কাকাবাবু ও মরণফাঁদ (২০০২)

কাকাবাবু ও মরণফাঁদ - সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

০১. সকাল থেকে সন্তু আর জোজো

সকাল থেকে সন্তু আর জোজো নিজেদের মধ্যে কী যেন বলছে ফিসফিস করে। কাছাকাছি কাকাবাবুকে দেখলেই থেমে যাচ্ছে হঠাৎ। যেন তাদের একটা কিছু গোপন কথা আছে। বাড়ির সামনে অনেকখানি জায়গা জুড়ে বাগান। বড় বড় সব ফলের গাছ। মাঝখানটায় মখমলের মতন সবুজ ঘাসে ভরা লন। ওখানে ব্যাডমিন্টন খেলার জন্য...

০২. রিহার্সালের জন্য বড় বৈঠকখানা

রিহার্সালের জন্য বড় বৈঠকখানা ঘরটিকে ঠিক করা হয়েছে। পুরনো আমলের ঢাউস ঢাউস সোফাগুলোকে ঠেলে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে দেওয়ালের পাশে। ওগুলো সবই এখন ছেঁড়াখোঁড়া। হাড়গোড় বার করা অবস্থা, ফেলে দিলেই ভাল হয়। টাকিতে বেশ কয়েকটি দল যাত্রা করে, নাটক করে, তাদের ডাকা হয়নি। শুধু বেছে নেওয়া...

০৩. পার্ট মুখস্থ হয়ে গেল

চারদিনের মধ্যেই সবার বেশ পার্ট মুখস্থ হয়ে গেল। কাকাবাবুর নিজেরও সব মনে পড়ে গেছে। গানগুলো তিনি বই না দেখেই গেয়ে শোনাতে পারেন। ছোটমামা এরমধ্যে পোস্টার ছাপিয়ে ফেলেছেন। টাকি থেকে বসিরহাট পর্যন্ত অনেক দেওয়ালে দেওয়ালে সেই পোস্টার। পরিচালক হিসেবে বড় বড় অক্ষরে লেখা : রাজা...

০৪. রাস্তা একেবারে অন্ধকার

রাস্তা একেবারে অন্ধকার। এদিকে গাড়ি বিশেষ চলে না, সাইকেল রিকশাও কমে এসেছে। ছোটমামা সাইকেল চালিয়ে গিয়ে দুটো সাইকেল রিকশা ডেকে আনলেন। রাস্তার পাশের বাড়িগুলোতে মানুষজন জেগে আছে, না এরই মধ্যে ঘুমিয়ে পড়েছে তা বোঝার উপায় নেই। লোডশেডিং, কয়েকটা বাড়িতে টিম টিম করে হ্যারিকেন...

০৫. সুকোমলের বাবা নিখিল মাহাতো

সকালবেলাতেই সুকোমলের বাবা নিখিল মাহাতো এসে হাজির। বেশ গড়াপেটা, কালো রঙের লম্বা চেহারা, ছেলের মতনই ইনিও খুব বিনীত আর ভদ্র, মুখে একটা লাজুক ভাব। দেখলে পুলিশ বলে মনেই হয় না। কাকাবাবু ভোরেই উঠেছেন, দ্বিতীয় কাপ চা খাচ্ছেন বাগানে বসে। আজ আকাশে মেঘ নেই। নিখিল মাহাতো নমস্কার...

০৬. বিকেল থেকেই দারুণ মেঘ

বিকেল থেকেই দারুণ মেঘ করে আছে। আকাশ একেবারে কালো, নেমে আসছে অন্ধকার। সুকোমলের কোনও খোঁজ পাওয়া যায়নি। দুপুরে পুলিশের দুজন বড় অফিসার এসে দেখা করে গেছেন কাকাবাবুর সঙ্গে। তাঁদের ধারণা, ছেলেটাকে পাচার করে দেওয়া হয়েছে বাংলাদেশের সীমান্তের ওপারে। এখানকার পুলিশ ওদিকে যেতে...

০৭. জোজো আরাম করে বিছানায় শুয়ে

জোজো আরাম করে বিছানায় শুয়ে গল্পের বই পড়ে যাচ্ছে, কত বেলা হল তার হুঁশই নেই। পাশের একটা ছোট টুলে রাখা আছে পেঁয়াজ-লঙ্কা দিয়ে মাখা একবাটি মুড়ি, মাঝে মাঝে সেই মুড়ি খাচ্ছে মুঠো করে। বইটা শেষ হয়নি, কিন্তু মুড়ি শেষ হওয়ার পর তার খেয়াল হল, অনেকক্ষণ সন্তুর সাড়াশব্দ নেই। সন্তু...

০৮. সন্ধের পরই নৌকো চলাচল প্রায় বন্ধ

হাটবার ছাড়া নদীর এই ঘাটে সন্ধের পরই নৌকো চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। যাত্রী থাকে না বলে ফেরিনৌকোও চলে না। দু-তিনটে যে খাবারের দোকান আছে, তারাও ঝাঁপ ফেলে দেয় তাড়াতাড়ি। কৃষ্ণপক্ষের রাত, একেবারে ঘুটঘুটে অন্ধকার। একটিমাত্র নৌকোয় বসে তামাক খাচ্ছে একজন মাঝি। তার নৌকোয় টিমটিম...

০৯. কাকাবাবু ভাল করে চোখ চাইতে পারছেন না

কাকাবাবু ভাল করে চোখ চাইতে পারছেন না, সবই অস্পষ্ট দেখছেন। যা দেখছেন, তার মানে বুঝতে পারছেন না। একবার মনে হল, উলটো দিকে একজন লোক দাঁড়িয়ে আছে, তার চেহারা অবিকল তার মতন। যেন আর একজন রাজা রায়চৌধুরী। ঠিক তার মতন গোঁফ, তার মতন দুবগলে ক্রাচ। কাকাবাবু ভাবলেন, তার তো কোনও যমজ...

১০. লুতফরকে ধরে রেখে

লুতফরকে ধরে রেখে কোনও লাভ নেই। তাকে অনেক জেরা করে বোঝা গেল, সে কিছুই জানে না। সে নদীর ওপারের হাঁসখালি গ্রামের ছেলে। তাকে সত্যিই জোর করে ধরে আনা হয়েছে। তাকে ভাল করে খাইয়েদাইয়ে ফেরত পাঠিয়ে দেওয়া হল পরদিনই। তা হলে সুকোমলকে কোথায় রাখা হয়েছে? টাকাগুলো নকল না হয়ে আসল পাঁচ...

১১. কাকাবাবুর হাত বাঁধা

কাকাবাবুর হাত বাঁধা, পা দুটোও বাঁধা। দুজন লোক কাকাবাবুকে প্রায় চ্যাংদোলা করে বয়ে নিয়ে এল। লম্বা বারান্দার একেবারে শেষে একটা ঘর। এই ঘরটাতেই সাজানো রয়েছে। কয়েকটা কম্পিউটার ও নানারকম যন্ত্র। টেবিলের ওপাশে বসে আছে শঙ্খচূড়। এখন সে পরে আছে একটা রঙিন ড্রেসিং গাউন। তার পাশে...

১২. গাড়িটার কাচ কালো রঙের

গাড়িটার কাচ কালো রঙের। কাকাবাবুর চোখ বাঁধা, হাত বাঁধা। গাড়িটা কোন রাস্তা দিয়ে যাচ্ছে, তা কাকাবাবুর পক্ষে বোঝার কোনও উপায় নেই। এটুকু বোঝা গেছে, পেছনের সিটে তাঁর পাশে বসে আছে একজন, আর সামনে ড্রাইভারের পাশে বসে আছে আর একজন। আর ওদের মাঝখানে টবি নামের কুকুরটা। এই লোক...

১৩. কবুতরডাঙায় সপ্তাহে দুদিন হাট হয়

কবুতরডাঙায় সপ্তাহে দুদিন হাট হয়। তখন কত লোকজন, কত চ্যাঁচামেচি, কতরকম তরিতরকারি আর মাছের গন্ধ। অন্য দিনগুলোতে সব শুনশান। চালাঘরগুলো ফাঁকা পড়ে থাকে, ঘুরে বেড়ায় কয়েকটা কুকুর। শুধু এক কোণে খোলা থাকে একটা মুদিখানা, আর একটা চায়ের দোকান। গ্রামের বড় বড় ছেলেরা বিকেলের দিকে সেই...

১৪. কাকাবাবু বসে আছেন একটা জেলখানার মধ্যে

কাকাবাবু বসে আছেন একটা জেলখানার মধ্যে। সেখানে টেবিল ও চেয়ার রয়েছে অবশ্য। টেবিলের ওপর অনেক কাগজ ছড়ানো। তিনি একমনে লিখে যাচ্ছেন কীসব। লোহার দরজা খোলার শব্দ হতে তিনি ফিরে তাকালেন। মৃগাঙ্কমৌলী আর আলম এসেছেন দেখা করতে। নমস্কার জানিয়ে মৃগাঙ্কমৌলী জিজ্ঞেস করলেন, কোনও অসুবিধে...

১৫. কাকাবাবু শুরু করলেন আর-একটা গান

গগনের মোটরবাইকটা তুলে দেওয়া হয়েছে পুলিশের জিপে। আলমের গাড়িতে কাকাবাবুর সঙ্গে বসেছে সন্তু আর গগন। কাকাবাবু সন্তুকে জিজ্ঞেস করলেন, হ্যাঁ রে, সুকোমল ভাল আছে? তাকে কোথায় পেলি? সন্তু এক পলক গগনের দিকে তাকিয়ে বলল, একটা দ্বীপে। না, ওকে মারধর করেনি। এমনই ভাল আছে। কাকাবাবু...