ঋগ্বেদ ১০।০১৪

ঋগ্বেদ ১০।০১৪
ঋগ্বেদ সংহিতা।। ১০ম মণ্ডল।। সূক্ত ১৪
পিতৃলোক ও যম প্রভৃতি দেবতা। যম ঋষি।

১। হে অন্তঃকরণ! তুমি বিবস্বানের পুত্র যমকে হোমের দ্রব্য দিয়া সেবা কর। তিনি সৎকৰ্ম্মান্বিত ব্যক্তিদিগকে সুখের দেশে লইয়া যান, তিনি অনেকের পথ পরিষ্কার করিয়া দেন, তাহার নিকটই সকল লোকে গমন করে (১)।

২। আমরা কোন্ পথে যাইব, তাহা যমই প্রথমে দেখাইয়া দেন। সেই পথ আর বিনষ্ট হইবে না। যে পথে আমাদিগের পূর্ব পুরুষেরা গিয়াছেন, সকল জীবনই নিজ নিজ কর্ম অনুসারে সেই পথে যাইবেন।

৩। মাতলির প্রভু ইন্দ্র কব্য নামক পিতৃলোকদিগেব সাহায্যে বৃদ্ধি প্রাপ্ত হয়েন, যম অঙ্গিরাদিগের সাহায্যে বর্ণিত হয়েন। যাহারা দেতাদিগকে সংবর্ধনা করে এবং যাহাদিগকে দেবতারা সংবর্দ্ধনা করেন, সকলেই বৃদ্ধি প্রাপ্ত হয়েন, কেহ স্বাহাদ্বারা আনন্দিত হয়েন, কেহ বা স্বধাদ্বারা।

৪। হে যম! এই আরদ্ধ যজ্ঞে অসিয়া উপবেশন কর, তুমি এই যজ্ঞ জান, তোমার সঙ্গে অঙ্গিরানামক পিতৃলোকদিগকে লইয়া আইস। তোমার উদ্দেশে কবিদিগের মুখেচ্চারিত মন্ত্র সকল চলিতে থাকুক। হে রাজন! এই হোমের দ্রব্য গ্রহণপূর্বক আমোদ কর।

৫। হে যম! নানা মূর্তিধারী অঙ্গিরা নামক যজ্ঞভোক্তা পিতৃলোকদিগের সহিত এস, এই স্থানে আমোদ কর। তোমার যে পিতা বিবস্বৎ, তাঁহাকে আহ্বান করিতেছি। এই যজ্ঞে কুশের উপর আসিয়া উপবেশন কর।

৬। অঙ্গিরা নামক, অথৰ্ব্বন নামক এবং ভৃগু নামক, আমাদিগের পিতৃ লোকগণ এই মাত্র আসিয়াছেন, তাঁহারা সোমরস পাইবার অধিকারী, সেই যজ্ঞভোক্তা পিতৃলোকগণ যেন আমাদিগের শুভানুধ্যান করেন; যেন আমরা তাঁহাদিগের প্রসন্নতা লাভ করিয়া কল্যাণভাগী হই (২)।

৭। (যজ্ঞকর্তাব্যক্তির মৃত্যু হইলে তাহাকে সম্বোধন করিয়া এই উক্তি)—আমাদিগের পূর্বপুরুষেরা যে পথ দিয়া, যে স্থানে গিয়াছেন, তুমিও সেই পথ দিয়া সেই স্থানে যাও। সেই যে দুই রাজা যম আর বরুণ, যাঁহারা স্বধা প্রাপ্ত হইয়া আমোদ করিতেছেন, তাহাদিগকে যাইয়া দর্শন কর।

৮। সেই চমৎকার স্বর্গরামে পিতৃলোকদিগের সঙ্গে মিলিত হও, যমের সহিত ও তোমার দয়ানুষ্ঠানের ফলের সহিত মিলিত হও। পাপ পরিত্যাগ পূর্বক অস্ত নামক গৃহে প্রবেশ কর এবং উজ্জ্বল দেহ গ্রহণ কর।

৯। [শ্মশানে দাহ কালে উক্তি]–হে ভূতপ্রেতগণ! দূর হও, চলিয়া যাও, সরিয়া যাও, সরিয়া যাও, পিতৃলোকেরা তাঁহার জন্য এই স্থান প্রস্তুত করিয়াছেন। এই স্থান দিবাদ্বারা, জলদ্বারা ও আলোকদ্বারা শোভিত; যম এই স্থান মৃতব্যক্তিকে দিয়া থাকেন।

১০। (যমদ্বারবর্ত্তী দুই কুকুরের বিষয়ে উক্তি)–হে মৃত! এই যে দুই কুকুর, যাহাদিগের চারি চারি চক্ষু ও বর্ণ বি চত্ৰ; ইহাদিগের নিকট দিয়া শীঘ্র চলিয়া যাও। তৎপরে যে সকল সুবিজ্ঞ পিতৃলোক যমের সহিত সর্বদা আমোদ আহ্লাদে কালক্ষেপ করেন, তুমি উত্তম পথ দিয়া তাঁহাদিগের নিকট গমন কর(৩)।

১১। হে যম! তোমার প্রহরীস্বরূপ যে দুই কুকুর আছে যাহাদিগের চারি চারি চক্ষু, যাহারা পথ রক্ষা করে এবং যাহাদিগের দৃষ্টিপথে সকল মনুষ্যকেই পতিত হইতে হয়; তাঁহাদিগের কোপ হইতে এই মৃতব্যক্তিকে রক্ষা কর। হে রাজন! ইহাকে কলণভাগী ও নিরোগী কর।

১২। সেই যে দুই যমদূত, যাহাদিগে বৃহৎ বৃহৎ নাসিকা, যাহারা শীঘ্র তপ্ত হয় না এবং সকল ব্যক্তির পশ্চাৎ পশ্চাৎ যাইয়া থাকে, তাহারা যেন আমাদিগকে অদ্য এই স্থানে বল ও মঙ্গল প্রদান করে, যেন আমরা সূর্যের দর্শন পাই।

১৩। যমের জন্য সোন প্রস্তুত কর, গমের জন্য হোমের দ্রব্য হোম কর। এই যে যজ্ঞ, অগ্নি যাহার দূত হইতেছেন এবং যাহাকে নানা সজ্জায় সুশোভিত করা হইয়াছে, এই যজ্ঞ যমের দিকেই যাইয়া থাকে।

১৪। যমের সেবা কর, ঘৃতযুক্ত হোমের দ্রব্যে তাঁহার জন্য হোম কর। দেবতাদিগের মধ্যে যম যেন বহুকাল বাঁচিয়া থাকিবার জন্য আমাদিগকে দীর্ঘ পরমায়ু প্ৰদান করেন।

১৫। যমরাজার উদ্দেশে অতি মিষ্ট হোমের দ্রব্য হোম কর। যে সকল পূৰ্ব্বকালের ঋষি অমাদিগের অগ্রে জন্ম গ্রহণ করিয়া ধর্মের পথ দেখাইয়া দিয়াছেন, তাহাদিগকে নমস্কার করি।

১৬। যম ত্ৰিকদ্রুক নামক যজ্ঞ পাইয়া থাকেন, তিনি ছয় স্থানে এবং এক বৃহৎ জগতে গতিবিধি করেন। ত্রিষ্টুপ গায়ত্রী প্রভৃতি সকল ছন্দই যমের প্রতি প্রয়োগ করা হয়।

———-
(১) পর কালের সুখ সম্বন্ধে ইতিপূর্বে আমরা স্থানে স্থানে উল্লেখ পাইয়াছি, নবম মণ্ডলের ১১৩ সূক্তে একটী বর্ণণাও পাইয়াছি। এই সূক্তেও সেই পরকালিক সুখের বর্ণনা আছে, সেই সুখবিধানকর্তা যমের কথা আছে অন্ত্যেষ্টি ক্রিয়ার উচ্চাৰ্য মন্ত্র গুলিও আছে। ঋগ্বেদের যম পৌরাণিক যম নহে, ঋগ্বেদের যম পুণ্যকর্মের পুরস্কারবিধাতা।

 (২) ৩ হইতে ৬ ঋকে প্রকাশ হইতেছে, যে পুণ্যাত্মা পূর্বপুরুষগণ দেবদিগের সহিত স্বর্গবাস করেন এবং দেবদিগের সহিত যজ্ঞের ভাগী, এরূপ বিশ্বাস ঋগ্বেদ রচনাকালে প্রচলিত ছিল।

(৩) ৭ হইতে ১০ ঋকে স্পষ্টই প্রতীয়মান হইতেছে যে, ঋগ্বেদের যম পরকালের সুখের বিধাতা। তথাপি যমের কুকুর মনুষ্যের ভয়ের পদার্থ তাহা ১০ হইতে ১২ ঋকে প্রকাশ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *