কালো পাখির ডানা

ধর্মপাশা থানার বিরমপাশা গ্রামের কিশোরী সোনালী হাজং একদিন তুমুল বৃষ্টির রাতে বারিধারা ডিপ্লোম্যাটিক জোনের জাতিসংঘ সড়কে অবস্থিত সুরম্য ও সুরক্ষিত ভবনের তিন তলার ঝুলন্ত বারান্দা থেকে নিচে পড়ে গেলে তার হালকা, শীর্ণ ও কালো শরীরটা পিচঢালা রাজপথে বৃষ্টির পানির সঙ্গে বেমালুম মিশে যায়। এর আগে ওই ঝুলন্ত বারান্দায় দাঁড়িয়ে সে কত দিন ভেবেছে, এই শহরের বৃষ্টি তার বিরমপাশার দীর্ঘ খরার পরে আসা উদ্বেলিত বৃষ্টির মতো কেন নয়, যে ফেটে চৌচির হয়ে যাওয়া মাটি তা শুষে নিয়ে আদিবাসী যুবতীর সুঠাম শরীরের মতো সতেজ আর টান টান হয়ে উঠবে। এই শহরের বৃষ্টিতে সেই পাগল করা সোঁদা গন্ধও নেই যে গন্ধে মাতোয়ারা হয়ে বিরমপাশার সমস্ত ব্যাঙ, কীট, কেঁচো আর সাপ সঙ্গীর খোঁজে পথে নেমে আসবে আর তাদের ঝিঁঝি ঘ্যাঙ ঘ্যাঙ থপ থপ শব্দে তালা লেগে আসবে কানে। এই ঢাকা শহরে, যেখানে হলুদ আলোয় কালো গোখরার মতো শুয়ে থাকা রাজপথে বৃষ্টির পানিতে থইথই ভাসে পলিথিন ব্যাগ, সিগারেটের টুকরো, ছেঁড়া কাগজ আর গাড়ির মবিল; পথচারীর বিরক্তি, রিকশাওয়ালার দাপট আর ম্যানহোলের মুখ দিয়ে গলগল বেরিয়ে আসা কালো দুর্গন্ধ যেখানে বর্ষার সঙ্গী—সেখানে সোনালী হাজংয়ের পলকা কালো ছোট্ট শরীরটা সেই সব আবর্জনার মতোই কোথায় যে মিশে যায় তা আর খুঁজে পাওয়া যায় না।
ভাগ্যিস, শহরের সবচেয়ে নিরাপদ আর সুরক্ষিত সড়ক বলেই চারদিকে উত্সুক জনতার ভিড় জমে যায়নি। মেমসাহেব তাঁর মেয়েকে নিয়ে গেছেন পাঁচতারা হোটেলে ফ্যাশন শো দেখতে; ডিনার সেরে ফিরতে রাত দুটো নিশ্চয় বেজে যাবে। আর উর্দি পরা দারোয়ান ভারী কালো রেইনকোটে আপাদমস্তক ঢেকে গেটের ধারে ছোট্ট বাক্সের মতো ঘরে বসে যে কী করছিল তা মেমসাহেবের গড-ই কেবল বলতে পারবেন। ফলে সোনালী চিত হয়ে দুই চোখ মেলে মুখ হাঁ করে বৃষ্টির পানি গিলছিল আর তারাহীন আকাশের দিকে চেয়ে বিরমপাশায় ফেলে আসা মা বিনোদিনী হাজং, বাবা থকসং হাজং আর নাম ভুলে যাওয়া ছোট ভাইটিকে স্বপ্নে দেখছিল।
তাদের বিরমপাশা গ্রামে ঢুকতেই বিস্তীর্ণ ধানখেত। বাবার কাছে শুনেছে এককালে—সে বহুদিন আগের কথা, তার দাদা কি পরদাদার আমলে এই ধানখেত তাদেরই ছিল যা এখন আর তাদের নয়। এখন তার বাবা থকসং হাজং আর আরও সব হাজং সেই সব জমিতে কামলা খাটে। কাঠফাটা রোদে খেতের কাজ সেরে বাবা যখন বাড়ি ফেরে তখন তার কালো শরীর বেয়ে ঝরে ঘাম—অশ্রু এবং শুধুই বেদনা—কোনো আগুন নয়—কেননা পূর্বপুরুষদের মৃতদেহের সঙ্গে সেই সব কালে কালে এই সোনালীর মতোই হাওয়ায় মিশে গেছে পাখির পালকের মতো—পঁয়তাল্লিশে, পঞ্চাশে, পঁয়ষট্টিতে, পঁচাত্তরে। এখন সোনালীর কেন যেন মনে হয় সে চিত হয়ে শুয়ে আছে সেই প্যাচপেচে ধানখেতের ওপর, তার শরীরের নিচে কালচে ভেজা স্যাঁতসেঁতে মাটি, আর তার কানের কাছেই হাতির বিকট নিনাদ, অনেক অনেক লোকের চেঁচামেচি-হইহল্লা, আগে বাড়ো আগে বাড়ো, শেষ করে দাও ছোটলোকের বাচ্চাগুলোকে, মাহুতের আঁকুশ ঠোকার শব্দটা যেন খুব কাছেই বাজে, আর বিকট চিত্কার করতে করতে ত্রিভুবন কাঁপিয়ে পাহাড়ের মতো ছুটে আসে বিশাল কালো হাতিগুলো। সোনালী ভয়ে চোখ বুজে ফেলে।

‘শ্রমজীবী মানুষ নির্বাসনে অগ্নিদগ্ধ যারা
অনেক শক্ত বিজয় ছিনে-নেওয়া হাতে তোমার যে প্রেম
তার মতে, হাওয়ায় ধনুক হয়ে ওঠে তোমার যে রঙধনু দৃষ্টি
তার মতে, সেই সব শহর আর ভূমির জন্য যাদের
সংগে রয়েছে তোমার জন্ম-সম্পর্ক…’
কোরেশীর ফরাসি আবৃত্তি শুনে ক্লঁদ হাসে। গাঁস্তো মিরোঁ। তাই না? বিপ্লবী? তবে প্যারিস হলো এখন দুনিয়ার ফ্যাশন কারিগর আর ফ্যাশন মডেলদের স্বপ্ননগরী। খোয়েশ, মাই ফ্রেন্ড, তুমি যে আজ নিমন্ত্রণ করেছ এখানে আমাকে, সে কি কেবল আমি ফরাসি বলেই?
স্টেজে চড়ুইয়ের মতো যে পাতলা মেয়েটি ব্লাউজবিহীন চকচকে বাহু, পিঠ আর কাঁধ দেখিয়ে একটা সাদা-কালো জামদানি হাওয়ায় উড়িয়ে দিয়ে বেড়াল-হাঁটা হেঁটে গেল তার যাত্রাপথের দিকে তাকিয়ে কোরেশী বলল—একেবারে ঠিক নয় রূপবতী ক্লঁদ। কেননা
‘আমি তো কখনো ভ্রমণ করিনি
তুমি ছাড়া অন্য দেশে, স্বদেশ আমার…’
কিন্তু খোয়েশ—তুমি তো জানো যে আমিও কত ভালোবাসি তোমার এই জামদানি। কী চমত্কার এর জ্যামিতিক শিল্প। কী যে জাদু এর ত্রিকোণ চৌকোণ ষড়ভুজ অঙ্কে। বিউতিফুল। সিম্পলি বিউতিফুল।
বেশ, স্টেজে যে সাদা-কালোটা এইমাত্র গেল সেটা তোমার জন্য। তোমার জন্মদিনে পাঠিয়ে দেব।
শুনে ক্লঁদ সত্যি খুশি হলো। ম্যাখসি, ম্যাখসি। অনেক ধন্যবাদ। কিন্তু এবার ফিরতে হবে। মিশেলের ঘুম পেয়েছে। কোরেশী আড়চোখে মিশেলের দিকে তাকায়। মেয়েটা এই মিউজিক-নাচ-হইহল্লা আর হাসাহাসির মধ্যেও একমনে বই পড়ে চলেছে। ভারী বিষণ্ন আর নিরুত্তাপ মেয়েটা। ক্লঁদের দিকে চেয়ে সে বলে, ওকে বাড়িতে রেখে এলেই পারতে। তোমার আদিবাসী মেয়েটা তো আছে?
ক্লঁদ সোনালীর কথা ভাবল একটু। দোতলা বাড়িতে একা একা এই সব রাতে মেয়েটা ভয় পায় না তো? আর ওই মেয়েটিও মিশেলের মতো কেমন নিঃশব্দ আর বিষণ্ন। ওর চোখ দুটোও মিশেলের মতোই বড় বড় আর গভীর, সো ডিপ অ্যান্ড ডার্ক। অফিস থেকে ফিরে ওদের দুজনকে দেখে মনে হয় পৃথিবীর চরম অসুখী দুটি বালিকা তার বাড়িতে থাকে। ঈশ্বরই জানেন এই বয়সী মেয়েগুলোর মনের ভেতর কী লুকিয়ে আছে!

প্রিয় চন্দ্রবিনোদ দাস, কালীচরণ হাজং নামের এই দরিদ্র আদিবাসী চাষীর মোট সাত হাল জমির মধ্যে খাজনা বাকির অজুহাতে জমিদারের কর্মচারীরা গোপনে মামলা করিয়া তিন হাল জমি আদালতে ডিক্রির মাধ্যমে দখল করিয়া নিয়াছে। আমরা খোঁজ নিয়া জানিতে পারিয়াছি যে মামলাটি একেবারেই মিথ্যা। কাছারির প্রাপ্য আদতে কালীচরণ কিছুই বকেয়া রাখে নাই। লোকটিকে আপনার নিকটে পাঠাইলাম। কেননা আপনি কেবল সুরমা উপত্যকা প্রাদেশিক কৃষক সভার সহসভাপতিই নন, আপনি একজন বিচক্ষণ উকিলও বটে। ইহাকে সাহায্য করিবেন। ইতি কমরেড মণি সিং। ১২ই মার্চ, ১৯৪৫।

অতি সাবধানে হলুদ হয়ে যাওয়া চিঠিটা ফাইলে ঢুকিয়ে নুসরাত জাহান বলল, ফাদার, এই কালীচরণ এই এলাকারই লোক ছিল বলে জানতে পেরেছি। এখানে হাজংরা কোন কোন গ্রামে থাকে আপনি নিশ্চয় জানেন।
ফাদার ক্লেমেন্ট রোজারিও উঠে দাঁড়ালেন। তাঁর প্রার্থনার সময় হয়েছে। আগামীকাল ইস্টার রবিবার। ফাদারের ব্যস্ততার অন্ত নেই। ফাদারকে দাঁড়াতে দেখে নুসরাত ঘাবড়ে যায়—ফাদার, আমি ৪৫-৫০-এর হাজং বিদ্রোহ নিয়ে থিসিস করছি। আমার অধ্যাপক কনককান্তি ভট্টাচার্য আপনার একান্ত সুহূদ বলে শুনেছি। স্যারই আমাকে আপনার কাছে পাঠিয়েছেন। আপনি আমাকে সাহায্য করবেন না?
ফাদার একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। এই স্মার্ট ও উচ্চশিক্ষিতা তরুণীর কাছে তাঁর জানতে ইচ্ছে করছে জমিদারের কর্মচারীরাই কি কেবল দরিদ্র আদিবাসীদের জমিজমা দখলে লিপ্ত ছিল? জমিদারিপ্রথা উঠে যাওয়ার পর গণতান্ত্রিক দেশে কেউ ওদের ভিটেমাটি জমিজমা দখল করেনি? স্বাধীন বাংলাদেশের স্বাধীন বাঙালি জাতি করেনি? কী দুঃখের কথা, ভাবেন ফাদার, তরুণীর শিক্ষা হয় অসম্পূর্ণ, নয় নেহাতই সার্টিফিকেটপ্রাপ্তির প্রহসন। বিরক্ত হয়ে ফাদার গলা তুলে ডাকলেন—সোনালী, সোনালী। সোনালী দরজার ওপাশে কুণ্ঠিত পায়ে এসে দাঁড়ায়। তিনি বললেন, ওর নাম সোনালী হাজং। আমার ঘরবাড়ি পরিষ্কার করে, টুকটাক ফরমাশ খাটে। বিনিময়ে আমি কেবল ওকে তিন বেলা খেতে দিই, কারণ এর মা-বাপের সে সংগতিও নেই। আপনি ওর সঙ্গে ওদের গ্রামে গিয়ে খোঁজ নিতে পারেন। আমাকে এখন গির্জায় যেতে হবে।

কালীচরণ হাজং বেমক্কা ধরনের একগুঁয়ে চাষাই ছিল বটে। কেউ কোনো দিন শুনেছে যে জমিদার আর তাঁর নায়েবের বিরুদ্ধে তাঁদেরই এক তুচ্ছ মুষিকসম কৃষক আদালতে মামলা করে বসতে পারে? নায়েব আর তাঁর কর্মচারীদের তো বিশ্বাসই হয় না। এও কখনো হয় নাকি? নেংটি পরা হাজংয়ের বাচ্চার এত সাহস? গল্প শুনতে শুনতে সোনালীর চোখ দুটো বড় বড় হয়ে ওঠে। তারা কুনতা করল না তারে?
করবে না মানে? নুসরাত মেঠো পথে আছাড় খেতে খেতে নিজেকে সামলে নেয়—মহারাজার পাইক-বরকন্দাজ-লাঠিয়াল আর বড় বড় হাতি নিয়ে ওরা এল কালীচরণের জমি দখল করে নিতে। জমি তো জমি, একেবারেই উচ্ছেদ করে দেবে তাকে দুনিয়া থেকে। কালীচরণ অবশ্য বাড়ি ছিল না। ছিল তার বউ। সেও কম যায় না। আরও সব চাষিকে নিয়ে টিনের চোঙ হাতে তারা লাইন করে দাঁড়িয়ে গেল জমির সামনে। আর তখন মাহুত চিত্কার করে হাতি ছুটিয়ে দিল সেদিকে। চারদিক দাপিয়ে হাতি ছুটে গেল। আর সবার সামনেই ছিল কালীচরণের জোয়ান বউটা।
সোনালীর গা শিউরে ওঠে। তারপর? সে পিষে মারা গেল?
আরে না। নুসরাত হাসে। যেন সে হলিউডের কোনো সিনেমার কাহিনী বলছে। গ্লাডিয়েটর কি ব্রেভ হার্ট। অত সহজ না, বুঝলে? চাষিরা সব টিনের চোঙ বাজিয়ে চিত্কার করে স্লোগান দিয়ে এমন হইচই শুরু করে দিল যে বেচারা হাতিগুলো একদম ঘাবড়ে গেল। পেছন ফিরে পালাল ওগুলো। অবস্থা বেগতিক দেখে কাছারির লোকেরাও পালাল। আদালতে মামলার রায়ও কালীচরণের পক্ষেই গেল। বুঝলে সোনালী? কালীচরণ হাজংয়ের এই ঘটনাটা ইতিহাসে খুবই ইম্পর্টেন্ট। কেননা এর মধ্য দিয়েই গঠিত হলো আদিবাসী কৃষক সমিতি, রবি দাম ছিলেন যার নেতা।
সোনালী সারা দিন সারা রাত ভাঙা কুটিরে শুয়ে শুয়ে ভাবে শুধু। কে মণি সিং আর কে-ই বা রবি দাম, কৃষক সমিতিই বা কি জিনিস—কিছুই বোঝে না সে, তবু ভাবতে ভাবতে তার গায়ের লোম খাড়া হয়ে যায়। কেমন রূপকথার মতো গল্পগুলো। মেঘের মতো ফরসা দিদিটা বলেছে এ রকম আরও কত গল্প জানা আছে তার যা আসলে গল্প নয়, সত্যি। রূপকথার নায়ক এই কালীচরণ হাজং হতে পারে তারই পরদাদা বা পরদাদার বাবা—এও দিদিটা বলেছে। সোনালী ভেবে কূলকিনারা পায় না তার বাপ-কাকা-মা এরা এমন হলো কীভাবে? এমন মৃত মাছের মতো ঠান্ডা , নীরব আর নিস্তেজ।
তুমি পড়াশুনা করেছ নাকি সোনালী? নুসরাত দাওয়ায় বসে প্রশ্ন করে।
না, দিদি। মা পরের বাড়িত কাম করতে যায়। আমি ছুডো ভাইটারে রাখি। তারপর ফাদারোর বাড়ি কাম করতে যাই। আমরার তিন বেলা ভাতই জোটে না দিদি আর লেখাপড়া।
নুসরাতকে অবশ্য হতাশ হতে হয়। হাজংরা এই সব রোমাঞ্চকর গল্পে কেন যেন বিন্দুমাত্র উত্সাহ দেখায় না। পরের জমিতে সারা দিন কামলা খেটে খোরাকিটাই জোটে না। বাড়িতে চুলা জ্বালানোর লাকড়ি নেই, ছেলেমেয়েরা ন্যাংটো, ঘরের ফুটো চাল দিয়ে বর্ষায় জল পড়ে। অভাবের তাড়নায় ওপাড়ার প্রমোদ হাজং মুসলমান হয়ে গিয়ে তার পাঁচটা ছেলেমেয়েকে মাদ্রাসায় দিয়েছে, মাদ্রাসার হোস্টেলে অন্তত দুই বেলা খেতে-পরতে তো পারবে। গাঁয়ের পাঁচ-ছয়টি হাজং কিশোরী ঢাকা শহরে বিউটিপার্লারে কাজ করতে গিয়ে কী করে যেন নিরুদ্দেশ হয়ে গেছে। লোকে বলে, ওরা নাকি ফুটপাতের দেহপসারিনী হয়ে গেছে। একদিন এই দেশে এই গাঁয়ে এই সব মাটি যে তাদেরই ছিল এ কথা এখন বিশ্বাস করতেও তারা ভয় পায়। নুসরাত জাহানকে তাই থিসিসের কাজ অসমাপ্ত রেখেই ফিরে আসতে হয়। কিন্তু সোনালী হাজং নামের কালো পলকা কিশোরীকে যে সে ভোলেনি তার প্রমাণ মেলে দুই মাস পর। কেননা ফাদারের কাছে একদিন ডাকযোগে একটা চিঠি আসে।
আমার শুভেচ্ছা গ্রহণ করুন, ফাদার। এই যুগেও যে আপনারা কেউ সেলফোন ব্যবহার করেন না তা আমার কাছে সত্যি আশ্চর্য লাগে। সে জন্যই বহুদিন পরে চিঠি লিখতে বসেছি। আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু কোরেশী তার এক ফরাসি বান্ধবীর মেয়েকে দেখাশুনা করার জন্য একজন আদিবাসী কিশোরী খুঁজছে। তার ধারণা, আদিবাসীরা সত্ ও নির্লোভ ধরনের হয়ে থাকে। তার বান্ধবী ফরাসি দূতাবাসে চাকুরিরত, একমাত্র মেয়েকে নিয়ে ঢাকার বারিধারায় থাকেন। আগামী সপ্তাহেই কোরেশী তার ড্রাইভার ও গাড়ি পাঠিয়ে দেবে। বেতন ও অন্যান্য সুবিধাদির ব্যাপারে কোনোরকম চিন্তাই করবেন না। মেয়েটি অত্যন্ত সুখে থাকবে। ইতি নুসরাত জাহান।

‘উলুউড়ি শিলকুড়ি মিয়ারী তোমার পারের গাঁও
তার নীচ দিয়া ধীরে ধীরে তুমি বইয়া যাও
আইজ কেনে লাল ঢেউ-এ তোমার সমুদ্দুরের ধ্বনি
কও কও বন্ধু কও সে কাহিনী।
সুনাই গাঙ তোমার কেনে উতলা পানি…’
সুনাইগাঙ নয়, বারিধারা লেকের পাশে ইট বিছানো ওয়াকওয়ে ধরে বিকেলে সাইকেল চালাতে চালাতে মিশেল একদিন সোনালীকে সাইকেলে উঠতে বলে। সোনালী প্রথমে ভয় পেলেও পরে আগ্রহ নিয়ে উঠে পড়ে। দু-একবার পড়তে পড়তে সাইকেল চালানোটা সে বেশ শিখে নেয়।
খোলা বাতাসে দুই ধারে সবুজ গাছপালার সারির ভেতর দিয়ে সাইকেল নিয়ে উড়তে উড়তে তার মনে হয় সে যেন একটা পাখি হয়ে গেছে। পাখি হয়ে উড়তে উড়তে সে ঠিক চলে যাবে সুনাই গাঙের তীরে বিরমপাশা গাঁয়ে তাদের ভাঙা কুটিরে, যে সুনাই গাঙ একদিন রঞ্জিত হয়েছিল তাদেরই পূর্বপুরুষদের রক্তে। পূর্বপুরুষের যে বীরত্বপূর্ণ ইতিহাস, আজ তার বাপ থকসং হাজং ও অন্য হাজংরা বেমালুম ভুলে গেছে, সোনালী হাজং সে ইতিহাস তার ছোট্ট বুকে নিত্য পেলেপুষে রাখে।
মিশেল একটা বেঞ্চে বসে চুপচাপ গাছপালা দেখে। ততক্ষণে এক চক্কর ঘুরে এসে সোনালী তার সামনে সাইকেল থামায়—এইবার তুমি ওঠো।
মিশেল মাথা নাড়ে। না।
কেনে?
জু স্যাঁ পা ভিয়া।
দুজনের ভাষাগত ব্যবধান বিস্তর। কিন্তু তাতে তাদের ভাববিনিময়ে কোনো অসুবিধে হয় না।
সব সময় তোমার ওই একই কথা। কিছুই কি তোমার ভালো লাগে না?
মিশেল উত্তর দেয় না। সাইকেল হাঁটিয়ে নিতে নিতে তারা বাড়ি ফেরে। মিশেলের অভাব নেই কিছুর। খাবারদাবার জামাকাপড় বইখাতা খেলনা পুতুল বেড়ানো আনন্দ করা—সবকিছুর উপকরণ ছড়িয়ে আছে চারদিকে। এসবের বাইরে আর কী চাওয়ার থাকতে পারে একটা মেয়ের? মিশেলকে দেখেই সোনালী জীবনে প্রথম শিখল যে পেট ভরে ভাত খেলে আর সুন্দর সুন্দর জামা পরলেই মানুষ সুখী হয়ে যায় না।
আচ্ছা, তোমার কিছু মনে চায় না?
মিশেল প্রথমে বুঝতে পারে না।
মাইনে, কিচ্ছু ইচ্ছা করে না তোমার?
উইশ। ওয়েল, আই উইশ। মিশেল গম্ভীর আর উদাস হয়ে আকাশের দিকে তাকায়। শেষ বিকেলে এক ঝাঁক পাখি তখন লেকের ওপর দিয়ে উড়ে যাচ্ছে। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মিশেল বলে, পাখি। বার্দস।
সোনালী চমকে ওঠে। সোনালীরও যে প্রায়ই পাখি হতে ইচ্ছে করে ভিনদেশি মিশেল তা কী করে টের পায়?

পার্টি বেশ জমে উঠেছে। চমত্কার দেহবল্লরীর স্বল্পবসনা মডেলরা স্টেজ থেকে নেমে এসে গল্পগুজবে যোগ দেওয়ায় পার্টি এবার একটা নতুন আমেজ ফিরে পেয়েছে।
ওর চোখ দুটো মিশেলের মতো। ক্লঁদ প্রথম দিনই বলেছিল—আশ্চর্য, তাই না?
কোরেশী হেসেছিল। হ্যাঁ, ওকে আমার জয়নুলের পোর্ট্রেট মনে হয়। আদিবাসী কিশোরী।
ক্লঁদ বলে, আর আমার মনে হয় লেওপলদ সেদার সঁঘরের কথা। আমাদের কৃষ্ণাঙ্গ ফরাসি কবি। যিনি লিখেছেন—
‘নগ্ন রমণী, কৃষ্ণ রমণী
তুমি আচ্ছাদিত তোমার গাত্রবর্ণে যা তোমার জীবন
এবং তোমার অবয়বে যা তোমার সৌন্দর্য।…’
মিউজিকের আওয়াজে সেলফোনের রিংটোন প্রথমে শোনাই যায়নি। অন্তত চার-পাঁচবার ফোনটা বেজেছিল এর আগে। কথা শেষ করে ক্লঁদ ফোনের ঢাকনা বন্ধ করে মিশেলের দিকে তাকায়। মিশেল এখন আর বই পড়ছে না, তাকিয়ে আছে শূন্য স্টেজের দিকে অকারণে।
মিশেল, মিশেল।
ইয়েস মম।
আমাদের এক্ষুণি যেতে হবে। একটা দুর্ঘটনা ঘটে গেছে।
মিশেল কোনো প্রশ্ন না করে গাড়িতে ওঠে। কোরেশী পেছন পেছন ছুটে আসে—কুল ডাউন ক্লঁদ। কিচ্ছু ভেবো না। আমি আছি। আমি সব ম্যানেজ করব।
ড্রাইভার গাড়ি স্টার্ট দিলে ক্লঁদ উদগত কান্না চেপে রাখতে গিয়ে হেঁচকি তুলে ফেলে। বাইরে ঘন রাত্রি, বৃষ্টিভেজা ঢাকার মন মরা রাস্তা। ফুটপাতে পলিথিন মুড়ি দেওয়া শরীর। বাতাসে ওড়ে মরা পাতা, ময়লা কাগজ আর প্লাস্টিকের ব্যাগ। রাস্তার পানি উড়িয়ে গুলশান এভিনিউ হয়ে ওদের গাড়ি ছুটে চলে। ক্লঁদ কাঁপা কাঁপা হাতে মিশেলকে জড়িয়ে ধরলে মিশেল ফিসফিস করে আজ রাত্রে এই প্রথম কথাটি বলে, ওকে আর পাওয়া যাবে না, মম। সে পাখি হয়ে গেছে।

তানজিনা হোসেন
সূত্র: দৈনিক প্রথম আলো, নভেম্বর ২০, ২০০৯

শেয়ার বা বুকমার্ক করে রাখুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *