নীলমূর্তি রহস্য (১৯৯২)

নীলমূর্তি রহস্য - কাকাবাবু ও সন্তু সিরিজ - সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

০১. দুপুরবেলা হঠাৎ কলেজ ছুটি হয়ে গেল

দুপুরবেলা হঠাৎ কলেজ ছুটি হয়ে গেল। একজন প্রোফেসর পদ্মশ্রী খেতাব পেয়েছেন, সেইজন্য। বাইরে ঝিরঝির করে বৃষ্টি পড়ছে, কিছু ছেলেমেয়ে সেই বৃষ্টির মধ্যেই বেরিয়ে পড়ল। সন্তু কলেজের গেটের সামনে দাঁড়িয়ে ভাবছে বৃষ্টিতে ভিজবে কি ভিজবে না, এই সময় তার বন্ধু জোজো তার পিঠে হাত দিয়ে বলল,...

০২. অংশুমান চৌধুরী খুব রোগা আর লম্বা

অংশুমান চৌধুরী খুব রোগা আর লম্বা একজন মানুষ। গায়ের রং বেশ ফসা, মাথায় একটাও চুল নেই, দাড়ি-গোঁফ নেই, ভুরুর চুল সব পাকা, কিন্তু সেরকম বুড়ো থুরথুরে নন্। চোখ দুটি ঝকঝকে। তাঁর ঘরে অনেক কালের পুরনো একটা খাট, যার আর-এক নাম পালঙ্ক। খাটটি বেশ উঁচু, একটা টুলের ওপর পা দিয়ে সেটার...

০৩. জাতীয় গ্রন্থাগারে কাকাবাবু

জাতীয় গ্রন্থাগারে কাকাবাবু একটা দরকারি বইয়ের খোঁজে এসেছিলেন। এখানে অনেকেই তাঁর চেনা। প্রধান গ্রন্থাগারিক নিজের ঘরে ডেকে নিয়ে গিয়ে চা খাওয়ালেন। তারপর কাকাবাবু বই দেখলেন অনেকক্ষণ ধরে। সেখান থেকে বেরুতে বেরুতে সন্ধে হয়ে গেল। গেটের বাইরে এসে তিনি একটাও ট্যাক্সি দেখতে...

০৪. ঘুম থেকে ওঠার পর

ঘুম থেকে ওঠার পর অংশুমান চৌধুরী প্রথমে খানিকক্ষণ গড়গড়া টানলেন। জানলা দিয়ে বাইরের মেঘলা আকাশ দেখা যাচ্ছে। একটু পরেই, জোর বৃষ্টি সামবে। অংশুমানের মুখে একটা খুশি-খুশি ভাব ফুটে উঠল। বৃষ্টি পড়লে তাঁর মেজাজ ভাল থাকে। তিনি হাঁক দিলেন, ভীমু! ভীমু! বারান্দার দিকের দরজা খুলে...

০৫. জিপগাড়ির লোকদুটোকে দেখে

জিপগাড়ির লোকদুটোকে দেখে জোজো দৌড় লাগালেও সন্তু দাঁড়িয়ে রইল এক জায়গায়। অরিন্দম সন্তুর হাত ধরে টানতে লাগল। সন্তু একঝলক তাকিয়ে দেখল, জোজো নিজের বাড়ির দিকে না গিয়ে চলে যাচ্ছে বড় রাস্তার দিকে। লোক দুটো জোজোকেও তাড়া করে গেল না। সন্তুদের সামনে এল না, ডান দিকে একটু বেঁকে গিয়ে...

০৬. কাকাবাবু একবার চোখ মেলেই

কাকাবাবু একবার চোখ মেলেই আবার চোখ বুজিয়ে ফেললেন। এখনও চোখের পাতাদুটো খুব ভারী। ঘুম কাটেনি। শরীরটা দুলছে। শরীরটা দুলছে। মাথা ঘুরছে? কিংবা তিনি কি শূন্যে ভাসছেন? তাঁর ইচ্ছে করল চোখ খুলে ভাল করে দেখতে। কিন্তু কিছুতেই আর তাকাতে পারছেন না। মিনিট পনেরো আবার অজ্ঞানের মতন...

০৭. জোজোর জ্ঞান ফিরল

জোজোর জ্ঞান ফিরল আরও তিন ঘণ্টা বাদে। ততক্ষণে সন্তুর ঝিমুনি এসে গেছে। খঙ্গাপুরে সে জোজোকে ফেলে নামতে পারেনি, তার পরেও জোজোর জ্ঞান ফেরার অপেক্ষায় সে অনেকক্ষণ বসেছিল। খাকি পোশাক পরা লোকটাও চা খাবার একটু পরেই ঘুমিয়ে পড়েছে। সন্তু আর একা কতক্ষণ জেগে থাকবে? জোজো চোখ মেলেও...

০৮. সন্তুর নাম শুনে

সন্তুর নাম শুনে কাকাবাবু একটু থমকে গেলেন। সম্বলপুরে সন্তু? দুজন ভদ্রলোক একদিন একটা বিদঘুটে প্রস্তাব নিয়ে এসেছিল তাঁর কাছে। একটা নীল পাথরের মূর্তি উদ্ধারের ব্যাপারে। তাঁকে সম্বলপুর নিয়ে যাওয়ার জন্য পীড়াপীড়ি করেছিল খুব। তাঁর ইচ্ছের বিরুদ্ধে সেখানেই তাঁকে নিয়ে যাওয়া...

০৯. স্টেশন থেকে বেরোবার সময়

স্টেশন থেকে বেরোবার সময় সন্তু লক্ষ করল, এটা সম্বলপুর স্টেশন নয়। যদিও ট্রেনের খাকি পোশাক পরা লোকটি বলেছিল, তাদের সম্বলপুরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। এই জায়গাটার নাম ধওলাগড়। ছোট স্টেশন, তার বাইরে সুরকির রাস্তা। সেখানে দু-তিনটি সাইকেল রিকশা আর-একটা টাঙ্গা দাঁড়িয়ে। সন্তু আগে...

১০. স্নান করে, খাওয়াদাওয়া সেরে

স্নান করে, খাওয়াদাওয়া সেরে কাকাবাবু ঘণ্টাখানেক ঘুমিয়ে নিলেন। দুপুরে ঘুমোবার অভ্যেস নেই তাঁর কিন্তু আজ তিনি ক্লান্ত বোধ করছিলেন। স্টেশন থেকে বেশ কিছুটা দূরে এই বাড়িটায় পৌঁছবার পর কাকাবাবুকে একটা ঘর দেখিয়ে দেওয়া হয়েছিল, কাকাবাবু তখনই বলেছিলেন, আমি কিছুক্ষণ বিশ্রাম করতে...

১১. স্টেশন ওয়াগানটা কোণ্ডাগাঁওতে

স্টেশন ওয়াগানটা কোণ্ডাগাঁওতে যখন পৌঁছল তখন রাত প্রায় এগারোটা। চারদিক একেবারে নিঝুম, রাস্তায় আর কোনও গাড়ির শব্দ পর্যন্ত নেই। কোনওদিকে এক বিন্দু আলোও দেখা যায় না। গাড়ি চালাচ্ছেন মাধব রাও নিজেই। কাকাবাবু বসে আছেন তার পাশেই। গাড়ির মধ্যে রয়েছে অংশুমান চৌধুরী আর তাঁর সহকারী...

১২. একটা গাড়ির আওয়াজে

একটা গাড়ির আওয়াজে সন্তুর ঘুম ভেঙে গেল। এমনিতেই তার খুব পাতলা ঘুম। তা ছাড়া নতুন কোনও জায়গায় প্রথম রাত্তিরে অন্তত ভাল করে ঘুমই হয় না। রাত এখন কটা হবে কে জানে! দুটো-তিনটের কম নিশ্চয়ই নয়। সন্তুরা শুতেই গেছে বারোটার পর। পাশের খাটে ঘুমোচ্ছে জোজো। বিছানায় শোওয়া মাত্র সে...

১৩. সন্তুর প্রথমে মনে হল

সন্তুর প্রথমে মনে হল, সে জলে ড়ুবে যাচ্ছে। খুব গভীর সমুদ্র, তার মধ্যে সে ড়ুবে যাচ্ছে আস্তে আস্তে। সব দিক নীল, শুধু নীল। প্রচণ্ড ঢেউয়ের শব্দ। তারপরই সন্তুর মনে পড়ল, সে তো সাঁতার জানে, তা হলে শুধু শুধু ড়ুবে যাচ্ছে কেন? সে হাত-পা ছুঁড়ে প্রাণপণে সাঁতার কাটতে শুরু করল। তার...

১৪. গাড়িটা একটু আগেই থেমে গেল

গাড়িটা একটু আগেই থেমে গেল। প্রথম দু-এক মিনিট গাড়ি থেকে কেউ নামল না। ইঞ্জিনের শব্দ হতে লাগল ধক ধক ধক ধক করে। জ্বলতে লাগল। হেডলাইট। তারপর গাড়ি থেকে প্রথমে নামল রাও, তারপর ভীমু, তারপর লর্ড, তার মাথায় একটা ফেট্টি বাঁধা। একেবারে শেষে অংশুমান চৌধুরী। রাও-এর হাতে রাইফেল,...

১৫. গাড়ি থেকে স্যান্ডউইচ-এর প্যাকেট

গাড়ি থেকে স্যান্ডউইচ-এর প্যাকেট আর চা-ভর্তি ফ্লাস্ক নিয়ে এল ভীমু। নদীর ধারে বালির ওপর একটা ম্যাপ সামনে বিছিয়ে বসে আছেন অংশুমান চৌধুরী। ভীমু কাগজের গেলাসে চা ঢেলে একটা করে দিল সবাইকে। সবে মাত্র ভোর হয়েছে। শোনা যাচ্ছে নানারকম পাখির ডাক। হাওয়ায় বেশ শীত-শীত ভাব। নদীর...

১৬. ভোরবেলাতে আবার যাত্রা শুরু হল

ভোরবেলাতে আবার যাত্রা শুরু হল। একটি ঘোড়ার পিঠে জোজো আর সন্তু। আর একটি ঘোড়ায় কাকাবাবু। দুটোর বেশি পাওয়া গেল না। তা ছাড়া জোজো নিজে আলাদা একটা ঘোড়া চালাতেও পারত না। কাকাবাবু তাঁর ক্রাচ দুটো বেঁধে এক পাশে ঝুলিয়ে নিয়েছেন। একটা পা প্রায় অকেজো হলেও তাঁর ঘোড়া চালাতে অসুবিধে...

১৭. কাছেই একটা ছোট ঝরনা

কাছেই একটা ছোট ঝরনা, সন্তু আঁজলা করে জল এনে ছিটিয়ে দিতে লাগল লোকটির চোখে-মুখে। আগেই সে লোকটির নাকে হাত দিয়ে দেখে নিয়েছে যে তার নিঃশ্বাস পড়ছে। কোনও কারণে অজ্ঞান হয়ে গেছে সে। কাকাবাবু ঘোড়াটিকে একটা কুঁড়েঘরের কাছে নিয়ে গিয়ে অতিকষ্টে নিজেই নামলেন। সেই ঘরের সামনে আর একটি...

১৮. পাহাড়ের গায়ে ছোট একটা জলাশয়

পাহাড়ের গায়ে ছোট একটা জলাশয়, সেখানে পৌঁছে অংশুমান চৌধুরী বললেন, এবারে এখানে একটু বসা যাক। ভীম তোর ফ্লাস্কে আর চা আছে? খাবার টাবার কিছু আছে? খিদে পেয়ে গেছে। ভীমু বলল, হ্যাঁ, আছে, স্যার। চা আছে, সন্দেশ আছে। লর্ড বলল, এবারে আমাদের মুখখাশ খুলে ফেলতে পারি? মাথাটা ভীষণ ভারী...

১৯. অংশুমান চৌধুরী কাকাবাবুর হাত দুটো ধরে

অংশুমান চৌধুরী কাকাবাবুর হাত দুটো ধরে টানতে টানতে নিয়ে এলেন জলাশয়টার ধারে। একটা পাতলা গাছের গায়ে কাকাবাবুকে হেলান দিয়ে বসিয়ে দিয়ে তিনি হাঁফাতে লাগলেন। কাকাবাবুর বেশ বলশালী চেহারা, তাঁকে এতটা টেনে আনতে পরিশ্রম কম হয়নি। পরিশ্রান্ত হলেও অংশুমান চৌধুরী তাঁর মুখোশ পরা...