ঋগ্বেদ ১০।০১৫

ঋগ্বেদ ১০।০১৫
ঋগ্বেদ সংহিতা।। ১০ম মণ্ডল।। সূক্ত ১৫
পিতৃলোকের দেবতা (১)। শঙ্খ ঋষি।

১। অধম, উত্তম ও মধ্যম তিন শ্রেণীর পিতৃলোকগণ আমাদিগের প্রতি অনুগ্ৰহযুক্ত হইয়া হোমের দ্রব্য গ্রহণ করুন। যাহার হিংসাধর্মবিহীন হইয়া আমাদিগের ধৰ্ম্মানুষ্ঠানের প্রতি দৃষ্টি রাখিয়া আমাদিগের প্রাণরক্ষা করিতে আসিয়াছেন, তাহার যজ্ঞের সময় আমাদিগকে রক্ষা করুন।

২। যে সকল পিতৃলোক অগ্রে কিংবা পশ্চাৎগত হইয়াছেন, যাঁহারা পৃথিবীলোকে আছেন, অথবা যাঁহারা ভাগ্যবান্ লোকদিগের মধ্যে আছেন, তাঁহাদিগের সকলকে অদ্য এই নমস্কার করিলাম।

৩। পিতৃলোকগণ বিলক্ষণ পরিচিত, আমি তাহাদিগকে পাইয়াছি, এই যজ্ঞের সুসম্পাদনের উপায়ও আমি পাইয়াছি। যে সকল পিতৃলোক কুশে উপবেশন করিয়া হব্যের সহিত সোমরস গ্রহণ করেন, তাহারা সকলে আসিয়াছেন।

৪। হে কুশে উপবেশনকারী পিতৃলোকগণ! এক্ষণে আমাদিগকে আশ্রয় দাও। তোমাদের জন্য এই সমস্ত দ্রব্য প্রস্তুত করিয়াছি, ভোগ কর। এক্ষণে এস, আমাদিগকে রক্ষা কর ও আমাদিগের সর্বশ্রেষ্ঠ মঙ্গল বিধান কর। আমা দিগকে কল্যাণভাগী, অকল্যাণবর্জিত ও পাপরহিত কর।

৫। কুশের উপর এই সমস্ত মনোহর দ্রব্য সংস্থাপন করা হইয়াছে, পিতৃলোক সোমরস গ্রহণের জন্য এবং ঐ সকল দ্রব্য ভোগ করিবার জন্য আহূত হইয়াছেন। তাঁহার আগমন করুন, আমাদিগের মন্ত্রপাঠ শ্রবণ করুন, আহ্লাদ প্রকাশ করুন এং আমাদিগকে রক্ষা করুন।

৬। হে পিতৃগণ! তোমরা দক্ষিণ দিকে ভূমিনিহিতজানু হইয়া উপবেশন পূৰ্ব্বক এই যজ্ঞকে প্রশংসা কর। আমরা মনুষ্য, সুতরাং কোন কিছু অপরাধ করা আমাদিগের সম্ভব; কিন্তু সেই নিমিত্ত যেন আমাদিগকে হিংসা করিও না।

৭। এই সকল লোহিতবর্ণ অগ্নিশিখার নিকটে বসিয়া দাতালোককে ধন দান কর। হে পিতৃগণ! তাহার পুত্রদিগকে ধন দান কর, তাহাদিগকে এই যজ্ঞে উৎসাহযুক্ত কর।

৮। সোমপানকারী পূর্বতন পিতৃলোক বসিষ্ঠগণ (২) যথানিয়মে সোম যজ্ঞ সম্পন্ন করিয়াছিলেন। তাহারাও হোমের দ্রব্য কামনা করেন, যমও কামনা করেন, সম তাঁহাদিগের সহিত একত্রে সুখী হইয়া যথা ইচ্ছা এই সকল হোমের দ্রব্য ভোজন করুন।

৯। হে অগ্নি! যে সকল পিতৃলোক হোম করিতে জানিতেন এবং বিবিধ ঋক্ রচনাপূর্বক স্তব প্রস্তুত করিতেন, সুতরাং যাঁহারা নিজ সৎকৰ্ম্ম প্রভাবে এক্ষণে দেবত্ব প্রাপ্ত হইয়াছেন, যদি তাঁহারা ক্ষুধাতৃষ্ণাযুক্ত হইয়া থাকেন, তাঁহাদিগকে লইয়া আমাদিগের নিকট এস, তাঁহারা বিশেষ পরিচিত, তাঁহারা যজ্ঞে উপবেশন করেন, তাঁহারাই পিতৃলোক, তাঁহাদিগের জন্য এই সকল উৎকৃষ্ট কব্য অর্থাৎ দ্রব্য রহিয়াছে।

১০। যে যকল সাধুশীল পিতৃলোক দেবতাদিগের সঙ্গে একত্র হইয়া হোমের দ্রব্য ভক্ষণ ও পান করেন এবং ইন্দ্রের সঙ্গে এক রথে আরোহণ করেন; হে অগ্নি! সেই সমস্ত দেবারাধনাকারী যজ্ঞের অনুষ্ঠানকারী, প্রাচীন ও আধুনিক পিতৃলোক দিগের সহিত এস (৩)।

১১। হে অগ্নিস্বত্ব পিতৃগণ! তোমরা উত্তম গতি প্রাপ্ত হইয়াছ, এই স্থানে আগমন কর এক এক আসনে প্রত্যেকে উপবেশন কর। এস্থানে কুশের উপর হোমের দ্রব্য সমস্ত প্রসারিত আছে, তাহা গ্রহণ করিয়া আমাদিগকে ধন দাও এবং পুত্রপৌত্রাদি দাও।

১২। হে অগ্নি! তুমি জাতবেদা। তোমাকে স্তব করা হইয়াছে, তুমি হোমের দ্রব্য সমস্ত সুগন্ধযুক্ত করিয়া দেবতাদিগের নিকট বহন করিয়াছ। তুমি পিতৃলোকদিগকে তাহা দিয়াছ। তাঁহারা ‘স্বধা’ ‘স্বধা’ এই শব্দ উচ্চারণ পূর্বক ভোজন করুন। হে দেব! এই সমস্ত প্রসারিত হোমের দ্রব্য তুমি ভোজন কর।

১৩। এই স্থানে যে সকল পিতৃলোক আসিয়াছেন, কিংবা যাঁহারা আসেন নাই, যাহাদিগকে আমরা জানি, কিংবা যাহাদিগকে আমরা না জানি, হে জাবেদা অগ্নি! তুমি জান, তাহার কে কে। হে পিতৃলোকগণ। ‘স্বধা এই শব্দ উচ্চারণপূর্বক এই সুসম্পন্ন যজ্ঞ ভোগ কর।

১৪। হে স্বপ্ৰকাশ অগ্নি! (৪) যে সকল পিতৃলোক অগ্নিদ্বারা দগ্ধ হইয়াছেন, কিংবা যাঁহারা অগ্নিদ্বারা দগ্ধ (৫) হয়েন নাই, যাহারা স্বর্গ মধ্যে স্বধার দ্রব্য প্রাপ্ত হইয়া আমোদ করিয়া থাকেন; তাঁহাদিগের সহিত একত্র হইয়া তুমি আমাদিগের এই সজীব দেহকে তোমার ও তাঁহাদিগের অভিলাষ পূর্ণ করিতে প্রবৃত্ত কর।

——–

(১) এই পিতৃলোক সম্বন্ধে সুক্তটী বিশেষ জ্ঞাতব্য। পুণ্যাত্মা পিতৃলোক দেবগণের ন্যায় স্বর্গে বাস করেন, দেবদিগের সহিত যজ্ঞে আগমন করেন, মনুষ্যের হিত সাধন করেন, ইত্যাদি বিশ্বাস এই রক্তে লক্ষিত হয়।

 (২) মূলে “বসিষ্ঠাঃ” আছে।

(৩) পূর্বপুরুষগণ পুণ্যবলে স্বর্গধামে যাইয়া দেবগণের সহিত একরথে আরোহণ করেন, অর্থাৎ দেবদিগের তুল্য পদ লাভ করেন।

(৪) মুলে “স্বরাট,” শব্দ আছে। অর্থ “স্বপ্রকাশ অগ্নি।” কিন্তু শুক্ল যজুৰ্বেদ সংহিতার টীকাকার (শু, যজু, ১৯। ৬০) ইহার অর্থ যম করিয়াছেন এবং পণ্ডিতবর রোথও সেই অর্থ গ্রহণ করিয়াছেন।

 (৫) মূলে “যে অগ্নিদগ্ধাঃ যে অগ্নিদগ্ধাঃ” আছে। অগ্নিদাহ প্রথা কতক পরিমাণে প্রচলিত ছিল, তাহা এতদ্বারা প্রকাশিত হইতেছে। ১১ খকে যে “অগ্নি সত্ব” শব্দ আছে সায়ণ তাহার অর্থ ও অগ্নিদগ্ধ করিয়াছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *