সেই সময় – ২য় পর্ব (১৯৮২)

সেই সময় – ২য় পর্ব (১৯৮২) / সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

০১. শীতের শেষ

শীতের শেষ কিন্তু গ্ৰীষ্ম এখনো তেমনভাবে আসরে নামেনি। বার্তাস মোলায়েম আর রোদুর যেন রেশমী ওড়না। বাজারে এখনো তরিতরকারি টাটকা সতেজ। দিনের বেলা জাগরণের সময় সহসা ক্লান্তি আসে না, রাত্রির নিদ্রা সুখকর। সময়টি প্রকৃতই মধুর। বাংলায় বসন্ত শুধু কবি-কল্পনায় আর মা-শীতলার দয়ার...

০২. ঈশ্বরচন্দ্রের বাড়িতে ডাকাতি

কিছুদিন আগে বীরসিংহ গ্রামে ঈশ্বরচন্দ্রের বাড়িতে বড় রকম একটা ডাকাতি হয়ে গেছে। ডাকাতরা কারুকে প্ৰাণে মারতে পারেনি। কিন্তু জিনিসপত্র নিয়ে গেছে সবই। এমনই অবস্থা যে পরদিন থালা-বাটি, হাঁড়িকুড়ি কিনে না আনলে ভাত খাওয়ারও উপায় নেই। ঈশ্বরচন্দ্র সে সময় গ্রামের বাড়িতেই ছিলেন।...

০৩. জিনিসটির নাম সিগারেট

শীতের এক সকালে বেণ্টিঙ্ক নামক একটি জাহাজ এসে ভিড়লো কলকাতার পোতাশ্রয়ে। জাহাজটি এসেছে মান্দ্ৰাজ প্রেসিডেন্সি থেকে। অন্যান্য অনেকের সঙ্গে সেই জাহাজ থেকে নামলেন এক কালো রঙের পাক্কা সাহেব। হ্যাট, কোট, প্যান্ট, বুট জুতো পরিহিত। এঁর ওষ্ঠে সাদা লম্বা একটি পদার্থ, যার এক...

০৪. এ জগতে সুখী কে

এক শনিবারের দ্বিপ্রহরে নবীনকুমারের ঘুম ভেঙ্গে গেল কিছু নারীকণ্ঠের কল-কোলাহলে। প্রতি শনিবার বিকেলের দিকে তাকে গুরুতর কর্মে ব্যাপৃত থাকতে হয়, তাই আহারাদির পর সে খানিকটা নিদ্রা-সাধনা করে নেয়। হিন্দু কলেজের পাঠ সাঙ্গ করার আগেই কলেজ ছেড়ে দিয়েছে নবীনকুমার। ক্লাসে শান্ত হয়ে...

০৫. ভৃত্য মহল

সোহাগবালার ব্যাধিটি বড় বিচিত্র। মানুষের স্থূলত্বেরও তো একটা সীমা আছে, কিন্তু সোহাগবালার ক্ষেত্রে সব কিছুই সীমা ছাড়িয়ে গেল। প্রত্যেকদিনই সে বেশী মোটা হচ্ছে। যৌবনে সোহাগবালা অসুন্দরী ছিল না, বরং ফর্সা, চোখ, নাক, ঠোঁট সবই গোল গোল, কিন্তু তার স্বামীর প্রতিপত্তি বাড়বার...

০৬. বিদ্যোৎসাহিনী সভা

বিদ্যোৎসাহিনী সভা থেকে বেরুবার মুখে একদিন রাইমোহনকে ধরলেন বিধুশেখর। প্রতি শনিবার সন্ধ্যাকালে তিনি এসে সিংহবাড়ির বৈঠকখানায় বসে থাকেন। নজর রাখেন কারা আসা-যাওয়া করছে। মজলিস কক্ষে। সভা চলাকালীন বিধুশেখর সেখানে কক্ষনো যান না। ছেলেছোঁকরাদের ব্যাপার, তাঁর মতন একজন প্ৰবীণ...

০৭. হাটখোলার মল্লিক বাড়ি

হাটখোলার মল্লিক বাড়িতে জগাই মল্লিকের কনিষ্ঠ সন্তান চণ্ডিকাপ্ৰসাদের মনে একটাই শুধু খেদ, সে আর তার মধ্যমাগ্রজ মিলে তাদের পিতার শ্রাদ্ধ উৎসব করতে পারলো না এখনো। এ বাড়িতে বিবাহযোগ্য এমন কোনো পুত্র বা কন্যা নেই যে তার বিবাহ উপলক্ষে খুব ধুমধাম করা যায়। বধূরা কোনো নতুন...

০৮. রানী রাসমণির জেদ

রানী রাসমণির জেদ শেষ পর্যন্ত রক্ষিত হয়েছে। এক শ্রেণীর ব্রাহ্মণের বিরোধিতা সত্ত্বেও তিনি দক্ষিণেশ্বরের মন্দির প্রতিষ্ঠা করেছেন মহা সমারোহে। সমারোহ মানে কী, তেমনটি আর কেউ কখনো দেখেনি। বাংলায় ধনী ব্যবসায়ী ও জমিদার তো কম নেই, কিন্তু আর কেউ এত বৃহৎ দেবালয়ের প্রতিষ্ঠাও...

০৯. প্রেসিডেন্সি কলেজ

হীরা বুলবুলের পুত্ৰ চন্দ্রনাথকে ভরতি করা উপলক্ষে হিন্দু কলেজ ভেঙে যায়। বারবনিতার সন্তানকে গ্ৰহণ করার জন্য শহরের গণ্যমান্য অভিভাবকরা নিজেদের সন্তানদের এ কলেজ থেকে সরিয়ে নিয়ে গিয়ে পৃথক কলেজ স্থাপন করেছিলেন। গৌরবোজ্জ্বল, ঐতিহ্যবাহী হিন্দু কলেজের হীন দশা দেখে কর্তৃপক্ষ...

১০. ভারতবর্ষ দেশটা ঠিক কাদের

এখনো যেন পুরোপুরি নির্ধারিত হয়নি, ভারতবর্ষ দেশটা ঠিক কাদের। হিন্দুরা অবশ্য মনে করে এ দেশটি পুরোপুরি হিন্দুদেরই, তাদের শরীরে প্রবাহিত হচ্ছে আর্য রক্ত, সুপ্রাচীন কাল থেকে তাঁরা এই সমুদ্র-মেখলা, পর্বত-মুকুট ভূমির উত্তরাধিকারী। তাদের ধর্ম, তাদের কৃষ্টি, তাদের জীবনযাপন...

১১. ঈশ্বরচন্দ্রের আবেদনের প্রতিবাদ

ঈশ্বরচন্দ্রের আবেদনের প্রতিবাদ করে রাজা রাধাকান্ত দেব সরকাব সমীপে পাঠালেন এক পাল্টা আবেদনপত্র। ঈশ্বরচন্দ্রের আবেদনে স্বাক্ষরকারীর সংখ্যা ছিল এক হাজারেরও কম। আর বিধবা-বিবাহ আইনের প্রতিবাদ করে রাজা রাধাকান্ত দেবের আবেদনে স্বাক্ষরকারীর সংখ্যা তেত্রিশ হাজার! শোভাবাজারের...

১২. কমলাসুন্দরীর জীবন

কালপ্রবাহে কমলাসুন্দরীর জীবনে অনেক পরিবর্তন এসেছে কিন্তু রূপের বিশেষ হেরফের হয়নি। তার বর্ণ কালো, কিন্তু সেই বৰ্ণই তার বৈশিষ্ট্য। এ দেশে সৌন্দর্যের প্রথম লক্ষণই হলো গাত্রবৰ্ণ কতখানি গৌর, তবু সকলে এক কথায় স্বীকার করে যে কমলাসুন্দরীর মতন রূপসী কাচিৎ দেখা যায়। তার চিকণ...

১৩. প্ৰাণগোপালের উপনয়ন

বিধুশেখরের নাতি প্ৰাণগোপালের উপনয়ন উপলক্ষে নবীনকুমার অনেকদিন পর এলো এ বাড়িতে। অতি শৈশবে সে তার জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা গঙ্গানারায়ণের হাত ধরে এখানে অনেকবার এসেছে। তখন তাকে আদর করার জন্য নারীগণের মধ্যে কাড়াকড়ি পড়ে যেত। পারিবারিক গণ্ডি ছাড়িয়ে নবীনকুমার এখন বাইরের পৃথিবীকে চিনতে...

১৪. মধুসূদনের পদোন্নতি

কিছুদিন কেরানীর চাকুরির পর মধুসূদনের একটু পদোন্নতি হয়েছে। তিনি নিযুক্ত হয়েছেন পুলিশ আদালতের দ্বিভাষিকের পদে। বেতনও কিঞ্চিৎ বেশী। কিশোরীচাঁদ মিত্রের বাগান বাটীতেও আর অধিক দিন আশ্রিত হয়ে থাকা ভালো দেখায় না। কিশোরীচাঁদ এবং তাঁর পত্নী যতই খাতির যত্ন করুন, তবু পরের গৃহে...

১৫. আইনত সাবালক হয়নি নবীনকুমার

এখনো আইনত সাবালক হয়নি নবীনকুমার, তবু সে বিপুল অর্থ তছনছ করার সুযোগ পেয়ে গেছে। সে এখনও অর্থের মূল্য বোঝে না। অর্থসম্পদ যে মানুষকে উপার্জন করতে হয়, এ জ্ঞানই যেন তার নেই। তার ধারণা, ও জিনিসটি চাইলেই পাওয়া যায়, এবং বরাবরই সে পেয়ে এসেছে। বিধুশেখরের বিচক্ষণতায় নবীনকুমারের...

১৬. যদুপতি গাঙ্গুলী এবং অম্বিকাচরণ সান্যাল

কলুটোলার কেশবদের বাড়ির সভা থেকে বেরিয়ে যদুপতি গাঙ্গুলী এবং তার বন্ধু অম্বিকাচরণ সান্যাল পদব্ৰজে বাড়ি ফিরতে লাগলো। উভয়েই থাকে নিকটস্থ এক পল্লীতে। অম্বিকাচরণ সম্প্রতি প্রেসিডেন্সি কলেজে শিক্ষকতার কাজ পেয়েছে, যদুপতি শিক্ষকতা করে অরিয়েণ্টাল সেমিনারিতে। বৃষ্টি পড়ছে অল্প...

১৭. আত্মীয় বন্ধুদের নিদারুণ উৎকণ্ঠা

বেশ কয়েকদিন আত্মীয় বন্ধুদের নিদারুণ উৎকণ্ঠার মধ্যে রেখে নবীনকুমার এক সময় আবার ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠতে লাগলো। তার আর বিপদাশঙ্কা রইলো না বটে, কিন্তু শরীর একেবারে বিছানার সঙ্গে লীন। জন্মের পর থেকে নবীনকুমারের কখনো কোনো গুরুতর পীড়া হয়নি। এই এক অসুখেই সে একেবারে কাহিল।...

১৮. নবীনকুমারের ব্যাধির সংবাদ

রোগীকে দেখতে আসা এবং প্রবল অসুস্থ কিংবা আচ্ছন্ন অবস্থার রোগীর সঙ্গে কথা বলে আত্মপরিচয়দানের চেষ্টা, বঙ্গবাসীরা একটি বিশেষ কর্তব্য বলে মনে করে। নবীনকুমারের ব্যাধির সংবাদ ছড়িয়ে পড়ায় দলে দলে লোক আসার.বিরাম নেই। ইতিমধ্যে এ কথাও ছড়িয়ে গেছে যে নবীনকুমার কানে প্রায় শুনতেই পায়...

১৯. বজরার ছাদে দাঁড়িয়ে

নবীনকুমার যেন এই পৃথিবীকে আবার নতুন ভাবে ফিরে পেয়েছে। বেঁচে থাকার প্রতিটি মুহূর্ত এখন তার কাছে রোমাঞ্চকর মনে হয়। শীত শেষ হয়ে গেছে, বাতাস এখন বড় মনোরম। বজরার ছাদে দাঁড়িয়ে সে সকালের রেশমী রৌদ্রের স্পর্শে যেন শরীরের প্রতিটি রন্ধে সুখানুভব করে। একটি টিটিভ পক্ষী মাথার ওপর...

২০. বেঙ্গল আর্মি

কলকাতা থেকে পেশোয়ার পর্যন্ত ছড়ানো রয়েছে যে সেনাবাহিনী, তার নাম বেঙ্গল আর্মি। কোম্পানির এই সেনাবাহিনীর মধ্যে অবশ্য বাঙালী সৈনিকের সংখ্যা অতি নগণ্য। বিভিন্ন জাতি ও বর্ণের পেশাদার সিপাহীরা ইংরেজদের অধীনে সুশিক্ষিত হয়ে একই ক্যান্টনমেণ্টে সুশৃঙ্খলভাবে অবস্থান করে। এখন...