তপন রায়চৌধুরী তপন রায়চৌধুরীর জন্ম পূর্ববঙ্গে, ১৯২৬ সালে। ইতিহাসের এই পণ্ডিত অধ্যাপনা করেছেন নানা দেশে, তবে তাঁর মুখ্য কাজের ক্ষেত্র অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়। মোগল আমলের ও ব্রিটিশ উপনিবেশের বাংলা তাঁর গবেষণার বিষয়। তাঁর স্মৃতিধর্মী দুটো বাংলা বই ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে। সম্প্রতি তিনি বাংলাদেশে এসেছিলেন এশিয়াটিক সোসাইটির আমন্ত্রণে, ব্যারিস্টার সৈয়দ ইশতিয়াক আহমেদ স্মারক বক্তৃতা দিতে। সে সময় প্রথম আলোর আমন্ত্রণে এর কার্যালয়ে এলে সাজ্জাদ শরিফ তাঁর এ সাক্ষাত্কার নেন

সাজ্জাদ শরিফ: সারা জীবন আপনি লেখালেখি করেছেন ইংরেজিতে। ৬৬ বছর বয়সে প্রথম বাংলায় লিখতে বসে এত প্রাঞ্জল, সুখপাঠ্য ও কৌতুকরসে টইটম্বুর ভাষায় লিখলেন কী করে?
তপন রায়চৌধুরী: আমি তো সাহিত্য রচনার জন্য লিখি না। যেমন মনে হয়, সেভাবেই লিখি। আমি কথাও বলি ওভাবেই। যখন লেখার কথা ভাবছি, তখন একদিন নবনীতা দেবসেনের সঙ্গে কথা বললাম। তিনি বললেন, ‘আপনি যেভাবে কথা বলেন, সেভাবেই লেখেন।’ আমি সেটাই করার চেষ্টা করেছি।
সা. শ.: আপনি গবেষণা করেছেন মোগল আমলের বা ব্রিটিশ উপনিবেশের বাংলা নিয়ে। কিন্তু স্মৃতিকথা লিখতে বসে আপনি ফিরে গেছেন ১৯৪০-এর দশকের দুর্ভিক্ষ আর দেশভাগের সময়টায়। আপনার জীবনে এ সময়ের প্রভাব অত্যন্ত প্রবল। এ সময়টা নিয়ে আপনি গবেষণা করলেন না কেন?
ত. রা.: দেখুন, একেবারে সাম্প্রতিক ঘটনা, বিশেষ করে যে সময়টার সঙ্গে নিজের জীবনের ভালোমন্দ এতটা জড়িত, কতটা নৈর্ব্যক্তিকভাবে সে সময়ের ইতিহাস লেখা সম্ভব, তা নিয়ে আমার সন্দেহ আছে। আমার কাছে ইতিহাসের দুটো দিক আছে: একটি সত্য অনুসন্ধান, অন্যটি সাহিত্যকর্ম। মোগল যুগটা আমাকে ভীষণভাবে আকর্ষণ করত। আমি তৈরি হচ্ছিলাম মোগল যুগ নিয়ে পড়াশোনা করব বলে। সে কারণে এতসব ঘটনার পরও যখন গবেষণা আরম্ভ করলাম, ফিরে গেলাম ওইখানে। আমার শেষ বই দুটো তো ইতিহাস নয়, স্মৃতিকথা। শুধু ঐতিহাসিক হিসেবে আমার জ্ঞান আমি সেখানে ব্যবহার করেছি আমার অভিজ্ঞতাগুলো ব্যাখ্যা করার জন্য।
সা. শ.: স্মৃতিকথায় অত্যন্ত মমতায় ভরা একটি একান্নবর্তী পরিবারের কথা আপনি বলেছেন। সমাজের যে ছবিটি আপনি এঁকেছেন, নানা ধর্ম-বর্ণ-গোত্র মিলিয়ে সেটাও এক বৃহত্তর একান্নবর্তী পরিবারের মতো। সেসবের বর্ণনা করতে গিয়ে যে মায়া আপনার লেখায় ঝরে পড়েছে, সেটা কি কেবল নস্টালজিয়া, নাকি এর পেছনে এমন একটি বাসনা কাজ করেছে যে সমাজটা ওভাবে টিকে থাকলে বেশ হতো?
ত. রা.: ওই সময়টা ধরে রাখা সম্ভব ছিল না। জোর করে ও সমাজ টিকিয়ে রাখা যায় না। ওটা অন্য যুগের জিনিস। আমরা সে যুগের শেষ চেহারাটা দেখেছি। ওর কতগুলো মজা আছে, আনন্দ আছে। সেসব কথা আমি লিখেছি। ওর যে নেতিবাচক দিক আছে, তাও আমি দেখেছি। পরস্পরের প্রতি ঈর্ষা, মনের ক্ষুদ্রত্বের প্রকাশ—সেসব তাতে ছিল। সে দিকটা আমি আলোচনা করিনি। কারণ আমার মনে যে স্মৃতিটা রয়ে গেছে, তার মধ্যে সেসব ছাড়িয়ে আনন্দের ভাগটাই বেশি। বালক হিসেবে সেই আনন্দটাই আমি বেশি দেখেছি।
সা. শ.: অনেকের কথা বিশদ করে লিখলেও কবি জীবনানন্দ দাশের জন্য আপনি ব্যয় করেছেন ছোট্ট একটি অনুচ্ছেদ। তাঁর ছবিটাও খুব অস্পষ্ট রেখায় আঁকা। এর কারণ কি এই যে তিনি তখনো বিখ্যাত হয়ে ওঠেননি? নাকি হিন্দু-ব্রাহ্ম বিবাদ তখনো এত গভীর যে হিন্দুসমাজের গণ্ডি পেরিয়ে ব্রাহ্ম জীবনানন্দের কাছে যাওয়া তখনো অত সহজ ছিল না?
ত. রা.: না, না। ব্রাহ্মসমাজের ব্যাপারটা তত দিনে অনেক হালকা হয়ে এসেছে। জীবনানন্দ মানুষটা ভীষণ একলাচোরা ছিলেন। আমি মাঝেমধ্যে ব্রজমোহন কলেজে গিয়েছি। তিনি একা একটা চেয়ারে বসে থাকতেন। ওঁকে নিয়ে সবাই ঠাট্টা করত। বরিশালে নদীর পাড়ে তিনি হাঁটতে বেরোতেন। তিনি হাঁটতেন একটু অদ্ভুত ভঙ্গিতে। কতগুলো ছেলে জীবনানন্দের হাঁটা অনুকরণ করে ওঁর পিছু নিত। শনিবারের চিঠি পত্রিকাগোষ্ঠী তাঁকে কী রকম অশ্রদ্ধা করত, সে কথা তো সবারই জানা। ওঁর কবিতা তাঁরা বুঝতেন না। কারণ সেটা সময়ের চেয়ে এগিয়ে গিয়েছিল। আমার নিজের কথাই বলি। সত্যজিত্ রায় আমার বন্ধু ছিলেন। তাঁর ওই যে কী যেন একটা ছবি আছে না, দার্জিলিংয়ের পটভূমিতে?
সা. শ.: কাঞ্চনজঙ্ঘা কি?
ত. রা.: হ্যাঁ, হ্যাঁ ওটা প্রথম দেখে আমার ভালো লাগেনি। সত্যজিত্ একটা সাক্ষাত্কারে বলেছিলেন, ‘আমি যখন ওই ছবিটা করি, তখন ওটা ছিল সময়ের চেয়ে অনেক এগোনো।’ দ্বিতীয়বার ছবিটা দেখে আমি খুব উপভোগ করি। তত দিনে আমি নুভেল ভাগ ছবি দেখে দেখে অনেকটা অভ্যস্ত হয়ে উঠেছি। জীবনানন্দের ক্ষেত্রেও সে রকম ব্যাপারই ঘটেছিল।
সা. শ.: স্মৃতিকথাগুলোর নানা জায়গায় আর যে মানুষটির প্রতি আপনার অনুরাগ অত্যন্ত স্পষ্ট, তিনি এ কে ফজলুল হক। কিন্তু তাঁর স্মৃতিও আপনি বেশি লেখেননি।
ত. রা.: খুব বেশি তো তাঁকে দেখিনি। তিনি করতেন কী, স্টিমারঘাট থেকে নেমে হেঁটে সার্কিট হাউসে গিয়ে উঠতেন। হেঁটে যাওয়ার পথটুকু ছিল তাঁর জনসংযোগ। বহু লোক পথের পাশে নানা তদবিরের জন্য অপেক্ষা করত। তবে অতটা উনি হাঁটতে পারতেন না। বিরাট লোক ছিলেন তো। আমাদের বাড়িতে এসে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিতেন। সেটা আমার মনে আছে। তিনি ছিলেন আমার ঠাকুরদার বন্ধু। মস্ত বড় আকারের লোক। তাঁর মুখটা আবার একটু শিথিল ছিল। একটা ঘটনা বলি। আমার বইয়েও সম্ভবত এর উল্লেখ করেছি। একবার তিনি আমাদের বাড়িতে এসেছেন। এর কিছু দিন আগে তিনি দল বদল করেছেন। ওঁর সহপাঠী ইন্দু গুপ্ত ছিলেন আমাদের বাড়িতে। তিনি ঢুকতেই ইন্দু গুপ্ত বলে উঠলেন, ‘ফজলু, তোর লইগ্যা তো ভদ্রসমাজে মুখ দ্যাহান যায় না।’ তাঁর চটজলদি জবাব, ‘মুখ যহন দ্যাখাইতেই পারস না, তাইলে হোগা দ্যাহা।’
আরেক দিন হক সাহেব স্টিমারঘাটে এসে নামছেন। আমিও সেখানে গিয়েছি। ভেবেছি, তাঁর সঙ্গে হেঁটে হেঁটেই বাড়িতে ফিরব। সে সময় উনি কৃষক-প্রজা পার্টি ছেড়ে মুসলিম লীগে যোগ দিয়েছেন কি না, আমার মনে পড়ে না। কিছু লোককে কারা যেন সেখানে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে তাঁকে কালো পতাকা দেখানোর জন্য। তাদের এও বলে দিয়েছে যে হক সাহেব স্টিমার থেকে নামলে পরে তাঁকে উদ্দেশ করে ‘শেম, শেম’ বলতে হবে। ‘শেম, শেম’ কী বস্তু, তা তো ওরা জানেও না। কালো পতাকা নামিয়ে ফজলুল হককে তারা বলতে লাগল, ‘শ্যাম, শ্যাম।’ শ্রীরাধিকাও এর থেকে মধুর স্বরে বলতে পারত না।
সা. শ.: আপনাকে তিনি একবার রাজনীতি না করে পড়াশোনার পরামর্শ দিয়েছিলেন।
ত. রা.: হ্যাঁ, অত কিছুও বলেননি। আমার দিকে তিনি একটা ঠোনা মেরেছিলেন। আমি তখন অসুস্থ হয়ে মাত্র জেল থেকে বেরিয়েছি।
সা. শ.: এটা কি ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলনের সময়কার কথা?
ত. রা.: হ্যাঁ, তখন ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলন চলছে। তো তিনি এসে বসলেন। তারপর হঠাত্ আমার দিকে তাকিয়ে বললেন—তাঁর কণ্ঠ এখনো আমার কানে বাজে—‘জ্যালে যাওনের অনেক লোক আছে। কিন্তু তোমার অন্য কাজ আছে। নিজেরে নষ্ট করিও না।’
সা. শ.: বেশ কয়েক জায়গায় আপনি মন্তব্য করেছেন, ফজলুল হকের বাড়িয়ে দেওয়া হাতটা যদি কংগ্রেস ধরত, তাহলে হয়তো দেশভাগ হতো না।
ত. রা.: হয়তো, হয়তো।
সা. শ.: কথাটা একটু ব্যাখ্যা করবেন?
ত. রা.: দেখুন, একটা কথা বলি। পাকিস্তান আন্দোলনের পেছনে ভারতবর্ষের মুসলমানদের এমন একটা ধারণা কাজ করেছিল যে গণতন্ত্রের পথে এ দেশে স্বাধীনতা এলে ওদের প্রতি অবিচার করা হবে। ১৯৩৭ সালে সাতটা প্রদেশে যখন কংগ্রেস সরকার হয়, তখন একটা প্রচার হয় যে ওদের প্রতি অত্যাচার হয়েছে। বেশির ভাগ মুসলমান এটা বিশ্বাস করতেন। তবু ’৪৬ সালের আগে পাকিস্তান আন্দোলন দানা বাঁধেনি। হক সাহেব পাকিস্তান প্রস্তাব করেন ’৪০ সালে। তবে তাঁর সন্দেহ ছিল ব্যাপারটা সম্পর্কে।
আরেকটা কথা মনে রাখতে হবে, একটা প্রদেশেও কিন্তু লীগ সরকার হয়নি ’৪৬ সালের আগে। প্রথম নির্বাচনে ’৩৭ সালের পরে সবচেয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠ দল কিন্তু কংগ্রেস। অন্য দলের সঙ্গে হাত না মিলিয়ে সরকার গঠন করতে পারত। উচ্চপর্যায়ের কথা হচ্ছে, তোমরা অন্য দলের সঙ্গে হাত মেলাওনি। অন্য দল বলতে হয় মুসলিম লীগ, নয় এদের সঙ্গে হাত মেলাতে হতো। মওলানা আবুল কালাম আজাদ কংগ্রেসের নেতাদের বলেছেন, ‘দ্যাখো, আমরা সারা জীবন তোমাদের সঙ্গে থেকেছি। এখন তোমরা অন্য দলের সঙ্গে হাত মেলালে আমাদের কংগ্রেসের মুসলমানদের কোনো গ্রহণযোগ্যতা থাকে না।’ কংগ্রেস সেটা করেনি।
কিন্তু হক সাহেব কংগ্রেস না করলেও তার দলছুট অংশ হিন্দু মহাসভার সঙ্গে শ্যামা-হক মন্ত্রিসভা গঠন করলেন। শ্যামাপ্রসাদ যখন ইস্তফা দিলেন, সেই বক্তৃতা আমি শুনেছি। আমার পিসেমশাই কিরণশঙ্কর রায়ের সঙ্গে আমি গিয়েছিলাম। অসাধারণ সেই বক্তৃতায় তিনি বলেছিলেন, ‘হক সাহেবের সঙ্গে কাজ করতে আমার একটুও অসুবিধা হয়নি। কিন্তু সরকারি-বেসরকারি ইংরেজ উপদেষ্টাদের সঙ্গে আত্মসম্মান বজায় রেখে কাজ করা কঠিন।’ হক সাহেব যখন মন্ত্রিসভায় বসতেন, বদমাশ গভর্নরটা তাঁকে উপেক্ষা করতেন। বিভিন্ন স্লিপে নানা মন্তব্য লিখে হক সাহেব শ্যামাপ্রসাদকে পাঠাতেন। শ্যামাপ্রসাদ সেগুলো পড়ে দলামোচড়া করে মেঝেতে ফেলে দিতেন। ওই টুকরোগুলো জোগাড় করে তারা গোয়েন্দাদের হাতে তুলে দিত—ভেতরে ভেতরে কী চলছে সেটা বোঝার জন্য। একবার হক সাহেব লিখেছিলেন, ‘সুভাষ আইতেয়াছে। হারামজাদাদের পিঠের ছাল ছাড়াইয়া নেবে।’ শরত্ বসু তখন কাছে চলে এসেছেন। কারণ সুভাষ বসু সে সময় জাপানে। ওরা বলল, এখানে তো একেবারে কুইসলিং সরকার তৈরি হয়ে যাবে। সামনে রীতিমতো বন্দুক রেখে হক সাহেবকে ওরা বরখাস্ত করল।
’৪৬ সালের দাঙ্গার আগে হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে কিছুটা সন্দেহ-অবিশ্বাস নিশ্চয় ছিল, কিন্তু এ রকম শত্রুতার ভাব হয়নি। ’৪৬ সালের ১৬ আগস্ট কলকাতায় যে কুিসত ঘটনাটা ঘটল, তার কোনো পূর্বপ্রস্তুতি ছিল না। আমার মুসলমান বন্ধুদের তাদের কাছ থেকে আগের দিনও এর বিন্দুমাত্র আভাস আমি পাইনি।
সা. শ.: একবার সাংবাদিক মার্ক টালি এক সাক্ষাত্কারে আমাকে বলেছিলেন, বাংলাদেশ-ভারত-পাকিস্তানের রাজনীতির মধ্যে যে বিদ্বেষ, তার উত্স দেশভাগে। এক প্রান্তে বাংলা, অন্য প্রান্তে পাঞ্জাব।
ত. রা.: তা তো বটে। কিন্তু অবস্থা যেখানে পৌঁছেছিল, সেখানে দেশভাগের বদলে কী করা যেত জানি না। বাংলা বা পাঞ্জাব না ভাঙলে হতো না, তা নয়। কিন্তু আসলে এটা হচ্ছে কংগ্রেস-লীগের লড়াই। কংগ্রেস আর লীগ একত্রে কাজ করতে রাজি ছিল না। অন্তর্বর্তী সরকারে লিয়াকত আলী খান যা করেছেন, তাতে জওয়াহরলাল নেহরু এই সিদ্ধান্তে পৌঁছান যে এঁদের সঙ্গে কাজ করা যাবে না। মওলানা আজাদও বলেছেন যে এটা নেহরুর দোষে হলো। নেহরু তো মেনেই নিয়েছিলেন, তাহলে আবার এটা-ওটা বলতে গেলেন কেন? তবে দেশভাগ যে হয়েছে, এটা মন্দের ভালো।
সা. শ.: হিন্দু-মুসলমান যে সদ্ভাবের কথা আপনি বলছেন, তার মধ্যে দাঙ্গার ব্যাপারটিকে কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন? একজন সাব-অলটার্ন বা নিম্নবর্গের ইতিহাসবিদ বলেছেন, আমাদের জাতীয়তাবাদী বা মার্ক্সবাদী সমস্ত ঐতিহাসিকই হিন্দু-মুসলমান সম্প্রীতির পূর্বধারণায় এমন আবদ্ধ থাকেন যে মনে হয় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাগুলোর কোনো পটভূমি নেই, এগুলো যেন ইতিহাসের বাইরের ঘটনা।
ত. রা.: না, না, দাঙ্গা ইতিহাসের বাইরের নয়, ইতিহাসের একেবারে ভেতরেরই ঘটনা। কিন্তু ইতিহাসের ঘটনার তো একটা ব্যাখ্যা থাকবে। আমি এর কোনো ব্যাখ্যা খুঁজে পাইনি। আমি এখনো সে ব্যাখ্যা খুঁজে বেড়াচ্ছি। যদি মরবার আগে বুঝতে পারি, কেন এটা হয়েছে—তাহলে আমার মৃত্যুটা সহজ হবে।
সা. শ.: আপনার লেখায় বরিশালে সে সময়কার বিদ্যাচর্চার আবহটা বেশ বোঝা যায়। আপনার বাবা বা মেজো জ্যাঠামশাইয়ের ছিল ধ্রুপদী বিশ্বসাহিত্যের সংগ্রহ, চারপাশের কেউ আপনাকে শুনিয়ে দিচ্ছেন ফারসি বয়েত, কোনো একটা বইয়ের দোকানে উঁকি দিচ্ছে ফরাসি গ্রন্থ। বরিশালের মতো মফস্বলে এমন আবহাওয়া তৈরি হলো কী করে?
ত. রা.: একটা কথা কি জানেন, শুধু বরিশাল নয়, বাঙালিদের মধ্যেই বিদ্যাচর্চার একটা পুরোনো প্রবণতা ছিল। আগে এর প্রকাশ ছিল ফারসি আর সংস্কৃতচর্চার মধ্য দিয়ে। নীরদ চৌধুরী লিখেছেন, ময়মনসিংহের ছোট একটি স্টেশনে তিনি ফরাসি বই দেখেছেন। এর একটা ভোক্তা অবশ্য ছিল ক্যাথলিক পাদরিরা। বরিশালে ওই টাউন হলের পাশে কালাভাইয়েরই একটা দোকান ছিল, বইয়ের। ওখানে ফরাসি বই পাওয়া যেত। আমার ঠাকুরদা ফরাসি ভাষা শেখেন। উনি ছিলেন অগুস্ত কোঁতের দর্শনের অনুসারী। অশ্বিনী দত্তের ভাই ফরাসি ভাষায় দিনপঞ্জি লিখতেন। এর অবশ্য কারণ ছিল। তিনি নানা কিছু করেছেন তো তাঁর জীবনে। অশ্বিনী দত্ত ভালো আরবি আর ফারসি জানতেন। আমার ঠাকুরদার বাবা ফারসি পণ্ডিত ছিলেন। আমার ঠাকুরদার বড় ভাই ভালো ফারসি জানতেন।
সা. শ.: ফারসি ভাষার এই পারিবারিক যোগসূত্রই কি আপনাকে মোগল সাম্রাজ্যের ইতিহাসের দিকে টেনে নিয়ে আসে? নাকি মোগল সাম্রাজ্য নিয়ে গবেষণা করতে করতে আপনি ফারসি ভাষার প্রেমে পড়েন?
ত. রা.: দুটোই পরস্পর পরস্পরের কারণ। কৈশোরে মানিক কাকার মাধ্যমে ফারসিতে আমার অনুপ্রবেশ। তিনি আমাকে ফারসি বয়েত শোনাতেন। সেই কৈশোর বয়সে—কাফ-লাভ যাকে বলে—আমি এক কিশোরীর প্রেমে পড়েছিলাম। ওর নাম ছিল লায়লা। ব্রজমোহন কলেজের অধ্যক্ষ হয়ে এসেছিলেন বিপ্লবী শৈলেন্দ্রনাথ ঘোষ। লায়লা ছিল তাঁর ও তাঁর মার্কিন স্ত্রীর কিশোরী-কন্যা। তো মানিক কাকা লায়লা-মজনুকে নিয়ে লেখা একটি বয়েত আমাকে শুনিয়ে দিলেন: ‘পা-এ সাগ বুসিদা মজনু/শখছ-এ পুশ্ত—ইয়ে চিস্ত/গোফত ইয়ে সাগ গাহে গাহে/রাহ্-এ লায়লা রফতাহ্ বুদ।’ মৌলভী সাহেবের কাছে তখন ফারসি শিখতে শুরু করেছি। তিনি আমাকে ধরিয়ে দিলেন ওমর খৈয়ামের রুবাইয়াত। ভাষাটার প্রতি এমনিতেই আমার একটা আকর্ষণ ছিল। অভিজাত মুসলমান পরিবারের মধ্যে একটা রোমান্সের আলো ছিল। আমাদের অনেক মিল, আমরা অনেক ঘনিষ্ঠ, কিন্তু যেকোনো কারণেই হোক আমরা একই রকম নই—এই ব্যাপারটা একটা রোমান্সের অনুভূতি জাগাত। চরামুদ্দির জমিদার খান ইসমাইল চৌধুরীর বাড়িতে যেতে আমার খুব ভালো লাগত। ওদের খাওয়া আমি খুব উপভোগ করতাম। সব মিলিয়ে মুসলমানদের সম্পর্কে আমার একটি ইতিবাচক কৌতূহল ছিল। সেটা থেকে আমি মোগল সাম্রাজ্যের দিকে অনেকটা আকৃষ্ট হয়ে পড়ি।
আরেকটা কারণ ছিল। আমাদের এক শিক্ষক ছিলেন সাদউল্লাহ সাহেব। তিনি জাতি-ধর্মনির্বিশেষে সবাইকে মিয়া বলে ডাকতেন। আমাকে বলতেন, ‘তপন মিয়া, কও চাই।’ ভালো পড়াতে পারতেন না। কিন্তু ইতিহাসের দিকে তিনি আমার আগ্রহ জাগিয়ে দিলেন। একগাদা বই নিয়ে আসতেন ক্লাসে: আইন-ই-আকবরী, আকবরনামা কিংবা বার্নিয়ের, তাভার্নিয়েরের লেখা ভ্রমণকাহিনী। সেসব পড়ে পড়ে শোনাতেন। একেবারে মুগ্ধ হয়ে শুনতাম। বইগুলো আমি স্কুলে থাকতেই পড়ে ফেলেছি। এগুলো আমাকে মোগল সাম্রাজ্যের দিকে টেনে নিয়ে আসে। এই সবকিছু আবার ফারসি ভাষার প্রতি আমার ভালোবাসা জাগিয়ে দেয়।
সা. শ.: গুলবদন বেগমের হুমায়ুননামা আপনি মূল ফারসি থেকে বাংলায় অনুবাদ করেছিলেন। পাণ্ডুলিপিটা হারিয়ে যায়। সেটা আরেকবার অনুবাদ করার উদ্দীপনা হারিয়ে ফেলেছিলেন?
ত. রা.: আসলে ফারসিটা ভালো করে শেখার জন্য বইটি আমি অনুবাদ করেছিলাম। আর কোনো কারণ ছিল না। অনুবাদের সময় কোনো অভিধানের দিকে তাকাইনি। মেয়েদের লেখা তো, একটু অন্য রকম। ভারি সুন্দর লেখা। সহজ ভাষা। নিজের স্বামীর একটিমাত্র উল্লেখ আছে, কিন্তু সেটি খুব সংবেদনশীল। স্বামী আসবেন, কিন্তু আসতে দেরি হচ্ছে। তিনি লিখছেন, ‘বালাকে ইন্তেজার দর্দ।’ মানে, ‘প্রতীক্ষা যে কী কষ্টের!’ ব্যস, এইটুকু মাত্র।
সা. শ.: ইতিহাসের প্রসঙ্গ যখন এসেই গেল, তাহলে একটা প্রশ্ন করি। একদিকে ঐতিহাসিক রণজিত্ গুহের প্রতি আপনার অগাধ শ্রদ্ধা। অন্যদিকে তাঁর প্রবর্তিত সাব-অলটার্ন বা নিম্নবর্গের ইতিহাসচর্চাকে আপনি বেশ খোঁচাও দিয়েছেন, কৌতুকচ্ছলে এর নাম দিয়েছেন ‘হাবিলদারচর্চা’। নতুন এই ইতিহাসচর্চাকে আপনি কীভাবে দেখেন?
ত. রা.: রণজিত্ গুহ একজন অত্যন্ত সৃজনশীল মানুষ। আমরা সবাই চেষ্টা করেছি ভারতবর্ষের ইতিহাসচর্চাকে পৃথিবীর মানচিত্রে স্থাপন করতে, কিন্তু পারিনি। তিনি পেরেছেন। এ ব্যাপারটাকে আমি শ্রদ্ধা করি। রণজিত্দা নাটকীয়তা পছন্দ করেন। তাই বলে কোনো চমক দেওয়ার জন্য তিনি সেটা করেননি। তিনি যেভাবে উপলব্ধি করেছেন, সেভাবে করেছেন। আমরা যে ইতিহাস লিখি, সেটা পাঁচ শতাংশ লোকের ইতিহাস। আমরা যে ‘বাঙালি’ ‘বাঙালি’ করি, পঁচানব্বই শতাংশ বাঙালি এর বাইরে থেকে যায়। তিনি এদের ইতিহাসচর্চার ভেতরে এনেছেন। তাঁর সঙ্গে আমার বহুবার ঝগড়া হয়েছে। কিন্তু এখন আমাদের মধ্যে খুব সদ্ভাব।
সা. শ.: আপনি তো জীবন পার করেছেন এক ঝাঁক তারকার মধ্য দিয়ে। কর্মজীবনে সহকর্মী হিসেবে পেয়েছেন অমর্ত্য সেন বা মনমোহন সিংয়ের মতো লোককে। এঁদের একজন পরে নোবেল পেয়েছেন, অন্যজন হয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী। কোনো স্ফুলিঙ্গ দেখতে পেয়েছিলেন তাঁদের মধ্যে, সে সময়?
ত. রা.: অমর্ত্যর সঙ্গে আমার বাবা আমাকে পরিচয় করিয়ে দেন। আমরা ট্রেনে চড়ে একসঙ্গে কলকাতা থেকে বম্বে যাই। তারপর জাহাজে গিয়ে উঠি। কেমব্রিজে পৌঁছানোর পর থেকেই শুনতাম, ওখানকার সমস্ত পুরস্কার ও হস্তগত করছে। আর যে থিসিস ও করল—এখন তো পঞ্চাশ বছরের ওপর হয়ে গেছে—এখনো সেটা অনেকে কেনেন, ব্যবহারযোগ্য মনে করেন। এ রকম সাধারণত হয় না অর্থনীতিতে।
আর আমি যখন দিল্লি স্কুল অব ইকনমিকসের অধ্যক্ষ, তখন মনমোহন সিং এলেন। খুব লাজুক, চুপচাপ, ভদ্র ধরনের মানুষ। বাড়ি খুঁজছেন। আমরা ছিলাম মডেল টাউনে, পাঞ্জাবি শরণার্থীদের পাড়ায়। যাঁর সঙ্গে আমরা ফ্ল্যাট শেয়ার করেছি বহুদিন, তাঁর নাম খালেক নাকভী। সে মনমোহনকে এই মডেল টাউনে এসে থাকার জন্য উদ্বুদ্ধ করতে লাগল। আমি বললাম, ‘কী করছ? ওই ভদ্রলোককে এখানে আসতে বোলো না। পরশুদিন তো একটা খুন হয়েছে এখানে।’ খালেকের উত্সাহে ভাটা পড়ল না। সে বলল, ‘ও তো বারবনিতা।’ আমি বললাম, ‘খুব ভালো জায়গায় আসতে বলছ। এখানে সন্ধেবেলায় গণিকারা খুন হয়। একটি পরিবারের থাকার পক্ষে আদর্শ জায়গা।’
সা. শ.: আপনি তো বাঙালির অতীত পর্যালোচনা করেছেন। বাঙালির ভবিষ্যত্ সম্পর্কে আপনার কী ধারণা?
ত. রা.: জাতি হিসেবে বাঙালির যে ভবিষ্যত্ আছে, সে কথা আমি বেশ জোর গলায় বলতে পারি। বাঙালির প্রতিভা অসাধারণ। সৃজনশীল কাজে বাঙালির প্রচুর ইতিবাচক প্রকাশ দেখতে পাই—চলচ্চিত্রে, নাটকে, গানে। লেখাও খারাপ নয়। প্রতি যুগে তো আর একজন করে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আসবেন না। বাঙালির সৃজনশীলতার হয়তো আরও বিকাশ হবে। আমাদের সমস্যা হলো, আমরা একসঙ্গে কাজ করতে পারি না, প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারি না। এ দেশের কথা তো আমি বলতে পারব না। তবে পশ্চিমবঙ্গে যা দেখছি, তা ভয়াবহ। বাঙালির রাজনৈতিক ভবিষ্যত্ কী, আমি সত্যিই জানি না।

সূত্র: দৈনিক প্রথম আলো, ডিসেম্বর ২৫, ২০০৯

Share This