জলদেশ
শিকোয়া নাজনীন

ঘাঘট নদীর কাছে স্টিমারে উঠেও জলঢাকায় যাওয়া যেত। কিন্তু ধলশ্রাবণের আকাশে বিশ্বাস নেই। বৃষ্টি নামে যখন-তখন। ঢাল ধরে রোহনপুরে পৌঁছাতে দিনটা হেলে পড়ে। কাঁচা সড়কপথে হাটখোলার মানুষচলা পথেই আবার নদীতে উঠে আসা। দপদপিয়া পেরোলেই তো জলঢাকা। লতাবেড়ি দিয়ে প্যাঁচানো বিলপাড়ে ঘরগুলো সব উঁচু। পাড়ে নোঙর বাঁধা। মলিনাহাটের মানুষ বলে, এখানে রাজার বাড়ি ছিল। বসত জায়গাটা আর নেই। জমিজমা, ঘাটপাট, রাজাপ্রজা, জলমাটি, নৌকা ভেড়ানো নদীপাড়। শ্রাবণ-ভাদ্রে জল না পাওয়ায় পলি পড়ে বাকেরগঞ্জ ফরিদপুর হয়েছে, আর ওদিকে আড়িয়াল খাঁ হয়েছে শায়েস্তাবাজার। বৃষ্টিতে বানের জলে সেসব তো শুধু অন্ধকার ঘন স্যাঁতসেঁতে চলতা পড়া বলেশ্বরের স্থলভূমি। অববাহিকার খাঁড়িতে, বাবুবাজার ঘাটে রাহেলারা, চন্দনারা বসে আছে লঞ্চের গলুইয়ের ডগায়। চন্দনারা প্রতীক্ষা করছে আর ভিড়টা কোন দিকে গড়াচ্ছে তা দেখছে। কাল রাত থেকে যাত্রীরা এখানে আসছে। পরেশ, আলী মিঞা, জান্নার বাপের প্রতিদিনের আসা-যাওয়া। এই তল্লাটে ব্যস্ত নিবারণ চরণ, বলাইরা ডাঙা আর জলের কর্মকাণ্ড দেখে। ঘটিবাটি বিক্রি করে দিয়েছে শানুরা। রাহেলারা বলে, এখানে তারা বিচ্ছিন্ন। সমাজ নেই। জলঢাকায়, মলিনাহাটে চন্দনাদেরও সমাজ ছিল। মলিনাহাটে কাঁটামনসার, ময়নাকাঁটার বেড়া দিয়ে ঘেরা উনুন ছিল। বাষ্প ছিল। সেই ফুটন্ত ভাতের গন্ধটা স্টিমারঘাট পর্যন্ত বাতাসে ভাসে। সন্ধের খেতে বিছন ছড়ানো রাতটা, গুড়জাল, খৈসা, তালপা, বিছুটি, চলনবালাম নামের ধানগুলো একদম নিজস্ব শৈলীতে ফলানো এই সুগন্ধি চালের বাসনাতে স্টিমারঘাটটা ম-ম করে। নিজের খাটনিতে উৎপন্ন রাতপোহানি ধান কোনোটাই এক রকমের না। তাই এ ধানের বাসনা নিয়ে তাদের কোনো যৌথ স্মৃতিও নেই। চন্দনাদের আঠারো কানি জমিতে বারোমাসি চাষের বায়না। নিচু চলতাপড়া ঘষটানো-থোবড়ানো দাওয়া, দক্ষিণের ভিটায় বারবারি, উঠোন পেরিয়ে দৌড়ঝাঁপ করেই বাঁ দিকের ঘাটলা ছাড়িয়ে সোজাসিধা ঘরের ঝাঁপ। গোলাঘরের একটু আগ বেরিয়ে বাঁ হাতে মলিনাহাট। বড় সরদারবাড়ি। সেটাই একটা নিজস্ব গ্রাম। একটা আস্ত পরিচয়। দাড়িওয়ালা যবেত আলী, তুলসীর মা, নানা সমাজের নারী-পুরুষের অজস্র শব্দমালা পটুয়াখালী, বরিশাল—সবটাই বাতাস মাটি রৌদ্র ছায়াতাপের ভেতরে ঢেউয়ের পর ঢেউ তোলে। বড়খালের রৌদ্রহাওয়াময় ছবিটি, উঁচু শক্ত খাদের গল্পটি, কোথাও বাঁশের সাঁকোতে অদৃশ্য পারাপারের স্মৃতিটি, দক্ষিণের খেতে বারোমাসি ধানভানার রাংমালি টিলা—সব একই পটের ছায়াছবি বনে যায়। নদীর মধ্যে স্রোতের টান টের পায় তারা। বাকেরগঞ্জে…ফরিদপুরে…বরিশাল বুড়িশ্বরে শাহবাজপুরে মাটির ওপর ফুলেফেঁপে ওঠা আবার মাটি আঁকড়ে পড়ে থাকা। কীর্তনখোলা, আড়িয়াল খাঁ, মেঘনা, তেঁতুলিয়া…বারনাবাদ—সব ছড়িয়ে কেমন সুবিশাল স্থলভাগ বিরান করে দিয়ে গেল। কিন্তু বরিশালে…সুগন্ধাতে মধুখালীতে নদীর বৈচিত্র্য কই? সেগুন শাল খয়ের পাতা বর্ষায় ঘন মাটির তলার নদীর জল টেনে নিয়ে বাড়ছে। ভাদ্রে মাটি পোড়ে। মাটির শেষ জলটুকু টেনে নিয়ে পাতার বাড়ন্ত গঠনে ক্রমে মাটি জলশূন্য হয়ে পড়ে। মাটি খটমটে শক্ত পাথর বনে যায়। ঝোপজঙ্গলের ভেতর মাটি পচা পাতায় বিদীর্ণ হয়ে সেখানের জলটা সারা বছর নরম পলির মতো জমাট বেঁধে বেঁধে একটা আস্ত হাওরে রূপ নেয়। সেখানে ঝোপঝাড় গাছগাছড়া, আকাশভাঙা জল, মাটির তলার জল—সব জমে শক্ত আচ্ছাদন। নদীটা যত দূর, তত দূর তাকিয়ে থাকে চন্দনা। চন্দনার কাছে অনেক দূর মনে হয় জীবনটা। গ্রামটা। বাতাসের বিপরীত টানটা রুখতেই রাহেলারা ভাদাইল বৃক্ষ কেটেছিল, এর ডাল চারপাশে পুঁতে ঘর দিয়েছিল। বিরুৎ পোকা ছিটিয়ে দিলে সেই ঘর কী সুনসান! অন্য পোকা আর আসতে পারল না। অন্য পোকা মেরে ফেলে বিরুৎ। সারা শরীরটা তার মৃত্যুবিছানা। চন্দনাদের মনোযোগ গ্রামকে কেন্দ্র করে। তাদের কথাবার্তা সেদিকেই এগোয়। ইটের ভাটি বন্ধ। তাঁতকল বন্ধ। ফজল গাজীর কাছে জলঢাকার খবর আসে যে কাজ আছে দেশে। মলিনাহাটে। ভিড়ের ভেতরে কে বলে আসলে হয়তো ছাপড়াখালীতে কাজ আছে। সেখানে মানুষ হাড্ডিসার উনুনের শেষ বাষ্পের নিভু নিভু দম নিয়ে নিরুপায় ভাদাইল বৃক্ষের ফনফনিয়ে বেড়ে ওঠা দেখা ছাড়া কাজ কী। ঘরটা পোকা কাটে, মাটিতে ডাবে। নানা প্রান্তে ঘুরে কত ঘর দেখেছে ওরা। গাবখানখালের হা্ওরে ইটভাটার ঝুপড়ি ঘর দেখেছে। ইট সাজিয়ে দেয়ালের টং করা ঘর, চারটা দেয়াল আছে। আকাশটা ঢাকা। বাখারির ছাউনি আছে। ভেটুইপাড়া বিলঘাসিয়াতে ঘর আছে টিলামতো। চৌকোনা জানালা কাটা। অথচ আশাশুনি পেরিয়ে, গলঘাসিয়া পেরিয়ে, জলঢাকা ঘাট পুবে রেখে ঘাসিয়াখালীতে চন্দনাদেরও ঘর ছিল। মুলিবাঁশের ছিদ্র ছিদ্র ঘর। বাইরের আলো ছিটকে আসত সেখানটায়। চন্দনার ইচ্ছে করে সেই ঘরের ছিদ্র্র দিয়ে ফুটন্ত ভাতের টগবগে হল্লাটা দেখে। কেদারপুরের হাটবারের বিজলি ছটা দেখে। তার ইচ্ছে, একবার ঘরের দরজা দিয়ে ঘরে যায়। চন্দনারা, রাহেলারা মোট ছয় ঘর আজ স্টিমার ঘাটে বসে আছে। লঞ্চঘাটটাতে এসে ভিড়ে পৌঁছতে বিকেল হলো, আর এখন তো রাত, স্টেশনে অনেক মানুষ। তারা কেউ কারও দিকে তাকানোর মতো না। তারা সব নদীর মতো শুধু বান ডাকছে। সেখানে স্টিমারে সবাই খালি সার্ভিসটার দিকে তাকিয়ে থাকে। সামনে স্রোতের বিস্তার। রংটা ছাই ছাই ছলকায়। শুধু জল আর স্রোত। আর ভিড়। কাউকে তো চেনার দরকারও নেই। লঞ্চ চলতে শুরু করলে তো জল ছলকাবে। চেনা-জানা হবে। জলপ্রান্তর থেকে বয়ে আসা মানুষের স্বভাবে থাকে বশীকরণ মন্ত্র। দূরত্ব ঘুছে যায়। দীর্ঘতার বৃত্তান্ত তৈরি হয়। মুখের বাঁকই হদিস দেয়। তাতে জানা হয় কুচিয়ামারা খালে সুকুমার যাবে। ছবেদ আলী যাবে জলঢাকা পেরিয়ে, তোরসা হয়ে দুপচাঁপিয়া মীরবাড়ি। রহিম শেখ যাবে গোয়ালবাড়ি, ছুতারবাড়ি, কালিভিটা, টিকবাইলা, সুকুমার, বলাই কেউ কেউ আছে, যারা যাবে চৌহাটের বাজারে।
এ নদীর কোনো ম্যাপ আঁকা যায় না। জলের টপোগ্রাফিটা আশ্চর্য। প্রত্নতত্ত্ব্বে জরুরি হলেও এর মানচিত্র নেই। টপোগ্রাফিতে অজস্র বিচ্ছিন্ন জল, রং, ঘন বাঁক, আকাশের হেলে পড়া। কিন্ত জলঘাটে জলের কোনো ছবির আদল দাঁড়ায় না। জলঘাটের এই স্টিমারে বসে নদীময় গুঞ্জনটা…ব্যস্ত বিচরণটা একটা সারা দিনের আস্ত জীবন বনে যায়। জলের প্রবহমানতা, মানুষের ছোটাছুটি সবই আকারহীন। অনচ্ছ, পিঙ্গল।
চন্দনারা ভাবে, কী নিয়ে গল্প করবে। মানুষকে বলার মতো কী আছে তাদের। ছাপড়াখালীতে জলঢাকাতে জলদেশ নেই, চাষবাস নেই। ফসল মাটি নেই। কেউ এখানে স্টিমারে জানতে চায়।
চন্দনা বলে, গদাধর থেকে বাইনতলা তারা চিনে। বোগাপানি থেকে ধনু হয়ে কালজানি, তার পরই জলঢাকা। পশ্চিমের ঘাটে সারা বছর বাদলা আকাশ, রোদ উঠতেই মাটিতে শেষ বৃষ্টির ফোঁটাটা গিলে নিয়ে মাটির ভেতরের আগুন ঝলকায়। এসব নিয়ে চরম বিশৃঙ্খল ভূপৃষ্ঠ। দুর্বল পাঁজরে মাটিগুলো ন্যাবড়া ন্যাবড়া হয়ে ঝুলে থাকে। সমস্ত আকাশময় স্থির জলের মতো কোনো ছবি হয় না সেখানে। খিদেয় মাটিতে সেঁধিয়ে পড়া জীবন। নিরন্তর বয়ে চলা কোনো নদী নেই। নরম পলিতে শস্যদানা নেই। খাদের ঢালপথ নেই। কী বলবে কাকে। শীর্ণ ঘোলাটে জীবন। বনতলে লতাগাছ যেভাবে বেড়ে ওঠে, উঠলে যে সেটাকে কোনো বসতি বলেও মনে হয় না, পুরোনো কথাও মনে হয় না। প্রত্নবিদেরও কাজ থাকে না সেখানে। যে সভ্যতা নেই তার তো পৌরাণিক অভ্যাসও থাকে না। মানবসম্পর্কোচিত কোনো ইতিবৃত্ত নেই। ভাদ্রের দাহে দগ্ধ, শ্রাবণে বাস্তুছাড়া। এসব কি পুরোনো কথা হবে? চন্দনাদের বিপুল জলদেশ মেঘদেশকে মানববসতির বাইরে কল্পনা করতে হয়। তার কিছু ছিল না এখানে আসলে। ঘরদোর, অফিস-কাছারি, থানা-হাজত, পাকা রাস্তা, গাড়িপথ, সমাজভিত্তিক বন্দোবস্ত, ট্রাকের গর্জন, মানুষের জৈবনিক নিয়মগুলো তার তো নেই। নদীর চর কি তার স্বদেশ ছিল কোনো দিন? দেশান্তরি মজুরের কি দেশে যাওয়ার দেশ থাকে? চন্দনারা যে জলঢাকার পারে সরু আর চওড়া হেঁটেছিল একদিন, বড় রাস্তা ছেড়ে কাঁচা রাস্তায় হেঁটেছিল একদিন, তার গিঁট কি ছিল কিছু? দেশবিহীন কোনো মানুষ যদি থাকে, তবে তার সঙ্গে অভ্যাসের সম্পর্কটা কী হবে, তা তো আগে থেকে ঠিক করা নেই। সে বিপুল কোলাহলের ভেতরে কোনো সম্পর্ক রচনা করে উঠতে পারে না। বিপুল এই ভিড়টার মধ্যে ঢাকা বরিশাল নোয়াখালী সিরাজগঞ্জ—বিরাট এই লঞ্চ সার্ভিসটার দিকে সে শুধু তাকিয়ে থাকে। কড়ে আঙুলে গোনে বাকেরগঞ্জ, শিবগঞ্জ…মেঘনা ডাকাতিয়া নদী ব্যবস্থার মধ্যেই পড়ে। মনসুর শেখ তাদের একটা শেডের তলে বসার ব্যবস্থা করে দেয়। ওরা যেখানে প্রথমে যাবে, সেখানে একটা ডাকবাংলো থাকার কথা। সেখানে খানিক জিরিয়ে নেওয়া, জল খাওয়া। সে থাক বা না থাক। রাহেলারা ভয় করে না। নদী দিয়ে ঘেরা পথ। নদী দিয়েই আবার লঞ্চ সার্ভিস। নদীপথেই জলঢাকার ঘাট।
রাহেলাকে ডেপুটি বলেছিল, কেন যে তোমরা ঘর ছাড়ো? গবমেন্ট কত ব্যবস্থা দিচ্ছে। লোকে ঘুরে ঘুরে খাচ্ছে। মজুরদের লেবার পারমিট, খোরপোশ আরও কত কী।
ফরিদপুরের চৌধুরীহাট থেকে চলা শুরু করলে তো রোহনপুর ঘাট পড়বেই। ধলগোদার কাছে, নদীর সোঁতার কাছে আসতেই জব্বর মাঝি বাতাসের বেগ সামলে নিতে নিতে বলে, তোমরা যাবে কোন পাড়? বাতাসের হল্লাটা হজম করতে করতে রাহেলা বলে, গোয়ালখালী যদি যাওয়া যায়, সেখান থেকে দাউদকান্দির ঘাট, সরাইল না কী যান কয়… বেতসলতা নদীডা পার হয়্যিয়া আর উজান একঘাট তেমহোনাতে যাব। যাবার পারোনিহি মাঝি? ন্যাবড়া-ধ্যাবড়া পাড়টা। জল তো নেমেও যেতে পারে। আকাশটা খানিক পেরিয়েই ওরা বুঝে যায়, ঘূর্ণির তোড়টা অনেক পেঁচানো। অন্তত বানের জলের ছলকটা জোট বাঁধছে কোথাও। এই নদীতে এই আকাশটা পেরোতে পারা যাবে না হয়তো। জলছপছপ পা চলে। সেই আন্ধার রাতে রাহেলারা, চন্দনারা পা চালিয়ে এসেছে। মেঠো দিগন্ত ধরে, আড়বারি ঘাটিয়াতে এসে দেখে এত জল? একদিকে হাঁটতে থাকো। সূর্য উঠলে হাঁটা। শ্যাওলার আস্তরণপড়া ঘেয়ো মাটি আর তোবড়ানো ঝুলিমাটির ঘুপচি খুপচি চ্যেখুপি ঘরের, মুলিবাঁশের পাকে চ্যাবড়ানো ফণিমনসার মরা ডাল ঘেরা ঘরের মধ্যে সেঁধিয়ে পড়ার জন্য হাঁটো।
ও মাঝি পারে ভিড়াও না নৌকাডা…। টাটকা জল। খুরের শব্দ। জল ভাঙছে রাতভর। আজ বিষখালীতে বাকেরগঞ্জে, হরিণঘাটাতে, ছাপড়াখালীতে, বলেশ্বরে…জলের এত বিস্তার, জল শুধু ঢুকছেই। জলের চক্র, চড়াই-উতরাই জলঢাকাতে, শিবগঞ্জে তবু জোটবাঁধা বাতাসের তোড়ে কথা চালায়—ও মুনি…অ্যাঁ কি তবে খামাক্ক্যা বাতাস…?
তাও বাকেরগঞ্জ হলে একরকম ছিল। মাদারীপুর বিল রুট ধরে বাতাস হলে সে আরেক কথা ছিল। বলেশ্বর হরিণঘাটা ধরে বাতাসের বেগ দক্ষিণের রায়ঢাকের ঢেপা টেঙ্গন সমুদ্রের যেখানটাতে মিশেছে, সেই তে-মোহনাতে তো খাঁড়ি নেই। সেখানে জলপ্লাবনের ছায়া মানুষ আন্দাজ পায়। কিন্তু ডাঙা থেকে নদী সমুদ্রে তো পড়েনি সেখানে। তেরসা গেলে যে সমূহ নদীপথ আছে বিষখালী-বুড়িশ্বর। সমুদ্রের সুবিপুল সমারোহের ভেতর থেকে মহীরুহের মতো আকাশমুখী বাঁক উঠে গেছে। দুরন্ত ফণা তোলা রায়বাহাদুর বাকেরগঞ্জ।
চন্দনারা স্টিমার থেকে ঘাটে, ঘাট থেকে কাঁচা সড়ক পর্যন্ত বুঝতে পারে যে অনেক নদী অনেক নতুন নতুন ঘাট দিয়ে বেঁকে গেছে। সাপের মতো পেঁচিয়ে ধরেছে দিগন্তকে। সেসব ঠিক জলডোবা ঘাট না। সুবিস্তীর্ণ নদী দেশ খণ্ড নিয়ে সহসা খাত পরিবর্তনের সমূহ চিহ্নকে লোপাট করে দিয়ে এমন আশ্চর্য শক্ত-সমর্থ ঢেউ ভাঙছে এমন টান জলে হেঁচকিয়ে পড়া, এলোপাতাড়ি ঘষটানো, তোবড়ানো এখন আর বলার কিছু থাকবে না যদি আড়িয়াল খাঁ না পেরিয়েই ফরিদপুরের চৌধুরীহাট ঘাট আচমকা চলে আসে। পানির তোড়ে, হুড়মুড় তেমোহনার জল তো এখন হিসেবে বইছে না। এমন জলে এই বান, মাটি ভেঙে জল গড়ানো অথবা রোহনপুর পেরিয়ে পাইকগাছা ধরে যে ঘুপচিতে ঘাট ছিল, সেখান থেকে বেরোনোর পথকে ডানে রেখে বিষখালীর এক টুকরো বলেশ্বরে মিশে যাওয়া। এসবই মুহূর্তে ঘটে।
রাহেলাদের মুখের অচেনা বিল হাওরের দুর্দম মত্ততায় নতুন প্রশ্ন আসে। নিবারণ মাঝি এই তাণ্ডবে হাওয়ার তলার অন্ধকার থেকেই বলে, ‘আপনে যদি নিরাপদ না মনে করেন, তবে যাওনডা বাদ দেন। স্বর্ণশস্যের আকর, মাঠে শস্য ফলানি গান পড়ে থাকে। হঅ…নিবারণ মাথা ঝাঁকিয়ে—যদি না চান তো এমন খারাপ নদীতে না যাওনডা ভালো। জব্বর মাঝি বিপুল মাথা ঝাঁকায়। অহ…মানুষ যদি নদী ড্যরায় তা তার ব্যেফার। ভালোমন্দডাও তার হাউসের ব্যেফার…
শেষ কথাটা শুনে চন্দনার দমটা উদোম হয়ে হাপর ছেড়ে বের হয়। এই দিগন্তে শ্রাবণে লেপা বিসারকান্দি ঘের তার এত চেনা। জন্মের আগে থেকে যে জল বাতাসের নদী অভ্যাসের। শ্রাবণের তলদেশকে ঘষে বলেশ্বরের অজস্র বাঁকের এক খুপরিতে, জলের ঘূর্ণিতে সে আজ দ্বিধান্বিত। সমুদ্র আর এই তাণ্ডবটা বাঁচিয়ে দৌলতখাঁ দ্বীপের এই প্রলয়োপধি পর্যন্ত যেতে পারলে তো তার চেনা লাগতে পারত দিগন্তটা। যদি আরেকটু থাকত দৃশ্যমান আকাশটা। অচ্ছেদ্য অন্ধকার জলরাশির স্রোতটাতে ত্রিমুখী প্লাবন তেমোহনাতেই না ভাঙত যদি।
রাহেলারা, চন্দনারা দপদপিয়া পৌঁছাতে পারলেই ঘাট পেয়ে যাওয়ার কথা ছিল। লালমোহন, ফজলু তাদের ডাকছে ওদিকে। ধানভানা বিধবা ননদ, ছুতোরপাড়ার মেজো বউ, মেসের শেখও ডাকছে।
তারা ঘুরে যেতে বলে নৌকাকে। জব্বর মাঝিসহ নৌকাতে তারা এই কয়জন সারা পথে একসঙ্গে…ঘাটে বৈঠা বাঁধতেও একসঙ্গে। রাহেলা বিপন্ন। গতকাল রাত তিন প্রহরে বিষখালীতে বাঁধ ভেঙেছে। চন্দনারা, রাহেলারা, নিবারণ চরণরা প্রত্যেকে তারা নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে এই গর্জমান হাওয়ার দিকনির্দেশনা পেতে দম ধরে বসে থাকে। তাদের হিসেবে বলেশ্বরের বানের মুখ তো একটাই। জলঢাকাতে, ঘাসিয়াখালীতে জল না নামলে ভূমিতল বহুকে বঞ্চিত করে একজন কি দুজন কিনে নেবে। সামনে নিশ্চল উজাড় আবদ্ধ জলরাশির দিকে তাকিয়ে চন্দনারা ভেবে রাখতে চায় যে জলঢাকার মুখটাতে রোহনপুরে এবার যে কাজ পাওয়ার কথা থাকে, যে বিছন হওয়ার সুবাদে সেটা দেশান্তরি মজুরের ভাগে কীভাবে বাটোয়ারা হবে।
পৃথিবীর কোনো পুনঃপ্রবাহের বীজের ভেতরে এই সত্য আঁচ করে নেওয়ার রেওয়াজে এই গাছতলা নেই, ঘরের বেড়া নেই, ঘাটপাড় নেই, গণেশপুরা নেই, তারপর যখন চালটাও নেই, তখন এই নাইয়ের হিসাবটা বণ্টন হবে কী দিয়ে। অন্ধকারে বাকি বাস্তবতা আঁচ করে নিতে নিতে তারা ঝিমোয়। জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের সভায় এমন বাছবিচার শুরু হলেও বিষখালী, স্বরূপকাঠি, বাবুগঞ্জের ব্যাপার তো কিছুই বোঝা যায় না।
ভূখণ্ড হিসেবে এ অঞ্চলে সমুদ্র স্থলদেশে ঢোকে যে যে জায়গা দিয়ে, বিষখালীতে, আড়িয়াল খাঁতে যে স্থলদেশের ঢাকনা ছিল, তা আর নেই। দক্ষিণমুখী বেসিনে বাঁক নেয়নি যে স্থলভাগ, তা মুছে ফেলা হয়েছে। এই সমতলের পরিমাণ কেউ আন্দাজে বুঝে না উঠতেই হাজার কিলোমিটার বেগে সেখানে জলরাশির আবর্তন বাতাসের হলকা বাড়িটাড়ি গাঁ-গঞ্জকে ঢেকে দেয়।
মাঝির নৌকাটা ঘুপচিতে তিন কি চারবার পাক খায়। তিনদিকেই ধু ধু বলেশ্বর। আকাশও ধু ধু বিষখালী বলেশ্বরের মতো বইছে ছপছপ। দেখলে নিরীহ মনে হয়। হাওয়ার দোলা দেখে, আকাশের বাহারি কাণ্ডটা দেখে মাঝিরা বলাবলি করেছিল বলেশ্বরের পেঁচাপেঁচিতে ওইখানডা ভাঙছিল সেবার।
তাদের হিসেবে গণেশপুর মেহেন্দীগঞ্জের হাটখোলা নিয়ে পুরো এলাকা পাঁচ আঙুলের গোনাতে ছিল। তার বাদে খানিক রাস্তা পেরোলেই তো রোহনপুর। আর মেহেন্দীগঞ্জের আকাশ থেকে দিগন্ত অবধি হাওয়া ভূপৃষ্ঠ সমতল সব লোপাট করে নিচে নেমে উল্টো নদীকে সেরাজাবাদ থেকে দৌলতখাঁ পর্যন্ত উজিয়ে দিয়েছে। তার ফলে এই প্রবল ভূপৃষ্ঠতা মেহেন্দীগঞ্জও খানিকটা পেয়েছে, রোহনপুরও কিছুটা পেয়েছে। এই বেসিনে নদীর সঞ্চরণ আর ক্ষয়সাধন পরিস্থিতিতে তলানিটা তাহলে হিসাব করা তো সহজ হয়ে পড়ে যে, যদি সেখানে রোহনপুরে এসডিওরে কোনো চার্জ বোঝাইতে সময় না পেয়ে থাকে, তবে তো সবই ক্ষতির মধ্যে চলে গেল। এখন প্রশ্ন থাকে যে গবমেন্ট কি এই ক্ষতিডা পোষাতে পারবে কি না।
বিষখালী দিয়ে গণেশপুরে নামার পথে শাহবাজপুরের নদী আর আকাশকে ফাঁকি দিতে চেয়েছিল রাহেলাদের নৌকাটা। একটা ছোট্ট সোঁতা দিয়ে তারা জোয়ারে যেতে চেয়েছিল। ছাপড়াখালী দিয়ে। কিন্তু লতানদী দেখে, তার পাঁকদণ্ড বেয়ে জলের বিস্মরণ দেখে, গলুইয়ের তোবড়ানো, ভচকানো দেখে বিরাট একটা ধসের কাছে তারা হুশ্শ করে গিয়ে থামল। নৌকার এমন চোট খেয়ে থামাটা অনেক দূর ভাসিয়ে নিল তাদের। চারদিক ছড়িয়ে পড়া অবক্ষেপণটাকে আড়াআড়ি পাড়ি দেওয়ার কথাটা মনে হলো না তাদের একবারও। এই তো সংলগ্নি দুই তফসিল লেখা। স্টিমারের ঘাটে টেবিলে সাদা ধবধবে জুঁই ফুলের মতো সাদা ভাত, এইটুকু মাত্র পথ তো। আড়াআড়ি গেলে চকজুনিদ হাওর। জোয়ারের বেগটা ধরতে চেয়ে নদীর দিকে তাকিয়েও নদীর দিকে আসলে তাকানো গেল না। পাড় ঘেঁষে ঘেঁষে যাওয়াই তো ছিল বুদ্ধিমানের কাজ। বুনো মেঘ তছনছ করা একটা তেমোহনাতে উন্মাদ অতল জলে পাক খেল প্রথম নৌকাটা। ওরা জানত ঠিক। আকাশের দিকে তাকিয়েও বলেশ্বরের ক্ষুরধার রশ্মিটা দেখা যাচ্ছিল। বিন্যাস অনুযায়ী সেটা পেরিয়েও যে তেমোহনাটা শেষ হতে পারল না, এখানে খাঁড়িতে জল বাড়ছেই। এই অববাহিকার বিহারে চার মোহনার একটু পরই শাহবাজপুর হয়ে নয়াডাঙাতে মুখ করে নেবে, তাতে কার কী বলার আছে। মানুষ বাঁধের ওপরে উঠে আসছে। এমন একটা ঘটনা সে রাতে একটা বড় দৃশ্য হয়ে ওঠে। মৈয়ার গাং একটা সরু নদী বেরিয়েই একটা ছোট পাক দিয়ে তেমোহনার ঠিক পরে বাকেরগঞ্জের শায়েবাজারে মিশেছে। পাকে পাকে জড়িয়ে ধরা এমন এক তোবড়ানো বাঁক খাওয়া নদী সিঙ্গরা, যেখানে ধলেশ্বরী বনে গেল, সেটাই কি পাহাড়ের জলের হিসেবে এল, নাকি ভুলে যাওয়া কুচিয়ামোড়ার খাল বেয়ে নদী, দুবালদিয়ার বুকের মধ্যে তৈরি হওয়া নদী, স্মৃতির অদৃশ্য পারাপারের নদী, বিষাদের মেঘে ডোবা আনমনা নদী, দিনাজপুরে রাইদক নিয়ে বরিশালে শিবচরের ভেতরে বইল। কোনো বাষ্প হওয়া নেই, পলায়ন নেই। সঙ্গোপন নেই। এই অবধারিত স্রোতের নদীতে ডোবার, ভেসে ওঠার অন্তর্বর্তীকালীন তরঙ্গায়নের কোনো ঠেকনা নেই। মরণডোবা তো আর ভাসা না। কোনো কোনো মাঝি তো আছেই, যারা কিনা সারা বছর বহরের নৌকো নিয়ে সমুদ্রের উল্টোসিধে নদীপথ দিয়ে যেতে পারে। তাদের ভেতরে দু-একজন কি ফিরে আসে, না ডাঙায় আসে।
সেদিন নৌকা স্রোতের ওপর এমন তুমুল এল। সমুদ্র কখনো কখনো উপমায় সংশ্লিষ্ট হচ্ছে মানুষের এই বাঁচামরার সংখ্যাটা কমাতে বাড়াতে। পুবের বাতাসটা, ওপরের হাওয়াটা আসছে ঝাউকাঠিতে ফেলে আসা বিরান প্রান্তর থেকে…
ওপরের জলপথে হাওয়াটা যদি প্যানেল দিয়েও অসন্তোষের নিষ্পত্তি নিয়ে আসে, তাতেও বণ্টনের সূত্রে তফসিল ঘোষিত হওয়ার আগেই হাওয়াটা আর নেই। এই স্রোতের নদীতে দিগন্ত উপচানো শাহবাজপুর বলেশ্বরের হাওয়াটা কোত্থেকে নেই, তার আনুদৈর্ঘিক ছেদের আকৃতি অনুসারেই আজ আর হাওয়াটা যে নেই, তার দিকে তাকানোর ফুরসত মেলে না। রানাঘাট এসে যায়। মুহূর্তের বিচ্ছুরণে সব বাকেরগঞ্জে, মেঘনাতে, বরিশালে, দিনাজপুরে, ঝালকাঠিতে, আড়িয়াল খাঁকে পাকে পাকে জড়িয়ে ধরা মানুষের অববাহিকার উপাদানকে সংহার করে নিয়ে জেগে ওঠে।
২৪ ঘণ্টার বৃষ্টি হাওয়া বাতাসের তোড় তাদের উদোম করে দিল। কোনো আড়াল নেই। এ জলস্রোতের কাছে তাদের কোনো আলাদা সীমা সরহদ্দ নেই। মানুষের হাজারে হাজারে, কাতারে কাতারে নিজেদের একেবারে নিজস্ব পারিবারিক বলয়ে স্বামী-স্ত্রী, বাবা-মা, ছেলে-মেয়ে হয়ে, বিধবা পিসিমা হয়ে দূর দ্বীপের প্রেমিকা হয়ে, মৃত বোন হয়ে বিস্মরণের পটে বিল হাওর নদীর সমান্তরালে লেপ্টে যায়। এই সম্বন্ধগুলোও চরদখলের মতোই দুকূল ছাপিয়ে বসতি বিন্যাসের চক্র পূর্ণাঙ্গ করে। এই সন্ধ্যাটায় বাড়িঘর উড়ে যাওয়াটা…সেই খাতে সেই সমুদ্রমোহনার ভেতরে অদৃশ্য নদীর মতো আরেকটি বিন্যাস কখনো শাহবাজপুর নদী মোহনাতে, কখনো বিষখালী স্বরূপকাঠির স্রোতের মুখে নির্বাসিত হয়। গৃহস্থ চায়। সেই খাত বেয়ে মধুমতী, শাহবাজপুর, দিনাজপুর, বাকেরগঞ্জ, শায়েস্তাবাজার মানুষের মুখের রেখা বনে যায়। তার এই বৃত্তান্তে হাওয়া বৃষ্টি তো থাকলই। খাঁড়িখুড়ি, লতাগুল্ম, মানুষী ভিড়, নৈরাজ্য, নিমগ্ন নদী ঢেউ আছড়ে-পিছড়ে সে তো একটি সম্বন্ধের কাছেই তারপর ফিরে আসে। ঢেউয়ের ছইয়ের শব্দে অসীম রাতের বিমূঢ়তা কাটিয়ে সে যখন ফেরে, তখন তার আত্মীয়তা ঘুচে গেছে। এই বৃত্তান্তে তখন শুধু জলে জল পচা মানুষের গন্ধ। সে তাকিয়ে দেখে দূরতম দৃশ্যমান ঘরটিকে, যার কাছে সে ফিরতে চেয়েছিল, যা এখন দগদগে স্মৃতির গার্হস্থ্য আকাঙ্ক্ষা নিয়ে ঝড়ের তাণ্ডবে তাবড়ানো ঢেঙ্গা কাঠের ফসিল বনে গেছে।

সূত্র: দৈনিক প্রথম আলো, ডিসেম্বর ৩০, ২০১১

Share This