৫০. ছিলেন শৈব, হয়ে গেলেন শাক্ত

ছিলেন শৈব, হয়ে গেলেন শাক্ত। অমরনাথ তীর্থ থেকে প্রত্যাবর্তনের পর থেকেই এই পরিবর্তন। লক্ষ করছেন নিবেদিতা। আগে যখন তখন আপন মনে বলে উঠতেন, শিব! শিব! এখন বলেন মা, মা! যেন সেই মাকে তিনি চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছেন।

স্বামীজির আচার-আচরণ দেখে নিবেদিতার মনে হয়েছিল, তিনি শিবের অবতার। বেলুড়ে দীক্ষার দিন স্বামীজি মহাদেব সেজেছিলেন, কিন্তু কালীর কথা তার মুখে বিশেষ শোনা যায়নি। ইংল্যান্ডে বক্তৃতার সময় তিনি ছিলেন বৈদান্তিক, মূর্তিপূজার কথা, তান্ত্রিক মতের কথা উল্লেখ করতেন না। কিন্তু ক্ষীরভবানী দর্শনের আগে তিনি এক রাত্রে ঘোরের মাথায় লিখে ফেললেন ইংরেজিতে এক কবিতা, ‘কালী দা মাদার’। কী সাংঘাতিক সেই কবিতার বর্ণনা, বাঙালির অতি পরিচিত মাতৃরূপা কালী তো তিনি নন। উগ্র রৌদ্ররস বাঙালির ঠিক যেন সয় না, তাই শ্যামাসঙ্গীতে, রামপ্রসাদের গানে কালী অনেক ঘরোয়া, তিনি মনোমোহিনী, সদানন্দময়ী, সুধা তরঙ্গিণী। তিনি তো প্রলয়ঙ্করী নন। বিবেকানন্দর কবিতায় উদ্ভাসিত কালী মূর্তি যেন ধ্বংসের দেবী, যেন চণ্ডিকার ভূকুটিকুটিল ললাট থেকে আবির্ভুত চামুণ্ডার বর্ণনার সঙ্গে মিলে যায়। সেই করালদ্রংস্ট্রা মূর্তির সঙ্গে ঘনান্ধকার ঝড়ের তাণ্ডবের মধ্যে ঘুর্ণিবাত্যায় গর্জে ফিরছে প্রমত্ত প্রেত পিশাচপাল। এই কবিতা লেখার পর স্বামীজি ভাবের আবেগে মুর্ছিত হয়ে পড়েছিলেন। কয়েকদিন পরে তিনি নাপিত ডেকে মস্তক মুণ্ডন করলেন। তারপর তিন বিদেশিনীর কাছে সেই ‘কালী দা মাদার’ কবিতাটি আবৃত্তি করতে করতে বললেন, এর প্রত্যেক কথাটি সত্য,… দেখো আমি মৃত্যুকে বরণ করেছি।

মৃত্যুচিন্তা। মাঝে মাঝেই এই চিন্তা এখন বিবেকানন্দর মনে ঘুরে ফিরে আসে। কিন্তু তার তো স্বেচ্ছামৃত্যু। নিবেদিতাকে তিনি বলেছিলেন, অমরনাথের শিব তাকে অমর হবার বর দিয়েছেন, এর পর স্বেচ্ছায় ভিন্ন মৃত্যু নেই তার। আবার শ্রীরামকৃষ্ণ বলে গেছেন, ও যখন নিজেকে জানতে পারবে, তখন এ শরীর আর রাখবে না।

এখনও কত কাজ বাকি আছে। এই তো সবে শুরু। সবে মাত্র সঙ্ঘ গড়া হয়েছে। এর পর সারা ভারত কাপিয়ে দিতে হবে। তবু শরীর যে দুর্বল হয়ে যাচ্ছে ক্রমশ। অমরনাথে লিঙ্গ দর্শনের আগে বরফ গলা ঠাণ্ডা জলে স্নান করেছিলেন জেদের বশে, এরপর শরীর এমন অবসন্ন হয়ে গিয়েছিল যে হঠাৎ মুর্ছিত হয়ে পড়ে যেতে পারতেন। একজন ডাক্তার পরীক্ষা করে দেখেছেন, সেই সময় তার হৃৎপিণ্ড থেমে যাবার সম্ভাবনা ছিল, তারপর থেকেই হৃৎপিণ্ডটি বর্ধিতায়তন হয়ে ঝুলে গেছে, যা অত্যন্ত বিপজ্জনক।

মৃত্যুচিন্তা থেকেই কি কালীর প্রতি এই টান এসেছে!

কলকাতায় যখন প্লেগের প্রাদুর্ভাব। চতুর্দিকে মহা অমঙ্গলের সংকেত, দাঙ্গা হাঙ্গামার আছে একটা অশুভ ছায়া ছড়িয়ে আছে সারা দেশে, তখন একদিন স্বামীজি বলেছিলেন, কিছু লোক কালীর অস্তিত্ব নিয়ে তামাশা করে। এখন বুঝুক! মহাকালী আজ বেরিয়ে পড়েছেন জনগণের মধ্যে। পাগলের মতো ভয়ে পালাচ্ছে তারা। সৈন্য ডাকাত হয়েছে মৃত্যুর সঙ্গে যুঝতে। কে বলে, ঈশ্বর শুভের মতই অশুভেও নিজেকে মেলে ধরেন না! কিন্তু শুধু হিন্দুই তাকে অশুভ রূপেও পুজা করতে সাহসী।

এর মধ্যে বিবেকানন্দ নিজের মায়ের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন। বিশ্ববিখ্যাত সন্তানকে পাশে বসিয়ে গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করলেন জননী। তারপর বললেন, হ্যাঁ রে বিলে, তুই এত পরিশ্রম করিস, এদিকে শরীর যে ভেঙে যাচ্ছে! মুখখানা এমন শুকনো শুকনো দেখাচ্ছে কেন?

বিবেকানন্দ বলেন, ও কিছু না। ডাক্তার বদ্যি দেখাচ্ছি তো নিয়মিত। ডাক্তারদের কথা শুনে খাওয়াদাওয়া কত কমিয়ে দিয়েছি জানো? মিষ্টি খাই না, নুন খাই না।

জননী বললেন, অত কম খেলে কি শৱীর টেকে! আজ আমি নিজের হাতে রান্না করে তোকে মাছের ঝোল ভাত খাওয়ার, আমার সামনে বসে খাবি। বিলে, তোকে আর একটা কথা বলব? ছোটবেলায় তো একবার খুব সুখ করেছিল। তখন কালীঘাটের মা কালীর কাছে মানত করেছিলাম, তুই মন্দিরে গিয়ে চাতালে তিনবার পড়াগড়ি দিয়ে মাকে প্রণাম করবি। তখন সেই রোগ সেরে গেল, আর মানত রক্ষা করা হয়নি। তাকে পাপ হয় না? সেই জন্যই কি তোর এখন শরীর খারাপ হচ্ছে? একবার কালীঘাটের মন্দিরে যাবি আমার সঙ্গে?

বিবেকানন্দ খানিকটা ইতস্তুত করেছিলেন। মায়ের এ সামান্য অনুরোধ রক্ষা করতে তিনি অরাজী নন। কিন্তু কালী ঘাটের মন্দিরে কি তাকে প্রবেশ করতে দেবে?

দক্ষিণেশ্বরের মন্দিরে তার প্রবেশ নিষিদ্ধ হয়ে গেছে। তার যৌবনের উপবন, তার সাধনার ক্ষেত্র, তার গুরুর লীলাস্থল, সেই দক্ষিণেশ্বরের মন্দিরে তিনি আর যেতে পারবেন না। তিনি শুদ্র হয়েও সন্ন্যাসী হয়েছেন, এই তাঁর অপরাধ। সন্ন্যাসী হয়েও পাহাড় পর্বতের গুহা কন্দরে না থেকে কালাপানি পাড়ি দিয়েছেন, সেখানে গিয়ে ম্লেচ্ছদের সঙ্গে বসে অপবিত্র, নিসিদ্ধ বস্তু আহার করেছেন। সে কথা বলে বেড়াতেও তার লজ্জা নেই। ফিরে আসার পরে প্রায়শ্চিত্ত্ব না করে তিনি এখনও ম্লেচ্ছদের সঙ্গে প্রকাশ্যে আহার-বিহার করছেন, তার অপরাধ কি কম? যেমন প্রগতিশীল ব্রাহ্মরা, তেমনি রক্ষণশীল হিন্দুরা তার বিপক্ষে। শ্রীরামকৃষ্ণ এবং তার চেলাদের সম্পর্কে মথুরবাবুর ছেলে ত্রৈলোক্যর কোন ভক্তি শ্রদ্ধা নেই। দক্ষিণেশ্বরে শ্রীরামকৃষ্ণের জন্মোৎসবও বন্ধ। রামকৃষ্ণ ছিলেন ওখানকার মন্দিরের পাঁচ টাকা মাইনের পূজারি বামুন, মৃত্যুর আগেই তাকে মন্দির চত্বর থেকে বিদায় করে দেওয়া হয়েছিল, তাঁর আবার জন্মোৎসব কীসের!

তবু মায়ের ইচ্ছা পূরণ করতে বিবেকানন্দ একদিন গেলেন কালীঘাটের মন্দিরে। আশ্চর্য ব্যাপার, এখানকার কর্তৃপক্ষ কিন্তু তাঁকে বাধা দিলেন না, বরং অভ্যর্থনা করলেন সাদরে। আদিগঙ্গায় ডুব দিয়ে এসে তিনি মন্দিরের চাতালে গড়াগড়ি দিলেন তিনবার, সাতবার মন্দির প্রদক্ষিণ কললেন, তারপর সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করলেন দেবীমূর্তিকে। প্রাঙ্গণে বসে যজ্ঞ করলেন অনেকক্ষণ ধরে।

মানত রক্ষা হল, কিন্তু শরীর সারল না। মাঝে মাঝেই বুক ধড়ফড় করে, অবসন্ন বোধ হয়। বিকেলবেলার দিকে প্রায়ই মনে হয়, শরীর আর বইছে না, শুয়ে পড়তে ইচ্ছে করে। অবশ্য বাইরের কেউ বুঝবে না, তিনি বুঝতে দেন না। শুধু মাত্র আত্মবিশ্বাসের তেজে তিনি দৃপ্ত রয়েছেন, যখন তিনি বেলুড়ে গিয়ে মঠের কাজ পরিদর্শন করেন কিংবা নতুন শিষ্যদের শাস্ত্র পড়ান কিংবা তন্ময় হয়ে শ্যামাসঙ্গীত গান করেন, তখন বোঝার কোন উপায় নেই যে, তার শরীরে কোনও রোগ ব্যাধি আছে।

 এই সাম্প্রতিক কালী ভক্তি ও মাতৃবন্দনা নিয়ে রসিকতাও করেন মাঝে মাঝে। একদিন সহাস্যে বলে উঠলেন, শরীর ভাল থাকলে ব্রহ্ম চিন্তা করি, পেট কামড়ালে ‘মা মা’ বলে ডাকি!

 নিবেদিতাকে স্বামীজি শিবের কাছে উৎসর্গ করেছেন। স্বামীজিই নিবেদিতার চক্ষে সাক্ষাৎ শিব। অমরনাথে বরফের লিঙ্গ দেখে তিনি অভিভূত হননি, কিন্তু স্বামীজিকে দেখে শিবের মহিমান্বিত রূপ তিনি উপলব্ধি করেচ্ছেন। তবু মা কালীর বন্দনার তাৎপর্য তিনি ঠিক বুঝে উঠতে পারেন না। ক্যাথলিক পরিবারে জন্ম, পরে সেই ধর্মীয় পরিমণ্ডল থেকে বেরিয়ে এসে অজ্ঞেয়বাদী এবং বিজ্ঞাননির্ভর যুক্তির প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলেন। কিন্তু ধর্মবিশ্বাস ত্যাগ করলেও পারিবারিক ধর্মীয় সংস্কৃতির প্রভাব থেকে মুক্ত হওয়া সহজ নয়। হিন্দুদের দেবদেবী পূজার ব্যাপারে কালীমূর্তি নিয়েই মিশনাবিবা আক্রমণ করেছে বারবার। ঘোর কৃষ্ণকায় এক নগ্নিকা দেবী, এক পুরুষের বুকের ওপর দণ্ডায়মান, গলায় নরমুণ্ডের মালা, এক হাতে ছিন্ন মুণ্ডু, অনেকখানি বেরিয়ে আছে জিভ, ডাকিনী-যোগিনীরা সেই মূর্তির সঙ্গিনী, তার সামনে ছাগবলি দেওয়া হয়, থকথক করে রক্ত, এই ভংকর দৃশ্যটি নিরাকারবাদীদের পক্ষে মেনে নেওয়া অবশ্যই শক্ত। নিবেদিতাও এক সময় এই মূর্তি সম্পর্কে ভয় বা বিতৃষ্ণা অনুভব করছেন। পুজা কিংবা আরাধনার সঙ্গে পবিত্রতা ও সৌন্দর্যের অঙ্গাঙ্গী সম্পর্ক, কালীমূর্তি যেন তার সম্পূর্ণ বিপরীত।

বিবেকানন্দের সান্নিধ্যে আসার পর, তার ব্যক্তিত্বে ও দর্শনে আকৃষ্ট হয়ে নিবেদিতার জন্মান্তর ঘটে গেছে। পূর্ব সংস্কার সব মুছে যাচ্ছে অতি দ্রুত। এখন তিনি জানেন, হিন্দুরা আসলে পুতুল পূজা করে না, দেব দেবীর মূর্তিগুলি এক একটি প্রতীক, সেই প্রতীকেরই পূজা হয়। মূর্তিগুলির মধ্যে অনন্ত ঈশ্বরের এক একটি রূপের প্রকাশ। মূর্তিগুলির সামনে একটি জলপূর্ণ ঘট থাকে, সেই ঘটেই নিরাকারের আরতি হয়, আর ভক্তি-প্রাবল্যে কেউ যদি মূর্তিগুলিকেই জীবন্ত মনে করে, তাতেই বা ক্ষতি কী? তবু হিন্দু ধর্মের দর্শনের প্রতি নিবেদিতা যতটা আগ্রহী ছিলেন, ততটা এই সব মূর্তি বা প্রতীকের প্রতি নয়। এখন স্বামীজি, তার প্ৰভু, তার রাজা যখন কালী-ভাবে ভাবিত হয়ে উঠেছেন, তখন তিনিও কালীমূর্তির বন্দনার তাৎপর্য আরও ভাল করে বোঝার চেষ্টা করতে লাগলেন। স্বামীজির পথই তার পথ।

একদিন স্বামীজি বললেন, মার্গট, আমি ব্যবস্থা করছি, কলকাতার একটা প্রকাশ্য জনসভায় তোমাকে কালী পুজো নিয়ে বক্তৃতা দিতে হবে।

নিবেদিতা হকচকিয়ে গিয়ে বললেন, সে কী! আমি বক্তৃতা দেব কী করে? আমি কতটুকু জানি? আমার সংস্কৃত জ্ঞান নেই।

স্বামীজি বললেন, পড়াশুনো করো। নিজেকে তৈরি করো। মাসখানেক সময়ের মধ্যে তুমি সারদানন্দের কাছে শাস্ত্র জেনে নাও।

নিবেদিতা বললেন, তবু আমি কলকাতার বিদগ্ধ, সংস্কৃতিবান মানুষের সামনে নতুন কী বলতে পারি?

স্বামীজি বললেন, তুমি মা কালীমূর্তির এবং মা কালীর সাধনার মাহাত্ম্য ও তাৎপর্য ব্যাখ্যা করবে। লোকের মনে যে-সব ভুল ধারণা আছে, তার নিরসন হবে।

গুরুর আদেশ সব সময়েই শিরোধার্য। তবু নিবেদিতা ইতস্তত করে বললেন, এর কি খুব দরকার আছে? মা কালী বিষয়ে স্বয়ং আপনি কিংবা আপনার কোনও গুরুভাই অনেক ভাল বলতে পারবেন আমার চেয়ে।

স্বামীজি জোর দিয়ে বললেন, না, না, তোমাকেই বলতে হবে। তোমার মুখ থেকেই শুনুক ওরা।

তিনি মিটিমিটি হাসতে লাগলেন। শুধু মিশনারিরাই যে কালীমূর্তি নিয়ে ঘৃণা বিদ্রুপ প্রচার করে তাই ই না, এ দেশের ব্রাহ্মরা এবং তথাকথিত প্রগতিশীলরাও কালী পূজার ঘোর বিরোধী। এবার রাজার জাতের প্রতিনিধি, একজন শিক্ষিত শ্বাতাঙ্গিনীর মুখ দিয়ে কালী মাহাত্ম্যর প্রচার শুনে তারা কী রকম হতচকিত হয়ে যাবে, তা ভেবেই বেশ মজা পেতে লাগলেন স্বামীজি।

অ্যালবার্ট হল ভাড়া নিয়ে রাখা হল। সংবাদপত্রে বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হল যে মিস মার্গারেট ই. নোবল (সিস্টার নিবেদিতা) নামে এক ইংরেজ লেডি, যিনি পাশ্চাত্য বিজ্ঞান ও দর্শনে উচ্চশিক্ষিত, তিনি কালী-ভজনা বিষয়ে একটি বক্তৃতা দেবেন। শহরের বুদ্ধিজীবীমহল অবশ্যই আসবেন দলে দলে।

প্রকাশ্য বক্তৃতা একটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার, ইংরেজ সমাজে তো বটেই। এ দেশেও। অপ্রস্তুত অবস্থায় অতি সাধারণ কথাবার্তা চলে না, জ্ঞানবুদ্ধি ও তাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গি থাকা আবশ্যক। নিবেদিতা গভীর মনোযোগের সঙ্গে পড়াশুনো শুরু করলেন। সারদানন্দের কাছ থেকে বুঝে নিচ্ছেন শাস্ত্রের ব্যাখ্যা, স্বামীজিকে কাছে পেলেও নানান প্রশ্ন করতে ছাড়েন না। স্বামীজির সামনে তিনি স্কুলের ছাত্রীর মতন খাতা-পেনসিল নিয়ে বসেন, স্বামীজির উত্তরগুলো টুকে নেন।

স্বামীজি একদিন বললেন, আমি ব্রহ্মে বিশ্বাসী এবং দেবদেবীতেও বিশ্বাসী। আর কিছুতে নয়।

নিবেদিতা বললেন, কিন্তু আপনি এক সময় কালীকে মানতেন না।

স্বামীজি বললেন, হ্যাঁ, তা ঠিক। ওঃ! কালীকে আরর কালী ব্যাপারটাকেই কী ঘৃণাই যে করতাম। দু বছর ধরে চলেছিল সেই লড়াই, কিছুতেই কালীকে মানতে চাইনি।

 নিবেদিতা বললেন, কিন্তু এখন আপনি তাকে বিশেষভাবে মেনে নিয়েছেন, তাই না?

স্বামীকি বললেন, মানতে বাধ্য হয়েছি। রামকৃষ্ণ পরমহংস তার কাছে আমাকে উৎসর্গ করে দিলেন যে। ক্ষুদ্রাদপি ক্ষুদ্র কাজেও মা আমাকে চালিত করেন। তিনি আমাকে দিয়ে যা ইচ্ছে তাই করান। সত্যি, কতদিন ধরে যে লড়াই চালিয়েছি! আমি ভালবাসতুম, বুঝলে, তাতেই আটকে পড়েছিলুম। আমি অনুভব করেছিলুম, এ পর্যন্ত যত মানুষ দেখেছি, তার মধ্যে তিনিই পবিত্রতম ব্যক্তি। আরও বুঝেছিলুম, আমাকে তিনি এত ভালবাসেন, সে ভালবাসার শক্তি আমার বাপ-মায়েরও নেই।

নিবেদিতা অধোমুখে একটুক্ষণ চিস্তা করে বললেন, একটা কথা জিজ্ঞেস করব? এত সুযোগ পেয়েও আপনি এত দীর্ঘদিন মা কালী সম্পর্কে সন্দেহ করেছেন, তা হলে ব্রাহ্মরাও যে করবে, তাতে আর আশ্চর্য কী?

স্বামীজি বললেন, হ্যাঁ, তা ঠিক। কিন্তু ওরা তো আমার গুরুর মধ্যে ওই সীমাহীন পবিত্রতা কখনও দেখতে পায়নি, আর সে ভালবাসার স্বাদ পায়নি।

নিবেদিতা বললেন, আমার কী মনে হয় জানেন, তার বিরাটত্বই তার ভালবাসাকে এত দুশ্ছেদ্য করে তুলেছিল আপনার কাছে।

স্বামীজি বললেন, তার বিরাটত্ব সম্পর্কে বোধ কিন্তু তখনও আমার মধ্যে জাগেনি। সেটা এল পরে, আত্মসমর্পণের পরে। তার আগে শ্রীরামকৃষ্ণকে খ্যাপা শিশুর মতন ভাবতুম, সব সময় এই দেখছেন, সেই দেখছেন, দেবদেবীদের চাক্ষুষ দেখতে পাচ্ছেন, আরও কত কী! সেসব জিনিসকে ঘৃণা করতুম। কিন্তু তার পরে আস্তে আস্তে সেই সব কিছুকেই, এমনকী কালীকেও মেনে নিতে হল।

নিবেদিতা বললেন, কেন মেনে নিতে হল আপনাকে, তা কিন্তু এখনও স্পষ্ট বুঝতে পারছি না। একটু বুঝিয়ে বলবেন, কীসে আপনার আত বিরোধিতা চুর্ণ হল?

স্বামীজি বললেন, না, বোঝানো যাবে না। সে রহস্য আমার সঙ্গেই চলে যাবে। সে সময় আমার চরম দুর্ভোগের দশা চলছে। বাবা মারা গেছেন, অভাব-অনটনের দুর্বিপাক; মা দেখলেন এই তো সুযোগ–আমাকে গোলাম করার। মা’র একেবারে মুখের কথা, ‘তোকে গোলাম করে রাখব।’ আর রামকৃষ্ণ পরমহংস তার হাতেই আমাকে তুলে দিলেন।

নিবেদিতা বললেন, আমার ধারণা, শ্রীরামকৃঞ্জ নিজেই কালীর অবতার।

স্বামীজি বললেন, হ্যাঁ, কোনও সন্দেহ নেই, মা কালাই শ্রীরামকৃষ্ণের ওপর ভর করে নিজের উদ্দেশ্য সিদ্ধ করেছেন। দ্যাখো মার্গট, আমি বিশ্বাস না করে পারি না, কোথাও একটা মহাশক্তি আছে যা নিজেকে নারী-প্রকৃতি বলে অনুভব করে– কালী বা মা নামে নিজেকেই আখ্যাত করে। আবার আমি ব্রহ্মেও বিশ্বাসী—ব্রহ্ম ছাড়া আর কিছুর অস্তিত্ব নেই।

নিবেদিতা বললেন, এটাকে বলা যেতে পারে বৈচিত্রের মধ্যে নিত্য ঐক্য।

স্বামীজি বললেন, তাই কি! কিন্তু ব্রহ্মের সঙ্গে ভিন্নতার কারণ কী? ব্ৰহ্ম এক ও অদ্বিতীয়, আবার দেবদেবীও… সুতরাং বুঝতেই পারছ, আমি ব্রহ্মেও বিশ্বাসী, আবার দেবদেবীতেও বিশ্বাস না করে পারি না। এই বিশ্বাসের যন্ত্রণা কী কম! তিনি এক এক সময় আমায় কী যন্ত্রণাই না দেন! তখন আমি তার কাছে চোটপাট করে বলি, খুব তো মা হয়েছিস, যদি তুই এই এই জিনিসগুলো আগামীকালের মধ্যে আমাকে না দিবি, তা হলে তোকে ছুঁড়ে ফেলে দেব! তারপর থেকে আমি শ্রীচৈতন্যের পুজো করব।

একটু থেমে, হেসে স্বামীজি বললেন, সেই জিনিসগুলো আমি ঠিক ঠিক পেয়ে যাই।

নিবেদিতা চোখ বিস্ফারিত করে বললেন, সত্যি?

স্বামীজি বললেন, সত্যি তো বটেই। কিন্তু মনে রেখো, এসব কথা আর কারুক জানাবার নয়।

নিবেদিতা বললেন, তার মানে আপনি বলছেন, এই আলাপ পৃখিবীর আর কেউ জানবে না?

স্বামীজি বলেন, কক্ষনও না। তিনি উঠে চলে যাচ্ছেন, নিবেদিতা বললেন, আমার আর একটা প্রশ্ন আছে, এই যে পাঠা বলির ব্যাপারটা, কালীমূর্তির পূজা চলছে, ভক্তরা মন্ত্র পাঠ করছে, তার মধ্যে একটা নিরীহ পশুকে টেনে এনে বলি দেওয়া, রক্ত ছিটকে যায় চার দিকে, এই বীভৎস ব্যাপারটা কি খুব প্রয়োজনীয়?

স্বামীজি তাচ্ছিল্যের সঙ্গে বললেন, ছবিটা সম্পূর্ণ করতে একটু রক্ত থাকলেই বা ক্ষতি কী?

স্বামীজি চলে গেলেন। নিবেদিতার আর একটা প্রশ্ন ছিল, সেটা বলা হল না। স্বামীজি শিবের অবতার, আর শ্রীরামকৃষ্ণ কালীর অবতার। স্বামীজি তা হলে কালীকে মা মা বলেন কেন? এদের মধ্যে তো মাতা-পুত্রের সম্পর্ক হতে পারে না। নিবেদিতার ধারণা, বিবেকানন্দ ও রামকৃষ্ণ, এরা দেবদম্পতি!

ফেব্রুয়ারি মাসের তেরো তারিখে আলবার্ট হল সন্ধে ছ’টার আগেই দর্শক সমাগমে পরিপূর্ণ হয়ে গেল। কলকাতার সম্ভ্রান্ত ও বিদ্বজ্জনেরা অনেকেই এসেছেন। নিবেদিতা নিজে তার ব্রাহ্ম বন্ধুদেরও আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন, অনেকেই বক্তৃতার বিষয়বস্তু শুনে আসতে চাননি, রবীন্দ্রনাথ অন্য ছুততো দেখিয়ে এড়িয়ে গেছেন। অমৃতবাজার পত্রিকাকেন্দ্রিক বৈষ্ণবরাও আগে থেকেই নিজেদের মধ্যে ঠাট্টা বিদ্রুপ করেছেন, তাঁদের পত্রিকার কোনও প্রতিনিধিও পাঠাননি। ঠাকুরবাড়ির পক্ষ থেকে শিষ্টতা রক্ষার জন্য এসেছেন সতেন্দ্রনাথ ঠাকুর, সঙ্গে তাঁর ভাগনি সরলা ঘোষাল। সত্যেন্দ্রনাথের মেয়ে ইন্দিরাও কৌতূহলবশে আসতে চেয়েছিল, কিন্তু আর কয়েক দিন পরেই তার বিবাহ, এ সময় তার বাড়ির বাইরে যাওয়াটা শোভা পায় না।

জরুরি রুগি দেখা সেরে একেবারে শেষ মুহূর্তে হন্তদন্ত হয়ে হাজির হলেন মহেন্দ্রলাল সরকার। প্রবেশপথে কিছু লোক দাঁড়িয়ে আছে, তাদের ঠেলেঠুলে তিনি চলে এলেন একেবারে সামনে। কোনও আসন খালি নেই, একজন সসম্ভ্রমে নিজের আসন ছেড়ে দিল তাঁকে। মহেন্দ্রলাল ওয়েস্ট কোটের পকেট থেকে গোল ঘড়ি বার করে সময় দেখলেন।

স্বামীজি আসেননি। মঞ্চের ওপর দুটি চেয়ার, একজন অনামা সভাপতির পাশে বসে আছেন নিবেদিতা। দুগ্ধধবল সিল্কের গাউন পরা, কাঁধের ওপর কারুকার্যময় কাশ্মীরি শাল, মুখে যৌবনের দীপ্তি, চক্ষু দুটি ঈষৎ চঞ্চল। নিবেদিতাকে শ্রোতাদের সঙ্গে পরিচয় করাবার কোনও প্রয়োজন নেই, তবু নিয়মরক্ষার জন্য সভাপতি সংক্ষিপ্ত ভাষণ নিলেন।

তারপর উঠে দাঁড়ালেন নিবেদিতা। সহজ, সরল ইংরেজিতে প্রথমেই বিনীতভাবে বললেন, এখান দাঁড়িয়ে কালীপূজা বিষয়ে বক্তৃতা করার অধিকার আমার তেমন নেই, সে বিষয়ে আমি সচেতন। সংস্কৃত-জ্ঞান কিংবা ভারতীয় ইতিহাস সম্বন্ধেও আমায় জ্ঞান খুব বেশি নয়…ভারতে আমি মাত্র এক বছর এসেছি।

সারাজীবন ধরে আমি কালীপুজোর কথা শুনে আসছি, কালী বা তাঁর পূজকদের সম্পর্কে সেসব মোটেই ভাল কথা নয়। এখন আমি এর সংস্পর্শে এসেছি, এবং বুঝেছি যে বাল্যকালে আমি যা শুনেছি, তা অর্ধসত্য, পূর্ণসত্য নয়। পূর্ণসত্যের সন্ধানই সামাদের ব্রত হওয়া উচিত। তা ছাড়া, একজন ইংরেজ রমণী হিসেবে আমার ক্ষমা প্রার্থনারও অধিকার আছে। আমার দেশের মানুষরা অন্য একটি দেশের ধর্মবিশ্বাসকে আঘাত করে যে সব কুৎসা রটনা করেছে, তার জন্য আমি প্রকাশ্যে ক্ষমা চাইতে পারি।

…ঈশ্বর উপলব্ধির প্রকাশ বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন নামে। কেউ ব্যাকুলভাবে ডাকেন, হে প্রভু! সেমেটিকরা ভাববেশে ঈশ্বরকে বলেন, আমাদের পিতা। …ভারতবর্ষ মধুরতম নাম ঈশ্বরকে ডাকে “মা” বলে। ঈশ্বর—জননী!

…মাতৃরূপিণী ঈশরের তিনটি রূপঃ দুর্গা, জগদ্ধাত্রী ও কালী। দিগবাসিনী দুর্গা, প্রকৃতিরূপে বিকাশশীল মহাশক্তির তিনি প্রতীক। জগদ্ধাত্রীর মধ্যে রক্ষয়িত্রীর ভাব কিছুটা প্রকাশ পেয়েছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কালীর কাছেই—ভয়ঙ্কর, অগ্নিরসনা, অগ্নিবদনা, মৃত্যু-শ্মশানের মধ্যে আসীনা যিনি—তাঁর কাছেই আত্মা স্তব্ধ হয়ে দাঁড়ায়, আর উচ্চারণ করে সেই পরম শব্দটি—মা!

নিবেদিতা খুব বিস্তৃতভাবে ঈশ্বরের মাতৃভাবের ব্যাখ্যা করতে লাগলেন। দুর্গা ও জগদ্ধাত্রীর তত্ত্ব বর্ণনা করে তিনি বললেন, ঈশ্বর জীবন দিয়েছেন সত্য। কিন্তু নিহন্তাও তিনি। ঈশ্বর কালাতীত নিত্য—এই ভাবের সঙ্গে জেগে ওঠে নাকি মহাকালের কৃষনচ্ছায়া, যার শুরু ও শেষ দুর্জ্ঞেয় রহস্যে?… সেই জন্যই, তার ধ্বংসলীলার মধ্যে কি তাঁকে অর্চনা করব না—সেই শ্মশানই কি একমাত্র স্থান নয়, যেখানে নতজানু হয়ে আমরা বলতে পারি—মা, মাগো!

যুগে যুগে মা কালী ভারতকে মানুষ দিয়েছেন। প্রতাপ সিংহ, শিবাজী, শিখেরা—এদের দিয়েছেন তিনি। যদি বাংলা দেশ, মাতৃপূজার এই আদিপীঠ, মাতৃসাধকদের এই জন্মভূমি—মাতৃপূজা ত্যাগ করে, তা হলে নিজ পৌরুষকেই ত্যাগ করবে। প্রাচীন পুজাকে দশগুণ বেশি ভক্তির সঙ্গে এখন করাতে হবে,– না করলে এ দেশের চির দুর্দশা ও অপমান…

সভাস্থল নিস্তব্ধ, সবাই গভীর মনোযোগ ও বিস্ময়-কৌতূহলের সঙ্গে শুনছে। হিন্দু ধর্মবিশ্বাসের মূল সত্যগুলির কথা এমন গভীর অথচ সাবলীলভাবে ইদানীং আর কারুকে বুঝিয়ে বলতে শোনা যায়নি। এক দল উচ্চ কন্ঠে গা-জোয়ারিভাবে নিজের ধর্মের প্রচার করে, অন্য দল নিন্দা বা অপপ্রচার করে। কোনও পক্ষই যুক্তির ধার ধারে না। সেই হিন্দু ধর্মের পক্ষ নিয়ে সবচেয়ে সারগর্ভ কথা বলছে কি না একজন মেমসাহেব! শ্রদ্ধা ও ভক্তির দীপ্তিতে উজ্জ্বল হয়ে আছে তার মুখ।

হঠাৎ ঘুমন্ত সিংহের জেগে ওঠার মতন দাঁড়িয়ে পড়লেন মহেন্দ্রলাল। বাজখাই গলায় চেঁচিয়ে বললেন, এখানে হচ্ছেটা কী, অ্যাঁ? এক বিলিতি বিবি আমাদের কালীপূজো শেখাবে! আরও দশগুণ বেশি কালীপুজো করতে হবে? এখনই যা বেলেল্লা চলছে, তার ওপর দশ গুণ! মিস নোবল, আমার ধারণা ছিল, তুমি এদেশে এসেছ স্ত্রীশিক্ষা বিস্তারের সদুদ্দেশ্য নিয়ে, বস্তিতে বস্তিতে ঘুরে তোমার প্লেগের রুগিদের সেবাব্রত দেখে মুগ্ধ হয়েছি। কিন্তু এখন এসব কী শুরু করলে? দেশটাকে আরও অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিতে ঢাও?

বিচলিত না হয়ে নিবেদিতা মৃদুহাস্যে বললেন, ডক্টর সরকার, ধর্মকে বাদ দিয়ে কি কোনও বড় কাজ হয়? আমি ধর্মের মূল তত্ব বোঝাবার চেষ্টা করছি, এখনও আমার বলা শেষ হয়নি।

মহেন্দ্রলাল ধমক দিয়ে বললেন, রাখো তোমার তত্ত্ব। তত্ত্বের তুমি কী বোঝো! এত প্রাচীন এক ধর্ম, তার সংস্কৃতি, এক বছর মাত্র এদেশে এসে কিছু মুখ শোঁকাশুঁকি করে তার তত্ত্ব বোঝা যায়? এত সহজ! তুমি তো তোতাপাখির মতন কতকগুলি শেখানো বুলি বলছ! তত্ত্ব হল এক ব্যাপার, তার প্রয়োগ কতরকম হয়, তার তুমি জানো? যত রাজ্যের মাতাল, গেজেল, চোর, ডাকাতরা কালী পুজা করে। তারা কোন তত্ত্বটা মানে?

নিবেদিতা বললেন, অপপ্রয়োগ দেখে মূল বিষয়ের বিচার করা যায় না। বাগানে অনেক আগাছা জন্মায়, তার জন্য পুরো বাগানটা নস্যাৎ করা কি ঠিক? মূল তত্ত্ব যদি ভালভাবে প্রচার করা যায়—

তাকে বাধা দিয়ে মহেন্দ্রলাল গর্জে উঠলেন, এসব পুজোফুজোর মূল তত্ত্বটাই তো ভন্ডামি! কতকগুলো তান্ত্রিক নিজেদের ভোগ-লালসা মেটালার জন্য একটা ল্যাংটা মাগির মূর্তি গড়েছে, তার সঙ্গে যতরাজ্যের বামাচার, মদের ছড়াছড়ি, বলি দেওয়া পাঁঠার মাংসের ভোজ, এইগুলোকেই শুদ্ধ করার জন্য বড় বড় তত্ত্বের বুলি কপচানো হয়েছে, সব ভণ্ডামি! ভণ্ডামি ছাড়া কিছু নয়—

নিবেদিতা বললেন, কালীপূজা বিষয়ে এক শ্রেণীর মানুষের আপত্তির কথাও আমি জানি। যেমন, প্রতিমা পূজা অনেকে মানেন না। এই প্রতিমাটির আকার বীভৎস। এই পুজোয় পশুবলি দেওয়ার রেওয়াজ আছে। একে একে আমি এই বিষয়গুলিরও ব্যাখ্যা করতে চাই।

মহেন্দ্রলাল বললেন, কী ব্যাখ্যা দেবে তুমি? সবই পালিশ করা ভণ্ডামির মুখোশ। শেষেরটা, ওই পাঠাবলির কথাটাই আগে বলো শুনি!

নিবেদিতা বললেন, মূর্তিপূজার মতন ওই বলিও তো প্রতীক। সব ধর্মের সাধকরাই শব্দ প্রতিমা নির্মাণ করেন। হিন্দু সাধকরা সেই শব্দ-প্রতিমার বর্ণনা দিয়ে মূর্তি গড়েছেন। কালী প্রতিমার সামনে প্রকৃত সাধক নিজেকেই নিবেদন করতে চান, তার বুকের রক্ত দিয়ে আরাধনা করতে চান। যত দিন না সে জন্য তিনি পুরোপুরি তৈরি হন, তত দিন পশুবলি দিতে হয় সেই রক্তের প্রতীক হিসেবে।

হা হা শব্দ অট্টহাস্য করে উঠলেন মহেন্দ্রলাল। দু’হাত তুলে বললেন, বলেছিলাম না, ভণ্ডামির ব্যাখ্যা! আজ অবধি কোন সাধক তার বুকের রক্ত দিয়েছে, অ্যাঁ? তার খোঁজ রাখো? বড় বড় জমিদাররা কালী পুজো করায়, তারা বুকের রক্ত দিতে চায়? ডাকাতগুলো কালী পুজো করে গিয়ে অন্যের গলা কাটে। দেবতার নামে উচ্ছুগ্যু করা মাংস খাবার ধান্দা? কালীপুজোর সময় ছেলেপুলে আর বুড়োরা পর্যন্ত হাঁ করে বসে থাকে, কখন মাংস খাবে। কসাইখানাগুলোতেও একটা কালী মূর্তি বসিয়ে পাঠাবলি হয়! অমন তত্ত্বের মুখে ঝ্যাঁটা মারি!

পেছন দিক থেকে একজন কেউ চেঁচিয়ে উঠল, চোপ! এই বুড়ো ভাম, তোর কথা কেউ শুনতে চায় না। বসে পড়, বসে পড়!

অমনি একটা শোরগোল শুরু হয়ে গেল। অনেকে মিলে বলতে লাগল, বসে পড়ুন, মশাই। বসে পড়ুন।

মহেন্দ্রলাল পেছন ফিরে ক্রুদ্ধ দৃষ্টিতে বললেন, না, আমি বসব না। আমরা চেষ্টা করছি, দেশটাকে কুসংস্কার থেকে মুক্ত করতে, বিজ্ঞানের দিকে দৃষ্টি ফেরাতে। আমরা চাই দেশের মানুষ ভণ্ডামিকে ঘৃণা করতে শিখুক। বাইরে থেকে এক মেম এসে কতকগুলো ভুল তত্ত্ব আর কদর্য আচার-অনুষ্ঠানের কথা প্রচার করবে, তা আমরা কিছুতেই মেনে নেব না!

একজন বলল, তুমি মানতে না চাও, গেট আউট! আমরা শুনব!

আর একজন বলল, তুমি একলা একলা ডিসটার্ব করছ কেন? আর কেউ তোমাকে সাপোর্ট করছে না।

মহেন্দ্রলাল কয়েক মুহূর্তের জন্য থেমে গেলেন। আহতভাবে তাকালেন সমগ্ৰ শ্ৰোতৃমণ্ডলীর দিকে। ভাঙ্গা গলায় বললেন, আর কেউ নেই? এখানে আর কেউ আমাকে সমর্থন করছেন না?

সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়ালেন। ধীরভাবে বললেন, আমিও মনে করি, এই বক্তৃতায় কুসংস্কারকে প্রশ্রয় দেওয়া হচ্ছে।

আরও কয়েকজন যুবকও উঠে দাঁড়াল, সংখ্যায় আট দশজনের বেশি না।

পেছন থেকে একজন চেঁচিয়ে উঠল, ওরে বেহ্ম রে, বেহ্ম! হিন্দুদের পুজোর কথা শুনলেই ওদের গা জ্বালা করে। তোরা এসেছিস কেন, যা, যা বেরিয়ে যা!

মহেন্দ্রলাল বললেন, আমি ব্রাহ্ম নই। আমি বিজ্ঞানী, আমি যুক্তিবাদী।

আর একজন বলল, ও মশাই, আপনারা তো মাত্তর ক’জন! আমরা অনেক বেশি লোক, আমরা শুনতে চাই, আমাদের ভাল লাগছে! বাধা দিচ্ছেন কেন?

মহেন্দ্রলাল বললেন, বেশি লোক! বেশির ভাগ লোকই তো ইডিয়েট, আর ভেড়ার পাল! যারা নতুন কথা বলে, যারা সমাজের ব্যধি দূর করতে চায়, যারা দেশটাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে চায়, চিরকালই তাদের সংখ্যা কম হয়। শেষ পর্যন্ত তারাই জেতে। বিদ্যাসাগর মশাই যখন বিধবা বিবাহ প্রচলন করতে চেয়েছিলেন, তখন বেশির ভাগ লোকই তার বিরুদ্ধে গিয়েছিল।

এই কথায় অগ্নিতে যেন ঘৃতাহুতি পড়ল। গোলমাল উঠল চরমে, গালাগালি ও কটুক্তিতে কান পাতা যায় না। একদল লোক ধেয়ে গেল মহেন্দ্রলালকে মারার জন্য।

নিবেদিতা উঠে দাঁড়িয়ে ব্যাকুল মিনতির সুৱে হাত জোড় করে বললেন, আপনার শান্ত হোন, অনুগ্রহ করে বসুন। ডঃ মহেন্দ্রলাল সরকার একজন শ্রদ্ধেয় ব্যক্তি, আমার পরিচিত। শুর আপত্তির কথা উনি নিশ্চয়ই বলতে পারেন। আপনারা সংযত হন।

তারপর মহেন্দ্রলালকে উদ্দেশ করে বললেন, ডক্টর সরকার, আমি কি আমার বক্তৃতার বাকি অংশ শেষ করতে পারি?

মহেন্দ্রলাল বললেন, শোনাও, তোমার যা খুশি শোনাও এদের!

সদর্পে তিনি সভাস্থল ছেড়ে বেরিয়ে চলে গেলেন।

তার পরেও প্রায় পঁয়তাল্লিশ মিনিট ধরে নিবেদিতা বলে গেলেন, স্বামী বিবেকানন্দের কালী দা মাদার কবিতাটি আবৃদ্ধি করলেন, রামপ্রসাদের অনেকগুলি গান অনুবাদ করে শোনালেন। শেষ হবার পর তুমুল করতালি ধ্বনিতে যেন ফেটে পড়ল বাতাস। অনেকে ছুটে এল মঞ্চের দিকে নিবেদিতাকে কতজ্ঞতা জানাতে।

যথাসময়ে এই বিবরণ শুনে খুবই হৃষ্ট বোধ করলেন স্বামীজি। নিবেদিতার শ্রম সার্থক, নিবেদিত জয়ী হয়েছেন। আরও একটা খুব বড় আনন্দের সংবাদ এই যে, কালীঘাট মন্দিরের কর্তৃপক্ষ মন্দির চত্বরে নিবেদিতাকে আর একবার এই বক্তৃতা দেবার জন্য বিশেষভাবে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। এটাও অবশ্যই আর একটি বড় জয়। দক্ষিণেশ্বরের কালী মন্দিরের দ্বার বন্ধ করে দিলে কী হয়, হিন্দু রক্ষণশীলতার প্রধান দুর্গ, কালীঘাটের সুপ্রাচীন কালী মন্দিরের দ্বার শ্রীরামকৃষ্ণপন্থিদের কাছে অবারিত। এমনকী এক ম্লেচ্ছ রমণীকেও তারা স্থান নিতে প্রস্তুত।

সংবাদপত্রগুলি নিবেদিতার এই বক্তৃতাকে বিশেষ আমল দিল না বটে, কিন্তু লোকের মুখে মুখে হিন্দু ধর্মের জোরালো সমর্থনকারী এই মেমসাহেবটির কথা ঘুরতে লাগল।

ব্রাহ্মদের কাছে নিবেদিতার যাতায়াত অবশ্য বন্ধ হল না। বুদ্ধিজীবী ও শিল্প-সাহিত্য সম্পর্কে আগ্রহী ব্রাহ্মদের সঙ্গে কথা বলতে তাঁর ভাল লাগে। ব্রাহ্ম ও শ্রীরামকৃষ্ণপন্থীদের মিলিয়ে দেবার ইচ্ছেটা তিনি এখনও ছাড়েননি। সেদিনের বক্তৃতার পর সরলা ও তার ভাই সুরেন নিবেদিতার আরও ভক্ত হয়ে উঠেছে। একদিন তিনি স্বামীজিকে সঙ্গে নিয়ে এলেন জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে।

দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছে সদ্য তরুণ বয়সে স্বামীজি একবার গিয়েছিলেন ব্যাকুল প্রশ্ন নিয়ে। ব্রাহ্ম নেতা বলে নয়, মহাপুরুষোপম এই মানুষটির প্রতি স্বামীজির এখনও বিশেষ শ্রদ্ধা আছে। এক রক্তপোলাপ নিয়ে দুজনে এলেন দেবেন্দ্রনাথের তিনতলার ঘরে। সকাল নটা বাজে, একটা আরামকেদারায় আধশোয়া হয়ে আছেন দেবেন্দ্রনাথ। আশি বছর পেরিয়ে গেছে কবে, এখনও তার চক্ষু ও কর্ণ সজাগ। বিবেকানন্দ সামনে এগিয়ে হাত জোড় করে প্রণাম জানালেন। দেবেন্দ্রনাথ অবশ্যই ইতিমধ্যে নৱেন্দ্রর বিবেকানন্দ স্বামীতে রূপান্তৱেব কাহিনী শুনেছেন, তিনি চিনতে পারলেন ও হাত তুলে আর্শীবাদ জানালেন। নিবেদিতা এর আগেই একবার দেখা করে গিয়েছিলেন, তিনি ফুলের স্তবক রাখলেন দেবেন্দ্রনাথের পায়ের কাছে।

দেবেন্দ্রনাথ বললেন, বসো মা, বসো। তোমরা দুজনেই আমার সামনে একটু বসো।

তারপর দেবেন্দ্রনাথ খুবই মৃদু কণ্ঠে, প্রায় শোনা যায় না এমনভাবে বিবেকানন্দকে কিছু বলতে লাগলেন বাংলায়, নিবেদিতা তার কিছুই বুঝতে পারলেন না। বিবেকানন্দই বা কী বুঝলেন কে জানে, মাথা নেড়ে যেতে লাগলেন। একটু পর দেবেন্দ্রনাথ একেবারে চুপ। কেউ কোনও কথা বলছেন না। মিনিট দশেক কেটে যাবার পর স্বামীজি বিনীতভাবে জিজ্ঞেস করলেন, আমরা এবার উঠি? আপনি আমাদের আর্শীবাদ করুন।

দেবেন্দ্রনাথ সংস্কৃত মন্ত্রোচ্চারণ করে ওঁদের আর্শীবাদ জানালেন।

সিড়ি দিয়ে নামতে নামতে স্বামীজি দেখলেন, একজন দীর্ঘকায় পুরুষ যেন ওঁদের দেখেও না দেখার ভান করে অন্যদিকে চলে গেল। কে? দেবেন্দ্রনাথের কনিষ্ট পুত্র কবিবর নাকি? আরও দু একজন উদাসীন ভাব দেখাল। স্বামীজির মনে হল, তিনি অনাহূতভাবে নিবেদিতার কথায় এসেছেন, যেন অবাঞ্ছিত। তিনি নিবেদিতাকে বললেন, চল, এক্ষুনি চলে যাই।

দোতলার ঘর থেকে একটি তরুণী বেরিয়ে এসে বলল, সে কী, এর মধ্যেই চলে যাবেন কেন? একটু চা খেয়ে যাবেন না?

স্বামীজি বললেন, না, আমার চা পান করার ইচ্ছে নেই এখন।

কিন্তু নিবেদিতার আরও কিছুক্ষণ থেকে যাবার ইচ্ছে। তিনি সতৃষ্ণ নয়নে স্বামীজির দিকে তাকালেন। স্বামীজি বুঝতে পেরে বললেন, তুমি যদি চাও, চা খেতে পারো।

ঘরের মধ্যে একটি সোফায় বসলেন স্বামীজি। ক্রমে আরও কয়েকজন এল, তারা নিবেদিতার সঙ্গেই গল্প করতে লাগল। মেয়ে মহলের খুব কৌতূহল নিবেদিতা সম্পর্কে। স্বামীজি চুপ করে বসে রইলেন, তার অস্বস্তি ক্রমশ বাড়ছে।

কেউ একজন জিজ্ঞেস করল, স্বামীজি, আপনি চাও খাচ্ছেন না, আপনার জন্য তামাক এনে দিতে বলব?

স্বামীজি এবার সম্মতি জানালেন। সঙ্গে চুরুট আনেননি বলে উসখুস করছিলেন। একজন ভৃত্য গড়গড়া সেজে নিয়ে এল, স্বামীজি নলটি হাতে নিয়ে তামাক টানতে লাগলেন। অন্যরা কালীমূর্তি নিয়ে তর্ক জুড়ে দিল নিবেদিতার সঙ্গে।

প্রায় ঘন্টাখানেক বাদে ওঠা হল। বাইরে বেরিয়ে এসে স্বামীজি বললেন, আমাদের নিজেদের অনেক কাজ আছে। এদের সঙ্গে মেলামেশা করে কী লাভ? মিছিমিছি এদের সঙ্গে তর্ক করেই বা কী হবে? কালীপুজো সম্পর্কে ওদের ছুঁৎমার্গ কিছুতেই যাবে না। তুমি আর ঠাকুরবাড়িতে এসো না।

নিবেদিতা অপরাধীর মতন একটুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন, আর আসব না? ইন্দিরা ওর আইবুড়ো ভাত আর বিয়েতে আমাকে নেমন্তন্ন করেছে, আসব না তা হলে? হিন্দু বিয়ের উৎসব আমার খুব দেখার ইচ্ছে ছিল।

স্বামীজি গম্ভীর হয়ে গেলেন। হুঁঃ ভারী তো বিয়ে! অশাস্ত্রীয় ছেলেখেলা। শালগ্রাম শিলা। নেই, যজ্ঞ অনুষ্ঠান হয় না, ব্রাহ্মদের বিয়ে আবার বিয়ে নাকি?

তবু তিনি বললেন, ঠিক আছে, বিয়েতে যেয়ো!

ইন্দিরার বিয়ের কটি দিন, বৌভাত পর্যন্ত অনেকখানি করে সময় কাটালেন নিবেদিতা ঠাকুর পরিবারের সঙ্গে। বিজ্ঞানী জগদীশ বোসও প্রায় সর্বক্ষণ ছিলেন, তার সঙ্গেও অনেক গল্প হল। জগদীশচন্দ্রের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের খুব বন্ধুত্ব। এক বিজ্ঞানীর সঙ্গে এক কবির এমন সখ্যও বেশ আকর্ষণীয় ব্যাপার। রবীন্দ্রনাথের শিলাইদহের জমিদারি কুঠিতে জগদীশচন্দ্র প্রায়ই যান, বিশাল পদ্মা নদীর তীরে শস্যশ্যামল প্রান্তর, গ্রামের সরল মানুষজন দেখতে জগদীশচন্দ্রের কত ভাল লাগে, সেই কথা বলছিলেন তিনি। শুনতে শুনতে নিবেদিতার খুব লোভ হল। একসময় নিজে বলেই ফেললেন, সেখানে একবার আমি যেতে পারি না?

রবীন্দ্রনাথ বললেন, অবশ্যই যেতে পারেন। এই তো জগনীশ সস্ত্রীক আবার যাচ্ছেন আমার সঙ্গে, আপনি তখন যেতে পারেন। আমি আপনাকে আমন্ত্রণ জানাচ্ছি।

তখনই দিন-তারিখ ঠিক হয়ে গেল। নিবেদিতা যাবার জন্য কথা দিয়ে ফেললেন।

কয়েকদিন পর স্বামীজির সঙ্গে দেখা হলে নিবেদিতা উৎসাহের সঙ্গে এই প্রসঙ্গ তুললেন। তিনি কবির সঙ্গে শিলাইদহে গিয়ে গ্রাম বাংলার রূপ প্রত্যক্ষ করতে চান।

স্বামীজি কয়েক পলক চেয়ে থাকে বললেন, মার্গট, আমার শরীর ভাল যাচ্ছে না। আমেরিকায় গিয়ে চিকিৎসা করাতে হবে, ঠাণ্ডার দেশে গেলে আমি ভাল থাকি। তার চেয়েও বড় কথা, বেলুড় মঠ ও মিশনের জন্য টাকা তুলতে হবে। আমার শরীরের অবস্থা যাই হোক, ওখানে গিয়ে বক্তৃতা দিয়ে আবার টাকা তোলা যাবে। তুমি আমার সঙ্গে যাবে।

নিবেদিতা বললেন, সে কী, আপনার একারই তো যাবার কথা ছিল। আমার এখানকার কাজের কী হবে?

স্বামীজি বললেন, সে কাজ অন্যরা দেখবে। তোমাকে সঙ্গে নিয়ে যাওয়া বিশেষ দরকার। তুমি এখানকার আরব্ধ কাজের কথা বিদেশে প্রচার করবে। ওখানে তোমারও বক্তৃতার ব্যবস্থা করা হবে, এত বেশ কিছু টাকা উঠতে পারে। যাবার জন্য তৈরি হও।

একটু থেমে, কঠিন কন্ঠে তিনি আবার বললেন, ওদের সঙ্গে অত মেলামেশা করার কী দরকার? শিলাইদহের হুজুগ এখন বাদ দাও!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *