নিস্তার নৌকো

নিস্তার নৌকো

দক্ষিণ খোলা বাড়িটা তৈরি করতে সুধাময়ের একটু বেশি খরচ পড়েছে। অধ্যাপকের পক্ষে কলকাতা শহরের ভাড়াটে বাড়িতে থেকে নিজে তদারকি করে বাড়ি বানানো অসম্ভব। সে কারণেই বন্ধুর পরিচিত কন্ট্রাক্টরের ওপর দায়িত্ব ছেড়ে দিতে হয়েছিল। প্রতি রবিবার খেয়েদেয়ে ভবানীপুর থেকে সল্টলেকে সুধাময় আর দয়মন্তী চলে আসত। ভিত খোঁড়া থেকে শুরু করে একটু-একটু করে বাড়িটা খাড়া হচ্ছে, বাড়ির আদল নিচ্ছে। শুরুর আগে যে দ্বিধা ছিল, অনিচ্ছা ছিল, সেটা কখন মরেহেজে একটা নেশার চেহারা নিয়ে সুধাময়কে প্রতি রবিবার এখানে টেনে আনত। দময়ন্তীর ইচ্ছেমতন বাড়ির প্লান অদলবদল হয়েছে। মেয়েদের যেমন হয়, চিরকাল ভাড়াবাড়িতে কাটিয়ে যেসব চাপা বিরক্তি থাকে সেগুলোকে দূরে হটিয়ে নিজের আশ-মতন। ঘরদোরগুলোর বিলিব্যবস্থা করে নিয়েছে সে। প্ল্যানটা পাশ করাতে সামান্য খরচা হয়েছে। এখন তো এমন অবস্থা যে বেঁচে থাকার জন্য প্রতি পায়ে ওটা করতেই হয়।

যেটুকু আইনে আটকায় সেটি ছাড়া সামনে কোনও জমি নেই, তারপরই রাস্তা। গেট খুলেই গ্যারেজের প্যাসেজ। সুধাময়ের গাড়ি নেই কোনওকালে, তবু ওটা করতে হয়েছে দময়ন্তীর চাপে। যখন দোতলা হবে এবং একতলায় ভাড়া দেওয়ার প্রসঙ্গ উঠবে তখন গ্যারেজ না থাকলে কোনও ভালো ভাড়াটে পাওয়া যাবে না। মেয়েদের বুদ্ধিসুদ্ধি কখন কীভাবে খালেদময়ন্তীকে না দেখলে সুধাময়ের অজানা থাকত। তিরিশ বছর ধরে দময়ন্তীকে দেখছে সুধাময়। সেই ছোট্ট নরম শরীর এবং বোকা-বোকা চাহনির মেয়েটি একটু-একটু করে কখন যে রাশভারী হল, শরীরে মেদ এসে মোহ সরিয়ে মর্যাদা এনে দিল! যেন এই পরিণতিতে পৌঁছবার জন্য দময়ন্তীর যাত্রা। শুরু। তিরিশ বছরের দময়ন্তী সুধাময়কে দুহাতে আগলে রেখেছে। বিয়ের পর ঝিয়ের খরচ বাঁচাতে নিজেই রাতদিন খেটেছে, মেয়েদের পড়িয়েছে। অভাবের সঙ্গে রীতিমতো মারামারি। করে সেটাকে দরজার বাইরে রেখেছে। তারপর যখন সুধাময়ের লেখা বইটার খুব নামডাক হল, কলেজের ছেলেমেয়েরা সেটাকে পরীক্ষা পাশের একমাত্র অবলম্বন করল তখন থেকে অবস্থা ফিরল। সেই নিয়মিত হিসেবের বাইরে আসা টাকা দময়ন্তীকে ভেতরে-ভেতরে নাড়াল। কোনওদিন কোনও চাহিদা ছিল না দময়ন্তীর। বিয়েতে পাওয়া জামাকাপড় কবে শেষ হয়েছে। সুধাময় জানে না, শাড়ি গয়না তিরিশ বছরে দময়ন্তী চায়নি সুধাময়ের কাছে। প্রয়োজনে কাপড় কেনার ব্যবস্থা নিজেই করত সে, সুধাময় সংসার নিয়ে বিব্রত হয়নি কখনও। সেই দময়ন্তী হঠাৎ নিজেই উদ্যোগী হয়ে কখন দরখাস্ত দাখিল করেছে এবং লটারিতে তিন কাঠা জমির মালিক। হয়েছে সুধাময় খেয়াল করেনি। টাকাটা দেওয়ার সময় সুধাময় অস্বস্তিতে স্ত্রীর দিকে তাকিয়েছিল। সুধাময়ের কাছে বাড়ি বানাবার কোনও যুক্তি নেই। এতদিন কষ্ট করে জমানো টাকাগুলো বাড়ির পেছনে ঢাললে চাকরির শেষের দিনগুলো চলবে কি করে? দময়ন্তী হিসেব করে দেখাল সুধাময়ের রিটায়ার করার মুখে কত টাকা জমবে এবং তার কতটা বাড়ির পেছনে যেতে। পারে। যদি দোতলা শেষ করা যায়, তাহলে সল্টলেকের যা চাহিদা বাড়বে তাতে একতলা ভাড়া সুধাময়ের মাইনের কাছাকাছি চলে যাবে। অসুবিধে হওয়ার কোনও কারণ নেই।

সুধাময়ের হিসেবে ভালো লাগছিল না, মোক্ষম প্রশ্নটি করল সে, কার জন্য বাড়ি বানাবে? সুধাময়ের বংশে বেশি দিন বাঁচার উদাহরণ নেই। তা ধরা যাক, এই ছাপ্পান্নর পর সে আরও বছর কুড়ি বাঁচতে পারে। আর দময়ন্তীর মেদবৃদ্ধির পর কতগুলো রোগ স্থায়ী বন্দোবস্ত করে নিয়েছে ওষুধের সঙ্গে। অতএব সেও কুড়ি বছরের বেশি আশা করতে পারে না। তারপর বাড়িটার কি। হবে? ছেলে নেই বলে কোনও আপশোস নেই, এবং ছেলে নেই বলে বাড়ি বানাবার। প্রয়োজনীয়তাও নেই। কয়েক মুহূর্ত থিতিয়ে ছিল দময়ন্তী। কিন্তু মেয়েরা একবার জেদি হলে যুক্তি পেতে ওদের কষ্ট হয় না। দময়ন্তী বোঝাল, পরে কি হবে তার জন্য আজ কেউ চিন্তা করে না। মরে যেতে হবে জেনেও নব্বই বছরের বৃদ্ধ শরীর সারাতে ওষুধ খায়। অতসীর জন্য রাখা যে টাকাটা ব্যাঙ্কে ফিকসড ডিপোজিট আছে সেটা পেতে আরও সাত বছর। সে সময়ের আগেও তো ওরা মারা যেতে পারে। অতএব যে কদিন আছে সে কদিন নিজেরাই ভোগ করে যাবে। দুটো দিন নিজের বাড়িতে হাত-পা খেলিয়ে বাঁচবে। তারপর যা হওয়ার হবে, মেয়েরা এসে ভোগ করুক।

সুধাময় দময়ন্তীকে মেয়েরা উচ্চারণ করতে শুনে চকিতে একবার দেখে নিলেন। দময়ন্তীর মেয়েরা হল মানসী আর অতসী। মানসী আছে আম্বালায়। সুখেন ওর স্বামী, দময়ন্তীর আদরের জামাই। ইঞ্জিনিয়ার। হ্যাঁ, সুখেন খুব ভদ্র এবং কর্তব্যজ্ঞান প্রচুর। ওদের মেয়েটাও হয়েছে ফুটফুটে। তা আম্বালা থেকে সল্টলেকে এসে কোনওকালে যে সুখেনরা বাস করবে এমন মনে হয় না। দ্বিতীয়টি অতসী। ঠিক এক বছর হল অতসী এ বাড়িতে ঢোকেনি। দময়ন্তী ঢুকতে। দেয়নি। এম-এ পাশ করা মেয়ে প্রেম করে বেজাতের একটা গ্র্যাজুয়েট ছেলেকে চট করে বিয়ে। করে ফেলল যার মাইনে চারশোর বেশিনয়–দময়ন্তী মানতে পারেনি। এ বাড়ির একটা নিয়মই ছিল, মানসী মায়ের অতসী বাপের, তা অতসী যে এত কাণ্ড করছে সুধাময় নিজেও টের পায়নি। অথচ খবরটা জানার পর দময়ন্তী ওকেই দায়ী করেছিল। প্রশ্রয়েই এটা সম্ভব। ত্যজ্য কন্যা কাকে বলে জানা নেই, মুখের ওপর মেয়ে-জামাইকে বলে দিয়েছিল দময়ন্তী, ওরা যখন নিজের ব্যবস্থা নিজেই করেছে তখন এই বাড়িতে যেন কখনও প্রবেশ না করে। অতসী কেঁদেছিল কিন্তু পায়ে পড়েনি। সুধাময় ইজিচেয়ারে বসে চুপচাপ দেখল সে মায়ের মতো ঘাড় তুলে গম্ভীরমুখে কথাগুলো শুনছিল। দময়ন্তী প্রণাম নেয়নি, ওরা যখন সুধাময়কে প্রণাম করে গেল তখন ভীষণ নিষ্ঠুর মনে হচ্ছিল স্ত্রীকে। দময়ন্তীর এই চেহারা সে আগে কখনও দেখেনি। সুধাময় নিজেও অতসীকে সমর্থন করতে পারছিল না অবশ্য। কলেজে পড়াতে গিয়ে ছেলেমেয়েদের প্রেম করতে দেখেছে, ক্লাসিক থেকে বর্তমানের গল্প-উপন্যাসে প্রেমের ছড়াছড়ি পড়ে তৃপ্ত হয়েছে। অথচ নিজের মেয়ের প্রেমকে সমর্থন করতে কোথায় বাধছিল। মানসীর বিয়ে হয়েছিল সম্বন্ধ করে, খরচ বেশি হয়নি তখন, সামর্থ্যও খুব একটা ছিল না। তবে দময়ন্তীর গয়নার অনেকটাই বেরিয়ে গিয়েছিল। সোনার দর ছিল তখন একশো আশি-নব্বই। অতসীর জন্য সোনা কিনব-কিনব করে দময়ন্তী পেরে উঠছিল না। তারপর নোটবই থেকে যখন থোক টাকা হাতে এল, সোনা তখন সোনার হরিণ লাফিয়ে সাত-আটশোতে চলে গেছে। ওর বিয়ের খরচ বাবদ টাকাটা ব্যাঙ্কে ফিকসড করে রাখা হয়েছে, যদি কখনও সোনার দর নেমে আসে! মেয়ে অবশ্য সে চিন্তা থেকে ওদের মুক্তি দিয়ে গেছে। দময়ন্তী হিসেব পালটে ফেলল। দোতলা করার সময় অতসীর নামে জমানো টাকাটা কাজে লাগাবে। ছেলে না থাক, একটা বাড়িকে যত্ন করে তৈরি করলে ছেলের। কাজ দেবে। বড় মেয়ে মানসী যেমন থাকতে আসছেনা, ছোট মেয়ে অতসীও তো প্রবেশাধিকার পাবে না। তাহলে ও বাড়িতে থাকবে কে? দময়ন্তী বোঝাল, আফটার জহরলাল হু? কিংবা ইন্দিরার পর কে? এসব প্রশ্নের উত্তর তৎক্ষণাৎ না পাওয়া গেলেও যেমন একসময় সময় এসে সব ঠিক করে দিয়েছে তখন এ নিয়ে ভাবনার কোনও কারণ নেই।

তৃতীয় প্রশ্নটা করতে পারেনি সুধাময়। যদি দময়ন্তী আগে মারা যায়, তাহলে সে একা-একা কি করে থাকবে? দময়ন্তী নেই অথচ ও বেঁচে আছে চিন্তা করা যায় না। আবার উলটোটাও হতে। পারে। তখন দময়ন্তী কি করবে? মেয়েদের উৎসাহ যখন আকাশ-ছোঁয়া হয় তখনসুধাময় ঠিক করল দময়ন্তীকে যখন সারা জীবনে কিছুই দেওয়া হয়নি তখন ওর এই সাধটা পূর্ণ করবে।

কিন্তু খরচটা বেশি হয়ে গেল। এখন সল্টলেকে তেমন বাড়িঘর ওঠেনি। দুটো রুটের বাস যাতায়াত করে। বাড়ি তৈরির পর আর একটি সদ্য ওঠা বাড়ির সঙ্গে হিসেব মিলিয়ে দেখা গেল প্রায় কুড়ি হাজারের মতো বেশি গেছে কন্ট্রাক্টরের পকেটে। যতই পরিচিত হোক, পৃথিবীতে বোধহয় সৎ মানুষের বড় অভাব। তবে এখন বাড়ি দেখলে চোখ জুড়িয়ে যায়। অতসীর নামের টাকাটা অবশ্য সময় পেরোবার আগেই ব্যাঙ্ক থেকে তুলতে হয়েছে এই সৌন্দর্য বাড়ানোর জন্য। নতুন রঙের গন্ধ, মোজায়েক করা মেঝে, দেওয়ালের রং আর পেছনের বাড়ি তৈরির সময় লাগানো গাছগুলোর ডাগর হয়ে বেড়ে ওঠা–সুধাময়কে বলল পথিবীতে যদি সুখ কোথাও থাকে তো এখানেই। অনেকদিন থেকে গৃহপ্রবেশের তোড়জোড় চলছিল। আম্বালায় চিঠি গেছে নিয়মিত। মানসীরা জানিয়েছে গৃহপ্রবেশের পরদিন ওরা উপস্থিত হবে। সুখেনের ছুটি পাওয়া অনেক কষ্টে সম্ভব হয়েছে। সঙ্গে-সঙ্গে দময়ন্তী ঠিক করলে গৃহপ্রবেশের দিন শুধু পুজোই হবে, খাওয়া-দাওয়া পরের রবিবার। অর্থাৎ মানসীকে বাদ দিয়ে কিছুনয়। লিস্ট হল, সুধাময়ের কলেজের বন্ধুবান্ধব, প্রকাশক আর আত্মীয়স্বজন। খাওয়াদাওয়াতে খরচ করাতে আপত্তি ছিল। সুধাময়ের। তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিল দময়ন্তী, এত বড় সুখ একা-একা ভোগ করব? সবার সঙ্গে না মিললে সুখের কোনও মানে হয়?

অতএব আজ ছাব্বিশে ফাল্গুন, বুধবার সকালে ওদের গৃহপ্রবেশ হল। টুকিটাকি জিনিস পর্যন্ত অবশ্য দময়ন্তী আগে থাকতে এই বাড়িতে তুলেছে। আজ ভাড়াটে বাড়ি চিরদিনের জন্য ছেড়ে এল। সকালে ট্যাক্সিতে উঠেই দময়ন্তী বলল, বাব্বা, এতদিন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। পরের বাড়িতে যে আর থাকতে হবে না এইটুকুই স্বস্তি। তোমার ওপরও ভরসাও করলে হত না।

সুধাময় হাসল। কথাটা সত্যি। দময়ন্তীর উদ্যোগ ছাড়া হত না। তিনটে শোওয়ার ঘর, একটা ডাইনিং স্পেস, বিরাট রান্নাঘর এবং সেখানে যাতে দক্ষিণের বাতাস ঢোকে সেটা লক্ষ ছিল। ভেতরের বারান্দার দিকের ঘরটা ওদের শোওয়ার ঘর, বাকি দুটো মানসীরা এসে অথবা অন্য কেউ অতিথি এলে ব্যবহার করবে। সবই দময়ন্তী ঠিকঠাক করছে। বাইরের ঘরটা ড্রইংরুম। বাঁকুড়ার পুতুল থেকে আরম্ভ করে শান্তিনিকেতনি দেওয়াল মাদুর দিয়ে আগেই সুন্দর করে। সাজিয়ে রেখেছিল ঘরটা। আজ ঘরে ঢুকে শেষ কথাটা বলল দময়ন্তী, দুটো জিনিস দরকার।

সুধাময় দেখছিল দরজার রঙটা এক জায়গায় সমান পড়েনি, বিরক্ত হয়ে জিজ্ঞাসা করল, কী?

একটা ছোট ফ্রিজ আর টিভি।

অবাক চোখে তাকাল সুধাময়। অবশ্যই জিনিস দুটো দরকার, কিন্তু এত খরচের পর দময়ন্তী একথা উচ্চারণ করল কী করে?

আমি এখনই কেনার কথা বলছি না। কিন্তু ফ্রিজ থাকলে তোমাকে রোজ বাজারে যেতে হবে না। ঠেলে-ঠেলে তো পাঠাতে হয়, তোমারই সুখ। আর সন্ধেবেলায় তো কিছু করার থাকবে না, তখন টিভি দেখে সময় কাটাবে। দময়ন্তী ভেবেছে বেশ।

হাসল সুধাময়, অনেকদিন পর রসিকতা করল, কেন, সন্ধেবেলায় তো এখানে কেউ দেখতে আসছে না, শিয়ালটিয়াল ডাকে, তোমার সঙ্গে চুটিয়ে প্রেম করব!

তিরিশ বছর আগের সেই মেয়েটার মতো চোখের মোচড় দিল দময়ন্তী, যাও, কত ক্ষমতা জানা আছে, দু-পা দৌড়লেই হাঁফাও! তা দুজনে মিলেই তো টিভি দেখব।

আজ সকাল থেকে এখানে আসার পর দময়ন্তীর চেহারাটা যেন পালটে গেছে। ঠিকে কাজের লোকের সঙ্গে সমানে ছুটোছুটি করছে, যে পুরুতটা পুজো করতে এসেছে তার সঙ্গে সমানে পাল্লা দিচ্ছে। বয়স যেন রাতারাতি থার্মোমিটারের পারার মতো নেমে এসেছে। সময়, দুশ্চিন্তা এবং রোগ মানুষকে উত্তপ্ত করে বয়সের পারদ বাড়িয়ে দেয়–এই রকমের সুখ এলে সেটা নেমে। আসতে পারে। প্রথম বা মধ্য যুবতীর মতো লাগছে দময়ন্তীকে। অনেকদিন পর ভোরে স্নান করে সিল্কের শাড়ি পরেছে, আজকাল তো রঙিন কিছু গায়ে ওঠাতই না। সে তুলনায় নবীন হতে পারছেনা সুধাময়। আনন্দ নিশ্চয়ই হচ্ছে কিন্তু কোথায় যেন খচখচ করে উঠছে মাঝে-মাঝে। নিজেকে দময়ন্তীর তুলনায় বৃদ্ধ বলে বোধ হচ্ছে।

আজ দময়ন্তী উপপাস করেছে। পুজো শেষ করে খাবে। বারণ করেছিল সুধাময়। প্রতিবেশী বলতে নতুন তৈরি বাড়ির মালিক একজন রিটায়ার্ড ডাক্তার। আলাপ হয়েছিল আগেই, একটু আগে তিনি ঘুরে গেলেন একবার। সুধাময় ভেতরের বারান্দায় ইজিচেয়ার পেতে বসেছিল। দময়ন্তী এক গ্লাস সরবত দিয়ে গেছে। আজ চা তৈরির ঝামেলা চায় না ও। বাড়িটার একটা নাম দেওয়া দরকার। বাতাস আসে বলে সুধাময় ভেবেছিল নাম দেবে বাতাস-বাড়ি। একদম পছন্দ হয়নি দময়ন্তীর। কী নাম দেওয়া যায় ভাবতে-ভাবতে সুধাময় ঠিক করল স্ত্রীর নামেই বাড়ির নাম থাকুক। চেঁচিয়ে স্ত্রীকে ডাকল সে। খিঁচিয়ে উঠে দময়ন্তী ছুটে এল, শুনে বলল, মরণ। পুরুতমশাই ওদিকে পুজো করছেন আর তোমার যত আদিখ্যেতা! একদম ডাকবে না আমাকে। গৃহপ্রবেশের পুজোএকদম ইয়ার্কি নয়।

এত বড় বাড়িতে ওরা দুই বৃদ্ধ থাকবে, তিরিশ বছর আগে না হয় অন্যরকম লাগত, এখন লোজন না হলে ভালো লাগে? অবশ্য মানসীরা কাল সকালে আসবে। কদিনের জন্য হলেও বাড়িটা জমবে। মানসীর কথা মনে হতেই সুধাময় অতসীর মুখটা দেখতে পেল। অতসী মানসীর মতো সুন্দরী নয় কিন্তু বড় গম্ভীর মেয়ে, ওকে ঠিক বুঝত। এক বছর কোনও খবর নেই। মেয়েটার। দময়ন্তী ঘুণাক্ষরে নাম করে না। এই যে আজ এত বড় আনন্দের দিন, মানসী আসছে। সেই আম্বালা থেকে, অথচ কাছেই মানিকতলা থেকে অতসী আসছে না। ওকে জানানোই হয়নি এই সুখের কথাটা। মনে-মনে অনেকবার ইচ্ছেটা নিশ্বাস নেওয়ার জন্য নাক তুলে ভুল করে ডুব দিয়েছে ফের–সুধাময়ের যাওয়া হয়নি কখনও। যদিও দময়ন্তী ওদের মুখের ওপর দরজা বন্ধ করে দিয়েছে তবু মেয়েটা তো একবার আসতে পারত। অন্ততপক্ষে ওর কলেজে গিয়ে দেখা করতে পারত। ছেলেবেলা থেকে যে অসম্ভব জেদের জন্য অতসী মায়ের কাছে মার খেত সেটা এখনও গেল না। মেয়েমানুষের এত জেদ ভালো নয়। সবাই বলে অতসী বাপের স্বভাব পেয়েছে, কিন্তু জেদটা তো একদম মায়ের কাছ থেকেই পাওয়া।

তবু এমন একটা হীনতা চারপাশ ছেয়ে ধেয়ে এল, সুধাময় ঠিক করল দময়ন্তী যাই বলুক না কেন, একদিন অতসীর সঙ্গে দেখা করে আসবে। যে মেয়েটাকে একটু-একটু করে বড় হতে দেখল, কাদার তালটাকে মানুষের ছাঁদে ফেলল, দুদিন আগে একটা ছেলে এসে তাকে কতটা পালটে দিতে পারে তা নিজের চোখে দেখে আসবে। মেয়ের প্রতি যে অভিমান এতটা কাল চারপাশে দেওয়াল রেখেছিল সেটাকে সরিয়ে দেওয়ার জন্যই যেন উঠে দাঁড়াল সুধাময়। সুখের কালে মানুষকে উদার হতে হয়। ঠিক সেই সময় ভেতর থেকে ডাক এল, হোম শুরু হচ্ছে। দময়ন্তী তাকে সঙ্গে পেতে চাইছে।

অবেলায় খাওয়া একদম সহ্য করতে পারে না দময়ন্তী। বিকেল নাগাদ অম্বল হয়ে গেল। সুধাময় অম্বল যাওয়ার ট্যাবলেট খাওয়াল তাকে। বাড়িতে ওষুধের একটা ছোটখাটো স্টক আছে। দুপুরে ঘুম হয়নি, শুয়েছিল কিন্তু দেরিতে খাওয়ার দরুনই হোক অথবা নতুন জায়গা বলেই হোক ঘুম। এল না। বিকেলটা ওরা বাগানে বসে কাটাল। চোখের সামনে সূর্য নিবতে-নিবতে অন্ধকারে মুখ। ডুবিয়ে সন্ধেটাকে টেনে আনল। সন্ধে রাত হবে। মানুষের সুখগুলো কেন সকালবেলায় আসে না? সারাটা দিন কেমন হেসেখেলে কাটানো যায় তাহলে।

এই যে এখন ওরা দুজনে মুখোমুখি বসে আছে, কথা হচ্ছে কম। আর কথাই বা কি! একটা দিনরাতের কাজের লোক দরকার। সল্টলেকে লোক পাওয়া যায় না। ভবানীপুরে বলে রেখেছে দময়ন্তী। বুড়ো মানুষও চলবে না, মেয়ে হলেই ভালো হয়। ছোঁকরা চাকর চুরিচামারি করবে। এখন সল্টলেক ফাঁকা, চোরদের সুবিধে খুব। বাচ্চা চাকরকে হাত করতে ওদের অসুবিধে হবে না। অল্পবয়সি মেয়ে রাখারও ঝামেলা। বাজারে পাঠালে কার সঙ্গে কি করবে, চাপ আসবে। বাড়ির ওপর। একমাত্র চল্লিশ পার হওয়া শক্তসমর্থ ঝি চাই। সুধাময় চুপচাপ শুনছিল। বছর পনেরো-কুড়ি আগে ঘরের মানুষের প্রতি সজাগ হয়ে যুবতী ঝি রাখত না দময়ন্তী, এখন চিন্তা বাইরের লোকের জন্য। হেসে ফেলল সে।

দময়ন্তী মুখ তুলল, হাসলে কেন?

এককালে ঝি রাখার সময় আমার কথা চিন্তা করে রাখতে না! সুধাময় স্মৃতি ধরল।

দময়ন্তীও হাসল, হ্যাঁ, এককালে। পুরুষমানুষের মন না মতি। তোমাদের বাবা বিশ্বাস করা যায় না।

এখন করো? সুধাময় স্ত্রীর দিকে তাকাল।

হুঁ। এখন তুমি তো শৈশব। শিশুর মতো সরল।

তিরিশ বছর আগে দুজনে এরকম নিভৃতে বসলে এ ধরনের কথা অবশ্যই হত না। আপশোস করে লাভ নেই। কারণ দময়ন্তী যখন বলল, কাল খুব ভোরে উঠতে হবে, মানসীদের ট্রেন হাওড়ায় পৌঁছচ্ছে ভোর-ভোর, ওরা নতুন বাড়ি চেনে না, ঠিকানা খুঁজে বাড়ি পাওয়া এখন সল্টলেকে খুব সহজ নয়, অতএব সুধাময়কে স্টেশনে যেতে হবে, কিন্তু কীভাবে যাওয়া যায় সেই চিন্তায় সে তখন এমন ব্যস্ত হয়ে পড়ল যে তিরিশ বছর আগের কথা আর খেয়াল থাকল না। অত ভোরে বাস ট্যাক্সি পাওয়া যাবে না। এক হয়, মিনিট পনেরো হেঁটে ভি আই পি রোড থেকে বাস। ধরা। সেটাই করতে হবে। ঠিক হল সুধাময় পাঁচটার আগেই বেরিয়ে যাবে। আজকাল সকাল বড় তাড়াতাড়ি হয়।

প্রথম রাত বলেই খাওয়া-দাওয়ার বেশি ঝামেলা করেনি দময়ন্তী। সুধাময় দুধ খায় অথচ এখানে সে ব্যবস্থা এখনও হয়নি। কৌটোর দুধ দিয়ে কাজ চালাতে হল। দময়ন্তী শোওয়ার আগে। প্রত্যেকটা ঘর ভালো করে দেখে সবকটা দরজায় তালা দিয়ে এল। সাবধানের মার নেই কিছু।

সুধাময় শুয়েছিল, বিছানায় ভারী শরীরটাকে ছেড়ে দিয়ে দময়ন্তী বলল, একটা বেড-সুইচের ব্যবস্থা করো। বারবার উঠতে ভালো লাগে না।

নতুন বাড়ি, পায়ে-পায়ে প্রয়োজনগুলোর কথা মনে ঠেকছে। সুধাময়েরও কিছু-কিছু পরিবর্তন দরকার। বুকসেলফটা ঠিক জায়গায় রাখা হয়নি। একটা নতুন লেখার টেবিল দরকার। দময়ন্তী উঠে বসে জামা খুলল। আটোসাঁটো হয়ে শুলে ঘুম আসে না। আপদগুলোকে পায়ের কাছে সরিয়ে রেখে ওর মশারির কথা মনে পড়ল। ভবানীপুরে এই ঝামেলাটা ছিল না। কিন্তু সল্টলেকের মশা চড়ুইপাখির মতো, মশারি না থাকলে কাল সকালে সমস্ত শরীরে গোদ হয়ে যাবে। স্বামীর দিকে তাকিয়ে মেজাজ রুক্ষ হয়ে গেল ওর। কেমন নিশ্চিন্তে শুয়ে পা দুটো ওপাশ এপাশ করছে। নিশ্চয়ই মশা কামড়াচ্ছে, তবু উঠে টাঙানোর চেষ্টা নেই। রাগে টং হয়ে দুমদাম করে উঠে মশারিটা খুলে ফ্রেম থেকে চারটে খুঁট টাঙিয়ে দিল হুকে। মশারিটা খুঁজে দেওয়ার প্রয়োজন নেই, যার দরকার সে করবে। খানিকবাদেই মনে হল প্রথম দিন আজ, আজ না হয় রাগারাগি নাই বা হল। মানুষটার স্বভাব যা তার বাইরে যাবে কী করে? তিরিশ বছর ধরে তো দেখছে দময়ন্তী। কথাটা মনে হতেই মশারিটা ভালো করে গুঁজে দিতে দিতে বলল, আমার মতো বউ পেয়েছিলে বলে বর্তে গেলে!

সুধাময় নিঃশব্দে স্ত্রীর আচরণ দেখছিল, ভঙ্গিগুলো খুব চেনা। খুব শিগগির ঝড় উঠবে ভাবছিল, তার বদলে এমন বাক্য শুনে অবাক হয়ে বলল, একদম সত্যি কথা।

ঢং! বলে দময়ন্তী ওর পাশে শুয়ে পড়ল। বিবাহিত জীবনের প্রতিটি রাত, শুধু দময়ন্তীর মা হওয়ার দিনগুলো ছাড়া ওরা আলাদা শোয়নি। সুধাময়ের একটা পরিচিত ভঙ্গি আছে শোওয়ার, দময়ন্তীর পাশ ফিরে থাকা জর ওপর পা তুলে পাশবালিশের মতো ব্যবহার করে ওর চুলের ঘ্রাণ নিতে-নিতে কখন ঘুম এসে যায়। এত বছরে দময়ন্তীরও এই ভঙ্গিটা অভ্যাস হয়ে গেছে। যৌবন চলে গেছে অনেকদিন, শরীর আর অন্য প্রয়োজনের কথা ভাবে না। কোন শৈশবে সুধাময় যেমনটি মায়ের পাশে শুয়ে থাকত জড়িয়ে মিশিয়ে, জীবনের এই শেষ অপরাহ্নে এই আরামটুকু ছাড়া ঘুম আসতে চায় না। দময়ন্তীর সঙ্গে ওর অনেক বিষয়ে মেলে না, প্রায়ই ঝগড়া হয়, মুখ। খিঁচিয়ে দময়ন্তী ওকে কথা শোনায়, কাটা-কাটা কথা বলে স্ত্রীকে বিদ্ধ করতে তখন সুধাময়ের আটকায় না, কিন্তু রাতের শোওয়ার সময় এই আশ্রয়টুকু তার চাই। সুধাময় জানে দময়ন্তী তার রক্তে মিশে গেছে। আজ সারাদিনের খাটুনিতে দময়ন্তীর শরীর খুব দ্রুত শিথিল হয়ে আসছিল। ফিসফিস করে সুধাময় জিজ্ঞাসা করল, তুমি খুশিদুমু? জড়ানো গলায় স্বামীর বুকের ওপর মুখটাকে সরিয়ে এনে দময়ন্তী সুখের জানান দিল।

অনেক রাতে ঘুম ভেঙে গেল সুধাময়ের। দময়ন্তী ডাকছে। নতুন জায়গা, চোরটোর আসতে পারে, দ্রুত উঠে স্ত্রী দিকে তাকাল সে। মেঝেতে দাঁড়িয়ে আছে দময়ন্তী, ওকে বসতে দেখে বলল, বাথরুমে যাব, একটু দাঁড়াবে চলো।

চট করে মেজাজ তিরিক্ষি হয়ে গেল সুধাময়ের, আচ্ছা জ্বালা তো, বুড়ো হয়ে মরতে চললে তবু বাচ্চাদের মতো ভয় গেল না। দরজা খুলেই বাথরুম, যেতে হয় যাও আমি দাঁড়াতে পারব না।

দময়ন্তী তবু দাঁড়িয়ে, চলো না।

আঃ, ঘুমটাকে নষ্ট করো না তো। এখানে আরশুলা কিংবা ভূত নেই। যত্ত ছেলেমানুষি! সুধাময় আবার শুয়ে পড়ল। দরজা খোলার শব্দ হল, দময়ন্তী বাথরুমে চলে গেল। কখন আবার ফিরেছে ও, বিছানায় শুয়েছে টের পায়নি সুধাময়। হঠাৎ উঃ-আঃশব্দে ঘুমটা চটে গেল। চোখ মেলে দেখল ঘর অন্ধকার, দময়ন্তী ছটফট করছে। দ্রুত বিছানা থেকে নেমে আলো জ্বালল সুধাময়। দময়ন্তীর দুটো হাত বুকের ওপর, কপালে ঘাম। ঝুঁকে পড়ে সে জিজ্ঞাসা করল, কী হয়েছে, অমন করছ কেন?

বুকটা কেমন করছে। দময়ন্তী দাঁতে দাঁতে চাপল।

দু-এক মুহূর্ত তাকিয়ে সুধাময় মাথা নাড়ল, অম্বল উইন্ড ওপরে ঠেলেছে। এত করে বললাম উপোস করো না, সেই অবেলায় খেয়ে এখন মাঝরাত্তিরে ঝামেলা। যা সয় তাই করো। গজগজ। করতে-করতে টেবিলের ওপর রাখা ওষুধের বাক্স খুলে জোয়ানের আরকের শিশিটা বের করল। সে। চাপা দিয়ে রাখা গেলাসের জলে ঢেলে দময়ন্তীর কাছে এগিয়ে এসে সুধাময় বলল, নাও। এটা গেলো।

দময়ন্তী বড়-বড় চোখে ওর দিকে তাকাল। ঠোঁট দুটো থরথর করে কাঁপছে, বুকের ওঠানামা আর হাত দুটোকে মুষ্টিবদ্ধ দেখল সুধাময় এবং এই প্রথম সে ভয় পেল। স্ত্রীর মাথার পাশে বসে ঝুঁকে পড়ে দুবার নাম ধরে ডাকল। দময়ন্তী তাকিয়ে আছে, কথা বলছে না। মুহূর্তে সমস্ত শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল সুধাময়ের। এটা তো সাধারণ অম্বল নয়। কী করা যায়। দ্রুত গেলাসটাকে রেখে স্ত্রীর ওপর হুমড়ি খেয়ে বুকে ম্যাসেজ করতে চেষ্টা করে বুঝতে পারল এতে কোনও লাভ হবে না। এখন যেমন করেই হোক একজন ডাক্তার আনা দরকার। সল্টলেকে এত রাত্রে ডাক্তার প্রতিবেশী ভদ্রলোকের কথা মনে পড়ল ওর। কিন্তু ভদ্রলোক প্র্যাকটিস করেন না, তবু ডাক্তার। তো। কিন্তু ডাকতে গেলে দময়ন্তীকে একা ফেলে যেতে হয়। এসব চিন্তা করার সময় নেই এখন। সুধাময় দরজা খুলে বাইরে বেরুতে যেতে ডাইনিং রুমের দরজায় হোঁচট খেল। জায়গাটা অন্ধকার, আলো জ্বেলে দেখল বাইরের ঘরে ঢোকার দরজায় তালা দেওয়া। অতিরিক্ত সর্তক। হয়েছিল দময়ন্তী। এখন আশেপাশে তাকিয়ে, ডাইনিং টেবিলের ওপর কোথাও চাবিটাকে খুঁজে পেল না সুধাময়। দৌড়ে ঘরে ফিরে এসে স্ত্রীকে ডাকল সে। দময়ন্তীর তখন কথা বলার মতো অবস্থা নেই। অসহায় হয়ে কয়েক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে রইল সুধাময়। নিজের বাড়ির ভেতর বন্দি হয়ে রয়েছে সে। এমন মেয়ে, চাবিটা যে সুধাময়ের প্রয়োজন হতে পারে তা খেয়াল করবে না। কখনও। তালাগুলো খুব মজবুত দেখেকিনেছিল সুধাময়। ওগুলোকে ভাঙার চেষ্টা করা বৃথা। জমাদারের আসার পথটা মনে হতেই বাথরুমের ছুটল সে। ল্যাট্রিনের পেছনের দরজায় ভেতর থেকে খিল এবং শেকল তোলা। ছোট্ট একটা টিনের তালা আছে অবশ্য, তবে সেটা ভেঙে ফেলতে অসুবিধা হল না ওর। ছোট্ট প্যাসেজ দিয়ে গ্যারেজের পাশ কাটিয়ে গেটে এসে গেল সুধাময়। দরজাটা খোলাই থাকল, সেদিকে নজর দেওয়ার সময় নেই এখন। গেটটা ছোট, তালা দেওয়া হয়নি, তাই সহজেই ডিঙিয়ে যাওয়া যায়।

এখন কত রাত কে জানে! বেশ হাওয়া দিচ্ছে। তামাম সল্টলেকে কোনও মানুষের সাড়াশব্দ নেই। ভবানীপুরে সিগারেটের দোকান সারারাত খোলা থাকে। বাড়িঘর হয়নি, মানুষ নেই এখানে। সুধাময় যতটা পারে দৌড়ে-দৌড়ে ডাক্তারের বাড়ির সামনে এল। সমস্ত বাড়ি অন্ধকার। লম্বা মাথা গেটে তালা ঝুলছে। প্রায় আধঘন্টা চেঁচামেরি পর ভদ্রলোককে পেল সুধাময়। ব্যাপারটা বুঝিয়ে ওঁকে আসতে আরও কিছু সময় ব্যয় হল। বাথরুমের দরজা দিয়ে ভদ্রলোককে যখন দময়ন্তীর কাছে পৌঁছালেন তখন তিনি রীতিমতো নার্ভাস। বোঝা যায় প্র্যাকটিস ছাড়ার পর সাধারণ বৃদ্ধের সঙ্গে ওঁর কোনও তফাত নেই। তবু দময়ন্তীকে পরীক্ষা করে ডাক্তার সুধাময়কে বললেন, ওঁকে এখনই হাসপাতালে দেওয়া দরকার।

হাসপাতাল। সুধাময় কিছুই ভাবতে পারছিল না। সল্টলেকের এই উপান্তে কোনও গাড়িঘোড়া নেই। কোন বাড়িতে আছে কে জানে! যদি সম্ভব হত দময়ন্তীকে কাঁধে করে নিয়ে যেত সে। প্রায় ভিক্ষে চাওয়ার ভঙ্গিতে সুধাময় বলল, সকাল অবধি কোনওরকমে রাখা যায় না ডক্টর?

একটু স্বাভাবিক হয়ে গেছেন ভদ্রলোক, ব্যাগ খুলে ইঞ্জেকশন দিলেন। বড্ড দেরি হয়ে গিয়েছে, হার্ট খারাপ ছিল?

কইনা তো! সুধাময় দময়ন্তীর অনেক অসুখের মধ্যে এটা মনে করতে পারল না।

আধঘণ্টা বাদে ভোর চারটে বেজে বাইশ মিনিটে দময়ন্তী চলে গেল। যাওয়ার আগে কোনও কথা বলেনি, বলার মতো ক্ষমতা ফিরে পায়নি।

সুধাময় বাবু হয়ে বসেছিল দময়ন্তীর মাথার পাশে। ডাক্তার ভদ্রলোক ভোর হওয়া অবধি অপেক্ষা করলেন। কিছু কথা যা এই অবস্থায় বলা উচিত বলেছিলেন, শেষতম পথিবীটা কার, সবাই আমার আমার বলে চেঁচাই, কিন্তু এটা যে ছেড়ে চলে যেতে হবে আমরা জানি না। আপনার স্ত্রী সাধ মিটিয়ে বাড়ি করলেন, ভোগ করতে পারলেন না। সুধাবাবু, তার চেয়ে সব সময় যাওয়ার জন্য তৈরি থাকাই ভালো, তাতে কষ্ট হয় না। এখানে বেড়াতে এসেছিলেন ভাবলেই ভালো। তা কাউকে খবর দিতে হবে কিনা বলুন?

সুধাময় ঘাড় নেড়েছিল। একটু বাদেই মানসীরা এসে পড়বে। যা কারার ওরাই করবে। ডাক্তার আবার আসবেন বলে চলে গেলেন।

সুধাময় স্ত্রীর দিকে তাকাল। ভোরবেলায় দময়ন্তী এইরকম ভঙ্গিতে ঘুমিয়ে থাকে। ঠোঁট সামান্য ফাঁক, দাঁত চিকচিক করে, মুখের চেহারায় শ্রী আনে বেশ। এই নতুন বাড়িতে ভোর রাতের। নির্জনে সুধাময় স্থবিরের মতো বসে-বসে স্ত্রীকে দেখছিল। আঙুল তুলে দময়ন্তীর গালের ওপর রাখল সে, এখনও গরম। চোখের পাতায় চুমু খেতে বড় ভালো লাগত প্রথম যৌবনে। এখন এ। মুখে হাঁসের পায়ের ছাপের মতো বয়স দাগ ফেলেছে প্রচুর। তবু সেগুলো বড় আদরের। বুকের ভেতর হাঁসফাঁস শুরু হল সুধাময়ের দুহাত দিয়ে দময়ন্তীকে জড়িয়ে ধরতেই শরীর মোচড় দিয়ে উঠল। কিন্তু কান্না আসছে না কিছুতেই, সুধাময় গলা তুলে চেঁচিয়ে কাঁদতে পারছে না। সমস্ত। শরীর থরথর করে কাঁপছে ওর। তারপর এক সময় দময়ন্তীর কপালের ওপর শীতল হাত রেখে পাথরের মতো বসে রইল সে।

ওরা এল। এর মধ্যে কখন বেলা গড়িয়েছে, চারধার রোদে রোদ। ডাকাডাকি করে সাড়া পায়নি মানসীরা। ডাক্তার বোধহয় নজর রেখেছিলেন, বাথরুমের দরজাটা তিনিই চিনিয়ে দিলেন। আর তার পরেই কান্নাটা আছড়ে পড়ল ঘরে। দু-রাত ট্রেন-জার্নি করে এসে মানসী মায়ের বুকে আছড়ে পড়ে কাঁদছে। সুখেন হতভম্ব। বাচ্চাটা মুখে হাত দিয়ে দাদুকে দেখছে। এই প্রথম হুস। হল সুধাময়ের। এই কান্না ওর হুস ফিরিয়ে আনল। কী করে হল, কেন হল, এই সব প্রশ্নের উত্তর এই মুহূর্তে ওকে দিতে হচ্ছে না কিন্তু মানসীর পাগলের মতো আকুলিবিকুলি দেখেও কান্না আসছে না। সুখেন স্ত্রীকে সামলাল। মেয়েরা বোধহয় খুব দ্রুত শোক সামলাতে পারে। খানিক বাদে মানসী বাবার পাশে এসে দাঁড়াল, বাবা–!

সুধাময় মুখ তুলে তাকাল। মোটা হয়েছে মানসী এবং ওর তাকানোটা ঠিক দময়ন্তীর মতো।

একি হল বাবা। কান্নাচাপা গলায় বলল মানসী।

চোখ বন্ধ করল সুধাময় চলে গেল। আমি এখন কী করব।

মানসী বাপের বুকে হাত রাখল, তুমি ভেব না, মা নেই কিন্তু আমি আছি।

তুমি আছ? সুধাময় চোখ খুলে দময়ন্তীকে দেখল, কিন্তু ও নেই, আমি থাকব কি করে?

সুখেন সবাইকে খবর দিল। সমস্ত বাড়ি ভরতি লোক এখন। যারা গৃহপ্রবেশের নেমন্তন্ন খেতে আসত তারাই এসে বাড়ি ভরিয়েছে। সেই রাত থেকে একঠায় হয়ে বসে আছে সুধাময়, বাথরুম। করতেও ওঠেনি। কিন্তু দুপুর নাগাদ ওকে ওঠাতে চাইল সবাই। আর দেরি করা যায় না।

এ ঘরের জানলা দিয়ে খোলা আকাশ, সামনের মাঠ আর রাস্তা পরিষ্কার দেখা যায়। ছোট্ট দলটা দময়ন্তীকে কাঁধে নিয়ে চলে গেল একটু আগে। হরিধ্বনি উঠছে মাঝে-মাঝে। সুধাময়ের অবস্থা। দেখে ওকে শ্মশানে নিয়ে যেতে চায়নি সুখেন। মুখাগ্নি সে-ই করবে। মাকে তিরিশ বছরের। পুরোনো বেনারসিতে সাজিয়ে দিয়েছে মানসী। মাথায় সিঁদুর মেখে পূর্ণ সুখের চেহারা নিয়ে দময়ন্তী চলে যাচ্ছে। ঘাড় তুলে জানলা দিয়ে ওদের যাওয়া দেখল সুধাময়।

এই সময় মানসী ঘরে ঢুকল, বাবা ওঠো, হাত-মুখ ধোবে চলো। মেয়ের দিকে তাকিয়ে সুধাময় উঠল। সমস্ত ঘর জুড়ে দময়ন্তী। কিন্তু সুধাময়ের বুক ফাঁকা চোখ শূন্য। কিছুই দেখতে পাচ্ছে না। সে। মানসী স্থির নেই, ডুকরে-ডুকরে উঠছে মাঝে-মাঝে। ওর মেয়েটাকে ডাক্তার তাঁদের বাড়িতে নিয়ে গেছেন। মুখ-চোখ ধুতে সাহায্য করল মানসী। বাবাকে বাইরের বারান্দায় বসিয়ে চায়ের। জোগাড় করতে গেল সেই অবস্থায়।

রোদে সল্টলেক পুড়ছে। বাতাস বইছে গরম হয়ে। সুধাময় মনে-মনে বলল, সেরকমটাই হল, যেরকমটা তার আশঙ্কা হয়েছিল। এত সহজে যদি মানুষ মরে যেতে পারে তবে পৃথিবীতে এত সমস্যা কেন? সুধাময় কেন চট করে মরতে পারছে না? আর এই সময় সেই হারটার কথা মনে পড়ল ওর। চিষ্কার করে মানসীকে ডাকল সুধাময়।

মেয়ে ছুটে বাইরে এলে কিছুক্ষণ কথা বলতে পারল না সুধাময়। হাঁপটা কমতে বলে উঠল চেঁচিয়ে, তাড়াতাড়ি আলমারি খোল। লকারে ছোট্ট গোল ভেলভেটের বাক্স আছে, সেইটে নিয়ে এসো।

মানসী বুঝতে না পেরে বলল, কেন?

ধমকে উঠল সুধাময়, আঃ, যা বলছি করো।

চাবি? মানসী অবাক হচ্ছিল।

আলমারির ওপরেই আছে। বলেই মনে পড়ল কাল রাতের কথা। আলমারির মাথায় আর বালিশের তলায়–দময়ন্তীর চাবি রাখার এই প্রিয় দুটো জায়গার কথা কাল রাতে একদম খেয়াল ছিল না। সকালে সুখেন বালিশের তলায় চাবিটা পেয়েছে। মানসী বাক্স এনে দিলে সুধাময় হারটা বের করে দেখল। খুবই পাতলা অল্প সোনার হার। তিরিশ বছর আগের অল্প টাকার চাকুরে। সুধাময় ফুলশয্যার রাতে দময়ন্তীকে উপহার দিয়েছিল হারটা। এই গরিব দেখতে হারটা দময়ন্তীর বড় প্রিয় জিনিস। বলত, আমি যদি আগে মরি তাহলে এই হারটা আমার গলায় পরিয়ে দিও শ্মশানে যাওয়ার সময়।

সুধাময় বাক্সটাকে হাতে নিয়ে ভেতরে ঢুকে পাজামার ওপরেই শার্ট পরে নিল। মানসী জিজ্ঞাসা করল, কোথায় যাচ্ছ?

সুধাময় যেতে-যেতে উত্তর দিল, তোমার মায়ের কাছে। এই জিনিস ওর পরে যাওয়ার কথা ছিল। মানসী বাধা দিতে গিয়ে চুপ করে গেল। কাঠফাটা রোদে প্রায় দৌড়ে যাওয়া বৃদ্ধের দিকে তাকিয়ে একবার কেঁদে উঠল সে।

পক্ষীকুঞ্জ ছাড়িয়ে অনেকটা এগিয়ে এসেও ওদের চোখে পড়ল না। ঘোরের মাথায় হেঁটে এসে রোদ্দুরে গিয়ে সুধাময়ের মাথা ঘুরতে লাগল। ওপাশ থেকে আসা একটা সাইকেলওয়ালাকে। জিজ্ঞাসা করে জানল–মাথায় করে নয়, একটা টেম্পোতে মৃতদেহ নিয়ে কয়েকজনকে যেতে দেখেছে সে। তাহলে কি ওরা মাঝপথে টেম্পো ধরে নিয়ে গেল দময়ন্তীকে? এখান থেকে। নিমতলা অনেক দূর। টেম্পোতে অবশ্যই ওদের সুবিধে হবে। কিন্তু সুধাময় এখন কি করবে? কোনও বাস সরাসরি নিমতলায় যায় না। শরীর কাঁপছে, পা চলছে না। এই সময় ন-নম্বর বাসটাকে দেখতে পাওয়া গেল। ভরদুপুরে সল্টলেকে যাত্রী নেই। দুহাত বাড়িয়ে সেটাকে থামিয়ে। উঠে বসল সে। মানিকতলায় বাসটার শেষ, নেমে প্রথমে কি করবে ভাবতে গিয়ে অতসীর কথা। মনে পড়ে গেল সুধাময়ের। বেচারা জানে না ওর মা মরে গিয়েছে। অতসী নামটা তোদময়ন্তীরই দেওয়া। কোনওদিন আসা হয়নি কিন্তু রাস্তা খুঁজে পেতে অসুবিধা হল না। জীবদ্দশায় যা হওয়ার হোক, মরে যাওয়ার পর মানুষের শরীরে ক্রোধ কিংবা অভিমান থাকে না। মানিকতলায় এসে অতসীকে খবরটা না দিলে বড় পাপ হয়ে যাবে। একটু দেরি হবে হয়তো কিন্তু শ্মশানে গিয়েই তো দাহ করা যায় না। মাকে শেষবার যেন দেখতে পায় অতসী। সুধাময় নির্দিষ্ট নম্বরে কড়া নাড়ল। বেশ খানিক বাদে ভেতর থেকে সাড়া এল, কে? এত জোরে কড়া নাড়ে কে?

সুধাময় দেখল একজন ঝি মতন বুড়ি জানলা খুলে তাকে দেখছে। অতসীরা কি এ বাড়িতে থাকে? সুধাময়ের গলা শুকিয়ে কাঠ।

হ্যাঁ, কী চাই?

একটু ডেকে দাও।

ডাকব কী করে? সে তো হাসপাতালে।

হাসপাতালে? কেন? আবার চমক সহ্য হচ্ছিল না সুধাময়ের।

বাচ্চা হয়েছে, পরশু দিন। কে গা তুমি?

পরিচয় দিতে গিয়ে থেমে গেল সুধাময়, কোন হাসপাতালে?

নীলরতন না কি বলে। শ্যালদার পাশে।

চুপচাপ চলে এল সুধাময়। অতসী–অতুর বাচ্চা হয়েছে। সেই ছোট্ট মেয়েটা গুড়গুড় করে হাঁটত, যার গায়ের ঘাম-গন্ধ এখনও সুধাময় নাক টানলে পায়, তারও বাচ্চা হয়ে গেল! কে গো। তুমি–ঝি-এর প্রশ্নটার উত্তরে সুধাময় যদি পরিচয় দিত তাহলে কি ও বলে উঠত, কেমন বাপ গো, মেয়ের খবর রাখো না!

মানিকতলার মোড়ে এসে কিছুক্ষণ দাঁড়াল সুধাময়। চোখের সামনে সব সাদা লাগছে কেন? এতক্ষণ ওরা নিশ্চয় শ্মশানে পৌঁছে তোড়জোড় শুরু করে দিয়েছে। সেখানে পৌঁছে যদি দ্যাখে আগুন লেগেছে শরীরে, তাহলে কেঁপে উঠল সুধাময়। না, সে দৃশ্য কিছুতেই সহ্য করতে পারবে না। তিরিশ বছর ধরে যে শরীরটায় মুখ ডুবিয়ে একটু-একটু করে তার পরিবর্তন দেখেছে, আজ সেটাকে বিকৃত হতে দেখতে পারবে না। অনেকক্ষণ রকে বসে পাথর হয়ে থাকল সে। তারপর উঠে শ্লথ পায়ে ন-নম্বরের দিকে এগোতেই খালি ট্রামটা চোখে পড়ল।

সুধাময় হাসপাতালের সামনে নেমে দেখল বিকেলের ছায়ামাখা রোদে প্রচুর মানুষ গেটে ভিড় করেছে। ভিজিটিং আওয়ার্স শুরু হতেই সে ভেতরে ঢুকে পড়ল। চেনে না, কোনওদিন আসেনি। জিজ্ঞাসা করে-করে মেটানিৰ্টি ওয়ার্ডে পৌঁছে গেল সে। খুঁজে-খুঁজে হয়রান হয়ে গেল সুধাময়। কেবিনগুলোতে নেই অতসী। আবার এনকোয়ারিতে গিয়ে খোঁজ নেওয়ার কথা ভাবতে-ভাবতে এগোচ্ছে এমন সময় চিৎকারটা কানে এল, বাবা!

মুখ ঘুরিয়ে বাঁদিকের দরজা দিয়ে বিরাট হলঘরটার দিকে তাকাল সুধাময়। অনেক খাট পাশাপাশি। একটা খাটের ওপর বাবু হয়ে বসে ওটা কে? অতসী নাকি? পায়ে-পায়ে কাছে আসতেই চমকে উঠল সুধাময়, অতসী যেন সেই ছোট্ট মেয়েটি হয়ে গিয়েছে। গায়ের জামাকাপড় ঢলঢলে, শরীর রোগা।

বাবা, তুমি এখানে? কী চেহারা হয়েছে– নিজের কথাটা মেয়ের মুখে শুনতে পেল সুধাময়। অতসী তখন বিছানা থেকে আস্তে-আস্তে নামছে। বিছানার এক পাশে টুল থেকে ছোট জামাই উঠে দাঁড়াতে দেখল বাচ্চা মেয়ের মতো অতসী বাবার হাত ধরল,  কে খবর দিল বাবা?

ভগবান। ফিসফিস করে বলল সুধাময়।

তুমি–তুমি, আমি জানতাম, একদিন তুমি আসবে। অভিমান ঝুরুঝুরু ঝরছিল অতসীর গলায়।

তুই আসতে পারলি না! প্রথম কথা বলল সুধাময়।

জামাই এসে টুলটা এগিয়ে দিল, বসুন।

ঘাড় নাড়ল সুধাময়। তারপর পাশের ছোট্ট খাটটার দিকে তাকাল। দুদিনের কচি মুখ এখন বেঘোরে ঘুমুচ্ছে। ফরসা, একমাথা কোঁকড়া চুল। ঠিক এইরকম ছিল অতসী। এই শরীরটা। একদিন তিল-তিল করে বড় হবে, সুখ পাবে, দুঃখ পাবে এবং একদিন দুঃখ দিয়ে দময়ন্তীর মতো চলে যাবে। পকেট থেকে ভেলভেটের বাক্সটা বের করে হারটা শিশুর গলায় পরিয়ে দিতে গিয়ে। আড়ষ্ট হয়ে গেল সুধাময়। এখন তার অশৌচ চলছে। এই মুহূর্তে সেই শরীরটা হয়তো দগ্ধ হয়ে গেছে। এখন কি ওকে ছোঁওয়া উচিত? হারটা মেয়ের হাতে দিল সুধাময়, ওটা ওকে পরিয়ে। দিস।

হাসিমুখে হারটা নিয়ে অতসী বলে উঠল, আরে, এটা তো মায়ের হার! মা পাঠিয়ে দিল বুঝি? ঠোঁট চেপে ঘাড় নাড়ল সুধাময়। তৃপ্ত চোখে স্বামীর দিকে তাকিয়ে ওটা শিশুর গলায় পরিয়ে দিল অতসী। সেই মুহূর্তে নড়ে উঠল শিশু, হাত-পা ছোঁড়ার চেষ্টা করে ঘুমন্ত হাসল। সেদিকে চেয়ে অতসী বলে উঠল, দ্যাখো-দ্যাখো বাবা, আমরা দুজন বলাবলি করছিলাম, তুমি দ্যাখো হাসলে একদম ওকে তোমার মতো দেখায়।

খাটের বাজু নেই, মেয়েকে ধরে নিজেকে সামলে নেওয়ার চেষ্টা করে থরথর করে কেঁপে উঠল সুধাময়। আর কী আশ্চর্য, কাল রাতের পর থেকে এই প্রথম, সমস্ত শরীর থেকে তেড়েফুঁড়ে জলগুলো ছুটে এল চোখের বাইরে।

সুধাময় কাঁদতে লাগল শিশুর মতন। তারপর জড়ানো গলায় বলল, ভুল দেখছিস। ও তোর মায়ের মতন হবে। তাহলে দেখবি কোনওদিন কষ্ট পাবে না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *