সেই সময় – ১ম পর্ব (১৯৮১)

'সেই সময়' উপন্যাসের প্রথম খণ্ড প্ৰথম প্ৰকাশিত হয় এপ্রিল ১৯৮১ সালে এবং দ্বিতীয় খণ্ড প্রথম প্রকাশিত হয় এপ্রিল ১৯৮২ সালে। ১৯৮৩ সালে এই উপন্যাস বঙ্কিম পুরস্কার এবং ১৯৮৫ সালে আকাদেমি পুরস্কারে সম্মানিত হয়েছে। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় তাঁর এই সুবৃহত এবং বিখ্যাত উপন্যাস 'সেই সময়'-এর প্রথম খণ্ড উৎসর্গ করেছিলেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরকে; দ্বিতীয় খণ্ড উৎসর্গ করেছিলেন কালীপ্রসন্ন সিংহকে।

০১. শিশুর নাম রাখা হলো নবীনকুমার

(সেই সময় – সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় — অনেক বড় উপন্যাস। ধীরে ধীরে আপডেট দেয়া হবে।) শিশুটির জন্ম মাত্র সাত মাস দশ দিন গর্ভবাসের পর। মাতৃজঠরেই তার চাঞ্চল্য প্রকাশ পেয়েছিল। সেই অন্ধকার জলধিতে সে বেশীদিন থাকতে চায়নি। বাবু রামকমল সিংহ তখন উড়িষ্যায় মহাল পরিদর্শন করতে...

০২. দোকান বন্ধ হয়ে গেছে

দোকান বন্ধ হয়ে গেছে, তবু ভেতরে বসে গুপী স্যাকরা দুর্গাপ্ৰদীপ জেলে রাংঝালের কাজে মগ্ন। সেই সময় ঝাঁপ ঠেলে ঢুকলো রাইমোহন। সে এতই লম্বা যে ছোট দোকান ঘরটিতে সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারে না, মাথা ঝুঁকিয়ে রইলো। তার পরণে সিমলের ফিনফিনে ধুতি, হলুদ রঙের বেনিয়ান, গলায় শান্তিপুরের ড়ুরে...

০৩. নবীনকুমার

শোনা যায় নবীনকুমারের যখন মাত্ৰ পাঁচ মাস বয়েস, সেই সময়েই সে একটি বিস্ময়কর কাণ্ড করেছিল। একদিন সে খাট থেকে গড়িয়ে পড়ে যায় মাটিতে। বিম্ববতী সেদিন পাল্কি চেপে গঙ্গাস্নানে গিয়েছিলেন, পুত্রের ভার দিয়ে গিয়েছিলেন অতি বিশ্বস্ত চিন্তামণি দাসীর ওপর। শিশুকে ঘুমন্ত ভেবে চিন্তামণি...

০৪. গঙ্গানারায়ণ

গঙ্গানারায়ণ পদব্ৰজেই রোজ কলেজ যায়। তার সহপাঠীরা অনেকেই আসে পালকিতে কিংবা ভাড়া করা কেরাঞ্চি গাড়িতে, জমিদারপুত্র হিসেবে তার জুড়িগাড়িতেই আসা উচিত, কিন্তু গঙ্গানারায়ণ হাঁটতেই ভালোবাসে। তাদের বাড়ি থেকে পটলডাঙা খুব বেশী দূর নয়। পথের দৃশ্য দেখতে দেখতে সে আধঘণ্টার মধ্যেই...

০৫. মধু এবং গৌর

মধু ঝট করে গায়ের কোটখানা খুলে নিয়ে ছুঁড়ে ফেলে দিল মাটিতে, তারপর দেওয়াল সংলগ্ন একটি কাঠের আলমারির পাল্লা খুলে গৌরকে জিজ্ঞেস করলো, এবার কোন পোশাকটি পরি বল তো? আলমারিতে অন্তত কুড়ি পঁচিশ রকমের কোট ঝুলছে, বিভিন্ন বর্ণ ও গড়নের। অনেক দোকানেও এক মাপের এত রকমারি কোট দেখা যায়...

০৬. লুণ্ঠনপর্বের গোড়ার দিকে

বাবু বিশ্বনাথ মতিলাল এক পুরুষেই প্রচুর টাকা রোজগার করেছেন। অন্য অনেকের মতন তাঁরও ভাগ্য ফিরেছে নুনে। লুণ্ঠনপর্বের গোড়ার দিকে ইংরেজ কোম্পানি কাতারে কাতারে জাহাজে এ-দেশ থেকে মালপত্র ভরে নিয়ে যেত নিজের দেশে। ফেরার সময় তার অধিকাংশ জাহাজই খালি আসতো। ও-রকম খালি জাহাজ নিয়ে...

০৭. বিন্দুবাসিনী

বিন্দুবাসিনী ঠাকুরঘরের মেঝেতে আঁচল ছড়িয়ে শুয়ে আছে। সারা বাড়ি নিস্তব্ধ। বেলা এখন তিন প্রহর। বাড়ির সকলে এই সময় খেয়েদেয়ে ঘুমোয়। নীচতলার দাস-দাসীদের কোলাহলও এখন কিছুক্ষণের জন্য শান্ত। বাইরে রাস্তায় ঠা ঠা পোড়া রোদুর, লোকজন বেশী হাঁটে না, গাড়ি-ঘোড়াও কম। মাঝে মাঝে কাকের...

০৮. শহরটি প্রায় স্পষ্ট দুভাগে ভাগ করা

শহরটি প্রায় স্পষ্ট দুভাগে ভাগ করা। হুগলী নদীর ধার ঘেঁষে যেখানে পুরোনো কেল্লা ছিল, সেই অঞ্চলেই শ্বেতাঙ্গ রাজপুরুষদের ঘনবসতি। গ্রেট ট্যাঙ্ক বা লাল দীঘির দক্ষিণ আর পশ্চিম দিকে সাহেবদের সুন্দর সুন্দর বসত বাড়ি। এর মাঝখান দিয়ে চলে গেছে কোর্ট হাউস স্ট্রিট নামে একটি প্রশস্ত...

০৯. থাকোমণি

থাকোমণিকে খুব সহজে স্থানচ্যুত করা গেল না। একেই তো গ্ৰাম্য রমণীর জেদ, তার ওপর ভয়ে ও পরাজয়ে সে একেবারে মরীয়া হয়ে উঠেছে। দেখতে দেখতে কৌতূহলী পথচারীদের ভিড় বাড়তে লাগলো, ওলাবিবির শিকার দেখে কেউ অবশ্য খুব কাছে আসছে না, কিন্তু তাদের কথাবার্তা ক্রমেই উচ্চগ্রামে উঠছে। কেউ...

১০. হেয়ার সাহেব

হেয়ার সাহেব শাস্তি দেবেন। শুনে গঙ্গানারায়ণ তেমন ভয় পায়নি। ওঁর কাছ থেকে শাস্তি পাওয়া একটা মজার অভিজ্ঞতা। পিঠে দু চার ঘা পড়ে বটে কিন্তু তারপর হেয়ার সাহেব নিজেই এমন ব্যাকুল হয়ে পড়েন যে তখন তাঁকেই সামলাবার জন্য বলতে হয়, না মহাশয়, অতি অল্পের ওপর হয়েছে, বিশেষ বেদনা বোধ নাই।...

১১. রাইমোহন

সন্ধের মুখে আবার একদিন গুপী স্যাকরার দোকানের ঝাঁপ ঠেলে ঢুকলো রাইমোহন। গুপী তখন বেরুবার উদযোগ করছিল, রাইমোহনকে দেখে বসে গেল। —ঘোষালমশাই যে! বহুৎদিন পায়ের ধুলো দ্যাননি ইদিকে। ভাবলুম বুঝি গরীবকে ভুলেই গ্যালেন। বেতের মোড়ায় হাঁটু উঁচু করে বসে পানের ডিবে বার করলো রাইমোহন।...

১২. কিছু পুরোনো আমলের গালগল্প

এবারে কিছু পুরোনো আমলের গালগল্প করা যাক। দিল্লীর বাদশাহের সনদ নিয়ে খান জাহান আলী নামে একজন সেনাপতি এসেছেন যশোর শাসন করতে। এই খান জাহান আলীকে অবশ্য আমাদের বিশেষ প্রয়োজন নেই, আমাদের আগ্রহ তাঁর এক কর্মচারী সম্পর্কে। তবু খান জাহান আলীর উল্লেখের প্রয়োজন হলো, কারণ এই...

১৩. গোরা সৈন্য ও সিপাহী

গোরা সৈন্য ও সিপাহীরা শহরের উপান্তে এক স্থলে বন্দুকের তাক অভ্যাস করে। দিনরাত গোলাগুলির শব্দের জন্য লোকে সেই অঞ্চলের নাম দিয়েছে দমদমা। এই দমদমা বা দমদমে যাবার পথেই এক জায়গার নাম বেলগাছিয়া। যে পল্লীতে যে গাছ বেশী দৃষ্ট হয় সেই গাছের নামেই পল্লীর নাম। যেমন বটতলা,...

১৪. জোড়াসাঁকোর বাড়ির সম্মুখে

জোড়াসাঁকোর বাড়ির সম্মুখের অলিন্দে একটি আরাম কেদারায় বসে আছেন দেবেন্দ্র। সময় প্রায় মধ্যরাত্রি, সমস্ত গৃহটি অন্ধকার। বার্তাসে ধারালো শীতের ভাব, কিন্তু দেবেন্দ্ৰ শুধু পিরানের ওপর একটা মুগার চাদর জড়িয়ে আছেন, অন্তরের চাঞ্চল্যের জন্য তাঁর এখন শীতবোধ নেই। দেবেন্দ্ৰ এখন...

১৫. সিংহদের অট্টালিকার নীচমহলের কর্তৃত্ব

সিংহদের অট্টালিকার নীচমহলের সম্পূর্ণ কর্তৃত্ব দিবাকরের স্ত্রী সোহাগবালার হাতে। দিবাকর এ বাড়ির গোমস্তাই শুধু নয়, রামকমল সিংহের দক্ষিণহস্ত স্বরূপ। সে দিনকে রাত এবং রাতকে দিন করার কাজে পরম দক্ষ। আপনাভোলা রামকমল সিংহকে সে পোস্তার হাটে বিক্রয় করে আবার কুলিবাজার থেকে ক্ৰয়...

১৬. দুই বিবাহের লগ্ন

এক সপ্তাহের মধ্যেই দুই বিবাহের লগ্ন। সোমে গঙ্গানারায়ণের আর বৃহস্পতিতে সুহাসিনীর। বিধুশেখর অনেক ভাবনা চিন্তা করেই এমন দিন ফেলেছেন। দুটি বিবাহেরই সম্পূর্ণ তত্ত্বাবধান করতে হবে বিধুশেখরকেই, কেননা রামকমল সিংহ ইদানীং সংসার থেকে প্রায় পুরোপুরি বিযুক্ত হয়ে পড়েছেন,...

১৭. রাজনারায়ণ দত্তের শয্যাকণ্টকী

রাজনারায়ণ দত্তের শয্যাকণ্টকী হয়েছে। একটুক্ষণ বিছানায় শুয়ে থাকলেই তাঁর সর্বশরীরে জ্বালা ধরে, তৎক্ষণাৎ উঠে ছটফটিয়ে বেড়ান। সমস্তক্ষণ শরীরে এতটা অস্থিরতা, বসে থাকলে মনে হয় পায়চারি করলে ভালো লাগবে, আবার তাতেও একটু পরেই ক্লান্তি বোধ হয়, তখন ইচ্ছা হয় বিছানায় একটু গড়িয়ে নিতে।...

১৮. মানিকগঞ্জের জমিদার পূর্ণচন্দ্র রায়

মানিকগঞ্জের জমিদার পূর্ণচন্দ্র রায় যাবেন কলকাতা দর্শনে। বাঙাল দেশের লোক, আগে কখনো পদ্মা পার হননি, রাজধানী কলকাতা সম্পর্কে মনের মধ্যে কিছুটা ভয় ভয় ভোব আছে। কিন্তু দেশ গাঁয়ে আমোদ ফুর্তির মধ্যে কোনো বৈচিত্ৰ্য নেই, একটু বিদেশ ঘুরে আসার জন্য মন ঘুরঘুর করে। তা ছাড়া একটি...

১৯. নবীনকুমারের হাতেখড়ি

পাঁচ বৎসর বয়েসে, সরস্বতী পূজার দিনে নবীনকুমারের হাতেখড়ি হলো। এই উপলক্ষে বেশ ধুমধাম হলো সিংহ সদনে। বিম্ববতীর পিত্ৰালয়ের কারুর শিক্ষার সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই। তাঁর শ্বশুর স্বামীও বিদ্যাচচাঁ না করেও প্রভূত বিষয়সম্পত্তির অধিকারী হয়েছেন। কিন্তু বিম্ববতীর দত্তকপুত্ৰ...

২০. সংস্কৃত কলেজের অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি

রামমাণিক্য বিদ্যালঙ্কার অকস্মাৎ পরলোকগমন করায় সংস্কৃত কলেজের অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারির পদটি খালি হোল। এই পদের জন্য দাবিদার অনেক। কিন্তু সাহেবরা বুঝেছে যে বৃদ্ধ পণ্ডিত বা গ্রামের টুলো বামুনদের দিয়ে শিক্ষালয় পরিচালনার কাজ ভালো চলে না। এজন্য আধুনিক দৃষ্টিসম্পন্ন কোনো...