একা এবং কয়েকজন

অনির্দিষ্ট নায়িকা

অনির্দিষ্ট নায়িকা ফিরে যাবো, শীত শেষে অবিশ্বাসী মরালের মতো অন্ধকার শুভ্ৰ হলে, ফিরে যাবো, হে সখি নিরালা, উরসে চন্দন গন্ধ, বিন্দু বিন্দু রক্ত ইতস্তত তোমার শিশির-স্বাদ মুখ আর দৃষ্টিপাত মালা— ফেলে আমি চলে যাবো, নির্বাসনে, হে সখি নিরালা। যৌবন আশ্রিত বুঝি দীর্ঘ ঋজুরাত্রির...

অনুভব

অনুভব একসঙ্গে জেগে উঠি দু’জনেই, হে সবিতৃদেব, দেখা হয় নিরালায় আমার ছাতের একলা ঘরে নানা কথা বলি আমরা, দুঃখ সুখ অজস্র হিসেব, আকাশের ঘন-নীল চোখে মুখে গায়ে মাখি দুই হাত ভরে ছড়াই, জমিয়ে রাখি, বুকের মধ্যেও একটু নীল সঙ্গোপনে রাখা থাকে–দুজনের এইটুকু মিল । এইবার যেতে...

অন্যপ্ৰাণ

অন্যপ্ৰাণ দিনান্তের ফেরা পথে কোনোদিন দৈবাৎ কখনো যদিবা পথের মোড়ে চোখ ফেলে থমকে দাঁড়াই অনেক দৃশ্যের ফাঁকে অকস্মাৎ হয়তো বা কোনো ভিখারী ছেলের মৃত্যু বুকে বিধে নিজেকে হারাই। ঘন কালো রক্ত মাখা, সাক্ষ্যহীন বিকৃত শরীরে চক্ষুকে যন্ত্রণা দেয় পথচারী যায় পিঠ ফিরে । সেখানেও...

অবিশ্বাস

অবিশ্বাস যদিও জীবনে অনেক মাধুরী করেছি হরণ কৃপণ আঙুলে খুঁজেছি বাঁচার অনেক অর্থ বারে বারে তবু অবুঝের মতো বলে ওঠে মন ব্যৰ্থ ব্যৰ্থ । কঠিন সময় তুচ্ছ করেছি হারিয়ে ছড়িয়ে অহঙ্কারকে অবহেলা ভরে করেছি চুৰ্ণ অন্ধ বাসনা, ভয় ফিরিয়েছি দুই হাত দিয়ে খুশির খেয়ালে স্মৃতির মীেন...

আত্মকাহিনী

আত্মকাহিনী রোজ সকালেই শুয়ে শুয়ে ভাবি উঠি কিনা উঠি সামনে টেবিলে চায়ের পেয়ালা সেঁকা পাউরুটি । সতেজ কাগজে পরিচিত হ্রাণ, চেনা সংবাদ বন্যা, মন্ত্রী, শান্তির বাণী, শরিকি বিবাদ । জানালার পাশে এই সংসার দিল তার ডাক থাক আলস্য, এবার তা’হলে উঠে পড়া যাক । গত রাত্রিকে বিছানায়...

উপলব্ধি

উপলব্ধি খুচরো পয়সা গুনে নিয়ে পেঁয়াজ রসুন বেচে উঠলো এনামালি, গত হাটে আর বুধবারে দু’টাকার মার গেছে, আজ শোধ নেবে চতুর্গুণ গঞ্জের বাজারে তারা সুর্মা চোখে আছে সারে সারে । লণ্ঠন নেভাও বিবি, বন্ধ রাখো সোহাগের বুলি না হয় বেশীই পাবে, আরো এক চকচকে আধুলি ভোর রাত্রে ধরা চাই...

