ঋগ্বেদ ০৬।৭৫(১)
ঋগ্বেদ সংহিতা ।। ৬ষ্ঠ মণ্ডল সূক্ত ৭৫(১)
প্রথম মন্ত্রের বর্ম্ম দেবতা; দ্বিতীয়ের ধনু; তৃতীয়ের জ্যা; চতুর্থের আর্তমী; পঞ্চমের ইবুধি; ষষ্ঠের পূর্বার্দ্ধের সারথি; ষষ্ঠের উত্তরার্দ্ধের রশ্নি; সপ্তমের অশ্ব; অষ্টমের রথ; নবমের রথগোপগণ; দশমের স্তোতা, পিতা, সোম্য, দ্যাবাপৃথিবী ও পূবা দেবতা; একাদশ ও দ্বাদশের ইষু দেবটা; ত্রয়োদশের প্রতোদ; চতুর্দ্দশের হত্তঘ্ন; পঞ্চদশ ও ষোড়শের ইষুদেবতা; সপ্তদশের বুদ্ধভূমি, ব্রহ্মণস্পতি এবং অদিতি দেবতা; অষ্ঠাদশের কবচ, সোম ও বরুণ দেবতা; ঊনবিংশের দেবগণ ও ব্রহ্মদেবতা। ভরদ্বাজের পুত্র পায়ু ঋষি।

১। সংগ্রাম উপস্থিত হইলে এই রাজা যখন বর্ম্ম পরিধান করিয়া গমন করেন, তখন তাঁহার জীমূতের ন্যায় রূপ হয়। হে রাজন! তুমি অবিদ্ধ শরীরে জয়লাভ কর; বৰ্ম্মের সেই মহিমা তোমাকে রক্ষা করুক।

২। আমরা ধনুদ্বারা গাভী জয় করিব; ধনুদ্বারা যুদ্ধ জউ করিব; ধনুদ্বারা তীব্র মদোন্মত্ত শত্রুসেনা বধ করিব। ধনু শত্রুর কামনা নষ্ট করুক, আমরা ধনুদ্বারা সর্বদিক জয় করিব।

৩। এই ধনু সংলগ্ন জ্যা সংগ্রাম কালে যুদ্ধের পারে লইয়া যাইতে ইচ্ছুক হইয়া, যেন প্ৰিয়বাক্য বলিবার জন্যই ধনুৰ্দ্ধারীর কর্ণের নিকট আগমন করে, এবং স্ত্রী যেরূপ প্ৰিয় পতিকে আলিঙ্গন করিয়া কথা কহে, জ্যা সেইরূপ বাণকে আলিঙ্গন করিয়া শব্দ করে।

৪। সেই ধনুস্কোটিদ্বয় অনন্যমনস্কা স্ত্রীর ন্যায় আচরণ করিয়া শত্রুকে আক্রমণ করিবার সময় মাতৃভাবে পুত্ৰতুল্য রাজাকে রক্ষা করুক এবং স্বকাৰ্য্য উত্তমরূপে অবগত হইয়া গমন পূর্বক এই রাজার অমিত্ৰাদিগকে হিংসা করিয়া শত্ৰুগণকে বিদ্ধ করুক।

৫। এই তূণীর বহুতর বাণের পিতা; অনেকগুলি বাণ ইহার পুত্ৰ; বাণ তুলিবার সময় এই তূণীর চিশ্বা শব্দ করে এবং যোদ্ধার পৃষ্ঠভাগে নিবদ্ধ। থাকিয়া যুদ্ধকালে বাণ প্রসবপূর্বক সমস্ত সেনা জয় করে।

৬। সুসারথি রথে অবস্থান করিয়া পুরস্থিত অশ্বগণকে যেখানে যেখানে লইয়া যাইতে ইচ্ছা করে, সেইখানেই লইয়া যায়। রশ্মিসমূহ অশ্বের পশ্চাতে থাকিয়া ইচ্ছামত নিয়মিত করে, তাহাদিগের মহিমা স্তব কর।

৭। অশ্ব সকল খুর দিয়া ধূলি উড়াইয়া রথের সহিত বেগে গমন করতঃ শব্দ করিতে থাকে এবং পলায়ন না করিয়া হিংস্ৰ শত্ৰুগণকে পদাঘাতে তাড়ন করে।

৮। হব্য যেমন অগ্নিকে বর্দ্ধিত করে, সেইরূপ এই রাজার রথবাহিত ধন ইহাকে বৰ্দ্ধিত করুক। রথে ইহার অস্ত্ৰ, কবচ প্ৰভৃতি নিহিত থাকে, আমরা সর্বদা প্ৰসন্ন মনে সেই সুখকর রথের সমীপে গমন করি।

৯। রথের রক্ষকগণ বিপক্ষদিগের সুস্বাদু অন্ন নষ্ট করিয়া স্বপক্ষীয়দিগকে অন্ন দান করে। বিপদকালে ইহাদিগের আশ্ৰয় লওয়া যায়। ইহাৱা শক্তিমান, গম্ভীর, বিচিত্র সেনাযুক্ত, বাণ বলবিশিষ্ট, অহিংস, বীর, মহান এবং বহুতর শক্রকে জয় করিতে সক্ষম।

১০। হে স্তোতাগণ! হে পিতৃগণ! হে যজ্ঞবৰ্দ্ধক সোম্যগণ! তোমরা এবং পাপরহিতা দ্যাবাপৃথিবী আমাদিগের মঙ্গলকর হও। পূষা আমাদিগকে পাপ হইতে রক্ষা করুন; আমাদিগের পাপশংসী শত্রু যেন প্ৰভুত্ব না করিতে পারে।

১১। বাণ সুপর্ণ ধারণ করে; মৃগ উহার দন্ত (২)। উহা গাভী কর্তৃক (৩) সম্যকরূপে বদ্ধ ও প্রেরিত হইয়া পতিত হয়। যেখানে নেতাগণ একত্রে ও পৃথকরূপে বিচরণ করেন, বাণসমূহ আমাদিগকে সেই স্থানে সুখ দান করুন।

১২। হে বাণ! আমাদিগকে পরিবর্দ্ধিত কর; আমাদের শরীর পাষাণের ন্যায় হউক। সোম আমাদের হইয়া বলুন; অদিতি সুখ দান করুন।

১৩। হে কশা! প্রকৃষ্টজ্ঞানবিশিষ্ট সারথিগণ তোমা দ্বারা ইহাদিগের শক্তিতে আঘাত করে, জঘন প্রদেশে আঘাত করে; তুমি সংগ্রামে অশ্বগণকে প্রেরণ কর।

১৪। হস্তঘ্ন(৪) জ্যার আঘাত নিবারণ করতঃ সর্পের ন্যায় শরীরের দ্বারা প্ৰকোষ্ঠকে পরিবেষ্টন করে এবং সমস্ত জ্ঞাতব্য বিষয় অবগত হয় ও পৌরুষশালী হইয়া পুরুষকে সৰ্বতোভাবে রক্ষা করে।

১৫। যাহা বিষাক্ত, যাহার শিরোদেশ হিংসাকারী এবং যাহার মুখ লৌহময়, সেই পর্জন্য কাৰ্য্যভূত বৃহৎ ইষু দেবতাকে এই নমস্কার।

১৬। হে মন্ত্রের দ্বারা তীক্ষ্ণকৃত হিংসাকুশল ইষু! তুমি বিসৃষ্ট হইয়া পতিত হও, গমন কর এবং অমিত্ৰদিগকে প্ৰাপ্ত হও। তুমি অমিত্ৰগণের মধ্যে কাহাকেও অবশিষ্ট রাখিও না।

১৭। মুণ্ডিত কুমারগণের ন্যায় বাণসমূহ যে যুদ্ধ ভূমিতে সম্পতিত হয়, তথায় ব্ৰহ্মণস্পতি আমাদিগকে সর্বদা সুখ দান করুন, অদিতি সুখদান করুন।

১৮। তোমার মৰ্মস্থানসমূহ বৰ্ম দ্বারা আচ্ছাদিত করিব; অনন্তর সোমরাজা তোমাকে অমৃতদ্বারা আচ্ছাদন করুন। বরুণ তোমাকে শ্রেষ্ঠ হইতেও শ্ৰেষ্ঠ সুখ দান করুন; তুমি জয়ী হইলে দেবগণ হৃষ্ট হউন।

১৯। যে জ্ঞাতি আমাদিগের প্রতি হৃষ্ট নহেন, যিনি দূরে থাকিয়া আমাদিগকে বধ করিতে ইচ্ছা করেন, তাহাকে সমস্ত দেবগণ হিংসা করুন। এই মন্ত্ৰই (৫) আমার শর নিবারক বর্ম।

————
(১) যুদ্ধ যাত্রাকালে রাজাকে বর্ম্মাদি পরিধান করাইবার সময় এই সূক্তোক্ত ঋকগুলি উচ্চারণ করিতে হয়। এই সূক্ত হয়তে যুদ্ধের অস্ত্র শস্ত্র ও আয়োজন দ্রব্যসমূহের পরিচয় পাওয়া যায়।
(২) মৃগের শৃঙ্গ নির্মিত বাণের ফলা।
(৩) গরুর স্নায়ু নির্মিত জ্যা।
(৪) ধনুর জ্যাঘাত হইতে প্রকোষ্ঠকে রক্ষা করার জন্য যে চর্ম বন্ধন করা যায়, তাহার নাম হস্তঘ্ন।
(৫) ভরদ্বাজ বংশীয়দিগের সূক্তগুলি, অর্থাৎ ষষ্ঠ মণ্ডল এইখানে শেষ হইল। শেষ সূক্তের শেষ ঋকটা জ্ঞাতি শক্রতার পরিচয় দিতেছে, এবং বিরুদ্ধাচারী জ্ঞাতিদিগের বিরুদ্ধে একটি অভিশম্পাত মাত্র। প্ৰথম মণ্ডলের শেষ সূক্ত এবং দ্বিতীয় মণ্ডলের শেষ সূক্ত ও এইরূপ “ওঝার মন্ত্ৰ” তাহা আমরা পূর্বে দেখিয়াছি।

Share This