০৮. পত্রাবলী ১৮৫-১৯৪

১৮৫*

নিউ ইয়র্ক
১৪ মে, ১৮৯৫

প্রিয় আলাসিঙ্গা,
বইগুলি সব নিরাপদে পৌঁছেছে। সেজন্য বহু ধন্যবাদ। শীঘ্রই তোমায় কিছু টাকা পাঠাতে পারব—খুব বেশী অবশ্য নয়, এখন কয়েক শতমাত্র; তবে যদি বেঁচে থাকি সময়ে সময়ে কিছু পাঠাব।

এখন নিউ ইয়র্কের ওপর আমার একটা প্রভাব বিস্তৃত হয়েছে; আশা করছি, একদল স্থায়ী কর্মী পাব, আমি এদেশ ছেড়ে চলে গেলে তারা কাজ চালাবে। বৎস, দেখছ এইসব খবরের কাগজের হুজুগ কিছুই নয়। যখন আমি চলে যাব, তখন এখানে আমার কাজের একটা স্থায়ী দাগ রেখে যাওয়া উচিত; আর প্রভুর আশীর্বাদে তা শীঘ্রই হবে। অবশ্য টাকাকড়ির দিক দিয়ে ধরলে সফলতা হয়নি, বলতে হবে। কিন্তু জগতে সমুদয় ধনরাশির চেয়ে ‘মানুষ’ হচ্ছে বেশী মূল্যবান।

মিস হ্যামলিন আমায় যথেষ্ট সাহায্য করছেন—আমি সেজন্য তাঁর নিকট বিশেষ কৃতজ্ঞ। তিনি আমার প্রতি বড়ই সদয় ব্যবহার করছেন—আশা করি, তাঁর ভাবের ঘরেও চুরি নাই। তিনি আমাকে ‘ঠিক ঠিক লোকদের’ সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিতে চান—আমার ভয় হয়, পূর্বে যেমন একবার শেখান হয়েছিল, ‘নিজেকে সামলে রেখো, যার তার সঙ্গে মিশো না’—এ ব্যাপার তারই দ্বিতীয় সংস্করণ। প্রভু যাঁদের পাঠান, তাঁরাই খাঁটি লোক; আমার সারা জীবনের অভিজ্ঞতায় এই কথাই তো আমি বুঝেছি। তাঁরাই যথার্থ সাহায্য করতে পারেন, আর তাঁরাই আমাকে সাহায্য করবেন। আর অবশিষ্ট লোকদের সম্বন্ধে বক্তব্য এই, প্রভু তাদের সকলেরই কল্যাণ করুন, আর তাদের হাত থেকে আমায় রক্ষা করুন।

তুমি আমার জন্য ভেবো না—প্রভু আমায় রক্ষা করছেন। আমার এদেশে আসা, আর এত পরিশ্রম ব্যর্থ হতে দেওয়া হবে না। প্রভু দয়াময়—যদিও এমন লোক অনেক আছে, যারা—যে-কোনরূপে হোক—আমার অনিষ্ট করবার চেষ্টা করেছে; আবার এমন লোকও অনেক আছে, যারা শেষ পর্যন্ত আমার সহায়তা করবে। অনন্ত ধৈর্য, অনন্ত পবিত্রতা, অনন্ত অধ্যবসায়—এই তিনটি জিনিষ থাকলে যে-কোন সৎ আন্দোলনে অবশ্যই সফল হতে পারা যায়; এই হল সিদ্ধিলাভের রহস্য।

এই ‘ঠিক ঠিক লোকদের’ কথা এখন থাক। হে আমার শিব, তুমিই আমার ভাল, তুমিই আমার মন্দ। প্রভো, বাল্যকাল থেকেই আমি তোমার চরণে শরণ নিয়েছি। গ্রীষ্মপ্রধান দেশে বা হিমানীমণ্ডিত মেরুপ্রদেশে, পর্বতচূড়ায় বা মহাসমুদ্রের অতল তলে—যেখানেই যাই, তুমি আমার সঙ্গে সঙ্গে থাকবে। তুমিই আমার গতি, আমার নিয়ন্তা, আমার শরণ, আমার সখা, আমার গুরু, আমার ঈশ্বর, তুমিই আমার স্বরূপ। তুমি কখনই আমায় ত্যাগ করবে না—কখনই না, এ আমি ঠিক জানি। হে আমার ঈশ্বর, আমি কখনও কখনও একলা প্রবল বাধাবিঘ্নের সঙ্গে যুদ্ধ করতে করতে দুর্বল হয়ে পড়ি, তখন মানুষের সাহায্যের কথা ভাবি। চিরদিনের জন্য ওসব দুর্বলতা থেকে আমায় রক্ষা কর, যেন আমি তোমা ছাড়া আর কারও কাছে কখনও সাহায্য প্রার্থনা না করি। যদি কেউ কোন ভাল লোকের ওপর বিশ্বাস স্থাপন করে, সে কখনও তাকে ত্যাগ করে না বা তার প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করে না। প্রভু, তুমি সকল ভালর সৃষ্টিকর্তা—তুমি কি আমায় ত্যাগ করবে? তুমি তো জান, সারা জীবন আমি তোমার—কেবল তোমারই দাস। তুমি কি আমায় ত্যাগ করবে—যাতে অপরে আমায় ঠকিয়ে যাবে বা আমি মন্দের দিকে ঢলে পড়ব?

সদা আশীর্বাদক
বিবেকানন্দ

১৮৬*

[মিঃ স্টার্ডিকে লিখিত]

C/o Miss Mary Philips
19 W. 38th St., নিউ ইয়র্ক
২৮ মে, ১৮৯৫

প্রিয় আলাসিঙ্গা,
এই সঙ্গে আমি একশ’ ডলার অথবা ইংরেজী মুদ্রা হিসাবে ২০ পাউণ্ড ৮ শিলিং ৭ পেন্স পাঠালাম। আশা করি, এতে তোমাদের কাগজটা বার করবার কিঞ্চিৎ সাহায্য হবে, পরে ধীরে ধীরে আরও সাহায্য করতে পারব।

সদা আশীর্বাদক
বিবেকানন্দ

পুঃ—পত্রপাঠ নিউ ইয়র্কে উপরের ঠিকানায় প্রাপ্তিস্বীকার করবে। এখন থেকে নিউ ইয়র্ক আমার প্রধান আস্তানা। অবশেষে আমি এদেশে কিছু করে যেতে সমর্থ হলাম।

—বি

১৮৭*

54 W. 33rd St, নিউ ইয়র্ক
মে, ১৮৯৫

প্রিয় মিসেস বুল,
আমি গতকাল মিস থার্সবিকে ২৫ পাউণ্ড দিয়েছি। ক্লাসগুলি চলছে বটে, কিন্তু দুঃখের সঙ্গে জানাচ্ছি—যদিও ক্লাসে বহু ছাত্রের সমাগম হয়, তারা যা দেয়, তাতে ঘরভাড়াটাও ওঠে না। এই সপ্তাহটা চেষ্টা করে দেখব, তারপর ছেড়ে দেব।

আমি সহস্রদ্বীপোদ্যানে (Thousand Island Park) আমার ক্লাসের জনৈকা ছাত্রী মিস ডাচারের কাছে যাচ্ছি। ভারতবর্ষ থেকে বেদান্তের বিভিন্ন ভাষ্য আমার নিকট শীঘ্র পাঠান হচ্ছে। এই গ্রীষ্মে ওখানে থাকাকালে আমি ‘বেদান্তদর্শনের তিনটি বিভিন্ন সোপান’ সম্বন্ধে ইংরেজীতে একখানি বই লিখব মনে করছি; তারপর গ্রীনএকারে যেতে পারি।

মিস ফার্মার আমার কাছে জানতে চান, এই গ্রীষ্মে গ্রীনএকারে কোন্ কোন্ বিষয়ে বক্তৃতা করব, আর কোন্ সময়েই বা সেখানে যাব। আমি এর উত্তরে কি লিখব বুঝতে পাচ্ছি না। আশা করি, আপনি কৌশলে ঐ অনুরোধ কাটিয়ে দেবেন—এ বিষয়ে আপনার উপর সম্পূর্ণ নির্ভর করলাম।

আমি বেশ ভাল আছি—মুদ্রাকর সমিতির (Press Association) জন্য ‘অমরত্ব’ (Immortality) বিষয়ে আমার প্রতিশ্রুত একটি প্রবন্ধ লিখতে বিশেষ ব্যস্ত আছি।

আপনার অনুগত
বিবেকানন্দ

১৮৮*

21 W. 34th St, নিউ ইয়র্ক
জুন, ১৮৯৫

প্রিয় জো,৬৮
নানা ঝড়-ঝাপটা তোমার উপর দিয়ে যাচ্ছে, দেখছি। ফলে নিশ্চয়ই আরও বহু আবরণ অপসৃত হবে।

মিঃ লেগেট তোমার ফনোগ্রাফের কথা বলছিলেন। তাঁকে কয়েকটি চোঙ (cylinders) সংগ্রহ করতে বলেছি। ‘কারও একটি ফনোগ্রাফে ঐগুলি দিয়ে কথা বলি, পরে ঐগুলি জো-কে পাঠিয়ে দি’—আমার এই কথা শুনে তিনি বললেন, ‘আমি তো একটি ফনোগ্রাফ কিনে দিতে পারি। জো যা বলে আমি তাই করি।’ তাঁর অন্তরে একটা কবিত্ব প্রচ্ছন্ন আছে দেখে সুখী হলাম।

আজ গার্নসিদের ওখানে থাকতে যাচ্ছি। ডাক্তার নিজের তত্ত্বাবধানে রেখে আমাকে রোগমুক্ত করতে চান। অন্য সব পরীক্ষার পর ডাঃ গার্নসি আমার নাড়ী দেখছিলেন; এমন সময় সহসা ল্যাণ্ডস‍্‌বার্গ এসে হাজির, আমাকে দেখামাত্র সরে পড়ল। ডাক্তার গার্নসি খুব হেসে উঠে বললেন যে, ঠিক ঐ সময়ে আসার জন্য তিনি লোকটিকে পুরস্কৃত করতে ইচ্ছুক, কারণ সে আসাতে রোগটা ঠিক ঠিক নির্ণয় করা গেল। তার আসবার পূর্ব পর্যন্ত নাড়ীর স্পন্দন ঠিক ছিল, কিন্তু তাকে দেখামাত্র মানসিক উত্তেজনার ফলে স্পন্দন প্রায় থেমে গেল। নিশ্চয় হল—রোগটি স্নায়ুসংক্রান্ত। তিনিও আমাকে ডাক্তার হেল‍্‍মারের চিকিৎসাই চালাতে বললেন—জোর করে। তাঁর বিশ্বাস হেল‍্‍মার আমাকে রোগমুক্ত করবেন। লোকটি বেশ উদার।

আজই শহরে ‘পবিত্র গাভী’ (the sacred cow) দেখতে যাবার ইচ্ছা। নিউ ইয়র্কে আর দিন-কয়েক আছি। হেল‍্‍মার বলেছেন, সপ্তাহে তিনবার করে চার সপ্তাহ, তার পর দু-বার করে আর চার সপ্তাহ চিকিৎসা করালেই সম্পূর্ণ সুস্থ হব। যদি ইতোমধ্যে বোষ্টনে যাই, তিনি ওখানকার এক ওস্তাদ চিকিৎসককে আবশ্যকমত নির্দেশ দেবেন।

ল্যাণ্ডস‍্‌বার্গের সঙ্গে সামান্য মিষ্টালাপের পর বেচারীকে অব্যাহতি দেবার জন্য— উপরতলায় মাদার গার্নসির নিকট চলে গেলাম। ইতি

সতত প্রভুপদে তোমাদের
বিবেকানন্দ

১৮৯

[স্বামী রামকৃষ্ণানন্দকে লিখিত]

যুক্তরাষ্ট্র, আমেরিকা
১৮৯৫

কল্যাণবরেষু,
তোমাদের এক পত্রে অনেক সমাচার জ্ঞাত হইলাম। তবে সকলের বিশেষ সমাচার লিখ নাই। নিরঞ্জনের এক পত্র মধ্যে পাই—সে সিলোন যাইতেছে সংবাদ পাই। সারদা যাহা করিতেছে, তাহাই আমার অভিমত; তবে ‘রামকৃষ্ণ পরমহংস অবতার’ ইত্যাদি প্রচার করিবার আবশ্যক নাই। তিনি পরোপকার করিতে আসিয়াছিলেন, নিজের নাম ঘোষণা করিতে নহে। চেলারা গুরুর নাম করে; গুরু যা শেখাতে এসেছিলেন, তাতে জলাঞ্জলি দেয়, আর দলাদলি ইত্যাদি তার ফল।

আলাসিঙ্গা লিখেছে চারুবাবুর বিষয়। আমি তাঁহাকে স্মরণ করিতেছি না। চারুবাবুর বিষয় সবিশেষ লিখিবে ও তাঁহাকে আমার ধন্যবাদ দিবে। সকলের বিষয় বিশেষ করিয়া লিখিবে—বৃথা বার্তা করিবার সময় কুলায় না। আমার জীবনে বোধ হয় কারুর সহিত ঠাট্টা-বটকেরা করার অপেক্ষা অনেক কার্য আছে।

কর্মকাণ্ড ত্যাগ করিবার চেষ্টা করিবে; ঘণ্টা নাড়া সন্ন্যাসীর নহে এবং যাবৎ জ্ঞান না হয়, তাবৎ কর্ম। আমিই ঐ অনর্থের মূল। এক্ষণে দেখিতেছি যে, ঐ ঘণ্টা-পত্র লইয়া রামকৃষ্ণ-অবতারের দল বাঁধিবে এবং তাঁহার শিক্ষায় ধূলি নিক্ষেপ হইবে। তোমরা ঘণ্টা ত্যাগ করিতে পার ভালই, নচেৎ আমি তোমাদের সঙ্গে যোগ দিতে পারিব না। দলাদলি, দলবাঁধা, কূপমণ্ডুকের মধ্যে আমি নাই, আর যেথায় আমি থাকি। ইতি

‘—’ থিওসফিষ্ট হইয়াছেন, ভালই, রুচীনাং বৈচিত্র্যং! মঙ্গলমস্তু তেষাং, কিমহংব্রবীমি (রুচির বৈচিত্র্য! তাদের মঙ্গল হউক, আমি আর কি বলিব)? Universal brotherhood (সর্বজনীন ভ্রাতৃত্ব), বেশ কথা—শিবাঃ বঃ সন্তু পন্থানঃ। তার চেয়ে সুখের বিষয় কি আছে? … রামকৃষ্ণ পরমহংসের উদারভাব প্রচার করে আবার দলবাঁধা কেমন করে হয়? দলের বীজ হচ্ছে ঐ ঘণ্টা-পত্র। আমি হাজারবার ঠুকেছি, এবারও ঠুকলাম—ফলে কিছু হয় না। আমার নামে যদি তোমাদের দলবাঁধার সহায়তা হয়, তাহলেই আমি লীডার (নেতা) বটি, নইলে আমি কেউ নই! এই সত্য বটে! আমি ওতে নাই। আমি যে রামকৃষ্ণ পরমহংসের শিষ্য এবং তোমরাও যে তাই, এইটি বই লিখে ছাপাতে যত্ন তো যথেষ্ট হয়েছে; কিন্তু আমি যে আজ ৬ বৎসর ঘণ্টা-পত্র ত্যাগ করার জন্য বলছি, তাতে কারুর কান পাতা নাই। … আমি একমাত্র কর্ম বুঝি—পরোপকার, বাকী সমস্ত কুকর্ম। তাই শ্রীবুদ্ধদেবের পদানত হই। বুঝতে পারছ? … ফল কথা—আমি বৈদান্তিক; সচ্চিদানন্দ আমার নিজের আত্মার মহান্‌ রূপ ছাড়া অন্য ঈশ্বর বড় একটা দেখতে পাচ্ছি না। অবতার মানে—যাঁহারা সেই ব্রহ্মত্ব প্রাপ্ত হয়েছেন, অর্থাৎ জীবন্মুক্ত। অবতারবিশেষত্ব আমি দেখিতে পাইতেছি না। ব্রহ্মাদিস্তম্ব পর্যন্ত সমস্ত প্রাণী কালে জীবন্মুক্তি প্রাপ্ত হবে এবং আমাদের উচিত সকলের সেই অবস্থা পেতে সহায় হওয়া। এই সহায়তার নাম ধর্ম, বাকী অধর্ম। এই সহায়তার নাম কর্ম, বাকী কুকর্ম; আর আমি কিছুই দেখছি না। অন্যবিধ তান্ত্রিক বা বৈদিক কর্মে ফল থাকিতে পারে, কিন্তু তদবলন্বন কেবল বৃথা জীবনক্ষয়—কারণ কর্মের ফল যে পবিত্রতা, তাহা কেবল পরোপকার মাত্রে ঘটে। যজ্ঞাদি কর্মের ভোগাদি সম্ভব, আত্মার পবিত্রতা অসম্ভব। অতএব সন্ন্যাস অবলম্বন করে, জীবকে উচ্চগতি শিক্ষা না দিয়ে পুনঃ- পুনঃ অনর্থকর কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি করা আমার মতে দূষণীয়। মূর্খ গৃহস্থ কর্মপর হউক, তাতে ক্ষতি নাই; কিন্তু ত্যাগী!! … সমস্তই প্রত্যেকের আত্মার বর্তমান। যে বলে আমি মুক্ত, সেই মুক্ত হবে। যে বলে আমি বদ্ধ, সে বদ্ধ হবে। দীন হীন ভাব আমার মতে পাপ এবং অজ্ঞতা। ‘নায়মাত্মা বলহীনেন লভ্যঃ’।৬৯ ‘অস্তি ব্রহ্ম বদসি চেদস্তি ভবিষ্যসি, নাস্তি ব্রহ্ম বদসি চেৎ নাস্ত্যেব ভবিষ্যসি’।৭০ যে সদা আপনাকে দুর্বল ভাবে, সে কোন কালে বলবান্‌ হইবে না; যে আপনাকে সিংহ জানে, সে ‘নির্গচ্ছতি জগজ্জালাৎ পিঞ্জরাদিব কেশরী’।৭১ দ্বিতীয়তঃ রামকৃষ্ণ পরমহংস কোন নূতন তত্ত্ব প্রচার করিতে আইসেন নাই—প্রকাশ করিতে আসিয়াছিলেন বটে, অর্থাৎ He was the embodiment of all past religious thoughts of India. His life alone made me understand what the Shastras really meant, and the whole plan and scope of the old Shastras.৭২

মিশনরী-ফিশনরী এদেশে বড় চলল না। এরা ঈশ্বরেচ্ছায় আমায় খুব ভালবাসে, কারুর কথায় ভোলবার নয়। এরা আমার ideas (ভাব) যেমন বোঝে, আমার দেশের লোক তেমন পারে না, এবং এরা বড় স্বার্থপর নয়। অর্থাৎ ঐ jealousy (ঈর্ষা) আর হামবড়া ভাবগুলো এরা কাজের বেলা দূর করে দেয়, তখন সকলে মিলে একজন কাজের লোকের কথামত চলে। তাতেই এরা এত বড়। তবে এরা হচ্ছে টাকা-দেবতার জাত, সকল কথায় পয়সা; আমাদের দেশের লোক টাকার বিষয়ে বড় উদার, এরা তত নয়। কৃপণ ঘরে ঘরে। ওটি ধর্মের মধ্যে। তবে দুষ্কর্ম করলে পর পাদ্রীদের হাতে পড়ে। তখন টাকা দিয়ে স্বর্গে যায়! এগুলো সব দেশেই সমান—priestcraft (পুরোহিতদের তুকতাক)।

আমি কবে দেশে যাব, কি না যাব, কিছুই বলতে পারি না। এখানে ঘুরে বেড়ান, সেখানেও তাই। তবে এখানে হাজারো লোক আমার কথা শোনে, বোঝে—হাজারো লোকের উপকার হয়; সেখানে কি?

রামকৃষ্ণ পরমহংসের বিষয় মজুমদার যা লিখেছিল, আমি খালি তাই চাহিয়াছিলাম। তা না হয়ে কতকগুলো জার্মান ছেঁড়া পুঁথি পাঠিয়ে দিয়েছ, আর তার মধ্যে দুখানা আমার লেকচার; কি আপদ!!

সারদা যা করছে, তা আমার সম্পূর্ণ অভিমত। তাকে আমার শত শত ধন্যবাদ। বলি, তোমরা যা কিছু করছ, আমি বুঝতে পারি না। … যা হোক, মান্দ্রাজ ও বোম্বেতে আমার মনের মত লোক আছে। তারা বিদ্বান্‌ এবং সকল কথা বোঝে এবং তারা দয়াল; অতএব পরহিতচিকীর্ষা বুঝিতে পারে। কিমধিকমিতি।

মা-ঠাকুরাণীকে আমার শত শত দণ্ডবৎ দিবে এবং সকলকে আমার যথাযোগ্য সম্ভাষণ দিবে। আমি বই-টই কিছু ছাপাই নাই। এখানে লেকচার করে বেড়াই মাত্র। গুপ্ত, তুলসী প্রভৃতির বিষয় কিছুই লেখ নাই কেন? কালী কি করছে? শরৎ, যোগেন সেরে গেছে কিনা? আমার জীবনের প্রতি দেখে [তাকালে] আমার আপসোস হয় না। দেশে দেশে কিছু না কিছু লোকশিক্ষা দিয়ে বেড়িয়েছি, তার বদলে রুটির টুকরো খেয়েছি। যদি দেখতুম যে, কোন কাজ করিনি, কেবল লোক ঠকিয়ে খেয়েছি, তাহলে আজ গলায় দড়ি দিয়ে মরতুম।

সারদাকে আমায় একটা চিঠি লিখতে বলবে। তার সঙ্গে আমার মত মিলবে বোধ হয়। … আমি রামকৃষ্ণ পরমহংসের চেলা নই, আমি কারুর চেলাপত্র নই ইতি; আমি সারদার চেলা। যারা আমার মনের মত কার্য করবে, আমি তাদের চেলা। যারা তা না করবে, তাদের কোন খবর আমি চাই না, আমার কোন খবর তাদের জন্য নাই। ইতি

নরেন্দ্র

১৯০*

পার্সি, নিউ হ্যাম্পসায়ার
৭ জুন, ১৮৯৫

প্রিয় মিসেস বুল,
অবশেষে আমি এখানে মিঃ লেগেটের কাছে এসে পৌঁছেছি। আমি জীবনে যে-সকল সুন্দরতম স্থান দেখেছি, এটি তাদের অন্যতম। কল্পনা করুন, চতুর্দিকে প্রকাণ্ড বনের দ্বারা আচ্ছাদিত পর্বতশ্রেণী ও তার মধ্যে একটি হ্রদ—আর সেখানে আমরা ছাড়া আর কেউ নেই। কি মনোরম, কি নিস্তব্ধ, কি শান্তিপূর্ণ! শহরের কোলাহলের পর, আমি যে এখানে কি আনন্দ পাচ্ছি, তা আপনি সহজেই অনুমান করতে পারেন।

এখানে এসে আমি যেন নবজীবন লাভ করেছি। আমি একলা বনের মধ্যে যাই, আমার গীতাখানি পাঠ করি এবং বেশ সুখেই আছি। দিন দশেকের মধ্যে এ স্থান ত্যাগ করে সহস্রদ্বীপোদ্যানে (Thousand Island Park) যাব। সেখানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা, দিনের পর দিন ভগবানের ধ্যান করব এবং একলা নির্জনে থাকব। এই কল্পনাটাই মনকে উঁচু করে দেয়।

ভবদীয়
বিবেকানন্দ

১৯১*

[ভূর্জপত্রে মিস মেরী হেলকে লিখিত]

পার্সি, N.H.
১৭ জুন, ১৮৯৫

প্রিয় ভগিনী,
আগামীকাল৭৩ যাচ্ছি সহস্রদ্বীপোদ্যানে। ঠিকানা—C/o Miss Dutcher, Thousand Island Park, N.Y. তুমি এখন কোথায় আছ? গ্রীষ্মের সময় তোমরা সব কোথায় থাকবে? অগষ্ট মাসে আমার ইওরোপে যাবার সম্ভাবনা আছে। যাবার আগে তোমাদের সঙ্গে দেখা করব। সুতরাং পত্র দিও। তাছাড়া ভারত হতে কতকগুলি বই ও চিঠি আসবার কথা। অনুগ্রহ করে সেগুলো মিস ফিলিপসের ঠিকানায়—নিউ ইয়র্কে পাঠিয়ে দিও। ভারতবর্ষে যাবতীয় পবিত্র লিপি এই ভূর্জপত্রে লেখা হয়। আমিও সংস্কৃতে লিখলামঃ উমাপতি (শিব) সর্বদা তোমাকে রক্ষা করুন।

তোমরা সকলে অনন্তকাল সুখে থাক।

বিবেকানন্দ

১৯২*

[মিঃ লেগেটকে লিখিত]

Thousand Island Park, N.Y.
C/o Miss Dutcher ১৮ জুন, ১৮৯৫

প্রিয় বন্ধু,
রওনা হবার পূর্বদিন মিসেস স্টার্জিস্-এর এক চিঠি পেয়েছি, ৫০ ডলারের একখানা চেকও সঙ্গে আছে। পরদিনই তাঁর কাছে প্রাপ্তিস্বীকার পৌঁছিয়ে দেওয়া সম্ভব ছিল না। তাই তোমাকে অনুরোধ করছি, তুমি এর পর যখন তাঁকে চিঠি লিখবে, তখন আমার ধন্যবাদ ও প্রাপ্তিস্বীকারটা তাঁকে জানিয়ে দিও।

প্রাচীন হিন্দু প্রবচন ‘ঢেঁকি স্বর্গে গেলেও ধান ভানে’-ছাড়া এখানে বেশ সময় কাটছে। একই কথা, আমাকে কঠোর পরিশ্রম করতে হচ্ছে। অগষ্টের প্রথম ভাগে চিকাগো যাচ্ছি। তুমি কখন রওনা হচ্ছ?

এখানকার বন্ধুরা সকলেই তোমাকে অভিবাদন জানাচ্ছে। তোমার সর্বাঙ্গীণ সুখ শান্তি ও স্বাস্থ্য কামনা করি।

তোমার স্নেহের
বিবেকানন্দ

১৯৩*

54 W. 33rd St., নিউ ইয়র্ক
জুন, ১৮৯৫

প্রিয় মিসেস বুল,
আমি এইমাত্র এখানে পৌঁছলাম। এই অল্প ভ্রমণে আমার উপকার হয়েছে। সেখানকার পল্লী ও পাহাড়গুলি—বিশেষতঃ মিঃ লেগেটের নিউ ইয়র্ক প্রদেশের পল্লীভবনটি আমার খুব ভাল লেগেছিল।

ল্যাণ্ডস‍্‍বার্গ বেচারী এই থেকে চলে গিয়েছে। সে তার ঠিকানা পর্যন্ত আমাকে জানিয়ে যায়নি। সে যেখানেই যাক, ভগবান্ তার মঙ্গল করুন। আমি জীবনে যে দু-চারজন অকপট লোক দেখবার সৌভাগ্য লাভ করেছি, সে তাদেরই মধ্যে একজন।

যা কিছু ঘটে, সবই ভালর জন্য। সকল প্রকার মিলনের পরেই বিচ্ছেদ অবশ্যম্ভাবী। আশা করি, আমি একাই সুন্দর কাজ করতে পারব। মানুষের কাছ থেকে যত কম সাহায্য নেওয়া যাবে, ভগবানের কাছ থেকে তত বেশী সাহায্য পাওয়া যাবে। এইমাত্র আমি লণ্ডনস্থ জনৈক ইংরেজের একখানি পত্র পেলাম—তিনি আমার দুইজন গুরুভাইয়ের সঙ্গে কিছুদিন ভারতবর্ষের হিমালয় প্রদেশে বাস করেছিলেন। তিনি আমায় লণ্ডনে যেতে বলছেন। আপনাকে চিঠি লেখার পর, আমার ছাত্রেরা খুব সাহায্য করছে এবং এখন যে ক্লাসগুলি খুব ভালভাবে চলবে, তাতে সন্দেহ নাই। আমি এতে খুব আনন্দিত হয়েছি, কারণ খাওয়া-দাওয়ার বা শ্বাস-প্রশ্বাসের মত শিক্ষাদান করাটা আমার জীবনে একটা অত্যাবশ্যক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।

পুঃ—‘—’ সম্বন্ধে ‘বর্ডারল্যাণ্ড’ নামক ইংরেজী সংবাদপত্রে অনেক বিষয় পড়লাম। তিনি হিন্দুদিগকে তাদের নিজ ধর্মের গুণগুলি গ্রহণ করতে শিখিয়ে ভারতবর্ষে যথার্থই সৎকার্য করেছেন। … উক্ত মহিলার লেখা পড়ে তার মধ্যে কোনরূপ পাণ্ডিত্যের পরিচয় পেলাম না, … কিম্বা কোনরূপ আধ্যাত্মিক ভাবও পেলাম না। যা হোক, যে-কেউ জগতের উপকার করতে চায়, ভগবান্ তারই সহায় হউন।

এই জগৎ কত সহজেই না বুজরুকদের দ্বারা প্রতারিত হয়ে থাকে! আর সভ্যতার প্রথম উন্মেষের সময় থেকে বেচারা মানুষকে নিরীহ পেয়ে তার উপর কত প্রবঞ্চনাই না চলেছে!

আপনার স্নেহের
তোমাদের বিবেকানন্দ

১৯৪*

[মিস মেরী হেলকে লিখিত]

54 W. 33rd Street, নিউ ইয়র্ক
২২ [?] জুন, ১৮৯৫

প্রিয় ভগিনী,
ভারত থেকে প্রেরিত পত্রগুলি ও বই-এর পার্সেল নির্বিঘ্নে পৌঁছেছে। মিঃ স্যামের আগমন-সংবাদে আমি খুবই আনন্দিত। একদিন রাস্তায় মিঃ স্যামের এক বন্ধুর সহিত দেখা হয়। ভদ্রলোক ইংরেজ; বেশ লোক। বললেন, ওহিওর কোন স্থানে মিঃ স্যামের সঙ্গে এক বাড়ীতে আছেন।

আমার দিনগুলো আগের মতই প্রায় একভাবে চলেছে। অবসরমত হয় অনর্গল বকছি, নয়তো একদম চুপচাপ। এ গ্রীষ্মে গ্রীনএকার যাওয়া হয়ে উঠবে কিনা জানি না। সেদিন মিস ফার্মারের সহিত দেখা করি; তখন তিনি স্থানান্তরে যেতে খুব ব্যস্ত, সুতরাং বাক্যালাপ অতি অল্পই হয়। তিনি একজন মহীয়সী নারী।

ক্রিশ্চান সায়ান্সের চর্চা কেমন চলছে? আশা করি তুমি গ্রীনএকার যাচ্ছ। সেখানে ওই দলের ও ভূতুড়েদের (spiritualists) অনেককে দেখবে, তাছাড়া দেখবে হস্তরেখাবিচারক, জ্যোতিষী, আরও কত কি! মিস ফার্মারের নেতৃত্বে সেখানে মিলবে রোগের যাবতীয় প্রতিকার ও ধর্মবিষয়ক যাবতীয় মতবাদ।

ল্যাণ্ডস‍্‍বার্গ অন্যত্র চলে গেছে। আমি একাই আছি। আজকাল দুধ, ফল, বাদাম—এইসব আমার আহার। ভাল লাগে, আছিও বেশ। এই গ্রীষ্মের মধ্যেই মনে হয় শরীরের ওজন ৩০/৪০ পাউণ্ড কমবে। শরীরের আকার অনুসারে ওজন ঠিকই হবে। ঐ যাঃ! বেড়ান বিষয়ে মিসেস এডাম‍্‍সের উপদেশের কথা একেবারে ভুলে গেছি। তাঁর নিউ ইয়র্কে এসে পৌঁছবার সঙ্গে সঙ্গে আমাকে আবার সেগুলি অভ্যাস করতে হবে।

গান্ধী সম্ভবতঃ বোষ্টন হতে ভারত রওনা হয়েছিলেন। পথে ইংলণ্ড হয়ে যাবেন। তাঁর অভিভাবিকা মিসেস হাওয়ার্ড শোকগ্রস্ত হয়ে কেমন আছেন? কম্বলগুলো যে আটলাণ্টিকগর্ভে মগ্ন হয়নি, সত্যসত্যই এসে পৌঁছেছে—এটা সুখবর বলতে হবে।

বক্তৃতা না দিলেও এ বৎসর মাথা তোলবার সময় পাইনি। ভারত থেকে বেদান্তের উপর দ্বৈত, অদ্বৈত ও বিশিষ্টাদ্বৈত—এই তিন প্রধান সম্প্রদায়ের ভাষ্য পাঠিয়েছে। আশা করি নির্বিঘ্নে এসে পৌঁছবে। চর্চা করে খুব আনন্দ হবে। এই গ্রীষ্মে বেদান্তদর্শন-বিষয়ক এক পুস্তক রচনার সঙ্কল্প। ভালমন্দ, সুখদুঃখের সংমিশ্রণই জগৎ। চক্র চিরকালই উঠবে ও নামবে; ভাঙা গড়া বিধির অলঙ্ঘ্য বিধান। যাঁরা এ সবের পারে যাবার চেষ্টা করছেন, তাঁরাই ধন্য।

মেয়েরা সব ভাল আছে জেনে সুখী হলাম। পরিতাপের বিষয়, এবারকার শীতেও কেউ ধরা পড়ল না। এদিকে শীতের পর শীত চলে যাচ্ছে। আশাও ক্ষীণ হয়ে যাচ্ছে। এখানে আমার বাসার কাছে অবস্থিত ওয়ালডর্ফ হোটেল। আমেরিকান ধনী-কন্যারা ক্রয় করবেন বলে বহু খেতাবধারী কিন্তু কপর্দকহীন ইওরোপীয় পুরুষের প্রদর্শনী ও আড্ডা এটি। আমদানী এত প্রচুর ও বিবিধ যে, ইচ্ছানুরূপ নির্বাচন বাস্তবিকই সুলভ। কেউ আছেন একেবারেই ইংরেজী বলতে পারেন না, আবার আছেন জনকয়েক যাঁরা আধ আধ ইংরেজী বলেন, যা অন্যের বোধগম্য নয়। ভাল ইংরেজী বলতে পারেন, এমন সব লোকও আছেন। কিন্তু নির্বাকদের তুলনায় তাঁদের আশা বড় কম। কারণ যাঁরা ইংরেজী ভাল বলতে পারেন, মেয়েরা তাঁদের ঠিক ‘বিদেশী’ বলে মনে করে না।

এক মজার বইয়ে পড়লাম, সমুদ্রে এক আমেরিকান জাহাজ ডুবু ডুবু। লোকেরা হতাশ হয়ে অন্তিম সান্ত্বনার জন্য কোনরূপ ধর্মানুষ্ঠানের প্রয়োজন অনুভব করল। প্রেসবিটেরিয়ান চার্চের এক বিশিষ্ট ধর্মযাজক জাহাজে ছিলেন—জস্ খুড়ো। সকলে তাঁকেই ধরে বসল, ‘আর তো মরতে বসেছি, এখন কিছু ধর্মানুষ্ঠান করুন, দোহাই জস্ খুড়ো।’ খুড়ো মাথার টুপি হাতে উল্টে ধরে তখনই দান সংগ্রহ করতে শুরু করলেন।

ধর্ম বলতে তিনি এর বেশী বুঝতেন না। এই জাতীয় লোকের অধিকাংশেরই এই অবস্থা। এদের বুদ্ধিতে ধর্মের তাৎপর্য দানসংগ্রহ। ভগবান্ এদের মঙ্গল করুন। এখনকার মত আসি। কিছু খেতে যাচ্ছি। বড় খিদে পেয়েছে। ইতি—

তোমাদের স্নেহের
বিবেকানন্দ