১৮. চায়ে চুমুক দিয়ে

চায়ে চুমুক দিয়ে কাকাবাবু বললেন, গুপ্তধনে আমার আগ্রহ নেই। এই বিংশ শতাব্দীতেও কোথাও কোথাও হঠাৎ গুপ্তধন পাওয়া যায় বটে। কিন্তু সে সবই গভর্নমেন্টের সম্পত্তি হওয়া উচিত। আমি ত্রিপুরায় কয়েকবার এসেছি মুদ্রার খোঁজে। আপনারা সবাই জানেন, ইতিহাস চর্চার জন্য প্রাচীন কালের মুদ্রার দাম। এই দাম মানে বাজারের দাম নয়। ইতিহাসের দাম। ত্রিপুরার ইতিহাসে রাজা রত্নমাণিক্যের আগেকার কোনও রাজার নামের কয়েন পাওয়া যায়নি। আমি খুঁজছিলাম তাঁর আগেকার কোনও রাজার, অর্থাৎ ফিফটিন্থ সেনচুরির আগেকার কোনও রাজার কয়েন উদ্ধার করতে।

কাকাবাবুর ঘরে সকালবেলাতেই এসে উপস্থিত হয়েছেন নরেন্দ্র ভার্মা আর শিশির দত্তগুপ্ত। শিশিরবাবুর চোখ লাল, গায়ে এখনও জ্বর আছে, তবু তিনি বিছানায় শুয়ে থাকতে পারেননি।

শিশিরবাবু বললেন, কিন্তু আপনি যে ঈগল আঁকা মুদ্রা খুঁজে পেয়েছেন। সেটা কোন্ সময়কার?

কাকাবাবু বললেন, ঠিক ঈগল কি না বলা যায় না। তবে ওই রকমই একটা পাখি আঁকা। সেটা মুকুটমাণিক্য নামে এক রাজার সময়কার। তাঁর মুদ্রায় সিংহের বদলে ঈগল পাখির ছবি, সেটা একটা রহস্য। অবশ্য সেই সময় ত্রিপুরার ইতিহাসে খুব খুনোখুনির পালা চলেছিল। প্রায়ই একজন রাজাকে তার সেনাপতি খুন করে নিজে রাজা হয়ে বসত। আবার আগেকার সেই রাজার কোনও ভাই বা ছেলে সেই সেনাপতিকে খুন করে সিংহাসন ফিরিয়ে আনত। ঈগল পাখি আঁকা মুদ্রা ছাড়া আমি আরও কয়েকটা মুদ্রাও পেয়েছি। সেগুলো কোন্ সময়কার তা এখনও জানা যায়নি। যাই হোক, আমার ওই মুদ্রা আবিষ্কারের কথা খবরের কাগজে ছাপা হয়ে যায়। যদিও এ কথা প্রকাশ করার ইচ্ছে আমার ছিল না। সেই খবর পড়েই কাদের ধারণা হয়েছে যে, আমি অমরমাণিক্যের গুপ্তধনের সন্ধান পেয়ে গেছি।

শিশিরবাবু জিজ্ঞেস করলেন,সেই মুদ্রা আপনি কোথায় পেয়েছিলেন?

কাকাবাবু বললেন, পেয়েছিলাম জঙ্গলের মধ্যে একটা ভাঙা বাড়িতে। লোকে সেটাকেই জঙ্গলগড় বলে।

নরেন্দ্র ভার্মা বললেন। অমরমাণিক্যের গুপধনের কাহানিটা কী আমি একটু শুনতে চাই।

কাকাবাবু বললেন, তা হলে একটু আগে থেকে শুরু করি। দিল্লিতে যখন আকবর বাদশা রাজত্ব করছেন, তখন ত্রিপুরায় রাজা ছিলেন বিজয়মাণিক্য। তাঁর ছেলের নাম অনন্তমাণিক্য। রাজা বিজয়মাণিক্য তাঁর বিশ্বাসী সেনাপতি গোপীপ্রসাদের মেয়ে রত্নাবতীর সঙ্গে ছেলের বিয়ে দিলেন। বিশ্বাসী সেনাপতিটি কিন্তু চমৎকার বিশ্বাসের পরিচয় দিলেন। অনন্তমাণিক্য রাজা হবার দু বছরের মধ্যে গোপীপ্রসাদ তাঁকে খুন করে নিজে রাজা হয়ে বসল।

শিশিরবাবু বললেন, সেনাপতিকে আপনি দোষ দিতে পারেন না! জোর যার সিংহাসন তার, এই ছিল তখনকার নিয়ম।

কাকাবাবু বললেন, তা বলে নিজের জামাইকে খুন করে, নিজের মেয়েকে বিধবা করে রাজা হওয়াটাকে ভাল বলব? বলুন?

শিশিরবাবু আর কিছু না বলে মাটির দিকে চেয়ে রইলেন।

কাকাবাবু বললেন, এই গোপীপ্রসাদ রাজা হয়েই নাম নিয়ে নিল উদয়মাণিক্য। তার রাজধানী রাঙামাটির নাম বদলে দিয়ে নিজের নামে নাম রাখল উদয়পুর। এই উদয়মাণিক্য আর তার রানি হিরা দাপটে রাজত্ব করতে লাগল কিছুদিন। কিন্তু বেশিদিন সুখ ভোগ করতে পারল না। কোনও একটি মেয়ে ওই রাজা উদয়মাণিক্যকে বিষ খাইয়ে দেয়। অনেকে বলে তার বিধবা মেয়েই নাকি বাবাকে বিষ খাইয়ে মেরেছে। তখন রাজা হল উদয়মাণিক্যের ছেলে জয়মাণিক্য!

নরেন্দ্র ভার্মা বললেন, তা হলে রয়াল থ্রোন সেনাপতিদের ফ্যামিলিতেই চলে গেল?

কাকাবাবু বললেন, হ্যাঁ, তবে বেশিদিনের জন্য নয়। আগেকার রাজা বিজয়মাণিক্যের এক ভাই ছিলেন অমরমাণিক্য নামে। গোপীপ্রসাদের অত্যাচারে তিনি রাজবাড়ি ছেড়ে বাইরে কোথাও চলে গিয়ে আত্মগোপন করেছিলেন। জয়মাণিক্য রাজা হবার পর সেই অমরমাণিক্য এসে চ্যালেঞ্জ জানালেন তাকে। লড়াইতে তিনি জয়মাণিক্যকে পরাজিত ও নিহত করলেন। আবার সিংহাসন এসে গেল রাজপরিবারে। এই অমরমাণিক্য ছিলেন সেকালের ত্রিপুরার সর্বশ্রেষ্ঠ রাজা।

নরেন্দ্র ভার্মা বললেন, লেকিন রাজা হয়ে তিনি গুপ্তধন রাখবেন কেন?

কাকাবাবু বললেন, বলছি, সে কথা বলছি। রাজা অমরমাণিক্য অনেকদিন গৌরবের সঙ্গে রাজত্ব করেছিলেন, প্রজাদের খুব প্রিয় ছিলেন। কিন্তু তাঁর ভাগ্যেও সুখ সইল না বেশি দিন।

নরেন্দ্র ভাম জিজ্ঞেস করলেন, আবার সেনাপতি এসে মারল তাকে?

কাকাবাবু বললেন, না, না, তা নয়। অমরমাণিক্য সাবধান হয়ে গিয়েছিলেন, তাঁর সেনাপতিকে তিনি বেশি বিশ্বাস করতেন না, তাকে বেশি ক্ষমতাও দেননি। কিন্তু তার ফলও ভাল হয়নি। হঠাৎ আরাকানের রাজা সিকান্দার শাহ বিরাট সৈন্যবাহিনী নিয়ে আক্রমণ করল ত্রিপুরা। অমরমাণিক্য এজন্য প্রস্তুত ছিলেন না। তাঁর সৈন্যবাহিনী তেমন শক্তিশালী ছিল না তখন। তিনি যুদ্ধে হারতে লাগলেন। শেষপর্যন্ত আরাকানের মগ সৈন্যরা যখন এসে পড়ল রাজধানী উদয়পুরের দোরগোড়ায়, তখন অমরমাণিক্য ধরা না দিয়ে পালিয়ে গেলেন সপরিবারে। মগ সৈন্য এসে উদয়পুরে লুঠতরাজ করে একেবারে তছনছ করে দিল।

নরেন্দ্র ভার্মা শুনতে শুনতে বেশ উত্তেজিত হয়ে উঠেছেন। এবার বললেন, তারপর? তারপর? রাজা ধরা পড়ে গেল?

কাকাবাবু বললেন, না। রাজা অমরমাণিক্য লুকিয়ে রইলেন তিতাইয়ার জঙ্গলে। সঙ্গে কয়েকজন বিশ্বাসী অনুচরও গিয়েছিল। সেই জঙ্গলের মধ্যে চারদিকে দেয়াল গেঁথে একটা ছোট দুর্গের মতনও বানিয়ে ফেললেন।

নরেন্দ্র ভার্মা বললেন, ওহি হ্যায় জঙ্গলগড়?

লোকে তাই বলে। এখন আর গড়ের চিহ্ন বিশেষ নেই, কয়েকটা দেয়াল আর দুএকটা ভাঙা ঘর মাত্র রয়েছে। আরাকান রাজার সৈন্যরা ওদের সন্ধান পায়নি, কিন্তু রাজা অমরমাণিক্য হঠাৎ একটা কাণ্ড করে ফেললেন।

শিশির দত্তগুপ্ত মুখ তুলে বললেন, রাজা কাপুরুষের মতন আত্মহত্যা করে বসলেন?

কাকাবাবু বললেন, আপনি এই ইতিহাস জানেন দেখছি!

শিশির দত্তগুপ্ত বললেন, এই ঘটনা সবাই জানে। রাজা অমরমাণিক্য বিষ খেয়েছিলেন। ত্রিপুরার আর কোনও রাজা এরকম কাপুরুষের মতন আত্মহত্যা করেননি।

কাকাবাবু বললেন, এটা ঠিক কাপুরুষতা বলা যায় না। রাজা অমরমাণিক্যের আত্মসম্মান জ্ঞান ছিল খুব বেশি। তিনি তো দুর্বল রাজা ছিলেন না।

নিজের ক্ষমতায় সিংহাসন দখল করেছিলেন। আরাকান রাজার কাছে হেরে গিয়ে তাঁকে পালিয়ে আসতে হয়েছিল, এই অপমান তিনি সহ্য করতে পারছিলেন না। তাই হঠাৎ একদিন আত্মহত্যা করলেন।

ওঁর ধনসম্পদ সব ওই জঙ্গলগড়েই রয়ে গেল?

অনেকে তাই বিশ্বাস করে। রাজধানী থেকে পালিয়ে আসবার সময় তিনি নিশ্চয়ই অনেক ধনসম্পদ নিয়ে এসেছিলেন। সেসব গেল কোথায়? অমরমাণিক্য হঠাৎ মারা যান, তাঁর ধনসম্পদ কোথায় লুকনো আছে, সে কথা কারুকে বলে যাননি। সেই থেকেই গুপ্তধনের গুজবের জন্ম। এই গুপ্তধনের দাবিদার শুধু রাজপরিবার নয়। সেনাপতি গোপীপ্রসাদের বংশধররাও মনে করে সেই গুপ্তধনে তাদেরও ভাগ আছে। এই নিয়ে দুই পরিবারে মারামারিও হয়েছে অনেকবার। কিন্তু আজ পর্যন্ত কেউই কিছু খুঁজে পায়নি।

নরেন্দ্র ভামা হেসে বললেন, আভি তো কই রাজাও নেই, সেনাপতিও নেই। এখন আর কে লড়ালড়ি করবে?

কাকাবাবু বললেন, রাজা নেই, সেনাপতি নেই বটে, কিন্তু তাদের বংশধররা আছেন। সেই সব বংশের অনেক শাখা-প্রশাখা হয়েছে। তাদের মধ্যে কার মনের ভাব কী তা কে জানে? যে লোকটি কাল রাতে নিজেকে রাজকুমার বলে পরিচয় দিচ্ছিল! সে তো বলল, ওই গুপ্তধনের ওপরে তারই সম্পূর্ণ অধিকার।

শিশির দত্তগুপ্ত বললেন, ওই রকম রাজকুমার অনেক আছে! সত্যিকারের রাজবংশের কোনও ছেলে কি সাধারণ গুণ্ডার মতন ব্যবহার করতে পারে? কক্ষনো না।

কাকাবাবু বললেন, আর একটা ব্যাপার আছে। কাল নরেন্দ্র ভামার আসতে যখন দেরি হচ্ছিল, তখন সময় নেবার জন্য আমি বলেছিলুম, ঠিক আছে, জঙ্গলগড়ের সন্ধান আমি দিতে পারি, কিন্তু আমায় কত টাকা বখরা দেবে বলল। তখন রাজকুমার বললে, রায়চৌধুরী, তোমাকে আগেই অনেক টাকা দেবার প্রস্তাব করা হয়েছে, তুমি রাজি হওনি! কিন্তু আশ্চর্য ব্যাপার এই, এর আগে তো আমায় কেউ এ ব্যাপারে কোনও টাকা দেবার প্রস্তাব করেনি! তার মানে, ওই রাজকুমার ঠিক জানে না। সে প্রধান দলপতি নয়। আর কেউ আছে।

শিশির দত্তগুপ্ত বললেন, ধরে ফেলব, সবাইকেই ধরে ফেলব। ওই রাজকুমার আর কর্নেল, ওদের সবাইকেই কালকের মধ্যে আপনার সামনে হাজির করে দেব!

কাকাবাবু বললেন, তার আগে সন্তুকে উদ্ধার করার কী ব্যবস্থা করবেন?

এই সময়ে সিঁড়িতে একটা গোলমাল শোনা গেল। শিশির দত্তগুপ্ত আর নরেন্দ্র ভার্মা সেই শব্দ শুনে উঠে দাঁড়াতেই সাদা পোশাকের পুলিশ দুজন একটা লোককে টানতে টানতে নিয়ে এল ঘরের মধ্যে।

ওদের একজন বলল, স্যার, এই লোকটা চিঠি নিয়ে এসেছে। ওকে আমরা ছাড়িনি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *