৪৭. গঙ্গার প্রায় সন্নিকটে বোসপাড়া

বাগবাজারে, গঙ্গার প্রায় সন্নিকটে বোসপাড়া লেনের ১৬ নম্বর বাড়িটি ভাড়া নিয়েছেন নিবেদিতা। পুরনো আমলের দোতলা বাড়ি, মোটা মোটা দেওয়াল, ঘরগুলির মেঝে লাল রঙের পালিশ করা। আলো-বাতাসের অভাব নেই, পাশেই এক টুকরো খালি জমি ও একটি পুকুর, জানলা দিয়ে দেখা যায় অবিরাম মানুষের আনাগোনা, এ পথ দিয়ে অনেকে গঙ্গাস্নানে যায়। অপরাহ্নের পর পল্লীটি নির্জন হয়ে আসে, তখন অবশ্য শুরু হয় মশার গুনগুনানি।

এ বাড়িতে নিবেদিতা একা থাকেন। প্রথম কয়েক দিন একটি পরিচারিকাও পাওয়া যায়নি। বিধর্মী, ম্লেচ্ছর বাড়িতে কাজ করতে আসবে কে? শ্বেতাঙ্গ রাজার জাতি সম্পর্কে ভারতীয় হিন্দুদের মনোভাবটি অতি বিচিত্র। যুগপৎ, ভয় ও ঘৃণা তা মনে মনে পোষণ করে। ইংরেজের সামনে পড়লে তারা ভয়ে কাঁপে, সামান্য চোখ রাঙানিতে তার পায়ে ধরে কাকুতি-মিনতি করতেও দ্বিধা করে না, অথচ কোন ইংরেজ খাতির করে ডাকলেও তার সঙ্গে খেতে বসবে না, তার ছোঁওয়া জল পান করবে না। অন্য কোন ধর্মের মানুষের সঙ্গে হিন্দুদের পান-ভোজনে আপত্তি আছে তো বটেই, এমনকী উচ্চবর্ণের হিন্দুরা অন্য হিন্দুদেরও স্পর্শ ঘৃণা করে, এই ছুঁৎমার্গের ঐতিহাসিক কারণটি নিবেদিতা এখনও বুঝতে পারেন না। এই ভারতেরই মুসলমানদের মধ্যে কিন্তু এরকম ছুৎমার্গ নেই।

অনেক চেষ্টায় এক বৃদ্ধাকে পাওয়া গেছে, সে প্রায় এক খুনখুনে বুড়ি, তার সাত কুলে কেউ নেই। অভাবের তাড়নায় সে এ বাড়িতে পরিচারিকার কাজ করতে রাজি হয়েছে বটে, কিন্তু দুটি শর্ত দিয়েছে। মেমসাহেব কখনও রান্নাঘরে ঢুকবেন না, এবং কোনওক্রমেই তার উনুন ও জলের পাত্র স্পর্শ করতে পারবেন না। নিবেদিতা তাতেই রাজি। প্রথম দিন নিবেদিতা তাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, তোমার নাম কী? আমি তোমায় কী বলে ডাকব? বৃদ্ধা বলেছিল, আমার নামের দরকারটা কী। আমি তোমার ঝি, সবাই ঝিকে ঝি বলেই ডাকে। নিবেদিতার বেশ মজা লেগেছিল, ঝি শব্দটা যে দুহিতার অপভ্রংশ তা তিনি এতদিনে জেনে গেছেন, অর্থাৎ এই পরিচারিকাটি বয়েসে তাঁর দ্বিগুণের বেশি হলেও সে হল তাঁর মেয়ে, আর তিনি হলেন ওই বৃদ্ধার মা!

বৃদ্ধাটির কাজে বেশ উৎসাহ আছে। সারা বাড়ি ঘরদোর ধুয়ে মুছে পরিষ্কার করে রাখে, অন্য সময় পড়ে পড়ে ঘুমোয়। নিবেদিতা একা একা বসে লেখাপড়া করেন, কখনও বাইরের দৃশ্যের দিকে চেয়ে থাকেন। ভারতে এসে এই প্রথম তিনি একলা থাকছেন, তাও একেবারে দেশি লোকদের পাড়ার মধ্যে। স্বামীজি পাহাড় থেকে নেমে আসার পর জো ম্যাকলাউড আর ওলি বুল উত্তর ভারতে আরও বেড়াতে চেয়েছিলেন। ওঁদের সঙ্গে কয়েকদিন থাকার পর নিবেদিতার মন চঞ্চল হয়ে উঠেছিল, আর কোনও বিশেষ দ্রষ্টব্য স্থান বা প্রাকৃঠিক সৌন্দর্যে আকর্ষণ বোধ করেননি। স্বামীজি থাকবেন কলকাতায় আর তিনি থাকবেন অত দূরে। দুই সঙ্গিনীকে ভ্রাম্যমাণ রেখে নিবেদিতা একাই চলে এসেছেন এখানে। স্বামীজির সঙ্গে প্রতিদিন দেখা হয় না, তবু তো তিনি এই শহরেই আছেন, তাতেই শক্তি পাওয়া যায়। বেলুড়ে মঠ গড়ার কাজ জোরকদমে চলছে, স্বাৰ্মীজি কখনও সেখানে পরিদর্শনে যান, কখনও এই বাগবাজারেই বলরাম বসুর বাড়িতে এসে থাকেন। মাঝে মাঝে চা খেতে চলে আসেন নিবেদিতার কাছে।

বারান্দাতেই নিবেদিতা চা বানাবার একটা নিজস্ব ব্যবস্থা করেছেন। নিবেদিতা কাপে চা ছেঁকে যখন দুধ-চিনি মেশান, তখন ঝিটি একটু দূরে বসে অবাক চোখে তাকিয়ে থাকে। আগে কারুকে সে চা পান করতে দেখেনি। নিবেদিতা এক দিন অন্যমনস্কভাবে চায়ের কাপটি বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, ঝি, এর মধ্যে আর একটু গরম জল ঢেলে দাও তো! বৃদ্ধাটি আঁতকে উঠে দ্রুত সেথান থেকে চলে গেল। খানিক বাদেই সে ফিরে এল সম্পূর্ণ স্নান করে, ভিজি-কাপড়ে। ম্লেচ্ছ-রমণীর পাত্র ছুঁয়ে ফেললে তাকে স্নান করে পবিত্র হতে হবে না!

এ জায়গায় এরকম ব্যবহার পেতে পেতে নিবেদিতার এখন আর রাগ কিংবা দুঃখও হয় না। একটা পাত্র শুধু একবার ছুঁলে কী করে মানুষের শরীর অপবিত্র হয় কিংবা ভেতরের পানীয় পানের অযোগ্য হয়ে যায়, এ তার কোনওদিন মাথায় ঢুকবে না। তিনি হেসে বললেন, ওগো মেয়ে, ভুল করেছি, আর তোমায় ছুঁতে বলব না।

তারপর তিনি এঁটো কাপ-ডিশ ধুতে শুরু করলে পরিচারিকাটি গজগজ করে কাছে এসে বলল, শোনো গো মা, এবার থেকে তোমার বাসনপত্র ধুয়ে নেব, কিন্তু আর কোনও সাহেব-মেম এলে তাদের সব কিন্তু আমি ছুঁতে পারব না।

নিবেদিতার মনে হল, এটাই একটা বিরাট জয়। এই পরিচারিকাটি তাঁকে শেষ পর্যন্ত আপন বলে গ্রহণ করেছে।

অদুরেই আর একটি ভাড়া বাড়িতে থাকেন সারদামণি। নিনেনি মাঝে মাঝেই সেখানে যান, এই রমণীটির সান্নিধ্যে তার মন স্নিন্ধ হয়ে যায়। সারদামণি সন্তানহীনা, তবু তার শরীরে যেন মা-মা গন্ধ আছে। রামকৃষ্ণ পরমহংসের সব শিষ্যের চোখেই সারদামণি মাতৃবৎ। সাধারণ গ্রাম্য এই মহিলাটির প্রখর বুদ্ধি ও বিবেচনাশক্তি দেখে নিবেদিতা প্রায়ই বিস্মিত হয়ে যান। স্বামীজির কাছে তিনি শুনেছেন যে, স্বামীর জীবিতকালে সারদামণি থাকতেন প্রায় সকলের দৃষ্টির আড়ালে। তার অস্তিত্বই টের পাওয়া যেত না, এখন রামকৃষ্ণের বড় বড় শিক্ষিত অনুগামীরাও তাঁর পরামর্শ নিয়ে থাকেন। গিরিশ ঘোষ এসে আছড়ে পড়েন তার পায়ের কাছে। আরও বিস্ময়ের কথা, অনেক উচ্চবংশীয় মহিলারাও যে-সব সংস্কার কাটিয়ে উঠতে পারেননি, সারদামণি তা পেরেছেন। তার ছোঁয়াছানির বাতিক নেই, তিনি নিবেদিতার সঙ্গে বসে আহার গ্রহণ করেছেন স্বচ্ছন্দে। মাঝে মাঝে আদর করে নিবেদিতার গায়ে হাত বুলিয়ে দেন।

বলরাম বসুর বাড়িতে নিবেদিতা যান মাঝে মাঝে। স্কুল খোলার ব্যাপারে সেখানে আলোচনা হয়। নিবেদিতা এ-দেশে এসেছেন মেয়েদের মধ্যে শিক্ষা বিস্তারের উদ্দেশ্য নিয়ে, সে কাজ শুরু করা দরকার। মেয়েদের জন্য স্কুল-কলেজ ইতিমধ্যেই স্থাপিত হয়েছে বেশ কয়েকটি, নিবেদিতা আর নতুন কী করবেন? স্বামীজি চান, এখানকার মেয়েদের শুধু বিলিতি ঢঙ্গে শিক্ষা না দিয়ে তাদের প্রাচীন ভারতীয় নারীর আদর্শে গড়ে তোলা হোক। প্রাথমিক পর্যায়ে ছোট আকারেই একটা বিদ্যালয় স্থাপিত হবে। বলরাম বসুর বাড়িতে নিবেদিতা যখন তার প্রস্তাবিত স্কুল সম্পর্কে বুঝিয়ে বলছিলেন কিছু বিশিষ্ট ব্যক্তিকে, কখন চুপি চুপি স্বামীজি যে পেছনে এসে বসেছেন, তিনি লক্ষই করেননি। সেদিন বেশ লঘু মেজাজে ছিলেন বিবেকানন্দ, পেছন থেকে কারুকে গুঁতো মারছেন, ফিসফিসিয়ে মসকরা করছেন। সবাই মুগ্ধ হয়ে নিবেদিতাকে দেখছে এবং তার ইংরিজি বক্তৃতা শুনছে, কিন্তু কে কোন সহযোগিতার প্রস্তাব দিচ্ছে না। মেয়েলের জন্য স্কুল খুলতে গেলে সবচেয়ে আগে প্রয়োজন তো কিছু ছাত্রী জোগাড় করা, কিন্তু বাগবাজারের মতন গোঁড়া হিন্দু পল্লীতে এক খ্রিস্টান মাস্টারনীর কাছে মেয়ে দেবে কে? উপস্থিত ভদ্র ব্যক্তিরা মনে মনে নিবেদিতাকে সমর্থন করলেও পরিবারে আপত্তির কথা ভেবে ভয়ে মুখ খুলছেন না।

বিবেকানন্দ একজনকে খোঁচা মেরে বললেন, ওরে ব্যাটা হরে, তুই মেয়ের বাপ হয়ে মুখ বুজে আছিস যে! তোর মেয়েকে মানুষ করবি না? ওই মাস্টারনী কি খালি ঘরে পড়াবে?

উক্ত ব্যক্তির নাম হরমোহন, সে ৎবু মুখ খোলে না। বিবেকানন্দ আর একজনকে বলেন, ও মশাই, আপনারও তো মেয়ে আছে, উঠুন, উঠে দাঁড়িয়ে বলুন, আমি মেয়ে দেব!

কেউ মুখ ফুটে এই কথাটি উচ্চারণ করে না। বিবেকানন্দ তখন হরমোহনের কাঁধ খামচে ধরে বললেন, শালা, তোর আজ নিস্তার নেই। শুধু মুখেই বড় বড় কথা, আর কাজের সময় বউয়ের আঁচলে লুকোনো!

গলা চড়িয়ে তিনি বললেন, ওয়েল, মিস নোবল, দিস জেন্টলম্যান অফারস হিজ গার্ল টু ইউ!

নিবেদিতা প্রথমে চমকে উঠেছিলেন। স্বামীজি তাঁকে বলেছিলেন, তাঁর ইস্কুলের ব্যবস্থা নিজেকেই করতে হবে, স্বামীজি কিছু সাহায্য করতে পারবেন না। সেই জন্য নিবেদিতা এখানে বিবেকানন্দর উপস্থিতি আশাই করেননি, কিন্তু তাঁর রাজা তাঁকে ভোলেননি, শত কাজ ফেলে চলে এসেছেন এখানে! নিবেদিতার বক্তৃতা থেমে গেল, উঠে দাঁড়িয়ে বালিকার মতন খুশিতে হাততালি দিয়ে উঠলেন। তাঁর ইচ্ছে করল নাচতে! সত্যি সত্যি নাচের ভঙ্গিতে দুলতে লাগলেন বিবেকানন্দর দিকে এক দৃষ্টিতে চেয়ে থেকে।

নিবেদিতা এখন একা একাই কলকাতা শহরে ঘেরাফেরা করতে পারেন। বাগবাজারে লোক অবাক হয়ে চেয়ে দেখে, ছাতা মাথায় দিয়ে এক সুন্দরী মেমসাহেব হেঁটে যাচ্ছেন শ্যামবাজারের দিকে। সেখানে ঘোড়াগাড়ির আড্ডা। এখন ভাঙা ভাঙা বাংলা বলতে পারেন, গাড়োয়াননের সঙ্গে দরদাম করতে অসুবিধে হয় না। কলকাতার বেশ কিছু সম্ভ্রান্ত পরিবারের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়েছে। এখানে যে এত ইংরিজি জানা শিক্ষিত মানুষজনও আছে, সে সম্পর্কে তার ঠিক ধারণা ছিল না। বিলেতে থাকার সময় ভারতীয় নারীদের শোচনীয় অবস্থার কথাই বারবার পড়েছেন বিভিন্ন সংবাদপত্রে, কিন্তু এখানে যে সংস্কারমুক্ত, উচ্চ-মেধাসম্পন্ন কিছু কিছু রমণীও আছে, তার কোন উল্লেখ ওইসব সংবাদপত্রে থাকে না।

এখানকার সম্ভ্রান্ত ও অভিজাত সমাজে স্পষ্ট দুটি ভাগ নিবেদিতার চোখে পড়ে। একটি হল ইঙ্গ বঙ্গীয় সমাজ, তারা সরকারের উচ্চ-চাকুৱে অথবা বারিস্টার, ডাক্তার, জমিদার। তারা বিলিতি আদব-কায়দায় অভ্যস্ত, ইংরিজি ছাড়া কথাই বলে না, নিজের দেশের ঐতিহ্য সম্পর্কে সচেতন নয়, জানেই না কিছু, ইংরেজদের নেকনজরে থাকাটাই তারা পরমার্থ জ্ঞান করে। আর একটি শিক্ষিত সমাজও গড়ে উঠেছে, যারা শুধু স্কুল-কলেজের লেখাপড়া শিখেই ক্ষান্ত হয় না, আরও পড়াশুনো করে, নিজের দেশের গণ্ডির বাইরেও তাদের দৃষ্টি যায়, তাদের বিশ্ব চেতনা গড়ে উঠেছে, আবার নিজের দেশের লুপ্ত গৌরব পুনরুদ্ধারের কথা চিন্তা করে। এরা অধিকাংশই কোনও না কোনও ব্রাহ্ম সমাজভুক্ত। এই ব্রাহ্মদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনাতেই নিবেদিতা বেশি স্বস্তি বোধ করেন। বিবেকানন্দও ব্রাহ্মদের সঙ্গে তাঁর এই মেলামেশা সমর্থন করেছেন, তিনি মাঝে মাঝেই বলেন, মেক ইনরোডস টু দা ব্রাহমজ, ব্রাহ্মদের মধ্যে ঢুকে পড়ো, তাদের তোমার দলে টানো।

জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারটিকে দেখেই নিবেদিতা সবচেয়ে বেশি মোহিত হয়েছেন। শাখা-প্রশাখায় ছড়িয়ে যাওয়া এক বিশাল গোষ্ঠী, বিত্তবান, উচ্চ রুচিসম্পন্ন এবং এই পরিবারের শুধু পুরুষরা না, অনেক নারীও যেমন রূপবতী তেমনি বিভিন্ন গুণের অধিকারিণী। এমন একটি পরিবার তিনি ইংল্যান্দেও দেখেননি। ঠাকুরবংশের মেয়েদের সঙ্গে তিনি মিশে যেতে পারেন সহজে, তাঁর বিশেষ ভাব হয়েছে সরলার সঙ্গে। এই মেয়েটি যেমন বিদুষী, তেমনি তেজস্বিনী, এমন দেশাত্মবোধ তিনি আর কোনও বঙ্গনারীর মধ্যে দেখেননি।

বিবেকানন্দর সঙ্গে সরলার আগেই যোগাযোগ হয়েছে চিঠিপত্রের মাধ্যমে। পশ্চিম জগতে বিবেকানন্দ ভারতত্মার বাণী প্রচার করে সাড়া জাগিয়ে এসেছেন বলে সরলা তাঁর প্রতি আকৃষ্ট। বিবেকানন্দও সরলার ওজস্বিতা ও মুক্ত মনের পরিচয় পেয়ে ইচ্ছে প্রকাশ করেছেন যে, তার মতন রমণীর বিদেশে গিয়ে বক্তৃতা করা উচিত।

সরলা ও নিবেদিতা পরস্পরের বাড়িতে মাঝে মাঝেই যাতায়াত করেন। নিবেদিতা বিবেকানন্দের শিষ্যা এবং রামকৃষ্ণ সঙ্ঘের মানুষজনের সঙ্গেই তার প্রধান যোগাযোগ, তাই সরলার মতন অনেকেরই প্রথম প্রথম মনে হয়েছিল যে, এই বিদেশিনী বুঝি খুবই ধর্মপ্রাণা এবং বৈদান্তিক আদর্শের কাছে আত্মসমর্পণ করেছেন। কিন্তু কিছুদিন আলাপ পরিচয়ের পর সরলা বুঝতে পারল যে, নিবেদিতার উৎসাহ ও আগ্রহ আছে নানা দিকে, শিল্প ও চারুকলা, সাহিত্য, বিজ্ঞান, সামাজিক অবস্থা নিয়ে তিনি চিন্তা করেন। এবং তিনি ভারতে ইংরেজ শাসনের ঘোর বিরোধী। এই ব্যাপারে সরলার সঙ্গে তাঁর খুব মনের মিল হল। সরলা চাইছে, এ দেশের মানুষদের আত্মমর্যাদাজ্ঞান ফিরিয়ে আনতে, যাতে ভীরুতা ও কাপুরুষতা কাটিয়ে এ দেশের মানুষ নিজেদের ইংরেজদের সমকক্ষ মনে করতে পারে, সে জন্য সে সঙ্ঘ স্থাপন কবেছ। নিবেদিতাও তাই চান।

কিছুদিন ঘোরাফেরা করার পর নিবেদিতা বুঝতে পারলেন, বাঙালিদের মধ্যে অনেক দলাদলি। ঠাকুত পরিবারের লোকজনদের সঙ্গে রামকৃষ্ণ সম্প্রদায়ের প্রায় কোনও যোগাযোগ নেই, বিবেকানন্দ আমেরিকায় গিয়ে যে বিপুল সাড়া জাগিয়ে এসেছেন তা নিয়ে একমাত্র সরলা ছাড়া এ পরিবারের আর কেউ উচ্চবাচ্য করে না, বরং যেন একটা সুক্ষ্ম তাচ্ছিল্যের ভাব আছে। ব্রাহ্মদের মধ্যেও আবার তিনটি ভাগ। গোঁড়া হিন্দুরাও রামকৃষ্ণ অনুগামীদের সুচক্ষে দেখে না। আবার একদল শিক্ষিত মানুষ ব্রাহ্ম এবং কালীসাধকদের মতন দুই সম্প্রদায় থেকেই সমদূরত্ব রক্ষা করে। অথচ পরাধীনতার শৃঙ্খল মোচনের জন্য যখন দেশের মানুষকে সংগঠিত করার চিন্তা করা হচ্ছে, তখন দলাদলি ও বিভেদ ঘুচিয়ে একতা আনা তো সর্বপ্রথম কাজ। কংগ্রেসের প্ল্যাটফর্মে শুধু বক্তৃতা দিয়ে সে কাজ হবে না, সমাজের সর্বস্তরে ঐক্যবদ্ধ হওয়া দরকার।

নিবেদিতা একদিন এই প্রসঙ্গ তুলতেই সরলা উৎসাহের সঙ্গে সমর্থন জানাল।

নিবেদিতা বললেন, প্লেগ রোগের সংক্রমণের সময় রামকৃষ্ণ সম্প্রদায় সেবার কাজে নেমেছিল, স্বামীজি বলেছিলেন, দরিদ্র মানুষের ত্রাণের কাজে টাকার অভাব হলে তিনি বেলুড় মঠ বিক্রি করে দিতেও রাজি আছেন। কিন্তু টাকার অভাব হবে কেন, এ দেশে কি ধনী লোক নেই? তারা তো রামকৃষ্ণ সঙ্ঘকে সাহায্য করতে এগিয়ে এলেন না। অন্যরাও কিছু কিছু প্লেগ প্রতিরোধের কাজ করেছেন ঠিকই, কিন্তু সবাই মিলে একসঙ্গে সংগঠিত হলে কি কাজ আরও ব্যাপক ও সুষ্ঠু হত না?

সরলা বলল, সে কথাও মানি। আপনারাও দেশের মানুষের কল্যাণ চান, আমরাও সেই কাজে ব্রতী হতে চাই। আপনাদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে নিতে আমাদের একটাই বাধা আছে। স্বামী বিবেকানন্দ এবং তাঁর সতীর্থরা রামকৃষ্ণ পরমহংসকে অবতার হিসেবে পূজা করেন। এটা আমরা মানি কী করে? কোনও মানুষ তার নিজগুণে কিংবা সাধনায় অসাধারণ বা মহত্বের পর্যায়ে উন্নীত হতে পারে, কিন্তু তাকে ঈশ্বরের অবতার হিসেবে গণ্য করার কী দরকার!

নিবেদিতা বিস্মিতভাবে সরলার দিকে চেয়ে রইলেন।

সরলা আবার বলল, হিন্দুদের কি অবতারের অভাব আছে? মাছও অবতার, কচ্ছপও অবতার, আরও অবতার চাই? আমরা অবতারবাদ মানতে পারি না। কালীপুজো নিয়ে বাড়াবাড়ি, পাঠা বলি, রক্তারক্তি, বীভৎস ব্যাপার, এ তো বামাচারী তন্ত্র সাধনা! স্বামী বিবেকানন্দ তো প্রায়ই বলেন, দরিদ্র নারায়ণের সেবা করাই সবচেয়ে বড় ধর্ম, আপনি ওঁকে বলুন না, এখন কিছুদিন রামকৃষ্ণকে অবতার হিসেবে পুজো করা থেকে বিরত থাকতে, তা হলে আমরা সবাই মিলে একসঙ্গে দেশের সেবায় নিযুক্ত হই!

সরলার এই দাবির কথা শুনে স্বামীজি দপ করে জ্বলে উঠলেন। ঠাকুর পরিবারের মেয়েটির এত স্পর্ধা! ও দেশের জন্য কী করেছে, শুধু মুখেই বড় বড় কথা! আমরা গুরুর পূজা বন্ধ করলে তবেই ওরা হাত মেলাবেন! দেশহিতৈষী মহাত্মা সব কেমন মানুষ তা আমার জানতে বাকি নেই। বলি এ দেশের জন্য বুক ধড়ফড়, কলিজা ছেঁড়-ছেঁড়, প্রাণ যায়-যায়, কন্ঠে ঘড়-ঘড়, আর একটি ঠাকুরেই সব বন্ধ করে দিলে? এই সব লোক গ্লাস-কেসের ভেতরে ভাল, কাজের সময় যত ওরা পেছনে থাকে, ততই কল্যাণ!

উঠে দাঁড়িয়ে সিংহের মতন গজরাতে গজরাতে তিনি বলতে লাগলেন, জানি কালীপুজো সম্পর্কে ওঁদের আপত্তি, মহামায়ার আরাধনার মূল তত্ত্ব ওরা কী বোঝে? আমরা বিধবার বে দিই, আর পুতুলপুজো মানি না, এসব আর চলে না। আমেরিকায় দেখলাম তো, তারা চায় ফিলসফি, লার্নিং, ফাঁকা গপ্পি আর কেউ শোনে না।

একটি থেমে নিবেদিতার দিকে তীব্র চোখে কিছুক্ষণ চেয়ে থেকে তিনি বললেন, মার্গট, তোমাকে দিয়ে মা কালীর ওপর আমি বক্তৃতা দেওয়াব! এই কলকেতা শহরের মাথা মাথা লোকদের সামনে তুমি কালী সাধনার দর্শন তত্ত্ব শোনাবে।

নিবেদিতা চমকিত হয়ে বললেন, আমি? আমি কতটুকু জানি!

বিবেকানন্দ বললেন, আমি তোমাকে শেখাব। তুমি আকর গ্রন্থগুলি পড়ে নেবে। তুমি পারাবে! ‘বজ্রাদপি কঠোবানি মৃদুনি কুসুমাদপি’—এই হবে তোমার মূলমন্ত্র।

সরলা শুধু নিবেদিতাকে মুখে বলেই ক্ষান্ত না হয়ে বিবেকানন্দকে চিঠি লিখেও সেই প্রস্তাব জানাল। বিবেকানন্দ পরিহাস-বিদ্রুপপুর্ণ এক উত্তর নিলেন তাকে।

নিবেদিতার মনে হল, অন্য কারুর মাধ্যমে কি চিঠিপত্রে এ বিষয়ের কোনও সুরাহা হতে পারে না। মুখোমুখি আলোচনায় কিছু ফল পাওয়া যেতে পারে। তিনি একদিন সরলাকে নিমন্ত্রণ করলেন নিজের বাড়িতে। সেদিন বিবেকানন্দ নিজের হাতে রান্না করলেন, রান্নার শখ তাঁর কৈশোর বয়েস থেকেই, এখনও মাঝে মাঝে রান্না করতে ভালবাসেন। সেদিন আরও কয়েকজন অতিথি রয়েছে, খাওয়াদাওয়া আর বঙ্গ রসিকতা চলল অনেকক্ষণ ধরে, গুরুতর বিষয়ে আলোচনার সুযোগ হল না।

আহারান্তে নিবেদিতার সমক্ষে সরলা প্রসঙ্গটা উত্থাপন করতে যেতেই বিবেকানন্দ সেদিকে মনোযোগ না দিয়ে হুকুমের সুরে বললেন, মার্গট, আমার জন্য তামাক সেজে আনো তো!

নিবেদিতা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গিয়ে স্বামীজির মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন, তামাক কী করে সাজতে হয়, আমি তো জানি না।

বিবেকানন্দ বললেন, একটা কল্কেতে এক গুলি তামাক দিয়ে তার ওপর টিকে চাপিয়ে নারকোল ছোবা দিয়ে ধরাবে। আস্তে আস্তে ফুঁ দিলে ধরবে। যাও, নিয়ে এসো।

সদ্য নিযুক্ত কোনও দাসীর মতন অপটু হাতে কল্কে ধরিয়ে নিয়ে এলেন নিবেদিতা। বিবেকানন্দ সেই কল্কে হুকোর পর চাপিয়ে চোখ বুজে আরামের সঙ্গে টানতে লাগলেন।

অনেকের ধারণা, এই যে অনেক বিদেশি শিষ্য-শিষ্যা স্বামীজির চারপাশে এসে জুটেছে, স্বামীজি বুঝি তাদের সঙ্গে সব সময় স্তুতি ও মনোরঞ্জনের সুরে কথা বলে তাদের বশ করেছেন। সরলা ঘোষাল নিজের চক্ষে দেখে যাক, গিয়ে তার পরিবারের লোকজনদের বলুক, সেবা করার অধিকার লাভ করেই এরা ধন্য! এ সেবা করছে শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসের এক শিষ্যকে।

বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মৈত্রী বন্ধনের চিন্তা এর পরেও নিবেদিতা ছাড়লেন না। সরলা ব্রাহ্ম সমাজের প্রতিনিধিত্ব করে না, তার চেয়েও যারা উচ্চপদে প্রতিষ্ঠিত এবং দায়িত্ববান, সেরকম কয়েকজনের সঙ্গে স্বামীজির মুখোমুখি সাক্ষাৎকার ঘটিয়ে নিতে পারলে কেমন হয়?

স্বামীজিকে তিনি একদিন কথা প্রসঙ্গে বলেন, আমি অনেক পরিবারে আলাপ-পরিচয়ের জন্য যাই, তারা আমাকে নানাভাবে আপ্যায়ন করেন, আমারও উচিত তাদের কিছু প্রতিদান দেওয়া। সেরকম কয়েক জনকে একদিন কি চায়ের আসরে ডাকতে পারি আমার বাড়িতে?

বিবেকানন্দ ভুরু তুলে বললেন, সেখানে বুঝি তোমার ব্রাহ্ম বন্ধুদের ডাকবে? ঠিক আছে, ডাকো।

নিবেদিতা উৎসাহের সঙ্গে সম্ভাব্য অতিথিদের নামের তালিকা তৈরি করতে লাগলেন। কিছু কিছু নাম লিখে কেটে দেওয়া হয়, কিছু নতুন নাম যোগ হয়। খুব বেশি লোককে ডাকা যাবে না, তত জায়গা নেই। জানুয়ারি মাস, এখন ঝড়বৃষ্টির সম্ভাবনা নেই বলে বলা হবে উঠোনে। তারিখ ঠিক করেও পিছিয়ে গেল কয়েকবার, স্বামীজির সময় হওয়াটাই বড় কথা। শেষপর্যন্ত দিন ঠিক হল এ মাসের শেষ শনিবারে।

বলরাম বসুর বাড়ি থেকে চেয়ে আনা হয়েছে কয়েকটি চেয়ার ও টেবিল। পাতা হয়েছে ধপধপে সাদা টেবিল ক্লথ। নিবেদিতা কয়েকটি ফুলদানিতে সাজিয়েছেন নানা রঙের ফুল। বারবার একটু দূরে দাঁড়িয়ে দেখছেন, সব কিছু ঠিকঠাক হয়েছে কি না। তাঁর রুচি অতি খুঁতখুঁতে, কোনওরকম বিশৃঙ্খলা তিনি সহ্য করতে পারেন না। বেশ শীত পড়েছে, নিবেদিতা পা পর্যন্ত লোটানো দুগ্ধ-ধবল গাউন পরে গায়ে একটা ঘি রঙের শাল জড়িয়ে নিয়েছেন। বুড়ি দাসিটিকেও পরিয়েছেন একটা পরিস্কার কাপড়, তার জন্য কিনে দিয়েছেন নতুন আলোয়ান।

পাঁচটার সময় অতিথিদের আসবার কথা। ঠিক পাঁচটা বাজতেই একসঙ্গে এসে উপস্থিত হলেন অনেকে। পি কে রায় এবং তার স্ত্রী সরলা রায়, মোহিনীমোহন চট্টোপাধ্যায়, সরলা ঘোষালকে সঙ্গে নিয়ে কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং আরও কয়েকজন। রবীন্দ্র পরে এসেছেন কুচোনো ধুতি, সাদা রেশমি পিরান ও রেশমি চাদর, পায়ে মোজা এবং নরম চামড়ার জুতো। আটত্রিশ বছর বয়স হলেও তার এখনও একটি চুলেও পাক ধরেনি। তবে ইদানীং তিনি একটি সোনালি চশমা ব্যবহার করতে শুরু করেছেন। ঘন কৃষ্ণ চুল মাঝখানে সিঁথি কাটা, ভ্রমরকৃষ্ণ দাড়ি ও গোঁফ সযত্ন বর্ধিত, গৌরবর্ণ এই দীর্ঘকায় পুরুষাটির রূপ ও ব্যক্তিত্বের প্রভা দেখে সকলেই প্রথম কয়েক মুহূর্ত মুগ্ধ হয়ে চেয়ে থাকে।

রবীন্দ্র মৃদুস্বরে নিবেদিতাকে বললেন, আমার বড় ভগিনী স্বর্ণকুমারী ঘোষালের আসার কথা ছিল, বিশেষ কারণে তিনি আসতে পারেননি বলে মার্জনা চেয়েছেন।

নিবেদিতা সযত্নে রবীন্দ্রকে বসালেন। নিবেদিতা আজ খুবই চাঞ্চল্য বোধ করছেন। অতিথি আপ্যায়নের ত্রুটি যাতে না হয় সে চিন্তা তো আছেই, তা ছাড়াও তাঁর স্বামীজি, তাঁর রাজা আজ কীরকম ব্যবহার করবেন, তা ভেবেও খানিকটা উদ্বিগ্ন। ব্রাহ্মদের সম্পর্কে স্বামীজির মনোভাব এর মধ্যে আরও কঠোর হয়ে গেছে, ঠাকুর পরিবার সম্পর্কেও তিনি তেমন শ্রদ্ধাশীল নন। তার ধারণা, ঠাকুরবাড়ির প্রভাব বাংলাদেশের পক্ষে ক্ষতিকর। বিবেকানন্দ শক্তির উপাসক, তিনি চান দেশের মানুষের মধ্যে এখন পৌরুষ জাগাতে হবে, আর ঠাকুরবাড়ির লেখকরা প্রেম-ভালবাসার কাব্য লিখে চলেছে, তাতে দেশের কী উপকার হবে? ইন্দ্রিয় রসের বিষ বাংলাদেশে ঢুকিয়ে দিচ্ছে!

রবীন্দ্রবাবুর সঙ্গে আলাপ হবার পর নিবেদিতা তাঁকে বেশ পছন্দ করেছেন। ইনি একজন সত্যিকারের কবি এবং সুগায়ক। এর কিছু কিছু কবিতা অনুধাবন করে নিবেদিতা বুঝেছেন যে, ইনি মুলত একজন রোমান্টিক রসের কবি হলেও ছত্রে ছত্রে ফুটে ওঠে গভীর জীবনবোধ। কবিতা তো রোমান্টিক হবেই। শুধু আদর্শের কথা, শুধু উচ্চ ভাব ও নীতিকথায় ভারাক্রান্ত হলে তা হয়ে যায় নিছক নিরস অ-কবিতা। নিবেদিতা কখনও রবীন্দ্রবাবুর কবিতার উলেখ করলে স্বামীজি অসহিষ্ণুভাবে মাথা নাড়েন। ওই সব কাব্য-টাব্যের রস আস্বাদনের সময় তার নেই, রবীন্দ্রনাথের সব রচনা পড়ার সময়ও তাঁর নেই, দেশের মানুষকে জাগাবার জন্য তার মতে এখন দরকার রুদ্র সঙ্গীত, তুরী-ভেরি-দুন্দুভির ডাক। ঠাকুরবাড়ির কবিদের একদল অনুকারকও জন্মেছে, তাদেরও স্বামীজি দু’চক্ষে দেখতে পারেন না, মাঝে মাঝে বিদ্রুপের সুরে বলেন, এই যে একদল ছেলে উঠেছে, মেয়েমানুষের মতন বেশভূষা, নরম নরম বুলি কাটেন, একে বেকে চলেন, কারুর চোখের ওপর চোখ রেখে কথা কইতে পারেন না, আর ভূমিষ্ঠ হয়ে অবধি পিরীতের কবিতা লেখেন, আর বিরহের জ্বালায় হাসেন হোসেন করেন…। নিবেদিতা যাতে ঠাকুরবাড়ির লোকদের সঙ্গে বেশি মেলামেশা না করেন, এমন ইঙ্গিত দু’একবার দিয়েছেন স্বামীজি।

তবে এই টি-পার্টির ব্যাপারে স্বামীজি আপত্তি জানাননি, বরং আগ্রহই প্রকাশ করেছেন, আমন্ত্রিতদের তালিকাও তিনি জানেন। এটাই নিবেদিতার বড় ভরসা।

স্বামীজি আসতে দেরি করছেন, অনারা ভদ্রতার বিনিময় করছেন নিজেদের মধ্যে। রবীন্দ্রনাথ প্রায় চুপ করেই আছেন। যদিও ঘনিষ্ঠ মহলে তিনি হাস্য-পরিহাস ও লঘু আমোদে খুবই পারদর্শী, একাই আড্ডা জমিয়ে রাখতে পারেন, কিন্তু অপরিচিত বা অর্ধ পরিচিতদের মধ্যে তিনি অতিরিক্ত ভদ্র ও নিয়মনিষ্ঠ হয়ে যান, মেপে মেপে কথা বলেন, শিষ্টাচারসম্মতভাবে সামান্য হাসেন।

টেবিলের ওপর নানাবিধ সুখাদ্য সাজানো রয়েছে। সাহেবপাড়া থেকে আনা হয়েছে কেক-পেস্ট্রি, দিশি খাবারও রয়েছে কিছু, বাড়িতে তৈরি নিমকি, বাগবাজারের বিখ্যাত রসগোল্লা। স্বামীজি আইসক্রিম পছন্দ করেন বলে তাও রয়েছে কিছু।

একটু পরে স্বামীজি এসে উপস্থিত হলেন ডাক্তার মহেন্দ্রলাল সরকারকে সঙ্গে নিয়ে। এই বিখ্যাত চিকিৎসক ও বিজ্ঞানপ্রেমীর সঙ্গে আগেই নিবেদিতার সৌহার্দ্য হয়েছে, তিনি উঠে দাঁড়িয়ে মহেন্দ্রলালের সঙ্গে সবার পরিচয় করিয়ে দিতে যেতেই মহেন্দ্রলাল বললেন, আরে রাখো রাখো, আমায় চেনে না কে? সব বাড়ির অন্দরমহলেই আমার গতায়াত, এদের সকলেরই নাড়ি নক্ষত্র জানি!

হা-হা করে হেসে উঠলেন তিনি। তারপর সরলার কাছে এসে তার পিঠে আলতো চাপড় মেরে বললেন, অনেকদিন তুই ইনস্টিটিউটে লেকচার শুনতে আসিস না, কেন রে? মার খাবি আমার কাছে।

নিবেদিতা একে একে সবার সঙ্গে বিবেকানন্দর আলাপ করিয়ে দিলেন। রবীন্দ্রনাথের কাছে আসার পর দুজনে হাত তুলে নমস্কার করলেন শুধু, একটি কথাও বললেন না। দু’জনেই যে দু’জনকে আগে থেকে চেনেন, সে কথাও প্রকাশ করলেন না কেউ। অনেকদিন আগে ব্রাহ্ম সমাজে যাতায়াত করত যে নরেন্দ্রনাথ দত্ত, সে বীন্দ্রনাথের গান গাইত, স্বয়ং গীতিকার রবীন্দ্রনাথ রাজনারায়ণ বসুর কন্যা লীলাবতীর বিয়ে উপলক্ষে নরেন্দ্রকে গান শিখিয়েছেন কয়েকদিন। এখনকার বিবেকানন্দ সে জীবন থেকে সরে এসেছেন অনেক দূরে, সে জীবনের কথা তিনি আর মনেও আনতে চান না। কিন্তু মেধাবী ও স্মৃতিধর বিবেকানন্দের পক্ষে ঠাকুরবাড়ির সেই অনিন্দ্যকান্তি গানের স্রষ্টাকে ভুলে যাওয়া কি সম্ভব! রবীন্দ্রনাথেরও মনে আছে সে দৃপ্ত যুবককে, যার গানের ভরাট কণ্ঠস্বর শুনে তিনি মুগ্ধ হয়েছিলেন। যখন রবীন্দ্রনাথের গান তাঁদের সমাজের বাইরে বিশেষ কেউ জানত না, তখন ওই নরেন্দ্র দত্ত নামে তরুণটি “তোমারেই করিয়াছি জীবনের ধ্রুবতারা” গানটি শুনিয়ে তাঁকে অবাক করেছিল। মনে আছে ঠিকই, কিন্তু ব্রাহ্মসমাজ ত্যাগ করে যে যুবক কালীসাধকদের দলে গিয়ে ভিড়েছে, তার সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের আর বিশেষ আগ্রহ নেই।

বিবেকানন্দ অঙ্গে জড়িয়ে আছেন গেরুয়া বসন, শীতবস্ত্র কিছু নেননি, রবীন্দ্রনাথের চেয়ে বয়সে ছোট হলেও তাঁর মাথার চুল পাতলা হয়ে গেছে, কিছু কিছু পাক ধরেছে, মুখের গৌরবর্ণ খানিকটা বিবর্ণ, তিনি যে সুস্থ নন, দু এক পলক দেখলেই বোঝা যায়। কিন্তু তীব্র তাঁর চোখের জ্যোতি, অসাধারণ মানসিক তেজ প্রতিফলিত হয়ে আছে তার মুখমণ্ডলে।

নিবেদিতা আশা করেছিলেন, এই সব বিদগ্ধ মানুষজনের সমাবেশে উচ্চাঙ্গের আলোচনা হবে, ব্রাহ্ম ও রামকৃষ্ণ-শিষ্যদের মিলন প্রস্তাবের প্রসঙ্গ উঠবে, কিন্তু সে সব কিছুই হল না, আড্ডা জমছে না, কেমন যেন ছাড়া ছাড়া ভাব। এর মধ্যে এসে গেছেন অবলা এবং জগদীশ বসু, তাদের দেখে উৎসাহিত হয়ে রবীন্দ্রনাথ ডেকে পাশে বসিয়েছেন, তাঁদের সঙ্গে কথা বলছেন নিচু গলায়। বিবেকানন্দ বসেছেন অন্য প্রান্তে, তিনি কথা বলছেন মহেন্দ্রলালের সঙ্গে, এদিকে একবার তাকাচ্ছেনও না।

পার্টিতে এরকম নিরুত্তাপ ভাত দেখে নিবেদিতা বললেন, মিস্টার টেগোর, আপনি একটা গান শোনান, নতুন রচিত গান।

জগদীশচন্দ্র বললেন, হ্যাঁ, গান হোক, গান হোক।

রবীন্দ্রনাথ একটু ভেবে নিয়ে শুরু করলেন :

বেলা গেল তোমার পথ চেয়ে।
        শূন্য ঘাটে একা আমি    পার করে লও খেয়ার নেয়ে।
        এসো এসো শ্রান্তি হরা   এসো শান্তি সুপ্তি ভরা
        এসো এসো তুমি এসো, এসো তোমার তরী বেয়ে।

অন্যদের অনুরোধে রবীন্দ্রনাথকে আরও দুটি গান গাইতে হল। নিবেদিতা মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইলেন। বিবেকানন্দর গান তিনি অনেক শুনেছেন, তার দৃপ্ত কন্ঠের উচ্চগ্রাম ও কালোয়াতি টান সব সময় নিবেদিতার কানে বাজে। কিন্তু এই কবির গান একেবারে অন্যরকম, কেমন মৃদু উদাস সুর। তিনি যেন সুর ও কথার মধ্যে একেবারে তন্ময় হয়ে গেছেন, ‘এসো শান্তি’ যখন উচ্চারণ করছেন, এক ব্যাকুল আর্তি মিশে যাচ্ছে বাতাসে।

বিবেকানন্দ আজকাল আর এ সব গান নিজে তো গানই না, পছন্দও করেন না। অত বারবার ইনিয়ে বিনিয়ে ‘বেলা গেল’ ‘বেলা গেল’ আর ‘এসো এসো’ করার কী আছে? তৃতীয় গানটি সমাপ্ত হতেই তিনি চেঁচিয়ে বললেন, মার্গট, তোমার টি পার্টিতে খাবার তো অনেক রকম রয়েছে দেখছি, কিন্তু এখনও চা এল না? গলা যে শুকিয়ে গেল।

নিবেদিতা লজ্জিতভাবে দৌড়ে চলে গেলেন রান্নাঘরের দিকে। গান শুনতে শুনতে তিনি চায়ের কথা ভুলেই গিয়েছিলেন। বুড়ি ঝি-কে বললেন, শিগগির জল চাপাও–

ঝি বলল, জল গরম করে কী হবে? দুধ যে নেই, তোমাদের এই জিনিস, চ্যা না কী বলে, তা দুধ ছাড়া কি হয়?

নিবেদিতা বললেন, দুধ নেই? সে কী? কেন নেই?

ঝি বলল, ও বেলার দুধ কেটে ছানা হয়ে গেছে। গয়লা বাড়িতে খবর নিয়ে এসেছিলুম, তা গয়লা মিনসে তো এখনও দুধ দিয়ে গেল না!

নিবেদিতা গালে হাত দিলেন। সর্বনাশ! এ দেশে সবাই দুধ-চিনি মিশিয়ে চা খায়। অতিথিদের চা দেওয়া যাবে না। মান-সম্মান সব যাবে।

সরলা রায় এই সময় উঠে এসে জিজ্ঞেস করলেন, মিস নোবল, আমি কি চা বানাতে সাহায্য করতে পারি?

নিবেদিতা কাঁদো কাঁদো হয়ে সরলা রায়ের হাত জড়িয়ে ধরে বললেন, মিসেস রায়, দারুণ বিপদে পড়ছি। বাড়িতে দুধ নেই এক ফোঁটাও। চায়ের নেমন্তন্নে আমি চা দিতে পারব না?

সরলা রায় হেসে বললেন, এতে এমন বিপদের কী আছে! চা বানাতে আর কত দুধ লাগে। সব গেরস্ত বাড়িতেই দুধ থাকে। ওগো ঝি, পাশের কোনও বাড়ি থেকে এক বাটি দুধ চেয়ে আনো তো বাছা। দুধ চাইলে কেউ না বলে না।

তারপর নিবেদিতাকে আশ্বস্ত করে তিনি বললেন, আপনি চিন্তা করবেন না, আমি সব ব্যবস্থা করে চা পাঠাচ্ছি। এখানে কেউ কোনও কথা বলছে না, আপনার ওখানে গিয়ে বসা উচিত।

বিবেকানন্দ এর মধ্যে একটা লম্বা চুরুট ধরিয়েছিলেন। নিবেদিতাকে ফিরতে দেখে বললেন, চা আসছে?

নিবেদিতা বিনীতভাবে বললেন, একটু দেরি হবে, অনুগ্রহ করে আপনারা অপেক্ষা করুন।

মহেন্দ্রলাল সরকার বললেন, এক পেয়ালা চা খেয়েই উঠব। অনেক কাজ আছে।

তারপর বিবেকানন্দর দিকে চেয়ে বললেন, হ্যাঁ হে নরেন, শুনলুম বেলুড়ে তোমরা একটা মস্ত বড় আখড়া বানাচ্ছ? মেমসাহেবরা টাকা দিয়েছে। সেখানে কী হবে?

বিবেকানন্দ সহাস্যে বললেন, আমার গুরুভাইদের থাকার জন্য একটা আস্তানা তো দরকার। ভাড়াবাড়ি থেকে বারবার খেদিয়ে দেয় আমাদের। আরও অনেক ছেলে আমাদের গুরুর টানে সংসার ছেড়ে আসতে চায়।

মহেন্দ্রলাল বললেন, সেখানে কি গুলতুনি হবে না কি ঠাকুর-ফাকুর বানিয়ে পুজোআচ্চাও চালাবে? ধুমধাম করে কিছু পুজো না করলে তো এ দেশের মানুষদের মন ভরে না। তবে হ্যাঁ, প্লেগের সময় তোমরা দলবল মিলে খুব একচোট সেবা করেছ মানুষের। শাবাশ! মাই হ্যাটস অফ। এই মিস নোবলকে একদিন দেখি নিজে ঝাঁটা নিয়ে বস্তির রাস্তা পরিস্কার করছে। তাই দেখে লজ্জা পেয়ে একদল ছোকরা ছুটে এসে ওঁর হাত থেকে ঝাঁটা কেড়ে নিয়ে নিজেরা সে কাজ শুরু করল। তখনই তো আমি নিজে থেকে ওঁর সঙ্গে আলাপ করেছি।

বিবেকানন্দ বললেন, আজ্ঞে, মানুষের সেবা করাই তো শ্রেষ্ঠ পূজা।

মহেন্দ্রলাল ভুরু তুলে বললেন, বটে! তাই নাকি? অনেকেই তো মুখে এই সব বড় বড় কথা বলে, চমৎকার শোনায়! তবু কোনও একটা মূর্তির সামনে গিয়ে ম্যা ম্যা করে কেঁদে ভাসাতেও তো ছাড়ে না। তুমি আমেরিকায় গিয়ে প্রচুর বক্তৃতা দিয়ে লালমুখো সাহেবদের আমাদের ধর্ম শিখিয়ে এসেছ। এখন এ দেশে তোমার প্লান কী? এ দেশের গরিবগুরবো লোকদেরও ধর্ম শেখাবে?

বিবেকানন্দ বলেন, ডাক্তারবাবু, আপনি অনেক মানুষ দেখেছেন জানি। কিন্তু শহরের বাইরে, গ্রামে-গঞ্জে, সারা ভারত ঘুরে ঘুরে আমি দেখেছি। এ দেশের সাধারণ মানুষের অবস্থা আমি আপনাদের থেকে ভাল জানি। চতুর্দিকে অসহ দারিদ্য, অশিক্ষা, কুশিক্ষা, কুসংস্কার। দারিদ্রই সব রোগের মূল। দারিদ্র মানুষকে একেবারে নির্জীব, কাপুরুষ করে দেয়। আমার গুরু বলতেন, খালি পেটে ধর্ম হয় না। আমিও মনে করি, এমনকী এ দেশের একটা কুকুরও যতদিন অভুক্ত থাকবে, ততদিন বেদ-পুরাণ-কোরান-বাইবেল চর্চার প্রয়োজন নেই। দেশবাসীর অন্ন জোগানোর ব্যবস্থা করা ছাড়া আর কোনও ধর্মের প্রয়োজন নেই।

গভীর বিস্ময়ে চক্ষু বিস্ফারিত করে মহেন্দ্রলাল বললেন, অ্যাঁ, বলো কী! এমন কথা বাপের জন্যে শুনিনি। আর কোনও মহাপুরুষও তো এই কথা বলেননি।

তারপর বিবেকানন্দর পিঠে একটা চাপড় মেরে তিনি বললেন, নরেন, তুমি যদি এই কাজ শুরু করতে পারো তা হলে বয়েসে অনেক বড় হয়েও আমি তোমার পায়ের ধুলো নেব। তোমার হুকুমের চাকর হয়ে থাকব।

এর মধ্য চা এসে গেল। আবার সবাই নীরব। সবাই যেন চায়ে চুমুক দিতেই বাস্ত।

চা শেষ হল, তবু আর কেউ মুখ খোলে না। নিবেদিতার মনে হল, এখানে যেন একটা মেঘ জমে আছে। থমথম করছে বাতাস।

মহেন্দ্রলাল বললেন, নরেন, তুমি একখানা গান শোনাবে নাকি?

বিবেকানন্দ বললেন, না, আজ থাক।

মহেন্দ্রলাল সাড়ম্বরে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, তা হলে আর বসে থেকে কী হবে! থাঙ্কি ইউ মিস নোবল, থাঙ্ক ইউ ফর হাই টি।

মহেন্দ্রলাল বিদায় নেবার পর আসর ভঙ্গ হল। সবাই বিদায় নিতে লাগলেন। রবীন্দ্রনাথ নিবেদিতাকে আনুষ্ঠানিকভাবে ধন্যবাদ জানালেন এর বিবেকানন্দর দিকে তাকিয়ে বললেন, নমস্কার।

বিবেকানন্দ বললেন, নমস্কার।

দু’জনের মধ্যে আর একটিও বাক্য বিনিময় হল না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *