পাহাড় চূড়ায় আতঙ্ক (১৯৮১)

০১. উঃ, কী শীত, কী শীত

উঃ, কী শীত, কী শীত! এখানকার হাওয়ার যেন ভয়ঙ্কর দাঁত আছে, শরীর কামড়ে ধরে একেবারে। সন্তু কাকাবাবুর সঙ্গে একবার কাশ্মীরেও গিয়েছিল, কিন্তু সেখানকার শীতের সঙ্গে এখানকার শীতের যেন তুলনাই হয় না। হাওয়ার ভয়ঙ্কর দাঁত, আছে, এ কথাটা সন্তুরই মনে পড়েছিল। গরম জামা-কাপড় দিয়ে শরীরের সব...

০২. দাঁতটার কথা

কলকাতায় কিন্তু কাকাবাবু ঐ দাঁতটার কথা কিছুই বলেননি সন্তুকে। সন্তুও জানতই না যে, কাকাবাবু এবার বিলেত থেকে ঐ দাঁতটা নিয়ে এসেছেন। বিলেত থেকে সবাই কত ভাল-ভাল জিনিস আনে, আর কাকাবাবু এনেছেন একটা মরা মানুষের দাঁত! আন্দামান অভিযানের কথা চারদিকে ছড়িয়ে পড়ার পর পৃথিবীর নানান...

০৩. গুলির আওয়াজ

গুলির আওয়াজে চার পাশের পাহাড়গুলো যেন কেঁপে উঠল। যেন অনেকগুলো গুলি ঠিকরে গেল অনেকগুলো পাথরে। তারপরেও দূরে-দূরে সেই আওয়াজ হতে লাগল। কাকাবাবু এমন আচমকা গুলি ছুঁড়েছিলেন যে, সন্তু দারুণ চমকে উঠেছিল। পাহাড়ি জায়গায় প্ৰতিধ্বনি কেমন হয়, সে সম্পর্কেও সন্তুর প্রথম অভিজ্ঞতা হল।...

০৪. চোখে দূরবিন লাগিয়ে

সন্তু চোখে দূরবিন লাগিয়ে প্রথমে কিছুই দেখতে পেল না। শুধু আবছা! আবছা অন্ধকার। এখানকার আকাশ প্ৰায় কখনওই পরিষ্কার থাকে না। সব সময় মেঘলা-মেঘলা, তবু তারই ফাঁক দিয়ে মাঝে-মাঝে চাঁদের আলো এসে পড়ে। সন্তু খুব মনোযোগ দিয়ে দেখবার চেষ্টা করল। কই, কিছুই তো দেখা যাচ্ছে না। দু জায়গায়...

০৫. দুপুর থেকেই বরফ-বৃষ্টি

দুপুর থেকেই বরফ-বৃষ্টি শুরু হয়েছে। এখানে বৃষ্টি মানেই বরফাবৃষ্টি, তবে এক-এক সময় খুব নরম, পাতলা পেজ-তুলোর মতন তুষারপাত হয়, তার মধ্য দিয়ে হাঁটতে বেশ আরাম লাগে, তাতে গা ভেজে না। আর এক-এক সময় তুষারপাতে আকাশ অন্ধকার হয়ে যায়, চার-পাঁচ হাত দুরের কোনও জিনিসও দেখা যায় না। সেই...

০৬. বৃষ্টি থেমেছে

কাকাবাবু বললেন, দ্যাখ তো, বৃষ্টি থেমেছে কি না। সন্তু গম্বুজের লোহার দরজাটা খুলে বাইরে উঁকি মোরল। এখানে এই এক অদ্ভুত। যখন-তখন বৃষ্টি, আবার একটু পরেই ঝকমকে রোদ। দুপুরে এমন বরফ-বৃষ্টি শুরু হয়েছিল যে, মনে হয়েছিল, আর থামবেই না। সারাদিন। কিন্তু এখন আকাশ একেবারে পরিষ্কার।...

০৭. বরফের মধ্যে

বরফের মধ্যে ঢুকে যেতে যেতে সন্তু ভাবল, এই তার শেষ। কাকাবাবু আর মিংমা তাকে দেখতে পাচ্ছে না, তার আর বাঁচার আশা নেই। কিন্তু মানুষ সব সময় বাঁচার জন্য শেষ পর্যন্ত চেষ্টা করে। সন্তুর দম আটকে আসছে, তবু সে পা দুটো বেঁকিয়ে নিজেকে তোলার চেষ্টা করতে লাগল। এক সময় তার মাথা ঠেকাল...

০৮. মিংমা

পরদিন সকালেই কাকাবাবু মিংমাকে ডেকে বললেন, তাঁবু গোটাও। আমরা এবার সামনের দিকে এগোব। মিংমা যেন আনন্দে একেবারে নেচে উঠল। সে বলল, এভারেস্টে যাব, সাব? চলিয়ে সাব, আমি আপনাকে কন্ধে পর উঠাকে নিয়ে যাব। কাকাবাবু বললেন, তার দরকার হবে না। আমি নিজেই যেতে পারব। আমাদের এক নম্বর...

০৯. যাত্রা শুরু

ঠিক সকাল নটার সময় যাত্রা শুরু হল। সন্তু এর আগে কালাপাথরের ওপরে উঠেছিল একবার। খুব বেশি দূর নয়। যদি তুষারপাত শুরু না হয়, তাহলে ঘন্টা তিনেকের মধ্যেই পৌঁছে যাওয়া যাবে। মিংমা আর নোরবুচলেছে একেবারে সামনে। তাদের পেছনে সন্তু। মিং তার স্বভাব অনুযায়ী নানারকম মজার কথা বলতে বলতে...

১০. জোরে আওয়াজ

দরজায় যত জোরে আওয়াজ হল, সন্তুর বুকের মধ্যে যেন তার থেকেও জোরে আওয়াজ হতে লাগল। এই বরফের রাজ্যের মধ্যে সে আর কাকাবাবু ছাড়া আর কেউ নেই। কাকাবাবু আর সন্তুর খাট যেখানে পাশাপাশি পাতা, সেখান থেকে গম্বুজের দরজাটা দেখা যায় না। কাকাবাবু বিছানার ওপর স্থির হয়ে বসে আছেন, হাতে...

১১. বরফের ঝড়

বরফের ঝড়টা চলতে লাগল সারা রাত ধরে। গম্বুজের ভেতরটা যেন ধোঁয়ায় ভরে গেছে। ওপরের জানলাটা ভাল করে বন্ধ করা যায়নি। পুরো বন্ধ করলেও ভেতরে কিছুক্ষণের মধ্যেই নিশ্বাসের কষ্ট হবে। খোলা জানলা দিয়ে ঝড়ের হাওয়ার ঝাপটা ঢুকছে সেইজন্য একেবারে অসহ্য শীত। সন্তুর মনে হল, আজকের রাতটা যেন...

১২. মরা মানুষ

চোখের সামনে একজন মরা মানুষকে দেখে সন্তুর শরীরটা ঘুলিয়ে উঠল। সে মুখ ফিরিয়ে নিল অন্যদিকে। চীনা ভদ্রলোকটির গায়ে একটা ভেড়ার চামড়ার কোট। থুতনিতে অল্প অল্প দাড়ি। চোখ দুটি খোলা। দৃষ্টিতে ভয়ের বদলে যেন খানিকটা বিস্ময়ের ভাব মাখানো। সন্তু মৃতদেহটির দিকে তাকাতে চায় না, কিন্তু...

১৩. নীল কোট

নীল কোট পরা লোকটা দুহাত তুলে তুলে ছুটে আসছে ওদের দিকে। ঠিক ছুটিতে পারছে না লাফিয়ে-লাফিয়ে আসছে। বরফের ওপর দিয়ে। রানা। আর ভার্মা লাইট মেশিনগান উঁচিয়ে আছেন লোকটির দিকে। একটু কাছে আসতেই দেখা গেল, লোকটা মিংমা। কাকাবাবু বললেন, এ তো আমাদের একজন শেরপা! সন্তু বলল, আমি আগেই...

১৪. ভার্মার মুখ

ভার্মার মুখ দেখে মনে হল, জীবনে তিনি এ-রকম অবাক কখনও হননি। চোখ দুটো একেবারে স্থির হয়ে গেছে। ফিসফিস করে তিনি বললেন, এ কী ব্যাপার? মিঃ রায়চৌধুরী কোথায় গেলেন? রানা বললেন, ষ্ট্রেঞ্জ। ভেরি ষ্ট্রেঞ্জ! এই তো আমাদের পেছনেই ছিলেন, খানিকটা আগেই দেখতে পাচ্ছিলাম! কোনও কারণে উনি কি...

১৫. জ্ঞান ফেরার পর

জ্ঞান ফেরার পর কাকাবাবু চোখ মেলে দেখলেন পাতলা-পাতলা অন্ধকার। তিনি ভাবলেন বুঝি রাত হয়ে গেছে। কতক্ষণ অজ্ঞান হয়ে আছেন, তা তো তিনি জানেন না। পাশে হাত দিয়ে দেখলেন, বরফ নয়, তিনি শুয়ে আছেন পাথরের ওপর। এখানে তিনি কী করে এলেন? তিনি অজ্ঞান হয়ে যাবার পর ওরা তাঁকে ধরাধরি করে এনে...

১৬. খুব দ্রুত চিন্তা

কাকাবাবু খুব দ্রুত চিন্তা করতে লাগলেন। এটা যদি ইয়েতি হয়, এটাকে মেরে ফেলা উচিত নয়। পৃথিবীর কেউ কখনও জ্যান্ত ইয়েতি ঠিকমতন দেখেনি। রহস্যময় প্রাণী হিসেবে একে বাঁচিয়ে রাখা দরকার। কিন্তু কাকাবাবুর নিজের প্রাণও তো বাঁচাতে হবে। তিনি ওকে একেবারে না মেরে পায়ে গুলি মেরে আহত...

১৭. সারা রাত না ঘুমিয়ে

সন্তু সারা রাত না ঘুমিয়ে ছটফট করল। কাকাবাবু কী করে অদৃশ্য হয়ে গেছেন, তা সে কিছুতেই বুঝতে পারছে না। মানুষ কখনও অদৃশ্য হতে পারে না। কাকাবাবু নিশ্চয়ই কোনও খাদের মধ্যে পড়ে গেছেন। অথচ, সেখানে কাছাকাছি কোনও খাদের চিহ্নও নেই। মাঝে মাঝে তন্দ্রার মধ্যে সন্তু একটা স্বপ্নই দেখতে...

১৮. রিভলভার

কাকাবাবু রিভলভারটা তুলেই দেয়ালের দিকে সরে গেলেন। তারপর রিভলভারটা টিপ করে রাখলেন লোকটির মাথার দিকে। পড়ে যাবার পর লোকটি কোনও শব্দও করল না, একটুও নড়ল না। একই জায়গায় পড়ে রইল, উপুড় হয়ে। কাকাবাবু ভাবলেন, পাথরে মাথা ঠুকে কি অজ্ঞান হয়ে গেল লোকটি? কিন্তু অত জোরে তো পড়েনি! ও...

১৯. সত্যিকারের ভয়

কাকাবাবু প্রথমটায় সত্যিকারের ভয় পেয়ে আঁতকে উঠলেন। পাথর কেটে বানানো হয়েছে একটা চৌকো মতন টেবিল। তার ওপর হাত-পা ছড়িয়ে শুয়ে আছে সন্তু। দেখলেই মনে হয়, সে মরে গেছে। কাকাবাবু সন্তুর দিকে ছুটে যাবার চেষ্টা করলেন। কিন্তু দুজন মুখোশধারী তাঁর হাত চেপে ধরে আছে। কাকাবাবু প্ৰচণ্ড...

২০. গলা ফাটিয়ে চিৎকার

মিংমার মনে হল যেন তার শরীরটা কোমরের কাছ থেকে কেটে দু টুকরো হয়ে যাচ্ছে। দারুণ যন্ত্রণায় সে গলা ফাটিয়ে চিৎকার করতে লাগল। মাথার ওপর দিয়ে হেলিকপটারটা ঘুরছে, সেদিকে সে একটা হাত নাড়তে লাগল প্ৰাণপণে, কিন্তু হেলিকপটার থেকে তাকে কেউ দেখতে পেল না। একেবারে মৃত্যুর মুখোমুখি এসে...