০২. কবিতা (অনুবাদ)

০১. সন্ন্যাসীর গীতি

সন্ন্যাসীর গীতি১ উঠাও সন্ন্যাসি, উঠাও সে তান, হিমাদ্রিশিখরে উঠিল যে গান— গভীর অরণ্যে পর্বত-প্রদেশে সংসারের তাপ যথা নাহি পশে, যে সঙ্গীত-ধ্বনি-প্রশান্ত-লহরী সংসারের রোল উঠে ভেদ করি; কাঞ্চন কি কাম কিম্বা যশ-আশ যাইতে না পারে কভু যার পাশ; যথা সত্য-জ্ঞান-আনন্দ-ত্রিবেণী...

০২. প্রবুদ্ধ ভারতের প্রতি

প্রবুদ্ধ ভারতের প্রতি২                                                   জাগো আরও একবার! মৃত্যু নহে, এ যে নিদ্রা তব, জাগরণে পুনঃ সঞ্চারিতে নবীন জীবন, আরও উচ্চ লক্ষ্য ধ্যান তরে, প্রদানিতে বিরাম পঙ্কজ-আঁখি-যুগে। হে সত্য! তোমার তরে হের প্রতীক্ষায় আছে বিশ্বজন, —তব মৃত্যু...

০৩. মৃত্যুরূপা মাতা

মৃত্যুরূপা মাতা৩ নিঃশেষে নিভেছে তারাদল, মেঘ এসে আবরিছে মেঘে, স্পন্দিত ধ্বনিত অন্ধকার, গরজিছে ঘূর্ণ-বায়ুবেগে! লক্ষ লক্ষ উন্মাদ পরাণ, বহির্গত বন্দীশালা হতে, মহাবৃক্ষ সমূলে উপাড়ি’ ফুৎকারে উড়ায়ে চলে পথে! সমুদ্র সংগ্রামে দিল হানা, উঠে ঢেউ গিরিচূড়া জিনি’ নভস্তল পরশিতে চায়!...

০৪. খেলা মোর হল শেষ

খেলা মোর হল শেষ৪ কভু উঠি, কখনও বা পড়ি                          কালের তরঙ্গ সনে গড়াইয়া চলিয়াছি হায়, ক্ষণস্থায়ী এক দৃশ্য হতে                          স্বল্পস্থায়ী দৃশ্যান্তরে জীবনের জোয়ার-ভাঁটায়। অন্তহীন এই প্রহসনে                          তিক্ত আজি প্রাণ মোর; আর ইহা...

০৫. দোষ কারও নয়

দোষ কারও নয়৫ দিনমণি ডুবে অস্তাচলে, রেখে যায় রক্তরাঙা কর, আলোকিত ক্ষীণ দিনমানে এই যেন শেষ অবসর! রাখি আঁখি দেখি সচকিতে বিজয়ের রাশি পিছে রয়, জয়ে গণি হীন লজ্জা বলে আমি ছাড়া দোষী কেহ নয়। জীবনেরে গড়ি দিন দিন কিম্বা উহা করে চলি ক্ষয়, যথাকর্ম সেইরূপ ফল— শুভে শুভ, মন্দে মন্দ...

০৬. ধৈর্য ধর কিছুকাল হে বীর হৃদয়

ধৈর্য ধর কিছুকাল হে বীর হৃদয়৬ সূর্য যদি মেঘাচ্ছন্ন হয় কিছুক্ষণ যদি বা আকাশ হের বিষণ্ণ গম্ভীর, ধৈর্য ধর কিছুকাল হে বীর হৃদয়, জয় তব জেনো সুনিশ্চয়। শীত যায়, গ্রীষ্ম আসে তার পাছে পাছে, ঢেউ পড়ে, ওঠে পুন তারি সাথে সাথে, আলো ছায়া আগাইয়া দেয় পরস্পরে; হও তবে ধীর, স্থির, বীর।...

০৭. অজানা দেবতা

অজানা দেবতা৭ ১ অন্ধকার নিরাশার বিসর্পিল পথে ক্লান্ত পদে এ নির্মম নিরানন্দ জীবনের ভারনত চলেছে পথিক। হৃদয়ের মননের কোন প্রান্ত হতে কোথাও মেলে না প্রাণে নিমেষের প্রেরণা-স্পন্দন। অবশেষে একদা যখন লুপ্তপ্রায় সীমারেখা ভালমন্দ সুখদুঃখ জন্মমরণের— অকস্মাৎ উদ্ভাসিল পুণ্যরজনীতে...

০৮. হে স্বপন!

হে স্বপন!৮ ভাল মন্দ যাই হয় হোক, সুখের সুস্মিত হাসি দেখা দেয় যদি, অথবা উদ্বেল হয় দুঃখ-পারাবার, সবারি আপন অংশ আছে অভিনয়ে, কারও হাসি কারও কান্না, যখন যেমন, রয়েছে আপন সাজ প্রত্যেকের তরে— রৌদ্র জলে আবর্তিয়া চলে দৃশ্যান্তর। হে স্বপন! সার্থক স্বপন! কাছে দূরে প্রসারিত কর...

০৯. অকালে ফোটা একটি ফুলের প্রতি

অকালে ফোটা একটি ফুলের প্রতি৯ তুষার-কঠিন মাটিই না হয় হোক না তোমার শয্যা, আবরণ তব শীতার্ত ঝঞ্ঝার, জীবনের পথে নাই বা জুটিল বন্ধুজনার হর্ষ, ব্যর্থ তোমার সৌরভ-বিস্তার; প্রেম যদি হয় নিজেই ব্যর্থ তবু কী-বা আসে যায় না হয় ব্যর্থ সৌরভসঞ্চার— অকল্যাণের জয় যদি হয়, কল্যাণ পরাজিত,...

১০. কে জানে মায়ের খেলা!

কে জানে মায়ের খেলা!১০ কে জানে—হয়তো তুমি ক্রান্তদর্শী ঋষি! সাধ্য কার স্পর্শ করে সে অতল গভীর গহন, যেখানে লুকান রয় মা’র হাতে অমোঘ অশনি! হয়তো পড়েছে ধরা উৎসুক করুণনেত্র শিশুর দৃষ্টিতে, দৃশ্যের আড়ালে কোন ছায়ার সঙ্কেত, মুহূর্তে যা হতে পারে দুর্নিবার ঘটনাপ্রবাহ। আসে তারা কখন...

১১. পানপাত্র

পানপাত্র১১ এই তব পানপাত্র, তোমারি উদ্দেশে সৃষ্টির উন্মেষ হতে এ পাত্র-রচনা। জানি জানি এ পানীয় কালকূট ঘোর, তোমারি মন্থিত সুরা—দূর অতীতের বাসনা বেদনা ভ্রান্তি যুগযুগান্তের। দুর্গম দুঃসহ পন্থা—এই তব পথ, প্রতি পদে অবিশ্রান্ত উপল-সঙ্ঘাত সে আমারি দান। দিয়েছি বন্ধুরে তব...

১২. জাগ্রত দেবতা

জাগ্রত দেবতা ১২ সেই এক বিরাজিত অন্তরে বাহিরে, সব হাতে তাঁরি কাজ, সব পায়ে তাঁরি চলা, তাঁরি দেহ তোমরা সবাই, কর তাঁর উপাসনা, ভেঙে ফেলো আর সব পুতুল প্রতিমা। মহামহীয়ান যিনি, দীন হতে দীন, একাধারে কীট ও দেবতা যিনি, পাপী পুণ্যবান, দৃশ্যমান, জ্ঞানগম্য, সর্বব্যাপী, প্রত্যক্ষ...

১৩. আলোক

আলোক ১৩ সম্মুখে পশ্চাতে চেয়ে দেখি— সব ঠিক, সকলি সার্থক। বেদনার গভীর আমার জ্বলে এক চিন্ময়...

১৪. শান্তিতে সে লভুক বিশ্রাম

শান্তিতে সে লভুক বিশ্রাম১৪ চল আত্মা, শীঘ্রগতি, তারকা-খচিত তব পথে, ধাও হে আনন্দময়, যেথা নাহি বাঁধে মনোরথে; দেশকাল দৃষ্টিপথ যেথা নাহি করে আবরণ! চিরশান্তি আশীর্বাদ যেথা করে তোমারে বরণ! সার্থক তোমার সেবা, পরিপূর্ণ তব আত্মদান, অপার্থিব প্রেমপূর্ণ হৃদয়েতে হোক তব স্থান;...

১৫. আশীর্বাদ

আশীর্বাদ ১৫ বীরের সঙ্কল্প আর মায়ের হৃদয়, দক্ষিণের সমীরণ—মৃদুমধুময়, আর্যবেদী ’পরে দীপ্ত মুক্ত হোমানলে যে পুণ্য সৌন্দর্য আর যে শৌর্য বিরাজে— সকলই তোমার হোক, আরও, আরও কিছু স্বপ্নেও ভাবেনি যাহা অতীতের কেহ। ভারতের ভবিষ্যৎ সন্তানের তরে তুমি হও বন্ধু, দাসী,...

১৬. মুক্তি

মুক্তি১৬ ওই দেখ মিলাইয়া যায় কালো মেঘপুঞ্জ যত রাত্রির আঁধারে আরও ঘন করি, ধরণীর ’পরে তাহারা থমকি ছিল, অবসন্ন বিষাদ কালিমা! তোমার মোহন-স্পর্শে জগৎ জাগিয়া উঠে ওই! পাখীরা তুলিছে তান—ফুলদল তুলে ধরে তার শিশির-খচিত শত তারার মুকুট; সুস্বাগত জানায় তোমায় তারা দুলিয়া দুলিয়া।...

১৭. শান্তি

শান্তি ১৭ ওই দেখ—আসে মহাবেগে মহাশক্তি, যাহা শক্তি নয়-— অন্ধকারে আলোকস্বরূপ তীব্রালোকে ছায়ার আভাস আনন্দ যা হয়নি প্রকাশ, অবেদিত দুঃখ সুগভীর, অযাপিত অমৃত জীবন— অশোচিত মৃত্যু সনাতন। দুঃখ নয়, আনন্দও নয় মাঝে তার তারে বোধ হয়, রাত্রি নয়, ঊষাও সে নয়— উভয়ের মাঝে জুড়ে রয়।...

১৮. জীবন্মুক্তের গীতি

জীবন্মুক্তের গীতি ১৮ বিস্তারে বিশাল ফণা দলিতা ফণিনী; প্রজ্বলিত হুতাশন যথা সঞ্চালনে, শূন্য ব্যোম-পথে যথা উঠে প্রতিধ্বনি মর্মাহত কেশরীর কুপিত গর্জনে। প্লাবনের ধারা ঢালে যথা মহা ঘন, দামিনী ঝলকে তার হৃদি বিদারিয়া, আত্মার গভীর দেশে করিলে স্পন্দন, মহাপ্রাণ উচ্চ তত্ত্ব দেয়...

১৯. আমারই আত্মাকে

আমারই আত্মাকে ১৯ ধরে থাক আরও কিছুকাল, অটল হৃদয়, ছিন্ন করো নাকো এই আজন্ম বন্ধন, যদিও অস্পষ্ট ক্ষীণ এই বর্তমান—ভবিষ্যৎ ঘনতমোময়! কেটে গেছে যেন এক যুগ—তোমাতে আমাতে মিলে যাত্রা শুরু করিলাম—জীবনের উঁচু-নীচু পথে, অপূর্ব সমুদ্রে কভু ভেসে যাই শান্ত ধীর পালে, আমি মোর তব কাছে,...

২০. আমন্ত্রণ

আমন্ত্রণ ২০ রোদন কি হেতু সখা? সর্বশক্তি তোমারি তো অন্তরে নিহিত! জ্ঞান-বীর্য-প্রদ সেই নিজ দিব্য স্বরূপেরে কর উদ্বোধিত— ত্রিলোকে যা কিছু আছে সবই তব পাদমূলে আসিবে তখন! আত্মার শক্তিই হয় চিরজয়ী—জড়শক্তি নহে কদাচন। ত্রিভুবন উপাড়িব, তারকা চিবায়ে খাব [করি অট্টহাস]! জান না কি...