৪৮. কয়েকদিন হল শীত পড়েছে

কয়েকদিন হল শীত পড়েছে বেশ জাঁকিয়ে। এই গ্রীষ্ম প্রধান দেশে শীতকালটিতেই যেন প্রকৃতিকে পূর্ণ চোখ মেলে দেখা যায়। চোখ ভরে যায় আকাশের নীলিমায়, তাপহীন রোদ্দুর বড় প্রীতি দেয়। মহারাজ রাধাকিশোরমণিকা শীতকালটি বিশেষ পছন্দ করেন। দোতলার জানালার ধারে দাঁড়িয়ে তিনি সামনের দিঘিতে কয়েকটি হাসের জলক্রীড়া দেখছেন। কোন সুদূর অজানা দেশ থেকে এসেছে এই হাঁসগুলি, গ্রীষ্ম একটু চড়া হলেই আবার উড়ে চলে যাবে।

মহারাজ রাধাকিশোরের এই বাসস্থানটিকে রাজবাড়ি বলা যায় না, এমনকী প্রাসাদও নয়। সিংহাসনের উত্তরাধিকারী হয়েছেন, কিন্তু তাঁর কোনও রাজসভাগৃহ নেই। গত ভূমিকম্পে বিধ্বস্ত হবার পর তা মেরামত করার বদলে নয়া হাভেলিতে নির্মিত হচ্ছে নতুন রাজপ্রাসাদ। ইংরেজ স্থপতির পরিকল্পনায় সে অট্টালিকা হবে সত্যিকারের একটি দর্শনীয় বস্তু। রাজত্ব চালাতে গেলে রাজা-মহারাজাদের দুটি জিনিস অবশ্য দরকার। সাধারণ লোকেদের চেয়ে অনেক লম্বা একটি নাম আর অন্য সমস্ত প্রজার চেয়ে বড় একটি প্রাসাদ। রাজকোষের অবস্থা সঙ্গীন হলেও এই প্রাসাদ নির্মাণে কার্পণ্য করা যায় না। বস্তুত প্রাক্তন রাজবাড়ি থেকে বেশ কিছুটা দূরে আগরতলায় নতুন একটি রাজধানীই প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে, সে জন্য প্রয়োজন মতন রাস্তা-ঘাটও তৈরি করা দরকার। সে সব কাজ এখনও সম্পূর্ণ হয়নি, তাই আপাতত মহারাজ রাধাকিশোর রয়েছেন একটি দ্বিতল ভবনে, এখানে বসেই তিনি রাজকার্য পরিচালনা করেন।

মাথায় রাজমুকুট পরলে অনেক রকম সমস্যা তার ওপর চেপে বসে। ভূমিকম্পের ক্ষয়-ক্ষতি মেটাতে অর্থসঙ্কট লেগেই আছে, আত্মীয়স্বজনদের ঈষা-লোভ-ষড়যন্ত্র সম্পর্কে সব সময় সতর্ক থাকতে হয়, রাজকর্মচারীরা সব সময় দলাদলিতে মত্ত, তাদের সদলবলে সরিয়েও দেওয়া যায় না আবার খুব ঘনিষ্ঠ হতে দেওয়াও বিপজ্জনক। বড়ঠাকুর সমরেন্দ্রনাথ এখন সিংহাসনের দাবি ছাড়েননি, কে যে কখন তার দলে যোগ দিচ্ছে তা বোঝা দুষ্কর। ইংৱেঙ্করাও চাপ দিচ্ছে নানা রকম।

এতসব সমস্যা থাকতেও আজ সকালে রাধাকিশোরের মন প্রসন্ন আছে। ঘুম থেকে ওঠার পর কিছুক্ষণ প্রাতর্ভ্রমণ করে এসেছেন, শীতের বাতাসে শরীর বেশ চাঙ্গা হয়ে ওঠে, ক্ষুধা বৃদ্ধি হয়। রাধাকিশোর তাঁর পিতার মতন ভোজনরসিক নন, তিনি স্বল্পাহারী, এক একদিন সকালে কিছুই খেতে চান না, আজ তিনি দুটি কচুরি ও একটি সিদ্ধ ডিম তৃপ্তির সঙ্গে খেয়েছেন। তারপর তিনি একটি কয়েক মাসের পুরনো ভারতী পত্রিকা পাঠ করতে লাগলেন।

এই পত্রিকায় অধিকাংশ রচনাতেই রচয়িতার নাম থাকে না। তবে রাধাকিশোর জানেন, অনেকগুলিরই লেখক কবীন্দ্র রবীন্দ্রবাবু। তিনি কত কাজে ব্যস্ত থাকেন, তবু কী করে এত লেখা লেখেন, তা বড় বিস্ময়কর। এবং একই সঙ্গে কত রকম রসের রচনা। কোনওটি লঘু প্রণয় কাব্য, কোনটি ঈশ্বর-আরাধনা-গীতি, আবার হাস্যকৌতুক, রাজনৈতিক ভাষ্য ও গুরু প্রবন্ধ। পত্রিকার এক একটি সংখ্যায় কোন কোনটি রবীন্দ্রবাবু রচনা তা চিহ্নিত করা রাধাকিশোরের একটি প্রিয় খেলা।

এই সংখ্যায় ‘হতভাগ্যের গান’ কবিতাটি অশাই রবীন্দ্র বাবুর। লঘু ভঙ্গিতে লেখা, তির্যক বিদ্রুপে সমসাময়িক চিত্রটি নিপুণভাবে ফুটে উঠেছে।

বন্ধু,
কিসের তরে অশ্রু ঝরে
কিসের লাগি দীর্ঘশ্বাস
হাস্যমুখে অদৃষ্টেরে
করব মোরা পরিহাস।
রিক্ত যারা সর্বহারা
সর্বজয়ী বিশ্বে তারা
গর্বময়ী ভাগ্যদেবীর
নয়গো তারা ক্রীতদাস।…

পড়তে পড়তে একটি জায়গায় রাধাকিশোরের মনে হল, এ যেন তাঁরই নিজের কথা :

লুকোক তোমার ডঙ্কা শুনে
কপট সখার শূন্য হাসি
পালাক ছুটে পুচ্ছ তুলে
মিথ্যে চাটু মক্কা কাশী
আত্মপরের প্রভেদ ভোলা
জীর্ণ দুয়োর নিত্য খোলা
থাকবে তুমি থাকব আমি
সমান ভাবে বার মাস…

এমন কৌতুকচ্ছলে যিনি লিখতে পারেন, তিনি আবার আগের সংখ্যায় আর একটি কবিতা লিখেছেন, যা সুগম্ভীর, সুললিত কাব্য সমন্বিত :

ঐ আসে ঐ অতি ভৈরব হরষে
জলসিঞ্চিত ক্ষিতিসৌরভ-রভসে
ঘন গৌরবে নবযৌবনা বরষা
শ্যামগম্ভীর সরসা…

        আবার একটি গল্প লিখেছেন ‘ডিটেকটিভ’ নামে। ‘প্রসঙ্গ কথা’ ও ‘সাময়িক সাহিত্য’-এই লেখারও ভাষা দেখে মনে হল, রবীন্দ্রবাবুর না হয়ে যায় না। বাংলা ভাষায় এত বেশি রচনা কি আর কোনও লেখক লিখতে পেয়েছেন? স্বয়ং দেবী সরস্বতী কলমে ভর না করলে এমনটি হতে পারে না।

        রাধাকিশোর নিবিষ্টভাবে পড়ছিলেন, একজন ভৃত্য এসে জানাল যে, মহিম ঠাকুর দর্শনপ্রার্থী।

নীচের তলায় হলঘরটিতে রাধাকিশোর বাইরের লোকদের সঙ্গে দেখা করেন। কিন্তু মহিম ঘরের লোক। মহিমকে ওপরে নিয়ে আসার জন্য তিনি ভৃত্যকে আজ্ঞা দিলেন।

মহিমের হাতে কাগজে জড়ানো একটি বড় মোড়ক আর একটি লেফাফা। রাধাকিশোর কৌতূহলী হয়ে তাকাতেই, মহিম প্রণাম জানাবার পর মোড়কটি খুলে টেবিলের ওপর রাখলেন। তারপর বললেন, কবি রবীন্দ্র ঠাকুর মহাশয় এটি আপনার জন্য পাঠিয়েছেন।

রাধাকিশোর বললেন, আশ্চর্য ব্যাপার। এই মুহূর্তে আমি ওঁরই রচনা পাঠ করছিলাম। এটা কী?

বস্তুটি একটি সাদা রেশমের থান। খুব একটা মসৃণও নয়। কোন রাজাকে উপহার দেওয়ার মতন কিছু নয়, হঠাৎ রবিবাবু এটা পাঠালেন কেন! মহারাজের বিস্ময় টের পেয়ে মহিম বললেন, জিনিসটি দেখতে অতি সাধারণ বটে, আপনার যোগ্য নিশ্চয়ই নয়, কিন্তু এর বিশেষ মূল্য আছে। কবি আমাকে জানিয়েছেন, এটা দিশি রেশম। রেশমের কাপড়ের ব্যবসা সব ইংরেজদের হাতে, এখন আমাদের দেশের মানুষও কিছু কিছু রেশমের উৎপাদন করছে। ইংরেজদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নামতে হলে দেশীয় উৎপাদকদের উৎসাহ দেওয়া দরকার। কবি তাই রাজশাহির রেশম উৎপাদক সমিতির কাছ থেকে এই থান কিনে কিনে বন্ধুবান্ধবদের উপহার পাঠাচ্ছেন। এতে দেশজননীর স্পর্শ আছে।

রাধাকিশোর থানটি তুলে নিয়ে দেখলেন, তারপর মাথায় ঠেকিয়ে বললেন, যত দেখছি, যত শুনছি, ততই বিস্ময়ের অবধি থাকছে না। এতদিন আমরা জানতাম, কবিরা ঘরে বসে বসে প্রদীপের আলোতে পদ্য লেখেন, আর লোকজনকে তা শুনিয়ে আনন্দ পান। আর ইনি এত বড় কবি। দু’হান্তে গদ্য-পদ্য লিখছেন, থিয়েটার করছেন, গান গাইছেন, আবার জমিদারি চালাচ্ছেন, দেশের কথা চিন্তা করছেন। যে দু চারবার ওঁর সঙ্গে দেখা হয়েছে, উনি দেশের মানুষের কল্যাণ বিষয়ে আমাকে সচেতন করতে চেয়েছেন। মহিম, দেশ মানে কী, তা কি আমরা জানতাম? দেশ মানে শুধু ত্রিপুরা নয়, সমগ্র ভারতই আমার দেশ, এ দেশের সমস্ত মানুষই আমার স্বজাতি, এমন কথা আমি রবীন্দ্রবাবুরই কাছ থেকেই জেনেছি। তুমি ওঁকে আমার ধন্যবাদ জানিয়ে চিঠি লিখে দাও। আমরা, ত্রিপুরায় রেশমের চাষ করতে পারি না?

মহিম বলল, অবশ্যই পারি। কবি নিজেও নাকি শুরু করেছেন। এই ব্যাপারে একজন কোনও এক্সপার্টকে তা হলে আনতে হয়।

রাধাকিশোর বললেন, আনার ব্যবস্থা করো। আজ আমরা পরনের কাপড়টুকুর জন্যও ইংরেজনের ওপর নির্ভরশীল। তুমি কিংবা আমি যে বস্ত্র পরে আছি, এগুলি এসেছে ল্যাঙ্কাশায়ার থেকে। ছিঃ! এই রেশমের থান দিয়ে আমার কুর্তা বানাব। সেই কুর্তা পরে আমি লাটসাহেবের দরবারে যাব।

মহিম বলল, মহারাজ, কয়েকখানা পত্র সই করাবার ছিল!

রাধাকিশোর বললেন, আজ ওসব থাক। এই ‘ভারতী’ পত্রিকাখানা পড়ছি, অন্য কিছু পড়তে চাই না। আচ্ছা মহিম বলো তো, এ লাইনগুলি কার লেখা? ‘বঙ্কিমবাবুর উপন্যাসে ইতিহাস যদি বা বিপর্যস্ত হইয়া থাকে তাহাতে বঙ্কিমবাবুর কোনও খর্বতা হয় না। … অক্ষয়বাবু জিজ্ঞাসা করিতে পারেন যে, যদি ইতিহাসকে মানিবে না তবে ঐতিহাসিক উপন্যাস লিখিবার প্রয়োজন কী? তাহার উত্তর এই যে, ইতিহাসের সংস্রবে উপন্যাসের একটি বিশেষ রস সঞ্চার করে, ইতিহাসের সেই রসটুকুর প্রতি উপন্যাসিকের লোভ, তাহার সত্যের প্রতি তাঁহার কোনও খাতির নাই।‘…

মহিম বলল, এ লেখা আমি আগেই পড়েছি। ঐতিহাসিক অক্ষয়কুমার মৈত্র মহাশয় ‘বঙ্কিমচন্দ্র মুসলমান সম্প্রদায়’ নামে একটি প্রবন্ধ লিখেছিলেন, রবীন্দ্রবাবু তার সমালোচনা করেছেন। শুনেছি অক্ষয়কুমার রবীন্দ্রবাবুর বন্ধু লোক, কিন্তু ইতিহাসের তথ্যের ব্যাপারে বড় খুঁতখুঁতে, রবীন্দ্রবাবু এই প্রবন্ধের ব্যাপারে অক্ষয়বাবুকে সমর্থন করতে পারেননি।

রাধাকিশোর বললেন, এই পরের অংশটি শোনো, কী অপূর্ব ভাষামাধুর্য। ‘ইতিহাস-ভারতীর উদ্যানে চঞ্চলা কাব্য সরস্বতী পুস্পচয়ন করিয়া বিচিত্র ইচ্ছানুসারে তাহার অপরূপ বাবহার করিয়া থাকেন, প্রহরী অক্ষয়বাবু তাহা কোন মতেই সহ্য করিতে পারেন না– কিন্তু মহারানীর খাস হুকুম আছে।… ইহাতে ইতিহাসের কোন ক্ষতি হয় না, অথচ কাব্যের কিছু শ্রীবৃদ্ধি হয়।‘…

পড়া থামিয়ে রাধাকিশোর বললেন, মহিম, রবীন্দ্রবাবুকে একবার ত্রিপুরায় আনা যায় না? পিতাঠাকুরের আমলে, ওঁকে দু’একবার আনার কথা হয়েছিল, পিতাঠাকুরের সঙ্গে রবীন্দ্রবাবু দার্জিলিং গিয়েছিলেন, কিন্তু ওঁর ত্রিপুরায় আসা হয়নি।

মহিম উৎসাহের সঙ্গে বলল, ওঁকে একবার অবশ্যই আনা উচিত। আমাদের এখানে যারা গান-বাজনা আর কাব্য চর্চা করে, তারা অনেক উৎসাহ পাবে।

রাধাকিশোর বললেন, শুধু চিঠি লেখা শিষ্টাচারসম্মত হয় না, ওঁর কাছে গিয়ে আমন্ত্রণ জানানো উচিত।

মহিম মুখটা বাড়িয়ে বলল, আমি কলকাতায় চলে যাব? কালই উদ্যোগ করতে পারি।

রাধাকিশোর হেসে বললেন, তুমি তো কলকাতার নাম শুনলেই একেবারে পাঁচ হাতিয়ার বেঁধে তৈয়ার! কেন, আমি নিজে যেতে পারি না? এই শীতকালে কলকাতায় কত আমোদ-প্রমোদ হয়, সার্কাস, ম্যাজিক, সারা রাত্র ব্যাপি যাত্রা-থিয়েটার, কত কী দেখার থাকে। কলকাতায় দুশো মজা! হ্যাঁ হে মহিম, আর একটা অদ্ভুত কথা শুনলাম। কোন এক সাহেব নাকি এক আজব জিনিস দেখাচ্ছে, ছবি নড়া চড়া করে? ছবি দৌড়োয়? ছবির ঘোড়া সত্যি সত্যি ছোটে! এই আজগুবি বাপার কী করে সম্ভব?

মহিম বলল, এটা আমিও শুনেছি। আপনি তো ফটোগ্রাফি বিষয়ে জানেন। স্বর্গত মহারাজ ভাল ফটোগ্রাফার ছিলেন। দু’জন ফরাসি সাহেব ফটোগ্রাফ জুড়ে জুড়ে কীভাবে যেন সেগুলি চলন্ত করে দিয়েছেন। একে বলে সিনেমাটোগ্রাফি। ব্যাপারটা যে ঠিক কী করে সম্ভব, তা আমি বুঝি না, মহারাজ। অমৃতবাজার পত্রিকায় মাঝে মাঝে বিজ্ঞাপন দেখি। স্টিভেনসন নামে এক সাহেব বায়স্কোপ যন্ত্রে মানুষের নড়াচাড়ার ছবি দেখাচ্ছে স্টার থিয়েটারে। এক ইংরেজ বিবির নাচও দেখাচ্ছে সেই ছবিতে।

রাধাকিশোর কিছুটা অবিশ্বাসের সুরে বললেন, তার মানে কী হল? আমি এখানে এই চেয়ারে বসে আছি, ওই বায়স্কোপে যদি আমার ছবি দেখানো হয়, আমি নিজেই নিজেকে দেখব? এ কী কখনও হতে পারে?

মহিম বলল, কেন মহারাজ, আমরা কি আয়নায় দেখি না? একটা মস্ত বড় আয়না হলে নিজেদের লাফানো ঝাঁপানো, নাচও দেখতে পারি। ধরে নিন সে রকম একটা ব্যাপার।

রাধাকিশোর প্রবলভাবে মাথা নেড়ে বলেন, না, এ তুলনাটা ঠিক হল না। আয়নায় শুধু ঘটমান বর্তমান দেখা যায়। অতীত কি কেউ দেখতে পারে? এই বায়স্কোপের ছবি যেদিন তোলা হল, তার এক মাস পরেও আমি দেখতে পাব সেই ছবি। ধরো, আমি বসে আছি, এই ঘরের মধ্যে, ছবি তোলা হয়েছিল কলকাতায় গড়ের মাঠে, এখানে বসে আমি দেখতে পাব যে, আমি কলকাতায় হেঁটে চলে বেড়াচ্ছি। একই সঙ্গে নিজের দ্বৈত সত্তা?

মহিম বলল, শুধু তাই নয়, মহারাজ। মনে করুন, এই যে নর্তকী বিবির ছবি তোলা হয়েছে, দুচারদিন পরে সে কোন দুর্ঘটনায় মারা গেল। তবু বায়স্কোপে দেখা যাবে, সে হাসি মুখে জ্যান্ত অবস্থায় নেচে চলেছে।

রাধাকিশোর বললেন, ছবিতে মরা মানুষকে জীবন্ত করে রাখছে? মাথাটা যে গুলিয়ে যাচ্ছে হে! থমকে যাবে মহাকাল?

মহিম বলল, বিজ্ঞানের যুগ এসে গেছে। বিজ্ঞান সব অত্যাশ্চর্য কাণ্ড ঘটাচ্ছে, মহারাজ। গত বর্ষাকালে আমি কলকাতায় গেসলাম, তখন আরও একটা অদ্ভুত কাণ্ড প্রত্যক্ষ করে এসেছি। কিছু কিছু বড় মানুষের বাড়িতে বিজলি বাতি জ্বলছে। আগুন জ্বলতে হয় না, বাতি জ্বলে। গ্যাসের বাতি জ্বালাতেও তো আগুন ধরাতে হয়, এই আলোয় আগুনের কোনও কারবারই নেই। কাচের ডুমের মধ্যে আলো জ্বলে, সেই ডুমে হাত দিলেও হাত পোড়ে না, এর নাম ইলেকট্রিসিটি। রেড়ির তেলের প্রদীপ, মোমবাতি কিংবা গ্যাসের বাতি এক সময় নিবে যায়। কিন্তু এই বিজলি সারা রাত্রি জ্বলে, এর কোনও লয় ক্ষয় নেই।

রাধাকিশোর বললেন, আর একটু ভাল করে বুঝিয়ে দাও তো। তেল দিতে হবে না, গ্যাস দিতে হবে না, নিজে নিজে জ্বলবে? এই আলো মধ্যে আগুন নেই?

মহিম বলল, আমি নিজের চক্ষে দেখে এসেছি, মহারাজ।

রাধাকিশোর কললেন, তা হলে আমার কলকাতা যাওয়ার ব্যবস্থা করো। আমি নিজের চক্ষে এসব দেখতে চাই। রবীন্দ্রবাবুর বন্ধু জগদীশ বসু মহাশয় মস্ত বড় বিজ্ঞানী, তাঁর কাছে সব বুঝে নিতে হবে। বিজ্ঞান যে ভেলকি দেখাচ্ছে হে!

মহিম বলল, সেই ভাল মহারাজ, চলুন, দিন কতক কলকাতায় গিয়ে থেকে আসা যাক। আমাদের তো বাড়ি পড়েই আছে। হাইকোর্টে মামলারও তদারকি করা দরকার। তার আগে এখানকার রাজ সরকারের কিছু কিছু কাজ সেরে নিলে ভাল হয়।

রাধাকিশোর বললেন, কাল থেকে বসব। আজ কী চিঠি সই করতে হবে বলছিলে, দাও।

চিঠিখানি পড়ত পড়তে বিরক্তিতে মহারাজের ভুরু কুঁচকে গেল। সেটা ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে বললেন, অপদার্থের দল। এ চিঠি কে মকশো করেছে?

মহিম লল, আজ্ঞে, চিঠিখানি ড্রাফট করেছেন সচিব মশাই। ভুল নেই তো কিছু, আমি পড়ে দেখেছি। আর একবার পড়ে আপনাকে বুঝিয়ে দেব?

রাধাকিশোর রক্ত চক্ষে বললেন, না, বোঝাতে হবে না। এ চিঠি লেখা হচ্ছে, আনন্দমোহন বসুকে। তিনি বাঙালি, না বাঙ্কালি নন? তাঁকে ইংরাজিতে চিঠি লেখা হবে কেন?

মহিম বলল, কিন্তু মহারাজ, উকিল ব্যারিস্টাররা তো ইংরাজি ছাড়া কথা বলেন না। তাদের তো ইংরাজিতেই সব কিছু–

রাধাকিশোর বললেন, তা তেনারা ইংরাজি বলুন আর ফার্সিই বলুন, তাতে আমাদের কী আসে যায়। আমাদের রাজ দরবার থেকে যত চিঠি আবে, সব বাংলাতেই যাবে। তেনারা পড়তে না পারেন, কেরানি মুনশিদের দিয়ে পড়িয়ে নেবেন। আমার পিতাঠাকুর এই রাজো বাংলা প্রবর্তন করেছিলেন, তার থেকে আমরা বিচ্যুত হব না। আমি লক্ষ করছি, আমার আমলা-কর্মচারীর অনেকেই ইদানীং ইংরাজি-মিশেল দিয়ে কথা বলে। শুনলে আমার গা জ্বলে যায়। দু’পাতা ইংরাজি পড়েই বাংলা ভুলে যাবে? তুমিই বা চিঠি ড্রাফট করা বললে কেন? চিঠি মুসাবিদা বলা যায় না? ওই যে মনুজেন্দ্র নামে নতুন লোকটি এসেছে কলকাতা থেকে, সে আমাকে বারবার মহারাজ না বলে মহারাজা বলে সম্বোধন করে। তার ভুলটা ধরে নিতে পারো না!

ধমক খেয়েও মহিম ঠিক বুঝতে পারল না, এই সম্বোধনে ভুল কোথায়!

রাধাকিশোর আবার বললেন, তুমিও বুঝি জানো না? এই তোমার বিদ্যার দৌড়! রাজা থেকে মহারাজ, যেমন অধিরাজ, সামন্তরাজ; ইংরেজরা ইংরিজি অক্ষরে লেখার সময় শেষ কালে একটা এ অক্ষর জুড়ে দেয়। তাই দেখে দেখে দেশের লোকরাও ব্যাকরণ ভুলে গিয়ে মহারাজা বলতে শুরু করেছে। এরপর কি ইংরাজি বানান অনুসারে রাম হয়ে যাবেন রামা, আর কৃষ্ণ হয়ে যাবেন কৃষ্ণা?

মহিম মাথা নিচু করে রইল। মহারাজার বাংলা সম্পর্কে স্পর্শকাতরতা সে জানে। কিন্তু আজকাল কথায় কথায় কিছু ইংরেজি শব্দ এসেই যায়। কলকাতা শহরে অধিকাংশ শিক্ষিত লোকই তো পুরো পুরো ইংরেজি বাক্য হলে, কিংবা ইংরেজি-বাংলায় জগাখিচুড়ি করে।

রাধাকিশোর বললেন, সকলকে বলে দেবে, ত্রিপুরা রাজসভায় একমাত্র ভাষা বাংলা, আমরা বাংলা ভাষার সেবক। যে যত ইচ্ছা ইংরেজি শিখুক কিন্তু রাজকার্যে সর্বদা বাংলা ভাষার ব্যবহার করতে হবে। আর আমার সামনে কেউ যেন ইংরাজি শব্দ ব্যবহার না করে। যাও, এই চিঠি আবার বাংলায় লিখে নিয়ে এসো।

মহিম বিদায় নিতে উদ্যত হলে রাধাকিশোর আবার ডেকে বললেন, দাঁড়াও! তোমাকে রূঢ় কথা বলে ফেলেছি, কিছু মনে কোরো না। তুমি আমার সুহৃদ। তোমার ওপরে আমি অনেক ব্যাপারেই নিৰ্ভর করি। মহিম, আমি লক্ষ করছি, নতুন নতুন যে-সব কর্মচারী নিযুক্ত হচ্ছে, তারা বাংলা ভাষার ওপর শ্রদ্ধাহীন। বিদ্যালয়ে মন দিয়ে বাংলা শেখেইনি। পাচ লাইন শুদ্ধ বাংলা লিখতে জানে না। আমার সব আমলা-কর্মচারীদের বাধামূলকভাবে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য কিছুদিন উত্তমরূপে শেখাবার ব্যবস্থা করলে কেমন হয়?

মহিম বলল, আপনি ঠিকই বলেছেন। অনেকেরই বাংলা জ্ঞান পোক্ত না। ছ’ মাসের জন্য ভাষা প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করলে ভালই হবে। এর জন্য কিন্তু উপযুক্ত শিক্ষক নিযুক্ত করতে হবে।

রাধাকিশোর বললেন, তুমি সে রকম কিছু শিক্ষকের সন্ধান করো। এই ত্রিপুরা রাজ্যে শিক্ষার প্রসারের দিকে মন দিতে হবে। আমি একটি মহাবিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার কথা চিন্তা করছি কিছু দিন ধরে। রাজকুমারদের শিক্ষার দিকটাও নজর দেয়া দরকার। আচ্ছা মহিম, তোমার শশিভূষণ সিংহের কথা মনে আছে? পিতাঠাকুরের সামলে তিনি কুমারদের শিক্ষক ছিলেন। অতি সজ্জন ব্যক্তি। ইংরাজি ও বাংলা দুটি ভাষাতেই তাঁর অগাধ জ্ঞান ছিল।

মহিম বলল, হ্যাঁ মহারাজ, তাঁর কথা আমার মনে আছে। এ রাজ্য ছেড়ে চলে যাবার পরেও তার সঙ্গে আমার দুএকবার দেখা হয়েছে।

রাধাকিশোর জিজ্ঞেস করলেন, তাঁকে ফিরিয়ে আনা যায় না?

মহিম বলল, না, তা বোধকরি সম্ভব হবে না। শশিভূষণ সিংহ ত্রিপুরা রাজ্যটিকে ভালবেসেছিলেন। এখানকার মানুষজন ও সংস্কৃতি সম্পর্কে তাঁর বিশেষ আগ্রহ ছিল। কিন্তু তিনি আর কখনও ত্রিপুরায় ফিরে আসতে চান না। স্বর্গত মহারাজ বীরচন্দ্ৰমাণিক্য জীবিত থাকতে শশিভূষণ সিংহের সঙ্গে আমার কিছু কিছু কথা হয়েছিল। কোনও একটি ঘটনায় ত্রিপুরা রাজবংশের ওপর তার সাংঘাতিক বিরাগ জন্মে গেছে।

রাধাকিশোর আগ্রহের সঙ্গে বলেন, কী ঘটনা, শুনি শুনি!

মহিম বলল, তিনি যা বলেছিলেন, তা যদি সত্য হয়, তবে তা আপনার সম্মুখে উচ্চারণ করা কিছুতেই উচিত হবে না।

রাধাকিশোর ভ্রূকুঞ্চিত করে বললেন, কী এমন ঘটনা হতে পারে? মহিম, আমি কৌতূহল দমন করতে পারছি না। তুমি আমাকে সবিস্তারে সব খুলে বল।

মহিম তবু ইতস্বত করতে লাগল।

রাধাকিশোর উঠে এসে মহিমের কাঁধ ছুয়ে বললেন, তুমি আমাকে ভয় পাচ্ছ? কেন? সত্য কথাকে তো আমি ভয় পাই না। শশিভূষণ মাস্টারের সঙ্গে আমার কখনও বিরোধ হয়নি। তিনি আমার সম্পর্কে কী এমন কঠোর অভিযোগ আনতে পারেন? তুমি জানো, তোমার পরামর্শ ছাড়া আমার চলে না। তুমি আমাকে যে-কোনও কথাই বলতে পারো। বলো।

মহিম মুখ নিচু করে বলল, শশিভুষণ মাস্টারের ধারণা, আপনি ভরতকে হত্যা করার জন্য ঘাতক নিযুক্ত করেছিলেন।

রাধাকিশোর স্তম্ভিত হয়ে গেলেন। রক্তশূন্য মুখে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন মহিমের দিকে। তারপর অস্ফুট স্বরে বললেন, ভরত! ভরত কে?

মহিম বলল, সে আপনাদের এক ভাই ছিল। শশিভূষণ মাস্টারের প্রিয় ছাত্র, খুব মেধাবী।

রাধাকিশোর দূরের দৃশ্য দেখার মতন অন্যমনস্ক কণ্ঠে বললেন, ও হ্যাঁ, হ্যাঁ, মনে পড়েছে বটে, রাধারমণ ঘোষ মশাইয়ের বাড়ির একখানা ঘরে থাকত। লেখাপড়ায় মন ছিল, মাস্টারের কাছে সে মাঝে মাঝে একাই পড়তে যেত। হা ভাবান, আমি নিজের হাতে কোনও দিন একটা পক্ষীও মারিনি, রক্ত দেখলে আমার মাথা ঝিমঝিম করে। আমি সেই নিরীহ ছেলেটিকে হত্যা করব কেন? আমার সঙ্গে বোধকরি জীবনে সে একটা কথাও বলেনি। তাঁর সঙ্গে আমার কীসের শক্রতা!

মহিম বলল, সে সময় যুবরাজ হিসেবে প্রাসাদের দেহরক্ষী বাহিনীর অধিকর্তা ছিলেন আপনি। আপনার অজ্ঞাতসারে কেউ কি ভরতকে খুন করার দায়িত্ব নিতে পারে?

রাধাকিশোর অসহায়ভাবে বললেন, মহিম, আমি গীতা ছুঁয়ে শপথ করে বলতে পারি, এ ব্যাপারে বিন্দু-বিসর্গও আমি জানতাম না। তাকে আমি খুন করব কেন! সে তো আমার সঙ্গে কোনও শত্রুতা করেনি। আমার রাজত্বে ভাগ বসাবারও তার কোনও অধিকার ছিল না।

মহিম বলল, আপনার পিতা সেই সময় আর একটি বিবাহ করেছিলেন মনে আছে? সেই বিবাহের ব্যাপারে ভরতকে নিয়ে কিছু জটিলতা সৃষ্টি হয়। ভরত নাকি নিজের অধিকার লঙ্কনের চেষ্টা করেছিল। আপনার পিতাকে খুশি করার জনা আপনি চিরতরে ভরতকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দিতে চেয়েছিলেন।

রাধাকিশোর ললেন, সে বিবাহের সময় আমার নিজেরই যথেষ্ট ভয়ের কারণ ঘটেছিল। ভরতের অস্তিত্ব সম্পর্কেই আমার কোনও খেয়াল ছিল না। ভরতকে নিয়ে কী জটিলতার সৃষ্টি হয়েছিল তাও আমি জানি না। মহিম, তুমি বিশ্বাস করো আমি এই ভরতের ঘাতক?

মহিম দৃঢ় স্বরে বলল, না মহারাজ, আমি বিশ্বাস করি না। এটা শুধু আপনাকে তোষামদের কথা নয়। সিংহাসন অটুট রাখতে গেলে কিছু কিছু লোককে সরিয়ে দিতেই হয়। রাজনীতিতে মায়াদয়া অনেকটা আপেক্ষিক ব্যাপার। কিন্তু আমি আপনাকে বাল্যকাল থেকেই তো দেখছি। আপনার মন বড় কোমল, রক্তারতিতে আপনার একেবারেই রুচি নেই। কিছুটা থাকলে বরং আপনি নিষ্কন্টক হতে পারতেন। ভরতের মতন সামান্য একটি প্রাণীকে হত্যার ব্যাপারে সম্মতি জানানো আপনার পক্ষে অসম্ভব। নিশ্চয়ই অন্য কোনও সুড়যন্ত্র ছিল এবং ইঙ্গিতটা ছিল আপনার দিকে, যাতে এ ব্যাপারে কোনও তদন্ত না হয়।

রাধাকিশোর বললেন, ভরতকে আর দেখিনি বটে, তাকে নিয়ে মাথাও ঘামাইনি। একবার শুধু ভেবেছিলাম, সে কাছুয়ার সন্তান, রাজকুমারদের ভাতা পাবারও অধিকারী নয়, তাই লেখাপড়া শিখে সে এ রাজ্য ছেড়ে চলে গেছে জীবিকার সন্ধানে। সেটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। আহা, ছেলেটাকে কে মারল? এতদিন পর তা কি জানার উপায় আছে? শশিভূষণ মাস্টার আমার সম্পর্কে এই ধারণা করে রেখেছেন, পৃথিবীতে একজন মানুষই বা বিনা অপরাধে আমাকে খুনি ভাববে কেন?

হঠাৎ, আর একটা কথা মনে পড়ায় তিনি ব্যস্ত হয়ে বললেন, মহিম, মহিম বঙ্গবাসী পত্রিকায় যিনি মাঝে মাঝে নিবন্ধ লেখেন, সেই শশিভূষণ সিংহ আর আমাদের মাস্টারমশাই কি একই ব্যক্তি?

মহিম বলল, খুব সম্ভবত একই। ওই লেখায় মাঝে মাঝেই ত্রিপুরার প্রসঙ্গ থাকে।

রাধাকিশোর বললেন, কী সর্বনাশ! যদি কখনও এই কাহিনী লেখেন! লোক চক্ষে আমি হেয় হয়ে যাব। বঙ্গবাসী পত্রিকা এিপুরা রাজ্যের শাসন ব্যবস্থার ছিদ্রান্বেষণে খুব উৎসাহী। জুম চাষ নিয়ে একবার কত বিদ্রুপ করেছিল মনে সেই? মহিম, যেমন করে পারো, শশিভূষণ সিংহকে খুঁজে বার করো। তার ভুল ভাঙাতেই হবে।

এক সপ্তাহের মধ্যে সপারিষদ মহারাজ রাধাকিশোর চলে এলেন কলকাতায়। প্রথমেই জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে দূত পাঠালেন, কিন্তু কবি রবীন্দ্রবাবু বর্তমানে শিলাইদহে রয়েছেন, অচিরে তাঁর সঙ্গে দেখা হবে না। রবীন্দ্রনাথের মাধ্যমেই রাধাকিশোর কলকাতার বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে পরিচিত হচ্ছেন, তিনি স্বয়ং কারুর সঙ্গে যোগাযোগ করতে সংকোচ বোধ করেন, সুতরাং রবীন্দ্রবাবুর ফেরার অপেক্ষায় থেকে তিনি অন্য কাজে মন দিলেন। মহিমকে তিনি সারাক্ষণ উত্যক্ত করেন শশিভুষণ সিংহকে একদিন এই সার্কুলার রোডের বাড়িতে নিয়ে আসার জন্য।

শশিভূষণের ঠিকানা সংগ্রহ করা কঠিন হল না, বঙ্গবাসী পত্রিকার কার্যালয় থেকেই পাওয়া গেল।

চন্দননগরে পাকাপাকি বসতি নিয়েছেন শশিভূষণ, একটি স্কুল ঢাগান, পর-পত্রিকায় মাঝে মাঝে লেখালেখি করেন। জীবিকার জন্য ব্যবসা-বাণিজ্য বা কোনও চাকরি গ্রহণ করেননি, জমা টাকা ব্যাঙ্কে লগ্নি করেছেন, যা সুদ পান তাতেই স্বচ্ছন্দে সংসার চলে যায়। ফটোগ্রাফি চর্চার বিলাসিতা আর নেই। শশিভূষণের বর্তমান চেহারায় আগেকার সেই ছিপছিপে সুদর্শন মানুষটিকে খুঁজে পাওয়া যাবে না। শরীর এখন ভারী হয়ে গেছে, কপাল প্রশস্ত হতে হতে পৌছে গেছে মাথার অর্ধেক পর্যন্ত, বাকি চুলে যেন পাউডারের ছোপ লেগেছে। বন্ধুর দু-এক আগে চন্দননগর স্টেশনে ট্রেন থেকে নামতে গিয়ে প্লাটফর্মে আছাড় খেয়ে পড়ে যান, বা পায়ের মালাইচাকি ঘুরে গিয়েছিল, সেই থেকে ওই পায়ে আর জোর পান না, একটা হাঙরমুখো ছড়ি তাঁর সঙ্গে থাকে সব সময়।

চেহারায় পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে মানসিক পরিবর্তন ঘটে গেছে অনেকখানি। পা ভাঙা অবস্থায় যখন শয্যাশায়ী থাকতে হয়েছিল প্রায় মাস দু-এক, সেই সময় শশিভূষণ বারবার নিজের জীবন পর্যালোচনা করেছেন। তারই মধ্যে একদিন তার মনে প্রশ্ন জাগল, ভূমিসুতার জন্য তিনি অমন পাগল হয়েছিলেন কেন? সমস্ত যুক্তিবোধ ও কাণ্ডজ্ঞান বিসর্জন দিয়ে তিনি ভূমিসুতাকে পেতে চেয়েছিলেন। কিন্তু অর্থবল, সামাজিক প্রতিষ্ঠা এমনকী জাতিভেদের সংস্কার বর্জিত ঔদার্য দেখিয়েও যে রমণীর প্রেম পাওয়া যায় না, তা কি তিনি জানতেন না? এত কাব্য-সাহিত্য পাঠ তা হলে বৃথা।

বেশ কয়েক বছর ধরে শশিভূষণ অবুঝ ছিলেন। বেচারি ভরতের চালচুলো ছিল না। পিতৃ-পরিচয় ছিল না, জীবনের স্থিরতা ছিল না, সে শুধু পেয়েছিল ভূমিসূতার প্রেম, সেটুকুও সহ্য করতে পারেননি শশিভুষণ। ভরতের সঙ্গে তার স্নেহ-দয়া-মায়ার সম্পর্ক এক নিমেষে উবে গেল, সে হয়ে উঠল তার দু’চক্ষের বিষ। জীবনে আর তার মুখ দর্শন করবেন না বলে প্রতিজ্ঞা করেছিলেন, অথচ ভরতের কী দোষ ছিল?

ভূমিসুতাকে তিনিও পাননি, ভরতও পায়নি। সেই ভূমিসুতাই যে নাম বদল করে থিয়েটারের অভিনেত্রী হয়েছে, সে খবরও এক সময় জেনে গিয়েছিলেন শশিভূষণ। তিনি দুটি সন্তানের জনক, তাঁর কোমল স্বভাবা স্ত্রী সংসারটিকে সুশ্ৰী করে রেখেছেন, পাড়া প্রতিবেশীরা তাঁকে অতি ভদ্র ও রুচিবান গৃহস্থ হিসেবে জানে, কিন্তু তার বুকের মধ্যে যে এখনও ভূমিসুতাকে পাবার তীব্র বাসনা ধক ধক করে, তা কেউ টের পায় না। ভূমিসুতা অভিনীত একই নাটক তিনি বারবার দেখতে গেছেন। আর কোনও অভিনেতা-অভিনেত্রীর সংলাপ তার কানে যায়নি, নাটকের কী কাহিনী তা তিনি গ্রাহ্য করেননি, প্রথম সারির মাঝখানে দর্শকদের আসনে বসে শশিভুষণ এক দৃষ্টিতে চেয়ে থাকতেন ভূমিসুতার দিকে। দীর্ঘশ্বাসের সঙ্গে তাঁর বারবার মনে হত, এই রমণীকে পেলে তার জীবনে অন্য রকম হয়ে যেতে পারত। শান্ত ভদ্র গৃহস্থ নয়, তিনিও হতে পারতেন এক উদ্দাম শিল্পী।

থিয়েটারের রমণীদের কোনও না কোনও ধনী ব্যক্তি দখল করে রাখে। সে-রকম কারুর রক্ষিতা হয়েও তাদের থাকে আর একজন গোপন পিরিতের মানুষ। যে-সব মঞ্চনারী কিছুটা তেজস্বিনী হয়, তারা একজনের অধীনে বেশিদিন থাকে না, মাঝে মাঝে বাবু বদলায়। সুন্দরী নৃত্য-গীত পটীয়সীদের বারাঙ্গনা হওয়াই নিয়তি। শশিভূষণ গোপনে খোঁজখবর নিয়ে জেনেছিলেন, ভূমিসুতা ওরফে নয়নমণি কোনও বড় মানুষেরই বশীভূত নয়, ভরতও ধারে কাছে কোথাও নেই। কোনও পুরুষই ভুমিসুতার কাছে ঘেষতে পারে না। একদিন শশিভূষণ শো-এর শেষে মঞ্চের পিছনে গিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন।

ভূমিসুতাকে ঠিক কী বলবেন তা ভেবে যাননি। ভুমিসূতা তাঁকে দেখে কী রকম ব্যবহার করবে, সেটাই জানতে চেয়েছিলেন। অমর দত্তর স্টেজের খুব রমরমা, তার নায়িকা নয়নমণি সত্যিই বহু দর্শকের নয়নমণি, তার অঙ্গুলিহেলনে বহু পুরুষ ছুটে আসবে, এতদিন পর সুযোগ পেয়ে ভূমিসুতা অনায়াসেই শশিভূষণকে অপমান করে তাড়িয়ে দিতে পারে। গ্রিনরুমের দরজার কাছে শশিভূষণকে দেখে ভূমিসুতা থমকে দাঁড়াল, না-চেনার ভান করল না, উদ্ধত ভঙ্গিতে মুখ ফিরিয়ে নিল না, আস্তে আস্তে বসে পড়ল হাঁটু গেড়ে। অঙ্গে জরির পোশাক, মুখে রাজনন্দিনীর মেক আপ, খোপায় মুক্তোর মালা জড়ানো, তবু শশিভূষণের পায়ের কাছে মাটিতে মাথা ঠেকিয়ে সে প্রণাম জানাল। শশিভূষণ কেঁপে উঠছিলেন, তাঁর মুখ নিয়ে একটি বাক্যও নিঃসৃত হয়নি, হঠাৎ চক্ষু জ্বালা করে উঠেছিল। এতকালের অবরুদ্ধ বাসনার বেগ তিনি সামলাতে পারছিলেন না। সেই অবস্থা ভূমিসুতার কাছ থেকে গোপন করার জন্য তিনি দ্রুত সেখান থেকে প্রস্থান করেছিলেন।

তারপর থেকে শশিভূষণ ভাবতেন, চেষ্টা করলে ভূমিসুতার সঙ্গে দেখা করা যায়, সে অপমান করে ফিরিয়ে দেবে না, কিন্তু তিনি তাকে কী বলবেন? কী চাইবেন তার কাছে। সে বিষয়ে কিছুতেই মনস্থির করতে পারেননি বলে শশিভূষণ আর ভূমিসুতার জন্য মঞ্চের পেছন দিকে যাননি, কিন্তু দর্শকের আসনে নিয়মিত বসতেন। পা ভাঙার সময় একদিন লাঠিতে ভর দিয়ে স্নানের ঘরে যেতে যেতে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে তিনি নিজের দিকে তাকিয়ে বললেন, ওকে আমি কী বলব? আয়নার মুখখানিতে পাঁচ দিনের না কামানো খোঁচা খোঁচা কাঁচা-পাকা দাড়ি, চোখ দুটি ফোলা ফোলা, মধ্য বয়সের ছাপ অতি স্পষ্ট। আর মঞ্চে সেই নারী এখন যৌবনের প্রতিমূর্তি। শশিভূষণ বললেন, ওকে কি আমি বলতে পারি, এই স্ত্রী-পুত্র-কন্যা সমেত সংসার ছেড়ে আমি তোমার কাছে চলে আসতে চাই! কিংবা এ সবও রইল, গোপনে তুমি আমাকে তোমার শয্যার অংশীদার করে নাও।

আয়নায় সেই মুখখানি হাসতে আরম্ভ করেছিল। কী অদ্ভুত, অবাস্তব শোনাচ্ছিল কথাগুলি। একা একা বেশ কিছুক্ষণ তিনি হাসলেন, ঘাম দিয়ে জ্বর ছেড়ে যাওয়ার মতন সেই থেকে তাঁর ভূমিসূতার ঘোর কেটে গেল। ভূমিসূতাকে নিয়ে তিনি একটা স্বপ্ন দেখেছিলেন, সেই স্বপ্ন বেশিদিন টেনে নিয়ে যাওয়া যায় না, বয়েস যে কারুকে ক্ষমা করে না।

তারপর থেকে আর থিয়েটার দেখতে যান না শশিভুষণ, কোনও থিয়েটারই না। ঘোর কেটে যাবার পর মনে বেশ একটা প্রশান্তি এসেছে। ভরতকেও তিনি ক্ষমা করে দিয়েছেন। এখন একবার ভরতের সঙ্গে দেখা হলে তাকে বক্ষে জড়িয়ে ধরতেন। কিন্তু কোথায় ভরত!

মহিম ঠাকুর যখন চন্দননগরে দেখা করতে এসে একবার মহারাজ রাধাকিশোরের সন্নিধানে যাবার জন্য অনুরোধ জানাল, শশিভূষণ সে প্রস্তাব হেসে উড়িয়ে দিলেন। তিনি বললেন, মহিম, আমি ছিলাম বর্তমান মহারাজের বাবার কর্মচারী, ইনি তখন ছিলেন রাজকুমার, আমার কাছে দুচারবার পড়া জানতেও এসেছিলেন, এক হিসেবে তিনি আমার ছাত্র, তখন তুমি বলতাম, এখন তার সামনে গিয়ে আপনি-আজ্ঞে করে কুর্নিশ জানাতে পারব না।

মহিম বলল, সে সব নাহয় নাই করলেন। মহারাজ নিছক প্রথার ওপর জোর দেন না।

শশিভুষণ বলেন, তা বললে কী হয়! সিংহাসনের অধিকারী একটা সম্মান তো অবশ্যই প্রাপ্য। এ ছাড়া ওসব পর্ব আমার জীবন থেকে চুকে গেছে। আর গিয়ে কী হবে?

মহিম আসল কথাটাই জানাল না। বিনীতভাবে বলল, আপনি পত্রপত্রিকায় মাঝে মাঝে ত্রিপুরার প্রসঙ্গ লেখেন, তাতে মহারাজ বিশেষ সন্তুষ্ট। এখানকার অনেকেই তো বিপুরা রাজ্য বিষয়ে বিশেষ কিছুই জানে না, মনে করে ওটা একটা পাণ্ডববর্জিত দেশ। মহারাজ সেই বিষয়েই আলোচনা করতে চান, আর আপনার ওপর কখনও যদি অবিচার হয়ে থাকে, মহারাজ তারও প্রতিকার করবেন।

শশিভুষণ হাসলেন। বললেন, হুঃ, অবিচার যদি কিছু হয়েও থাকে, মহারাজ এতদিন পর তার কী প্রতিকার করবেন। তা ছাড়া অবিচারের প্রশ্ন ওঠে না, মহারাজ বীরচন্দ্রমাণিক্যের কাজে আমি স্বেচ্ছায় ইস্তফা দিয়েছি। কেউ বাধ্য করেনি।

মহিম তবু বলল, আপনি বর্তমানে কোনও কর্মে যুক্ত নন। আমাদের রাজ সরকার থেকে কেউ অবসর নিলে তাঁকে মাসোহারা দেয়ার ব্যবস্থা আছে। মহারাজ সে ব্যাপারেও—

তাকে আমিয়ে দিয়ে শশিভূষণ বললেন, ঈশ্বরের আশীর্বাদে আমি পৈতৃক সম্পত্তির যা ভাগ পেয়েছি, তাতেই আমার বাকি জীবন কেটে যাবে। আমার প্রয়োজন তেমন বেশি নয়। তুমি। বোধহয় জানো না, ত্রিপুরায় যে আমি শিক্ষকতা করতে গিয়েছিলাম, তা জীবিকার জন্য নয়, সেটা ছিল আমার শখ। মহারাজকে বোলো, রাজ্যে তো গরিব দুঃখীর অভাব নেই, আমাকে যা দিতে চান তা যেন ওদের মধ্যে বিলিয়ে দেন।

মহিমের কাছে সব বৃত্তান্ত শুনেও রাধাকিশোর নিরস্ত হলেন না। তিনি বললেন, শশিভূষণ মাস্টার যদি আসতে না চান, আমি যাব তাঁর কাছে। তোমরা সেই ব্যবস্থা কর।

কিন্তু সেটাও সম্ভব নয়। একজন রাজার পক্ষে অনাহূতভাবে কোনও প্রাক্তন কর্মচারীর বাড়ি যাওয়া শোভা পায় না। তা ছাড়া শশিভূষণ থাকেন ইংরেজ রাজত্বের বাইরে, ফরাসডাঙ্গায়। হুট করে সেখানে যাওয়াটা সুনজরে দেখবে না ইংরেজ সরকার। যত ছোটই রাজ্য হোক, তবু রাধাকিশোর সেখানকার স্বাধীন রাজা তো বটে। ফরাসি এলাকায় যেতে হলে তাঁর মান-মর্যাদা সহকারেই যাওয়া উচিত।

মহিম নিজ বুদ্ধিবলে এর পরেও উভয়ের সাক্ষাৎকারের একটা ব্যবস্থা করে ফেলল।

শশিভূষণ বঙ্গবাসী পত্রিকার কার্যালয়ে মাঝে মাঝে রচনা জমা দিতে আসেন। সেখানে কিছু সাহিত্যিকের সঙ্গে গল্পগুজবও হয়। একদিন সন্ধ্যাকালে বঙ্গবাসী দফতর থেকে বেরিয়ে শশিভূষণ দেখলেন, সামনের রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে মহিম। পাশের একটি জুড়িগাড়িতে মহারাজ রাধাকিশোর উপবিষ্ট।

রাজারা কারুর পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করেন না। রাধাকিশোর গাড়ি থেকে নেমে সসম্মানে হাত জোড় করে বললেন, নমস্কার মাস্টারমশাই!

শশিভূষণও প্রতিনমস্কার জানিয়ে বললেন, মহারাজের জয় হোক। আপনার সর্বাঙ্গীণ কুশল তো?

রাধাকিশোর বললেন, মাস্টারমশাই, আগে আপনি আমায় তুমি বলে সম্মোধন করতেন। আমি তো আগের সেই রাধাকিশোরই আছি।

মহিম বলল, আপনারা দুজনে গাড়িতে উঠে কথা বলুন বরং।

একটু ইতস্তুত করে শশিভুষণ উঠে বসলেন। তারপর বললেন, আমাকে গঙ্গার ওপারে গিয়ে ট্রেন ধরতে হবে। হাতে বেশি সময় নেই।

রাধাকিশোর বললেন, চলুন আপনাকে স্টেশন পর্যন্ত পৌঁছে দিয়ে আসি।

শশিভূষণ বললেন, তার প্রয়োজন হবে না। কিন্তু মহিম, তুমি মহারাজকে এখানে নিয়ে এসেছ। গুরুতর কোনও কারণ ঘটেছে নাকি?

মহিম বলল, নতুন সংখ্যা ‘বঙ্গবাসী’ আমরা আজই সকালে পড়েছি। সম্পাদকীয়তে তীব্র কশাঘাত করে লেখা হয়েছে ইংরেজ পলিটিক্যাল এজেন্টের কাছে মহারাজ মাথা বিকিয়ে দিতে যাচ্ছেন। সেই লেখা পড়ে মহারাজ খুব উদ্বিগ্ন। অভিযোগ একেবারেই সত্য নয়।

শশিভূষণ বলেন, এ পত্রিকার সম্পাদকীয় আমি রচনা করি না। সম্পাদকমশাই আমার মতামতে প্রভাবিত হবেন না। এ ব্যপারে আমার কোনও হাত নেই। তবে সম্পাদকের এটুকু উদারতা আছে তিনি আমার রচনায় হস্তক্ষেপ করেন না, আমি স্বাধীনকাবে ভিন্ন মত প্রকাশ করতে পারি।

তারপর তিনি রাধাকিশোরের দিকে তাকিয়ে বললেন মহারাজ, আমি নিজে কখনও ত্রিপুরার বিরুদ্ধে কিছু লিখব না, এই ব্যাপারে নিশ্চিন্ত থাকতে পারো। শুধু ত্রিপুরার নুন খেয়েছি বলেই নয়, রাজ্যটি আমার ভারী পছন্দের। সেখানকার বিভিন্ন সম্প্রদায়ের সরল আন্তরিক ব্যবহার আমাকে মুগ্ধ করেছে। এতগুলি জাতি, এতগুলি ভাষা, তবু সবাই মিলেমিশে আছে, এমন দৃষ্টান্তই বা আর কোথায়!

রাধাকিশোর বলেন, মাস্টারমশাই, আপনার মনে কোনও ক্ষোভ নেই তো?

শশিভূষণ বললেন, না। সে রকম কোনও কারণ ঘটেনি তো! তা ছাড়া, এই বয়সে আমি মনে কোনও ক্ষোভই পুষে রাখিনি। মহারাজ রাধাকিশোর, আমি কথা দিচ্ছি, আমার দ্বারা ত্রিপুরার কোনও অপকার কখনও হবে না। এবারে গাড়ি থামাতে বলো, আমি নেমে যাই।

রাধাকিশোর ইঙ্গিতপূর্ণ চোখে মহিমের দিকে তাকালেন।

মহিম বলল, মাস্টারমশাই, আপনি ব্যস্ত হচ্ছেন কেন? আমরা আপনাকে গঙ্গার ঘাট পর্যন্ত পৌঁছে দেব। আর একটা কথা মহারাজ নিজের মুখে বলতে পারছেন না। আমি বলি?

শশিভূষণ কৌতুহলী হয়ে বললেন, হ্যাঁ, বলো।

মহিম বলল, মাস্টারমশাই, অনেকদিন আগে আপনি ত্রিপুরার রাজবাড়িতে একটা গুরুতর ঘটনার কথা আমাকে বলেছিলেন, সেটা আমি এতদিন গোপন রেখেছিলাম। কিছুদিন আগে আমি কথায় কথায় সেটা মহারাজের সমক্ষে প্রকাশ করে ফেলেছি। মহানাজ তাতে খুবই আহত হয়েছেন। আপনার কাছে প্রকৃত সত্য উদঘাটিত না হলে তিনি কিছুতেই শান্তি পাবেন না। আপনি বলেছিলেন, ভরত নামে একটি ছেলেকে খুন করা হয়েছে এবং সেজন্য, এই মহারাজ তখন যুবরাজ ছিলেন, তিনিই দায়ী।

রাধাকিশোর ঝুঁকে পড়ে আবেগের সঙ্গে বললেন, মাস্টামশাই, আপনাকে বিশ্বাস করতেই হবে, আমি দায়ী নই। আমি ঘুণাক্ষরেও কিছু জানতাম না।

শশিভূষণ মহারাজের মুখের দিয়ে কিছুক্ষণ চেয়ে রইলেন। তারপর মহিমকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমাকে আমি এ কথাটা বলেছিলাম? কবে বল তো?

মহিম বলল, এঁর পিতা, আমাদের স্বর্গত মহারাজ যথন প্রথমবার কলকাতায় এসে সার্কুলার রোডের বাড়িতে উঠেছিলেন, আমি তখন কলকাতায় ছাত্র ছিলাম–

শশিভূষণ বললেন, হুঁ, তোমাকে বলেছিলাম, তার একটা গূঢ় উদ্দেশ্য ছিল।

রাধাকিশোর বললেন, ভরতকে হত্যা করার নির্দেশ আমি দিইনি। আমি যে-কোন শপথ নিয়ে বলতে পারি।

শশিভূষণ বললেন, এখন আমি বিশ্বাস করি। নরহত্যা তোমার স্বভাবধর্ম নয়। কিন্তু কোন্ অপবাদে জানি না, কারুর নির্দেশে ভরতকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেবার ব্যবস্থা হয়েছিল। দেহরক্ষী বাহিনী ও সেপাইদের কর্তৃত্ব তখন তোমার হাতে ছিল, তাই তোমার নির্দেশে কিংবা জ্ঞাতসারে এই কাণ্ডটি ঘটেছিল, এটা মনে হওয়া স্বাভাবিক।

রাধাকিশোর বললেন, মাস্টারমশাই, আমাদের প্রাসাদে ষড়যন্ত্রকারীর অভাব তখনও ছিল না, এখনও নেই। এখনও আমি অনেকের বিষ নিশ্বাস টের পাই।

শশিভূষণ বললেন, মহিম, তোমাকে আমি এই ঘটনা বলেছিলাম, যাতে তুমি অন্যদের জানিয়ে দাও যে ভরতের নিশ্চিত মৃত্যু ঘটেছে। কেউ আর তার খোঁজ করবে না। ভরতকে খুন করার অতি নিষ্ঠুর ব্যবস্থা হলেও এক চমকপ্রদ উপায়ে সে শেষ পর্যন্ত বেড়ে গেছে। সে বেঁচে আছে।

রাধাকিশোর বললেন, অ্যাঁ? সে বেঁচে আছে?

শশিভূষণ বললেন, হ্যাঁ, সেই অবস্থা থেকে বেঁচে সে কলকাতায় চলে এসেছিল। এখানে লেখাপড়া শিখে কৃতবিদ্য হয়েছে। সুতরাং মহারাজ, তার হত্যার অপরাধের বোঝা তোমাকে বহন করতে হবে না।

রাধাকিশোর উল্লাসিত মুখে বললেন, ভরত তবে বেঁচে আছে। সে আমার ভাই। তাঁকে আমি ত্রিপুরা ফিরিয়ে নিয়ে যাব। উচ্চ পদ দেব। সে কোথায় আছে বলুন, আমি এখনি তার কাছে যেতে চাই।

দু’দিকে মাথা নেড়ে শশিভূষণ ধীরভাবে বললেন, তুমি ফিরিয়ে নিয়ে যেতে চাইলেও সে যেত কি না তাতে সন্দেহ আছে। সে যাই হোক, সে কোথায় আছে আমি জানি না। কোনও কারণে আমার ওপর তার প্রবল অভিমান হয়েছে। হয়তো এ জীবনে আর সে কখনও আমার সঙ্গে দেখা করবে না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *