৬৪.৬ হরিদ্বারে যাওয়ার ব্যাপারটা

হরিদ্বারে যাওয়ার ব্যাপারটা সব ঠিকঠাক করে প্রায় শেষ মুহূর্তে দুর্বল হয়ে পড়েছিলেন মমতা। এর মধ্যে একদিন কানু এসেছিল, সে ট্রেনের টিকিট যোগাড় করে দিয়েছে। কানুর কাছে এসব কোনো সমস্যাই নয়। কানুর ছোট মেয়ে চায়না এবার পার্ট-টু পরীক্ষা দিয়েছে, এখনও রেজাল্ট বেরোয়নি, সে যেতে রাজি হয়েছে মমতার সঙ্গে, এই সুযোগে তারও বেড়ানো হবে। চায়না মেয়েটি বেশ সপ্রতিভ, লোকজনের সঙ্গে পরিষ্কার চোখে কথা বলতে পারে, সে সঙ্গে থাকলে মমতার কোনো অসুবিধে হবারই কথা নয়। কিন্তু প্রতাপকে একলা ফেলে যাবেন কী করে মমতা?

ঝগড়ার পর কথা বন্ধ ছিল, মমতা নিজেই কথা খুলে দিলেন। নিজেই কিছুটা নত ও কোমল হয়ে প্রতাপকে মিনতি করে বলেছিলেন, তুমিও চলো আমার সঙ্গে। তুমি না গেলে আমার ভালো লাগবে না!

প্রতাপ লক্ষ করে যাচ্ছিলেন যে মমতা নিজে নিজেই হরিদ্বার যাবার সব ব্যবস্থা করে নিচ্ছেন, টিকিট কাটালেন, যাত্রাপথের সঙ্গিনী ঠিক করলেন, প্রতাপের টাকাপয়সাও চাইলেন না। ইদানীং মমতার নিজস্ব একটা অর্থ দফতর হয়েছে, হঠাৎ হঠাৎ প্রতাপকে না জানিয়ে তিনি দু’একটা দামী জিনিস কিনে ফেলেন। মমতার বহুকালের শখ ছিল একটা কার্পেটের, এতদিন বাদে তিনি শয়নকক্ষে বিছিয়েছেন বেশ পুরু, সুন্দর লতা-পাতার ডিজাইন করা একটা লাল কাশ্মীরী কার্পেট। এর দাম যে কত হাজার টাকা লেগেছে, তা মমতা কিছুতেই জানাতে চাননি প্রতাপকে। প্রথম বেশ কয়েকদিন শুতে এসে সেটাকে প্রতাপের একটা অচেনা মানুষের ঘর বলে মনে হতো। এই শীতে মমতা প্রতাপের জন্য বেশ একটা মূল্যবান কোট তৈরি করিয়েছেন, তাও প্রতাপের অজান্তে। কোটটা গায়ে দেবার পর প্রতাপ খানিকটা ঠাট্টার সুরেই বলেছিলেন, আজকাল তোমার খুব টাকার গরম হয়েছে, তাই না?

মমতা বলেছিলেন, সারাটা জীবন তোমার কাছে হাত-তোলা হয়েই কাটাতে হয়েছে, দাসী বাঁদীর মতন শুধু সেবা করে গিয়েছি। কোনোদিন কিছু তো দাওনি আমাকে!

প্রতাপ অবাক হয়ে বলেছিলেন, তোমাকে কোনোদিন কিছু দিইনি? এই সবকিছুই তো তোমার জন্য!

মমতা বলেছিলেন, সবকিছু? :! দয়া করে দিয়েছো, নেহাত যেটুকু প্রয়োজন না মেটালে নয়। কিন্তু মানুষের তো সাধ-আহ্লাদও থাকে। সেসব তুমি জানতেও চাওনি। নিজের ইচ্ছেমতন কিছুই করতে পারিনি।

মমতার এইসব কথার মধ্যে কৌতুক একটুও ছিল না, ছিল প্রচ্ছন্ন অভিমান মেশানো স্পষ্ট অভিযোগ। আজকাল মমতার কথার মধ্যে প্রায়ই অভিযোগের সুর ফুটে ওঠে। মুন্নির বিয়ে হয়ে যাবার পর, বাড়িতে এখন শুধু স্বামী-স্ত্রী, সাংসারিক ঝামেলাও চুকে গেছে, এখন মমতার যেন অন্য একটা ব্যক্তিত্ব ফুটে উঠছে।

সেই কথার পর থেকে মমতার কেনা কোটটা প্রতাপ আর গায়ে দিতে চান না। তাঁর ইচ্ছে করে না। কলকাতায় যেটুকু শীত পড়ে, তাতে তাঁর পুরোনো আমলের পকেট ছেঁড়া কোটটাতেই বেশ কাজ চলে যায়।

মমতার শত অনুরোধেও অবশ্য প্রতাপ আর মত বদল করেননি। উদাসীনভাবে বলেছিলেন, আমি আর হরিদ্বার গিয়ে কী করবো! মুন্নির বাচ্চাকে নিয়ে তুমি ব্যস্ত থাকবে, অনুনয় আর তার বাবা অন্য দিকগুলো সামলাবে, আমি শুধু শুধু তোমাদের বোঝা বাড়াতে যাবো কেন? তা ছাড়া বাড়ির ট্যাক্সের ব্যাপারে সামনের সপ্তাহে করপোরেশনে একটা হিয়ারিং আছে…

তখন প্রশ্ন উঠেছিল, কলকাতায় বাড়িতে প্রতাপের সঙ্গে কে থাকবে? এই প্রশ্নে প্রতাপ আবার জ্বলে উঠেছিলেন। তাঁর সঙ্গে কারুর থাকার দরকার নেই। তিনি নিজেই নিজের ভার যথেষ্ট নিতে পারেন, নানু তো আছেই, সে রান্নাবান্না করে দেবে। রাত্তিরে তিনি একা থাকতে পারবেন না কেন, তিনি কি ছেলেমানুষ!

প্রতাপ ছেলেমানুষ নন, কিন্তু তিনি যে বৃদ্ধ, সে কথাও তাঁর মনে থাকে না।

মমতা তবু নানুকে পই পই করে বলে গিয়েছিলেন, সে যেন প্রতিদিন বসবার ঘরে বিছানা পেতে শোয়। প্রত্যেকদিন সকালে বাবুকে গরম জলে লেবুর রস আর মধু মিশিয়ে দিতে ভুলে না যায়। বাবুকে ওষুধ খাওয়ার কথা মনে করিয়ে দেওয়াও তার দায়িত্ব। প্রথম দশ বারোদিন নানু ঠিক ঠিক সেই দায়িত্ব পালন করেছে। তারপর তার বাড়িতে একটা বিয়ের ব্যাপার থাকলে সে ছুটি নেবে না? প্রতাপ নিজেই তাকে ছুটি দিয়েছেন। নানু তবু এক ফাঁকে এসে রান্নাটা করে দিয়ে যায়।

মমতাকে পৌঁছে দিতে হাওড়া স্টেশনেও গিয়েছিলেন প্রতাপ। তিনি নিজে কুলি ঠিক করেছিলেন এবং দেরি করে কম্পার্টমেন্টের দরজা খোলার জন্য কন্ডাকটর গার্ডকে বকাবকিও করেছিলেন। মমতা আর চায়না একটা কুপে পেয়েছে, সুতরাং নিশ্চিন্ত, পথে অন্য কোনো যাত্রী। তাদের বিরক্ত করবে না। স্টেশনের কল থেকে প্রতাপ ওয়াটার বটলে জল ভরে দিলেন ওদের জন্য। সবই তিনি করছেন, কিন্তু কোনো আবেগ নেই। মমতা সেই যে রাগের মাথায়। বলেছিলেন, তোমার টাকা লাগবে না, নিজের টাকাতেই আমি হরিদ্বার যেতে পারবো, সেই কথাটা তাঁর বুকে যে ঘা দিয়েছে, সেটা দগদগে হয়ে আছে, কিছুতেই চাপা পড়ছে না। প্রতাপ। সারাজীবন কষ্ট করে সংসারে যে ভাবে টাকা উপার্জন করেছেন তা যেন তুচ্ছ হয়ে গেছে ওই একটি কথায়। মমতার সঙ্গে তাঁর ব্যবহারে কোনো খুঁত নেই। এমন কি প্রতাপ মাঝে মাঝে হাসি মুখও দেখিয়েছেন, তবু সেটা যেন অতিরঞ্জিত এক মুখোসের মতন। ব্যস্ততায় ও বাইরে যাবার উত্তেজনায় মমতা তা লক্ষ করেননি।

ট্রেনটা ছাড়তে একটু লেট করছিল, প্রতাপ দাঁড়িয়েছিলেন প্লাটফর্মে, মমতাদের জানলার সামনে। হঠাৎ তাঁর মনটা যেন এক তরল বিষণ্ণতায় ভিজে গেল। কেন যেন তাঁর মনে হলো, মমতার সঙ্গে তাঁর এই শেষ দেখা। প্রায় চল্লিশ বছরের মধ্যে মমতা তো তাঁকে ছেড়ে কখনো একা কোথাও যাননি। এবার কি মমতার কোনো বিপদ ঘটবে? ট্রেন দুর্ঘটনা? হরিদ্বারে খরস্রোতা নদী…। প্রতাপ এই চিন্তাটা মন থেকে উড়িয়ে দিতে চাইলেন। মমতা না থাকলে বাকি জীবনটা তিনি কাটাবেন কী করে?