এক ঘুমের পর

এক ঘুমের পর সমস্ত আকাশ থেকে রাত্রি আর বৃষ্টি ঝরে পড়ে নীলকান্ত অন্ধকারে নিশ্বাসের সঙ্গী এই ঘরে হাত দিয়ে স্পর্শ করি তুষারের স্তূপ এক নারী অকুল কুন্তল পাশ–মেলে দিয়ে ক্লান্তির সাগরে তুমিও আকাশ বুঝি, অন্ধকার, বর্ষণ-সঞ্চারী? মধ্যরাত্রে মাতালের মতো ঘোরে দুরন্ত বাতাস...

একজন মানুষের গল্প

একজন মানুষের গল্প নায়ক শহরে কোনো এক মসীপণ্য দিনের প্রকৃতি মুছে গেছে তার চোখে সেই অভিমানে সেও মিলে গেল পথে অগণ্য লোকে অকৃপণ হাতে সময় ছড়ালো তার ; সংসার তাকে করেছে ছিন্ন ভিন্ন তীব্ৰ নখরে চিহ্ন এঁকেছে দেহে সোনার প্রভাত কোনোদিনও তাকে দেখলে না সস্নেহে তাই সে...

একটি অনুভব

একটি অনুভব পায়ের কাছে এই বিশাল বাধাহীন সমুদ্র মাথারও অধিতটে আকাশ নীলে নীল সমুদ্র একদা কার বুক আমার মনে হত সমুদ্র ? এখানে এ সাগর চোখের পরপারে অন্তহীন একদা কার প্ৰেম আমার চোখে ছিল অন্তহীন দু’বাহু বন্ধনে পেয়েও মনে হত অন্তহীন...

একা

একা একা গৃহকোণে আছি, তোমরাও এসো কয়েকজন অন্ধকার চিন্তাকুণ্ডে পাছড়িয়ে বসো হে আরামে কয়েকটি উজ্জ্বল স্মৃতি সময়কে করি সমর্পণ অনন্তের হাত থেকে কিছুক্ষণ অনিত্যের নামে । কাল রাত্রে ঘুম হয়নি, একা এক দ্বিতীয় জগতে বৃষ্টিহীন, নিষ্পাদপ, আদিগন্ত রুক্ষ তপ্ত বালি পায়ে ঠেলে...

কঠিন মিল

কঠিন মিল ধু ধু করা এক মাঠের মধ্যে একলা গাছের মতো ধুলোর ঝাপট রোদের ভ্রূকুটি স’য়ে স’য়ে অবিরত বৃষ্টি বাদন ঝড়ে শিকড়ে শিকড়ে বাঁচার সাহস শাখার শাখায় দুঃখ অবশ বাঁচতে চায় সে একলা বাঁচার প্ৰেম নিয়ে অন্তরে ! এ কেমন সাধ! আলোর বৃত্তে বিলাসী পোকার মতো তাকে চেয়ে আমি সারাটা জীবন...

কবি

কবি তার কোনো দুঃখ নেই, সে তো সব সুখেরও অতীত তার চক্ষে আলো জ্বলে, সে আলোর বর্ণ নেই কোনো তার বুকে এত ঘুম, ছুঁয়ে দেখি, সে তো নয় মৃত যন্ত্রণার আভা দিয়ে তার মুখ আগুনে সাজানো । তার কোনো দুঃখ নেই, সুখ নেই, শুধু এ জীবনে দুরাশ্চর্য তপস্যায় গেঁথে যায় মুহুর্তের মালা দিনের...

ক্ষণিকা

ক্ষণিকা এপ্রিলের কৃষ্ণচুডা অহঙ্কারে ব্যাপ্ত করে দিক ; ঝরে যাবে, মনে মনে বলি আমি, ঝরে যাবে ঠিক, শীতের নির্মম হাত ছিড়ে নেবে স্পধার নিশান ; যে আকাশ নীলে নীলে মনে হয় যেন অফুরান সেও শূন্য হবে, ক্লান্ত মেঘ এসে মুছে দেবে সীমা, । কালের কুটিল স্রোতে ভেসে যাবে কালের প্রতিমা ।...

ঘর

ঘর পাহাড় সমুদ্র আর অরণ্যের স্তব লিখে লিখে ক্লান্ত এক কবি আজ ঘুমিয়েছে একলা ছোট ঘরে, যখন সে জেগেছিল, ছোট ছোট ঘর ভর্তি এই পৃথিবীকে উদার প্রশস্ত চোখে চেয়েছিল বাসনার স্তরে। কৈশোরে অম্লান এক শ্বেতপদ্ম ছিল তার বুকে । প্ৰসন্ন রৌদ্রের আলো টলোমলো স্বচ্ছ সরোবর এবং উদাস, নীল,...

চতুরের ভূমিকা

কিছু উপমার ফুল নিতে হবে নিরুপমা দেবী যদিও নামের মধ্যে বেখেছেন আসল উপমা ক্ষণিক প্রশ্রয়-তুষ্টি চায় আজ সামান্য এ কবি, রবীন্দ্রনাথেরও আপনি চপলতা করেছেন ক্ষমা। যদিও প্রত্যহ আসে অগণিত সুঠাম যুবক নানা উপহার আনে সময় সাগর থেকে তুলে আমি তো আনি নি কিছু চম্পা কিংবা কুর্চি কুরুবক...

চতুর্দশপদী

চতুর্দশপদী সুনিশ্চিত সর্বনাশে চিরকাল যুবকের নেশা এই সত্য জেনে তুমি সুকুমার মৃণাল-শরীরে ফোটালে বিষাক্ত পদ্ম ছদ্মবেশী মাধুর্যেতে মেশা অনায়াসলভ্যমণি রেখে দিলে দুর্গ দিয়ে ঘিরে। হিংস্র অন্ধকারে ভরা অরণ্যের মতো চুল খুলে পৌরাণিক রূপসীর মতো তুমি মায়াবী-আলোকে এ জন্মের...

চিরহরিৎ বৃক্ষ

চিরহরিৎ বৃক্ষ শ্মশানে পিতৃপুরুষের কঙ্কাল, তার ফাঁকে ফাঁকে শিরশির করে বয়ে যাচ্ছে বাতাস । আমার সাধ ছিল সেই বাতাসের ভাষা শুনি । একদিন তাই অন্ধকার নদীর কিনারায় নিভে আসা চিতাকুণ্ডের পাশে শুয়েছিলাম আমি, জীবন্ত । কোথা থেকে পাখার শনশন শব্দ করে একটা বিশাল বাজ পাখি উড়ে এসে...

ঝর্ণা-কে

ঝর্ণা-কে সেই যে এক বাউল ছিল সংক্রান্তির মেলায় গানের তোড়ে দম বাধলো গলায় হারানো তার গানের পিছে হারালো তার প্রাণ, আহা, ভুলে গেলাম কি যেন তার গান ! প্ৰাণ দিয়েছে দেয়নি তার হাসি গানের মতো প্ৰাণ ছেড়েছে খাঁচা । সেই যে তার মরণাহত হাসি ঝর্ণা, জানো, তারই নাম তো বাঁচা...

ঝড়

ঝড় কোথায় নামলে ঝড়–এখানে আকাশে মেঘ-ছোঁয়া পাখি এক ভয় পেয়ে নীড়ে ফিরে আসে । অথচ এখানে মেঘ কুমারীর মুখের মতন অস্ফুট লাবণ্যময়, শান্ত নীল রৌদ্রে ভেজা বন, ঝড়ের আভাস নেই, তবু সেই মেঘ-ছোঁয়া পাখি ডানায় বিদ্যুৎ এনে ফিরে এসে কুলায় একাকী প্ৰতীক্ষার তীক্ষ্ণ চোখে...

তামসিক

তামসিক পায়ের নিচে শুকনো বালি একটু খুঁড়লে জল গভীরে যাও গভীরে যাও বুকের হলাহল আলো চায় না, হাওয়া চায় না, স্তব্ধতার সুখ দেখ জ্বলছে আকাশ ভরে, তবু ফেরাও মুখ গভীরে যাও গভীরে যাও দু হাতে ধরে আঁধার পায়ের নিচে বালি খুঁড়লে অতল পারাবার। মৌমাছির চাক ভেঙেছি, আমার চোখে মুখে...