তিনতলার ঘরগুলি বীরেন ও রাণুর। বারান্দা থেকে দেখা যায় সুন্দর কেয়ারি করা বাগান। ভোরবেলা অনেক পাখি এসে বসে।

এ বাড়ির নিয়ম পুরুষরা বেশি দেরি করে ঘুমোলেও বউদের উঠতে হবে সকাল সকাল। তাই বীরেন জাগবার আগেই রাণু নেমে যায় পালঙ্ক থেকে। বারান্দায় গিয়ে একটুখানি দাঁড়ায়, টাটকা বাতাস মুখে চোখে মাখে।

দিনের বেলা সাদা বা ড়ুরে ধনেখালি কিংবা টাঙ্গাইল শাড়ি পরতে হবে। মাথায় কাপড় দিয়ে, আঁচলে বাঁধতে হবে চাবির গোছা। এর পর সারাদিন আর স্বামীর সঙ্গে দেখা হবে না। সবচেয়ে আপন মানুষটির সঙ্গে যাবতীয় কথা বলা ও অন্য যা কিছু, তা শুধু রাতে।

শ্বশুর রাজেন্দ্রনাথ অবশ্য শয্যাত্যাগ করেন অতি প্রত্যুষে। দোতলার বারান্দায় একটি আরামকেদারায় বসে তিনি আকাশের আলো ফোটা দেখেন। তাঁর জন্য বিভিন্ন ঋতুর ফল ছাড়িয়ে রুপোর রেকাবিতে সাজিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব রাণুর।

মানুষটি কর্মবীর হিসেবে পরিচিত। ইংরেজদের সঙ্গে ব্যবসায়িক প্রতিযোগিতাতেই তিনি শুধু সফল নন, অন্যভাবেও পাল্লা দেন। সাহেবদের নিজস্ব বেঙ্গল ক্লাবে তাঁকে একবার প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি বলে তিনি তেজের সঙ্গে অন্য কয়েকজনের সঙ্গে প্রতিষ্ঠিত করেছেন ক্যালকাটা ক্লাব, সে ক্লাবের সুনাম দিন দিন বাড়ছে।

সারাদিন রাজেন্দ্রনাথ বহু কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকেন, শুধু সকালবেলা এক দেড় ঘণ্টা সময় তিনি রাখেন পরিবারের মানুষদের জন্য। স্ত্রী বসে থাকেন পাশে, বিবাহিতা মেয়েদের বাড়িতেই রেখেছেন বা কাছাকাছি বাড়ি কিনে দিয়েছেন, তারাও আসে, পুত্রবধূ রাণুর কাছ থেকেও তিনি নানান ছোটখাটো বিষয়ে জানতে চান।

ফলাহারের পর কফি বানিয়ে দেবেন তাঁর পত্নী। মেয়েরা অবশ্য কফি নয়, চা পান করবে।

এর পর সংবাদপত্র খুলতে না খুলতেই এসে যান কেউ না কেউ। কোনও সাহেব-মেম, বা স্যার পি সি মিটার, স্যার নীলরতন সরকার বা বর্ধমানের বিশাল বপু মহারাজ। রাজেন্দ্রনাথ ভৃত্যদের মুখে খবর পেয়ে চলে যান ড্রয়িং রুমে। সেখানে মেয়েদের যেতে নেই।

একটু বেলা হলে মেয়েদের নেমে আসতে হয় একতলায়।

রান্নাঘরে ঢুকে শাশুড়ি দিনের দিন রান্নার নির্দেশ দেবেন, রাণুকে শুধু শুনতে হবে পাশে দাঁড়িয়ে। সে রান্নার র-ও জানে না, মশলাপাতিরও নাম জানে না, তবু শিখতে তো হবে। বিয়ের আগে তার রান্নার পরীক্ষা নেওয়া হয়নি। রন্ধন কার্যে অযোগ্যতার কথা সে অকপটে জানিয়েছিল, তা শুনে খুব এক চোট হেসেছিল বীরেন। বাড়ির বউরা রান্না করলে পাচকদের চাকরি যাবে যে!

ডাইনিং রুমে ব্রেক ফাস্ট খেতে বসবেন রাজেন্দ্রনাথের সঙ্গে তাঁর বড় ছেলে ও বীরেন, এবং এক জামাই। তারপর সবাই বিভিন্ন গাড়িতে অফিসে যাত্রা করবে। বীরেন বড় ছেলে না হলেও তার পিতার প্রিয়, তার ওপরেই অধিকাংশ ব্যবসায়ের ভার, সে যায় রাজেন্দ্রনাথের সঙ্গে এক গাড়িতে।

গাড়িগুলি ছাড়বার সময় বাড়ির মেয়েরা মাথায় কাপড় দিয়ে গাড়ি বারান্দায় দাঁড়িয়ে বিদায় জানাবে। অনেক দিন ধরে এই প্রথা চলে আসছে। এই সময়টায় রাণু এক ঝলক পথের দৃশ্য দেখতে পায়।

গেটের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকে চিনে, জাপানি ও অন্যান্য অনেক ফেরিওয়ালা। বাবুরা বেরিয়ে গেলেই তারা ডাইনিং রুমে এসে বিভিন্ন ধরনের কাপড়, এমব্রয়ডারি সিল্ক লেস বিছিয়ে বসে, প্রায় প্রতিদিনই কিছু কেনাকাটি হয়, বেশ সময় কেটে যায়।

দুপুরের খাওয়া দাওয়ার পর বসতে হবে শাশুড়ির ঘরে। রাণুর পাঁচ ননদ, সকালে যারা আসতে পারে না, তারা দুপুরে আসবেই। পান খেতে খেতে গল্প আর সেলাই বোনা। সেলাইটা যে খুব প্রয়োজনীয় তা নয়, এমনই চলে আসছে। রাণু একেবারেই সেলাই পারে না, আঙুলে সূচ ফুটে রক্ত বেরিয়ে যায়, অন্য কেউ দেখে ফেলার আগেই সে সেই রক্ত চেটে খেয়ে নেয়। তবু কিছুদিনের মধ্যেই অনিচ্ছাসত্ত্বেও শেখা হয়ে যায়, একটা ক্রসস্টিচের আসন বুনে সে বাহবাও পেয়ে গেল।

এ বাড়িতে কেউ গান শোনে না। রবীন্দ্রনাথের গান শোনার তো প্রশ্নই নেই। কেউ বাংলা নাটক দেখতে যায় না। কেউ বই পড়ে না। কেউ বৃষ্টিতে ভেজে না, কেউ বাগানে দৌড়োয় না। মেয়েরা সাইকেল চালায়, এ কথা শুনলে তারা আঁতকে ওঠে।

 

মাঝে মাঝে যে একেবারে বাইরে যাওয়া হয় না তা নয়। শাশুড়ির জন্য সব সময় একটি রোলস রয়েস গাড়ি সাহেব ড্রাইভার সমেত মজুত থাকে। এক একদিন তিনি পুত্রবধূ ও মেয়েদের নিয়ে বেরোন। কোথায়? অবশ্যই বিভিন্ন দোকানে শখের কেনাকাটির জন্য। হল অ্যান্ড অ্যান্ডারসন, আর্মি অ্যান্ড নেভি স্টোরস, হোয়াইট অ্যাওয়ে লেড ল আর হ্যারিসন হ্যাথওয়ে—এই চারটি দোকানের মধ্যেই তাঁদের গতিবিধি সীমাবদ্ধ। কোনও ভারতীয় দোকানে তাঁদের যাওয়া মানায় না, এমনকী নিউ মার্কেটেও, সেখানে যে হেঁজিপেঁজিরাও যায়। নির্দিষ্ট দোকানগুলিতেও দরাদরির প্রশ্নই নেই। পছন্দমতন দ্রব্যটি তুলে নেবে, দামও দেবে না, সে দায়িত্ব পশ্চাৎ অনুবর্তী সরকার বাবুদের।

সংস্কৃত ভাষার অধ্যাপক এবং মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে হয়েও রাণু দ্রুত শিখে নিতে লাগল এই নব্যধনী ও ইংরেজ-অনুসারী পরিবারের আদব কায়দা। যেমন, কারুর সঙ্গেই বেশি বেশি আন্তরিকতা দেখাতে নেই। হাসি হাসি মুখ থাকলেও সব সময় কিছুটা দূরত্ব বজায় রাখতে হবে অন্যদের সঙ্গে। বাইরের লোকের কথা বেশিক্ষণ মন দিয়ে শুনবে না। একটু পরেই চলে যাবে অন্যদের দিকে। হঠাৎ হঠাৎ উদাসীন হয়ে যাবে। কেউ খুব আর্ত বা বিপন্ন হয়ে কাছে এলে সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দেবে অবশ্যই, সেই সঙ্গে বুঝিয়ে দেবে, তার জন্য তুমি বেশি সময় দিতে রাজি নও। টাকা পাবে, মনোযোগ পাবে না। আত্মীয়-স্বজনরা এলে বুঝে নিতে হবে, কে কোন পর্যায়ের। যারা সমপর্যায়ের নয়, হাসি মুখে ছোটখাটো অপমান করে তাদের জানিয়ে দিতে হবে, যখন তখন এসো না।

ভানুদাদার কথা প্রায়ই মনে পড়ে। শান্তিনিকেতনের স্মৃতি হঠাৎ হঠাৎ ঝলসে উঠে অন্য সব কিছু ভুলিয়ে দেয়। তাঁকে চিঠি লিখি লিখি করেও লেখা হয় না। তাঁর পুরনো চিঠিগুলোই সে বারবার পড়ে।

শ্বশুর-শাশুড়ি যখন বিলেতে কিংবা অন্য কোথাও বেড়াতে যান তখন রাণু কিছুটা স্বাধীনতা পায়। তাও একা বেরুতে পারে না, হুট করে যেতে পারে না বাপের বাড়িতে। স্বামীর সঙ্গেই শুধু থিয়েটার-বাইস্কোপে যেতে পারে। বীরেনের ও সবে রুচি নেই একেবারেই, সময়ও নেই, তবে তরুণী স্ত্রীর অনুরোধ উপেক্ষা করতে পারে না একেবারে।।

কবির সঙ্গে মাঝে মাঝে দেখা হয় রাণুর, কখনও কোনও উৎসবে, পরিচিতদের বিবাহ বাসরে। সৌজন্যমূলক কথা হয় শুধু, যেন খুব দূরের মানুষ, চোখাচোখি হয়, তার মর্ম অন্য কেউ বোঝে না। রাণু বুঝতে পারে। সেবারে সেই থিয়েটার হল থেকে কবিকে কিছু না জানিয়ে মধ্য পথে চলে আসার জন্য কবি খুব আঘাত পেয়েছেন, এখনও অভিমান করে আছেন। কিন্তু কবিকে সব অবস্থাটা বুঝিয়ে বলার সুযোগই সে পেল না এ পর্যন্ত। সে রকম নিভৃত সান্নিধ্য আর পাবার উপায় নেই।

ক্রমে রাণু মা হল।

প্রথমে একটি কন্যা, তারপর একটি পুত্র।

একটি মেয়ের কুমারী অবস্থা থেকে বিবাহিত অবস্থার মধ্যে অনেক তফাত হয়ে যায় ঠিকই। তার চেয়েও বেশি বদল হয়ে যায় জননী হলে।

প্রকৃতিই তার মনোযোগের অনেকখানি টেনে নেয় সন্তানের দিকে। এ বাড়িতে শিশুদের জন্য মাদ্রাজি আয়া রাখা হয়, আছে গণ্ডা গণ্ডা কাজের লোক, তবু কোনও সন্তানের সামান্য কান্নার আওয়াজ শুনলেই রাণু তিনতলা থেকে ছুটে যায় একতলায়। ওদের সামান্য জ্বর বা সর্দিকাশি হলে দুশ্চিন্তায় রাণুর মুখে অন্ন রোচে না। যতই কলকাতার সবচেয়ে নামকরা ডাক্তারবদ্যি ডাকা হোক, সে সময় বীরেন কলকাতায় না থাকলে রাণু যেন অগাধ জলে পড়ে।

নিজের সাজগোজের দিকে আর মন নেই রাণুর, সে ছেলেমেয়ে দুটিকে অনবরত পুতুলের মতন সাজায়, তবু আশ মেটে না। এ বাড়িতে আসার পর থেকে তার এস্রাজ বাজানোর পাট চুকে গেছে, বই পড়ারও সময় পায় না, ছেলেমেয়েদের ছড়া শেখায়, রামায়ণ-মহাভারতের গল্প শোনায়।

কিছু কিছু কর্তব্য পালন করে যেতে হয় অবশ্যই, স্বামীর সঙ্গে যেতে হয় পার্টিতে। সে সবচেয়ে ধনী বাঙালি পরিবারের বধূ, তার চালচলনে সামান্য বিচ্যুতি দেখাবার উপায় নেই।

রাণু বেশ ভাল ইংরিজি বলতে পারে, ইংরিজি সাহিত্যও যথেষ্ট পড়েছে জেনে তার শ্বশুরমশাই বাড়িতে ইংরেজ অতিথি এলে পুত্রবধূকে ডেকে পরিচয় করিয়ে দেন। রাণুর সঙ্গে বাক্যালাপ চালিয়ে যেমন বিস্মিত হন সাহেবমেমরা, তা দেখে তেমনই গর্ববোধ করেন তার শ্বশুর।

দিনের পর দিন চলে যায়, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর।

মানুষের স্মৃতি যেন অনেকটা নদীর মতো। কখনও নিস্তরঙ্গ হয়ে থাকে অনেক নীচে, আবার কখনও জোয়ারের মতো ফুলে ফেঁপে উত্তাল হয়ে ওঠে।

হঠাৎ একসময় শান্তিনিকেতনের জন্য তার মন আকুলি বিকুলি করে ওঠে। নিজের ঘরে বসে সে যেন ছাতিম ফুলের গন্ধ পায়, যেন আম্রকুঞ্জের বাতাস এসে তার গায়ে লাগে, শুনতে পায় ছাত্র-ছাত্রীদের বৃন্দগান। চোখে ভাসে, জ্যোৎস্নায় ধুয়ে যাওয়া একটা দোতলার বারান্দা, সেখানে কি কবি একা বসে আছেন?

রাণুর দুই বোন এখন থাকে শান্তিনিকেতনে। বড় বোন আশা বেশি বয়েসে বিয়ে করেছে শান্তিনিকেতনেরই অধ্যাপক আর্যনায়কমকে। ওরা সবসময় কবিকে দেখতে পায়, অথচ রাণুরই সে অধিকার নেই।

বোনেদেরও কতদিন দেখেনি রাণু।

আর একটা কথা ভেবেও তার কষ্ট হয়, তার ছেলেমেয়ে এখনও কবিকে চিনল না, তারা কবির আশীর্বাদ পাবে না?

একদিন সে বীরেনকে বলল, আমরা একবার শান্তিনিকেতনে বেড়াতে যেতে পারি না? তুমি তো শান্তিনিকেতন দেখইনি।

বীরেন বলল, আমি পৃথিবীর বহু বিখ্যাত স্থান এখনও দেখিনি। শান্তিনিকেতনের এমন কী বৈশিষ্ট্য আছে?

রাণু বলল, আহা, শান্তিনিকেতনের সঙ্গে অন্য কোনও জায়গার তুলনাই হয় না।

বীরেন বলল, সেটা কে তুলনা করছে, তার ওপর নির্ভর করে।

রাণু বলল, ওখানে আমার দুই দিদি রয়েছে। সুন্দরী শ্যালিকাদের সঙ্গেও কয়েকটা দিন কাটাতে ইচ্ছে করে না তোমার?

এক একজন পুরুষ কোনও বিষয় অপছন্দ করলেও তা নিয়ে তর্কে যেতে চায় না। তাতে সময় নষ্ট। সোজাসুজি আবেদনটি প্রত্যাখ্যান করলেও স্ত্রীর মন-খারাপ আটকাতে পারবে না। এ নিয়ে কয়েকদিন অশান্তি চলবে। তার চেয়ে অনিচ্ছা সত্ত্বেও মেনে নেওয়া ভাল।

শ্বশুর ও শাশুড়ি দু’জনেই গত হয়েছেন এর মধ্যে, এখন আর অন্য কারুর কাছ থেকে অনুমতি নেওয়ার প্রয়োজন নেই। রাণু নিজেই বন্দোবস্ত করতে লাগল সব কিছুর।

স্বামী, পুত্র-কন্যা, তাদের আয়া, ঠাকুর-চাকর ও বিরাট লটবহর নিয়ে চাপ হল ট্রেনের রিজার্ভ করা একটা কম্পার্টমেন্টে। বোম্বাই দিল্লির ট্রেনের তুলনায় শান্তিনিকেতনের ট্রেন অনেক শ্লথ গতি, কামরাগুলো অপরিচ্ছন্ন, হকারদের চিৎকারে কান পাতা দায়। প্রথম থেকেই সব কিছু বীরেনের অপছন্দ, সে নাক কুঁচকে রইল।

বোলপুর স্টেশনে জল কাদা থিক থিক করছে। বীরেনের মুখ দেখলে মনে হয়, তাকে যেন জোর করে তেতো ওষুধ খাওয়ানো হয়েছে।

অভ্যর্থনা জানাতে রথী উপস্থিত। অনেকদিন পর রাণু এসেছে, এবারে তার খাতিরই আলাদা। সে এখন ভারতের এক প্রধান শিল্পপতির স্ত্রী। কিছুদিন আগে আর এক ব্যবসায়ী শ্ৰীযুক্ত টাটা এখানে একটি অতিথিনিবাস নির্মাণের জন্য অনেক টাকা দিয়েছেন। রাণু তার স্বামীকেও সঙ্গে এনে বড় ভাল কাজ করেছে, তিনি সব ঘুরে টুরে দেখুন। তাঁর জন্যই সাজিয়ে রাখা হয়েছে একটি আলাদা বাড়ি।

সে বাড়িতে যেমন সর্বক্ষণ লোকজনের আনাগোনা, তেমনই কবির কাছেও যাওয়া হয় সদলবলে। একসঙ্গে চা পান ও কিছু কিছু গল্প হয়। কবি যেন অনেকটা নীরব হয়ে গেছেন, কথা বলতেই চান না। হঠাৎ হঠাৎ উঠে যান অন্য ঘরে।

রাণু লক্ষ করে, কবি চুল আঁচড়াননি। তাঁর দাড়িতেও যেন বেশি পাক ধরেছে। কিন্তু ইচ্ছে করলেও তো সে আর এখন কবির মাথায় চিরুনি চালাতে পারবে না।

বীরেন এখানে সময় কাটাবার একটা উপায় পেয়েছে। সে ব্রিজখেলা পছন্দ করে, রথীরও তাসের নেশা আছে, প্রতি বিকেলবেলা অন্য পার্টনার জুটিয়ে বসে যায় তাসের আসর।

রাণু তখন সেখান থেকে উঠে যায় কবির ঘরে।

সেখানে বসে আছেন নেপাল মজুমদার ও বিধুশেখর শাস্ত্রী। তাঁরা উঠে যেতেই এলেন এক পারস্যদেশীয় অধ্যাপক। আবার অন্য কেউ। মীরা ও প্রতিমাও আসে যখন তখন।

এর মধ্যে আশার বাড়িতেও যেতে হয় রাণুকে।

শান্তিনিকেতনের পুরনো বাসিন্দা, যারা রাণুকে অনেকদিন ধরে দেখছেন, তাঁদের মতে রাণু যেন এখন আরও সুন্দর হয়েছে। এখন সে পূর্ণ যুবতী, কৈশোর বা প্রথম যৌবনের চাঞ্চল্য আর নেই, মুখের লাবণ্য যেন আরও বিকশিত হয়েছে, তার হাসি যেন পূর্ণ চাঁদের কিরণ। সবাই রাণুর সঙ্গে কথা বলতে চায়, সবাইকে তার কিছু কিছু সময় দিতে হয়।

শুধু যাঁর সঙ্গে অনেকদিনের জমে থাকা গল্প বিনিময় করার জন্য ছুটে আসা, তাঁকেই নিরিবিলিতে পাওয়া যায় না।

একদিন বিকেলে রাণু জিজ্ঞেস করল, ভানুদাদা, তোমার নতুন গান শোনাবে না আমাকে?

কবি বললেন, এমন হট্টমেলায় কি গান হয়?

ইঙ্গিতটি স্পষ্ট।

কবির রাত্রির আহারের পর তাঁর কাছে আর কেউ আসে না। সেইরকম সময়েই তো বারান্দায় বসে কবি রাণুকে শুনিয়েছেন গান, শুনেছেন রাণুর এলোমেলো কথা, দেখেছেন তার কান্না। এবারে তো রাণু সে সময় একবারও আসেনি।

দু’জনের দৃষ্টিতে যেন একটা সেতু গড়া হল কয়েক মুহূর্তের জন্য। তারপর রাণু আলতো ভাবে মাথা হেলিয়ে সম্মতি জানাল।

কবির জন্য নৈশ আহার এলে রাণুরও ডাক পড়ে বাড়ি ফেরার জন্য।

ছেলেমেয়েদের আগেই খাওয়া হয়ে গেছে। তাদের ঘুম পাড়ানোও হয়ে গেছে, দেখে এসেছে রাণু। এবার ডাইনিং টেবিলে অনেকে মিলে একসঙ্গে খাওয়া-দাওয়া। তারপর ড্রয়িং রুমে বসে কিছুক্ষণ গল্প।

একটা নির্দিষ্ট সময় বিজলি বাতি নিভিয়ে দেওয়া হয় বলে শান্তিনিকেতনে সবাই তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়ে। একসময় ঘর ফাঁকা হয়ে গেল।

রাণুর সারা শরীরে একটা অস্থিরতার তরঙ্গ বইছে।

এই সময় তার ভানুদার কাছে যাওয়ার কথা।

বীরেন একটা বিলিতি রেডিও এনেছে, সেটার নব ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে সে বিশ্বসংবাদ শোনার চেষ্টা করছে। সে একটু পরেই ঘুমিয়ে পড়বে, রাণু জানে। রাণু টপ করে চলে যেতে পারে ভানুদাদার কাছে।

কিন্তু সে একা যাবে? এখন কি আর তা সম্ভব? তার সাহস হল না।

ভানুদাদা যা চাইছেন, তা দেবার ক্ষমতা আমার নেই, নেই, নেই!

অথচ ভানুদাদা অপেক্ষা করে বসে আছেন। দোতলার বারান্দার অন্ধকারে, একা। তিনি নিশ্চিত ভেবেছেন, রাণু আজ আসবেই। কবিরা কি সারাজীবনই এরকম অবুঝ থাকে? ভালবাসা তাদের বাস্তব জ্ঞান ভুলিয়ে দেয়।

রাণুর মনের মধ্যে গুঞ্জরিত হচ্ছে সেই শিলং পাহাড়ের বাড়িতে শোনা একটি গান:

তোমায় গান শোনাব, তাই তো আমায় জাগিয়ে রাখো
ওগো ঘুম ভাঙানিয়া
বুকে চমক দিয়ে তাই তো ডাকো,
ওগো দুখ জাগানিয়া—

রাণু এখন দুখজাগানিয়ার সঠিক মানে বুঝতে পারে। কত সুখের স্মৃতির মধ্যেও জেগে ওঠে দুঃখ?

শুধু দুখজাগানিয়া তো নয়, কয়েকটি স্মৃতি যেন বুকের মধ্যে ঝড় তুলে দেয়।

ভানুদাদা আর সে, সে আর ভানুদাদা, এই দু’জনের নিভৃতি আর কখনও পাওয়া যাবে না।

রাণু যেতে পারছে না, অথচ কতটুকুই বা দূরত্ব!

সে দৌড়ে গিয়ে বীরেনের গায়ে ধাক্কা মেরে বলল, ওগো, চলো না একবার কবির সঙ্গে দেখা করে আসি।

বীরেন দুটি ভুরু অনেকখানি তুলে বলল, এখন? কেন? এই তো কিছুক্ষণ আগে কথা বলে এলাম।

রাণু বলল, তবু চলো না, আবার এখন একবার যাই।

বীরেন বলল, ফর গডস সেক, টেল মি হোয়াই!

রাণু ব্যাকুল ভাবে বলল, আমরা কাল চলে যাব, একবার শেষ দেখা করে আসব না? বিদায় নেব না?

বীরেন বলল, কাল তো যাব দুপুরবেলা? সারা সকাল পড়ে আছে। তখন দেখা করা যাবে না?

বাণু তবু দীনহীনা হয়ে বীরেনের হাত ধরে ভিক্ষে চাওয়ার মতো বলল, প্লিজ চলো, আমার ইচ্ছে করছে, তুমি আমার সঙ্গে চলো।

স্ত্রীর এই পাগলামির অর্থ বুঝতে পারল না বীরেন। মেয়েদের সব ব্যবহারের মর্ম ক’জন পুরুষই বা বোঝে!

অগত্যা বীরেনকে উঠে, পোশাক বদলে বেরোতেই হল।

এর মধ্যেই নিঝুম হয়ে গেছে শান্তিনিকেতনের পল্লীগুলি। গাছগুলির ফাঁকে ফাঁকে আলো ছায়ার জাফরি কাটা। বাতাসে রেশমি স্পর্শ। রাণু কিছুই দেখছে না, তার বুক ধক ধক করছে। অতিকষ্টে সে সামলে আছে কান্না।

এর মধ্যে টিপি টিপি বৃষ্টি নামল।

বারান্দায় নয়, কবি বসে আছেন একটি নতুন তৈরি ঘরে। ঘরটি ধোঁয়ায় ভর্তি। একটা বড় ধুনুচিতে শিউলি পাতা পোড়ানো হচ্ছে, মশা তাড়াবার এটা নবতম উপায়।

পায়ের শব্দে কবি ফিরে তাকালেন।

কিছু বলতে গিয়ে থেমে গিয়ে, রাণুর পাশে বীরেনকে দেখতে পেয়ে ফ্যাকাশে গলায় বললেন, তোমরা এসেছ, বসো!

দু’জনে একটু দূরের সোফায় বসল। কেউ কোনও কথা বলছে না।

ধোঁয়ার জন্য মাঝে মাঝে অস্পষ্ট হয়ে যাচ্ছেন কবি।

রাণুর মনে হল, সে যেন বিশ্বাসঘাতিনী, ভানুদাদার কাছে কথা রাখেনি। কিন্তু এসময় একা আসা যে এখন আর তার পক্ষে সম্ভব নয়, তা কি ভানুদাদা বুঝবেন না?

বীরেনের এই ধোঁয়া সহ্য হয় না। সে জিজ্ঞেস করল, আমি এই ধুনুচিটা একটু সরিয়ে রাখতে পারি?

কবি বললেন, হ্যাঁ, হ্যাঁ, ঘরের ওই কোণটায়…

তারপর জিজ্ঞেস করলেন, তোমরা এই সময় এলে, বিশেষ কিছু বলার আছে।

বীরেনের কিছুই বলার নেই, সে তাকাল তার স্ত্রীর দিকে।

রাণু নতমুখী হয়ে বসে আছে। যেন তাকাতেও ভয় পাচ্ছে কবির দিকে।

একটু পরে সে বলল, একটা গান শোনাবেন না?

কবি বললেন, গান…আজ আর হবে না, শরীরটা তেমন ভাল নেই।

কবির যখন শরীর ভাল নেই, তখন তো আর তাঁকে জাগিয়ে রাখা উচিত নয়। বীরেন সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, রাণু, তা হলে এখন আমরা যাই?

রাণুও উঠে দাঁড়িয়ে, এই প্রথম কবির দিকে সোজাসুজি তাকিয়ে কাতর গলায় বলল, যাই?

রাণু আশা করেছিলেন, কবি বলবেন, আর একটু বসো।

আগে যেমন বিদায় নিতে দিতেন না এক কথায়।

এখন তিনি মুখে কিছুই বললেন না। মাথা নোয়ালেন সামান্য।

বীরেন ব্যস্ত ভাবে পা বাড়িয়েছে দরজার দিকে। রাণু বারবার ফিরে ফিরে তাকাচ্ছে। প্রতি রোমকূপে সে আকাঙক্ষা করছে, কবি তাকে একবার অন্তত ডাকবেন।

ধোঁয়ার জন্য স্পষ্ট মুখ দেখা যাচ্ছে না কবির।

রাণু নিজেই আবার বললেন, আমরা যাচ্ছি।

কবি কিছুই বললেন না, যেন ধোঁয়ার মধ্যে মিলিয়ে গেলেন একেবারে।

এরপর আর সারা রাত রাণুর ঘুম আসবে কী করে?

নিদ্রিত স্বামীর পাশে সে ছটফট করতে করতে উঠে পড়ল ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে।

কবি এই সময় বাড়ির সমানের প্রাঙ্গণে বসে প্রথম সূর্যের আলো গায়ে মাখেন। এখানেই তাঁকে চা দেওয়া হয়।

রাণু প্রায় ছুটে গিয়ে দেখল, এই সাতসকালেও কবির সামনে বসে আছেন সুধাকান্ত। দু’জনে চা খাচ্ছেন। পটে আর চা নেই, সুধাকান্ত উঠে গেলেন রাণুর জন্য চা আনতে।

সুধাকান্ত যাচ্ছেন, আর দেখা যাচ্ছে দূর থেকে হেঁটে আসছেন বিধুশেখর। মধ্যবর্তী এইটুকু সময়ের মধ্যে রাণুকে তার নিজের কথা বলতেই হবে কবির কাছে।

সে বলল, ভানুদাদা, কাল রাত্তিরে।

কবি হাত তুলে তাকে থামিয়ে দিয়ে চেয়ে রইলেন তার মুখের দিকে।

কবিও কি ঘুমোতে পারেননি কাল রাতে? তাঁর চোখের নীচে ক্লান্তির কালো রেখা। দৃষ্টিতে জ্যোতি নেই। বসে থাকার ভঙ্গিটিও কেমন যেন ভাঙাচুররা।

সময় নেই আর সময় নেই।

যে-কথা অন্যদের সামনে বলা যায় না, সে কথা বলতে দেয় না অন্যরা।

রাণু দু’ দিকে তাকাল। বিধুশেখর হাঁটতে হাঁটতে একবার নিচু হয়ে মাটি থেকে কী যেন তুললেন। সুধাকান্ত এক পরিচারকের হাত থেকে নিল দ্বিতীয় একটি চায়ের পট। দু’জনেই এখানে এসে পড়বে আর এক মিনিটের মধ্যে।

গাঢ় বিষাদ মাখা মুখ কবির। ঊষালয়ের অপরূপ আলোও তা মুছে নিতে পারেনি। তিনি এক দৃষ্টিতে চেয়ে আছেন রাণুর মুখের দিকে।

রাণু আবার ব্যাকুলভাবে বললেন, ভানুদাদা, তোমাকে শুনতেই হবে–

কবি তাঁকে থামিয়ে দিলেন আবার।

তিনি ভাঙা ভাঙা গলায় বললেন, রাণু, তুমি আর আমাকে ভানুদাদা বলে ডেকো না। ভানু সিংহ হারিয়ে গেছে চিরকালের মতন। আর তাকে ফেরানো যাবে না। তুমি সুখী হও। তোমার স্বামীর পরিবারের গৌরব বৃদ্ধি করো। তোমার ছেলে ও মেয়েকে আমি আশীর্বাদ করি, তারাও যোগ্য হয়ে উঠে দেশের সেবা করুক।।

রাণু দু’হাতে মুখ ঢেকে ফেলল। কাঁপছে তার সারা শরীর।

দূরে ঢং ঢং করে করে ঘণ্টা বেজে উঠল। রাণুর বালিকা বয়েসের দানে নির্মিত সেই ঘণ্টা।

কবি চেয়ার ছেড়ে উঠে হাঁটতে লাগলেন।

পিঠের দিকে দৃ’হাত, শরীরটা যেন ঈষৎ বেঁকে গেছে এর মধ্যে। শিথিল হয়ে গেছে চামড়া।

আম্রকুঞ্জের মধ্য দিয়ে কবি আস্তে আস্তে হেঁটে চলেছেন একা। একটু একটু নড়ছে তাঁর ঠোঁট।

আমার ভুবন তো আজ হলো কাঙাল, কিছু তো নাই বাকি, ওগো নিঠুর দেখতে পেলে তা কি। তার সব ঝরেছে, সব মরেছে, জীর্ণ বসন ওই পড়েছে—প্রেমের দানে নগ্ন প্রাণের লজ্জা দেহো ঢাকি।

কুঞ্জে তাহার গান যা ছিল কোথায় গেল ভাসি। এবার তাহার শূন্য হিয়ায় বাজাও তোমার বাঁশি। তার দীপের আলো কে নিভালো, তারে তুমি আবার জ্বালো–আমার আপন আঁধার আমার আঁখিরে দেয় ফাঁকি।…

যখন ভাঙলো মিলন মেলা ভেবেছিলাম ভুলবো না আর চক্ষের জল ফেলা। দিনে দিনে পথের ধুলায় মালা হতে ফুল ঝরে যায়–জানি নে তো কখন এলো বিস্মরণের বেলা।

দিনে দিনে কঠিন হলো কখন বুকের তল—ভেবেছিলেম ঝরবে না আর আমার চোখের জল। হঠাৎ দেখা পথের মাঝে, কান্না তখন থামে না যে–ভোলার তলে তলে ছিল অশ্রু জলের খেলা।…

আমার এ পথ তোমার পথের থেকে অনেক দূরে গেছে বেঁকে। আমার ফুলে আর কি কবে তোমার মালা গাঁথা হবে, তোমার বাঁশি দূরের হাওয়ায় কেঁদে বাজে কারে ডেকে।

শ্রান্তি লাগে পায়ে পায়ে, বসি পথের তরুছায়ে। সাথী হারার গোপন ব্যথা বলবো যারে সে জন কোথা—পথিকরা যায় আপন মনে, আমারে যায় পিছে রেখে…

তুমি তো সেই যাবেই চলে, কিছু তো না রবে বাকি—আমার ব্যথা দিয়ে গেলে জেগে রবে সেই কথা কি। তুমি পথিক আপন মনে, এলে আমার কুসুম বনে, চরণপাতে যা দাও দলে সে সব আমি দেব ঢাকি।

বেলা যবে আঁধার হবে, একা বসে হৃদয় ভরে, আমার বেদনখানি আমি রেখে দেব মধুর করে। বিদায় বাঁশির করুণ রবে সাঁঝের গগন মগন হবে, চোখের জলে দুখের শোভা নবীন করে দেব রাখি…

॥ সমাপ্ত ॥

Share This