০১. জ্ঞানযোগ

০১. মায়া

মায়া (লণ্ডনে প্রদত্ত বক্তৃতা) ‘মায়া’ কথাটি আপনারা প্রায় সকলেই শুনিয়াছেন। সাধারণতঃ কল্পনা বা কুহক বা এইরূপ কোন অর্থে মায়া-শব্দ ব্যবহৃত হইয়া থাকে, কিন্তু তাহা উহার প্রকৃত অর্থ নহে। মায়াবাদ-রূপ অন্যতম স্তম্ভের উপর বেদান্ত স্থাপিত বলিয়া মায়ার যথার্থ তাৎপর্য বুঝা আবশ্যক।...

০২. মানুষের যথার্থ স্বরূপ (১)

মানুষের যথার্থ স্বরূপ [লণ্ডনে প্রদত্ত বক্তৃতা] মানুষ এই পঞ্চেন্দ্রিয়গ্রাহ্য জগতে এতটা আসক্ত যে, সহজে সে উহা ছাড়িতে চাহে না। কিন্তু এই বাহ্য জগতকে যতদূর সত্য বা সার বলিয়া বোধ হউক না কেন, প্রত্যেক ব্যক্তি এবং প্রত্যেক জাতির জীবনেই এমন একটি সময় আসে যখন অনিচ্ছাসত্তেও...

০৩. মানুষের যথার্থ স্বরূপ (২)

মানুষের যথার্থ স্বরূপ (২) [নিউ ইয়র্কে প্রদত্ত বক্তৃতা] আমরা এখানে দাঁড়াইয়া আছি, কিন্তু আমাদের দৃষ্টি সম্মুখে প্রসারিত, অনেক সময় আমরা বহু দুরে দৃষ্টিনিক্ষেপ করি। মানুষও যতদিন চিন্তা করিতে আরম্ভ করিয়াছে, ততদিন এইরূপ করিতেছে। মানুষ সর্বদাই সম্মুখে—ভবিষ্যতে দৃষ্টিনিক্ষেপ...

০৪. মায়া ও ঈশ্বর-ধারণার ক্রমবিকাশ

মায়া ও ঈশ্বর-ধারণার ক্রমাবকাশ [লণ্ডনে প্রদত্ত বক্তৃতা : ২০ অক্টোবর, ১৮৯৬] আমরা দেখিয়াছি, অদ্বৈত বেদান্তের অন্যতম মূলভিত্তিস্বরূপ মায়াবাদ অস্ফুটভাবে সংহিতাতেও দেখিতে পাওয়া যায়, আর উপনিষদে যে-সকল তত্ত্ব খুব পরিস্ফুট ভাব ধারণ করিয়াছে, সংহিতাতে তাহার সবগুলিই কোন না কোন...

০৫. মায়া ও মুক্তি

মায়া ও মুক্তি [লণ্ডনে প্রদত্ত বক্তৃতা : ২২শে অক্টোবর, ১৮৯৬] কবি বলেন, ‘পিছনে হিরণ্ময় জলদজাল লইয়া আমরা জগতে প্রবেশ করি। কিন্তু’ সত্য কথা বলিতে গেলে, আমরা সকলেই এরূপ মহিমামণ্ডিত হইয়া সংসারে প্রবেশ করি না; আমাদের অনেকেই কুজ্ঝটিকার কালিমা লইয়া জগতে প্রবেশ করে; ইহাতে কোন...

০৬. ব্রহ্ম ও জগৎ

অনন্ত ব্রহ্ম যিনি, তিনি সসীম হইলেন কিরূপে—অদ্বৈত বেদান্তের এই বিষয়টি ধারণা করা অতি কঠিন। এই প্রশ্ন মানুষ পুনঃ পুনঃ জিজ্ঞাসা করিবে কিন্তু এই প্রশ্ন চিরকাল থাকিবে—যিনি অনন্ত অসীম, তিনি সসীম হইলেন কিরূপে? আমি এখন এই প্রশ্নটি আলোচনা করিব। ভাল করিয়া বুঝাইবার জন্য এই...

০৭. জগৎ(১)

[নিউইয়র্কে প্রদত্ত বক্তৃতা ১৯শে জানুআরি, ১৮৯৬] সুন্দর কুসুমরাশি চতুর্দিকে সুবাস ছড়াইতেছে, প্রভাতের সূর্য অতি সুন্দর লোহিতবর্ণ ধরিয়া উঠিতেছে। প্রকৃতি নানা বিচিত্র বর্ণে সজ্জিত হইয়া পরম রমণীয় হইয়াছে। সমগ্র জগৎই সুন্দর, আর মানুষ পৃথিবীতে আসিয়া অবধি এই সৌন্দর্য সম্ভোগ...

০৮. জগৎ(২)

ক্ষুদ্র ব্রহ্মাণ্ড [নিউ ইয়র্কে প্রদত্ত, ২৬শে জানুয়ারি, ১৮৯৬] মনুষ্যমন স্বভাবতই বহির্মুখী। মন যেন শরীরের বাহিরে ইন্দ্রিয়গুলির মধ্য দিয়া উঁকি মারিতে চায়। চক্ষু অবশ্যই দেখিবে, কর্ণ অবশ্যই শুনিবে, ইন্দ্রিয়গণ অবশ্যই বহির্জগৎ প্রত্যক্ষ করিবে। তাই স্বভাবতই প্রকৃতির সৌন্দর্য...

০৯. অমৃতত্ব

[আমেরিকায় প্রদত্ত বক্তৃতা] জীবাত্মার অমরত্ব সম্বন্ধে প্রশ্ন মানুষ যতবার জিজ্ঞাসা করিয়াছে, ঐ তত্ত্বের রহস্য উদ‍্ঘাটন করিতে মানুষ সমগ্র জগৎ যত অধিক খুঁজিয়াছে, ঐ প্রশ্ন মানব-হৃদয়ের যেমন অন্তরতর ও প্রিয়তর, ঐ প্রশ্ন আমাদের অস্তিত্বের সহিত যেমন অচ্ছেদ্যভাবে জড়িত, তেমন আর...

১০. বহুত্বে একত্ব

[লণ্ডনে প্রদত্ত বক্তৃতা, ৩রা নভেম্বর, ১৮৯৬] পরাঞ্চি খানি ব্যতৃণৎ স্বয়ম্ভূস্তস্মাৎ পরাঙ‍্ পশ্যতি নান্তরাত্মন‍্। কশ্চিদ্ধীরঃ প্রত্যগাত্মানমৈক্ষদাবৃত্তচক্ষুরমৃতত্বমিচ্ছন‍্ ।।১ —’স্বয়ম্ভূ সৃষ্টিকর্তা ইন্দ্রিয়গুলিকে বহির্মুখ করিয়া দিয়াছেন, সেইজন্যই মনুষ্য বাহিরের...

১১. সর্ববস্তুতে ব্রহ্মদর্শন

 [লণ্ডনে প্রদত্ত বক্তৃতা, ২৭শে অক্টোবর, ১৮৯৬] আমরা দেখিয়াছি, আমরা দুঃখ দূর করিতে যতই চেষ্টা করি না কেন, আমাদের জীবনের বেশীর ভাগই অবশ্য দুঃখপূর্ণ থাকিবে। আর এই দুঃখরাশি আমাদের পক্ষে একরূপ সীমাহীন। আমরা অনাদি কাল হইতে এই দুঃখ প্রতিকারের চেষ্টা করিতেছি, কিন্তু বাস্তবিক...

১২. অপরোক্ষানুভূতি

[লণ্ডনে প্রদত্ত বক্তৃতা, ২৯শে অক্টোবর, ১৮৯৬] আমি তোমাদিগকে আর একখানি উপনিষদ‍্ হইতে পাঠ করিয়া শুনাইব। ইহা অতি সরল অথচ অতিশয় কবিত্বপূর্ণ; ইহার নাম ‘কঠোপনিষদ‍্’। তোমাদের অনেকে বোধ হয়, সার এডুইন আর্নল্ড-কৃত ইহার অনুবাদ পাঠ করিয়াছ। আমরা পূর্বে দেখিয়াছি, জগতের...

১৩. আত্মার মুক্তস্বভাব

[লণ্ডনে প্রদত্ত-৫ই নভেম্বর, ১৮৯৬] আমরা পূর্বে যে কঠোপনিষদের আলোচনা করিতেছিলাম তাহা এখন যাহার আলোচনা করিব, সেই ছান্দোগ্য উপনিষদের অনেক পরে রচিত হইয়াছিল। কঠোপনিষদের ভাষা অপেক্ষাকৃত আধুনিক, উহার চিন্তাপ্রণালীও সর্বাপেক্ষা অধিক প্রণালীবদ্ধ। প্রাচীনতর উপনিষদ‍্গুলির ভাষা আর...

১৪. কর্মজীবনে বেদান্ত (প্রথম প্রস্তাব)

[লণ্ডনে প্রদত্ত, ১০নভেম্বর, ১৮৯৬] কর্মজীবনে বেদান্তদর্শনের উপযোগীতা সম্বন্ধে অনেকে আমাকে কিছু বলিতে বলিয়াছেন। আমি পূর্বেই বলিয়াছি, মতবাদ খুব ভাল বটে, কিন্তু কিভাবে উহা কার্যে পরিণত করা যাইবে , তাহাই প্রকৃত সমস্যা। যদি কার্যে পরিণত করা একেবারে অসম্ভব হয়, তবে বু্দ্ধির...

১৫. কর্মজীবনে বেদান্ত (দ্বিতীয় প্রস্তাব)

[লণ্ডনে প্রদত্ত বক্তৃতা,-১২ই নভেম্বর, ১৮৯৬] আমি ছান্দোগ্য উপনিষদ‍্ হইতে একটি গল্প১ বলিব—একটি বালকের কিরূপে জ্ঞানলাভ হইয়াছিল। গল্পটি প্রাচীন ধরনের বটে, কিন্তু উহার ভিতরে একটি সারতত্ত্ব নিহিত আছে। একটি অল্পবয়স্ক বালক তাহার মাতাকে বলিল, ‘মা, আমি বেদশিক্ষা করিতে...

১৬. কর্মজীবনে বেদান্ত (তৃতীয় প্রস্তাব)

[লণ্ডনে প্রদত্ত বক্তৃতা, ১৭ই নভেম্বর, ১৮৯৬] পূর্বোক্ত (ছান্দোগ্য) উপনিষদ‍্ হইতেই আমরা পাইতেছি যে, দেবর্ষি নারদ এক সময় সনৎকুমারের নিকট আগমন করিয়া অনেক প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করিলেন। সনৎকুমার তাঁহাকে সোপানারোহণ-ন্যায়ে ধীরে ধীরে লইয়া গিয়া অবশেষে আকাশতত্ত্বে উপনীত হইলেন।...

১৭. কর্মজীবনে বেদান্ত (চতুর্থ প্রস্তাব)

[লণ্ডনে প্রদত্ত বক্তৃতা, ১৮ই নভেম্বর, ১৮৯৬] আমরা এ পর্যন্ত সমষ্টির আলোচনাই করিয়া আসিয়াছি। অদ্য প্রাতে আমি তোমাদের সমক্ষে ব্যষ্টির সহিত সমষ্টির সম্বন্ধ বিষয়ে বেদান্তের মত বলিতে চেষ্টা করিব। আমরা প্রাচীনতর দ্বৈতবাদাত্মক বৈদিক মত দেখিতে পাই, প্রত্যেক জীবের একটি নির্দিষ্ট...