ারটা টেনে বসে চারপাশে চোখ বোলালেন, ‘ঘরে এসি নেই!’

‘না। মানে এখন তো গরম তেমন নেই–।’

গরমেই যে এসি চালানো হয় এমন ভাবার কোনও কারণ নেই। ধুলো, ধুলোর অ্যালার্জি থেকে বাঁচার জন্যে গভীর শীতেও আমি হালকা এসি চালাই। যাক গে। বাবু পিনাকীর খবর কী?’ রতিকান্ত হাত বাড়ালেন।

‘ভালো!’ কিন্তু কেন হাত বাড়ালেন বুঝতে পারল না সুদীপ্ত।

‘সিগারেট–!’

তাড়াতাড়ি প্যাকেটটা এগিয়ে দিতে বিছানা থেকে নেমে এল সুদীপ্ত। প্যাকেট নিয়ে সিগারেট বের করতে-করতে রতিকান্ত হাসলেন, ‘অনেকদিন পরে সিগারেট খাচ্ছি। বেড়ে লাগে। কলকাতায় এখন কোনও ব্র্যান্ডের সিগারেট বেশি চলে?’

‘মানে?’ ধন্দে পড়ল সুদীপ্ত।

‘আমাদের ছাত্রাবস্থায় চারমিনার খুব চালু ছিল। তারপর এই উইলস ফিল্টার। আপনি কীরকম পরিচালক? বাজারের খবর রাখেন না?’ খিঁচিয়ে উঠলেন রতিকান্ত।

‘এখন ঠিকঠাক বলা মুশকিল। সিগারেট খাওয়া তো খুব কমে গিয়েছে।’

রতিকান্ত চেয়ার ছেড়ে উঠলেন, ‘একটু আরাম করি। বিছানার চাদরটা নিশ্চয়ই আপনি আসার পর পালটেছে?’

‘হ্যাঁ। আমি আজ দুপুরে ঘরে ঢুকে দেখেছি ওরা পালটাচ্ছে।’

‘গুড।’ বালিশে মাথা রেখে শুয়ে পড়ে সিগারেট ঠোঁটে রাখলেন রতিকান্ত। ওটা এখনও ধরাননি।’

সুদীপ্ত জিজ্ঞাসা করল, ‘স্যার, দেশলাই দেব?’

‘একটু পরে। তামাকের গন্ধটা আর একটু নিই। হ্যাঁ, কী নিয়ে এসেছেন?’

খেয়াল হল সুদীপ্তর। দ্রুত আড়ালে রাখা মোড়কে মোড়া বোতলটা বের করে টেবিলে রাখল। সযত্নে মোড়ক খুলল।

‘মাই গড! আপনি ইন্ডিয়ান হুইস্কি নিয়ে এসেছেন। লোকে ব্ল্যাক লেভেল, শিভার্স, বুলেভেল নিয়ে লাইন দিয়ে বসে আছে। আর আপনি! এই জন্যেই বাঙালির কিছু হল না। কিছুতেই নজর বড় করতে পারলেন না আপনারা। কলকাতায় যে ক’টা বাংলা মেগাসিরিয়াল চলছে তার আশি পার্সেন্ট মালিকানা অবাঙালিদের। কেন? ওরা জানে কাউকে কী করে খুশি করতে হয়। নাকে শব্দ তুললেন রতিকান্ত।

‘আসলে এখানে তো আমি নতুন। দোকানদারকে বলেছিলাম বেস্ট হুইস্কি দিতে। লোকটা বলল, এটাই নাকি বেস্ট। দামও নিল সাড়ে চারশো টাকা।’ সুদীপ্ত অপরাধীর গলায় বলল।

রতিকান্ত হো-হো করে হেসে উঠলেন, ‘আপনি ড্রিঙ্ক করেন না?’

‘না।’ মাথা নাড়ল সুদীপ্ত।

‘তাই দোকানদার আপনাকে টুপি পরাতে পেরেছে। পঞ্চাশ টাকা বেশি নিয়েছে। যাক গে, কী করা যাবে। অভাবে স্বভাব নষ্ট করা যাক। গ্লাস ধোওয়া আছে?

তখন মনে পড়ে গেল সুদীপ্তর। সে বেল বাজিয়ে বেয়ারাকে ডেকেছিল কিন্তু বেয়ারা আসার আগেই ওই ভদ্রলোক-ভদ্রমহিলা এই ঘরে এসেছিলেন। বেয়ারা আসেনি।

এবার বেল বাজতেই বেয়ারা চলে এল। সুদীপ্ত তাকে জিজ্ঞাসা করল, এর আগে তাকে ডাকা সত্বেও কেন আসেনি! লোকটি জানাল সে একটু বাইরে বেরিয়েছিল।

রতিকান্ত বললেন, ‘ভালো গ্লাস আছে তোমার স্টকে?’

‘আছে স্যার।’

‘দুটো নিয়ে এসো আর দু-বোতল বিসলারি। আমি খোলা জলকে বিশ্বাস করি না।’

‘ঠিক আছে, স্যার।’

‘ও হ্যাঁ। দুশো গ্রাম কিসমিস আর অল্প বাদাম আনবে। তাড়াতাড়ি।’

বেয়ারা মাথা নেড়ে হাত বাড়াতেই সুদীপ্ত চটপট একশো টাকার নোট দিয়ে দিল, ‘এতে হবে না?’

রতিকান্ত বললেন, ‘আলবাত হবে। বাকিটা ফেরত দিতে হবে না। চটপট করো।’

দরজা ভেজিয়ে দিতেই রতিকান্ত জিজ্ঞাসা করলেন, ‘উত্তর কলকাতার গঙ্গার ঘাট হল ফ্যান্টাস্টিক জায়গা। ওখানে যাওয়া হয়?’

‘না। আমার বাড়ি থেকে বেশ দূরে।’

‘তাকে কী হয়েছে? আমরা দলবেঁধে রবিবারের সকালে যেতাম বেদিং বিউটি দেখতে। এককালে বাঙালি মহিলাদের কী ফিগার ছিল! যেমন লম্বা তেমনি চওড়া। আর এখন?মনে হয় দেশলাই কাঠি হাঁটছে।’ মাথা নাড়লেন রতিকান্ত।

সুদীপ্ত সাহস সঞ্চয় করছিল। এবার বলে ফেলল, ‘স্যার, আমরা খুব আশা করে আছি। পিনাকীবাবু বলেছেন আপনি নিশ্চয়ই আমাদের সুযোগ দেবেন। এই সুযোগ পেলে আমার একটা বড় ব্রেক হয়। আপনি যদি একটু কনসিডার করেন!’

‘দেখুন ভাই, এই কথাগুলো নানান মুখে এত শুনেছি যে এখন ইরিটেশন তৈরি হয়। আমাকে একা পেলে মানুষ কেন যে অন্যকথা বলতে পারে না! যাক গে, পিনাকীর স্ত্রীকে চেনেন?

ঢোল গিলল সুদীপ্ত, ‘না, আমি ঠিক–।’

‘তার মানে ওর বাড়িতে আপনার যাওয়া-আসা নেই!’

‘হ্যাঁ। আমি ওঁর অফিসেই যাই–।’

‘পিনাকীর বউ শুনেছি দারুণ দেখতে ছিল। সিনেমার নায়িকা হতে পারত। বিয়ের পর পিনাকী ওকে বাইরে বের করেনি। ওর মতো কনজারভেটিভ লোক কী করে সিরিয়াল বানাতে এল আমি ভেবে পাই না। যাক গে, মন্দিরার খবর কী?’

‘মন্দিরা?’

‘দূর মশাই। পরিচালক হতে চান অথচ নায়িকার নাম শোনেননি?’

‘ও হ্যাঁ। কিন্তু উনি তো অভিনয় ছেড়ে দিয়েছেন।’

‘সেটা জানি। কিন্তু কোথায় আছে জানি না। ত্রিপাঠী ওকে নায়িকা বানিয়ে ছেড়েছিল। দিল্লিতে কতবার এসেছে আমার কাছে ত্রিপাঠীর জন্যে। বাপের বয়সি লোকটা ওকে দিয়ে যা ইচ্ছে তাই করাত। শেষের দিকে হুইস্কি খেত খুব। শুনেছি একজন সাধারণ ছেলেকে বিয়ে করে কলকাতা ছেড়ে চলে গিয়েছে। খুব ভালো করেছে।’

বেয়ারা এল জলের বোতল, গ্লাস, কিসমিস-বাদাম নিয়ে। টেবিলে রেখে চলে গেল।

রতিকান্ত বললেন, ‘বিলম্বের আর দেরি করে লাভ নেই। শুরু করো।’

জীবনে কখনও গ্লাসে মদ ঢালেনি সুদীপ্ত। কিন্তু বন্ধুদের দেখেছে। সেই আন্দাজে মদ ঢেলে রতিকান্তর দিকে তাকাল। রতিকান্ত মাথা নাড়লেন, ঠিক আছে। স্কচ হলে নিট খেতাম কিন্তু প্রায় ভরতি করে দাও গ্লাস।’

বিসলারির বোতল খুলে জল ঢেলে গ্লাস এগিয়ে ধরল সুদীপ্ত। এবার উঠে বসলেন রতিকান্ত, ‘একটা কথা স্বীকার করতেই হয় খাওয়াটাও একটা পরিশ্রম। তুমি নাও।’

‘আমি, আমি খাই না।’

‘কেন? তোমার কি লিভার খারাপ?

‘না। মানে–।’

‘শোনো, মদের আসরে যে গ্লাস হাতে না নেয় সে ক্রিমিনাল।’ রতিকান্ত বললেন, ‘আমি মদ খেয়ে যা যা বলব তুমি সুস্থ মাথায় তা মনে রেখে দেবে, নো, এটা চলবে না। ঢালো মদ গ্লাসে। হু-হু। আমার কথা না শুনলে পস্তাবে।’

গ্লাসটা ধরে রাখলেন রতিকান্ত, চুমুক দিলেন না।

হাত কাঁপছিল। কোনওমতে খানিকটা হুইস্কি গ্লাসে ঢেলে জল মিশিয়ে শ্বাস ফেলল সুদীপ্ত। রতিকান্ত চুমুক দিয়ে বললেন, ‘ইন্ডিয়ান হুইস্কি প্রথম দিকে চুমুক দিলে গন্ধে গা গোলায়। কিন্তু পরে আর গন্ধটা যে খাচ্ছে সে পায় না। উল্লাস। বলল, উল্লাস।’ গ্লাস ওপরে তুললেন রতিকান্ত।

‘উল্লাস!’ মিনমিনে গলায় বলল সুদীপ্ত। রতিকান্ত যে আপনি থেকে তুমিতে নেমে এসেছেন শুরুর সময়ে তা লক্ষ করে খুশি হল সে। তুমি কেন, তুই বলুক লোকটা। কিন্তু প্রপোজাল অ্যাকসেপ্ট করে স্লট দিয়ে দিক।

মুঠোয় কিসমিস আর বাদাম তুলে মুখে চালান দিচ্ছিল লোকটা। সুদীপ্ত জিজ্ঞাসা করল, ‘স্যার, কাল কখন যাব?’

‘কোথায়?’ হুইস্কিতে চুমুক দিয়ে গলা ভেজালেন রতিকান্ত।

‘আপনার কাছে।’

‘যাওয়ার কী দরকার? আমি তো নিজেই এসেছি।’ আর একটা বড় চুমুক নিলেন রতিকান্ত, ‘বেশ ভালো লাগছে হে। পরিচিত কেউ ভাবতেই পারবে না এরকম স্যাবি ঘরে তোমার সঙ্গে বসে আমি ড্রিঙ্ক করছি! ইচ্ছে হলে আমি যে-কোনও ফাইভস্টারে অথবা ক্লাবে বসে স্কচ খেতে। পারতাম। মাঝে-মাঝেই করি। বড় একঘেয়ে লাগে। যে লোকগুলো সঙ্গে থাকে তাদের ধান্দা। থাকে আমার মুখ থেকে কথা বের করার জন্যে। আরে, তোরা আমাকে টাকা দিবি মুখ খুললেই। কিন্তু টাকা নিয়ে আমি কী করব? এই মুহূর্তে ভারতবর্ষের অন্তত আটটি মেগাসিরিয়াল থেকে বছরে দু-কোটি টাকা পাচ্ছি। চার বছর গেল। এখন আর ভালো লাগে না। এত টাকা রাখার জায়গাই নেই। তার চেয়ে তোমার সঙ্গে এই ঘরে বসে নিশ্চিন্তে ড্রিঙ্ক করায় যে আরাম তা কেউ বুঝবে না।’ চোখ বন্ধ করলেন রতিকান্ত। তারপর গান ধরলেন। রবীন্দ্রনাথের গান। ভদ্রলোকের গানের গলা ভালো। ধ্রুপদাঙ্গের গান গাইতে লাগলেন হুইস্কি খেতে-খেতে।

এই সময় দরজায় শব্দ হতেই গান থামালেন রতিকান্ত। ইশারায় সুদীপ্তকে বললেন কে এসেছে দেখতে। সুদীপ্ত উঠল। সে যে তখন থেকে একটা হুইস্কি নিয়েই বসে আছে তা রতিকান্ত দেখার প্রয়োজন মনে করেননি।

সে দরজার একটা পাল্লা সামান্য খুলতেই বেয়ারাকে দেখতে পেল।

‘কী দরকার?’ সুদীপ্ত জিজ্ঞাসা করল।

‘নিচের তলার মেমসাহেব জিজ্ঞাসা করছেন আপনি যাবেন কিনা?’

‘না।’

বেয়ারা চলে গেলে দরজা বন্ধ করল সুদীপ্ত। রতিকান্ত জিজ্ঞাসা করলেন, ‘মেমসাহেবটি কে? কলকাতা থেকে নিয়ে এসেছ নাকি?’

‘না না। আজ মান্ডি হাউসে উনি যেচে আমার সঙ্গে আলাপ করেছেন।’

‘মান্ডি হাউসে?’

‘হ্যাঁ। আপনার সঙ্গে দেখা করতে চান কিন্তু অ্যাপয়েন্টমেন্ট পাচ্ছেন না।’

‘কেন? কী দরকার?’

‘দুটো সিরিয়াল নাকি বন্ধ হতে চলেছে, আপনাকে রিকোয়েস্ট করবেন বাঁচাতে।’

‘উনি প্রোডিউসার? তা কী করে হবে? অবাঙালি?’

‘না। বাঙালি।’

ইম্পসিবল। ও দুটো বাঙালি প্রোডিউসারের নয়।’ রতিকান্ত মাথা নাড়লেন, ‘নির্ঘাত দালাল। আমি তোমার কাছে আসব তা জানে না তো?’

‘না-না।’

‘গুড। এসেছিলাম যে তাও বলার দরকার নেই।’

‘কেন বলব? ওই সিরিয়াল দুটো বন্ধ হলে তবেই তো সুযোগ হবে আমাদের।’

‘বাঃ। বেশ বুদ্ধি।’ বিছানা থেকে নেমে দাঁড়াতে একটু টলে গেলেন রতিকান্ত। তারপর হাত বাড়ালেন, ‘কই, দাও।’

‘কী দেব?’ হকচকিয়ে গেল সুদীপ্ত।

‘ন্যাকামি করো না। দেরি হয়ে গেছে বেশ। পিনাকী আমাকে দেওয়ার জন্যে কিছু দেয়নি তোমাকে?’ হাতটা বাড়ানোই ছিল।

পঞ্চাশ হাজার টাকার বান্ডিলটার কথা মনে পড়ল সুদীপ্তর। কিছুক্ষণ আগে লোকটা বলল তার টাকার দরকার নেই!

হাসলেন রতিকান্ত, ‘আমি টাকাটা না নিলে পিনাকী খুব দুঃখ পাবে।’

সুদীপ্ত স্যুটকেস খুলল। পঞ্চাশটা হাজার টাকার নোট। আজ মদ কিনতে খরচ হয়েছে, থাকা খাওয়ার টাকাও লাগবে। সে দ্রুত পাঁচটা নোট সরিয়ে এগিয়ে ধরতে রতিকান্ত জিজ্ঞাসা করল, ‘কত আছে ওতে?’

‘পঁয়তাল্লিশ।’

‘অ্যাঁ! পিনাকী ওই পাঠিয়েছে?ছুঁচো মেরে হাত গন্ধ করতে বলেছে আমাকে? ছিঃ। এই জন্যে বাঙালির কিছু হয় না। যে-কোনও অবাঙালি প্রোডিউসার মিনিমাম এক লাখ দিয়ে বউনি করত। টাকাটা পকেটে পুরে আমার সঙ্গে চলো।’

‘পকেটে পুরব?’

‘হ্যাঁ। পিনাকীর নাম করছ বটে কিন্তু তুমি কে তা আমি জানি না। দরজা খুলে বেরুতেই সি বি আই আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে। ওগুলো ধরলে নোটের ওপর আমার আঙুলের ছাপ পেয়ে যাবে ওরা। সারাজীবনের জন্যে ফেঁসে যাব। তোমার মতলব কী তা তো আমি জানি না। চলো।’

দরজার বাইরে এসে দু-পাশে তাকিয়ে রতিকান্ত সুদীপ্তকে নিয়ে লিফটে ঢুকলেন, ‘আমার গাড়িতে উঠে বসে দেবে।’

পার্কিং-এ গাড়ি ছিল। ড্রাইভার গাড়ি নিয়ে আসতেই রতিকান্ত পেছনের দরজা খুলে উঠে বসলেন, ‘এসো।’

তারপর ড্রাইভারকে নির্দেশ দিলেন হিন্দিতে, ‘রাতের দিল্লিটা এই সাহেব দেখতে চান। একটু ঘুরে বেড়াও।’ তারপর চাপা গলায় বললেন, ‘বান্ডিলটা পকেট থেকে বের করে আমার পাশে সিটের ওপর রেখে দাও। ড্রাইভার যেন সন্দেহ না করে।’

সুদীপ্ত আদেশ পালন করল। মিনিট দশেক ফালতু ঘোরাঘুরির পর রতিকান্ত নির্দেশ দিলেন ড্রাইভারকে বঙ্গভবনে ফিরে যেতে।

নামবার আগে সুদীপ জিজ্ঞাসা করল, ‘কাল কখন যাব?’

‘সকাল আটটায় আমাকে বাড়িতে ফোন করো।’ পকেট থেকে একটা কার্ড বের করে সুদীপ্তর হাতে ধরিয়ে দিলেন রতিকান্ত।

বঙ্গভবন থেকে পিনাকীকে ফোন করল সুদীপ্ত, ‘উনি এসেছিলেন। ওই বিষয়ে কোনও কথা বলতে চাননি। আপনার দেওয়া প্যাকেটটা নিয়ে গিয়েছেন।’

পিনাকীর গলা শুনল। ‘ভালো খবর। পুরোটাই?

‘না। ক-দিন থাকতে হবে জানি না, তাই–।’

‘ও কে! কবে দেখা করতে বলেছে?

‘কাল সকালে ফোন করলে জানাবেন।’

‘গুড লাক।’ পিনাকী ফোন কেটে দিলেন।

ফোনের বিল মিটিয়ে সুদীপ্ত লিফটের দিকে যাচ্ছিল, লোকটা পেছন থেকে ডাকল, ‘এই যে, আপনি এই কার্ডটা ফেলে যাচ্ছেন।’

সুদীপ্ত এগিয়ে গিয়ে কার্ডটি নেওয়ার আগেই লোকটিনাম পড়ে ফেলেছে, ‘রতিকান্ত চৌধুরী? দূরদর্শনের?’

মাথা নাড়ল সুদীপ্ত।

‘উনি দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই দেখছি কলকাতা থেকে লোকজনের আসা বেড়ে গেছে। কুসুম দেবীও তো ওঁর সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন।’

‘তা হবে।’ সুদীপ্ত আর দাঁড়াল না।

সকালে ঘুম ভাঙল দরজায় শব্দ হওয়ায়। ধড়মড়িয়ে বিছানা ছেড়ে দরজা খুলতেই কুসুমকে দেখতে পেল সুদীপ্ত। কুসুমের পরনে হাতকাটা ম্যাক্সি।

দেখামাত্র ঝাঁঝিয়ে উঠলেন মহিলা, ‘এটা কী হল? আপনি—আপনি–।’

‘এক মিনিট, টয়লেট থেকে আসছি।’ সুদীপ্ত দ্রুত সরে এল।

দাঁজ মাজতে-মাজতে মনে করার চেষ্টা করল সে। কাল রতিকান্ত চৌধুরী তার ঘরে এসেছিলেন একথাটা আর কারও জানার কথা নয়। রাত্রে বেরুবার সময় কুসুম ছিলেন না ধারে কাছে। তাহলে এত সকালে ছুটে এলেন কেন?

ঘরে ফিরে সুদীপ্ত দেখল কুসুম এরমধ্যে তিনভাগ শেষ হওয়া মদের বোতল এবং গ্লাস দুটো আবিষ্কার করে ফেলেছেন।

‘কে এসেছিল কাল রাত্রে।’ চোখের কোণে তাকালেন কুসুম।

‘আমার পরিচিত এক ভদ্রলোক।’

‘দুজনে মিলে দশ পেগ খেয়ে ফেলেছেন? আপনাকে দেখে মনে হয় না তো এত মদ খেতে পারেন। অতটা খাওয়ার পর ভদ্রলোককে এগিয়ে দিতে নিচে নামতে পেরেছিলেন? স্বীকার করছি, ক্ষমতা আছে। এখন বলুন তো কে ওই ভদ্রলোক?

এইবার ঠাহর করল সুদীপ্ত। কুসুম ওই রিসেপশনিস্টের কাছে শুনেছেন। বেশি কথা বলার অভ্যেস থাকায় লোকটা ওই কার্ডের গল্প নিশ্চয়ই এঁকেও করেছে। চট করে ঘড়ি দেখল সুদীপ্ত। আটটা বাজতে কুড়ি মিনিট বাকি আছে।

সে হাসল, ‘আপনার অনুমান ঠিক।’

‘আর অত করে বলা সত্বেও আমাকে ডাকলেন না আপনি। আমি কলকাতা থেকে স্কচ নিয়ে এসেছি ওঁকে গিফট দেব বলে। ইস! এই ঘরে উনি অতক্ষণ ছিলেন, ড্রিঙ্ক করেছেন, তার মানে আপনার সব কাজ হয়ে গেছে?তাই না?’

‘না। গতরাত্রে ও-বিষয়ে কোনও কথাই হয়নি। আমাকে একটু নিচে যেতে হবে।’

‘চা ঘরেই দিয়ে যায়।’

‘চা নয়। একটা ফোন করতে হবে আটটার সময়।

‘আমার মোবাইল থেকে করুন। মোবাইল ফোন টেবিলের ওপর রেখে বেল টিপলেন কুসুম, ‘আমারও সকালে চা খাওয়া হয়নি।’

বেয়ারা এলে চায়ের হুকুম দিয়ে বসলেন কুসুম, ‘কলকাতার কোন পাড়ায় থাকেন?’

‘শ্যামবাজারে।’

‘আমি আলিপুরে। আপনাদের সিরিয়ালের নাম কী?’

একটু ইতস্তত করল সুদীপ্ত। নামটা বললে যদি কলকাতায় চাউর করে দেয়। সে গম্ভীর গলায় বলল, ‘প্রোডাকশন নাম্বার টু।’

‘বাংলা সিরিয়ালের এরকম নাম হয় নাকি?

‘নতুনত্ব হবে বলে রাখা হয়েছে।’

চা এসে গেল। চুপচাপ চা খাচ্ছিল ওরা। কুসুম বললেন, ‘সময় হয়ে যাচ্ছে।’

ঘড়ি দেখল সুদীপ্ত। আটটা বাজতে তিন। কার্ডটা বের করে নাম্বার দেখে ডায়াল করল সে। রিং হচ্ছে। তারপর একজন মহিলার গলা পেল, ‘হ্যালো।’

‘মিস্টার চৌধুরী আছেন?’

‘কে বলছেন?’

সুদীপ্ত। কলকাতা থেকে এসেছি।’

‘আমি মিসেস চৌধুরী। আমাকে আধঘণ্টা পরে ফোন করবেন? প্লিজ!’

‘নিশ্চয়ই। কিন্তু–।’

‘একটু ধরুন।’ ভদ্রমহিলা বোধহয় টেবিলের ওপর রিসিভার নামিয়ে রাখলেন। সুদীপ্ত বুঝতে পারছিল না কেন মিসেস চৌধুরী তাকে আধঘণ্টা বাদে ফোন করতে বললেন। কুসুম ইশারায় জানতে চাইলেন, কী কথা হয়েছে? সুদীপ্ত মাথা নেড়ে জানাল কথা না বলতে।

রতিকান্তর গলা কানে এল, ‘হ্যালো!’

‘আমি সুদীপ্ত।’

‘কে, কোন সুদীপ্ত।’ বোঝা গেল রতিকান্ত বিরক্ত হয়েছেন।

পিনাকীবাবু পাঠিয়েছেন কলকাতা থেকে, কাল রাত্রে বঙ্গভবনে–।’

‘অ। সকালেই তো ফেরার ট্রেন, দেরি না করে স্টেশনে চলে যাও।’

‘কিন্তু–।’

‘হয়ে যাবে, চিন্তা করো না।’

‘কিন্তু আপনাকে তো প্রপোজাল দেওয়াই হয়নি। আপনি তো কিছুই জানেন না।‘

‘আমার জানার দরকার নেই। কলকাতার অফিসের সঙ্গে যোগাযোগ রেখো, আমি ওদের বলে দেব। ওকে!’

‘স্যার। ওখানে কোনও কাজ হবে না আপনি তো সব জানেন।’

পিনাকীকে বলবে আমার সঙ্গে কথা বলতে।’ এবার লাইনটা কেটে দিলেন রতিকান্ত চৌধুরী।

হতভম্ব হয়ে রিসিভারটার দিকে তাকাল সুদীপ্ত।

‘কী বলল?’ কুসুম আর ধৈর্য রাখতে পারলেন না।

‘কলকাতায় ফিরে যেতে বললেন।’ সুদীপ্ত হতাশ গলায় বলল।

‘তার মানে? আপনার তো কাজ হয়নি।’

‘হয়নি।’

‘আপনার কাছ থেকে কাগজপত্র নিয়েছেন।’

‘না। দেওয়ার সুযোগ পাইনি।’

‘তাহলে? চলে যেতে বললেই চলে যাবেন?’

‘কী করব?কী করতে পারি?’

‘আবার দেখা করুন।’

‘যদি এবার ঢুকতে না দেয়।’

একটু ভাবলেন কুসুম। তারপর জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কাল রাত্রে অতক্ষণ ছিলেন ভদ্রলোক, ঠিক কী-কী কথা হয়েছিল। বলুন তো!’

সুদীপ্ত ভাবল। টাকার কথা এই প্রায়-অচেনা ভদ্রমহিলাকে বলা ঠিক হবে কিনা বুঝতে পারছিল । শেষপর্যন্ত ওই প্রসঙ্গ বাদ দিয়ে যা বলা যায় তাই বলল।

মাথা নাড়লেন কুসুম। তারপর বাঁ-হাতে কানের পাশের চুল সরালেন, ‘সুদীপ্ত, এটা একটা যুদ্ধ। আমরা একসঙ্গে না লড়লে হার অনিবার্য। আপনার আমার চেয়ে অনেক শক্তিশালী লোকের কাছে এরা নিজেদের বাঁধা রেখেছে। চলুন, এগারোটা নাগাদ অফিসে যাই। আমি একজনকে ধরেছি। তিনি আমাকে ভেতরে ঢোকার অনুমতি দেবেন। তাঁর সঙ্গে দেখা করার অছিলায় আমরা মিস্টার চৌধুরীর চেম্বারে যাব।’

‘আমরা মানে?’

‘আপনি আর আমি।’

‘আপনার সঙ্গে উনি আছেন–।’

‘উনি আজ না গেলে কোনও ক্ষতি হবে না। উনি সঙ্গে থাকবেন রিসেপশন পর্যন্ত।’

কুসুম উঠলেন। তাঁর ওঠার ভঙ্গিতে এমন কিছু ছিল যে সুদীপ্ত চমৎকৃত হল। ভদ্রমহিলার ফিগার খুবই আকর্ষণীয়। মুখচোখের সৌন্দর্য মাঝারি হলেও সব মিলিয়ে আলাদাচটক আছে।

কুসুম চলে যাওয়ার পর ঘড়ি দেখেই মনে পড়ে গেল। আধঘণ্টার বেশি সময় চলে গিয়েছে। সে চটপট দরজা বন্ধ করে নিচে নেমে এল।

টেলিফোনের সামনে আজ অন্য লোক। রিসিভার তুলে বোতাম টিপল সুদীপ্ত। রিং হচ্ছে। চারবারের পর মহিলা কণ্ঠ শুনতে পেল, ‘হ্যালো।’

‘আমি, আমি, সুদীপ্ত, একটু আগে ফোন করেছিলাম–‘

‘ও, হ্যাঁ। আপনি তো বঙ্গভবনে উঠেছেন?’

‘হ্যাঁ।’

‘আমি আসছি। ধরুন মিনিট পঁচিশলাগবে।’ রিসিভার নামিয়ে রাখলেন মিসেস চৌধুরী। হকচকিয়ে গেল সুদীপ্ত। রতিকান্ত চৌধুরীর স্ত্রী তার সঙ্গে দেখা করতে আসছেন কেন? সিরিয়াল অ্যাভালের ব্যাপারে ওঁর তো কোনও হাত নেই।

অযথা কল্পনা করে কোনও লাভ নেই। ভদ্রমহিলা এলেই তো সব শোনা যাবে। এগারোটা বাজতে দেরি আছে। কিন্তু মিসেস চৌধুরী যে আসছেন তা কি কুসুমকে জানানো ঠিক হবে? অথচ এগারোটার সময় মান্ডি হাউসে যেতে চেয়েছেন মহিলা। নিশ্চয়ই তার ঘরে আসবেন তাড়া দিতে। সুদীপ্ত বঙ্গভবনের গেটের সামনে গিয়ে দাঁড়াল।

ঠিক দশটার সময় একটা ট্যাক্সি এসে দাঁড়াল। মধ্যবয়সিনী এক মহিলা ড্রাইভারকে কিছু বলে দরজা খুলতে যেতেই সুদীপ্ত এগিয়ে গেল, ‘কিছু মনে করবেন না, আপনি কি মিসেস চৌধুরী?’

‘হ্যাঁ। সুদীপ্ত?’ ‘হ্যাঁ। আমার ঘরে লোকজন আছে। হয়তো আপনার অসুবিধে হবে। তাই–I’ ‘ও।’ ভাবলেন মহিলা, ‘উঠে আসুন।’

সুদীপ্ত উঠল। হিন্দিভাষীর মতো উচ্চারণে তিনি ড্রাইভারকে নির্দেশ দিলেন। মিনিট পাঁচেকের মধ্যে ট্যাক্সি একটা ফকির দোকানের সামনে পৌঁছে গেল। এই সময়টায় একটাও কথা বলেননি মহিলা।

ভাড়া মিটিয়ে শীততাপনিয়ন্ত্রিত দোকানে ঢুকে একটি কোণের টেবিলে গিয়ে বসলেন মিসেস চৌধুরী। সুদীপ্তকে উলটোদিকে বসতে ইঙ্গিত করলেন। ‘আপনি কলকাতা থেকে এসেছেন। টিভি সিরিয়ালের জন্যে তাই তো?

‘হ্যাঁ।’

‘কেন? ওখান থেকে পাওয়া যায় না?

‘অনেক বছর অপেক্ষা করতে হয়। যারা তাড়াতাড়ি পায় তারা দিল্লিতে এসে স্যাংশন করিয়ে নিয়ে যায়।’ সুদীপ্ত বলল।। দু-কাপ কফির অর্ডার দিয়ে মিসেস চৌধুরী বললেন, ‘আপনি কী করেন?

‘আমি পরিচালনা করি। কিন্তু কাজ না থাকলে–।’

‘রতিকান্ত আপনাকে কাজ দিতে পারে?

‘হ্যাঁ। সবই তো ওঁর হাতে।’

‘কিন্তু কেন ও আপনাকে কাজ দেবে?

‘আসলে, সিরিয়ালটি প্রযোজনা করবেন পিনাকীদা, পিনাকী মিত্র। উনি রতিকান্তবাবুর সঙ্গে কলেজে পড়তেন। সেই সুবাদেই ওঁর কাছে এসেছিলাম।’

‘কী বললেন তিনি?

‘বলেছেন কলকাতায় ফিরে যেতে। চেষ্টা করবেন কিছু করতে।’

হাসলেন মিসেস চৌধুরী, ‘একথায় আপনি আদৌ ভরসা পাচ্ছেন না, তাই তো?’

‘কী করব বুঝতে পারছি না। আসলে আমার একজিসটেন্সের জন্যে একটা মেগাসিরিয়াল এখনই পাওয়া দরকার। খুব ভরসা করে এসেছিলাম।’ সুদীপ্ত বলল।

‘কাল ওকে কত টাকা দিয়েছেন?’ সরাসরি তাকালেন মিসেস চৌধুরী।

‘মা-মানে!’ থিতিয়ে গেল সুদীপ্ত।

এই সময় বেয়ারা এসে কফি দিয়ে গেল। মিসেস চৌধুরী বললেন, ‘কফি খেতে-খেতে কথা বলুন। আপনি আমার চেয়ে বয়সে অনেক ছোট, যা বলছি তাই করুন।’ গরম কফিতে চুমুক দিতে গিয়ে সামলে নিল সুদীপ্ত।

‘কত দিয়েছেন?’

‘পঁয়তাল্লিশ।’ কোনওমতে বলল সুদীপ্ত।

‘কম দিলেন কেন?’

‘কম? মানে?’

‘পিনাকীবাবু আপনাকে পঞ্চাশ দিতে বলেছিলেন। তাই না?’

পা ঠান্ডা হয়ে গেল সুদীপ্তর। কথাটা ইনি জানলেন কী করে? কফিতে চুমুক দিয়ে মিসেস চৌধুরী বললেন, ‘কাল রাত্রে কানে এল ও টেলিফোনে বাংলায় কথা বলছে। যাকে বলছে সে যে বন্ধুলোক তা বুঝলাম। তাকে ধমকে বললে, ‘তুই আমাকে ভেবেছিস কী? তোর কাছ থেকে আমি টাকা নেব? তুই আমাকে এতটা আন্ডার-এস্টিমেট করলি যে পরিচালকের হাত দিয়ে পঁয়তাল্লিশ পাঠালি।’ বলে ও-পক্ষের কথা শুনে বলেছিল, ‘নো পিনাকী, তোর লোক আমাকে পঞ্চাশ দেয়নি, পঁয়তাল্লিশ দিয়েছে। প্রথমেই যে টাকা মারছে তাকে তুই বিশ্বাস করবি কী করে? না-, তুই। পরিচালক চেঞ্জ কর, আমি তোকে দুটো নাম বলতে পারি, তারপর এসে কথা বল, আমি কথা দিচ্ছি তোকে।’

অসাড় হয়ে গেল সুদীপ্ত। রতিকান্তবাবু পিনাকীদার কাছে তাকে চোর প্রমাণ করেছে? পিনাকীদা নিশ্চয়ই মুখ ফিরিয়ে নেবে। তাহলে তার কী হবে? সে দেখল মিসেস চৌধুরী তার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন।

ঠোঁট কামড়াল সে। মিসেস চৌধুরী জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আপনি পাঁচ সরাতে গেলেন কেন?’

পিনাকীদা আমার যাতায়াত আর দু-দিনের বঙ্গভবনের থাকা-খাওয়ার টাকা দিয়েছিলেন। কাল যখন রতিকান্তবাবু আমার কাছে আসতে চাইলেন, তখন দামি মদ কিনে রাখতে বলেছিলেন। আমি কখনও মদ খাইনি, কিনিনি। সেটা কিনতে অনেক টাকা বেরিয়ে গেল। আমার ওখানে। এসে উনি এত আন্তরিক ভাবে গল্প করছিলেন যে মনে হচ্ছিল আমাকে আরও কয়েকটা দিন এই দিল্লিতে থেকে স্যাংশন লেটার নিয়ে যেতে হবে। আর ততদিনের মধ্যে উনি যদি দু-দিনও আবার আসেন তাহলে দামি মদ কিনতে হবে, সঙ্গে খাবার! এসবের টাকা আমি কোথায় পাব? তা ছাড়া। আরও কয়েকদিন থাকলে তার জন্যে খরচও বাড়বে। পিনাকীদার এক আত্মীয়ার বাইপাস করানো হচ্ছে। উনি তাই নিয়ে ব্যস্ত। এই অবস্থায় ওঁর কাছে টাকা চাওয়া ঠিক নয়। পঞ্চাশের জায়গায় পঁয়তাল্লিশ পেলে রতিকান্তবাবুর কিছু এসে যায় না। কম যে দিয়েছি, পিনাকীদাকে জানিয়েছি, কেন কম দিয়েছি কলকাতায় ফিরে সেটা ওঁকে জানিয়ে দিতাম।’

‘কথাগুলো যদি সত্যি হয় তাহলে যাওয়ার আগে আপনি স্যাংশন লেটার পেয়ে যাবেন।’

‘বিশ্বাস করুন দিদি, এর একটাও মিথ্যে নয়।’

‘আপনাকে আমি সাহায্য করছি। এই কাগজটা দেখুন, লেখাগুলো মুখস্থ করুন।’ ব্যাগ থেকে একটা চিরকুট বের করে সুদীপ্তকে দিলেন মিসেস চৌধুরী।

সুদীপ্ত দেখল পরপর পাঁচটা ব্যাঙ্কের নাম লেখা আছে। সবগুলোই বিদেশি ব্যাঙ্ক। তাদের পাশে পাঁচজন মহিলার নাম, অ্যাকাউন্ট নাম্বার।

সে জিজ্ঞাসা করল, ‘এগুলো কী?’

‘আপনি আগে মুখস্থ করুন।’

প্রাণপণে মনে রাখতে চাইল সুদীপ্ত। ব্যাঙ্কের নাম এবং মহিলাদের নাম সহজেই মনে গেঁথে গেল কিন্তু অ্যাকাউন্ট নাম্বার কিছুতেই মনে রাখতে পারছে না সে।

সেটা বুঝতে পেরে মিসেস চৌধুরী বললেন, ‘বুঝেছি। প্রথম অ্যাকাউন্ট নাম্বারটা যেটা সুধা রায়ের নামের পাশে আছে মনে রাখুন।’

তিনবার পড়ে মাথা নাড়ল সুদীপ্ত, ‘ঠিক আছে।‘

‘এবার যান মান্ডি হাউসে। ওঁর সঙ্গে দেখা করুন। অ্যাপিল করুন স্যাংশন লেটারের জন্যে। যদি দিতে না চায় তাহলে ব্যাঙ্কের নামগুলো এবং অ্যাকাউন্ট হোল্ডারের নামগুলো ওঁকে শুনিয়ে জিজ্ঞাসা করবেন অ্যাকাউন্ট নাম্বারগুলো উনি শুনতে চান কিনা–। আপনার কাজ হয়ে যাবে।’

‘কিন্তু এগুলো উনি শুনলে কাজ হবে কী করে?’

‘ওঁর কোটি-কোটি টাকার কিছুটা এইসব অ্যাকাউন্টে রাখা আছে।

‘ও।’

‘যদি জানতে চান আমি কী করে জানলাম?’

‘বলবেন, সোর্স বলতে আপনি বাধ্য নন। খবরদার, আমার সঙ্গে আপনার দেখা হয়েছে একথা ভুলেও বলবেন না।’

‘না-না।’

চিরকুটটা ছিঁড়ে কুচি-কুচি করে অ্যাশট্রেতে ফেলে তার ওপর কিছুটা কফি ঢেলে দিলেন মিসেস চৌধুরী।

ট্যাক্সিতে ওঠার সময় মিসেস চৌধুরী বললেন, ‘আপনি একটা অটো ধরে চলে যান। আমার সঙ্গে না যাওয়াই ভালো।’

‘ঠিক আছে। একটা কথা জিজ্ঞাসা করব?

‘বলুন।’

‘এত সব গোপন তথ্য দিয়ে আপনি আমাকে সাহায্য করছেন কেন? আপনি তো আমাকে চেনেন না। রতিকান্তবাবু তো আপনার স্বামী।’

শেষ করতে দিলেন না সুদীপ্তকে, মিসেস চৌধুরী বললেন, ‘স্যাংশন লেটার হাতে পেলে আমাকে ফোন করবেন, উত্তরটা তখন দেব।’

ট্যাক্সি চলে গেলে আর একবার নাম এবং নাম্বার ঝালিয়ে নিল সুদীপ্ত। এখন এগারোটা বেজে পনেরো। সর্বনাশ। কুসুমেরা নিশ্চয়ই তার জন্যে বসে না থেকে মান্ডি হাউসে চলে গিয়েছেন। একটা অটো নিয়ে মান্ডি হাউস চলে এল সুদীপ্ত।

রিসেপশনে আজ ভিড় নেই। তাকে দেখেই কুসুম উঠে এলেন, ‘কোথায় গিয়েছিলেন? বঙ্গভবনের কেউ বলতে পারল না?’

‘একটু কাজ ছিল!’

‘এখানে এসেছেন যে কাজটা করতে সেটা না করে কী করে যে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। শুনুন আমি স্লিপ। দিয়েছি, আর একজনের নামে। যদি তিনি ডাকেন তাহলে আপনি আমার সঙ্গে যাবেন!

‘তাঁর কাছে গিয়ে আমি কী করব?’

‘উঃ, আপনার কিছু মনে থাকে না। ওর কাছে যাচ্ছি বলে ভেতরে ঢুকে রতিকান্তবাবুর কাছে চলে যাব। রতিকান্ত তো যেতে অনুমতি দেবে না এরা ফোন করলে।’

তখনই কুসুমের নাম ধরে ডাকলেন রিসেপশনিস্ট। কুসুম এগিয়ে গিয়ে নিজের পরিচয় জানাতে আইডেন্টিটি কার্ড দেখতে চাওয়া হল। সেটা দেখার পর একটা পাস ইস্যু করলেন রিসেপশনিস্ট। কুসুম বললেন, ‘আমরা দুজন।’

লোকটি একটু বিরক্ত হলেও ‘টু’ লিখে দিলেন।

‘আসুন সুদীপ্ত।’ ভেতরের গেটের দিকে এগিয়ে গেলেন কুসুম, তাঁকে অনুসরণ করল সুদীপ্ত। কুসুমের সঙ্গে যে লোকটি কলকাতা থেকে এসেছেন তিনি বেশ হতাশ হলেন।

পাস দেখিয়ে ভেতরে যাওয়ার অনুমতি মিলল। প্রথমে লন, রাস্তা।

কুসুম বললেন, ‘প্রথমটা আমি ম্যানেজ করলাম, দ্বিতীয়টা করার দায়িত্ব আপনার।’

‘মানে?’

‘আমাকে নিয়ে রতিকান্তর চেম্বারে ঢোকার ব্যবস্থা করুন।’ কুসুম বললেন, ‘তার আগে একটু এলোমেলো ঘুরি যাতে কেউ বুঝতে না পারে।’

শেষপর্যন্ত রতিকান্ত চৌধুরীর ফ্লোরে উঠল ওরা। কুসুমকে সঙ্গে নিয়ে রতিকান্তর সামনে যাওয়া যাবে না। কিন্তু ওঁকে কীভাবে কাটানো যায় ভেবে পাচ্ছিল না সুদীপ্ত। একেবারে গায়ে গা লাগিয়ে হাঁটছেন ভদ্রমহিলা। এত সুন্দরী হওয়া সত্বেও এই মুহূর্তে ওঁকে সহ্য হচ্ছিল না তার।

রতিকান্তর অপেক্ষাগৃহে গিয়ে শুনল সাহেব মিটিং-এ গেছেন।

স্লিপ দিল সুদীপ্ত। কুসুম বলল, ‘পাশে আমার নামটাও লিখে দিন।’

তাই লিখল সে। চারজন অবাঙালি ভদ্রলোক তাদের আগে থেকে অপেক্ষা করছেন ওখানে। কুসুম ফিসফিস করে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আপনি সিমলায় গিয়েছেন?’

‘না।’

‘যদি স্যাংশন লেটার পেয়ে যাই তাহলে আপনাতে আমাতে সিমলায় যাব। ফ্যান্টাস্টিক ব্যাপার হবে। রাজি।’

কিন্তু আপনার সঙ্গে যিনি এসেছেন–।’

‘দূর। মোস্ট বোরিং। ওকে ভাবছি আজই কলকাতায় ফিরে যেতে বলব।’

পঁয়তাল্লিশ মিনিট অপেক্ষার পর রতিকান্তর দর্শন পাওয়া গেল। হনহন করে নিজের চেম্বারের দিকে আসছেন। সুদীপ্ত উঠে কয়েক পা এগিয়ে দাঁড়াল। রতিকান্ত ঘরে ঢোকার আগে সেটা দেখতে পেয়ে চোখ ছোট করলেন। বোঝা গেল খুব বিরক্ত হয়েছেন। ভেতরে ঢুকে গেলেন তিনি।

কুসুম জিজ্ঞাসা করলেন, ‘মুখটা ওরকম করল কেন?

সুদীপ্ত জবাব দিল না।

মিনিট পাঁচেকের মধ্যে বেয়ারা বেরিয়ে এসে সুদীপ্তর সামনে দাঁড়াল, ‘আপনি সুদীপ্ত? সাহেব আপনাকে এখনই ভেতরে যেতে বললেন।’

সুদীপ্ত নার্ভাস বোধ করল। সে পা বাড়াতে কুসুমও সঙ্গ নিল। বেয়ারা তাকে বলল, ‘আপনি অপেক্ষা করুন। এখন আপনাকে ডাকেনি।’

‘আমি ওর সঙ্গে আছি।’ প্রতিবাদ করল কুসুম।

‘উনি গিয়ে কথা বলার পর সাহেব ডাকলে যাবেন।’

কুসুম কাতর গলায় বললেন, ‘সুদীপ্ত, ওঁকে আমার কথা বলবেন!’

ভেতরে ঢুকল সুদীপ্ত। সোজা হয়ে বসেছিলেন রতিকান্ত চৌধুরী, দেখামাত্র ফোঁস করে উঠলেন, ‘তুমি এখানে কেন? কে তোমাকে পারমিশন দিয়েছে ভেতরে ঢুকতে?

‘আর একজনের সঙ্গে দরকার ছিল, ভাবলাম আপনার সঙ্গে দেখা করে যাই!’

‘লায়ার। চিট! তুমি মিথ্যে কথা বলে আমার এখানে এসেছ! আমি তোমাকে পুলিশের হাতে তুলে দিতে পারি। এখানে মিথ্যে কথা বলে ঢোকা মানে তুমি স্যাভোটাজ করতে এসেছ! আমার সঙ্গে চিটিং করে আবার দেখা করতে এসেছ?’ ফুঁসলেন রতিকান্ত।

‘স্যার! আপনি কী বলছেন, বুঝতে পারছি না।’

‘পারছ না! কাল তুমি পাঁচ হাজার সরিয়ে রাখনি? গেট আউট। বেরিয়ে যাও।’

‘আপনি মিছিমিছি রেগে যাচ্ছেন।’

‘কোনও কথা শুনতে চাই না।’

‘এক মিনিট। একটা কথা বলতে দিন।’

‘কী বলবে তুমি?’

‘একটা কাগজ দিন, প্লিজ। না থাক। সিটি ব্যাঙ্ক, স্ট্যান চার্টার্ড, এইচ এস বি সি, আমেরিকান এক্সপ্রেস, ব্যাঙ্ক অফ সুদানের নাম তো আপনার জানা, তাই না?’

‘ইয়ার্কি মারছ আমার সঙ্গে?

‘আপনি কী করে ভাবলেন? আমার সাহস আছে? আচ্ছা, এই নামগুলো ওইসব ব্যাঙ্কের সঙ্গে জড়িয়ে দিলে কেমন হয়?সুধারায়, শর্মিলা ডাট, সরস্বতী সেন, মাণ্ডবী গুপ্তা, কুন্তী দাস।’ সুদীপ্ত তাকাল।

সঙ্গে-সঙ্গে কীরকম মিইয়ে গেলেন ভদ্রলোক। চোয়াল ঝুলে পড়ল। মুখের চেহারা বদলে গেল আচমকা, ‘এসব কী? কে এরা?’

‘এদের নামে ওইসব ব্যাঙ্কে অ্যাকাউন্ট আছে।’

‘অ্যাকাউন্ট?

‘হ্যাঁ স্যার।’

‘তুমি, তুমি জানলে কী করে?’

‘জেনেছি। আপনি বলুন ওই পাঁচ হাজার যা আপনি বলেছেন আমি চুরি করেছি, তা কার অ্যাকাউন্টে রাখব? সুধা রায়ের অ্যাকাউন্টে রাখি?’ একটা কাগজ টেনে নিয়ে অ্যাকাউন্ট নম্বর লিখে এগিয়ে দিল সুদীপ্ত, ‘এই নম্বর তো?’

‘অসম্ভব!’ নাম্বারটা দেখে চেঁচিয়ে উঠলেন রতিকান্ত, ‘তুমি কী করে জানলে?’

‘যে করেই হোক জেনেছি। আপনি পুলিশ ডাকবেন বলছিলেন। ডাকুন। আমার না হয় দিন সাতেক জেল হবে। কিন্তু আমি নম্বরগুলো সি বি আইকে দিতে বাধ্য হলে আপনি আমাকে দোষ দেবেন না স্যার।’ সুদীপ্ত এই প্রথমবার হাসল।

ইশারায় বসতে বললেন রতিকান্ত। সুদীপ্ত বসল।

চোখ বন্ধ করে বললেন, ‘প্রপোজাল সঙ্গে এনেছ?’

‘হ্যাঁ স্যার। এই যে।’

ব্যাগ থেকে কাগজ বের করে এগিয়ে দিল সে। পাতা ওলটালেন রতিকান্ত। ‘বাঃ, নামকরা লেখকের গল্প। দুশো ষাট পর্যন্ত পাবে। তারমধ্যে টি আর পি ভালো থাকলে এসে কথা বলবে।’ বেল বাজালেন রতিকান্ত।

বেয়ারা ঢুকল। রতিকান্ত বললেন, ‘রিসিভিং থেকে সিল মেরে নিয়ে এসো।’

বেয়ারা চলে গেলে রতিকান্ত বললেন, ‘এই পৃথিবীতে কাউকে বিশ্বাস করা যায় না হে। নাঃ, টাকার ওপর আজ থেকে ঘেন্না ধরে গেছে আমার। কাল তোমার কাছ থেকে টাকা নেওয়া ঠিক হয়নি। যাক গে। মন দিয়ে কাজটা করবে। পিনাকীকে এসব বলার দরকার নেই। বুঝেছ?’

মাথা নাড়ল সুদীপ্ত।

‘এই স্লিপে কুসুম বলে কার কথা লিখেছ?’

‘আপনার সঙ্গে দেখা করতে চান। যার কথা কাল বলেছিলাম।’ বেল বাজালেন রতিকান্ত। ওঁর সেক্রেটারি ঘরে এল, ‘ইয়েস স্যার।’

‘বেয়ারাকে কাজে পাঠিয়েছি। এক ভদ্রমহিলা, নাম কুসুম, বাইরে অপেক্ষা করছেন, একটু দেখুন তো!’

কুসুম ঘরে এসে মিষ্টি হাসলেন, ‘আমার কী সৌভাগ্য, আপনার দেখা পেলাম। এত আপনার নাম শুনেছি।’

‘শুনুন। দুটো সিরিয়ালকে বাঁচানো সম্ভব নয়। কোনটাকে এক্সটেনশন দিলে আপনার লাভ হবে চটপট বলুন।’

‘আমার লাভ!’ বুকে হাত দিলেন মহিলা।

‘সুদীপ্তর অনুরোধে একটাকে এক্সটেনশন দিতে পারি।’

‘প্লিজ, দুটোকেই দিন।’

‘অসম্ভব।’

‘তাহলে!’ একটু ভেবে নাম বললেন মহিলা, ‘অন্তত একশো কুড়িটা দিন।’

‘কত থাকবে আপনার?’

‘কী যে বলেন?’ লজ্জায় নুইয়ে গেলেন মহিলা।

এই সময় বেয়ারা প্রপোজালটা ফেরত নিয়ে এল ট্যাম্প মেরে। ভালো করে দেখে নিয়ে রতিকান্ত বেয়ারাকে বললেন, ‘সেক্রেটারিকে দিয়ে এসো।’ দেওয়ার আগে একটা টিক মারলেন ওপরে।

বেয়ারা চলে গেলে রতিকান্ত কুসুমকে বললেন, ‘আপনি বাইরে অপেক্ষা করুন, আধঘণ্টা পরে অর্ডারের কপি পেয়ে যাবেন।’

‘থ্যাঙ্ক ইউ স্যার।’ কুসুম বেরিয়ে গেলেন।

‘নাউ সুদীপ্ত। তোমার অভিলাষ পূর্ণ হয়েছে। টেল মি, কে তোমাকে ইনফরমেশনগুলো দিয়েছে? রতিকান্ত জিজ্ঞাসা করলেন।

‘জেনে আপনার কী লাভ স্যার?’

‘শত্রুদের সম্পর্কে সজাগ হতে পারব।’

‘আপনাকে আমি কথা দিচ্ছি এসব কথা তৃতীয় ব্যক্তি জানবে না।’

‘সুদীপ্ত, তোমাকে স্যাংশন লেটার দিচ্ছি, সামনের মাস থেকে তোমার টেলিকাস্ট ডেট পেয়ে যাবে। তার মানে এই নয় যে পঁচিশ বা পঞ্চাশ এপিসোডের পর ওটাকে বন্ধ করা যাবে না। আমাদের আইন অনুযায়ী যে-কোনও সিরিয়ালকে সাবস্ট্যান্ডার্ড মনে করলে বন্ধ করতে পারি। সেটা হবে কিনা তা নির্ভর করছে তোমার আচরণের ওপর। যাও, বাইরে গিয়ে অপেক্ষা করো। সেক্রেটারি তোমাদের ডাকবেন।’ রতিকান্ত রিসিভার তুলে নিলেন কারও সঙ্গে কথা বলার জন্যে।

দেড়ঘণ্টা পরে ওরা ফিরে এল বঙ্গভবনে। ঘরে ঢোকামাত্র কুসুম সুদীপ্তকে জড়িয়ে ধরে সশব্দে চুমু খেল, ‘থ্যাঙ্ক ইউ। আমি আজই রাজধানী ধরব।’

সুদীপ্ত হাসল, ‘সেকি? সিমলায় যাওয়ার কথা ছিল না?’

‘দুটো হলে যেতাম। তা ছাড়া ওই ভদ্রলোককে কাটিয়ে দিলে কলকাতায় ফিরে গিয়ে বদনাম করবেন। যাই, তৈরি হই।’ কুসুম বেরিয়ে গেলেন।

নিচে নেমে ফোন করল সুদীপ্ত। মিসেস চৌধুরীর গলা পেয়ে বলল, ‘আপনাকে কী বলে যে ধন্যবাদ দেব? স্যাংশন লেটার পেয়ে গেছি!’

‘কীসের স্যাংশন লেটার?’

‘মেগাসিরিয়ালের।’

অবাক হল সুদীপ্ত, ‘আপনি বলেছিলেন ফোন করতে।’

‘আমি? আপনি ভুল করছেন।’

‘আপনি মিসেস চৌধুরী, মানে রতিকান্ত চৌধুরীর স্ত্রী নন?’

‘অবশ্যই। কিন্তু সুদীপ্ত নামে কাউকে আমি চিনি না ভাই।’

লাইন কেটে গেল। হতভম্ব সুদীপ্ত। এটা কী হল? তারপর একটু-একটু করে মিসেস চৌধুরীর আচরণের মানে তৈরি করে নিল। ভদ্রমহিলার ওপর শ্রদ্ধা জন্মাল তার মনে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *