অরণ্যের দিনরাত্রি – সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

০১. সকালবেলা ধলভূমগড় স্টেশনে

অরণ্যের দিনরাত্রি – সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় সকালবেলা ধলভূমগড় স্টেশনে চারজন যুবক ট্রেন থেকে নামলো। ছোট্ট স্টেশন, সারা দিন-রাতে দুতিনবার মাত্র সরব হয়ে ওঠে, বাকি সময়টা অলসভাবে নিঝুম। আলাদা টিকিট কালেক্টার নেই, স্টেশন মাস্টার নিজেই ট্রেন থেকে নামা ছোট্ট যাত্রীদলের দিকে...

০২. জঙ্গল অথচ ঠিক জঙ্গলের মতন নয়

জঙ্গল অথচ ঠিক জঙ্গলের মতন নয়। যতদূর দেখা যায়, ঘন গাছের সারি, কোথাও কোথাও ঘন পাতায় আড়ালে নিবিড় ছায়া, কিন্তু যে-জঙ্গলে হিংস্র-জন্তুজানোয়ার নেই, সেটাকে তো অরণ্য নী স্বলে বাগান বললেও চলে; লখাকে সঙ্গে নিয়ে বিকেলে ওরা বেড়াতে বেরিয়েছিল, লখার মুখেই শুনলো, না, বাঘ-টাঘের কোনো...

০৩. একবার শহরে যেতে হলো

পরের দিনই ওদের অবশ্য একবার শহরে যেতে হলো। প্রথমদিন ঠাণ্ডা কুয়োর জলে স্নান করার পর সঞ্জয়ের একটু সর্দি লেগেছে–ওষুধ কেনা দরকার। নেশা করলে পরের দিন ভোরে অসীমের মাথা ধরে-তার অ্যাসপিরিন লাগছে। তা ছাড়াও ওদের খেয়াল হয়েছিল ওরা কেউ চিরুনি আনে নি, একজন কেউ আনবেই–এই...

০৪. বিচিত্র রঙিন পাখির পালক

একটা বিচিত্র রঙিন পাখির পালক উড়তে উড়তে এসে পড়লো অতসী ফুলগাছগুলোর ওপরে। সঞ্জয় এগিয়ে গিয়ে পালকাটা কুড়িয়ে নিলো। কোন পাখির পালক সেটা দেখার জন্য চাইলো এদিক-ওদিক। পাখিটিকে দেখা গেল না। অন্যমনস্কভাবে সঞ্জয় এগিয়ে গেল। জঙ্গলের দিকে। ডাকবাংলোর সীমানার ঠিক প্রান্তে জঙ্গলের...

০৫. বাংলোর ঘরে আলো জ্বলে নি

বাংলোর ঘরে আলো জ্বলে নি, বারান্দাও অন্ধকার। সেই অন্ধকারেই রবি আর সঞ্জয় চুপ করে বসে আছে ইজিচেয়ারে। অসীম চেঁচিয়ে উঠলো, কি রে, তোরা অন্ধকারে ভূতের মতন বসে আছিস কেন? রবির গলা তখনো থমথমে সে গভীরভাবে জানালো, বারান্দার আলো জ্বালিস না। শেখর ঘরের ভেতর থেকে টাকা এনে চাটওয়ালাকে...

০৬. কাচের জানলা

কাচের জানলা, তাই অতি ভোরের সূৰ্য যখন রক্তবর্ণ, তখনই আলোয় বাংলোর খানা ঘর ভরে যায়। এক ঘরের খাটে সঞ্জয় আর শেখর, অন্য ঘরে অসীম আর রবি, চাদর গায়ে দিয়ে ঘুমিয়ে আছে দেখা যায়। রবির লম্বা শরীরটা কুঁকড়ে আছে–শেষ রাতের ঠাণ্ডা হাওয়ায় শেখরের মুখখানা যেন বিষদাচ্ছন্ন, বোধহয় কোনো...

০৭. হাট দেখে নিরাশ

হাট দেখে নিরাশই হলো। গুচ্ছের মাটির হাঁড়িকুড়ি আর তরিতরকারির দোকান ছাড়া কিছুই নেই প্রায়। কিছু মুর্গী ছাগল এসেছে, গামছা আর ঝ্যালঝেলে শাড়ি-ধুতির কয়েকখানা দোকান, এক কোণে কয়েকটা নাপিত লাইন দিয়ে চুল কাটতে বসেছে। আর একদিকে ভাত-পচাই হাঁড়িয়ার মদ বেচছে কয়েকটা মেয়ে, ছুরি-কাঁচি...

০৮. চৌকিদার রতিলাল

বাংলোতে বেশ ভিড়। চৌকিদার রতিলাল খাকি পোশাক পরে সেজোগুঁজে ফিটফট হয়েছে, আর কয়েকজন ফরেস্টগার্ড ঘোরাঘুরি করছে। বাইরের বাগানে চেয়ার-টেবিল সাজানো, ফুলদানিতে ভর্তি ফুল! কি ব্যাপার? আজ এখানে উৎসব নাকি? রান্নাঘরের পাশ থেকে চওড়া মুখে বিনীত হাস্যে রেঞ্জার সুখেন্দু পুরকায়স্থ...

০৯. জঙ্গলের মধ্যে অসীম আর অপর্ণা

জঙ্গলের মধ্যে অসীম আর অপর্ণা আলাদা অনেক দূরে এগিয়ে গেছে। বিকেল শেষ হয়েছে একটু আগে, এখনো সন্ধে নামে নি, জঙ্গলের মধ্যে আব্বছ আলো; রবি তখনো না ফেরায় সবাই ক্রমশ চিন্তিত হয়ে উঠেছিল। কিন্তু কোথায় তাকে খোঁজা হবে–তারও ঠিক নেই। জয়া-অপৰ্ণাদের দেরি হয়ে যাচ্ছে, শেখর চেয়েছিল...

১০. মাদল বাজাতে বাজাতে

মেয়ে-পুরুষের একটা দল মাদল বাজাতে বাজাতে হাট ছেড়ে চলে যাচ্ছিল, কিছু না ভেবেই রবি তাদের সঙ্গ নেয়। ওরা কিছু বলে নি, তোয়ালে—শার্ট আর সাদা প্যান্ট পরা একটি লম্বা শক্ত চেহারার বাবু এদের সঙ্গে আসছে, তবু ওরা কিছু বলে নি। ঢ্যাং-ঢ্যাং করে অকারণে মাদল বাজাচ্ছিল একটা বুড়ো, দুতিন...

১১. শেখর আর জয়া

শেখর আর জয়া বারান্দায় পা ঝুলিয়ে বসে আছে, বাগানে পাতা টেবিল-চেয়ার তুলছে রতিলাল। টেবিলের উপর ফাঁকা ডিসগুলো পড়ে আছে, ঝকঝকে পরিষ্কার, খাবার দেবার সুযোগ হয় নি। রেঞ্জার সুখেদুর সঙ্গে কী যেন কথা বলছে সঞ্জয়। সেদিকে একটুক্ষণ চেয়ে থেকে শেখর জয়াকে বললো, আজকাল একটা মুশকিল হয়েছে,...

১২. হাত ছাড়িয়ে নেবেন না

পাথরের বেঞ্চে হাতলের ওপর পা দুটো তুলে দিয়ে শেখর হেলান দিয়ে বসেছিল। খুব আস্তে আস্তে ভোরের আলো ফুটছে। বহুদিন শেখর এইরকম সূর্যোদয় দেখে নি। বাতাস এখন ঠাণ্ডা, ভোরের আলোও হিম, সূর্যের এখনো দেখা নেই, শুধু দূরের জঙ্গলের মাথায় নীলচে আলো। সূৰ্য উঠলেও জঙ্গলের আড়ালে বহুক্ষণ দেখা...