ট্রেনটা দুলে উঠতেই মমতা তাঁর স্বামীর হাত চেপে ধরে বলেছিলেন, কথা দাও, তুমি শরীরের যত্ন নেবে? নানুকে আমি বলে গেছি, সে সব কিছু করবে, তুমি নিজে মশারি টাঙাতে যেও না, নানু সব জানে, তুমি শুধু বাজারটা করে দিও, তোমার পছন্দমতন মাছ… আর একটা কথা বলবো? তুমি আমার গা ছুঁয়ে প্রতিজ্ঞা করো, চিঠি লিখলে সঙ্গে সঙ্গে জবাব দেবে? আমি এক মাসের বেশি থাকবো না, মুন্নি একটু সামলে উঠলেই…

মমতার ব্যাকুল মুখোনি দেখে প্রতাপের দয়া হয়েছিল। একটা বয়েসে ভালোবাসা রূপান্তরিত হয়ে যায় স্নেহ-মমতায়। ভালোবাসার চেয়ে তার শক্তি বেশি। তিনি শিশুকে সান্ত্বনা দেবার ভঙ্গিতে মমতার হাত চাপড়ে বলেছিলেন, কোনো চিন্তা করো না, আমি ঠিক থাকবে। তুমি পোঁছোনো মাত্র চিঠি দিও। সাবধানে থেকো। রাত্তিরে কোনো স্টেশনে ট্রেন থামলে জানলা খুলো না, অবশ্য সঙ্গে চায়না আছে, ও স্মাট মেয়ে চায়না, ভালো করে ঘুরে আয়

সেদিন হাওড়া স্টেশন থেকে ফেরার পথে প্রতাপ বাস বা ট্যাক্সি না নিয়ে হেঁটে ব্রীজ পার হয়েছিলেন। তারপর স্ট্র্যান্ড রোড ধরে খানিকটা এগিয়ে, ফেরীঘাট দেখে কী খেয়াল হয়েছিল, তিনি টিকিট কেটে ফেরীতে চেপে আবার গঙ্গা পার হলেন। তাঁর তো বাড়ি ফেরার কোনো তাড়া ছিল না। ফেরীতে চেপে মধ্যপথে এসে তাঁর মনে হয়েছিল, এই গঙ্গা যেখানে পাহাড় ছেড়ে সমতলে নামছে, সেখানে চলে গেল মমতা। সে আবার ফিরে আসবে তো? নদী কখনো থামে না, কিন্তু মানুষের জীবন হঠাৎ এক সময় থেমে যায়। তাঁর ভুরু কুঁচকে গিয়েছিল। এই অলক্ষুণে কথাটা বারবার মনে পড়ছে কেন? না, না, মমতার কিছু হবে না, তার শরীর ভালো আছে, এত বছর একটা সংসার সামলাবার পর এই তো সবেমাত্র সে নির্ঞ্ঝাট হয়েছে, এখন সাধ-আহ্লাদ মেটাবে…

একবার হেঁটে হাওড়া ব্রীজ পেরিয়ে এসে আবার অকারণে ফেরী করে সেই হাওড়ার দিকেই যাওয়া, অন্য কেউ প্রতাপকে এরকম ছেলেমানুষী করতে দেখলে সাঙ্ঘাতিক অবাক হতো। আবার ওই ফেরীতেই এপারে এসে প্রতাপ অনেকক্ষণ বসেছিলেন আউটরাম ঘাটের কাছে। প্রতাপদের ছেলেবেলায় এটাকে বলা হতো উট্রাম ঘাট, এখন আউটরাম নামটাই চালু হয়ে গেছে, এটা যে কোনো সাহেবের নামে তাও হয়তো লোকে ভুলে গেছে। বোধহয় ভাবে কেনারাম, বেচারামের মতনই আউটরাম। ইডেন গার্ডেন-এর নাম অবশ্য কেউ নন্দন কানন দেয়নি, যদিও অকটরলোনি মনুমেন্ট হয়ে গেছে শহিদ মিনার। এই ইডেন গার্ডেনে একসময় গোরাদের ব্যান্ড বাজতো, প্রতাপের মনে আছে। এখানেই স্বাধীনতার পরে কোনো একটা বছর বিরাট একটা মেলা হয়েছিল না? ত্রিদিবের গাড়িতে সবাই মিলে আসা হয়েছিল, সুলেখা, পিকলু বাবলু-মুন্নি, মমতা; দিদি আর তুলতুলও ছিল কি? হ্যাঁ ছিল, শুধু মা ছিল না। তার কিছুদিন পরেই তো পিকলু…। বাকিরাও সব কোথায় গেল?

এই গঙ্গা নদীই পিকলুকে খেয়েছে। মমতা আবার এই নদীর ধারেই গেল। মমতা আবার পুণ্য-টুন্যের কথা ভেবে হরিদ্বারের নদীতে স্নান করতে না নামে। গঙ্গার ওপর প্রতাপের ভক্তি-শ্রদ্ধা নেই একটুও। পিকলু চলে যাবার পর তিনি আর কোনোদিন গঙ্গায় স্নান করেননি। এমন কি সুপ্রীতিকে পোড়াবার পর অনেকে আদিগঙ্গার বিশ্রী নোংরা জলে নেমেছিল, প্রতাপ রাজি হননি কিছুতেই।

মাঝে মাঝে প্রতাপের মনে এমন একটা বিশ্রী চিন্তা আসে যে তাঁর নিজের গলাটা টিপে ধরতে ইচ্ছে করে। তবু চিন্তাকে রোধ করা যায় না। পিকলু বাঁচাতে গিয়েছিল বাবলুকে, বাবলুর। বদলে যদি পিকলু বেঁচে থাকতো? পিকলু নিশ্চিত এদেশের একজন গণ্যমান্য মানুষ হতো। না, না, প্রতাপ বাবলুকেও কোনোদিন হারাতে চাননি। মমতার ধারণা, প্রতাপ তাঁর ওই ছেলেটিকে ভালোবাসেন না। ভুল ধারণা। ছোটবেলা থেকেই বাবলু দুরন্ত, সে জন্য প্রতাপ ওকে অনেকবার শাস্তি দিয়েছেন, তবু বাবলুর প্রতিই বোধহয় তাঁর পক্ষপাতিত্ব ছিল বেশি। বাবলুকে বিলেত পাঠাবার জন্য একসময় তিনি সর্বস্বান্ত হননি? বাবলুর জন্য দুশ্চিন্তায় তিনি যে বছরের পর বছর ভেতরে ভেতরে দগ্ধ হয়েছেন, তা বুঝতেও দেননি মমতাকে। এখনও বাবলুর চিঠি এলে, সে বাবাকে লেখে না, মাকেই লেখে, তবু প্রতাপ মমতাকে লুকিয়ে চোরের মতন সে চিঠি দুতিনবার পড়েন না!

গঙ্গার ধারে সন্ধেবেলা অনেক মানুষ বসে থাকে, অল্পবয়েসী ছেলে-মেয়েরা একটু নিরালা। খুঁজে হৃদয় ও শরীরের উত্তাপ বিনিময় করতে চায়। দুটি যুবক রেলিং-এ হেলান দিয়ে খুব জোরে জোরে হাসছে। একটু দূরে কে যেন গান গাইছে। সে দিকে তাকিয়ে অকস্মাৎ প্রতাপ যেন। একটা অদ্ভুত দৃশ্য দেখতে পেলেন। তিনি যে বেঞ্চিতে বসে আছেন, সেখানে তাঁর বদলে রয়েছে অন্য একজন মানুষ, রেলিং-এ ভর দেওয়া ওই যুবক দুটির জায়গায় অন্যরকম পোশাক পরা, অন্য দুটি যুবক হাসছে, একটা গাছের পাশে যে তিনজন যুবতী, তাদের শাড়ির রং, মুখের চেহারা সট সট করে বদলে গেল, তারা অন্য হয়ে গেল। যেন আজ থেকে পঁচিশ-তিরিশ কিংবা পঞ্চাশ বছর পরের একটা দৃশ্য উদ্ভাসিত হলো প্রতাপের চোখের সামনে। তখন তিনি থাকবেন না, এই মানুষগুলি কেউই থাকবে না। এই একই জায়গায় অন্যরা আসবে, হাসবে, গান গাইবে। মাত্র কয়েকটা বছরের ব্যাপার, তারপরই সব শেষ!

প্রতাপের শিহরন হয়েছিল, খানিকটা ভয়ও পেয়েছিলেন। এরকম দৃশ্য তিনি দেখলেন কেন? এরকম একটা ফুঁকো দার্শনিকতাই বা কেন ভর করলো তাঁর মাথায়?

একা থাকলেই যত রাজ্যের বাজে চিন্তা এসে মাথা জুড়ে বসে। মমতার সঙ্গে তাঁর যাওয়াই উচিত ছিল, না হয় কোনোরকমে মুন্নির শ্বশুরের সঙ্গে কয়েকটা দিন মানিয়ে চলতেন। মমতাকে ছেড়ে থাকতে প্রতাপের যে কষ্ট হচ্ছে, সে কথা প্রথম কয়েকটা দিন প্রতাপ নিজের মনের কাছেও স্বীকার করতে চাননি। কিন্তু ফাঁকা বাড়িতে তাঁর কিছুতেই বেশিক্ষণ থাকতে ইচ্ছে করে না। বিমানবিহারীর বাড়ি ছাড়া আর কোথাও যে যাবার জায়গাও নেই। প্রতাপ নিজেই ট্রেনে চেপে কৃষ্ণনগর চলে যাবেন? বিমান ক’দিনের জন্য গেছেন তা অলিরাও ঠিক জানে না, প্রতাপ যেতে যেতেই যদি তিনি ফিরে আসেন? প্রতাপ আর কোনো বন্ধু সংগ্রহ করেননি। একা একা তিনি কোথাও বেড়াতে যাবেন? বাড়ির ট্যাক্সের হিয়ারিং আবার পিছিয়ে গেছে এক সপ্তাহ, এমন কিছু গুরুত্বপূর্ণ নয় যদিও, কিন্তু ওটা আগে চুকিয়ে ফেলা দরকার।

একা একা রাস্তায় ঘুরতেও মন্দ লাগে না। অনেক রকম মানুষ দেখা যায়। অন্যদের কথা কান পেতে শুনলে চমকে যেতে হয় এক এক সময়। তিরিশের কাছাকাছি বয়েসের একজোড়া যুবক-যুবতী পাশাপাশি হাঁটছে, তাদের দু’একটা টুকরো কথা কানে এলো। মেয়েটি ব্রহ্মকমল ফুলের কথা বলছে। ভ্যালি অফ ফ্লাওয়ার্স থেকে এই ফুল তুলে আনলে অলকানন্দা নদীর তীর পর্যন্ত টাটকা থাকে, নদীর এপারে আনলেই সে ফুল শুকিয়ে যায়। প্রতাপ এই কথাটা আগেও যেন কোথায় শুনেছেন। এই ফুল পাহাড় ছেড়ে সমতলে নামতে চায় না। মেয়েটি সদ্য ভ্যালি অফ ফ্লাওয়ার্স ঘুরে এসেছে মনে হলো। মমতারও ওই জায়গাটা দেখতে যাওয়ার খুব শখ। আশ্চর্য, একটু আগে প্রতাপ এই সাইনবোর্ড দেখেছিলেন, ‘হরিদ্বার-হৃষীকেশ-ভ্যালি অফ ফ্লাওয়ার্স বেড়াতে যেতে চান? আমরা আছি। হলিড়ে ট্রাভেলস!’

যুবতীটির মুখ সুখস্মৃতিতে ঝলমল করছে। তার সঙ্গীটিকে কেমন যেন চেনা চেনা মনে হচ্ছে, অনেকটা সিদ্ধার্থর মতন নয়? বাবলুর বন্ধু সিদ্ধার্থ নাকি? সিদ্ধার্থ ফিরে এসেছে? প্রতাপ প্রায় তাকে ডাকতে উদ্যত হয়েও থেমে গেলেন। না, তার ভুল হচ্ছে। বাবলুর ঘনিষ্ঠ বন্ধুরা কেউ কলকাতায় এলে দু’একদিনের মধ্যেই বাড়িতে এসে দেখা করে। কিছু না কিছু জিনিসপত্রের সঙ্গে শর্মিলা তার শাশুড়ির জন্য চকলেট পাঠাবেই। বাচ্চা মেয়েদের মতন মমতা। এখনো চকলেট খেতে ভালোবাসেন। সেবারে বাবলুদের কাছে বেড়াতে গিয়ে মমতা বারবার বলতেন, আমি অত্র মাংস টাংসর ভক্ত নই, তবে এদেশের আইসক্রিম আর চকলেট সত্যিই খুব ভালো। প্রতাপ অবশ্য মিষ্টি একেবারেই খেতে পারেন না, তিনি আমিষাশী, তবে আমেরিকায় মাছ-মাংস খেয়ে সুখ পাননি। তিনি গোমাংস খান না, বাবলুদের বাড়িতে অবশ্য গোরু-শুয়োর দুই-ই চলে, তাঁর প্রেসার হাই বলে কোলেস্টরলের ভয়ে তিনি শুয়োরও স্পর্শ করেননি, ওদেশের মুর্গিগুলো কৃত্রিম উপায়ে বড় করা বলে তাঁর কাছে বিস্বাদ লেগেছে, পাঁঠার মাংস প্রায় পাওয়াই যায় না বলতে গেলে, ভেড়ার মাংসে কেমন যেন একটা বোঁটকা গন্ধ, সামুদ্রিক মাছও প্রতাপের বিশেষ পছন্দ নয়। বাবলু প্রায়ই ইলিশ মাছ কিনে আনতো, শ্যাড মাছ ইলিশের মতন, তা ছাড়া পদ্মার ইলিশও বিমানে উড়িয়ে নিয়ে যাওয়া হয়, পাওয়া যায় ওখানকার বাংলাদেশী দোকানে, দুর দুর, দেশের টাটকা ইলিশের সঙ্গে তার কোনো তুলনাই চলে না। ডিপ ফ্রিজে জমানো কাঠের মতন শক্ত মাছ দেখলেই তো অভক্তি জন্মে যায়। তবে হ্যাঁ, স্বীকার করতেই হবে, অ্যামেরিকা তরিতরকারি আর ফলমূলের স্বর্গ। প্রতাপের সবচেয়ে ভালো লাগতো মাশরুম, অমন সুস্বাদু মাশরুম তিনি জীবনে কখনো খাননি।

কলকাতায় ফিরে প্রতাপ নিউ মার্কেটে এই ধরনের মাশরুম কিনতে গিয়েছিলেন, কে যেন একজন বললো, মাশরুম চিনতে হয়, এদেশের এক এক জাতের মাশরুম বিষাক্ত হতে পারে, তাই শুনেই মমতা বেঁকে বসলেন, প্রতাপের কিনে আনা মাশরুম রান্না না করেই ফেলে দিলেন আস্তাকুঁড়ে।

হাজরা রোড ধরে হাঁটতে হাঁটতে প্রতাপ আপনমনে হাসলেন। ঘুরে ফিরে মমতার কথাই তাঁর মনে আসছে। তিনি যে এতটা স্ত্রৈণ, তা আগে তো কখনো টের পাননি। তিনি ভেবেছিলেন, মমতা হরিদ্বারে চলে গেলে তিনি বেশ একলা একলা স্বাধীনভাবে থাকবেন। এখন এক-একবার লোভ হচ্ছে একটা টিকিট কেটে হঠাৎ হরিদ্বার পৌঁছে মমতাকে চমকে দিতে।

রাস্তার ধারের একটা জবরদখল স্টলে দাঁড়িয়ে প্রতাপ এক গেলাস চা খেলেন। চা তো নয়। যেন গরম গরম ষাঁড়ের পেচ্ছাপ। চায়ের নামে এরা কী দেয় মানুষকে? প্রতাপের মেজাজ গরম হয়ে গেলেও কিছু বললেন না। পয়সাটা ছুঁড়ে দিয়ে তিনি এগিয়ে গেলেন।

মুখের স্বাদটা এমন বিশ্রী হয়ে গেছে যে পাল্টানো দরকার।

একসময় সিগারেটের নেশা ছিল খুব, ছেড়ে দিয়েছেন প্রায় তিন বছর আগে। এখনো অনেকক্ষণ একা থাকলে বা অস্থির বোধ হলে হাতের আঙুল আর ঠোঁট নিশপিশ করে। সিগারেট ছাড়তে হয়েছিল প্রায় বাধ্য হয়েই। প্রত্যেকদিন সকালে খুব কাশি হতো, একবার ব্রঙ্কাইটিসের মতন হয়ে গিয়েছিল, কাশিও চলছে, সিগারেটও চলছে। একদিন কাশতে কাশতে প্রায় দম বন্ধ হয়ে যাবার মতন অবস্থা, মমতা বিদ্রূপ করে বলেছিলেন, কাশো, আরও কাশো, সিগারেট তো ছাড়তে পারবে না কোনোদিন! প্রতাপ তৎক্ষণাৎ বিছানা ছেড়ে উঠে সিগারেটের প্যাকেট আর লাইটার ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিলেন জানলা দিয়ে। মমতা খুব হেসেছিলেন তখন। মমতার এই হাসিটাই প্রতাপকে প্রতিজ্ঞা রক্ষা করতে বাধ্য করেছে। এরপর দু’তিনবার মাত্র দুর্বল হয়েছিলেন প্রতাপ, বাড়িতে কোনো অতিথি এলে তার এগিয়ে দেওয়া সিগারেট প্রতাপ গ্রহণ করতে যেতেই মমতা বলতেন, জানতাম, তুমি পারবে না! অমনি প্রতাপ প্রত্যাখ্যান করে বীরের মতন বলেছেন, দ্যাখো পারি কি না। একবার একটা সিগারেট ঠোঁটে চুঁইয়ে পর্যন্ত ফেলে দিয়েছিলেন।

এখন মমতা নেই, এক প্যাকেট সিগারেট কিনলে কেমন হয়? একটা দোকানের সামনে দাঁড়াতেই তিনি যেন অন্তরীক্ষে মমতার হাসি শুনতে পেলেন। প্রতাপ ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলেন, কাছাকাছি একটি বাড়ির ছোট ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে দুটি মহিলা খুব হাসছে। প্রতাপ ঠিক করলেন, সিগারেট বিষয়ে যদি প্রতিজ্ঞা ভাঙতেই হয়, মমতার সামনেই ভাঙবেন, কাপুরুষের মতন আড়ালে নয়।

তা হলে একটা পান খাওয়া যেতে পারে। বাড়িতে কখনো সখনো দু’একটা পান খেলেও প্রতাপের এ নেশা নেই। লোকজনের সামনে কিছু চিবোনোর মধ্যে কেমন যেন একটা জন্তু জন্তু ভাব থাকে। পুরুষ মানুষের লাল ঠোঁটও তাঁর চোখে কদাকার লাগে। বিয়েবাড়িতে নেমন্তন্ন খাবার পর কেউ কেউ যখন মুখে দু’তিনটি পানের খিলি একসঙ্গে পুরে জাবর কাটে, সেই অবস্থায় আবার কথা বলতে আসে, প্রতাপ সেদিক থেকে চোখ ফিরিয়ে নেন।

প্রতাপ দোকানদারটিকে বললেন, ওহে, এক খিলি পান সাজো তো। খয়ের দিও না!

পানওয়ালা তার দোকানের পাটাতনের নীচের অন্ধকার গহুর থেকে রাশি রাশি খালি বোতল বার করে ক্রেটে সাজাচ্ছে। সে এখন ব্যস্ত, উত্তর দিল না।

প্রতাপ অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে চলন্ত মানুষের স্রোত দেখতে লাগলেন।

এই শহরের মানুষ কি হঠাৎ বেড়ে গেছে? আজ পথে এত বেশি লোক মনে হচ্ছে কেন? কিংবা এমন মনোহরণ বাতাস বইছিল বলেই কি অনেক লোক বাইরে বেরিয়ে এসেছে? কলকাতার অনেক বাড়িতেই তো হাওয়া ঢোকে না। এখন অবশ্য বাতাসের বেশ জোর। ঠিক ঝড় নয়, ঝোড়ো হাওয়ার মতন। আকাশের রং এখন পাতলা লালচে। পায়রাগুলো হুড়োহুড়ি করে ঘরে ফিরছে। এই শহরে বেশ কিছু টিয়া পাখিও আছে। পশ্চিম আকাশের দিকে উড়ে গেল এক ঝাঁক পাখি, ওদের কী নাম কে জানে! দুটি দমকল সন্ধ্যারতির শব্দ জানিয়ে চলে গেল।

খানিক পরে প্রতাপের খেয়াল হলো, লোকটি তাকে পান দেয়নি তো!

পানওয়ালাটি তখন বোতল নিষ্কাশন বন্ধ রেখে তারই মতন চেহারার আর একটি লোকের সঙ্গে নিচু স্বরে কিছু আলোচনা করছে। একজন খরিদ্দার যে তার দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে, সে খেয়ালই নেই।

এটা একটা প্রতিষ্ঠিত সত্যের মতন যে প্রতাপ মজুমদার শ্রেণীর একজন রাশভারী চেহারার ভদ্রলোক এসে দাঁড়ালে এই পানওয়ালা শ্রেণীর কেউ তাকে খাতির করবার জন্য ব্যস্ত হয়ে উঠবে।

এর ব্যত্যয় দেখে প্রতাপ বিস্মিত হলেন। তারপর গম্ভীর আদেশের সুরে বললেন, ওহে, তোমার কাছে পান চাইলুম না?

পানওয়ালাটি প্রতাপের ব্যক্তিত্ব সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করলো। সে পাশ ফিরে প্রতাপের চোখের দিকে সোজাসুজি তাকিয়ে নিস্পৃহ গলায় বললো, খালি একটা পান চাইছেন তো? দাঁড়ান, দিচ্ছি!

তারপর সে তার সঙ্গীর প্রতি আর দু’চারটি কী সব নির্দেশ দিয়ে নিজের দোকানের পাটাতনের ওপর উঠে বসলো। হাত মুছলো একটা নোংরা ভিজে ন্যাকড়ায়। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই আর একটি পাজামা-পাঞ্জাবি পরা ছোকরা প্রতাপের পাশে এসে জিজ্ঞেস করলো, বেচুলাল, আমার চুরুট এনেছো?

পানওয়ালাটি এবারে বেশ উৎসুকভাবে বললো, হ্যাঁ বাবু, আজ সকালেই এসেছে।

পান সাজায় হাত না দিয়ে সে উঠে দাঁড়িয়ে ওপরের তাক থেকে বিভিন্ন বাক্সের চুরুট দেখাতে লাগলো ছোকরাটিকে।

প্রতাপ ওর স্পর্ধা দেখে হতবাক হয়ে গেলেন। আগুনের মতন রাগ ছড়িয়ে যাচ্ছে তাঁর সারা দেহে। তিনি ভাবলেন, লোকটির কান ধরে টেনে নামিয়ে দুই থাপ্পড় কষাবেন ওর গালে।

কিন্তু প্রতাপ মজুমদারের মতন মানুষেরা কোনো পানওয়ালাকে থাপ্পড় মারে না। এরকম ইচ্ছে তাঁদের মাঝে মাঝেই হয়, কিন্তু সেই রাগ মনেই পুষে রাখতে হয়, কিংবা বাড়িতে ফিরে স্ত্রী-পুত্র কন্যাদের ওপর সেই রাগের প্রভাব পড়ে।

প্রতাপ আর দাঁড়ালেন না সেখানে। তিনি আর অন্য দোকানেও গেলেন না। পান খাওয়ার ইচ্ছেটাই নষ্ট হয়ে গেছে। ওই বেয়াদপ পানওয়ালাটিকে কি কোনো শাস্তিই দেওয়া যাবে না? তিনি শুধু এক খিলি পান চেয়েছেন, অতি সামান্য তার দাম, সেইজন্য লোকটা তাকে অবজ্ঞা করলো? অথচ সে তো পানের দোকানই খুলে বসেছে। পুলিশের উচিত্র ওর দোকান তুলে দেওয়া!

ওই পানওয়ালার কথা ভাবতে ভাবতেই প্রতাপ অনেকটা রাস্তা হেঁটে গেলেন। নিরপেক্ষ ভাবেও তিনি বিচার করতে চাইলেন লোকটাকে। যে-খদ্দের বেশি পয়সার জিনিস কিনবে, তার প্রতিই বেশি আগ্রহ দেখাবে, এটাই তো ব্যবসার নিয়ম। সে দিক থেকে লোকটি অন্যায় করেনি। কিন্তু প্রতাপ আগে এসেছেন, এমনিতেই তাঁকে বেশ কিছুক্ষণ দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছে। আর কিছু না হোক, সে তো কাঁচুমাচু ভাবে বলতে পারতো বাবু, আপনার দেরি হয়ে যাচ্ছে, আর একটু দাঁড়ান, পানে হাত দেবার আগে এনাকে চুরুটটা দিয়ে নিই!

মনের মধ্যে রাগটা রয়েই গেল।

সেই জন্যই বোধহয় প্রতাপ একটু পরে আর একটি বাজে ঘটনায় জড়িয়ে পড়লেন।

ঘটনাটি অতি সামান্য। যে-কোনো বড় শহরেই এরকম খুচখাচ অপরাধের ঘটনা যখন তখন ঘটে। অনেক অন্যায় আছে, যেদিকে আইনের দৃষ্টি পড়ে না। নগরে যারা থাকে, তারা সবাই নাগরিক চেতনাসম্পন্ন হয় না। কলকাতার মতন বিশৃঙ্খলভাবে বেড়ে যাওয়া শহরে বিশেষ কোনো সামাজিক নীতিবোধও গড়ে ওঠেনি।

হাজরা রোড আর ডোভার রোডের মোড়ের কাছটায় একটা রিকশা হঠাৎ উল্টে যায়। রিকশাটিতে বসেছিল একটি হলুদ শাড়িপরা যুবতী, তার হাতে একটি খাতা ও একটি মোটা বই, সম্ভবত অখণ্ড গীতবিতান, সেও আচমকা বিসদৃশ ভাবে, হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেল রাস্তায়। হাজরার এই অংশটিতে সামান্য বৃষ্টি হলেই দু’পাশে নোংরা জমে থাকে। যুবতীটি কোনোক্রমে উঠে দাঁড়ালো, তার বইটিতে কাদা লেগেছে, রাগে-দুঃখে সে রিকশাওয়ালাটিকে বকতে শুরু করে দিল, এখন তার ভাষা ঠিক রাবীন্দ্রিক নয়। এমন সময় একটি মোটর সাইকেল চড়া যুবক সেখানে এসে উপস্থিত, সেও রিকশাওয়ালাটিকে ধমকে বললো, অ্যাই, তুমি নতুন রিকশা চালাচ্ছো? আর একটু হলেই তো আমার সঙ্গেই ধাক্কা লাগতো!

যুবতীটি মাধ্যাকর্ষণের টান অনুভব করার ঠিক আগের মুহূর্তে একটা মোটর বাইকের গর্জন শুনেছিল। রিকশার ধার ঘেষে এই মোটর বাইকটিই যাচ্ছিল তো। তার ধারণা হলো, এই লোকটিই দুষ্কৃতকারী। সে বললো, আপনিই তো ধাক্কা মেরেছেন!

যুবকটি বললো, না না, আমি খুব জোর সামলে নিয়েছি। এই ব্যাটা এমন বিচ্ছিরিভাবে চালাচ্ছিল, গাঁ থেকে সদ্য এসেছে বোধহয়, হর্ন শুনেও বোঝে না। এদিক দিয়ে আবার একটা ট্যাক্সি…

যুবতীটি তবু বললো, আপনিই ধাক্কা মেরেছেন। আপনার লজ্জা করে না?

যুবকটি বললো, কী মুশকিল! আমি ধাক্কা মারলে কি আমি আবার এখানে ফিরে আসতুম? আমি খুব জোর সাইড করে না নিলে একটা বড় অ্যাকসিডেন্ট হতে পারতো। আমি কি আপনাকে কিছু হেল্প করতে পারি? আপনার যদি বেশি জোর চোট লেগে থাকে…

কলকাতা শহরে মাটি খুঁড়েও মানুষ ওঠে। কাছেই একটা বস্তিমতন আছে, চোখের নিমেষে জমে গেল ভিড়। একটি চলনসই চেহারার যুবতী, একটি সপ্রতিভ ও সুদৃশ্য পোশাক পরিচ্ছদে ভূষিত মোটর সাইকেল চালক আর একটি গোবেচারা, রোগা, হতভম্ব রিকশাওয়ালা, এই তিনটি পাত্রপাত্রীর মধ্যে যুবকটিই আদর্শ টার্গেট। ভিড়ের মধ্যে দুতিনজন রয়েছে পাড়ার গার্জেন টাইপের, একজন ধ্যাডেঙ্গা চেহারার লোক যুবকটির কলার শক্ত করে চেপে ধরে প্রথম থেকেই সপাটে গালাগাল শুরু করে দিল। তার কণ্ঠস্বর ঈষৎ জড়ানো, কাছেই গচার বাংলা মদের দোকান।

জনতার প্রথম দাবি, মেয়েছেলের অপমান করা হয়েছে, যুবকটিকে ক্ষমা চাইতে হবে।

দ্বিতীয় দাবি, মোটর সাইকেল এই গরিব রিকশাওয়ালাকে ধাক্কা মেরেছে, সুতরাং শুধু ক্ষমা চাইলেই চলবে না, কিছু ক্ষতিপূরণও দিতে হবে।

ধ্যাড়েঙ্গা লোকটির অনুচ্চারিত দাবি, যে-লোক একটি মেয়েছেলেবসা রিকশায় ধাক্কা মারতে পারে, তার মোটর সাইকেল চালাবার কোনো অধিকারই নেই, ওই মোর্টর সাইকেলটি আপাতত বাজেয়াপ্ত করা দরকার।

আর যুবকটি বারবার বলতে লাগলো, আমি ধাক্কা মারিনি। ধাক্কা মারলে কেউ কখনো ফিরে আসে? আমি অনেকটা চলে গিয়েছিলুম, গাড়ি ঘুরিয়ে…

এই ঘটনার মাঝামাঝি প্রতাপ এসে দাঁড়ালেন ভিড়ের পেছনে।

প্রায় সন্ধে হয়ে এসেছে। রাস্তার আলো জ্বলেনি। প্রত্যেক সন্ধেতেই তো আলো জ্বলে না। এরই মধ্যে দোতলা বাস যাচ্ছে, অন্য অনেক গাড়ি-রিকশা যাচ্ছে, মানুষের ঢেউ বয়ে চলেছে। একপাশের একটা ভিড়ের মধ্যে কী নিয়ে চ্যাঁচামেচি হচ্ছে তা নিয়ে অন্যদের মাথাব্যথা নেই। আইন এবং নীতিবোধ এখান থেকে অনেক দূরে।

অবস্থা ঘোরালো হচ্ছে ক্রমেই। যারা নিছক কৌতূহলে ভিড় জমিয়েছিল, তারা পাতলা হয়ে যাচ্ছে, ধেয়ে আসছে পাড়া থেকে নতুন স্বার্থান্বেষীরা। মেয়েটি তার ভুল বুঝতে পেরে এখন যুবকটির পক্ষ নিয়েই কথা বলছে, সে যুবকটিকে বিপদে ফেলতে চায় না, সে ওর ক্ষমাপ্রার্থনায় আগ্রহী নয়, সে এখন পালাতে পারলে বাঁচে। তার কণ্ঠে প্রায় কান্না। কিন্তু তাকে ঘিরে রেখেছে। কয়েকজন, নাটক শেষ না হলে তাকে যেতে দেওয়া হবে না। অবশ্য তার গায়ে হাত দেবে না

ঢ্যাঙা লোকটি কুৎসিত ভাষা শুরু করে দিয়েছে, অন্য দু’জন টানাটানি করছে মোটর সাইকেলটি, যুবকটির গায়ে কয়েকটি চড়-চাপড়ও পড়েছে। এই সময় প্রতাপ ভিড় ঠেলে সামনে এগিয়ে এলেন।

তিনি বিচারক, বহু বৎসর ধরে ন্যায়-অন্যায়ের বিচার করে এসেছেন। চোখের সামনে এরকম একটি অন্যায় ঘটতে দেখলে তিনি তা চুপ করে সহ্য করে যেতে পারেন না। তিনি ভুলে গেলেন যে তিনি চাকরি থেকে রিটায়ার করেছেন অনেকদিন আগে, তা ছাড়া চাকুরিরত বিচারকরাও সমাজের সব অন্যায়-অবিচার রোধ করার দায়িত্ব নেন না। তাঁর মতন মর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিরা রাস্তাঘাটে কক্ষনো এইসব বাজে লোকদের ঝামেলায় মাথা গলান না, নাক কুঁচকে পাশ কাটিয়ে চলে যাওয়াই নিয়ম। এসব জায়গায় কথা বলতে গেলে মানী লোকের মান থাকে না।

প্রতাপের এই মোটর সাইকেল চালকটির মুখ দেখেই মনে হচ্ছে, সে সৎ ধরনের, সে মিথ্যে কথা বলছে না। এই শহরে কোনো গাড়ি অন্য গাড়িকে বা মানুষকে ধাক্কা দিলে পালিয়ে যেতেই চায়, ফিরে আসে না। সে ফিরে এসেছে মেয়েটিকে সাহায্য করবার জন্য, এটা একটা দুর্লভ ব্যাপার, এ জন্য সে অভিনন্দন পাওয়ার যোগ্য, তাকে শাস্তি দেওয়া হচ্ছে কেন? ঢ্যাঙা লোকটির খারাপ ভাষাই প্রতাপ সবচেয়ে বেশি অপছন্দ করছেন।

প্রতাপ একেবারে সামনে এসে কড়াভাবে ধমক দিয়ে বললেন, এর কলার ধরেছো কেন? আগে ছেড়ে দাও? ভদ্রভাবে কথা বলো।

ঢ্যাঙা লোকটি তাচ্ছিল্যের সঙ্গে বললো, আপনি চুপ মারুন তো! এই হারামীর বাচ্চা এই পাড়া দিয়ে রোজ ফাঁট মেরে মোটর বাইক হাঁকিয়ে যায়, আমি ঠিক চিনে রেখেছি! শালা মাগীবাজ…

পেছন থেকে আর একজন বললো, আপনি কী জানেন দাদু? কেন ফোঁপর দালালি করছেন! যান, যান, নিজের কাজে যান!

প্রতাপ বললেন, রোজ এই রাস্তা দিয়ে যাওয়াটা কি অপরাধ? এই রাস্তাটা কি তোমার সম্পত্তি নাকি? ওকে ছেড়ে দাও! মেয়েটির সঙ্গে ওর যা হয়েছে, তা ওরা দু’জনে বুঝে নেবে!

ঢ্যাঙা লোকটি বললো, আপনি ফের বকবক করছেন! যান ভাগুন, কাটুন এখান থেকে!

প্রতাপ আবার দৃঢ়ভাবে বললেন, না, তুমি আগে ছাড়ো ওকে! কিংবা ওকে পুলিশের হাতে দেওয়া হোক, ফাঁড়ির মোড়ে পুলিশ আছে।

সেই লোকটি এবার হিংস্র মুখখানা ফেরালো প্রতাপের দিকে। তারপর ডান হাতের পাঞ্জাটা ওপরে তুললো, সেটা চকিতে প্রতাপের নাকের ওপর ঠেসে ধরে একটা ধাক্কা দিয়ে বললো, ভাগ। শাল্লা! আমি কে চিনিস না? পুলিশ দেখানো হচ্ছে! আমার মুখের ওপর কতা!

লম্বা মাতালটির গায়ে বেশ জোর। সেই এক ধাক্কায় প্রতাপ ছিটকে পড়ে গেলেন রাস্তার একধারে। কিছু লোক ভয় পেয়ে দৌড়ে সরে গেল, একটা কেউ প্রতিবাদ জানালো না।

এরপর ব্যাপারটা চুকতে মিনিট দু’এক লাগলো। যুবকটি তেজ দেখিয়ে নিজেকে ছাড়িয়ে নেবার চেষ্টা করতেই কিল-ঘুষি বর্ষণ শুরু হয়ে গেল তার ওপরে, মেয়েটিকে চলে যাবার রাস্তা করে দেওয়া হলো। রিকশাওয়ালাটি আগেই পালিয়েছে। যুবকটি বেশি চিৎকার করার সুযোগই পেল না, কেননা গণ-বিচারকদের ক্রুদ্ধ হুংকারের জোর অনেক বেশি, তাকে টানতে টানতে নিয়ে যাওয়া হলো পাশের একটা অন্ধকার গলিতে। মোটর সাইকেলটি আগেই তার হাতছাড়া হয়েছে।

যুবকটি যদি শেষ পর্যন্ত খুন না হয়, তা হলে এটা কোনো উল্লেখযোগ্য ঘটনাই নয়। সাধারণত কিছুটা বেশ জোর মারধরের পর ভিকটিমকে একটুখানি সুযোগ দেওয়া হয় পালাবার। সে তখন প্রাণভয়ে ছোটে, নিজের সম্পত্তির কথা ভুলে। মোটর সাইকেলটি টুকরো টুকরো হয়ে আজ রাতের মধ্যেই বিক্রি হয়ে যাবে মল্লিকবাজারে।

ভিড় মিলিয়ে গেছে, রাস্তা আবার স্বাভাবিক। যানবাহন চলছে। পথচারীরা নানা রকম কথা বলতে বলতে যাচ্ছে, কেউ হাসছে, কেউ বিষণ্ণ, কেউ নিজের ওপরেই বিরক্ত।

প্রতাপ যেমনভাবে পড়েছিলেন, ঠিক সেইভাবেই আধশোয়া অবস্থায় দেওয়ালে ঠেস দিয়ে। রইলেন। তিনি অজ্ঞান হননি, খুব যে তাঁর আঘাত লেগেছে তাও নয়, নিজের চেষ্টাতেই তিনি উঠে দাঁড়াতে পারতেন, কিন্তু তাঁর মন নিশ্চল হয়ে গেছে, চক্ষু দুটি স্থির। এখনো লোডশেডিং চলছে। সেইজন্য কেউ তাঁকে দেখতেও পাচ্ছে না। দু’একজন পথ-চলতি লোকের পা লাগছে তার গায়ে, কেউ কেউ চমকে উঠছে, কিন্তু একজন মানুষ না জন্তুর গায়ে পা লাগলো তা দেখবার জন্যও কেউ এই অন্ধকারে থামে না।

বেশ খানিকক্ষণ পর উল্টোদিকের একটি দোকানঘর থেকে একজন লোক টর্চ হাতে নিয়ে এলো এদিকে। প্রতাপের সামনে এসে মাথা ঝুঁকিয়ে জিজ্ঞেস করলো, ও দাদা, আপনার বেশি লেগেছে নাকি? উঠতে পারছেন না?

প্রতাপ কোনো উত্তর দিলেন না।

লোকটি আবার জিজ্ঞেস করলো, শিরদাঁড়ায় চোট লেগেছে? আমি ধরবো আপনাকে?

প্রতাপ এবারে আস্তে আস্তে উঠে বসলেন।

লোকটি টর্চ ফেলে প্রতাপকে ভালো করে দেখলো। তারপর জিভে আফসোসের শব্দ করে বললো, এঃ! ভদ্দরলোক, আপনার অনেক বয়েসও হয়েছে দেখছি, কেন ওদের সঙ্গে কথা বলতে গেলেন? আমি তো আমার দোকান থেকে দেখছিলুম, তখন ভয়ে এগোইনি, ওরা সব মস্তান-গুণ্ডা, ওদের সঙ্গে কি ভদ্রলোকেরা পারে? বেশি কিছু বলতে গেলে ছুরি চালিয়ে দেয়।

প্রতাপ তবু কোনো কথা বললেন না। মানুষের সঙ্গে কথা বলার ভাষা যেন তাঁর শেষ হয়ে। গেছে।

লোকটি আরও দু’চারটি সান্ত্বনার বাক্য বললো, তার দোকানে প্রতাপকে একটু বসে বিশ্রাম নিয়ে যাওয়ার প্রস্তাব করলো, প্রতাপ তাতেও রাজি হলেন না।

লোকটি বললো, তা হলে একটু পা-চালিয়ে চলে যান। একটু সাবধানে থাকবেন। এই যে আপনি ওদের কাজে আজ বাধা দিতে গেসলেন, আপনাকে ওরা চিনে রাখলো, আবার এ পাড়ায় দেখলেই ধরবে।

প্রতাপ হাঁটতে আরম্ভ করলেন। সেই হাজরা রোড থেকে যাদবপুর পর্যন্ত পুরোটাই তিনি হেঁটে এলেন একটা ঘোরের মধ্যে। তাঁর জামায় এবং একটা হাতে জল কাদা মাখা, তা একটু মুছে নেবার কথাও মনে পড়লো না। তাঁর মন সম্পূর্ণ অবশ, রাগ বা দুঃখেরও অনুভূতি নেই। এতখানি রাস্তা আসার সময় তিনি যে গাড়ি চাপা পড়েননি, সেটাই আশ্চর্য ব্যাপার।

নিজের বাড়িটি চিনতে তাঁর ভুল হলো না, তিনি সদরের তালা খুললেন। দোতলায় এসে দ্বিতীয় তালাটিও খুললেন ঠিক মতন। তারপর হাত-পা না ধুয়ে, জামা না খুলে তিনি একটা দাঁড় করানো পুতুলের হঠাৎ এলিয়ে যাবার মতন পড়ে গেলেন বিছানায়। তারপর তিনি ঘুমের মধ্যে অজ্ঞান হয়ে গেলেন।

প্রায় ঘণ্টা চারেক বাদে তাঁর ঘুম ভাঙলো। প্রথমে চোখ মেলে তিনি নিজের পরিপার্শ্বটা চিনতে পারলেন না। এটা কার বাড়ি কিংবা কোন দেশ? তিনি কি সমুদ্রে ভাসছেন? না, পিঠের নীচে বিছানা, সেই বিছানাটা দুলছে কেন? মাথাটা বিষম ভারী, তিনি মাথা তুলতে পারছেন না।

আরও একটু পরে তিনি আস্তে আস্তে বিছানা ছেড়ে উঠলেন। দেয়ালে হাত বুলিয়ে বুলিয়ে তিনি সুইচ টিপলেন, অন্ধকার রইলো এক রকমই, বিদ্যুৎ হয়তো এর মধ্যে একবার এসে প্রস্থান করেছে আবার।

এদেশে সবাই এখন অন্ধকারে অভ্যস্ত। নিজের বাড়ির মধ্যে হাঁটাচলা করার কোনো অসুবিধে নেই। রান্নাঘরে গিয়ে মোমটা খুঁজতে হবে, একথা প্রতাপের মনে পড়লো। তবু তিনি একটুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলেন। নিজেকে একটা অন্যরকম মানুষ মনে হচ্ছে কেন? সারা বুক জুড়ে একটা ব্যথা ভাব। পা ফেলতে আলগা আলগা লাগছে, অথচ পায়ে তো চোট লাগেনি।

মাথাটা দু’বার ঝাঁকিয়ে তিনি স্বাভাবিক হবার চেষ্টা করলেন। সন্ধেবেলা একটা বিশ্রী ঘটনা ঘটে গেছে, তা তাঁর মনে পড়েছে, কিন্তু সে জন্য রাগ হচ্ছে না কেন? যেন অন্য কারুর জীবনের ঘটনা, তিনি শুনেছেন মাত্র। দৃশ্যটাও তিনি দেখতে পাচ্ছেন, কিন্তু একজন গুণ্ডার হাতে ধাক্কা খেয়ে যে প্রতাপ মজুমদার পড়ে যাচ্ছেন, তিনি আর এখনকার এই প্রতাপ মজুমদার এক নন। এটা একটা ছবির অংশ। তাঁর ভুরু কুঁচকে গেল।

মোমবাতিটা জ্বেলে তিনি সিঁড়ির দরজা বন্ধ করলেন। এতক্ষণ খোলা ছিল, চোর ঢুকতে পারতো। এ পাড়ায় খুব চোরের উপদ্রব। বেশ রাত হয়েছে, রাস্তায় কোনো শব্দ নেই। নানু আজ রাতেও থাকবে না, সেটা ঠিকই ছিল। বিকেল থেকে কিছু খাওয়া হয়নি, প্রতাপের খিদে পাবার কথা, কিন্তু খিদের কোনো বোধ নেই।

দোতলায় চারখানা ঘর, তার মধ্যে একখানাই শুধু স্বামী-স্ত্রী ব্যবহার করেন। বাকি তিনখানা ঘর সাজিয়ে রাখা হয়েছে, কখন ছেলেমেয়েরা আসবে। বাবলু-শর্মিলা এলে যাতে কোনো অসুবিধে না হয়, সে জন্য মমতার ব্যবস্থার ত্রুটি নেই। ওরা এই নতুন বাড়িতে একবারও আসেনি, প্রত্যেক বছরই শীতকালে আসবে বলে ভাবে, একটা না একটা বাধা পড়ে যায়।

ওই ঘরগুলোও একবার দেখা দরকার। অন্ধকারের মধ্যে কেউ ঢুকে পড়ে লুকিয়ে থাকতে পারে। জমাট অন্ধকারের মধ্যে শীর্ণ মোমের আলোয় প্রতাপকে একটা অদ্ভুত ছায়ামূর্তির মতন মনে হয়।

অনেকদিন আগে বিমানবিহারী একটা রিভলভার দিয়েছিলেন প্রতাপকে। তাঁর নামে লাইসেন্সও করা আছে। এর মধ্যে প্রতাপ কয়েকবার সেটা ফেরত দিতে চেয়েছিলেন, বিমান খালি বলেন, থাক না, ব্যস্ত হবার কী আছে?

আলমারি খুলে রিভলভারটা বার করে তিনি প্রত্যেকটা ঘর ঘুরে ঘুরে দেখলেন। একটা জানলায় শব্দ হচ্ছে, সেটা বন্ধ করে দেবার আগে রাস্তায় একবার উঁকি দিলেন, একেবারে শুনশান। তবু প্রতাপ রিভলভারটা উঁচু করে ধরে আছেন। বাইরে বেরুবার সময় কোনোদিন এটা সঙ্গে নেন না। মমতা মাথার দিব্যি দিয়েছেন, তাঁর বদমেজাজী স্বামী হঠাৎ একটা কিছু করে

বসতে পারেন, মমতার সব সময় এই ভয়। আজ যদি রিভলভারটা সঙ্গে থাকতো তা হলে প্রতাপ নির্ঘাৎ ওই ঢ্যাঙা শয়তানটাকে গুলি করতেন। সেটা কি কোনো অন্যায় হতো?

নানু সব রান্না করে গুছিয়ে রেখে গেছে। রুটি, আলু-পেঁয়াজের তরকারি, মুলো দিয়ে। কচ্ছপের মাংস, এটা প্রতাপের খুব পছন্দের খাবার, মমতা কচ্ছপের মাংস খান না, তাই অন্য সময় আনা হয় না। আর গাজরের হালুয়া। সব কটার ঢাকনা খুলে দেখতে দেখতে প্রতাপের হঠাৎ মনে পড়লো, পাখার গুদামের কর্মচারিটি তাঁকে বলেছিল, মাটির তলায় যা জন্মায় আপনি সেগুলো আর খাবেন না। কেন বলেছিল এ কথা? লোকটি কিন্তু মতলববাজ নয়।

তিনি নিজেই খাবার গরম করে নিতে পারেন। তবু আজ আর স্টোভ জ্বাললেন না। মোমটা আর রিভলভারটা টেবিলের ওপর রেখে তিনি খেতে বসলেন। একটুখানি রুটি ছিঁড়ে, তার মধ্যে তরকারি মাখিয়ে হাতে ধরে রইলেন। আজ না খেলেও চলে। বুকটা খুব ভারী ভারী লাগছে, মনে হয় যেন গলা দিয়ে, বুক পেরিয়ে খাদ্যগুলো নীচে নামতে পারবে না, মাঝখানে কোথাও আটকে যাবে। মুলো দিয়ে কচ্ছপের মাংস খেতে ভালোবাসতো যে প্রতাপ মজুমদার, সে অন্য লোক। আজ তাঁর ওইসব খাদ্যে কোনো আসক্তিই নেই।

তারপর তিনি দেখলেন, তার বাঁ হাতের কনুইয়ের কাছে চাপ চাপ কাদা। তাঁর ডান হাতের পাঞ্জাটাও নোংরা। খেতে বসার আগে তিনি এমনিতেই প্রত্যেকদিন হাত ধুয়ে নেন, আজ রাস্তার ধুলো কাদার মধ্যে অনেকক্ষণ শুয়েছিলেন, তার পরেও বাড়ি ফিরে স্নান করেননি। তাঁর সমস্ত শরীরটাই নোংরা। কিন্তু যেন তাতে কিছু যায় আসে না।

মোমটা নিবু নিবু হয়ে আসছে। আর কি মোম আছে? উঠে খুঁজতেও ইচ্ছে করছে না। বিমর্ষতায় ভরে যাচ্ছে বুক। কেন এমন হচ্ছে আজ? সন্ধেবেলার ঘটনাটার জন্য দোষ তো তাঁরই। উল্টোদিকের দোকানদারটি ঠিকই বলেছিল, ওইসব গুণ্ডা-মাস্তানদের সঙ্গে কি শিক্ষিত ভদ্রলোকেরা পারে? ওরা অনায়াসে যে-সব খারাপ কথা বলে, লোককে ধাক্কা মারে, পেটে ছোরা বসিয়ে দেয়, ফস করে পাইপগান চালায়, তা কি ভদ্র মানুষের পক্ষে প্রতিরোধ করা সম্ভব? সবাই এড়িয়ে যায়। এই রকমই চলতে থাকবে।

একটা নিম্নশ্রেণীর লোক তাকে অকারণে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিল, অত লোকের সামনে, কেউ প্রতিবাদ করলো না? ভদ্রতা-সভ্যতা কি উঠে গেল এদেশ থেকে? পানের দোকানের যে-ছোকরাটি চুরুট কিনতে এসেছিল, সেও তো বলতে পারতো, এই ভদ্রলোক আগে থেকে দাঁড়িয়ে আছেন, একে দিয়ে নাও, তারপর আমার চুরুট দেখিয়ো।

মোটর সাইকেল-চালক ছোকরাটি অবশ্য অন্যরকম। সে ফিরে এসেছিল। আজকালকার তরুণদের মধ্যে এরকমও তো আছে। ওর চোখে মুখে প্রতাপ একটা সতোর দীপ্তি দেখতে পেয়েছিলেন। সেই ছেলেটির ওই পরিণতি। কেউ বাধা দেবে না? রাস্তার সব লোক তো খারাপ হতে পারে না, কিন্তু যারা অসং নয় তারা সবাই ভীতু? সেই ছোকরাটিকে একেবারে মেরে ফেললো কি না, তাই-ই বা কে জানে! আজকাল খুন তো জলভাত, কাগজ খুললে রোজই চোখে পড়ে। একটু রাজনীতির রং মেশাতে পারলে পুলিশও ছোঁয় না। ছেলেটিকে যদি প্রাণে না মেরে পঙ্গু করে দেয়, সে খবর ছাপাও হবে না।

সেবার অ্যামেরিকায় গিয়ে প্রতাপের মনে হয়েছিল এখানে টাকা রোজগারের জন্য তাঁর দেশের ছেলেমেয়েরা দাঁতে দাঁত কামড়ে পড়ে আছে, কিন্তু এখানকার সমাজে তাঁদের কোনো স্থান নেই, মেইন স্ট্রিমের সঙ্গে তাদের যোগ থাকে না, তাদের সেনস অফ বিলংগিং হয় না। রাস্তায় কোনো গণ্ডগোল হলে তারা ভাবে, এটা আমাদের ব্যাপার নয়। পাশে দাঁড়িয়ে দুটি আমেরিকান ঝগড়া বা তর্ক করলেও এরা কোনো পক্ষ নেবে না। কালো লোক বলে কোনো দোকানদার যদি তার প্রতি সরাসরি অপমান না করে স্রেফ অবজ্ঞার ভাব দেখায়, ইচ্ছে করে তাকে দাঁড় করিয়ে রাখে, তারও কোনো প্রতিবাদ করতে পারবে না, অন্য দোকানে চলে যাবে। বর্ণবিদ্বেষের কোনো স্পষ্ট প্রমাণ প্রতাপের চোখে পড়েনি, কিন্তু অনুভব করেছেন, সেটা চাপা ভাবে অনেকের মধ্যে আছে। সেটা অস্বাভাবিকও তো নয়। কালোর চেয়ে ফর্সা লোকেরা সব জায়গাতেই তো বেশি খাতির পায়।

আজ প্রতাপ বুঝলেন, নিজের দেশে থেকেও তো সবসময় সব কিছুতে অংশ নেওয়া যায় না। রাস্তায় কোনো গণ্ডগোল হলে আজকাল সবাই পরামর্শ দেয়, ওতে মাথা গলিও না। পাশের বাড়ির একটা ছেলে বখামি করলে তাকিয়ো না তার দিকে, তাকে কিছু বলতে যেও না, বলতে গেলে নিজের মান নষ্ট হবে। এইসব ব্যাপার নিয়ে বড়জোর খবরের কাগজে চিঠি লেখা যায়।

প্রতাপ ভাবলেন, তিনি নন, অন্য একজন প্রতাপ মজুমদার, যিনি চেয়েছিলেন নিজের স্ত্রী-পুত্র-পরিবারকে সাধ্যমতন স্বাচ্ছন্দ্য দিতে, বাস্তুচ্যুত হয়ে, পৈত্রিক সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত হয়েও যে মানুষটি অতিরিক্ত পরিশ্রম করে অর্থ উপার্জন করেছেন, ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া শিখিয়েছেন, সৎ থাকার চেষ্টা করেছেন, কারুর কাছে মাথা নীচু করেননি, সেই মানুষটি আজ চরম একা। ছেলেমেয়েরা কেউ কাছে থাকে না, তাদের এখন নিজস্ব জীবন আছে। পাড়ার লোক বা অল্প চেনারা খানিকটা সম্ভ্রমের সঙ্গে বলে, আপনার ছেলে তো আমেরিকায় থাকে? কিসের জন্য এই সম্রম? তিন-চার বৎসর অন্তর সেই ছেলে একটা ক্যামেরা বা রেডিও বা কিছু বিদেশী পারফিউম নিয়ে আসবে, তার টুথ পেস্টটা দেখেও অন্যরা বলবে, আহা কী সুন্দর! মাঝে মাঝে নিয়মরক্ষার জন্য চিঠি বা কিছু টাকা পাঠাবে। সেই প্রতাপ মজুমদার আজ এক ও ণ্ডার হাতে ধাক্কা খেয়ে রাস্তার নর্দমার পাশে শুয়েছিল, তাকে কেউ চেনে না, ওইটাই তাঁর যোগ্য স্থান।

হ্যাঁ। অন্য প্রতাপ মজুমদার, তিনি নন। এখন তাঁর কিছুতেই কিছু যায় আসে না।

প্রতাপ টের পাচ্ছেন না, তাঁর গাল বেয়ে টপ টপ করে জল গড়াচ্ছে খাবারের থালায়। বারবার একটা কথাই মনে পড়ছে, আমাকে এখন আর কারুর কোনো প্রয়োজন নেই, আমি অপ্রয়োজনীয়, আমি অপ্রয়োজনীয়!

দপ করে আলো জ্বলে উঠলো। এখন এই আলোটারও যেন কোনো প্রয়োজন ছিল না। সব কিছু কেমন যেন ক্যাটক্যাট করছে এই আলোতে। এখন লোকে ঘুমাবে, এখন আলো না। থাকলেও চলে। প্রতাপের মতন ক’জনই বা এখন জেগে থাকে? সন্ধের সময়, যে-সময়টা সভ্য মানুষ বই-টই পড়ে, গান-বাজনা শুনতে চায়, সেই সময়েই অন্ধকারে হাত গুটিয়ে বসে থাকতে হয়। সেই সময় অন্ধকার রাস্তায় অনেক কিছু ঘটে যায়।

প্রতাপ এবার খাওয়ার চেষ্টা করলেন। সবটাই তাঁর তেতো লাগলো। তিনি এক ঝটকায় প্লেট, বাটিগুলো ফেলে দিলেন মাটিতে, নিস্তব্ধতার মধ্যে বেশ জোরে ঝনঝন শব্দ হলো, একটা দুটো প্লেট ভাঙলো। প্রতাপ একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন রিভলভারটার দিকে।

একটু পরেই তিনি ভাবলেন, এই রাগ তো তাঁর নয়, অন্য প্রতাপ মজুমদারের। যে-লোকটি মূর্খের মতন সারাজীবন খেটেখুটে শুধু একটা পরিবার গড়ে তুলতে চেয়েছিল, বৃহত্তর পরিপ্রেক্ষিতে নিজের ভূমিকার কথা কিছু ভাবেনি। নিজের পরিবারের মানুষজনের কাছে তার অনেক কিছু প্রত্যাশা ছিল বলেই এখন তার মধ্যে বিরাট ব্যর্থতাবোধ ও হতাশা আসা সম্ভব। মূর্খ। মূর্খই তো সে। আজকালকার দিনে ছেলেমেয়েরা কি কাছে থাকতে পারে সব সময়। একটা ছেলে গেছে অপঘাতে, সে বেঁচে থাকলেও কী রকম হতো কে জানে! অন্য ছেলে তার কাজের সুবিধের জন্য বিদেশে থাকে, সে এখন নিজের পরিবার গড়বে, সেটাই তো স্বাভাবিক, সে বাপ-মাকে নিয়ে সর্বক্ষণ মাথা ঘামাবে কেন? স্নেহ-মমতা অনেকটা জলের মতনই স্বাভাবিকভাবেই নিম্নগামী।

প্রতাপ মেঝে থেকে বাসনপত্রগুলো আবার কুড়োলেন। আর একটা কথা তাঁর মনে পড়লো। অন্ধকারের মধ্যে একটা লোক টর্চ জ্বেলে উল্টোদিকের দোকান থেকে তাঁর হাত ধরে তুলতে এসেছিল। এইরকম লোকও তো আছে। কেউ ধাক্কা মেরে ফেলে দেয়, কেউ হাত ধরে তোলে। তিনি ওই দ্বিতীয় ব্যক্তিটির ভূমিকাটা তো অনুসরণ করতে পারেন।

সব বাতি নিবিয়ে, রিভলভারটা বালিশের তলায় রেখে প্রতাপ শুয়ে পড়লেন। তিনি আর আগেকার প্রতাপ মজুমদার নন, এই ভেবে হৃষ্ট বোধ করলেন খানিকটা।

পরদিন ঘুম ভাঙলো বেশ দেরিতে। কোনো তাড়া নেই অবশ্য। নানু এখনো আসেনি, তিনি নিজেই চা করে নিলেন। খবরের কাগজ নীচে দিয়ে যায়, সেটা আনতে গিয়ে সিঁড়ি ভাঙার সময় তিনি টের পেলেন, তার শরীরটায় তেমন যুত নেই। বুকের মধ্যে একটা চাপ চাপ ভাব। মাঝে মাঝে খুকখুক করে কাশি আসছে। চোরা ঠাণ্ডা লেগে গেছে বোধহয়। নিজের শরীর খারাপের ব্যাপারটা তিনি গুরুত্ব দেন না, বিকেলের দিকে একবার ব্লাড প্রেশারটা চেক করাবেন ভাবলেন।

চা খাওয়ার খানিক পরেই অলি এসে উপস্থিত। সে ঝলমলেভাবে হেসে বললো, যাদবপুর ইউনিভার্সিটিতে আমার একটা কাজ আছে, এদিকে আসতে আসতে তাই ভাবলুম, তোমার বাড়িতে একটু চা খেয়ে যাই। ব্যাচেলারের জীবন কেমন লাগছে, প্রতাপকাকা?

প্রতাপও মুচকি হাসলেন। অলির অজুহাতটা হয়তো সত্যি নয়। অলি যে শুনেছে মমতা হরিদ্বারে গেছেন, প্রতাপ একলা রয়েছেন, সেই জন্য অলি তাঁর খবর নিতে এসেছে। অলির এইসব দিকে তীক্ষ্ণ নজর।

অলি বললো, নানু কোথায়? তোমার চা কে বানিয়ে দিল?

প্রতাপ বললেন, আমি বুঝি চা করতে পারি না? আমাকে এত অপদার্থ ভাবিস! দ্যাখ, তোকে কেমন চা বানিয়ে খাওয়াচ্ছি। আর কি খাবি, বল? আমি ভালো ওমলেটও বানাতে পারি।

অলি বললো, থাক আর ওমলেট লাগবে না। আমি খেয়ে এসেছি।

কাঁধের ঝোলা ব্যাগ থেকে সে একটা টিফিন কৌটো বার করে বললো, এতে একটু আতার পায়েস এনেছি তোমার জন্য। তুমি মিষ্টি খাও না বললে চলবে না, এটুকু তোমায় খেতে হবে। বুলি বেঁধেছে কাল রাত্তিরে। বুলি নানারকম রান্না খুব ভালো পারে, জানো তো?

প্রতাপ বললেন, ঠিক আছে, খাবো। আতার পায়েস? কখনো খাইনি।

অলি আর একটা কাগজের বাক্স বার করে, এতে আছে কয়েকটা চিকেন প্যাটিজ। টাটকা। আজ সকালেই বানানো হয়েছে।

প্রতাপ জিজ্ঞেস করলেন, আর কী কী এনেছিস?

অলি বললো, কাকীমা নেই, বাড়িটা ভীষণ খালি খালি লাগছে। ও হ্যাঁ, বুলি বলে দিয়েছে, এই শনিবার ওর গানের প্রোগ্রামটা দেখাবে টি ভি-তে, তুমি দেখো।

প্রতাপ বললেন, দেখবো। এমনিতে টি ভি খোলাই হয় না, মমতাই ওসব দেখে, কিন্তু বুলির গান অনেকদিন শুনিনি। হ্যাঁরে, বুলি একদিন আমার কাছে খেতে চেয়েছিল। নানু আজ থেকে থাকবে। তোরা কাল দুপুরে আমার এখানে খেতে আয় না! আমি বাজার করবো, নানু খুব খারাপ রাঁধে না, ইচ্ছে করলে তুই আর বুলিও এখানে এসে কিছু রাঁধতে পারিস, বেশ পিকনিকের মতন হবে।

অলি বললো, এই রে, তুমি আগে বললে না? আমি যে আজ বিকেলের ট্রেনে ঝাড়গ্রাম যাচ্ছি, সব ঠিক ঠাক হয়ে গেছে।

–হঠাৎ ঝাড়গ্রাম যাবি কেন?

–বিনপুরে কৌশিক পমপম থাকে না? ওদের কাছে যেতে হবে। পমপম খবর পাঠিয়েছে।

–কৌশিক ওই গ্রামের ইস্কুলেই রয়ে গেল? ও দিকে অন্য কোনো ভালো কাজ টাজ পেতে পারতো না?

–প্রতাপকাকা, যার যেখানে ভালো লাগে, সে সেখানেই থাকবে। ওরা দু’জনে ওখানে বেশ মজাসে আছে।

–এখনও বুঝি পলিটিক্যাল অ্যাকটিভিটি চালিয়ে যাচ্ছে ওদিকে?

–ওই যে বললুম না, যার যা ভালো লাগে, সে সেটাই করবে!

প্রতাপ রান্নাঘরে এসে চা বানাতে লাগলেন, অলি তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে গল্প করতে লাগলো। প্রতাপ লক্ষ করলেন, একটু যেন রোগা হয়েছে অলি, কিন্তু তার মুখে কোনো মালিন্য নেই। মেয়েটা কি সুখেই আছে? অলিকে কখনো মন-মরা অবস্থায় দেখেননি তিনি।

যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের অজুহাতটা বোধহয় একেবারে মিথ্যে নয়। চা খাওয়ার পর অলি চলে যাওয়ার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়লো। প্রতাপের খুব ইচ্ছে অলি আর একটু থাকুক। অলির উপস্থিতিতে যেন বাড়িটা ভরে গেছে।

বসবার ঘরের দেওয়ালে প্যারিস থেকে কিনে আনা একটা রেমব্রাশুটের ছবি বাঁধানো, সেটা একটু বেঁকে গেছে, অলি সোজা করে দিয়ে বললো, প্রতাপকাকা, আমি তাহলে যাই? লক্ষ্মী হয়ে থেকো, কাকীমা নেই বলে তুমি যেন যতখুশী অনিয়ম করো না। ঠিক সময়ে খাবে।

–তুই ঝাড়গ্রাম থেকে কবে ফিরবি?

–আমার এখন কলেজ ছুটি, হয়তো দিন সাতেক থাকবো, একটু বেশিও হতে পারে। পমপমের শরীর ভালো না জানোই তো!

–হ্যাঁ রে অলি, তুই আমার খবর নিবি, পমপমের সেবা করতে যাবি, যার যখন অসুবিধে হবে তোকে দৌড়ে যেতে হবে, এসব তো বুঝলুম, কিন্তু তোর কথা কেউ ভাবে?

–কেন ভাববে না কেন? অনেকেই ভাবে। তুমি ভাবো না?

–অলি, একটা সত্যি কথা বলবি? বিয়ে তো করলি না, কিন্তু তুই কারুকে ভালো বাসিস না? সেরকম কেউ নেই?

অলি মুখ ফিরিয়ে, খুব যেন অবাক হবার ভাব করে বললো, ভালোবাসার কেউ নেই? কী বলছো তুমি? আমি তোমাকে ভালোবাসি, বাবাকে ভালোবাসি, কৌশিককে ভালোবাসি, অনুপম, তপন, বাবলুদাকেও ভালোবাসি। আমার কি ভালোবাসার লোকের অভাব? আরও আছে।

–তুই বাবলুর নামটাও বললি? তার সঙ্গে তোর দেখা হয় না কত বচ্ছর…

–ভালোবাসতে দোষের কী আছে? দেখা না হলেও ভালোবাসা যায়। তবে, সবচেয়ে বেশি ভালোবাসি শৌনককে।

–ওঃ, তোর মাথা থেকে এখনও সেই ভূত যায়নি? তুই আজও সেই ছেলেমানুষটিই রয়ে গেলি!

চোখ গোল গোল করে দুষ্টুমির ভঙ্গিতে অলি বললো, তোমাকে আর একটা গোপন কথা বলি, প্রতাপকাকা। শৌনককে আমি যদিও বিয়ে করিনি, তবু মাঝে মাঝে সে রাত্তিরে আমার পাশে বিছানায় শুয়ে থাকে।

অলি বেশ জোরে হেসে উঠতেই প্রতাপের ইচ্ছে হলো তার হাত ধরে বলতে, অলি, তুই এখুনি চলে যাসনি। আর একটু থাক।

কিন্তু মুখ ফুটে সেটা বলা গেল না। তিনি অলির সঙ্গে সঙ্গে সিঁড়ি দিয়ে নেমে এলেন একতলায়। প্রতাপের বুকটা টনটন করতে লাগলো অলির জন্য। অলি কয়েকদিন কলকাতায় থাকবে না, এখন কলকাতাটা তাঁর আরও ফাঁকা মনে হবে।

অলি এগিয়ে গেল বাস স্টপের দিকে, প্রতাপ দেখলেন নানু ফিরছে, অলির সঙ্গে সে তো দাঁড়িয়ে কথা বলছে। সদর দরজাটা খোলা রেখে প্রতাপ ওপরে উঠতে লাগলেন।

হঠাৎ তাঁর পা দুটো যেন অসাড় হয়ে এলো, তিনি এক পা এক পা করে উঠতে যেন প্রচুর পরিশ্রম করছেন। বুকটা যেন ফেটে যেতে চাইছে। কিছু একটা বেরিয়ে আসতে চাইছে বুক থেকে। তিনি থেমে দাঁড়িয়ে ব্যাপারটা বুঝবার চেষ্টা করলেন। এরকম তাঁর কখনো হয়নি আগে। এটা একটা বড় রকমের অসুখ? তিনি অসুস্থ হয়ে বিছানায় পড়ে থাকবেন?

প্রতাপের মনে পড়লো, বিছানায় বালিশের তলায় রিভলভারটা আছে। যে প্রতাপ মজুমদার হাজরা রোডে একটা গুণ্ডার ঘৃণার ধাক্কায় নর্দমায় পড়ে শুয়ে ছিল, তার পক্ষে অসুস্থ হয়ে বিছানায় পড়ে থেকে অন্যের সেবা নেওয়া মানায় না। সে অধিকার তার নেই।

প্রতাপ ছুটে ওপরে উঠতে গেলেন, একটুও না উঠে তিনি পড়ে গেলেন সিঁড়িতে। পড়তে পড়তে ফিসফিস করে তিনি ডাকলেন, অলি, অলি…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *