জঙ্গল নিবাসী বাঘ কেন, কবে থেকে আশ্রমে বেড়ে উঠতে শুরু করল—প্রশ্নটি মস্তিষ্কে দাখিল হওয়ার পরই মনে হলো, কবিতার বিচিত্র স্বভাব। নানা মত ও পথে বহুমাত্রিক লীলার মাধ্যমে সে বেড়ে ওঠে, ব্যক্ত হয় কবির যথেচ্ছ স্বাধীনতায়। ফলে কবির চেতনায় যে ব্যাঘ্রটি তসরিব রাখে, সে জঙ্গলে নয়—বেড়ে ওঠে খাঁচা ঘেরা আশ্রমের পরিপাট্যে। এখানে দ্রষ্টব্য হলো কবির দৃষ্টিভঙ্গি; যে কারণে কবি মিজান মল্লিক কবিতায় যে বাঘের কথা বলেন তাকে জঙ্গলবঞ্চিত হয়ে আশ্রমবাসী হয়ে উঠতে হয়। আশ্রমে বেড়ে ওঠা বাঘ মিজান মল্লিকের প্রথম কবিতার বই। নাম কবিতা থেকে স্পষ্ট হয় যে এই কবি একটু ভিন্নভাবে অন্য চোখে জগৎ বিচার করতে ইচ্ছুক। ভঙ্গি নয়, যেন বা এক ধরনের প্রতিভঙ্গি তৈরি করে তার মধ্য দিয়ে বলবার কথাটি বলতে পারলেই মনোবাঞ্ছাটি হাসিল হলো। প্রতিটি কবিতার কাছে তাঁর অভিপ্রায় যেন বা এরূপ।
মিজান মল্লিকের কবিতায় তেমনভাবে ইন্তেজামের ঘনঘটা নেই। চিত্রকল্পের ঔজ্জ্বল্যও অত্যুজ্জ্বল নয়। কথা বলেন লঘু স্বরে, ছোট বাক্যে এবং কথাগুলো নিতান্তই সামান্য কথা। কিন্তু সামান্য কথাই এক সময় অসামান্য হয়ে উঠতে চায়। বিবরণধর্মী বক্তব্য প্রকাশের মধ্য দিয়ে প্রতীক-ভাষ্যে শেষ অবধি তা বক্তব্যের অধিক একটি অভিজ্ঞতায় পৌঁছোয়। ছোট শব্দ-বাক্যের অসামান্য রেশনাই মূর্ত হয় তখনই। ‘পিতা’ নামাঙ্কিত কবিতার কথা যদি বলা যায়, কবিতার শরীরজুড়ে পিতার বদলে ঘোড়ার বয়ান—‘দূর গ্রাম থেকে খাদ্য বয়ে আনো/বৃদ্ধ কঙ্কালসার ঘোড়া।/কতকাল পৃষ্ঠে চড়েছি পুরো পরিবার/ছিঁড়ে নিয়েছি তোমার মাংস,/উৎসবের দিন রন্ধনশালা থেকে/বাতাসে ছিটিয়ে দিয়েছি মসলার ঘ্রাণ।/তোমার পাহাড়ি ধসনামা চোয়াল থেকে/নামিয়ে রেখেছি ছুটির আবেদননামা।/জুতা পায়ে ঘোড়ায় চড়তে অভ্যস্ত/আমরা মাংসাশী।’—এ পর্যন্ত পড়ে মনে হবে এটি নিতান্তই ঘোড়াবিষয়ক রচনার সার সংক্ষেপ। কিন্তু এর পরই কবির কারসাজি, বলে ফেললেন কহতব্য কথাটি। বস্তুত যা বলবার জন্য এতদূর অপেক্ষা—‘আমার মেয়ে পিঠে সওয়ার হলে/মনে হয়, আমিও পিতা হয়েছি।’ আর সূর্য ডুবিয়ে দেওয়ার মতো করে কবিতার এই অন্তিম স্তবক প্রকৃত প্রস্তাবে ঘোড়ার রচনার হাত থেকে রেহাই দিয়ে রচনাটিকে কবিতার মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করে। সমগ্র কবিতায় তখন এমন এক অকল্পনীয় অভিনবত্ব জারি হয় যে, নিমেষেই অর্থের বদল ঘটে। প্রতীকের ঝরনাধারায় স্নাত হয়ে মুহূর্তেই পিতার সমার্থক হয়ে ওঠে প্রাণী পদবাচ্য ঘোড়া।
মিজান মল্লিকের কাব্য-কুশলতা কবিতা থেকে কবিতায় যে বিস্ময় বয়ে আনে এর পেছনে রয়েছে তাঁর প্রতীক ব্যবহারের বিচিত্রতা। সহজ ভাঁটফুল, টুনটুনি দম্পতি, ঘাড় উল্টে কটমট তাকানো হুলো কিংবা বজ্রে পোড়া সুপারিগাছটি—সবকিছুই আমাদের চেনা ভুবনের। এ ক্ষেত্রে কবির বুননটি এমন যে, চারপাশে দেখাশোনার চেনা বস্তুগুলো নির্দিষ্ট অবয়বে আর স্থিত থাকে না। তাদের রূপান্তর ঘটে এবং কবিতার অর্থও নতুন দ্যোতনায় অভীষ্টে পৌঁছায়—‘যত্ন তো নয়ই উপরন্তু অনেক/উৎপাত আর অবহেলা সয়ে/ফুটেছে সে। সহজ ভাঁটফুল। কোনো বিশেষত্বই নেই প্রায়।/গন্ধও ছড়ায় মৃদু।’ এই কবিতার পরবর্তী অংশে কবি ভাঁটপাতার ছাউনিতে টুনটুনি দম্পতির ঘর বেঁধে দিলেন। এক পর্যায়ে দেখা গেল, টুনটুনিদের বাড়ির পথ দিয়ে যেতে যেতে খানিক দাঁড়িয়ে একটি হুলো তাদের দিকে কটমট করে তাকাচ্ছে। কবিতা শেষ। কবিতাটির নাম ‘বেঁচে থাকা’। এখানে পশু-পাখির প্রতীকে গল্প বলতে বলতে মিজান কী শেষ পর্যন্ত আমাদের সামাজিক বিন্যাস, ক্ষমতা কাঠামো এবং এর বিপরীতে অসহনীয় বেঁচে থাকাকেই চিত্রিত করলেন না? হরহামেশা নজরের চৌহদ্দিতে থাকা প্রাত্যহিকতা কিংবা রূপকথার মোটিফকে তিনি কবিতায় বিধৃত করলেন নাগরিক-ক্যামেরায়, অবশ্যই ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির নিজস্ব ‘মুদ্রাদোষ’সহ।
কবিতাগুলো পড়তে পড়তে কখনো বা পাঠকের মনে হতে পারে, এই গ্রন্থের কবি আসলে কবিতা লিখতে চাননি, বিবরণমূলক বর্ণনা বা গল্প বলাই তাঁর অভিপ্রায়! তার পরও কী করে যেন এগুলো কবিতা হয়ে উঠেছে। কেননা মিজানের লিখন ভঙ্গিমা এমন যে, বর্ণনাচ্ছলে প্রথমত তিনি গল্পের ছদ্মবেশ গড়ে তোলেন। পরের কিস্তিতে বলে ফেলেন সেই ‘একান্ত গোপন কথা’টি, যা বলার জন্য সাতখণ্ড রামায়ণের অবতারণা। যেমন, ‘ছাই’ শিরোনামে কবিতার আদ্যোপান্তজুড়ে ছাইয়ের উপযোগিতা, কার্যকরতা তথা সাদামাটা বর্ণনায় টইটম্বুর। কিন্তু যবনিকা পর্বে এসে কবি যখন ছাইকে ভিন্নাবয়বে দেখতে পেয়ে বলেন—‘সে। প্রেমে পোড়া। ছাই।/ও বাতাস তাকে জ্বালিও না।’ তখন বিবরমূলক গল্পের ছাইভস্মের ভেতর কবিতামুহূর্ত তৈরি হয়। যেন এখান থেকেই লেখা হতে পারে আরেকটি নতুন কবিতা! আশ্রমে বেড়ে ওঠা বাঘ-এর কবি এভাবেই সহি কিংবা ছদ্মবেশী গল্পের শরীরে কবিতামুহূর্ত রচনার বারুদ-বোমা স্থাপন করে আমাদের সামনে দিয়ে দিব্যি পার হয়ে গেছেন সরল বাউলের মতো।
তাঁর কবিতার নাম-সাকিন সম্পর্কে একরত্তি বাক্যে যা বলা যাবে, সবার আগে ভিন্ন প্রসঙ্গে রচিত স্বীয় পঙিক্ততে তিনিই সেটি কহেছেন যেন—‘কোনো বিশেষত্বই নেই প্রায়।/গন্ধও ছড়ায় মৃদু।’ তবে সমস্যা হলো এই ‘বিশেষত্বহীন’ এবং ‘মৃদু গন্ধ’কে পাঠকের এজলাসে মোহনীয় বলে মনে হতে পারে এক সময়।

সূত্র: দৈনিক প্রথম আলো, মে ১৪, ২০১০

%d bloggers like this: