১.১১ দুপুরবেলা নানা গল্পের মধ্যে

দুপুরবেলা নানা গল্পের মধ্যে কার কোন্ কারণে কলকাতা শহরটা ভালো লাগে এই বিষয়ে কথা হচ্ছিল, সুহাসিনী হঠাৎ বলে উঠলেন, কলকাতায় একটা খুব ভালো জিনিস পাওয়া যায়, বোতলের সোডার জল। ছিপি খুললেই ভুসভুস করে ওঠে, বড় উপকারী!

সবাই হেসে উঠেছিল। কলকাতার দই-রাবড়ি নয়, চিড়িয়াখানা-ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল নয়, থিয়েটার বাইস্কোপ-রেডিও নয়, সবচেয়ে আকর্ষণীয় হলো সোডার বোতল?

সুহাসিনী অবাকভাবে ভুরু তুলে বলেছিলেন, তোরা হাসছিস? মালখানগরে থাকতে আমি বায়ুর চাপে মাঝে মাঝে বড় কষ্ট পেতাম। কোনো ওষুধেই উপশম হয় না। একবার কলকাতায় এসে তাদের বাবা আমাকে এক বোতল সোডার জল খাওয়ালেন, ওমা, তারপর আর এক মাস আমার পেটে একটুও বায়ু হয়নি। গতবারেও তো কলকাতায় গিয়ে আমি পিকলুকে দিয়ে সোডার বোতল আনিয়েছি।

প্রতাপ জিজ্ঞেস করলেন, দেওঘরে সোডা ওয়াটার পাওয়া যায় না?

বিশ্বনাথ বললেন, না, আমি খোঁজ করেছি। এখানে এসব জিনিসের চল নেই।

মমতা বললেন, আপনি এখন তো বায়ুতে কষ্ট পান। আমাদের লেখেননি কেন মা, আমরা কলকাতা থেকে কয়েকটা বোতল নিয়ে আসতাম?

প্রতাপ বললেন, বড় বড় রেল স্টেশনে পাওয়া যায়। দেওঘরে না থাকলেও জসিডিতে থাকতে পারে, ওটাতো একটা জংশন।

বিকেলবেলা প্রতাপ তাঁর মায়ের এই সামান্য সাধটুকু মেটাবার জন্য চলে গেলেন জসিডি। রেলের রেস্তোরাঁয় খোঁজ করে ঠিক পাওয়াও গেল, মোট তিনটি বোতল ছিল, প্রতাপ তিনটিই কিনে নিলেন। স্টেশনের বাইরে এসে আরও কিছু টুকটাক বাজার করলেন তিনি। এখানে বেশ ভালো সাইজের ফুল কপি পাওয়া যাচ্ছে, কলকাতার তুলনায় তো বটেই, দেওঘরের থেকেও। দাম সস্তা। বড় বড় আতা আর পেয়ারাও উঠেছে।

জিনিসপত্র দরদাম করতে করতে হঠাৎ এক সময় তিনি দেখতে পেলেন তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে আছেন বিশ্বনাথ। অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, এ কী ওস্তাদজী, আপনি আবার শুধু শুধু এলেন কেন? আমি বেশি কিছু কিনছি না তো।

বিশ্বনাথ গম্ভীরভাবে বললেন, তোমার সঙ্গে আমার জরুরি কথা আছে। বাড়িতে ঠিক বলা যাবে না, তাই এখানে চলে এলাম।

প্রতাপ ভেতরে ভেতরে বেশ চমকে উঠলেন। মানুষ এই ভাবে কথা বলে টাকা ধার চাইবার সময়। কিন্তু বিশ্বনাথের আত্মসম্মানবোধ অতি তীব্র। প্রতাপের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কও খুব পরিষ্কার, কোনোরকম গোপনীয়তার স্থান নেই।

প্রতাপ জিজ্ঞাসু দৃষ্টি ফেলতেই বিশ্বনাথ বললেন, এই বাজারের মধ্যে তো বলা যাবে না, চলল, একটু নিরিবিলিতে যাই। হেঁটে ফিরবে নাকি?

জসিডি থেকে দেওঘরের দূরত্ব বেশি নয়, অনায়াসেই হাঁটতে হাঁটতে ফেরা যেত, সন্ধ্যাটিও মনোরম; কিন্তু প্রতাপ এক ঝুড়ি আতা কিনে ফেলেছেন, তা বয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। সুতরাং একটা টাঙ্গা ডাকতে হলো।

টাঙ্গাতে উঠেও বিশ্বনাথ কোনো কথা বললেন না, আপন মনে চুরুট টানতে লাগলেন। প্রতাপ বেশ বিচলিত বোধ করছেন। কী এমন জরুরি কথা যা বিশ্বনাথ বলতে ইতস্তত করছেন? নিশ্চয়ই পারিবারিক কিছু। মা এখানে এসে রয়েছেন, তার জন্য কোনো জটিলতার সৃষ্টি হয়েছে? ছোড়দির কোনো শক্ত রোগ হয়েছে? কিংবা বুলা, বুলার ব্যাপারে কিছু বলেছে সত্যেন? কী-ইবা বলার থাকতে পারে, বুলার সঙ্গে তো প্রতাপের একটা কথাও হয় না।

দারোয়া নদীর সেতুর ওপর এসে বিশ্বনাথ বললেন, এখানে একটু নামা যাক।

টাঙ্গাওয়ালাকে অপেক্ষা করার নির্দেশ দিয়ে বিশ্বনাথ জলের দিকে এগিয়ে গেলেন। সূর্য অস্ত যাবার পরও একটা চাপা আলো এখনও রয়ে গেছে আকাশে। দূরে ডিগরিয়া পাহাড়ের রেখা এখন কিছুটা অস্পষ্ট, শোনা যাচ্ছে একটা রেলের ইঞ্জিনের শব্দ।

নদীতে জল কম, কিন্তু এত পরিচ্ছন্ন যে আঁজলা তুলে পান করা যায়। নদীর ঠিক মাঝখানে জেগে থাকা একটা পাথরে কেউ বাংলায় তার প্রেয়সী বা মানসীর নাম লিখে রেখে গেছে।

বিশ্বনাথ চটি খুলে পায়ের বুড়ো আঙুল দিয়ে বালি খুঁড়তে খুঁড়তে বললেন, এই নদীটাও ফলগু নদীর মতন, জল শুকিয়ে গেলেও বালি খুঁড়লে জল পাওয়া যায়।

প্রতাপ বললেন, ওস্তাদজী, আমি আপনার জরুরি কথাটা শুনতে চাইছি।

বিশ্বনাথ প্রতাপের মুখের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন কয়েক মুহূর্ত। তারপর আস্তে আস্তে বললেন, সব কথা কি যে-কোনো পরিবেশে, যে-কোনো সময়ে বলা যায়? তাই আমি সময় নিচ্ছি। প্রতাপ, একটা খুব খারাপ খবর আছে। তুমি শোনার জন্য তৈরি?

প্রতাপের মুখটা রক্তশূন্য হয়ে গেল। ঝট করে তাঁর মনে হলো, বাবুল? পিকলু বা মুন্নি? বাবলুটাই বেশি দুরন্ত।

–কী হয়েছে? কী হয়েছে, বলুন!

বিশ্বনাথ প্রতাপের কাঁধে হাত রেখে বললেন, মনটাকে শক্ত করো, তোমার দায়িত্ব অনেক। বেড়ে গেল… অসিতদা মারা গেছেন!

— অ্যাাঁ?

–তুমি চলে আসার একটু পরেই টেলিগ্রাম এলো, আমি গেটের কাছে দাঁড়িয়েছিলুম… বাড়ির আর কেউ জানে না তোমাকে আগে জানাবার জন্য…

বিশ্বনাথ পকেট থেকে টেলিগ্রামটা বার করে দিলেন। টেলিগ্রামটা প্রতাপের নামে, পাঠিয়েছেন অসিতবরণের দাদা জলদবরণ। অতি সংক্ষিপ্ত বাতা, অসিতবরণ মাডারড, কাম অ্যাটওয়ান্স!

প্রতাপ চিৎকার করে উঠলেন, মাডারড?

বেশ কিছুক্ষণ দু জনে নিঝুমভাবে বসে রইলেন। আলোর শেষ চিহ্নটুকুও মিলিয়ে গেল। আকাশ থেকে। দু’জনে আর পরস্পরের মুখ দেখতে পাচ্ছেন না।

প্রতাপ এক সময় একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, চলুন, আমাকে এক্ষুনি কলকাতায় যাওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।

বিশ্বনাথ বললেন, ভোর সাড়ে চারটার সময় একটা ট্রেন আছে, জসিডিতে এসে ধরতে হবে, তার আগে কলকাতায় যাওয়ার আর কোনো ব্যবস্থা নেই। আমিও যাবো তোমার সঙ্গে।

প্রতাপের বুকটা ভারি হয়ে গেছে। অসিতবরণকে তিনি পছন্দ করতেন কিন্তু এখন শুধু মনে পড়ছে দিদির মুখখানা। তিনি জানেন, শ্বশুরবাড়ির প্রতিকূল পরিবেশে এই বিপদের সময় দিদিকে সাহায্য করবে কে? বিষয়-সম্পত্তি নিয়ে মামলা-মকদ্দমা চলছে, এর মধ্যে আবার অসিতদার চাকরি চলে গেছে, তবু অসিতদার বেঁচে থাকা না-থাকার মধ্যে অনেক তফাৎ আছে। এক্ষুনি দিদির পাশে গিয়ে প্রতাপের দাঁড়ানো দরকার।

বিশ্বনাথ বললেন, অসিতদা নিরীহ ভালো মানুষ, তাকে কে খুন করবে, প্রতাপ?

প্রতাপ রাগতভাবে বললেন, নিরীহ ভালো মানুষরা বুঝি খুন হয় না? অসিতদাকে তার নিজের বাড়ির লোক, এমনকি ওঁর দাদা, যে এই টেলিগ্রামটা পাঠিয়েছে, সে তো একটা দুশ্চরিত্র, বদমাস, এরাই খুন করতে পারে সম্পত্তির জন্য। ওঁর অফিসের লোকজনরাও খুন করতে পারে!

–অফিসের লোক?

–অসিতদার চাকরি গেছে কেন জানেন? উনি সৎ ছিলেন বলে! উনি সিভিল সাপ্লাই ডিপার্টমেন্টে কাজ করতেন, সেখানে তো ঘুষের রাজত্ব। অসিতদা একটা ঘুষের র‍্যাকেট ধরে ফেলেছিলেন, ফুড মিনিস্টার প্রফুল্ল সেনের কাছে নোট পাঠাতে যাচ্ছিলেন। সেইসব ঘুষখোর কর্মচারীরা, তাদের মধ্যে দু’জন আবার জেলখাটা স্বদেশী, একটু আগে জানতে পেরে অসিতদার কাছ থেকে ফাঁইল কেড়ে নেয়। উল্টে তারা অসিতদার নামেই মিথ্যে অভিযোগ চাপিয়ে দেয়। কথায় কথায় অসিতদাকে প্রাণের ভয় দেখাতো, বাধ্য হয়ে অসিতদাকে চাকরি ছাড়তে হয়। “ আমি অসিতদাকে বলেছিলুম মামলা করতে, উনি সাহস পেলেন না, তারপর থেকেই তো ওঁর মাথায় গোলমাল দেখা দিল!

এতক্ষণ একটানা বলে গিয়ে প্রতাপ একটু থামলেন, তারপর আবার জোর দিয়ে বললেন, আমি জানি, অসিতদা কখনো ঘুষের টাকা ছুঁতেন না, শরীরে বনেদী বাড়ির রক্ত আছে তো! বিশ্বনাথ বললেন, মাথার গোলমাল…

–একদম কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছিলেন। অফিসের সেই দুষ্টচক্র ওঁকে শাসিয়েছিল, উনি চাকরি ছাড়ার পরেও মুখ খুললে ওরা দেখে নেবে! তাই উনি দিদির সঙ্গেও কথা বলতেন না। ওস্তাদজী, এখন দিদির কী হবে?

–চলো, আমরা কলকাতায় যাই।

বাড়ি ফিরে আসল খবরটা কারুকে জানানো হলো না। অসিতবরণের অসুস্থ হয়ে পড়ার খবর এসেছে, তাই প্রতাপকে যেতে হবে। প্রতাপ সকলকেই নিয়ে ফিরবেন কিনা সেই সম্পর্কে কিছুক্ষণ আলোচনা হলো। এক মাসের জন্য বেড়াতে আসা, সবে মাত্র এগারোদিন কেটেছে, তা। ছাড়া মমতার বেশ জ্বর। বিশ্বনাথও চলে গেলে এদিকে সকলকে সামলে রাখা মুশকিল হবে, তাই ঠিক হলো প্রতাপ একাই যাবেন।

বরানগরে দিদির শ্বশুরবাড়ির কথাই প্রতাপের মন জুড়ে আছে, সেখানে এতক্ষণ কী চলছে। কে জানে? বনেদী বাড়িগুলিতে যখন পচন ধরে তখন মাটির তলা থেকে যেন অসংখ্য কদাকার, কুৎসিত জিনিস ফুটে বেরোয়। ক্ষীয়মাণ বিষয়-সম্পত্তি নিয়ে কাড়াকাড়ির সময় ভাই ভাইয়ের সঙ্গে, ভাইপো খুড়োর সঙ্গে, এমনকি ছেলে মায়ের সঙ্গে পরম শত্রুর মতন ব্যবহার। করে, প্রতাপ তাঁর নিজের আদালতেই এরকম অনেক মামলা দেখেছেন।

মানুষের মন বড় বিচিত্র। এরকম অবস্থার মধ্যেও প্রতাপের মাঝে মাঝে মনে পড়তে লাগলো বুলার কথা। যাবার আগে বুলার সঙ্গে একবার দেখা হবে না? বুলাও অসহায় অবস্থার মধ্যে আছে, সে স্বামী পরিত্যক্তা, তার দেওরটি সুবিধের মানুষ নয়, এই সময় প্রতাপ তাকে কোনো সাহায্য করতে পারবে না? বুলা কোনো কথা বলেনি বটে, কিন্তু তার দৃষ্টির মধ্যে যেন সেরকম প্রত্যাশা ছিল।

প্রতাপের একবার তীব্র ইচ্ছে হলো, এই রাত্রেই একবার সত্যেনের বাড়ি গিয়ে বুলাকে তাঁর হঠাৎ কলকাতায় চলে যাওয়ার কারণটা জানিয়ে যেতে। বুলা যেন আবার ভুল না বোঝে। কিন্তু কোন্ ছুতোয় এখন সে বাড়িতে যাবেন প্রতাপ? সত্যেনের সঙ্গে তাঁর বনিবনা হয়নি, ঠিক ঘোষিত না হলেও দু’জনেই দু’জনকে অপছন্দ করেছেন।

প্রতাপের যাওয়া হলো না সেখানে।  

প্রতাপ যখন বরানগরে পৌঁছোলেন, ততক্ষণে অসিতবরণের শব দাহ হয়ে গেছে। সুপ্রীতি তাঁর মেয়েকে নিয়ে নিজের শয়নকক্ষে চুপ করে বসেছিলেন, তাঁর চোখে জল নেই, প্রতাপকে দেখেই তিনি উঠে এসে তাঁর হাত ধরে আবেগহীন কণ্ঠে বললেন, খোকন, এ বাড়িতে আমরা আর এক দণ্ড টিকতে পারবো না। তুই আমাদের নিয়ে যাবার ব্যবস্থা কর।

প্রতাপ বললেন, দিদি, আগে বসো। সব শুনি। কী হয়েছিল বলো তো?

সুপ্রীতি বললেন, মহা সর্বনাশ হয়ে গেছে আমাদের। রিফিউজিরা তোর জামাইবাবুকে মেরে ফেলেছে।

অসিতবরণের ঠিক কী ভাবে মৃত্যু ঘটেছে, তার সঠিক কারণটা সুপ্রীতিও জানেন না, হয়তো কোনোদিনই আর জানা যাবে না। কাশীপুরে এদের বাগান বাড়িটি জবরদখল এবং তার উচ্ছেদের চেষ্টা নিয়ে অনেক কাণ্ড ঘটে গেছে।

প্রথম দিন অসিতবরণের অন্যান্য ভাইরা যখন সেই ঘটনাস্থল থেকে পশ্চাৎ-অপসরণ করেন, তখন মনোরোগী অসিতবরণ সেখানেই থেকে গিয়েছিলেন। ভিড়ের মধ্যে অনেকক্ষণ তাঁকে কেউ লক্ষ্যই করেনি।

তারপর অসিতবরণ উদ্বাস্তুদের প্রহরা ভেদ করে কী করে যে ভেতরে ঢুকে পড়লেন, সেটা একটা রহস্য। দীর্ঘকায়, গৌরবর্ণ সুপুরুষ তিনি, খেতে না পাওয়া উদ্বাস্তুদের সঙ্গে তাঁর চেহারার কোনো মিলই নেই, সুতরাং উদ্বাস্তুরা তাঁকে কেন নিজেদের লোক মনে করবে? তবুও, যেভাবেই হোক গোলমাল, ঠ্যালাঠেলির মধ্যে অসিতবরণ কোনো এক সময়ে ঢুকে পড়েছিলেন ভেতরে। সোজা চলে এসেছিলেন পাকা হলঘরে, যেটা এক সময় নাচঘর হিসেবে ব্যবহৃত হতো।

চৌকো চৌকো সাদা ও কালো মার্বেল বসানো সেই নাচঘর। খুব অল্প বয়েসে অসিতবরণ যখন এ বাড়িতে পিকনিক করতে আসতেন, তখন ঐ চৌখুপ্পি কাটা নাচঘরে তিনি ভাইবোনদের সঙ্গে এক্কা দোক্কা খেলতেন। হঠাৎ অসিতবরণ যেন ফিরে গিয়েছিলেন সেই বালক বেলায়, তিনি পকেট থেকে একটা এক আনি বার করে এক পা তুলে লাফিয়ে লাফিয়ে এক্কা দোক্কা খেলতে শুরু করেন।

জবরদখলকারীরা এই অদ্ভুত দৃশ্য দেখে প্রথমে হতভম্ব হয়ে গিয়েছিল, তারপর তাকে মালিকপক্ষের একজন বলে চিনতে পারে।

এর পরের ঘটনা সম্পর্কে নানারকম মত আছে। কেউ বলে যে জবরদখলকারীরা তাঁকে বাঁশ দিয়ে পেটাতে শুরু করে। কেউ বলে যে, ঐ সুদর্শন, নিরীহ মতন মানুষটিকে দেখে কারুর মনেই হিংস্রতা জাগেনি, বরং বয়স্ক ব্যক্তিরা অসিতবরণের সামনে হাত জোড় করে বলেছিলেন, আপনি বাইরে চলে যান। আপনাকে অনুরোধ করছি, নইলে বিপদ হতে পারে। উদ্বাস্তুদের স্থানীয় নেতা হরীত মণ্ডলের বিবৃতি একটু অন্যরকম, তিনি বলেছেন যে, তিনি নিজে সেই সময়ে ওখানে উপস্থিত ছিলেন। তিনি সব দেখেছেন। সেখানে কয়েকজন একটু ধাক্কাধাক্কি করেছিল ঠিকই, কিন্তু কেউ কোনো অস্ত্র দিয়ে মারেনি, অসিতবরণের শরীরে কোনো আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। ঐটুকু ধাক্কাতে কোনো মানুষ মরে না, নিশ্চয়ই ওনার হার্টে গোলমাল ছিল। একটু ধাক্কা খেয়েই উনি মাটিতে পড়ে গিয়ে গোঁ গোঁ শব্দ করতে লাগলেন। তারপর ওঁর চোখ উল্টে গেল। জবরদখলকারীরা তখন অনেকে ছুটে গিয়ে জল নিয়ে এসে ওঁর চোখমুখে ছিটিয়েছে, কিন্তু ততক্ষণে সব শেষ হয়ে গেছে, উনি আর কোনো সাড়াশব্দ করেননি। ওঁর হাতে যে দুটি সোনার আংটি ছিল তা পর্যন্ত কেউ খুলে নেয়নি।

অসিতবরণের কাকা-ভাইপোরা অবশ্য এসব কিছু বিশ্বাস করেন না। তাঁদের মতে, আসতবরণকে মালিকপক্ষের একজন হিসেবে চিনতে পেরে বাঞ্চৎ রিফিউজিরা তাঁকে টেনে হিঁচড়ে ভেতরে নিয়ে যায়, তারপর সেখানে তাকে গলা টিপে মেরে ফেলেছে। এই কাহিনী যতটা ভয়াবহ করা যায়, ততই জবরদখলকারীদের উচ্ছেদ করার যুক্তি খুঁজে পাওয়া যায়। যে-কোনো প্রকারে বাড়িটা উদ্ধার করতেই হবে। পরদিন বরানগর থেকে বড় একটা দল গিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে রিফিউজিদের ওপর, প্রচণ্ড মারামারি শুরু হয়ে যাবার পর পুলিশ এসে গুলি চালায়। একটি সাত বছরের বাচ্চা সমেত তিনজন উদ্বাস্তু সেই গুলিতে প্রাণ দিয়েছে।

বাড়িটা অবশ্য মুক্ত করা যায়নি। গুলি চালনার প্রতিবাদে বামপন্থী দলগুলি রিফিউজিদের পক্ষ নিয়েছে, গতকাল কাশীপুরে হরতাল হয়ে গেছে, বিধানসভাতেও এই প্রসঙ্গ নিয়ে ঝড়। উঠেছে।

দিদির মুখ থেকে কিছুটা শুনে আর খবরের কাগজের বিবরণগুলো পড়ে প্রতাপ গুম হয়ে বসে রইলেন। আসল ঘটনা যাই হোক, উদ্বাস্তুদের কারণেই অসিতবরণের প্রাণটা চলে গেছে। এর দায় তো প্রতাপদের ওপরেও খানিকটা বতাবেই।

প্রতাপ ক্ষীণভাবে জিজ্ঞেস করলেন, অসিতদার, হার্টের অসুখ ছিল?

সুপ্রীতি বললেন, জানি না। কখনো তো কিছু বলেনি।

জানলার কাছে আড়ষ্ট হয়ে দাঁড়িয়ে আছে তুতুল। একটা হলদে রঙের ফ্রক পরা, মাথার চুল এলোমেলো, চোখদুটি দেখলে মনে হয়, একটু আগে সে কান্না থামিয়েছে। প্রতাপের সঙ্গে চোখাচোখি হতেই সে আবার ফুঁপিয়ে উঠলো।

আইনজ্ঞ হিসেবে প্রতাপের জানতে ইচ্ছে হলো যে অসিতবরণের দেহ পোস্ট মর্টেম করা হয়েছিল কিনা। কিন্তু খবরের কাগজগুলিতে সে কথার উল্লেখ নেই, দিদির কাছে এখন এই প্রশ্নটা করা ঠিক হবে না।

সুপ্রীতি একটা কিছু বলতে যাচ্ছিলেন, এমন সময় বাইরে একটা হুংকার শোনা গেল, কোথায়? সে এসেচে শুনলুম, কোথায় সে?

প্রতাপ তাড়াতাড়ি দরজার কাছে এগিয়ে গেলেন।

ধুতির ওপর একটা বেনিয়ান পরা, হাতে রূপো বাঁধানো ছড়ি, এই সন্ধেবেলাতেই জলদবরণের চক্ষুদুটি নেশায় রক্তিম, ক্রভাবে তিনি প্রতাপের দিকে তাকিয়ে রইলেন।

অন্য সময় প্রতাপ জলদবরণকে গ্রাহ্যই করেন না। এ বাড়ির অন্য কারুর সঙ্গে তাঁর। বাক্যালাপ নেই, কিন্তু এখন জলদবরণের দৃষ্টির সামনে তিনি যেন কুঁকড়ে গেলেন। তিনি নিজেকে অকারণেই যেন অপরাধী বোধ করছেন।

জলদবরণ জিজ্ঞেস করলেন, এই যে, এসেচো তা হলে’, সব শুনেছো?

প্রতাপ মুখ নিচু করে মাথা নাড়লেন।

জলদবরণ তাঁর বাজখাঁই গলায় আবার জিজ্ঞেস করলেন, কী শুনেছো? হার্টের অসুখ? আমাদের বংশের কারুর কোনো দিন হার্টের অসুখ হয়নি। তোমার দিদি আমাদের নামে কান ভাঙাচি দিয়েছে তো? বলেনি যে আমরা ইচ্ছে করে ওকে ফেলে পালিয়ে এসেছিলুম!

প্রতাপ মৃদুভাবে বললেন, আজ্ঞে না!

–আলবাৎ বলেচে। বাড়ির সব্বাই শুনেচে। মায়ের পেটের ভাইপো, আমি তার আপন নয়, বউ আপন? আমি তাকে ঐ শেয়ালগুলোর মুখে ফেলে আসবো? আমাদের। সামনে থেকে ওকে জোর করে টেনে নিয়ে গ্যাচে, আমি বলিনি এই কথা! কী? আমি বলচি, আমার মুখের ওপর কেউ কথা বলতে পারবে?

প্রতাপ বললো, আজ্ঞে ওসব কথা এখন থাক বরং।

জলদবরণ মুখটা একটু অন্যদের দিকে ফিরিয়ে, যেন অনুপস্থিত দর্শকদের শোনাবার জন্য আরও জোরে চিৎকার করে উঠলেন, তোমরাই তো আমার ভাইপোকে মেরে ফেললে! সব শালা রিফিউজি এক জাত! বাঞ্চোৎ, গুখেকোর ব্যাটাগুলোকে পোঁদে লাথি মেরে পদ্মার পার করে দেবো! বেরোও, আমার বাড়ি থেকে বেরোও, দূর হয়ে যাও। হাতের ছড়িখানা তিনি ঘোরাতে লাগলেন শূন্যে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *