২১. স্বর্গের নন্দনকাননে

বিন্দুবাসিনী একটা স্বপ্ন দেখছিল। স্বর্গের নন্দনকাননে সে শুয়ে আছে গোলাপের পাপড়ি বিছানো তৃণশয্যায়, তার সামনে দাঁড়িয়ে এক জ্যোতিষ্মান পুরুষ, মাথায় সুবর্ণ কিরীট, মুখখানি অপরূপ হাস্যময়। বিন্দু চিনতে পারলো, ইনিই তো জনাৰ্দনরূপী বিষ্ণু স্বয়ং, যিনি সমস্ত জগতের পতি এবং বিন্দুবাসিনীর আরাধ্য। তিনি বিন্দুবাসিনীর দিকে হাত বাড়িয়ে ভুবনমোহন স্বরে বললেন, উঠে এসো, কোন অভিমানে তুমি শুয়ে আছে, এই তো আমি দর্শন দিয়েছি।

শরীরে মানুষের স্পর্শ লাগতেই বিন্দুবাসিনী ঘুম ভেঙে ধড়মড় করে উঠে বসলো। দারুণ চমকে গিয়ে বললো, এ কি, তুই?

গঙ্গানারায়ণ বিন্দুর খুব কাছে মাটিতে হাত রেখে ঝুঁকে বসে একদৃষ্টে দেখছিল বিন্দুর ঘুমন্ত মুখখানি। যেন একটি সাদা ফোঁটা পদ্ম, তাতে শারদ শিশিরের মতন কয়েকটি শ্বেত কণা। বিন্দুবাসিনী এখন পূর্ণ যুবতী, তার রূপ যেন ফেটে পড়ছে। কোমর পর্যন্ত নেমে এসেছে নিবিড় বিষরি মেঘের মতন কেশভার, তার বুকে যৌবন যেন আপনি আগমনের কথা জানান দিচ্ছে শব্দ করে। তার উরুর রেখা ভঙ্গিমা পারস্য দেশীয় খড়েগের মতন।

অকৃত্রিম বিস্ময়ের সঙ্গে বিন্দু প্রশ্ন করলো, একি গঙ্গা, তুই ঠাকুরঘরে ঢুকিচিস যে?

গঙ্গানারায়ণ বললো, আমি অনেকক্ষণ দাঁড়িয়েছিলুম। বাইরে, তোর ঘুম ভাঙাতে চাইনি। কী অপরূপ লাবণ্যময়ী হয়চিস তুই, বিন্দু! তাই আমি আর মাথার ঠিক রাখতে পারলুম না।

বিন্দু ঈষৎ হাস্যে বললো, আহা হা, ঢং! তোর বোয়ের খবর কী? বাপের বাড়ি থেকে এয়েচে?

অন্যমনস্কভাবে গঙ্গানারায়ণ বললো, না।

—তাকে আর কতদিন বাপের বাড়িতে ফেলে রাকবি? তাকে নিয়ে আয় এবার। আমরা একটু মনের মতন করে তাকে সাজাই!

-সে আসতে চায় না।

—ওমা সেকি কথা? বাড়ির প্রথম বউ, সে আর কতদিন বাইরে বাইরে থাকবে। নতুন বউ পায়ে মল পরে ঝামর ঝামর করে সারা বাড়ি ঘুরে বেড়াবে, তবেই না আনন্দ!

গঙ্গানারায়ণ বিন্দুর একখানি হাত ধরে আবেগাপ্নত কণ্ঠে বললো, এখন তার কথা থাক। বিন্দু, তুই একটু আমার পানে চা।

বিন্দুবাসিনী গঙ্গানারায়ণের চেয়ে বয়সে সামান্য ছোট হলেও ভাবভঙ্গিতে যেন অনেকখানি বড়। একুশ বৎসর বয়েসে গঙ্গানারায়ণ জীবনে প্রতিষ্ঠিত এবং উচ্চদায়িত্বসম্পন্ন পুরুষ হয়েও বিন্দুর সামনে সে আচরণ করছে বালকের মতন।

বিন্দুবাসিনী গঙ্গানারায়ণের আবেগ-ভোব অগ্রাহ্য করে পুনরায় খুব স্বাভাবিকভাবে বললো, বাড়ির বউকে বেশী দিন বাপের বাড়িতে রানকা মোটেই কাজের কতা নয়। এবার লোক পাটিয়ে তাকে নিয়ে আয়। তিন বাচর হলো বিয়ে হয়েচে, এখন তো আর সে ছোটটি নেই।

গঙ্গানারায়ণ অপ্ৰসন্নভাবে বললো, আজো সে বালিকা। আমার কোনো কথাই সে বোঝে না। সে তার মায়ের আদরিণী মেয়ে, এ বাড়িতে এলেই মায়ের জন্য কাঁদাকাটি করে। এখনো সে পুতুল খেলে।

বিন্দুবাসিনী সহাস্যে বললো, তুই এবার নিয়ে আয়, আমরা তাকে সব শিকিয়ে পড়িয়ে দেবো। এখন সে তোকে নিয়েই পুতুল খেলবে। মেয়েমানুষের সবচেয়ে বড় পুতুল তো তার স্বামী।

—বিন্দু, সে কোনোদিনই আমার জীবনসঙ্গিনী হতে পারবে না। সে লেখাপড়া কিচুই শেখেনি।

—তুই শিকিয়ে পড়িয়ে দিবি। তুই এত বড় বিদ্বান হয়িচিস।

—আমি তোর সাথে বসে অনেক বই পড়বো। মনে আচে, আমাদের একসঙ্গে মেঘদূতম পাঠের কথা ছেল? আজও তা হলো না।

—আমার আর লেখাপড়া! আমার মতন মেয়েরা লেখাপড়া করলে সে বাড়ির অকল্যাণ হয়!

—তোর সেই অভিমান এখনো আচে, না বিন্দু? খুড়োমশাই তোর পড়া বন্ধ করে দিয়েছিলেন-এবার থেকে আমরা গোপনে এক সাথে পড়বো আবার।

—আমার হাত ছাড়, বাইরে গিয়ে দাঁড়া। তুই ঠাকুরঘরে ঢুকিচিস, কেউ যদি দ্যাকে?

—বিন্দু, তোকে বিনে আমি বাঁচবো না।

—মরণ! মাথায় বুঝি ভূত সেঁধিয়েচে? যা, বাইরে যা বলচি!

—কেউ দেখবে না। বাড়িতে কেউ নেই। আমি কায়স্থ বলে তুই-ও আমায় ঠাকুরঘর থেকে তাড়িয়ে দিবি? কেন, কায়স্থ হয়ে জন্মিচি বলেই আমি কিসে অপবিত্ৰ?

সে কথার উত্তর না দিয়ে বিন্দু একটুক্ষণ উৎকৰ্ণ হলো। সে ঘুমিয়ে পড়েছিল, কখন বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যে নেমে এসেছে সে টেরও পায়নি।। ঘরের মধ্যে এখন আবছা আবছা অন্ধকার। সারা বাড়িটা নিস্তব্ধ মনে হয়।

বিন্দু জিজ্ঞেস করলো, বাড়িতে কেউ নেই কেন? সবাই কোতায় গেল?

গঙ্গানারায়ণ বললো, আজ শ্ৰীরামপুরে আমার বড় মামার বাড়িতে সকলের নেমন্তন্ন, তুই জানিস না? সবাই বেলাবেলি রওনা হয়ে গ্যাচে।

বিন্দুবাসিনী একটি সংক্ষিপ্ত দীর্ঘশ্বাস ফেলে অন্যদিকে মুখ ফেরালো। গঙ্গানারায়ণকে সে তার মনের ভাব বুঝতে দিতে চায় না। সে বিধবা, তাকে তো কোথাও নিয়ে যাওয়া হবে না, তাই কোনদিন কবে নেমন্তন্ন থাকে সে কথা তাকে জানাবারও প্রয়োজন মনে করে না কেউ। ক্রমে ক্রমে এ বাড়ির অনেকেই তার অস্তিত্ব সম্পর্কে বিস্মৃত হয়ে যাচ্ছে। সে তিনতলার ঠাকুরঘরে নির্বাসিতা।

আবার মুখ ফিরিয়ে বিন্দুবাসিনী জিজ্ঞেস করলো, সবাই গ্যাচে, তুই যাসনি কেন?

গঙ্গানারায়ণ বললো, আমার যে জ্বর। তুই তো আমার খবরও রাকিস না, তিনদিন ধরে আমি জ্বরে শুয়েচিলাম।

নারীদের চিরকালীন স্বভাব্যবশত অসুখের কথা শুনেই বিন্দুবাসিনী ঈষৎ ব্যাকুল হয়ে গঙ্গার কপালে হাত ছুঁইয়ে বললো, ওমা, এখনো জ্বর রয়েচে দেকচি! তুই এই জ্বর-গায়ে বেরিয়ে এলি?

উদ্ভিন্নযৌবনা বিন্দুকে এত কাছে পেয়ে গঙ্গানারায়ণ আর স্থির থাকতে পারলো না। তাকে আলিঙ্গন করে বুকে টেনে নিল।

রীতিমতন ভয় পেয়ে বিন্দু বললো, এ কি গঙ্গা, তুই কি পাগল হয়ে গেলি? জুরের জন্য তোর বিকার হয়েচে। ছাড়ি, ছাড় আমাকে।

—না, আমি আর তোকে কোনোদিন ছাড়বো না!

—তোর মাথায় পাপ ঢুকেচে। গঙ্গা, তুই ঠাকুরের সামনে…ছি, ছি, ছি, আমার মরে যেতে ইচ্ছে কচ্চে, তুই আমাকে ছাড়, নইলে আজই আমি আত্মঘাতিনী হবো।

বিন্দুবাসিনীর এই মুক্তি পাওয়ার চেষ্টার মধ্যে কোনো প্রকার ছলাকলা নেই বুঝতে পেরে গঙ্গানারায়ণ ছেড়ে দিল তাকে। আহত, কাতর কণ্ঠে বললো, বিন্দু, তুই সত্যিই আমায় চাস না?

গঙ্গানারায়ণ সরোষে সে মূর্তির দিকে হাত বাড়িয়ে বললো, আমি ভেঙে ফেলবো এই পাথরের ঠাকুর।

বিন্দুবাসিনী তার হাত চেপে ধরে বললো, তুই কি সত্যি পাগল হলি? এসব কথা তো তোর মুখে কখনো শুনিনি? তোর কী হয়েচে আমায় সব বল তো!

গঙ্গানারায়ণ বললো, আমি কদিন জ্বরে পড়েচিলাম, আমার কিচুই ভালো লাগচিল না। আমার বন্ধুরা এসেচিল, তাদের সঙ্গও আমার ভালো লাগেনি। মা বলেচিলেন, বাগবাজার থেকে লীলাবতীকে আনবেন, আমি বলিচিলুম, থাক মা। সে পুতুল খেলা নিয়ে আচে থাক। আমি তো সেবা চাইনি, আমি চেয়িচিলুম সাহচর্য। লীলাবতী তো আমায় তা দিতে পারে না, সে এখনও অবোধ বালিকা-আমার খুব অভিমান হচ্চিল, তুই আমাকে ভুলে গেচিস।

—আমি কি তোকে কখনো ভুলতে পারি, গঙ্গা? আমার আর কী আচে যে তোকে ভুলবো?

—এই যে বললি, তোর জনাৰ্দন আচে? কিন্তু আমার আর কেউ নেই, আমি অনেক ভেবে দেখিচি, তুই দূরে থাকলে আমি কিছুতেই শান্তি পাবো না। আমার কোনো আশ্রয় নেই, অথচ তুই বারবার আমাকে ঠেলে দিসা-কেন বিন্দু, কেন, আমার জন্য তোর টান হয় না?

—চল গঙ্গা, আমরা ঠাকুরঘরের বাইরে যাই।

—তুই এখনো ভাবচিস, আমি এখানে থাকলে তোর জনার্দিনের ঘর অপবিত্র হয়ে যাবে? আমি সত্যিই একদিন ভূয়ে আছড়ে তোর এ ঠাকুরকে ভেঙে ফেলবো!

—তুই বুঝি। বেহ্মদের দলে নাম লিকিয়িচিস? শুনলুম তুই দেবেন। ঠাকুরের বাড়িতে যাতায়াত করিস আজকাল?

–তোকে কে বললে?

—তুই ভাবিস আমি তোর খবর রাখি না। কিন্তু আমি সব খবরই রাখি।

—শুধু আমি কাচে এলেই তুই দূরে ঠেলে দিস! আজি আমি তোকে ছাড়বো না। আজ আমাকে বাধা দেবার কেউ নেই।

—ছিঃ! বাড়িতে কেউ নেই বলেই বুঝি তোকে চোরের মতন আসতে হবে! তুই তো রাজা, তুই যেখানে যাবি, রাজার মতন যাবি! তোর কত যাবার জায়গা আচে। আমি দূরেই থাকবো, সেই তো আমার নিয়তি।

–আমি নিয়তি মানি না।

—তুই মানিস না, কিন্তু আমায় মানতেই হবে। আমি যে স্ত্রীলোক।

এই কথা বলেই বিন্দু হাসলো। তার কণ্ঠে একটুও দুঃখের সুর নেই। ইতিমধ্যে ঘরের মধ্যে অন্ধকার গাঢ় হয়েছে, গবাক্ষের বাইরে আকাশে জ্যোৎস্নাধারা।

—তুই হাসলি কেন?

—আমরা একসঙ্গে পড়াশুনো কত্তুম, তোর মনে আচে? হঠাৎ পণ্ডিতমশাই একদিন বলেচিলেন, আমি আর বালিক নই, আমি স্ত্রীলোক। তখন অবাক হয়িচিলুম, রাগও ধরেছিল খুব। কিন্তু এখন তো সত্যিই আমি স্ত্রীলোক। স্ত্রীলোকের অনেক কিচুই করতে নেই, এমনকি ছেলেবিয়সের খেলার সাখী যে তুই, সে তুই-ও এখন আমার কাচে পরপুরুষ, তোর কাঁচাকাচি আমায় বসতে নেই। তুই এটা বুঝিাস না?

—না। আমি বুঝবো না। বিন্দু, আমি তোকে চাই।

–এ জন্মে নয়।

-হ্যাঁ, এ জন্মেই!

গঙ্গানারায়ণ আবার বিন্দুবাসিনীর দু বাহু চেপে ধরে তার সুমেরু পর্বত সদৃশ স্তনের ওপর ব্যাকুল মুখখানি চেপে ধরলো।

নিশ্বাস রোধ করে শরীর শক্ত করে রইলো বিন্দু। তারপর শান্ত অথচ দৃঢ় কণ্ঠে বললো, ছাড়, আমাকে একবার ছাড়, আগে আমার একটা কতা শোন।

—আমি আর তোর কোনো কতা শুনরো না।

—তুই একবার ছাড়, তারপর তোর সব কথা আমি শুনবো!

গঙ্গানারায়ণ ছেড়ে দিতেই বিন্দুবাসিনী ঝটিতি উঠে পড়েই ছুটলো ঘরের বাইরে গঙ্গানারায়ণও তৎক্ষণাৎ তাড়া করে গেল তাকে। নীচের তলার দাসদাসীরা কেউ ওপরে আসবে না, দ্বিতল, ত্রিতল সম্পূর্ণ ফাঁকা। বিন্দুবাসিনী কোথায় লুকোবে? নীচে যাবার সিঁড়িতে পৌঁছোবার আগেই গঙ্গানারায়ণ তাকে ধরে ফেলবে বুঝতে পেরে সে ছুটতে লাগলো ছাদের দিকে।

যেন বাল্যকালের মতন পরস্পরকে ধরার খেলা। এককালের দুই শিশু-খেলুড়ে এইরকম ভাবেই ছাদে ছুটোছুটি করতো। তবে তখন সব খেলাই ছিল উদ্দেশ্যহীন, কিন্তু দুই যুবক-যুবতী আধো অন্ধকার ছাদে সে প্রকার অনাবিল উদ্দেশ্যহীন খেলা আর খেলতে পারে না।

গঙ্গানারায়ণ অচিরেই ধরে ফেললো বিন্দুবাসিনীকে। সবলে তাকে নিজ শরীরের সঙ্গে চেপে ধরে ক্ষ্যাপার মতন তার সারা মুখে চুম্বন বর্ষণ করতে লাগলো।

একবার ক্ষণেকের জন্য গঙ্গানারায়ণ নিবৃত্ত হতেই বিন্দু বসে পড়লো তার পায়ের কাছে। গঙ্গানারায়ণের জানু ধরে, এতক্ষণ বাদে এই প্রথম সে ব্যথিত গলায় বললো, গঙ্গা, আমি পাপ করতে পারবো না। কিছুতেই পারবো না। তুই আমার বন্ধু হয়েও এমন সর্বনাশ কর্বি?

গঙ্গানারায়ণ বললো, পাপ? এই যদি পাপ হয়, তবে পুণ্য কী? লোকে যাকে পুণ্য বলে, তার সব কিচু আমি পরিত্যাগ করতে রাজি আচি। আমার যথাসর্বম্বের বিনিময়েও আমি তোকে চাই, এই কি পাপের চাওয়া?

বিন্দু বললো, তুই এসব আর আমাকে বলিসনি। এ জন্মটা আমার এইভাবেই যাবে। আশীর্বাদ কর, যেন পরের জন্মে তোকে আমার নিজের করে পেতে পারি।

গঙ্গানারায়ণ নিজেও হাঁটু গেড়ে বিন্দুর মুখোমুখি বসে পড়ে বললো, পরজন্ম আছে কিনা কে বলতে পারে? তার জন্য এ জন্মটায় নিজেকে বঞ্চনা করা মুখামি নয়? আর বিন্দু, এই দেশ কিংবা এই সমাজের বাইরেও অন্য দেশ, অন্য সমাজ আচে, চল, আমরা সেরকম কোনো স্থলে চলে যাই। সেখানে কেউ আমাদের চিনবে না।

বিন্দু বললো, কিন্তু আমরা কি নিজের কাচ থেকে পালাতে পারবো? আমি নিজেই যে জানি, এটা পাপ।

—না, পাপ নয়।

—গঙ্গা, তুই আমাকে ছাড়, আমি পারবো না, কিছুতেই পারবো না।

—বিন্দু, তোকে আমি ছাড়তে পারি না, তোর এই অনিন্দ্যসুন্দর কান্তি, এমন দেবীর মতন মুখের শোভা—আমার বুকে তুই আগুন জ্বলিয়িচিস বিন্দু।

গঙ্গানারায়ণ ফের বিন্দুকে বক্ষে টানতে যেতেই বিন্দু দু হাতে তাকে বাধা দিয়ে বললো, তুই যদি আমার ওপর জোর করিস। তবে তুই শুধু আমার শরীর পাবি, মন, পাবি না। আর আজ রাতেই আমি গলায় ফাঁস বেঁধে মরবো। তুই তো আমার জেদ জানিস?

গঙ্গানারায়ণ বিন্দুকে ছেড়ে দিয়ে তীক্ষ্ণ ভাবে বিন্দুর মুখখানি পরীক্ষা করতে করতে বললো, এমন? সত্য করে বল তো, অপর কারোর ওপর তোর মন মজেচে?

——ছিঃ, আমন কথা বলতে নেই, গঙ্গা।

–বিন্দু, তুই আমাকে চাস না?

—এমন নোংরা, কদৰ্যভাবে তোকে আমি চাই না। আমার কাচে তুই থাকিবি শুদ্ধ, সুন্দর, জ্যোতির্ময়রূপে।

উঠে দাঁড়িয়ে গঙ্গানারায়ণ বললো, আমি চললুম। আর আমি তোর কাচে কোনোদিন আসবো না।

বিন্দুবাসিনী কোনো উত্তর দিল না।

গঙ্গানারায়ণ আবার বললো, আমার মাথার মধ্যে কেমন আগুন জ্বলচে, তুই কিচুই বুঝলি না। জানি না, এখন কিসে শান্তি পাবো। আমাকে না দেখলেই তুই খুশী হোস তো, আমি আর আসবো না তোর কাচে।

বিন্দু এবারও কোনো কথা বললো না। ছাদের আলসেতে হেলান দিয়ে বসে রইলো হাঁটুতে চিবুক ভর দিয়ে।

গঙ্গানারায়ণ পিছন ফিরে ক্রুদ্ধভাবে চলে গেল, সিঁড়িতে তার পদশব্দ হতে লাগলো, তবু কেউ তাকে ফিরে আসবার জন্য ডাকলো না। পথ দিয়ে সে পদব্ৰজে ধাবিত হলো নিজের বাড়ির দিকে। এ গৃহও শান্য। কারুর সঙ্গে কথা বলে যে সে তার মস্তিষ্ক জুড়োবে, তার উপায় নেই। অথচ বন্ধু-বান্ধব কারো কাছে যেতেও তার ইচ্ছে হলো না। শান্ত, মৃদু স্বভাবের গঙ্গানারায়ণ আজ অত্যন্ত চঞ্চল ও উদভ্ৰান্ত। শহরে স্ত্রীলোকের অভাব নেই। ইচ্ছা হলে গঙ্গানারায়ণ এখনই জুড়ি গাড়ি হাঁকিয়ে কোনো রূপসী সঙ্গীতপটীয়সী বারাঙ্গনার গৃহে গিয়ে উপস্থিত হতে পারে, তার এখন অর্থেরও অভাব নেই। কিন্তু বিন্দুবাসিনী ছাড়া আর কোনো রমণী তাকে আকৃষ্ট করতে পারে না। বিন্দু তার জীবনে শুধু নারীর প্রয়োজন মেটারে না, বিন্দু তার চেয়েও বেশী অনেক কিছু। সেই বিন্দু তাকে প্রত্যাখ্যান করে ফিরিয়ে দিল।

সেই সন্ধ্যাকালেই নিজের শয্যায় শুয়ে ছটফট করতে লাগলো গঙ্গানারায়ণ।

গঙ্গানারায়ণের এই চাঞ্চল্য এর পরের কয়েকদিনেও কমলো না একটুও। অথচ মন শাস্ত করা দরকার। অনেকটা শান্তি পাওয়া যায় দেবেন্দ্রবাবুর কাছে গিয়ে তাঁর মুখনিঃসৃত বাণীগুলি শুনলে।

তার কলেজ জীবনের সহপাঠী রাজনারায়ণ বসু এখন দেবেন্দ্রবাবুর তত্ত্ববোধিনী সভার অধীনে উপনিষদ অনুবাদকের চাকুরি করে। একসময় রাজনারায়ণ অতিরিক্ত মদ্যপান শুরু করেছিল, এখন কিছুটা শুধরেছে। রাজনারায়ণ একসময় ছিল সংশয়বাদী, সকল ধর্ম নিয়ে ঠাট্টা বিদ্রুপ করতো, এখন যেন তার মন খানিকটা ফিরেছে। ধর্মপথে। দেবেন্দ্রবাবু উপনিষদের শ্লোকগুলি পাঠ করে তারপর তার অর্থ ও ব্যাখ্যা বুঝিয়ে দেন। সেই শুনে শুনে রাজনারায়ণ এই শ্লোকগুলি ইংরেজিতে অনুবাদ করে। উপনিষদের দুরূহ শ্লোকগুলি দেবেন্দ্ৰবাবু এমনই প্ৰাঞ্জল ও সুললিত ভাষায় ব্যাখ্যা করেন যে তা শুনবার জন্য অনেকেই সেখানে ভিড় করে। গঙ্গানারায়ণ একদিন তার বন্ধু রাজনারায়ণের সঙ্গে গিয়ে দেবেন্দ্রবাবুর প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়েছে। দেবেন্দ্রবাবুও তাকে প্রীতির চক্ষে দেখেন।

কয়েকদিন সেখানে গিয়েও গঙ্গানারায়ণের মন শান্ত হলো না। ধর্ম, দর্শন, সমাজ, সংস্কার কিছুই যেন আর তার ভালো লাগে না। মন সর্বক্ষণ বিন্দুর সান্নিধ্যে যাবার জন্য ছটফট করে। নিজেকে শাস্তি দেবার জন্য সে জমিদারি পরিদর্শনে চলে গেল কুষ্টিয়ায়।

সেখানে পৌঁছেই বুঝলো, সে আরও ভুল করেছে। কলকাতায় তবু বরং এটুকু সান্ত্বনা ছিল যে, বিন্দু অদূরেই আছে, ইচ্ছা করলেই সে ছুটে গিয়ে বিন্দুকে একবার দেখে আসতে পারে। কিন্তু কুষ্টিয়া যেন তার কাছে মরুভূমির ন্যায় প্রতীয়মান হলো। কাজকর্ম সব অসমাপ্ত রেখে সে আবার ফিরে এলো কলকাতায়।

আবার এক সায়াহ্নে সে বিন্দুর ঠাকুরঘরে উপস্থিত হয়ে বললো, আমি হার মানলাম বিন্দু। তোকে ছেড়ে আমি কিছুতেই দূরে রইতে পাচ্চি না!

বিন্দু রাগ করলো না, বরং সুমিষ্ট স্বরে তাকে বললো, আয়, দোরের কাচে বোস। শরীরের উপর খুব বুঝি অযত্ন করচিস?

কিন্তু শুধু বিন্দুর সুমিষ্ট বাক্য শুনলেই গঙ্গানারায়ণের মন ভরে না। আর। দূরে থাকার সময় সে ভেবেছিল, বুঝি একবার বিন্দুর মুখখানি দেখলেই তার হৃদয় জুড়োবে। কাছে এসে বুঝলো, পতঙ্গ যেমন অগ্নিশিখার দিকে ধায়, তেমনি বিন্দুর রূপরাশির মধ্যে সে চায় আকণ্ঠ নিমজিত হতে।

বিন্দু কিছুতেই তাকে প্রশ্রয় দেবে না। গঙ্গানারায়ণ যদি দূরে বসে তার সঙ্গে গল্পগাছা করতে চায় তার আপত্তি নেই, কিন্তু গঙ্গানারায়ণ তার হস্ত আকর্ষণ করলেই বিন্দু বলে, তুই কি চাস আমি মারি? পাপের পথে যাওয়ার চেয়ে মরণও ভালো।

গঙ্গানারায়ণ প্রশ্ন করে, আর কিচু নয়, আমি যদি তোর ক্ৰোড়ে মাথা দিয়ে শুই, তাও কি পাপ?

বিন্দু বলে, অমন কতা উচ্চারণ করাও পাপ। এমন কি হাতে হাত ছোঁয়াও পাপ।

গঙ্গানারায়ণ উন্মত্তবৎ হয়ে উঠলো। সে জিদ ধরলো, বিন্দুর এই প্রতিরোধ সে ভাঙবেই। বিন্দুকে না পেলে তার জীবনের আর সব কিছু ব্যর্থ। তার আর দিগ্বিদিক জ্ঞান রইলো না। অফিস-কাছারি থেকে সে যখন তখন চলে এসে বসে থাকে বিন্দুর কাছে। সে গৃহে তার অবারিতদ্বার। যে-কোনো সময় সে আসতে পারে, যার কাছে খুশী সে যেতে পারে, কেউ তাকে বাধা দেবে না। কিন্তু সে যে আর কারো কাছে নয়, শুধু সৰ্বক্ষণ বিন্দুর কাছেই নিভৃতে বসে থাকে, এটা যে দৃষ্টিকটু এ বোধ তার লুপ্ত হয়ে গেছে। বিন্দুকে ছাড়া এ জগতের আর কিছুই যেন সে এখন দেখতে পায় না।

এক নিঝুম দ্বিপ্রহরে গঙ্গানারায়ণ আবার বিন্দুর ওপর বলপ্রয়োগ করতে গেল। বিন্দু সেদিন কেঁদে ফেললো একেবারে। বিন্দু বড় অসহায়। সে চিৎকার চেঁচামেচি করতে পারে না, কারণ গঙ্গানারায়ণ যে তার বড় প্রিয়, গঙ্গানারায়ণের সম্মানহানি হোক, তাই বা সে চাইবে কী করে! সে কাঁদতে কাঁদতে বলতে লাগলো, আমার মরণই ভালো। তুই কেন এমনভাবে নিজের সর্বনাশ করচিস গঙ্গা? তুই আমায় বিষ। এনে দে!

গঙ্গানারায়ণ বিন্দুকে বক্ষে আঁকড়ে ধরে বলতে লাগলো, আমি আর কিচু জানি না, আয় আজ তুই আমি দুইজনে মরণ-উৎসবে মাতি।

বিন্দু ফিসফিস করে বললে, ছেড়ে দে, ওরে আমায় ছেড়ে দে, আমায় এমনভাবে নরকের দিকে য় যাসনি—

পক্ষকাল ধরেই এ বাড়ির দাসদাসী মহলে পাঁচরকম কথা কানাকানি হচ্ছিল। কথা পৌঁছেছিল বাড়ির গৃহিণীরও কানে। দাসী সমভিব্যাহারে বিন্দুর মা নিজে সেই সময় এসে এ দৃশ্য দেখে শিউরে উঠলেন। গৃহদেবতার সামনে ব্যভিচারক্রিয়া চলছে।

তিনি তীক্ষ্ণ স্বরে ডাকলেন, বিন্দু!

তারপর কপাল চাপড়ে বললেন, হা অদৃষ্ট, এ কি কল্লে? বিন্দু, পোড়ারমুখী, ঘরজ্বালানী, তুই মরলিনি কেন? তোর মনে মনে এই ছেল? গঙ্গা আমাদের সোনার টুকরো ছেলে, তুই তার ওপর বিষ নজর দিইচিস! ডাইনী!

গঙ্গানারায়ণের চৈতন্য উদয় হলো। বিন্দুর কাছ থেকে সরে এসে নতমস্তকে বললো, খুড়িমা, দোষ আমার। বিন্দুর কোনো দোষ নয়।

বিন্দু পাষাণমূর্তির মতন স্থির।

বিন্দুর মা সৌদামিনী গঙ্গানারায়ণকে বললেন, গঙ্গা, তুমি সরে এসো, ও ডাইনীর কাচে থেকে না। আমার পেটে আমি এই বিষপুঁটুলি ধরিচিলাম। ওফ!

গঙ্গানারায়ণ বাইরে বেরিয়ে আসতেই তিনি দরজা টেনে শিকলি বন্ধ করে দিয়ে বললে, ও থাকুক। এখানে। কত্তা এসে ওকে নিয়ে যা করার করবেন। তুমি এসো, গঙ্গা, নীচে এসো—

দাসীর দিকে ফিরে গৃহকর্ত্রী কড়া সুরে বললেন, দেখিস, খাপরদার যেন এ সব কথা পাঁচ কান হয় না! তাহলে তোর জিভা কেটে দেবো!

গঙ্গানারায়ণ আচ্ছন্নের মতন বললো, আপনি-বিন্দুকে বন্ধ করে রাখলেন-দোষ যে সব আমার-আমিই ওর ওপর জোর খাটাচ্চিালুম-।

গঙ্গানারায়ণ কিছুতেই সেখান থেকে যাবে না। কথাবার্তা উচ্চগ্রামে উঠছে ক্রমশ। দৈবাৎ সেদিন বিধুশেখরও গৃহে ছিলেন, তিনি উঠে এলেন ওপরে।

তাঁকে দেখে সবাই চুপ করে গেল।

গঙ্গানারায়ণ কম্পিতবক্ষে বললো, খুড়ামশাই, বিন্দুকে ক্ষমা করুন। আমার মতিভ্রম হয়েছেল, আমি বিন্দুর উপর লোভ করিচিলুম, কিন্তু বিন্দু আমায় শেষ পর্যন্ত নিবৃত্ত করেচে…যা শাস্তি দেবার আমায় দিন…।

বিধুশেখর দরজা খুলে দেখলেন বিন্দুকে। বিন্দু ঠিক সেই একই রকম স্থির। আলুলায়িত বসনও ঠিক করেনি। যেন সে দক্ষের যজ্ঞ সভায় সতীর মতন নিশ্বাস রোধ করে বসে আছে।

বিধুশেখর বিন্দুকে কিছুই বললেন না, গঙ্গানারায়ণকে আদেশ করলেন, এসো আমার সঙ্গে।

সে আদেশ অমান্য করার সাধ্য গঙ্গানারায়ণের নেই। সে বিধুশেখরের সঙ্গে নীচে নেমে এলো। বিধুশেখর পোশাক পরিবর্তন করলেন না পর্যন্ত। সেইভাবেই গঙ্গানারায়ণকে নিয়ে তাঁর ল্যাণ্ডো গাড়িতে উঠলেন।

গঙ্গানারায়ণ ভেবেছিল, বিধুশেখর তাকে নিয়ে তাদের বাড়িতে চলে আসবেন। পিতা রামকমল শহরে নেই। মাতা বিম্ববতীর সামনে গিয়ে কিছু একটা বোঝাপড়া করবেন বিধুশেখর। কিন্তু তিনি সহিসকে সোজা যাবার হুকুম দিলেন।

পথে একটিও কথা বললেন না বিধুশেখর। তাঁর প্রখর ব্যক্তিত্বের সামনে গঙ্গানারায়ণ যেন কুঁকড়ে যেতে লাগলো। তবু তৎক্ষণাৎ সে মনে মনে একথাও ঠিক করে রাখলো, যদি তাকে সমস্ত বিষয়সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করাও হয়, তবু সে বিন্দুবাসিনীকে কোনো শাস্তি দেওয়া সহ্য করবে না। সে রুখে দাঁড়াবে।

অনেকক্ষণ পর বিধুশেখরের নির্দেশে গাড়ি এসে দাঁড়ালো বউবাজারের সুবিখ্যাত কালীমন্দিরের সামনে। গাড়ি থেকে নেমে গঙ্গানারায়ণকে বিধুশেখর বললেন, এসো।

সন্ধ্যা হয় হয়। এস্থলে এখন ভক্তবৃন্দের খুব ভিড়। গেজেল ও সুরাপায়ীদের গদগদ চিৎকারে কান পাতা দায়। তবে এ মন্দিরের পাণ্ডা-পূজারীরা বিধুশেখরের পরিচিত। তিনি ভিড় ঠেলে উপস্থিত হলেন একেবারে গর্ভ গৃহে। প্রতিমার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে গঙ্গানারায়ণকে বসতে ইঙ্গিত করলেন।

তারপর নিম্ন স্বরে বললেন, গঙ্গা, তুমি আজ যা করেচো, তা কোনোদিন কেউ জানতে পারবে না। তোমার পিতামাতা কিচুই টের পাবেন না। তোমার সংসারে কোনো অশান্তি ঘটুক আমি চাই না। শুধু তুমি শপথ করো, আর কোনোদিন তুমি বিন্দুকে দোকতে যাবে না, আর কোনোদিন তুমি তার সঙ্গে কতা পর্যন্ত বলবে না।

গঙ্গানারায়ণ একটুক্ষণ ইতঃস্তত করে বললো, আমি এ শপথ করতে রাজি আচি। কিন্তু আপনিও বিন্দুকে কোনো শাস্তি দেবেন না বলুন! সে নিরপরাধ।

বিধুশেখর বললেন, বেশ, সেকথাও আমি দিলুম।

গঙ্গানারায়ণ তখন মূর্তির সামনে গড় করে বিড়বিড় করে ঐ শপথ বাক্য উচ্চারণ করলো।

কিন্তু এ ঘটনার তিন-চারদিন পরই গঙ্গানারায়ণ খবর পেল যে, বিন্দুবাসিনী তার নিজের বাড়িতে আর নেই। সে কোথায় গেছে। কেউ জানে না।

গঙ্গানারায়ণ ছুটে গেল বিধুশেখরের কাছে। উত্তেজিতভাবে বললো, খুড়ামশাই, আপনি যে কতা দিয়েছিলেন–

বিধুশেখর বললেন, আমি ঠিকই আমার কথা রেখিচি, গঙ্গা। বিন্দুকে কোনোরূপ শাস্তি দিইনি, সে ভালো আচে। আমি বরং তোমার শপথ রক্ষার ব্যাপারটা অনেক সহজ করে দিইচি। কাশীতে পাঠিয়ে দিইচি বিন্দুকে। সে আর কোনোদিন এখানে আসবে না। সেখানেই সে ভালো থাকবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *