জঙ্গলগড়ের চাবি (১৯৮৭)

জঙ্গলগড়ের চাবি - কাকাবাবু এবং সন্তু - সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

০১. মাধ্যমিকের রেজাল্ট বেরিয়েছে

মাধ্যমিকের রেজাল্ট বেরিয়েছে আজ সকালে। রাস্তা থেকে হকার খবরের কাগজটা ছুঁড়ে দিয়ে গেছে একটু আগে, সেটা পড়ে আছে দোতলার বারান্দার কোণে। সন্তু কিন্তু ঘুমিয়ে আছে এখনও। আজ যার রেজাল্ট বেরুবার কথা, তার কি এত বেলা পর্যন্ত ঘুমিয়ে থাকা উচিত? একটু চিন্তা-ভাবনা নেই? আসলে সন্তু সারা...

০২. কাকাবাবুর চেয়ে সন্তুর বাবা মাত্র দুবছরের বড়

কাকাবাবুর চেয়ে সন্তুর বাবা মাত্র দুবছরের বড়। কিন্তু দুজনের চেহারার অনেক তফাত। কাকাবাবু যেমন লম্বা, তেমনি চওড়া কাঁধ, চওড়া কব্জি। আর পুরুষ্টু গোঁফটার জন্য কাকাবাবুকে মিলিটারি অফিসারের মতন দেখায়। সন্তুর বাবাও বেশ লম্বা হলেও রোগা-পাতলা চেহারা, কোনওদিন গোঁফ রাখেননি, মাথার...

০৩. ওপরের বারান্দা থেকে

বাবা ওপরের বারান্দা থেকে শুনতে পেয়ে বললেন, অ্যাঁ? কী বললে? কী সর্বনাশ! সন্তু কোথায়? সন্তু ততক্ষণে রাস্তায় বেরিয়ে তীরের মতন ছুটুতে আরম্ভ করেছে। গলি থেকে বেরিয়ে বড় রাস্তা, তারপর ডান দিকে বেঁকে মিনিট পাঁচেক হাঁটলেই পার্কটায় পৌঁছনো যায়। সন্তু সেখানে পৌঁছে গেল দেড় মিনিটে।...

০৪. প্লেনের সিঁড়ি

প্লেনের সিঁড়ি থেকে কাকাবাবুকে ধরাধরি করে নামিয়ে আনা হল। কাছেই টারম্যাকের ওপর অপেক্ষা করছে একটা বেশ বড় জিপ। তার পেছন দিকে দুই সীটের মাঝখানে বিছানা পাতা। প্রকাশ সরকার আর সন্তু দুজনে মিলে কাকাবাবুকে সেখানে শুইয়ে দিল খুব সাবধানে। সন্তু সেখানেই বসল। আর প্রকাশ সরকার গিয়ে...

০৫. কাকাবাবুকে ইঞ্জেকশান দিয়ে ঘুম

প্রকাশ সরকার কাকাবাবুকে একটা ইঞ্জেকশান দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিল। তারপর সন্তুর সঙ্গে তাড়াতাড়ি খাওয়া-দাওয়া সেরে নিয়ে নিজেদের ঘরে এসে বসল। সন্তুর মুখখানা শুকিয়ে গেছে। একেবারে। সে যেন বুঝতে পারছে কাকাবাবুর একটা ভীষণ বিপদ আসছে। এই অবস্থায় বাড়ি থেকে এত দূরে থাকা কি ঠিক? প্ৰকাশ...

০৬. সন্তু এখন ঠিক কী করবে

সন্তু এখন ঠিক কী করবে, তা প্রথমে কিছুতেই ঠিক করতে পারল না। এখন সে কি প্রকাশ সরকারকে ভাল করে খুঁজে দেখতে যাবে? কিন্তু তা হলে কাকাবাবুর কাছে কে থাকবে?কাকাবাবুকে একা ফেলে রাখা যায় না। প্রকাশ সরকার এত সকালে কোথায় গেল? সন্তুকে কিছু না বলে সে সার্কিট হাউসের বাইরে চলে যাবে,...

০৭. ডলি নামের মেয়েটি

ডলি নামের মেয়েটি খুব যত্ন করে খাইয়ে দিল কাকাবাবুকে। তারপর মুখ ধুইয়ে, তোয়ালে দিয়ে মুছিয়ে দিল। তারপর বলল, এবার চলুন, কাকাবাবু। সন্তুর দিকে ফিরে বলল, সন্তু, তুমি সব জিনিসপত্তর গুছিয়ে টুছিয়ে নাও। সন্তু পড়েছে মহা মুশকিলে। সে বুঝতে পারছে যে, এখন এই সার্কিট হাউস ছেড়ে অচেনা...

০৮. সন্তু ঘরের দরজা খুলে

সন্তু ঘরের দরজা খুলে প্রথমে কাকাবাবুকে একটা চেয়ারে বসিয়ে দিল। তারপর অরিজিৎ দেববর্মনকে বলল, আপনি একটু এখানে থাকবেন, আমি একটু বাইরেটা দেখে আসব? অরিজিৎ দেববর্মন বললেন, ব্যস্ত হবার কিছু নেই। শিশিরবাবু ঠিক চামেলিকে ধরে নিয়ে আসবেন। সন্তু তবু দরজার কাছে গিয়ে উকি মেরে বলল,...

০৯. সন্তুর ধারণা হল

সন্তুর ধারণা হল বাইরে গিয়ে সে ডক্টর প্রকাশ সরকারকে দেখতে পাবে। কারণ ভোর থেকে প্রকাশ সরকারের উধাও হয়ে যাবার সে কোনও যুক্তিই খুঁজে পাচ্ছে না। কিন্তু বাইরে এসে দেখল, একটা সাইকেল-রিকশার ওপর একজন সম্পূর্ণ অচেনা লোক গা এলিয়ে শুয়ে আছে। দেখলে মনে হয় ঘুমিয়ে পড়েছে। লোকটির গায়ে...

১০. সাধারণ শহরের ছেলেদের মতন নয়

সন্তু তো আর সাধারণ শহরের ছেলেদের মতন নয় যে, সাপ দেখেই ভয়ে আঁতকে উঠবে! সে কত দুর্গম পাহাড় আর কত গভীর জঙ্গলে গেছে, সাপ-টাপ দেখার অভিজ্ঞতা তার অনেক আছে। সাপটার চোখের দিকে তাকিয়ে সন্তু একেবারে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। ফুল দেখতে দেখতে অন্যমনস্ক হয়ে আর একটু হলেই সে সাপটাকে...

১১. প্রায় আধঘণ্টা বাদে নিরাশ হয়ে

প্রায় আধঘণ্টা বাদে নিরাশ হয়ে বেরিয়ে এলেন নরেন্দ্র ভার্মা। মাথা নাড়তে নাড়তে বললেন, নাঃ, কিচ্ছু হল না! মাথা একদম গড়বড় হয়ে গেছে। আমার কোনও কথাই বুঝতে পারছেন না। সন্তু উদগ্রীবভাবে দাঁড়িয়ে ছিল দরজার বাইরে। সে বলল, তা হলে এখন কী হবে? নরেন্দ্র ভার্মা জিজ্ঞেস করলেন, এখানে...

১২. যদি যাও বঙ্গে

গাড়িটা গেস্ট হাউসের গেট ছাড়িয়ে বাইরে পড়বার পর লোকগুলো দুটো কালো কাপড় দিয়ে কাকাবাবু আর সন্তুর চোখ বেঁধে দিল। কাকাবাবুর তো বাধা দেবার কোনও ক্ষমতাই নেই, সন্তুও বুঝল বাধা দেবার চেষ্টা করে কোনও লাভ নেই। নার্স সুনীতি দত্ত ওদের সঙ্গেই এসেছে আর লোকগুলোর সঙ্গে বেশ গল্প জুড়ে...

১৩. কাকাবাবু হাঁটতে পারেন না

কাকাবাবু হাঁটতে পারেন না জেনেও দুজন লোক দুদিক থেকে কাকাবাবুর হাত ধরে সিঁড়ি দিয়ে হেঁচড়ে টেনে নিয়ে চলল। কাকাবাবুর খুবই ব্যথা লাগছে নিশ্চয়ই। কিন্তু কিছুই বলছেন না। সন্তুও যে কিছু করবে তার উপায় নেই। আর দুজন লোক তার জামার কলার ও চুলের মুঠি ধরে আছে। তার নড়বার উপায় নেই।...

১৪. কাকাবাবু বজ্রমুষ্টিতে গলা চেপে ধরায়

কাকাবাবু বজ্রমুষ্টিতে গলা চেপে ধরায় লম্বা লোকটা দুবার মাত্র আঁ আঁ শব্দ করল। একটা হাত কোটের পকেটে ভরে কিছু একটা বার করে আনবার চেষ্টা করেও পারল না। তার আগেই জ্ঞান হারিয়ে ফেলল। কাকাবাবু ওর অচৈতন্য দেহটা মাটিতে শুইয়ে দিয়ে প্রকাশ সরকারকে বললেন, বললুম যে, দরজাটা ভেতর থেকে...

১৫. কালবৈশাখীর ঝড় বইছে

সন্তুর বুকের মধ্যে যেন কালবৈশাখীর ঝড় বইছে। এক্ষুনি একটা কিছু সাঙ্ঘাতিক কাণ্ড ঘটবে। কাকাবাবু কি ঠাণ্ডা মাথায় একটা লোককে সত্যিই গুলি করে মেরে ফেলতে পারবেন? কাকাবাবু যে ভয় দেখাচ্ছেন, তা কি ওই কর্নেল নামে লোকটা বিশ্বাস করবে? একবার সে চট করে প্রকাশ সরকারের দিকে তাকাল।...

১৬. সমস্ত জায়গাটা একেবারে নিস্তব্ধ

হঠাৎ সমস্ত জায়গাটা একেবারে নিস্তব্ধ হয়ে গেল। কাকাবাবু উঠে দাঁড়িয়ে খোঁড়াতে খোঁড়াতে এলেন প্রকাশ সরকারের কাছে। মাথার এক জায়গা থেকে রক্ত বেরুচ্ছে, প্রকাশ সরকার অজ্ঞান। কাকাবাবু পরে আছেন রাত-পোশাক, সঙ্গে একটা রুমাল পর্যন্ত নেই। ফাঁস করে তিনি। নিজের জামাটা ছিড়ে ফেললেন,...

১৭. একটা গাড়ি এসে থামল

একটা গাড়ি এসে থামল বাড়িটার সামনে। তার থেকে নামলেন পুলিশের কতা শিশির দত্তগুপ্ত। নরেন্দ্র ভার্মা দোতলার সিঁড়ির কাছে রিভলভার নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন, শিশির দত্তগুপ্তকে দেখে বললেন, আমাদেরই লোক! কী আশ্চর্য, আপনি? টকটক করে জুতোর শব্দ তুলে সিঁড়ি দিয়ে উঠে আসতে আসতে শিশিরবাবু...

১৮. চায়ে চুমুক দিয়ে

চায়ে চুমুক দিয়ে কাকাবাবু বললেন, গুপ্তধনে আমার আগ্রহ নেই। এই বিংশ শতাব্দীতেও কোথাও কোথাও হঠাৎ গুপ্তধন পাওয়া যায় বটে। কিন্তু সে সবই গভর্নমেন্টের সম্পত্তি হওয়া উচিত। আমি ত্রিপুরায় কয়েকবার এসেছি মুদ্রার খোঁজে। আপনারা সবাই জানেন, ইতিহাস চর্চার জন্য প্রাচীন কালের মুদ্রার...

১৯. রাজকুমার বজ্রমুষ্টিতে সন্তুর ঘাড় চেপে ধরে

রাজকুমার বজ্রমুষ্টিতে সন্তুর ঘাড় চেপে ধরে প্রায় ছ্যাঁচড়াতে ছ্যাঁচড়াতে টেনে এনে তুলল একটা জিপ গাড়িতে। নিজে ড্রাইভারের সিটে বসে মাঝখানে বসাল সন্তুকে। আর পাশে খোলা রিভলভার হাতে নিয়ে বসল কর্নেল। গাড়িতে স্টার্ট দেবার পর রাজকুমার বলল, কেউ আমাদের ফলো করলে সোজা গুলি চালাবে।...

২০. ঘরের মধ্যে ঢুকে রাজকুমার

ঘরের মধ্যে ঢুকে রাজকুমার মেজর-কে বলল, যাও, জলদি কাগজ আর কলম নিয়ে এসো! মেজর যেন আকাশ থেকে পড়ল। চোখ বড় বড় করে বলল, কাগজ? কলম? সে আমি পাব কোথায়? রাজকুমার বিরক্ত হয়ে বলল, কেন, তোমার কাছে কাগজ কলম নেই? জোগাড় করে রাখোনি কেন? মেজর হে-হে করে হেসে বলল, কী যে বলেন, রাজকুমার!...