প্রথম আলো – ১ম পর্ব – সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

প্রথম আলো - প্রথম পর্ব - সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

০১. আজকের দিনটি বড় মনােরম

আজকের দিনটি বড় মনোরম। শুভ্র রোদ্দুরে একটুও জ্বালা নেই, স্নিগ্ধ বাতাস বইছে মৃদু মন্দ, পটভূমিকার পাহাড়শ্রেণী স্পষ্ট দৃশ্যমান। গত কয়েকদিন ছিল একটানা বৃষ্টি, কাল সন্ধ্যায় যেন সমস্ত মেঘ নিঃশেষ হয়েছে, তাই আকাশ স্বোদহীন নীলাভ। অরণ্যের প্রতিটি বৃক্ষ ও লতাপাতাই স্নানসিক্ত,...

০২. মহারাজ বীরচন্দ্রের এক পাশে হুঁকো-বরাদর

মহারাজ বীরচন্দ্রের এক পাশে হুঁকো-বরাদর, অন্য পাশে সুসজ্জিত ও সশস্ত্ৰ কৰ্ণেল সুখদেব ঠাকুর। পেছনে ন’জন পারিষদ। বিভিন্ন উপলক্ষে এই পারিষদদের মুখ বদল হয়। এই পারিষদ নির্বাচনের ব্যাপারে মহারাজ একটি নীরব প্রথা অনুসরণ করেন সব সময়। রাজকর্মচারী, সভাসদ ও প্রাসাদ-বাসিন্দা...

০৩. শশিভূষণের পাঠশালাটি বড় বিচিত্র

শশিভূষণের পাঠশালাটি বড় বিচিত্র। মাস্টার ঠিক আছে, কিন্তু ছাত্রদের কোনও ঠিক ঠিকানা নেই। প্রতিদিন দোকান খোলার মতন তিনি একটি টেবিলে বইপত্র, দোয়াত-কলম সাজিয়ে বসে থাকেন সকালবেলা, প্রায় দিনই কোনও ছাত্রই আসে না। তিনি রাজকুমারদের শিক্ষক, শুধুমাত্র রাজকুমারগণ ছাড়া অন্য কারুর এ...

০৪. গায়ক বাজনাদাররা ঘুমে ঢুলে পড়েছেন

গায়ক বাজনাদাররা ঘুমে ঢুলে পড়েছেন, শ্ৰোতা আছেন জেগে। এসরাজি আর তবলিয়ারা ক্লান্ত, কিন্তু শ্রোতাটির ক্লান্তি নেই। রাত্রি ভোর হয়ে এসেছে, পুব দিগন্ত রাঙা, ছোট ছোট পাখিরা বেঁচে আছি, বেঁচে আছি রবে বিস্ময়ের কিচির মিচির শুরু করেছে। মহারাজ বীরচন্দ্ৰ বলে উঠলেন, এ কী, খাঁ সাব, লয়...

০৫. মহারানী ভানুমতীও শয্যাগ্ৰহণ করেননি

মহারানী ভানুমতীও শয্যাগ্ৰহণ করেননি সারারাত, তবু তাঁর মন বেশ প্রফুল্লই ছিল। সতীনপুত্র রাধাকিশোরকে মহারাজ সত্যি সত্যি যুবরাজ হিসেবে মর্যাদা দিয়েছেন শুনে প্রথমে তিনি বিচলিত হয়ে পড়েছিলেন ঠিকই, কিন্তু নিজস্ব দূতের মারফত খানিক বাদেই যখন জানলেন যে সে ঘোষণা মহারাজ নিজের মুখে...

০৬. রাজপুরী একেবারে নিস্তব্ধ

রাজপুরী একেবারে নিস্তব্ধ। বড় একটা বটগাছে অসংখ্য পাখির বাসার মতন এই প্রাসাদেও খোপে খোপে অনেক মানুষ। তবু তারা চলা ফেরার সময় পায়ের আওয়াজ গোপন করতে ব্যস্ত। সবাই কথা বলছে ফিসফিসিয়ে। মহারাজ বীরচন্দ্ৰ গভীর শোকে মগ্ন। শুধু শোকগ্ৰস্তই নয়, মহারাজ মহাক্রুদ্ধও হয়ে আছেন। সচরাচর...

০৭. ঘুমের মধ্যে ভরতের হঠাৎ শ্বাসরোধ

ঘুমের মধ্যে ভরতের হঠাৎ শ্বাসরোধ হয়ে গেল। ছটফটিয়ে জেগে উঠতেই অন্ধকারের মধ্যে সে অস্পষ্টভাবে দেখল একটা দৈত্য ঝুঁকে আছে তার মুখের কাছে। তার বিশাল থাবায় চেপে ধরেছে তার নাক মুখ। তা হলে ভরত তুই মরলি। এই তোর শেষ! আতঙ্ক ও যন্ত্রণার মধ্যে এই কথাই মনে এলো তার। তার দৃঢ় বিশ্বাস...

০৮. আগরতলা থেকে কলকাতা যাত্রা

আগরতলা থেকে কলকাতা যাত্রা সহজ ব্যাপার নয়। বাষ্পরূপী দৈত্যের শক্তিতে এখন লৌহনির্মিত শকট ছুটে চলে। সিপাহি বিদ্রোহের পর এক স্থান থেকে আর এক স্থানে দ্রুত সৈন্য পাঠাবার সুবিধার জন্য ভারতের নানা অঞ্চলে দ্রুত রেল লাইন পাতা হচ্ছে, সেই রেল সাধারণ যাত্রীদেরও বহন করে। কিন্তু...

০৯. ভরতকে কেন্দ্র করে

ভরতকে কেন্দ্র করে শশিভূষণ ও রাধারমণের মধ্যে জোর বিবাদ ঘটে গেল। আচম্বিতে এরকম একটা অস্বাভাবিক অবস্থায় ভরতকে দেখে শশিভূষণ শুধু বিস্মিত নন, ক্রমান্বয়ে স্তম্ভিত, ক্রুদ্ধ এবং বেদনার্ত। রাধারমণের কোনও ভাবান্তর নেই। শশিভূষণ জননীর মতন যত্নে ভরতের শরীরের কাঁদা ধুইয়ে দিলেন,...

১০. চন্দননগরের গোন্দলপাড়ায় গঙ্গার ধারে

চন্দননগরের গোন্দলপাড়ায় গঙ্গার ধারে মোরান সাহেবের বাগানবাড়িটি রাজপ্রাসাদতুল্য। নীলের ব্যবসায়ী মোরান সাহেব এই বাগানবাড়িটি বানিয়েছিলেন খুব শখে ও যত্নে। এখন নীলের কারবারে মন্দা চলছে, প্রায় বন্ধ হবারই মুখে, তাই এই কুঠিবাড়িটি ভাড়া দেওয়া হয়। বর্তমানে এখানে সস্ত্রীক বসবাস...

১১. সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে

সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে শশিভূষণের হঠাৎ মাথা ঘুরে গেল। মনে হল পৃথিবীটা যেন দুলছে। রেলিং ধরে পড়ে যাবার ঝোঁক সামলে নিয়ে তিনি ভাবলেন, ভূমিকম্প শুরু হল নাকি? পায়ের নীচে মাটি কাঁপছে। তিনি অপেক্ষা করতে লাগলেন, নিশ্চয়ই চতুর্দিকে এখন শঙ্খধ্বনি শুরু হবে। সাধারণ মানুষের ধারণা...

১২. ঘাটের পৈঠায় বসে একটা নিম ডাল চিবিয়ে

ঘাটের পৈঠায় বসে একটা নিম ডাল চিবিয়ে দাঁতন করছে রবি। ঊষালগ্ন পার হয়নি, অতি নরম আলো ছড়িয়ে পড়েছে দিগবলয়ে, এখনও প্রকাশিত হননি সূর্যদেব। কয়েকদিন অবিশ্রাম বৃষ্টিধারার পর প্রাচীনা গঙ্গা নদীকে আজ মনে হচ্ছে পূর্ণযৌবনা। ছলচ্ছল স্রোতের শব্দের মধ্যে রয়েছে একটা চাপা সঙ্গীত। রবি...

১৩. বাবুঘাটে স্টিমার থেকে নেমে

বাবুঘাটে স্টিমার থেকে নেমে ভাড়ার গাড়ির জন্য রবিকে কিছুক্ষণ খোঁজাখুঁজি করতে হল। কাদায় প্যাচপ্যাচ করছে রাস্তা, লোকজনের ভিড়, মুটে-মজুরদের ঠেলাঠেলি, এর মধ্যে গা বাঁচিয়ে চলার চেষ্টা করল রবি, তাও পারা যায় না। একজন তার পা মাড়িয়ে জুতো নোংরা করে দিল। বৃষ্টির দিনে গাড়ি দুর্লভ...

১৪. এখন ভরতের সবসময় খিদে পায়

এখন ভরতের সবসময় খিদে পায়। পেটের মধ্যে একটি অনিবাৰ্ণ উনুন জ্বলছে, তার দাহ্য চাই, এমনকি মাঝরাত্রেও ঘুম ভেঙে গিয়ে তার মনটা খাই খাই করে। কিন্তু কে তাকে সৰ্বক্ষণ খাবার জোগাবে? ত্রিপুরার রাজবাড়িতে যদিও সে ছিল ফ্যালনা ছেলে, কিন্তু ক্যাওটরাম নামে এক বৃদ্ধ পাচক তাকে নেকনজরে...

১৫. মহারাজ বীরচন্দ্ৰ মাণিক্য তাঁর পাটরানীর মৃত্যুশোকে

মহারাজ বীরচন্দ্ৰ মাণিক্য তাঁর পাটরানীর মৃত্যুশোকে তীৰ্থ করতে গেলেন বৃন্দাবনে। রাজাদের শোকের বহর বোঝা যায় শ্রাদ্ধের আড়ম্বর দেখে। মহারানী ভানুমতী সৌভাগ্যবতী, তাঁর শ্রাদ্ধের অনুষ্ঠান হল দু’জায়গায়, রাজধানী আগরতলায় এবং বৃন্দাবনের পুণ্যস্থানে। রাজকোষ থেকে খরচ হল এক লক্ষ...

১৬. মহারাজ বীরচন্দ্ৰ মাণিক্য ভোজনবিলাসী

মহারাজ বীরচন্দ্ৰ মাণিক্য ভোজনবিলাসী, কিন্তু পেটুক নন। খাদ্যের আস্বাদের ব্যাপারে তিনি খুঁতখুতে। তাঁর বপুটি বেশ বড়সড় হলেও মাঝে মাঝেই তিনি আহার করেন নাম মাত্র। কাজে বিভোর হয়ে থাকলে দু’একবেলা তিনি কিছু মুখে দিতেই ভুলে যান। সাধারণত তিনি আহার গ্রহণ করেন নিজের কক্ষে বসে, তখন...

১৭. বাহাত্তর নম্বর আপার সার্কুলার রোডে

বাহাত্তর নম্বর আপার সার্কুলার রোডে কেশব সেনের বাড়িটি শহরের একটি দ্রষ্টব্য স্থান। এ  গৃহের নাম কমল কুটির। গৃহ সংলগ্ন উদ্যানটি বড় সুচারু, মধ্যে একটি দিঘি, তার নাম কমল সরোবর, সেখানে সত্যি সত্যি কমল ফুটে আছে । পাশের বাড়িটির নাম শান্তি কুটির, সেখানে থাকেন বিখ্যাত বাগ্নী...

১৮. হেদোর পুকুরের এক ধারে

হেদোর পুকুরের এক ধারে জেনারেল অ্যাসেম্বলি ইনস্টিটিউশন নামে কলেজ। এই পুকুরটি পানায় মজে গিয়েছিল, সম্প্রতি তার সংস্কার করা হয়েছে, পার্শ্ববর্তী জমি সাফসুতরো করে লাগানো হয়েছে কিছু ফুলের গাছ, তারপর লোহার রেলিং দিয়ে ঘিরে দেওয়ায় বেশ একটা উদ্যানের রূপ ধারণ করেছে। কলেজের ছেলের...

১৯. নরেন্দ্ৰ ছুটতে ছুটতে রামতনু বসুর গলিতে

নরেন্দ্ৰ ছুটতে ছুটতে রামতনু বসুর গলিতে ঢুকে পড়ল। তাদের নিজেদের বাড়িতে অনেক মানুষজন, তার নিজস্ব ঘর নেই, পড়াশুনো-গানবাজনা চর্চার সুবিধে হয় না। এই গলিতে তার দিদিমার বাড়ি, এখানে সে একটা ঘর পেয়েছে। ঘরটি অবশ্য বিচিত্র, মূল বাড়ির সঙ্গে কোনও সম্পর্ক নেই, একেবারে বাইরের দিকে...

২০. চন্দননগরের মোরান সাহেবের বাগানবাড়িটি

চন্দননগরের মোরান সাহেবের বাগানবাড়িটি ছেড়ে দিতে হল। উদ্দেশ্য ছিল তিনজনে মিলে কাব্য ও গান নিয়ে মেতে থাকা ও প্রকৃতি সম্ভোগ, কিন্তু জ্যোতিরিন্দ্রনাথকে নানা কাজে প্রায়ই কলকাতায় যেতে হয়, আসা-যাওয়ায় অনেক সময় খরচ হয়। জ্যোতিরিন্দ্রনাথ কলকাতায় ফিরলেন বটে, কিন্তু জোড়াসাঁকোর...
পাতা 1/41234