যৌনবিজ্ঞানের ইতিহাস

০১. যৌনবোধের স্বরূপ

বিশ্ববিখ্যাত গ্ৰীক পণ্ডিত প্লেটো যৌনবোধের সংজ্ঞা দিতে গিয়া বলিয়াছেন, নারী ও পুরুষ দেবতাদেব অভিশাপে বিচ্ছিন্ন হইয়া আবাব পরম্পরে মিলিত হইবার জন্য যে অবিরাম আকর্ষণ বোধ করে, সেই আকর্ষণবোধের নামই যৌনবোধ। উক্ত অভিমত হইতে কল্পিত দেবতাদেব অভিশাপের কথা, বাদ দিয়া আমবা অবশিষ্ট অংশ মোটামুটিভাবে গ্রহণ করিতে পারি। মোট কথা, এক লিঙ্গের প্রাণী বিপরীত লিঙ্গের প্রাণীর দিকে যে দৈহিক এবং মানসিক আকর্ষণবোধ করে তাহাই যৌনবোধ। ভবিষ্যৎ বংশবিস্তাব স্ত্রী-পুরুষেবা মিলনসাক্ষেপ বলিয়াই যৌনবোধের তীব্রতা ও তাহার তৃপ্তিতে সুখ এত বেশী। তাহা না হইলে পুরুষের আত্মকেন্দ্রীয়তা বা স্বার্থপরতা বা শরীরের অপচয়ের অহেতুক ভয় অথবা নারীর অবহেলা, কষ্টবিমুখতা, ভয়বিহ্বলতা, শালীনতাবোধ ইত্যাদি কারণে মানবজাতি অল্প সময়েই লোপ পাইয়া বসিত।

যৌনবোধেব প্ৰকৃত ব্যাখ্যা আমরা পরবর্তী এক অধ্যায়ে করিতেছি। এখানে শুধু এই বলিলেই চলিবে যে, যৌনবোধ মানব-মনেব তীব্ৰতম বৃত্তির মধ্যে অন্যতম। এই বৃত্তির তীব্ৰতা সম্বন্ধে ফ্রাঙ্কোয় দ্য কারেল (Francois de Currel) বলিয়াছেন,–সভ্যতা বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে মানুষ অন্যান্য ব্যাপারে উন্নত হইলেও মৌনবৃত্তিতে তাঁহারা আজিও বনের হরিণ-হরিণীর মতই রহিয়া গিয়াছে।

০২. নিরোধ-চেষ্টা

আশ্চৰ্য এই যে, যৌনবোধকে বৈজ্ঞানিক, ভিত্তিতে আলোচনা করিতে মানুষ বরাবরই একটা অহেতুক লজ্জা বোধ করিয়া আসিয়াছে। ধর্ম, নীতি, সমাজ ও রাষ্ট্র সকলে একসঙ্গে কোমর বাঁধিয়া যেন যৌনবোধের বিরুদ্ধে সংগ্ৰাম করিয়াছে। ধর্ম পরকালের নিতান্তু মনোরম সম্ভোগের লোভ ও কল্পনাতীত শাস্তির ভয় দেখাইয়াছে, সমাজ ও রাষ্ট্র কঠোর হাতে শাসন করিয়াছে, কিন্তু কিছুই করিতে পাবে নাই। সেণ্ট ভিক্টরের ধর্মমন্দিবে ধর্মযাজকগণের যৌনবোধ সংযত করিবার জন্য বৎসবে পাঁচিবার তাঁহাদের রক্তমোক্ষণ করা হইত। পৃথিবীতে কোনও দেশে কোনও যুগেই এতাদৃশ ব্যবস্থার অভাব ছিল না। কিন্তু মানুষেব যৌনবোধেব তীব্রতা তাহাতে কিছুমাত্র হ্রাস প্রাপ্ত হয় নাই।

কিন্তু লোকসান হইয়াছে খুবই। যৌনবোধের বিরুদ্ধে এই সাৰ্বজনীন শক্ৰতা ইহাকে মানব-মন হইতে দূর করিতে না পারিলেও প্ৰকাশ্যভাবে ইহার আলোচনা বন্ধ করিতে সমর্থ হইয়াছে। যৌনবৃত্তির ন্যায় এমন তীব্র মানববৃত্তি সম্বন্ধে প্ৰকাশ আলোচনা হইতে না পারায়, ইহা মানুষের শিক্ষনীয় বিষযসমূহের অন্তর্ভুক্ত হইতে ক্ৰমাগত বাধাপ্রাপ্ত হইয়াছে। ফলে মানুষ অনেক অপ্রয়োজনীয় ব্যাপারে বৈজ্ঞানিক গবেষণা দ্বাবা উন্নতি লাভ করিয়াও এই অতি প্রয়োজনীয় ব্যাপারে স্বীয় আদিম আকৰ্ষিত মনোবৃত্তিব দাস হইয়াই রহিয়াছে। জগৎ সৃষ্টি ও রক্ষার মূলীভূত যে বৃত্তি সে বৃত্তিকে সে অবলীলাক্রমে চাপা দিয়া দিয়াছে!

০৩. সাহিত্যে আত্মবিকাশ

কিন্তু লাজ বা কৃত্রিম ও বিকৃত রুচি নীতিজ্ঞান মানুষের প্রয়োজনবোধ তীব্রতাকে চাপিয়া রাখিতে পারে নাই। ফলে নীতিবাগীশদের প্রচণ্ড বিরুদ্ধতা ঠেলিয়াও মানুষ যৌনবোধের কৃষ্টি সাধনের প্রয়াস পাইয়াছে। সেইজন্য প্ৰকাশ্যভাবে না হইলেও সমাজের দৃষ্টির অন্তরালে যে একটি শাস্ত্র গড়িয়া উঠিয়াছিল, তাহার নাম যৌনশাস্ত্ৰ। সমাজ ও রাষ্ট্রের বিরুদ্ধতার ফলে এই শাস্ত্ৰ অন্যান্য শাস্ত্রের ন্যান্য স্বাভাবিক গতিতে অগ্রসর হইতে না পারিয়া একটু বক্র, কুটিল ও গোপনীয় গতিপথ অবলম্বন করিয়াছিল। ফলে উহা দ্বারা মানুষ আশানুরূপ ও প্রয়োজনানুযায়ী উপকৃত হয় নাই। কারণ, সমাজদৃষ্টির অন্তরালে গড়িয়া উঠায় এবং অহেতুক সমাজ-শাসন ভয়ে বাধাপ্রাপ্ত হওয়ায় শাস্ত্রটি সুষ্ঠভাবে প্রাপ্ত হয় নাই।

০৪. ভারতীয় পণ্ডিতগণ

যৌনশাস্ত্ৰকে বৈজ্ঞানিক ভিত্তিতে স্থাপন করিবার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেন। সর্বপ্রথম ভারতীয় পণ্ডিতগণ। গ্রীক ও মিশরীয় পণ্ডিতগণও প্ৰসঙ্গক্রমে যৌন-অঙ্গের পরিচয় ও সন্তান জন্মের বিষয় উল্লেখ করিয়াছেন বটে, কিন্তু সুশৃঙ্খল ভিত্তিতে যৌনতত্বের আলোচনার অনুপ্রেরণা ভারতীয় পণ্ডিতগণই দিয়াছেন। দত্তাত্ৰেয় নামক ঋষির বাচনে বাজীকরণ, বীৰ্যস্তম্ভন, বশীকরণ ইত্যাদি নানা আজগুবি ব্যবস্থা দেখা যায়।

খ্রীষ্টীয় প্রথম কি দ্বিতীয় শতাব্দীতে বাৎস্যায়ন নামক এক পণ্ডিত কামসূত্র নামক একখানি সুন্দর পুস্তক প্রণয়ন করেন। বাৎস্যায়নের পূর্বেও প্রায় দশজন পণ্ডিত মানুষের যৌনবৃত্তিকে সূক্ষ্ম অধ্যয়নের বিষয়ীভূত করিবার উপকরণ রাখিয়া গিয়াছেন। বাৎস্যায়নের কামসূত্ৰ প্ৰাচীন হইলেণ্ড উহাতে বিষয়টি এমন ধারাবাহিক প্ৰণালীতে আলোচিত হইয়াছে যে, তাহা দেখিয়া বিস্মিত হইতে হয়। তাঁহাব আলোচনার মধ্যেও যে অন্তর্দৃষ্টি দেখিতে পাওয়া যায়, তাহা কতকটা আধুনিক বিজ্ঞানীর মত। তবে পুরাতন পুঁথি হিসাবে যৌনতত্ত্ববিদদের নিকট আদরণীয় হইলেও সাধারণ পাঠক-পাঠিকা উহা হইতে বিশেষ উপকার লাভ করিতে পরিবেন না। কারণ, পুস্তক প্রণয়নের সময়ে শরীরবিদ্যা অপূর্ণাঙ্গ ছিল এবং সেই হেতু অন্ধবিশ্বাস ও কল্পনার প্রভাবই উহাতে বেশী রহিয়া গিয়াছে।

বাৎস্যায়নের ‘কামসূত্র’ ব্যতীত সংস্কৃত সাহিত্যে আরও করিপয় যৌনশাস্ত্রের পুস্তক আছে। ইহাদের মধ্যে কোকা পণ্ডিতের কামশাস্ত্ৰই প্ৰধান। কোকা পণ্ডিত বেণুদত্ত নামক এক রাজার মনস্তুষ্টির জন্য তাঁহার রতিরহস্য নামক পুস্তক প্রণয়ন করিয়াছিলেন। কোকা পণ্ডিতের উক্ত পুস্তক তদানীন্তন ভারতে ও পরবর্তী সময়ে এত জনপ্রিয় হইয়াছিল যে, রতিশাস্ত্র বা যৌনশাস্ত্ৰ অবশেষে কেবলমাত্র কোকশাস্ত্ৰ নামেই পরিচিত হইয়া গিয়াছিল।

সংস্কৃত ভাষায় রতিশাস্ত্রবিষয়ক শেষ পুস্তক কল্যাণমল্ল নামক এক পণ্ডিতের রচিত অনঙ্গ-রঙ্গ। এই পুস্তকখানি খ্ৰীষ্টীয় পঞ্চদশ শতাব্দীতে লোদী পরিবারের কোনও এক রাজার অনুরোধে পণ্ডিত কল্যাণমল্ল কর্তৃক রচিত হইয়াছিল। এতদ্ব্যতীত ঋষি নাগার্জুন তাহার প্রিয় শিষ্য তুণ্ডিকে উপদেশ দিবার ছলে সিদ্ধবিনোদন নামক এক রতিশাস্ত্ৰ প্ৰণয়ন করিয়া গিয়াছেন বলিয়া কথিত আছে।

০৫. লুপ্ত যৌনশাস্ত্র

প্রাক-মুসলিম যুগে ভারতবর্ষে আরও বহু যৌনশাস্ত্ৰবিদ জন্মগ্রহণ করিয়া ছিলেন বলিয়া অনুমান করিবার যথেষ্ট কারণ আছে। কিন্তু দুৰ্ভাগ্যবশতঃ সে-সময়ে মুদ্রাযন্ত্র বা রক্ষা করিবার ভাল ব্যবস্থা না থাকায়, ঐ সমস্ত পণ্ডিতের কোনও পুস্তক আমাদের হস্তগত হয় নাই। ইহাতে দুইটি অশুভ ফলোদয় হইয়াছে। প্রথমতঃ ঐ সমস্ত পণ্ডিতের গবেষণার ফল হইতে আমরা বঞ্চিত রহিয়াছি। দ্বিতীয়তঃ ঐ সমস্ত পণ্ডিতের নামে অর্থলোলুপ দায়িত্ব-জ্ঞানহীন, পুস্তক বিক্রেতাগণ কতকগুলি কুরুচিপূর্ণ, বীভৎস ও অশ্লীল পুস্তক দিয়া বাজার ছাইয়া ফেলিয়াছে। উদাহরণস্বরূপ কোকা পণ্ডিতের নাম করা যাইতে পারে। অনেক যৌনশাস্ত্ৰবিদ কোকা পণ্ডিতের অস্তিত্বই অস্বীকাব করিয়াছেন। কোকা পণ্ডিত বলিয়া কেহ থাকুন আর নাই থাকুন, তাহার রচিত বলিয়া ভারতবর্ষের বিভিন্ন ভাষায় শতাধিক যৌনবিষয়ক পুস্তক ‘গরম পিঠা’র মত বিক্রয় হইতেছে।

০৬. অন্যান্য দেশের যৌনশাস্ত্ৰ

মিশরীয় সভ্যতা অতি প্ৰাচীন। প্ৰাচীন মিশরীয় জ্ঞান-গরিমার বিষয় আমরা প্যাপাইবাস নামক কাগজে উদ্ধার-প্ৰাপ্ত শ্লোক বা তথ্য হইতে জানিতে পারি। যৌন-বিষয়ে প্ৰাচীন মিশরীয়দের জ্ঞান অতি সামান্য এবং ভ্রমাত্মক ছিল।

গ্রীস যে-যুগে তদানীন্তন পৃথিবীর শ্ৰেষ্ঠ সভ্য দেশ ছিল, সেই যুগে সে দেশের সাহিত্যে যৌনবিজ্ঞানও খুব প্ৰসারলাভ করিয়াছিল। প্লেটো-অ্যারিষ্টটলের ন্যায় বিশ্ববিশ্রুত পণ্ডিতগণ প্ৰকাশ্যভাবে ছাত্রগণকে যৌন-বিষযে উপদেশ দিতেন। অ্যারিস্টটল ‘অভিজ্ঞ ধাত্রী’ (Experienced Midwife) নামক একখানি গ্ৰন্থ রচনা করিয়াছিলেন। অ্যারিষ্টটলের পূর্বে হিপোক্ৰটীসও এ-বিষয়ে আলোচনা করিয়াছিলেন। তাঁহার “স্ত্রীলোকের শারীরিক গঠন”, “বন্ধ্যাত্ব” এবং “কৌমাৰ্য” ইত্যাদি বিষয়ে রচনা এখন আর পাওয়া যাইতেছে না। “ভেনাসের আকৃতি” বিষয়ক পুস্তকসমূহে রাতিপ্রক্রিয়া বিস্তৃতভাবে বর্ণিত হইয়াছে। বলা বাহুল্য, গভীর জ্ঞানলিপ্সা সত্ত্বেও এই সকল প্ৰাচীন পণ্ডিত কল্পনা ও অন্ধবিশ্বাসের সাহায্য লইতে বাধ্য হইয়াছিলেন।

রোমীয় সম্রাটগণ এ বিষয়ে অধিকতর মনোনিবেশ করিয়াছিলেন। সেজন্য ক্যাটুলাস (৮৪-৫৪ খ্ৰীঃ পুঃ), টিবুলাস-(৫৪-১৯ খ্ৰীঃ পূঃ) পেট্রোনিয়াস মার্শাল (৪১-১০৪ খ্ৰীঃ), জুভেনাল (৫৫-১৪০ খ্ৰী:) প্ৰভৃতি বহু কবি ও পণ্ডিত কবিতায়, রসরচনায় ও প্ৰবন্ধে যৌনবিজ্ঞান আলোচনা করিয়া গিয়াছেন।

০৭. ওভিডের প্রেমকাব্য (The Poetry of Love)

এই প্রসঙ্গে ওভিডের (Ovid) নাম জগদ্বিখ্যাত। ইনি খ্ৰীষ্ট পূর্ব ৪৩ ব্দে সলমনায় জন্মগ্রহণ করিয়া আইন ব্যবসার জন্য শিক্ষালাভ করেন। কিন্তু কবিতার দিকেই ঝোঁক বেশী থাকায় তিনি কাব্যচর্চায় মনোনিবেশ করেন। যৌন বিষয়ে Epistoloe বা Heroides প্রথম রচনা করেন। ইহাতে পুৰ্বেকার প্রসিদ্ধা প্রেমিকাদের তাঁহাদের প্ৰেমাস্পদের নিকট কল্পিত প্ৰেমপত্ৰ ছিল। তাঁহার সবচেয়ে প্রসিদ্ধ গ্রন্থ Ars Amandi বা Ars Amatoria তিন খণ্ডে সমাপ্ত। ইহাতে নারীর প্ৰেম কি করিয়া জয় এবং রক্ষা করা যায় তাহার উপদেশ দিয়াছেন। খ্ৰীঃ পূঃ ১ অব্দে ইহা লিখিত হয়। নানা ভাষায় ইহা অনুদিত হইয়াছে।

তিনি কিভাবে প্রসঙ্গের অবতারণা করেন, তাহা বুঝা যাইবে একটি কাব্যাংশের ভাবাৰ্থ হইতে–

“তুমি যদি প্ৰেমরাজ্যে জয়ী সৈনিক হইতে চাও, তাহা হইলে প্রথমতঃ কাহাকে ভালবাসিতে হইবে তাহার খোঁজ কর, তারপর কাহাকে জয় করিবে তাহা ঠিক কর এবং সর্বশেষ যাহাতে তাহার প্রেম অটুট থাকে তাহার চেষ্টা কর।

“কৌশলজাল বিস্তার করিয়া চারিদিকে বিচরণ কর এবং কেবলমাত্র যে জন তোমার সম্পূর্ণ সুখেব কারণ হয়, তাহাকেই পছন্দ কর। স্বৰ্গ হইতে রূপসী নামিয়া আসিবে না ; মর্ত্যলোকেই প্রিয়াকে খুজিয়া বাহির করিতে হইবে।

“শিকারীরা জানে কোথায় শ্রম বিফল হইবে না, কোন উপত্যকায় পলায়মান শূকর মারা সম্ভব হইবে, যাহারা পাখী শিকার করিয়া বেড়ায় তাঁহারা কোন গাছে পাখী বসে তাহা জানে, যাহারা মাছ ধরিয়া বেড়ায় তাঁহারা জানে কোথায় সবচেয়ে বেশী মাছ জড়ো হয়। তেমনি তুমিও প্রেমিক সাজিতে চাহিলে যে সব প্রমোদ-উদ্যানে রূপসীরা জড়ো হয় ও আলাপ করে সেখানে বিচরণ করবে। ইহার জন্য খুব বেশী দূর যাইতে বা সাগর পাড়ি দিতে আমি বলি না।”

প্ৰেমালাপে পুরুষকেই যে অগ্রসর হইতে হইবে, তাহার ব্যাখ্যায় তিনি বলেন,–“প্ৰেয়সীই আগে প্ৰেমানিবেদন করিবে বা পুরুষকে মনোনয়ন করিয়া বসিবে, এ কথা ভাবা অনর্থক। পুরুষকে অগ্রগামী হইতে হইবে এবং প্রেম ভিক্ষা করিতে হইবে, নারীজাতি মধুর ও তুষ্টিকর নিবেদন শুনিতে ভালবাসে।

“যোভ্‌ (ভগবান) পুরাকালে বিনয় সহকারে নারীদের প্ৰেমভিক্ষা করিতেন, তাহার অনুরোধ কোন নারীই এড়াইতে পারিত না।”

ওভিড আরও বহু কাব্য ও গ্রন্থ রাখিয়া গিয়াছেন। কিন্তু তাঁহাব এই কাব্যই সবচেযে সুবিদিত। ইহাকে The Poetry of Love বা ‘প্রেমের কাব্য’ বলা হইয়া থাকে।

এই কাব্য রসাল এবং মজার ব্যাপার হইলেও আমব যৌনবিষয়ে যে বিজ্ঞানসন্মত তথ্যাদির বিশ্লেষণে প্ৰবৃত্ত, তাহাদের সম্বন্ধে উহা হইতে বিশেষ মালমশলা পাইবার সম্ভাবনা নাই।

ওভিডেব আলোচনা অনেকটা প্ৰেম-অভিসারের অনুকূলে,–নারীদের মজাইবার কুচক্রজাল-বিস্তারে প্ৰরোচনাদায়ক, কিন্তু আমাদের আলোচনার উদ্দেশ্য দাস্পত্য-জীবনকে কি করিয়া মধুর ও প্ৰেমময় করা যায়।

০৮. সেরাসিনীয় সভ্যতায় যৌনচর্চা

সেবাসিনীয় সভ্যতার আমলে যৌনবিজ্ঞান অধিকতর উন্নতি লাভ করিয়াছিল। এই সময়ে যৌনশাস্ত্ৰ বাস্তবিকই বিজ্ঞানের অঙ্গীভূত হইয়াছিল।হ্যাভলক এলিস এই প্রসঙ্গে বলেন,–“The breath of Christian asceticism had passed over love; it was no longer, as in classic days, an art to be cultivated, but only a malady to be cured. The true inheritor of the classic spirit in this as in many other matters, was not the Christian world but the world of Islam.” অর্থাৎ–খ্রীষ্টীয় বৈরাগ্যের ছাপ প্রেমকলার উপরে–খ্ৰীষ্টান ধর্মে প্ৰেমকলাকে দমনযোগ্য মনে করা হইত। এ বিষয়, অন্যান্য বহু বিষয়ের মত, ইসলামীয় জগৎই গ্ৰীক-রোমীয় কৃষ্টির উত্তবাধিকারী, খ্রীষ্টীয় জগৎ নয়।

মুসলিম চিকিৎসা-শাস্ত্রবিদগণের এমন একখানা চিকিৎসাবিষয়ক পুস্তক আরবী ও ফারসী ভাষায় দৃষ্টিগোচর হয় না, যাহাতে অন্যান্য বিভাগের ন্যায় যৌনবিজ্ঞান ও স্থান না পাইয়াছে। ফলতঃ মুসলমান হেকিমগণ যৌনবিজ্ঞানকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ মনে করিতেন।

যৌন-ব্যাপারে মুসলমানদেব কোরআন-হাদিসে বহু মূল্যবান উপদেশের উল্লেখ থাকায় ঐ সমস্ত আযাৎ ও হাদিসের ব্যাখ্যা করিতে গিয়া কোরআন-হাদিসেব ব্যাখ্যাকারগণও বিস্তৃতভাবে যৌনবিজ্ঞানসমূহের আলোচনা করিয়াছেন। হাকিম আবু আলী সিনা এবং জালালুদ্দীন সাযুতী তাঁহাদের চিকিৎসা বিষয়ক পুস্তকে যৌনবিষয়ের বিস্তৃত আলোচনা করিয়াছেন। এমন কি দার্শনিক ঈমাম গাজ্জালী তাঁহার নীতিবিজ্ঞান বিষয়ক গ্ৰন্থ “কিমিয়া-ই-সা’দাৎ” ও “এহিয়া-উল-উলুম”-এ যৌনবিষয়ে স্বতন্ত্র পরিচ্ছেদ যোগ করিয়াছেন। শেখ নেফযাওই নামক একজন গ্ৰন্থকাব ষোড়শ শতাব্দীর প্রারম্ভে তিউনিস শহরে যৌনবিজ্ঞান সম্বন্ধে আলোচনা করেন। তিনি তাঁহার “সুগন্ধি কানন” (The Perfumed Garden) নামক পুস্তকের অবতারণা এইভাবে করেন : “সমস্তু প্ৰশংসা প্ৰাপ্য খোদাতালার–যিনি পুরুষের সর্বাধিক উপভোগের স্থল নারীর অঙ্গে এবং নারীর পবম তৃপ্তিব কারণ পুরুষের অঙ্গে ন্যস্ত করিয়াছেন।”

শেখ নেফযাওইর কেতাবখানা স্যার রিচার্ড ইংরেজীতে ‘দ্য পারফিউমড গারডেন’ নাম দিয়া অনুবাদ করেন। লণ্ডন হইতে প্ৰকাশিত ১৯৬৪ সালের সংস্করণ আমার সম্মুখে বহিয়াছে।

পুস্তকটি ২১ অধ্যায়ে বিভক্ত। “শুনুন হে উযির, মানুষের মধ্যে বিভিন্ন প্রকৃতির নর ও নারী আছে : উভয় শ্রেণীর মধ্যে আবার প্রশংসা ও নিন্দার যোগ্য ব্যক্তি আছে—” বলিয়া প্ৰথম অধ্যায় শুরু হইয়াছে। পুরুষদের মধ্যে নারীর কাম্যের মধ্যে নারীসুলভ গাল, চুল, অর্থ, সামর্থ্য, দীর্ঘ পুরুষাঙ্গ, সুগন্ধি ইত্যাদির কথা আছে।

কেচ্ছা কাহিনীর মারফতেই বিবরণ দেওয়া হইয়াছে। নারীর মধ্যে কাম্য সুষ্ঠ কোমর, কান, চুল, বড় চোখ, সুগঠিত নাক, সুডৌল স্তন ইত্যাদি।

মেয়েদের মুখেই কবিতায় নারীর চপলতার কথা বলা হইয়াছে :

অবশ্য এ সব পুরুষসুলভ পক্ষপাতিদোষে দুষ্ট

এই সংস্করণের অন্যত্র ও পুস্তকের ভাল ভাল কথা উদ্ধৃত করা হইবে। তবে মোটের উপর, এ পুস্তকখানি কোক শাস্ত্রজাতীয়–বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি লইয়া লিখিত নয়।

ইসলামে বিবাহ, স্বামী-স্ত্রীর সম্বন্ধ, তালাক, স্ত্রীর সংখ্যা, স্ত্রীর প্রতি ব্যবহার সম্বন্ধে কোরআন সুনির্দিষ্ট পন্থা নির্দেশ করিয়া দেওয়ায় ঐ সমস্ত ব্যাপারে মুলালমানদের বিশেষ কোনও স্বাধীনতা ছিল না। কাজেই কোরআন-নির্দিষ্ট মূলনীতিকে ভিত্তি করিয়াই মুসলমান পণ্ডিতগণ যৌনশাস্ত্রের ব্যাখ্যা করিয়াছেন। ইসলামে বৈবাগ্যের ব্যবস্থা না থাকায় স্বামী-স্ত্রীর যৌনসম্বন্ধেব উপর কোনও আবশ্যক বিধি-নিষেধের আরোপ করা হয় নাই। ইসলামে বিবাহেতর যৌনমিলনের বিরুদ্ধে কঠোর নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও মুসলমান বাদশাহগণ বিবাহিতা স্ত্রী ব্যতীত বহুসংখ্যক উপপত্নী রাখিতেন। নিজেদেব ভোগলিপ্সা ইহাদের যৌনবাসনা পূবণের জন্য স্বভাবতঃই বাদশাহগণকে অসাধারণ রতিশক্তিসম্পন্ন হইতে হইত। সেজন্য তাঁহাদের পাবিবারিক চিকিৎসকগণকে রতিশক্তিবর্ধক ও বীর্যস্তম্ভক ঔষধের আবিষ্কারে নিয়োজিত থাকিতে হইত। এইভাবে তাহাদের ব্যক্তিগত কাম-লালসাকে উপলক্ষ্য করিয়া কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞানের একটা কল্যাণপ্ৰদ দিক বিশেষ উন্নতি লাভ করিয়াছিল।

সম্প্রতি আববী ভাষাযও বহু যৌনবিষযক গ্ৰন্থ বাহির হইয়াছে। এই সমস্ত বিশেষ গবেষণার ফল। ইহার মধ্যে ‘বৃদ্ধের পুনর্যৌবন প্ৰাপ্তি’ নামক গ্ৰন্থ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এই বইখানিতে প্ৰেমকলার সম্যক আলোচনা আছে। রতিকৃষ্টির নানা উপায-উপকরণ বৰ্ণনা ছাড়া উত্তেজক বহু গল্পের সমষ্টিও ইহাতে আছে। এতদ্ব্যতীত ফারসী হস্তলিখিত বহু মূল্যবান গ্ৰন্থ আমাদের অধ্যয়ন করিতে হইয়াছে। তন্মধ্যে ‘খুলা সাতুল মুজারবাবাত’ (পরীক্ষিত ঔষধসংগ্ৰহ) এবং ‘কিমিযায়ে ইশরাৎ (সম্ভোগ-বিজ্ঞান) নামক গ্রন্থ দুইখানিতে রতিশক্তিবর্ধন, বাজীকরণ ও বীর্যস্তম্ভনের বহু মূল্যবান প্রক্রিয় ও ঔষধের উল্লেখ আছে। এই পুস্তকের দ্বিতীয় খণ্ডে ‘দম্পতির রতিজীবন অধ্যায়ে আমরাও সব বিষয়ে আলোচনা করিয়াছি।

ভারতের মুসলমান সম্রাটগণের পৃষ্ঠপোষকতায় আরবী, ফারসী ও উর্দুতে যৌন-বিষয়ক যে সমস্ত গ্ৰন্থ রচিত হইয়াছে, তাহার অধিকাংশই প্ৰাচীন ভারতীয় ও আরবীয় পণ্ডিতগণের মতবাদের সংমিশ্রণমাত্র। বিখ্যাত “লয্‌যতন্নেছা” গ্রন্থ তাহার জাজ্বল্যমান প্ৰমাণ। এই রসাল নামটি অবলম্বন করিয়াও কোকশাস্ত্রের মত বহু ভালমন্দ গ্রন্থ বাজারে চলিয়া যাইতেছে। সুবিখ্যাত আরবী ‘আলকিতাব’ গ্রন্থখানি যৌনতত্ত্বের আধুনিক পুস্তক। আলজিরিয়ার ওমর হালবী আবু উসমান নামক জনৈক ব্যক্তি এই গ্ৰন্থখানি প্রণয়ন করেন। ইহার পিতা তুর্কী এবং মাতা মূর রমণী ছিলেন। গ্ৰন্থখানি তথ্যবহল ও উপাদেয়।

০৯. মধ্যযুগে অধঃপতন

কিন্তু ভারতীয়, গ্ৰীক, রোমীয় ও সেরাসিনীয় সভ্যতাব পতনের সঙ্গে সঙ্গে এত্তদেশীয় যৌনবিজ্ঞান স্বভাবতঃই ভোগে ইন্ধনদাতা রতিশাস্ত্রে পরিণত হইল। জাতির পতনের সঙ্গে সঙ্গে জাতির দারিদ্র্যের অবিচ্ছেদ্য সহচররূপে মানসিক দারিদ্র্যও আত্মপ্ৰকাশ করে। এই সমস্ত জাতির সভ্যতা, সাম্রাজ্য ও শক্তির মধ্যাহ্নে যে সব বিষয় উহাদেব মধ্যে বিজ্ঞানরূপে, মানবকল্যাণের হেতুরূপী সত্যানুরাগীরূপে, সৃষ্টিরহস্যের দ্বারোদঘাটনে আন্তরিক সাধনারূপে অধীত ও আলোচিত হইত, সাম্রাজ্য, ঐশ্বৰ্য ও ক্ষমতা লোপের সঙ্গে সঙ্গে উহাদের জ্ঞানানুসন্ধিৎসা লোপ পাইয়া, সেই বিজ্ঞান তাহাদের কামচৰ্চা ও কামোদ্দীপনার উপাদান রতিশাস্ত্রে অবনত হইল। যে জটিল রহস্যপূর্ণ বিষয় তত্তৎকালের শ্ৰেষ্ঠ মনীষীগণেব আলোচনা ও গবেষণার বিষয় ছিল, তাহা নিকর্মা, মদ্যাসক্ত পাপচারীদের গণিকালয়ের হাস্যপরিহাসের বিষয়ে পরিণত হইল। সুতরাং প্ৰাচ্য দেশের যৌনগবেষণাব ফল স্থায়ী হইল না।

মধ্যযুগীয় ইউরোপ যৌন-অনাচারেব লীলাভূমি ছিল বটে, কিন্তু বাহিরে কৃত্ৰিম ধাৰ্মিকতার আডম্বর ষোল আনা বজায় ছিল। কাজেই সেই যুগে ইউবোপে যৌনশাস্ত্রেব শিক্ষা ও আলোচনা হওয়া দূবের কথা, নারীপুরুষেব দৈহিক মিলনকে প্ৰকাশ্যভাবে শয়তানের কাৰ্য বলিয়া নিন্দা না করিলে ভদ্রসমাজে স্থান পাইবার উপায় ছিল না। সমস্ত গির্জা ও মঠ বিবাহোেত্তর অনাচারের লীলাক্ষেত্র ছিল এবং ধর্মযাজক ও মঠাধ্যক্ষগণ ঐ অনাচারের নায়ক হইলেও তাঁহারা বাহিরে চিরকৌমার্য ও ব্ৰহ্মচর্যের স্তুতিগানে শতমুখ ছিলেন। বিবাহকে তাঁহারা নিতান্ত দুর্বল ও হতভাগ্য লোকের কাজ বলিয়া দয়াপরবশ হইয়া তাহাতে অনুমতি দিলেও পুত্রোৎপাদন ব্যতিরেকে অন্য কোন উদ্দেশ্যে যৌন-মিলনকে সকলে মিলিয়া সমস্বরে নিন্দা করিতেন। সুতরাং ঐ আবহাওয়ার মধ্যে যৌনবিষয়ে বৈজ্ঞানিক আলোচনা ও গবেষণা হইবার কোনও উপায় ছিল না।

১০. আধুনিক ইউরোপে ও আমেরিকার গবেষণা

কিন্তু ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে ইহার প্রতিক্রিয়া আরম্ভ হইল। সত্যানুসন্ধানে ও প্ৰকৃতির রহস্যোদঘাটনে ইউরোপীয় বিজ্ঞানীদের নিষ্ঠা ও সঙ্কল্প সাধনে তাঁহাদের চিত্তের দৃঢ়তা আজ সর্বজনবিদিত। এই সাধনায় কত সত্যাদর্শীকে কুসংস্কার ও অন্ধ গোঁড়ামীর যুপকাষ্ঠে আত্মবলি দিতে হইয়াছে, তাহা আজ কাহারও অবিদিত নাই। পাশ্চাত্য, বিশেষতঃ ইউরোপীয় বিজ্ঞানীদের চিত্তেব্য এই দৃঢ়তা, সত্যের জন্য তাঁহাদের এই আত্মত্যাগ, কুসংস্কার ও গোঁড়ামীব বিরুদ্ধে এই প্ৰচণ্ড বিদ্রোহ অন্যান্য বহু বিজ্ঞানশাখার ন্যায় যৌনবিজ্ঞানকেও কুসংস্কাবমুক্ত করিয়া জ্ঞানালোকের রাজপথে প্ৰতিষ্ঠিত করিয়াছে।

ঊনবিংশ শতাব্দীর প্ৰথমভাগে ফ্রান্সের ব্যালজাক (Balzac, Honore de) বহু পুস্তক লিখিয়া খ্যাতিলাভ করেন। ইঁহার The Physiology of Marriage নামক চটকদার পুস্তকখানি জনপ্ৰি্য় হইয়া পড়ে। ইহাতে নরনারীর সম্পর্ক এবং বিবাহ সম্বন্ধে কিছু মূল্যবান এবং বহু রসাল কথা আছে। ব্যালজাকোব স্বীয় অভিজ্ঞতা ও তৎকালের সমাজের মনোভাব সম্বলিত এই পুস্তকে বিজ্ঞানসম্মত খুব বেশী তথ্য আছে বলিয়া মনে হয় না।

ফরাসী লেখক বেনি গাইও যৌনবিজ্ঞানের নানা দিক লইয়া বৈজ্ঞানিক আলোচনা কবিতেছেন। তাঁহার পুস্তকগুলিব মধ্যে Ethics of Sexual Acts এবং Sexual Freedom উল্লেখযোগ্য। তাঁহার আরও বই ক্ৰমে ইংরেজীতে অনূদিত হইতেছে। তাঁহার জ্ঞান সুদূর-প্রসারী। ইনি থাইল্যাণ্ডের হাইকোর্টের একজন জজ।

বিংশ শতাব্দীর প্রক্কালে ওয়েস্টারমার্ক (Westermark, Edward) তিন খণ্ডে  History of Human marriage নামক একখানি বিবাহের ইতিহাসমূলক পুস্তক সমাপ্ত করেন। ইহাতে বিবাহের উৎপত্তি, প্রসার বৈচিত্ৰ্য ইত্যাদি সম্পর্কে নানা তথ্যের সমাবেশ আছে। ১৯৩৭ হইতে ১৯৩৯ পৰ্যন্ত ইনি লণ্ডনে সমাজ-বিজ্ঞানের অধ্যাপক ছিলেন। বিবাহের ধারাবাহিক আলোচনায় ইহার মতামতের বিশেষ মূল্য আছে।

পাশ্চাত্য জগতের অন্যান্য বহু পণ্ডিত যৌনবিজ্ঞানকে একটি গুরুতর ও প্রয়োজনীয় জ্ঞানের শাখারূপে অধ্যয়ন ও আলোচনা করিয়াছেন। ইঁহাদের মধ্যে বিখ্যাত কয়েকজনের সামান্য পরিচয় মাত্র দেওয়া এখানে সম্ভবপর। ইঁহাদের পুস্তকের ইংরেজী নামই এখানে দিতেছি।

জার্মানীর ক্রাফট্‌ এবিং (Kraft-Ebbing. Riehard Freiher Von) যৌনবিকৃতির নানা দিক লইয়া গবেষণা করেন। তাঁহার Psychopathia Sexualis একখানা মূল্যবান গ্রন্থ।

ভিয়েনার স্টেকেল (Stekel, Wilhelm) যৌনবিকৃতি, রতিজড়তা ইত্যাদি বিষয়ে বহু গবেষণা করেন। তাঁহার Impotence in the Male এবং Frigidity in Woman দুইখানি মূল্যবান পুস্তক।

জার্মানীর হার্শফেল্ড (Hirschfeld Magnus) আরও ব্যাপকভাবে যৌনবিজ্ঞানের চর্চা এবং উহার নানা দিক লইয়া আলোচনা করেন। উনি নানা দেশ ঘুরিয়া বার্লিনে একটি গবেষণাগার (Museum) স্থাপন করেন এবং প্ৰাচ্য জগতের ও নানা তথ্য সংগ্রহ করেন। হিটলারী আমলে এই মহামূল্য গবেষণাগার বহু পুস্তক, উপকরণ, চিত্র ও মূৰ্তিসহ ধ্বংস করিয়া ফেলা হয়। হার্শফেল্ডের Sex in Human Relationships একখানি সুন্দর পুস্তক I

হল্যাণ্ডেব ভেন্ডি (Van de Velde) একজন প্ৰসিদ্ধ ধাত্রীবিদ্যাবিশারদ ডাক্তার। ইনি তথ্যবহুল কয়েকখানা গ্ৰন্থ লিখিযাছেন। ইহাদেব মধ্যে Ideal Marriage সবচেয়ে মূল্যবান। অন্যান্য পুস্তক আলোচনার বাহুল্য দোষে কতকটা দুষ্ট।

ইতালীর মন্তেগাজার (Mantegazza, Paolo) প্রসিদ্ধ গ্রন্থ Sex Relations of Mankind । The Art of Taking a Wife ইঁহার আর একখানি উপাদেয় গ্ৰন্থ।

সুইজারল্যাণ্ডের ফোরেল (Forei, August) অসামান্য বৈজ্ঞানিক সুন্ম দৃষ্টি ও দার্শনিক অন্তর্দৃস্টির পবিচ্য দিয়াছেন। ইঁহাকে চিন্তাশীল যৌনবিজ্ঞানীদের অগ্ৰণী বলিয়া অনেকেই শ্রদ্ধা করেন। ইহার The Sexual Question নামক যৌনবিজ্ঞানের সর্বাঙ্গীণ সুক্ষ্ম আলোচনামূলক গ্ৰন্থখানি শুধু জ্ঞানই বিতরণ করে না, রীতিমত চিন্তাব খোরাক যোগায়। এই পুস্তকখানি প্ৰথমবার পড়িয়া আমি বাস্তবিকই চমৎকৃত ও মুগ্ধ হইয়া পড়ি ৷

ভিয়েনার অধ্যাপক জগদ্বিখ্যাত ফ্রয়েড (Freud, Sigmund) মনো বিশ্লেষণের (Psycho-analysis) প্রবক্তারূপে অমর হইয়া থাকিবেন।  যৌনচেতনা যে শিশুদেরও হয় এবং যৌনদমন (repression) যে সমাজবদ্ধ মানুষের নানা রোগ, বিকৃতি পাগলামী ইত্যাদির কারণ হইয়া থাকে, তিনি এরূপ অভিমত প্রকাশ ও প্রচার করেন, তাঁহার Three Contributions to the Theory of Sex নামক গবেষণার ফল সুবিদিত।

ইংলণ্ডের মারশ্যাল (Marchal, F. H. A.) যৌন-অঙ্গসমূহের ক্রিয়া ও প্রতিক্রিয়া বিষয়ক গবেষণা করেন। ইঁহার Introduction to Sexual Physiology তথ্যবহুল গ্রন্থ। ডাক্তার হেয়ার (Haire, Norman) যৌনশাস্ত্ৰে সুপণ্ডিত। ইনি নানা প্ৰবন্ধে, পুস্তিকা এবং পুস্তকের মারফতে যৌনবিজ্ঞান প্রচার এবং Encyclopaedia of Sexual KnowledgeVol. 1 নামক যৌনবিশ্বকোষের সম্পাদনা করেন। Birth Control Methods নামক জন্মনিয়ন্ত্রণ বিষয়ে তাহার একখানি সুলিখিত বই আছে। তিনি ১৯৫২ সালে পরলোক গমন করিয়াছেন।

কিন্তু সবচেয়ে বেশী খ্যাতি লাভ করিয়াছেন ইংলণ্ডের স্টোপস (Stopes, Mary) নামী মহিলা। ইনি জন্মনিয়ন্ত্রণের ক্লিনিক ইত্যাদি খুলিয়া জনসাধারণকে উপদেশ দেন এবং বহু সহজবোধ্য সুন্দর সুন্দর পুস্তক লিখিয়া যৌনজ্ঞান প্রচারে ব্ৰতী হন। ইহার পুস্তকগুলি বহুল প্ৰচলিত এবং জনপ্রিয়। Married Love, Enduring Passion, Wise Parenthood, Contraception, Radiant Motherhood ইত্যাদি বইগুলি সুপরিচিত। ঠিক খাঁটি বিজ্ঞানালোচনা সব ক্ষেত্রে না হইলেও কতকটা কবিত্বময় রচনা সম্বলিত হওয়ায় বোধ হয সাধারণ পাঠক তাঁহার পুস্তকগুলিকে বেশী আদর করে।

আমেবিকাব মারগারেট সুয়ানজারের জীবনী বড়ই চিত্তাকর্ষক। ১৯১২ সালে একটি মোটর ড্রাইভার ইঁহাকে ও একটি ডাক্তার ডাকিয়া আনিনা তাহার স্ত্রীকে দেখায়। তিনটি ছেলেমেযেসহ এই স্ত্রীলোকটি একটি ছোট ঘরে বাস কবিত। ডাক্তার ও নার্স মিসেস স্যানজার দেখিতে পান স্ত্রীলোকটির অবস্থা শোচনীয়–সে নিজেই নিজের গর্ভপাত ঘটাইয়া বিপন্ন অবস্থায় পড়িয়া আছে। কয়েকদিন চিকিৎসার পর ভাল হইলে স্ত্রীলোকটি করুণ সুরে জিজ্ঞাসা করে, “ডাক্তার যে কয়টি ছেলেমেয়ে আছে তাহাদেরকেই খেতে দিতে পারি না–আর ছেলেপুলে না হয় কি করলে?” ডাক্তার উত্তর করিলেন, “আপনার স্বামীকে আলাদা শুতে বলবেন।“

মিসেস স্যানজারের মনে দরিদ্র স্ত্রীলোকটির এই করুণ জিজ্ঞাসা দারুণ রেখাপাত করিল। তিনি তখন হইতে “বাৰ্থ কনট্রোল” কথাটার প্রচলন ও ব্যবস্থার প্রচার আরম্ভ করিলেন।

মিসেস স্যানজারের স্বামীর অবস্থা বিশেষ সচ্ছল ছিল না। তাই তাঁহাকে নার্সের কাজ করিয়া কিছু উপরি আয় করিতে হইত। সেই সময়ে বহু দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত নারী তাহাকে জন্ম-নিয়ন্ত্রণের উপায় সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করিত। তিনি উত্তর দিতে না পারিয়া মৰ্মাহত হইতেন। তারপর হইতে তিনি মাসের পর মাস ডাক্তারী বহি খুঁজিতে লাগিলেন। ফ্রান্সের লোকের জন্ম-নিয়ন্ত্রণ করে জানিয়া তিনি সেখানে আসিয়া এ সম্পর্কে জ্ঞানাহরণ করিলেন।

আমেরিকায় ফিরিয়া The Woman Rebel নামে একখানা ছোট্ট পত্রিকা বাহির করিয়া বাৰ্থ কনট্রোল সম্বন্ধে প্রচার চালাইতে লাগিলেন। তারপর তাহাকে বহু বাধাবিঘ্নের সম্মুখীন হইতে হইল। জেলে যাইতে তিনি ভয় করিতেন না। ছাপাখানার মালিকেরা ভয়ে তাঁহার প্রচার পুস্তিকা Family Limitation ছাপাইতে রাজী হইলেন না। অবশেষে একজন রাতারাতি গোপনে উহা ছাপাইয়া দিলে সারা দেশময় হুলুস্থূল পড়িয়া গেল। মেয়েরা হাতে হাতে নকল করিয়া দেশময় ঐ পুস্তিকা ছড়াইয়া দিল এবং বাড়ীতে বাড়ীতে উহার আলোচনা চলিতে লাগিল।

ইহার পর তিনি প্রকাশ্যে জন্ম-নিয়ন্ত্রণ ক্লিনিক খুলিতে চাহিলেন কিন্তু ডাক্তারই তাঁহার কাজে যোগদান করিতে সাহস পাইলেন না। অবশেষে তিনি ও তাহার ভগ্নী নার্স এথেল (Ethel) ব্রুকলিনের (Brooklyn) একটি ছোট ঘরে আমেরিকার সর্বপ্রথম বার্থ কনট্রোল ক্লিনিক খুলিলেন। কয়েকদিনেই বহু নারী জড়ো হইল। সঙ্গে সঙ্গেই আইনে উভয় ভগ্নীর শাস্তি হইল।

ইহার পর ডাঃ এ্যাব্রাহাম ও তদীয় স্ত্রী হ্যানা স্টোন (Dr. Abraham and Dr. Hannah Stone)-এর সহযোগিতায় ১৯২৩ সালে ইঁহারা নিউ ইয়র্কে ক্লিনিক্যাল রিসার্চ ব্যুরো (Clinical Research Bureau) খুলেন এবং সারা আমেরিকায় খ্যাতি লাভ করেন। নানা জায়গায় শাখা-প্ৰশাখা খোলা, নানা সভাসমিতিতে আলোচনা ও প্রচার হইতে থাকে।

তাঁহার অদম্য উৎসাহ ও প্ৰাণপণ উৎসর্গ সারা জগতের শ্রদ্ধা লাভ করিয়াছে। তাঁহার লেখা My Fight For Birth Control এবং Motherhood in Bondage তাঁহারই জীবনব্রতের পরিচয় দেয়। তিনি নানা দেশ ঘুরিয়া জন্ম-নিয়ন্ত্রণের আবশ্যকতা প্রচার করেন ও ক্লিনিক, সমিতি ইত্যাদি গঠনে সহায়তা করেন। তিনি ১৯৩৫ খ্ৰীষ্টাব্দের ২৫শে নভেম্বর বোম্বাই-এ অবতরণ করিয়া জনৈক সংবাদপত্রের প্রতিনিধির নিকট যে উক্তি করিয়াছিলেন, তাহার এক স্থলে বলেন,–পিতৃত্ব ও মাতৃত্ব স্বেচ্ছাকৃত, দায়িত্বপূর্ণ, মহান ও সগৌরব কর্তব্যে পবিণত করিতে হইলে উহাকে অন্ধ নিয়তির হাত হইতে মুক্ত করিয়া সজ্ঞান ও ইচ্ছাসাপেক্ষ কার্যে রূপান্তরিত করিতে হইবে। ইহা হইলেই প্ৰত্যেক সন্তান বাঞ্ছিত হইবে এবং তাহার প্ৰাপ্য ভালবাসা, আদর যত্ন ও আরাম পাইবে।

ডেভিস (Davis, Katherine) নামের আমেরিকান অন্য একজন নারীর যৌবনজীবন ও মনোভাব সম্পৰ্কীয় নানা তথ্য আহরণ করিয়া খ্যাতিলাভ করিয়াছেন। ইঁহার Factors in the Sex Life of 2200 Women নানা তথ্যে সমৃদ্ধ।

আমেরিকার পুরুষদের মধ্যে ডাঃ ডিকিনসন (Dickınson, R. L.) জন্মনিয়ন্ত্রণ এবং যৌনশারীরতত্ত্ব সম্বন্ধে আলোচনা করেন। তাঁহার Human Sex Anatomy এবং Thousand Marriage মূল্যবান পুস্তক। শেষোক্ত পুস্তকে বিবাহিত নরনারীর প্রকৃত যৌনজীবন হইতে আহরিত বহু মূল্যবান তথ্য আছে। ইনি কিছুকাল হইল প্ৰায় নব্বই বৎসর বয়সে পরলোক গমন করিয়াছেন।

ডাঃ স্টোন (Stone, Abraham) এবং তদীয় পত্মী ডাঃ হ্যানা স্টোনও যৌনবিজ্ঞান বিতরণে ও প্রচারকার্যে ব্রতী। তাঁহাদের A Marriage Manual নামে একখানা সহজবোধ্য প্রাথমিক যৌনবিজ্ঞানের পুস্তক খুব ভাল ও জনপ্রিয়।

যৌনবিজ্ঞানের একটা শাখা জন্ম-নিয়ন্ত্রন (Birth Control) এই বিষয়েও বহু পূর্ব হইতে অধ্যয়ন ও আলোচনা চলিয়া আসিয়াছে। এই আলোচনার ইতিহাসও চিত্তাকর্ষক। এই ইতিহাস সংক্ষিপ্তভাবে আমার তিনখানা পুস্তকে [জন্মনিয়ন্ত্রণ মত ও পথ (ষষ্ঠ সংস্করণ) এবং Ideal Family Planning ও Controlled Parenthood (ইংরেজী পুস্তক)] দিয়াছি। এখানে পুনরুল্লেখ অনাবশ্যক।

এই পুস্তকের শেষে মূল্যবান গ্ৰন্থসমূহের যে তালিকা দিলাম, তাহা হইতে আরও বহু লেখক-লেখিকার পরিচয় পাওয়া যাইবে। তবে যে একজন মনীষীয় কথা এখানে একটু বিস্তৃতভাবে বলা দরকার, তিনি হইলেন হ্যাভলক এলিস।

১১. হ্যাভলক এলিস (Havelock Ellis)

শরীরবিজ্ঞান ও মনোবিজ্ঞানের দিক হইতে যৌনশাস্ত্রের সূক্ষ্ম গবেষণার জন্য বর্তমান জগতে ইহার নাম সর্বাপেক্ষা উল্লেখযোগ্য। এই বিশ্ববিশ্রুত মনীষীর সামান্য পরিচয় মাত্র এখানে দেওয়া সম্ভব। একনিষ্ঠ  আলোচনা হিসাবে ইঁহার Studies in the Psychology of Sex নামক সাত খণ্ডে সমাপ্ত সুবৃহৎ ও তথ্যপূর্ণ গ্ৰন্থ চিন্মস্মরণীয় হইয়া থাকিবে।

এলিস ১৮৫৯ খ্ৰীষ্টাব্দে ক্রয়ডনে জন্মগ্রহণ করিয়া কৈশোর কাল অষ্ট্রেলিয়ায় কাটান। যৌনবিষয়ে চারিদিকের কপট নীরবতা তাহাকে বিরক্ত করিয়া তোলে এবং প্ৰায় ষোল বৎসর বয়সেই এদিকে নির্ভুল জ্ঞানাহরণ করিবার জন্য তাঁহার অদম্য আকাঙ্ক্ষা জাগে। শুধু জ্ঞানাহরণই নহে, তিনি জ্ঞানবিতরণ করিবারও দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করেন।

তিনি এই প্রসঙ্গে বলেন,–আমি (তখন) এই বলিয়া দৃঢ় সিদ্ধান্ত করিলাম যে, সমস্ত নীতিবাগীশতা ও ভাবপ্রবণতা পরিহার করিয়া আমি আজীবন যৌন-ব্যাপারের প্রকৃত তথ্যসমূহ উদঘাটন করিব এবং তাহা করিয়া এ বিষয়ে অজ্ঞতার দরুন আমাকে যত সব ক্লেশ ও বিমুঢ়তা সহ্য করিতে হইয়াছে, তাহা হইতে ভবিষ্যতের যুব-সম্প্রদায়কে রেহাই দিব।

এলিস দারুণ পরিশ্রম করিয়া যৌনবিষয়ে যে সকল তথ্য সংগ্ৰহ করিয়াছিলেন তাহা প্ৰকাশ করাও দুষ্কর হইয়া পড়িয়াছিল। ইংলণ্ডের নীতিবাগীশদের বিরুদ্ধতার ভয়ে তাঁহাকে প্রথম জার্মানীতে তাঁহার গবেষণার ফল ছাপাইতে হইয়াছিল। পরবর্তী এক খণ্ড (Sexual Inversion) ইংলণ্ডে ছাপাইবার সঙ্গে সঙ্গেই আইনের  কঠোর হস্ত তাঁহার পুস্তক ও প্ৰকাশকের উপরে পড়ে। আইনে প্ৰকাশকের দণ্ড হয় এবং পুস্তকখণ্ড পোড়াইয়া ফেলিবার আদেশ দেওয়া হয়।

অবশেষে আমেরিকার এক প্রকাশন তাঁহার গবেষনার ফল সারা জগতের সম্মুখে উপস্থাপিত করেন। ইনি ৮১ বৎসর বয়সে ১৯৩৯ সালে মারা যান।

এখন তাঁহাকে কামোদ্দীপক রতিশাস্ত্রকার বলিবার সাহস কাহারও নাই। তাহাকে নিঃস্বাৰ্থ সমাজসেবক, নিৰ্ভীক সত্যদ্রষ্টা এবং অতুলনীয় গবেষক বলিয়া সারা জগৎ শ্রদ্ধা করিতেছে। তিনি পথপ্রদর্শক, তাঁহার পদাঙ্ক অনুসরণ করিয়া বহু গবেষক আরও সম্মুখে আগাইয়া যাইতেছেন। তাঁহার মৃত্যুতে আমরা একজন মনীষী হারাইযাছি, কিন্তু তাঁহার কীর্তি অমর হইয়া রহিবে।

কিনযে সহকর্মীদের বিরাট অবদান

ডঃ কিনযে (Alfred Kinsey) ও তাঁহার সহকর্মীদের গবেষণার ফল যৌনসাহিত্যে উল্লেখযোগ্য … … …. তাঁহাদের Sexual Behaviour in the Human Male ও Sexual Behaviour in the Human

Female… … … প্রায় পনের বৎসর কালের তথ্যানুসন্ধানের ফলে রচিত।

প্রথম বইটি যখন প্রকাশিত হইয়াছিল (১৯৪৮) তখনই সমালোচনার ঝড় উঠিয়াছিল। পক্ষান্তরে বাহির হওয়া মাত্র বইখানির লক্ষ লক্ষ কপি বিক্রি হইয়াছিল। আমেরিকার পুরুষদের যৌন-ব্যবহার সম্বন্ধে তথ্য যোগাড় করিবার প্রয়াসে ডঃ কিনযে এবং সমকর্মী পাঁচ হাজারেব ঊর্ধ্বে মার্কিন পুরুষের নিকট হইতে প্রশ্নচ্ছলে তাহাদের বিভিন্নমুখী যৌন যৌন অভিজ্ঞতা ও অভিমত তালিকাভুক্ত করিয়াছেন।

তাহাদের প্রশ্নগুলিকে প্রধানতঃ দুই ভাগে ভাগ করা যায়, বিবাহ পূর্ব এবং বিবাহোত্তর যৌন-অভিজ্ঞতা বিষয়ে।

বিবাহ-পূর্ব-যৌন-অভিজ্ঞতাকে আবার তাঁহারা দুইভাগে ভাগ করিয়াছেন। স্পৰ্শ, চুম্বন, আলিঙ্গন প্রভৃতি যৌন-অভিজ্ঞতা–যাহার সমষ্টিগত নাম তাঁহারা দিয়াছেন ‘petting’ অন্য পর্যায়ে স্বয়ংমৈথুন, সহমৈথুন ও সহবাস। প্রশ্নের জবাবে প্ৰকাশ পায় উত্তর-দাতা মার্কিন যুবকদের শতকরা প্ৰায় সকলেরই বিবাহ-পূর্ব ‘petting’ এর অভিজ্ঞতা রহিয়াছে, শতকরা নব্বই জনের স্বয়ংমৈথুন ও সহমৈথুনের, শতকরা অন্ততঃ পঞ্চাশ ভাগের সহবাসের। প্ৰায় সকল নর ও নারীর শৈশব হইতেই যৌন-চেতনা অল্পাধিক থাকে এবং উহা নানাভাবে উদ্দীপিত হইয়া উঠে—এ তথ্যো তাঁহারা প্রকাশ করিয়াছেন।

১৯৫৩ সালে Sexual Behaviour in the Human Female প্ৰকাশিত হয়। এই বইটি অধিকতর চাঞ্চলের সৃষ্টি করে, কারণ উপরি উক্ত পন্থা অবলম্বন করিয়া ডঃ কিনযে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে পরীক্ষিত পাঁচ হাজারের উর্ধ্বে বিবাহিতা মার্কিন যুবতী ও প্ৰৌঢ়াব মধ্যে শতকরা ৪১ জনের, বিবাহ-পূর্ব সহবাসের অভিজ্ঞতা ছিল।

এই সব তথ্য প্ৰকাশিত হইবার পর প্ৰায় সমস্ত আমেরিকা জুড়িয়া ডঃ কিনযের বই দুইটিকে কেন্দ্ৰ করিয়া তুমুল বাকবিতণ্ডা চলিয়াছে। তাঁহাদের পুস্তক দুইটির সারাংশ দিয়া ও উহাদের সমালোচনা করিয়া কয়েকখানা গ্ৰন্থ ও পুস্তিকা প্রকাশিত হইয়াছে।

একদল বলিতেছেন যে, ইহারা যে পন্থা অবলম্বন করিয়াছেন তাহা বিজ্ঞানসম্মত নহে, যে সব নারীদের তিনি বাছিয়া লইয়াছেন সমাজের তাঁহারা বিশেষ স্তরের—অতএব তাঁহাদের অভিজ্ঞতাকে অবলম্বন করিয়া মার্কিন নারীদের সম্বন্ধে সাধারণভাবে প্ৰযোজ্য কোনও মতামত গঠন করা নিরাপদ নয়। পরস্তু ডঃ কিনযের অনুসন্ধানের পদ্ধতি ও ফলাফলকে যদি বিজ্ঞানসম্মত বলিয়া গ্ৰহণ করা যায় তবুও সেসব ফলাফল প্ৰকাশ করা তাহাদের পক্ষে সমীচীন হয় নাই। কারণ ইহাতে দেশের যুবসম্প্রদায়ের নৈতিকতার উপব অনাকাঙিক্ষত প্ৰতিক্রিয়ার সৃষ্টি হইতে পারে। অন্যদল এই সমস্ত আপত্তি বিজ্ঞানের বিচারে টেকসই নয় বলিয়া মত প্রচার করিতেছেন। ব্যাপারটি নিরপেক্ষ ও বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গীতে বিচার করিয়া দেখিবার জন্য সকলের চেষ্টা করিতে হইবে।

ডঃ কিনযে তাহদের দুইটি পুস্তকে যেসব তথ্য সমাবেশ করিয়াছেন বৈজ্ঞানিক যৌন অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে তাহার মূল্য সমধিক, সন্দেহ নাই। এস্থলে এই পুস্তকের দ্বিতীয় খণ্ডের শেষের দিকে সন্নিবেশিত প্ৰশ্নমালার উত্তরদাত্রীদের কথা বলা অপ্রাসঙ্গিক হইবে না। তাঁহাদের বিশেষ অভিজ্ঞতা সম্বন্ধে দ্রুত সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যেমন সঙ্গত হইবে না, তেমনি সে অভিজ্ঞতা উত্তর-দাত্রীদের দেশের অবস্থার সঙ্গে একেবাবে সম্পর্কচ্যুত, এ কথা বলাও নিশ্চয় বাড়াবাড়ি হইবে।

অতএব, যে সকল মার্কিন রমণীর যৌন-ব্যবহার ও অভিজ্ঞতাকে ডঃ কিনযে বিশ্লেষণ করিয়া দেখিয়াছেন তেমন অভিজ্ঞতা ও ব্যবহার মোটামুটিভাবে অধিকাংশ মার্কিন নারীরই বলিয়া ধরা যাইতে পারে। ডঃ কিনযে দেখাইয়াছেন যে, শিক্ষার ব্যবধান বা সামাজিক স্তর-ভেদ যৌন-ব্যবহার বা অভিজ্ঞতাকে তেমন প্রভাবান্বিত করে না, যেমন করে ধর্মীয় মনোভাব। ১৯২০ সাল হইতে এই ধর্মীয় মনোভাব মার্কিন নারীদের ভিতর অনেকটা শিথিল হইয়া আসিয়াছে; ফলে ধর্মীয় মনোভাব যে সব ক্ষেত্রে যৌন-ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করে তাহার সংখ্যা খুব কম।

মোটামুটি এ কথা বলা যাইতে পারে যে, ডঃ কিন্‌যের বই দুইটি যৌনব্যবহারের তথ্য সমাবেশের দিক হইতে যৌন-সমস্যার উপর নূতন আলোকপাত করিয়াছে। তাঁহার সমস্ত মতামত অবশ্য সমানভাবে গ্রহণযোগ্য নয়। উদাহরণস্বরূপ মেয়েদের চরম-পুলক-প্রাপ্তি সম্বন্ধে তিনি যে কথা বলিয়াছেন তাহার উল্লেখ করা যাইতে পারে। এ সম্বন্ধে আমরা এই পুস্তকের দ্বিতীয় খণ্ডে বিস্তারিতভাবে সমালোচনা করিয়াছি।

পুরুষের তুলনায় নারীর চরম-পুলক-প্ৰাপ্তি অনেক বিলম্বে ঘটে। এ কথা মানিয়া লইলে আরও বলিতে হয় যে, ইহার কারণ শুধু দৈহিক জড়তা নয়, মানসিক প্রত্যাশাও বটে। নারী সাধারণভাবে যৌন-ক্রিয়াকে শুধু আঙ্গিক রতিকাৰ্য হিসাবে ধরে না। তাই আদর-আপ্যায়ন, চুম্বন, আলিঙ্গন তাঁর এত কাম্য। এতটা সূক্ষ্মতা দেখাইতে পুরুষের সব সময় ধৈৰ্য থাকে না–তাই সাধারণতঃ চরম-পুলক-প্ৰাপ্তি উভয়ের একসঙ্গে ঘটে না।

মনে হয় এই মনস্তাত্ত্বিক দিকটা ডঃ কিনযে এড়াইয়া গিয়াছেন এবং যৌন অভিজ্ঞতায় মেয়েরা অপেক্ষাকৃত নিরাসক্ত, এই অনির্ভরযোগ্য সিদ্ধান্তে উপনীত হইয়াছেন। তাঁহারা দ্রুত রেতঃপাতকে স্বাভাবিক বলিয়া এ বিষয়ে আর বাড়াবাড়ি না করিবার পরামর্শ দিয়াছেন। অথচ রাতিকালের স্থায়িত্ব বাড়াইবার জন্যই রতিকলার প্রয়োজন বেশী।

খুঁটাইয়া দেখিলে বই দুইটির আরও খুঁত বাহির করা কষ্টসাধ্য নয়। তবে সমগ্রভাবে যৌন-সাহিত্যে ডঃ কিনযের বই দুইটি মূল্যবান অবদান এবং পুরুষ ও নারীর যৌন-ব্যবহার ও অভিজ্ঞতার এমন বিস্তারিত, পুঙ্খানুপুঙ্খ, বিজ্ঞান-সন্মত তথ্যের সমাবেশ আর কোন বইয়ে পাওয়া যাইবে না।

আমি এই সংস্করণে ডঃ কিনযের বই দুইটি হইতে তথ্য ও অভিজ্ঞতাদি গ্ৰহণ করিযাছি। আবার, যেখানে দরকার সমালোচনাও করিয়াছি। এই বই দুইটি প্রশ্নোত্তরের বেড়াজাল ও সংখ্যানুপাতিক ও অন্যান্য তথ্যে এত ভরা যে সাধারণ পাঠক-পাঠিকা পড়িবার আগ্রহ রক্ষা করিতে পারিবে না। লেখকদের পক্ষে অবশ্য বই দুইটি অতি মূল্যবান।

ডঃ কিনযে অশেষ পরিশ্রম করিয়া তথ্যানুসন্ধান করিতেন। ১৯৫৪ সনে রকফেলার ট্রাস্টের সাহায্য বন্ধ হইয়া যাওয়ায় তিনি ভগ্নমনোরথ হইয়া পড়েন। নানা দুয়ারে ঘুরিয়া ফিরিয়া অর্থসংগ্রহে বিফল হন। ১৯৫৬ সালের মে মাসে তিনি হঠাত অসুস্থ হইয়া পড়েন এবং কিছুদিনের মধ্যেই মৃত্যুমুখে পতিত হন। তথ্যানুসন্ধানে অক্লান্ত কর্মী হিসাবে এবং যৌনবিজ্ঞানে অমূল্য তথ্য পরিবেশক হিসাবে ডঃ কিনযে অমর হইয়া থাকিবেন। তাঁহার সহকর্মীরা আর একটি খণ্ড প্রকাশ করিয়াছেন।

শিক্ষা ও প্রচারের ফলে পাশ্চাত্যদেশে আজ শত শত বিজ্ঞানী সমাজ-কল্যাণের উদ্দেশ্যে যৌনবিষয়ে গবেষণা করিবার জন্য এবং উহাকে শ্রেষ্ঠ ও সুন্দরতম উপায়ে মানবকল্যাণে নিয়োজিত করিবার উদ্দেশ্যে শত শত গবেষণাগার স্থাপন করিয়া উহাদের প্রকোষ্ঠে প্রকোষ্ঠে সাধনায় সমাহিত হইয়া আছেন। মানুষ যদি সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব হইয়া থাকে তবে এই শ্রেষ্ঠ জীবের সৃষ্টিরহস্যই প্ৰকৃতির শ্রেষ্ঠ রহস্য। মানবের সাধনাকে যদি কোথাও জয়যুক্ত করার প্রয়োজন হয়, তবে তাহা এই রহস্যোদ্ঘাটনে। বস্তুত আধুনিক বিজ্ঞানীর কাছে—শুধু বিজ্ঞানীর নয়, নিতান্ত সাধারণ মানুশের কাছেও—ইহা একটি পরম বিস্ময়ের বিষয়ে যে, মানুষ এত বড় প্রয়োজনীয় এবং জীবন-মৃত্যু ও কল্যাণ অকল্যাণ সম্পর্কিত বিষয়ের প্রতি এতকাল এমন নিৰ্বোঞ্চ উপেক্ষা করিল কেমন করিয়া!

Print Friendly, PDF & Email
%d bloggers like this: